ছাতা

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
অণুগল্প
Bengali
ছাতা

জানলা দিয়ে হঠাৎ করে একটা দমকা হাওয়া ঢুকে পড়তেই সায়ন্তী বাইরে তাকাল। এখনও কিছুটা বেলা আছে। সবেমাত্র ছ’টা দশ। মেঘ করে আসায় আলো অনেকটাই কমে এসেছে।

তুই একটু বোস। আমি ওপরের ঘরের জানলাগুলো বন্ধ করে আসি। তা না হলে ঘর একেবারে ধুলোয় ভর্তি হয়ে যাবে। স্নেহা খুব দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল।

সায়ন্তী খাট থেকে নেমে খোলা জানলাটার কাছে গেল। বাইরে বেশ ধুলো উড়ছে। জৈষ্ঠ্যের শেষ। এটাকে ঠিক কি ধরনের বৃষ্টি বলে সায়ন্তী জানে না। তবে চরিত্রে কালবৈশাখীর কাছাকাছি। ঝড় থামলেই বৃষ্টি শুরু হবে।

জানলা বন্ধ করে দে।

স্নেহার কথায় সায়ন্তী জানলা বন্ধ করে আবার খাটে এসে বসল।

দুই.

আধ ঘন্টারও বেশি হয়ে গেল বৃষ্টি পড়ছে। এখন আড্ডায় স্নেহার মা, দাদাও এসে বসেছে।

বৃষ্টি ছাড়ার তো নামই নেই! সায়ন্তী জানলা খুলে বাইরে তাকিয়ে বলল।

বৃষ্টি না ছাড়লে তোর অসুবিধে কোথায়? কাকিমাকে শুধু একটা ফোন করে দেব। ব্যাস, তাহলেই আর চিন্তার কোনো ব্যাপার নেই।

কাল সকাল সাড়ে ছ’টায় পড়ানো। রাত থাকলে হবে না রে স্নেহা। সায়ন্তী আবার জানলার কাছে উঠে গেল।

যখন এলাম কত রোদ। একটুও বুঝতে পারি নি। না হলে প্রস্তুত হয়েই বেরোতাম। এতক্ষণ ধরে বৃষ্টি হওয়ার কোনো মানে হয় !

স্নেহার দাদা খুব জোরে হেসে উঠলে সায়ন্তী ঘুরে তাকালো। তুমি জানলে কি প্রস্তুতি নিয়ে বেরোতে?

একটা অন্তত ছাতা নিয়ে বেরোতাম।

আমি বুঝতে পেরেছি সায়ন্তী। তোমার খারাপটা লাগছে ওই কারণেই। শুধু তোমার নয়, বাঙালি মাত্রেই এই সমস্যা। কিছুতেই বন্ধুর বাড়ির লোকেদের সে ছাতার কথা বলতে পারবে না। আসলে তার মনে কে যেন একটা ধারণা তৈরি করে দিয়েছে, বৃষ্টির সময় ছাতা সংসারে একটা অতি দরকারি জিনিস। তাই এইসময় ছাতা চাওয়া মানে গৃহস্থকে সমস্যায় ফেলে দেওয়া। বলো সত্য কিনা?

হয়তো কিছুটা সেরকমই।

আমরা একটা ছাতা চেয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারি না কেন বলো তো ? যেটা তুমিও এতক্ষণ পেরে ওঠো নি।

কেন?

আসলে আমাদের বাড়িতে কেউ এলে বৃষ্টির সময় আমরাও কেউ ছাতার প্রসঙ্গ তুলি না। কারণ প্রত্যেক বাড়িতেই গোনা-গুনতি ছাতা। কোনো কোনো বাড়িতে আবার সেটাও থাকে না। আর এইসব ক্ষেত্রে ছাতা একবার বাড়ির বাইরে বের হলে আর কখনও ফিরে আসে না। এটা আমরা জানি বলেই নিজেরাও কারও বাড়ি থেকে চাইতে পারি না।

বাপরে! তুমি কতো ভাবো মৃণালদা। তবে আমি মোটেও এইসব কথা ভাবনা চিন্তা করে ছাতা চাইতে ইতস্তত করি নি।

আমি তো তোমার কথা ভেবে বলি নি সায়ন্তী। আসলে আমার এটা মনে হয় তাই বললাম। মৃণাল জানলা খুলে বাইরেটা একবার দেখে নিয়ে বলল।

বৃষ্টি কিন্তু অনেকটাই কমে এসেছে। এর বেশি কিন্তু কমবে না। তুমি বেরিয়ে পড়তে পারো।

কি হচ্ছে দাদা! আমি ওকে আজকে রাখতে চাইছি আর তুই বাড়ি পাঠাতে চাইছিস?

ও থাকুক না, আমার অসুবিধে কোথায়। ওই-ই তো বললো কাল সকালেই ওর পড়ানো আছে। আমি সেইজন্যই বলছিলাম।

তুমি একদম ঠিক কথা বলেছ মৃণালদা। আমাকে এখনই বেরোতে হবে।

অবশ্যই বেরোবে তবে ছাতাটা নিয়ে।

মোটেও না। এমন কিছু বৃষ্টি পড়ে নি যে ছাতা নিয়ে বেরোতে হবে!

দেখেছো, আমি যা বললাম তা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল তো!

আমি অত সবকিছু ভেবে বলছি না মৃণালদা।

কিন্তু তবুও তুমি ছাতাটা নিয়েই বেরোবে। তুমি ছাতা নিয়ে চলে গেলে আমাদের যদি ভিজতেও হয় তবু তুমি নিয়ে যাবে। আমি এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারি না, পরে আমার দরকার লাগবে বলে আমি আমার ছাতাটা কিছুতেই হাত ছাড়া করব না! আশ্চর্য! ছাতাটা কেনা কি জন্যে? চোখের সামনে একজন মানুষ ভিজতে ভিজতে যাবে আর আমি পরে কোনো একসময় ভিজে যাব বলে ছাতাটাকে আগলে রেখে দেব!

সায়ন্তী ছাতা নিয়েই স্নেহার বাড়ি থেকে বের হয়। বাসে মাত্র মিনিট কুড়ির পথ। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, রাতটা কাটিয়ে এলে মন্দ হতো না। মৃণালদা যা মানুষ তাতে ও সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠিয়ে সাড়ে ছ’টার পড়া ধরিয়ে দিতে পারত। এরকম মানুষ যেকোনো পরিবারে সত্যিই ছাতার মতো। কথাটা ভাবতে ভাবতে সায়ন্তীর ভেতরটা আনন্দে ভরে গেল।

সম্পাদনা: জোবায়েন সন্ধি

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