ছায়া

সাবরিনা ফেরদৌস
গল্প
Bengali
ছায়া

ছায়ার দিকে তাকিয়ে হাঁটলে কেমন ঘোর লেগে যায়। সূর্য ঘোরে, তার সাথে ঘোরে ছায়া, কখনো সামনে কখনো পেছনে। কখনো আমি ছায়ার আগে যাই, কখনো ছায়া আমার আগে যায়। ছায়াসঙ্গী হয়ে ছায়া থেকে যায় ছায়ার মত করে। এখন ছায়া আমার আগে আগে চলছে, কিছুটা বামদিক ঘেঁষে। এতিমখানা থেকে বের হয়ে হেঁটে যাচ্ছি। কিন্তু কোথায় যাচ্ছি জানি না। আমার গন্তব্য কোনটা? আমি একটি মেয়েশিশু দত্তক নিতে চাই। ফুটফুটে নিষ্পাপ শিশির ফোঁটার মত একটি মেয়েশিশু। শুধু ছায়াকে সঙ্গী করে বেঁচে থাকতে থাকতে আমি বড্ড ক্লান্ত। তুলতুলে নরম ছোট একটা মেয়ে আমার সঙ্গী হতে পারে না?

রাস্তার উপর দিয়ে, কখনো ফুটপাথের উপর দিয়ে আমি আর ছায়া হেঁটে যাই। ধীরে ধীরে কেমন বড় হয়ে উঠছে ছায়াটা। আমি কে? যে আমি সাদা সালোয়ার কামিজ আর সবুজ ওড়না পরে হেঁটে যাই সে? নাকি কালো অন্ধকার ছায়াটা আমি? চিপসের খালি প্যাকেট, কলার খোসা, ম্যানহোল উপচানো ময়লা পানি, মানুষের কফ, থুথু যার উপর পড়ছে সেই ছায়া কি আমি? মোড়টা ঘুরতেই ছায়া আমার পেছনে পড়ে গেলো! কিন্তু আমি জানি সে আমাকে ছেড়ে যায়নি। সে আছে।

শিল্পী: রিয়া দাস

ছোট আমাকে রেখে মা-বাবা যখন অফিসে চলে যেতেন আমি জানতাম সে আছে। কতো আর বয়স তখন আমার, চার বা পাঁচ? দাদাবাড়ির বুড়ি এক মেয়েমানুষ আর তাঁর কাছে আমাকে রেখে বাবা-মা পরম নিশ্চিন্তে চলে যেতেন। বুড়ি মেয়ে মানুষটা সব বুঝতো। রান্না আর ঘরের কাজ করে ঘুমাতো সে। আমি খেলতাম বাবার বিশ্বস্ত আমার দূর সম্পর্কের চাচার সাথে। আমি খেলতাম নাকি খেলতো সে? খেলনার ঝুড়ি থেকে সব খেলনা মেলে আমি সেসব নিয়ে ব্যস্ত। সে আমাকে আদর করে। বেবিফ্রকের উপর দিয়ে আমার ছোট্ট শরীরটাকে সে আদর করে। বেবিফ্রকের নীচ দিয়ে তার হাত খেলা করে আমার অস্ফুট বুকে। দুপুরের খাবারের পর সে আমার ঘরের দরজা আটকে দিত। আমার ছোট্ট বিছানায় আমাকে দুমড়েমুচড়ে ফেলত। আমি বুঝতাম সে ভয়ানক খারাপ কাজ করছে। আমাকে বলতো আমিও করছি। ভয় পেতাম, আমি খারাপ কাজ করছি। কাকে বলি আমি এসব করতে চাই না? বাবামাকে বলে দিলে তারা যে আমাকে অনেক মারবে!

