ছায়ামানব

আলপনা তালুকদার
গল্প
Bengali
ছায়ামানব

গভীর রাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি ঘেমে জবজবে হয়ে গেছি। আবছা অন্ধকারে আমি ওই লোকটাকে খুঁজছি। সে কি আজও আমার পাশে শুয়ে আছে? এলোমেলো বড় বড় চুল। কাঁচাপাকা দাড়ি। উদভ্রান্ত, স্থির দৃষ্টি। ভাবতেই ভয়ে জমে গেলাম। তারপর অনেক কষ্টে বিছানা থেকে নেমে আলো জ্বালানোর চেষ্টা করলাম। সুইচবোর্ড খুঁজে পাচ্ছি না। এই ঘরে আজই আমি প্রথম ঘুমিয়েছি। সবকিছু এখনও ঠিকঠাক চিনে উঠতে পারিনি। ঘুমানোর আগে সুইচবোর্ডটার অবস্থান ভালো করে দেখে নিয়েছিলাম। কারণ আমি জানি, রাতে ওটাই আমার সবচেয়ে বেশী দরকার হবে। প্রাণপণ চেষ্টার পর আলো জ্বালাতে পারলাম। আহ্! দেহে প্রাণ ফিরে এলো। লোকটা নেই। শামা আর জয়ী ঘুমাচ্ছে। ওরাও ক্লান্ত। আমার মতই।

আমি সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষজন। মেয়েদের মেসে এই ঘরটাতে আমরা তিনজন থাকি। তিনজনই একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। শামা আপু সিনিয়র। সে পড়ে থার্ড ইয়ারে। বোটানিতে। গোলগাল মুখ, বেশ সুন্দরী। আর জয়ী পড়ে ল’তে। আমার মত নতুন। খুব বুদ্ধিমতী আর চটপটে মেয়ে। লম্বাও অনেক। জিন্স পরে। তবে ওরা দু’জনেই খুব মিশুক। সেজন্য ওদের সাথে থাকতে আমার তেমন কোন সমস্যা হবেনা। তবে ওদেরকে যেহেতু আমার খুবই দরকার, তাই আমি এমন কিছুই করব না, যাতে ওদের সাথে আমার সম্পর্ক খারাপ হয়।

কিন্তু প্রথম রাতেই আমি ওদেরকে বিরক্ত করছি। গভীর রাতে আলো জ্বালিয়ে ওদের ঘুম ভাঙ্গানোর দরকারটা কী? দরকার আছে। আমার ভীষণ ভয় করছিল। আমি রাতে একা ঘুমাতে পারিনা। প্রায়ই ভয় পাই।

আমি জেলা শহরের মেয়ে। বাবা সরকারী কলেজের শিক্ষক। মা গৃহিণী। একটা ছোট ভাই আছে। সে পড়ে ক্লাস টেনে। আমি একা কখনও বাড়ীর বাইরে কোথাও থাকিনি। তাই নতুন পরিবেশে অতটা মানিয়ে নিতেও শিখিনি। এখানে সবচেয়ে বড় যে অসুবিধাটা হচ্ছে, সেটা হলো, বুয়ার রান্না খেতে পারছি না। আমাকে রেখে আম্মু চলে যাবার সময় আমি ফ্যা ফ্যা করে কেঁদেছি।

মূল সমস্যা সেখানে নয়। মূল সমস্যা ওই লোকটা। সে প্রায়ই রাতে এসে আমার সামনে হাজির হলে তখন আমি কী করব? ভাবতেই ভয়ে আমি আধমরা হয়ে যাচ্ছি।

সমস্যাটা শুরু হয়েছিল বছর তিনেক আগে। একদিন রাতে আমি পড়ছিলাম। একটা মত বাজে। ঘরে আর কেউ ছিলনা। আমার রাত জেগে পড়ার অভ্যাস। সবাই যার যার ঘরে। হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। আমি হঠাৎ আমার ঘরের দরজায় নক করার শব্দ শুনলাম। দূুইবার। ঠক ঠক। মাঝে মাঝে আমার ঘরে ঢোকার আগে আব্বু এভাবে নক করে। আমি চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখি, কেউ নেই। ভাবলাম, ভুল শুনেছি। কয়েকদিন পরে আবার দরজায় নক। এবার তিনরার। ঠক ঠক ঠক। আবার দরজা খুলে দেখি, কেউ নেই। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে আম্মুর ঘরে ছুটে গেলাম। আম্মুর ঘরের দরজা খোলাই থাকে। আমি আলো জ্বালিয়ে দেখলাম, আব্বু-আম্মু দু’জনেই  ঘুমাচ্ছে। আমি আম্মুকে ডেকে তুললাম। আম্মু অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “কী হয়েছে?” আমি হড়বড় করে বললাম, “আম্মু, আম্মু! কে যেন আমার ঘরের দরজায় টোকা দিচ্ছিল!” আম্মু বিরক্ত হন। “কী আজব কথা! বাড়ীর ভিতরে ঢুকে কে নক করবে?”