লিফটের বাটনে আমি আট চাপি। আমার ছোট্ট সাজানো ঘর। ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে হাজার মণ ক্লান্তি নিয়ে আমি আমার ছোট্ট স্বর্গে ঢুকি। আমি আমার মত করে বুক ভরে শ্বাস নিই। শোবার ঘরের একপাশে দেয়াল জুড়ে আয়না। ফুল স্পিডে সিলিং ফ্যানটা চালিয়ে দিয়ে আমি একে একে আমার শরীর থেকে সব কটা কাপড় খুলে ফেলি। ঘর ভরা আলো, সিলিং ফ্যানের মাতাল হাওয়ায় আমার শরীরটাকে আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি আমার দিকে তারপর লজ্জা আর ঘৃণায় ডুকরে কেঁদে উঠি। কতোজনের লোভের থাবায় আমার শরীরটা ক্ষতবিক্ষত। আমি ব্যথায় যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠি। কেউ নেই আমার সঙ্গী। শুধু আমার ছায়া আমায় দেখে।

মায়ের হাতে প্রচন্ড মার খেয়ে আমি বিছানাতে এমনি উপুড় হয়ে কেঁদেছিলাম। আমার ছোট্ট ভাইটার জন্মের পর মাকে চাকরি ছাড়তে হয়। আমি বেঁচে যাই চাচার সাথে খেলার হাত থেকে। স্কুল থেকে ফিরে দুরন্ত আমি মেতে উঠি রসগোল্লার মত আমার ভাইটিকে নিয়ে। ক্লাস টুয়ে পড়ার সময় থেকেই আমি মায়ের সাহায্যকারী। মা কাজ করার সময় বাবু আমার কোলে থাকে। মাকে আরও ছোটখাটো কাজে সাহায্য করি। ছেলেশিশু আর মেয়েশিশুকে সংসারে যে একভাবে দেখা হয় না তা যেন বুঝতে পারি। ভালো সবকিছু বাবুর জন্য রেখে দেয়া, বাবুর আবদার আগে মেটানো, যেকোনো অনুষ্ঠানে বাবুকে মধ্যমণি করে রাখা, আমি সব মেনে নিই। শুধু মেনে নিই না, আমিও তাদের সাথে সামিল যারা বাবুকে আমার চাইতে অধিক মূল্যবান ভাবে।
আমার এই ঘরে বাবু থাকে না। বাবা বা মা, কেউ থাকেন না। এই ঘর আমার যেখানে আমি আয়নায় আমাকে দেখি। দেখি আর মুগ্ধ হই। দেখি আর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠি। হালকা গোলাপী রঙের টাইলসের বাথরুমে আমি গোসল করি প্রাণভরে। প্রতিদিন আমি গোসল করি আর আমার শরীরে যত নোংরা লেগেছে তা ধুয়ে পরিস্কার করি। যে মৌলভি আমাকে কোরআন পড়াতে আসতো তাঁর কামুক দৃষ্টি আমি ধুয়ে ফেলি। মৌলভি যে কোন বাহানায় আমার গায়ে হাত দিত। এভাবেই একদিন আমাকে জড়িয়ে ধরলে মা দেখে ফেলে আর আমাকেই খারাপ বলে অসম্ভবরকম মারে। আমি মায়ের সবকটা আঘাতকে ধুয়ে ফেলি। কলেজে জুওলোজি স্যারের অসভ্যের মত বুকের দিকে তাকিয়ে থাকাকে আমি ধুয়ে ফেলি। গোসল করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে পরি। আমার চোখ জবাফুলের মত লাল হয়। তবুও আমার গোসল শেষ হয় না। কতো নোংরা এই সমাজ আমার শরীরে মেখে দিয়েছে!