আব্বু আমার কথা বিশ্বাস করলেন। বললেন,

“চলতো, দেখি। চোর-টোর হতে পারে।”

আমরা তিনজন মিলে গোটা বাড়ীটা খুঁজে দেখলাম। কোথাও কেউ নেই।

তার কিছুদিন পর এলো সেই হিমশীতল রাত। আমি গভীর রাতে ঘুমভেঙ্গে দেখলাম, একটা লোক আমার পাশে শুয়ে আছে! লোকটা আমাকে ছুঁচ্ছেনা। শুধু শুয়ে আছে। আর বড় বড় স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটার বাম হাতের কনুইয়ের কাছে দগদগে ঘা। পুড়ে গিয়ে মাংস বেরিয়ে গেলে যেমন হয়, তেমন।

আমি বিরাট এক চিৎকার দিয়ে এক লাফে দৌড়ে বিছানা থেকে নেমে আম্মুর ঘরে গিয়ে জ্ঞান হারালাম। আর কিছু মনে নেই। তারপর থেকে রাতে আম্মু আমার সাথে ঘুমাতো এবং আমি আম্মুকে রাতে কোথাও থাকতে দিতাম না। বেড়াতে গেলে আমি সাথে যেতাম।

পরে আব্বু যুক্তি দিয়ে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে, আমি হয়তো স্বপ্নে এসব দেখেছি। কিন্তু ঘুম ভেঙ্গে মনে হয়েছে, বাস্তবে দেখেছি। অথবা হেলুসিনেশন। আমার কল্পনা। কিন্তু আমি জানি, আমি যা দেখেছি, তার কোনটাই স্বপ্ন বা হেলুসিনেশন নয়।

একটা জিনিস আমার খুব অবাক লেগেছে। সেটা হলো, ওরকম ভয়ের সময়েও আমি অতকিছু দেখলাম কী করে? লোকটার মুখটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। কিন্তু আমার সারাজীবনের সব স্মৃতি হাতড়েও আমি ওই লোকটাকে কোথাও খুঁজে পেলাম না। আমি কখনও ওরকম চেহারার কাউকে দেখিনি। শুধু এক পাগলের কথা মনে আছে। আমি তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি। তখন স্কুলে একদিন একটা পাগল আমার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করছিল। লোকটা বিশ্রী নোংরা। আমি ভয় পেয়ে কেঁদে ফেলি। তখন আশপাশের লোকজন পাগলটাকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়। আর কোনদিন আমি ঐ পাগলটাকে দেখিনি। পাগলটার চেহারা কিছুটা এই লোকটার মত। কে লোকটা? সে আমার কাছে কেন আসে? কী চায়?

আমি তখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। শামা আপু বাড়ী গেছে। তার মায়ের অসুখ। আজ রাতে জয়ী আর আমি রুমে একা থাকব। আমার খুব বেশী ভয় করছিল না। জয়ী খুব সাহসী। কিন্তু জয়ী ওর দূর সম্পর্কের এক খালার বাসায় বেড়াতে গেছে। সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আসার কথা। কিন্তু জয়ী ফিরলো না। রাতে আমার ভয় করতে লাগলো। একা থাকবো কীভাবে? আমি পাশের রুমের নীনা আপার কাছে গেলাম।

“আপু, আজ রাতে আমি তোমার রুমে থাকি?”

নীনা হা হা করে হেসে উঠে বলল,

“কেন? সমস্যা কী? ভয় পাও?”

সে রাতে আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি। শুধু মনে হচ্ছিল, আজ রাতে নিশ্চয়ই ওই লোকটা আসবে। হয় দরজায় কড়া নাড়বে, অথবা আমার পাশে এসে শুয়ে থাকবে। তবে আশার কথা হলো, এদু’টোর কোনটাই সেদিন ঘটলো না। আমি ধীরে ধীরে লোকটাকে ভুলে গেলাম।

অনার্স পরীক্ষার পর হুট করে আমার বিয়ে হয়ে গেল। পারিবারিকভাবে। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। দেখতে সুদর্শন। আর্থিক অবস্থাও ভালো। ছেলের পরিবার আমার মামার পরিচিত। মামাই ঘটক। ছেলে ঢাকায় চাকরি করে। আমি আপত্তি করিনি। তাছাড়া কথা বলে আমার ছেলেটিকে বেশ পছন্দও হয়ে যায়।

বাসর রাতে আমার বর যখন শেরোয়ানী খুললো, আমি দেখলাম, তার বাম হাতের কনুইয়ের কাছে পোড়া দাগ। ঠিক ওই লোকটার মত। আমি ভয়ে শিউরে উঠলাম। আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার হাতে ওটা কীসের দাগ?” আমার ভয় পাওয়া দেখে

আমার বর খুব অবাক হলো।

“ছোটবেলায় গরম মাড়ের গামলায় পড়ে গেছিলাম। তখন পুড়ে গেছে। তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন?”

আমার ইচ্ছা করছিল, ঘর থেকে বেরিয়ে নানীর কাছে চলে যাই। নানী আমার সাথে এসেছে। কিন্তু এতবড় বাড়ীতে নানী ঠিক কোন্ ঘরে শুয়েছে, আমি জানিনা। আমি খাট থেকে নেমে দরজার দিকে গেলাম। আমি ভয় আর সন্দেহের চোখে আমার বরকে দেখছি। ওই লোকটার চেহারার সাথে তার চেহারার তুলনা করছি। ওই লোকটার মত মেকআপ দিলে কী আমার বরকেও ওই লোকটার মত দেখাবে? ঘরের আলো নিভিয়ে দিলে কী আমার বরের চেহারা ওই লোকটার মত হয়ে যাবে?

আমার বর আমার অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ আমার মনে হল, আমার বরের চোখদুটো ভাসা ভাসা, টানা টানা। ওই লোকটার মত! তারপর ধীরে ধীরে আমার চোখের সামনে আমার বরের চেহারাটা ঝাপসা হয়ে এলো।

আলপনা তালুকদার। ড. আকতার বানু আলপনা (আলপনা তালুকদার নামেই বেশি পরিচিত) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আই.ই.আর (শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট) - এর একজন অধ্যাপক। তিনি এসএসসি-তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল থেকে রাজশাহী বোর্ডে মানবিক বিভাগ থেকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম ও সম্মিলিত মেধা তালিকায় অষ্টম...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..