গরম পানির ভাপে বাথরুমের আয়না যেন কুয়াশা মাখানো। কুয়াশার ভেতরেও কি আমার ছায়া আছে? আমার ছায়া কখনো আমাকে ছেড়ে যাবে না? সে কি আমার পেছনে দাঁড়ানো? ঐতো বদরুন্নেসা কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী, হাত ধরে হাঁটছে মেডিকেল কলেজের দুর্দান্ত মেধাবী এক ছাত্রের সাথে। কি উচ্ছল আর প্রাণবন্ত সেসব দিন। ছোটবেলার দুঃস্বপ্নকে একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম তৌকিরের ভালোবাসা পেয়ে। হায়রে ভালোবাসা! শুধু শরীরের খেলা! আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বছরেই তৌকিরের ভালোবাসা দিক বদলায়।

আয়নায় তৌকির মিলিয়ে যায়। লেখাপড়ায় খুব সিরিয়াস হয়ে পড়ি। শুধু মেধার জোরে ভালো ফলাফল আসে না। তাই ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক অফিসরুমের ভেতরেই তাঁর সাহায্য ঢেলে দেয় আমার শরীরের ভেতর। জঘন্য…। ট্যাপের পানিতে সেই সম্মানিত শিক্ষকের মুখ ধুয়ে ফেলি। মগ ভরে পানি ছিটিয়ে দেই আয়নার উপর।

এই যে আমি আমাকে টাওয়েলে জড়িয়ে বসে আছি বিছানাতে, এভাবেই এক শীতে চাদর জড়িয়ে বসে ছিলাম। বাবা আমাকে খুন করার জন্য বসার ঘরে পায়চারী করছে। মা হাতের কাছে যা পায় তাই দিয়েই একের পর এক আমাকে আঘাত করে যাচ্ছে। আবার করছে, আবার…, বারবার। সহপাঠীর সাথে আমার দ্বিতীয় প্রেমে আমি তখন অন্তঃসত্ত্বা। দুজনই পাশ করেছি। রাকিব মোটে এক এনজিওতে ঢুকেছে। আর আমি একটি বেসরকারী কলেজে পড়াই। আমাদের বাবু, যে আমার চেয়ে ছ বছরের ছোট, আমাকে পায়ের স্যান্ডেল দিয়ে মারে। আমি অজ্ঞান হয়ে নিস্তার পাই কিন্তু তার আগে জেনে নিই কালকের মধ্যে রাকিবকে বাড়িতে নিয়ে আসতে হবে।

আসেনি সে। তার অপারগতার কথা জানিয়ে দিয়েছে। তবে একেবারেই অসহায় করতে চায়নি। এবরশনের খরচটা দিয়ে দিবে। বাড়ি ফেরার উপায় ছিল না আমার। বান্ধবীর বাড়িতে উঠি। কিন্তু কতদিন? নীলিমার মাবাবা বাংলাদেশে থাকতেন বলে রক্ষা, নয়তো সেখানে আমার একদিনও আশ্রয় মিলত না। ওর সাহায্যে আমাকে শেষ পর্যন্ত এবরশন করাতে হয়। মাতৃত্বের সাধ পাইনি কারণ পিতা তাঁর সন্তানের পরিচয় দেয়নি। সমাজ পিতা ছাড়া কোন সন্তানের স্থান দেয় না।
নিজেকে গুছিয়ে নেই। রোজ রাতে মনের মত করে সাজ করার অভ্যেস হয়ে গেছে। সবুজ পাড়ের কালো একটা শাড়ি পড়ি। সবুজ টিপ আর কাজলের ছোঁয়ায় আমাকে কি অপূর্ব লাগছে! নীলিমার বাড়ি থেকে চলে আসার পর কতো যে ঠিকানা বদলাতে হয়েছে! কখনো সাবলেট, কখনো মেয়েদের সাথে মেস করে থাকা, কখনো হোস্টেলে থাকা। কলেজের চাকরী ছেড়ে দিয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। পনেরটা বছর আমি একা, এখানে ওখানে। একা ছিলাম কি! ছায়া কি আমার সাথে ছিল না?

বহুজাতিক কোম্পানিতে লোভনীয় চাকরী আমার। লাখ টাকার উপর স্যালারি পাই। শেষ পর্যন্ত আমার নিজের একটা স্বর্গ রচনা করতে পারি। কিন্তু এখানেও আমি একা হতে পারি না। আমার ছায়া আমাকে ছেড়ে যায় না। আমার নিজের ছোট্ট এপার্টমেন্টে আমি গান গাই, কবিতা পড়ি। ছোটবেলায় জর্জ মাইকেলের প্রেমে পড়েছিলাম। আমি ওর গানের সাথে নাচি। ছায়ার সাথে কথা বলি।

চাকরির সুবাদে মাঝে মাঝে দেশের বাইরে যেতে হয়। তখনও ছায়াটা আমার সাথে যায়। কতবার কতজনের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে! আমি আর ফিরে যেতে চাইনি সেই অনিশ্চিত জীবনে। স্থিতি ছেয়েছিলাম। শুধু একটুখানি স্থিতির জন্য আমি সব কিছু ছাড়তে রাজি হয়েছিলাম। তিন মেয়ের বাবা মেহবুবকে আবারও ভালবেসেছিলাম। আমার

গর্ভে আমি একটা সন্তান চেয়েছিলাম। নিকেতনের বাসায় মেহবুবের সাথে আমার কতো সৃতি! কিন্তু আমার সন্তানের বাবা সে হতে পারবে না। সমাজে ওর একটা সুনাম আছে, ওর মেয়েদের ভবিষ্যৎ আছে। সেবার এবরশনের সময় কমপ্লিকেসি দেখা দেয়। আমার প্রাণের বিনিময়ে আমি হারাই মা হবার যোগ্যতা। তখনও আমার সেই বিকট ছায়া আমাকে ছেড়ে যায়নি। দিনরাত ছায়া আমার কানে অট্টহাস্য করে। আমাকে উপহাস করে ছায়ার যে কি সুখ! মাঝে মাঝে যখন কাউকে খুব ভালবাসতে ইচ্ছে করে, তখন আমি ছায়াকে ভালোবাসি। আমি জানি সেও আমাকে খুব ভালোবাসে। আমরা দু’জন প্রাণের সই। কেউ কাউকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারি না। তবুও মাঝে মাঝে আমি ছায়া দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। ছায়াটা কি খুব বীভৎস দেখতে? ওর চোখ দিয়ে কি আগুন ঝরে? ওর জিভে কি রক্ত লেগে আছে? ওর নখগুলো কি খুব ধারালো? আমাকে এফোঁড়ওফোঁড় করে দেবে?

ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকি। ঘুমের ওষুধ খেয়েছি। জানি কিছুক্ষনের মধ্যে আমি হারিয়ে যাবো। আমার নিদ্রাহীন ঘুমের মধ্যেও কি ছায়া আমার সাথে থাকে? কতদিন স্বপ্ন দেখি না! আজকাল খুব স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে হয়। একটা নরম তুলতুলে হাত আমাকে জড়িয়ে রাখছে। ওর খিলখিল হাসিতে ছায়ার অট্টহাস্য আমার কানে পৌছোবে না। আমার ঘর ভর্তি করে ছায়া না, একটা ছোট মেয়ে ছুটোছুটি করবে। আমার মেয়েটার উপর আমি কারো ছায়া পড়তে দেবো না। সবার ছায়া থেকে আমি ওকে আড়াল করে রাখবো।

আমি কেন মা হতে পারবো না? আমার গর্ভের না হোক, আমি তো একটা ছোট মেয়ের মা হতে পারি। সেজন্যও কি আমাকে কোন পুরুষের সাহায্য নিতে হবে? একটা শিশুকে দেবার মত ভালোবাসা, মায়া, মমতা, সবকিছু আমার আছে। তবুও আমি মা হতে পারি না! কিন্তু আমি মা হবোই। যেভাবেই হোক, আমি মা হবো। একলা মা, আমার মেয়ের কোন বাবার প্রয়োজন নেই। আমার মেয়ের সবটুকু আমার। আমার সবটুকু আমার মেয়ের। আমরা মা ও মেয়ে। সেই নিঃসঙ্গ ছায়াটার অট্টহাসি আমাকে আর ভাবায় না। আমি সবকিছু তুচ্ছ করবো আমার সন্তানের জন্য।

সাবরিনা ফেরদৌস। লেখক।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..