জলপরি

শ্রীপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
কবিতা
Bengali
জলপরি

থাকি না

তুমি এসে ফিরে গেছ ডেকে
ভোরে এসে দাঁড়িয়েছে স্নিগ্ধ হাওয়া
বুকের সিন্দুকে তেমন গোপন কিছু নেই
শুকনো বিশ্বাসে মোড়া সম্পর্কের শিকড় বাকড়

স্বর্গের বাগানে জ্যোৎস্না চুরি করে
রাত্রি ফিরে আসে
অনেকেই এসে ডেকে ডেকে ফিরে গেছে
অবনীর মতো আমিও বাড়িতে থেকেও থাকি না

আজ তোমার জন্যই তুলে রেখেছি রঙ তুলি
হিরণ্ময় যত অবসাদ সব তোমাকে ঘিরেই
অবাধ্য রক্তের স্রোত আমাকেই ঠকায় রোজ
তোমায় জানাবার কোন ইচ্ছা হয়নি

 

তোমারই মতো

আমিও তোমার মতো
গাছ, নদী, পাথর, অক্ষর হতে চেয়ে
শোকসভার ঘোষকের মতো
চোখের পাতায় চন্দ্রাবলী প্রহর রেখে
বাঙ্ময় শোক প্রস্তাব
তুলে দিই নির্জন বারান্দায়

পাতার প্রহরঝরা রাত্রির বিষণ্ণতায়
মৌলির মতো খুঁজে বেড়াই
মরে যাওয়া পাতার হলুদ
হারিয়ে যাওয়া উজ্জ্বল জোয়ার
নদীতটে রেখে আসা অনাগত ঢেউ

জীবন যন্ত্রণা সব লিখে রাখি
রাতের ক্লান্ত পালকে, জলের অক্ষরে
বিজয়ার মতো ম্লান চোখে
বাঁচিয়ে রেখেছি কিছুটা আগুন
অবশেষে নিজেকে পোড়াব বলে

প্রতীক্ষা

এমন-ই কী হয়
প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হলে
মনমরা গাঙচিল উড়ে যায়
কোটর জঠরে
কুমারী তারার দল
সিঁদুর জলে নেয়ে
হারিয়ে যায় ঢেউয়ের ভিতর

প্রতীক্ষা এমনও হয়
বালি খুঁড়ে খুঁড়ে জল
পাঁজর খুঁড়ে ভালোবাসা
কবর খুঁড়ে কঙ্কাল-করোটি
শতবার হৃদয় খুঁড়েও বেদনা জাগে না আর
কার জন্য জেগে থাকে
অশ্বগন্ধামূলে রাতজাগা চোখ

হয়তো এমনই হয়
জীবন জেগে থাকে
অমলিন কাঙালের মতো, ভালোবাসা
মৃৎপাত্র কাতারে কাতারে
শতাব্দীপ্রাচীন তৃষ্ণা নিয়ে
তোমাকে একবার দেখতে চেয়েছিলাম
একবার, মাত্র একবারই।

তৃষ্ণা

আঁখি কারো কারো পাখি হয়
যেমন তোমার,
হাসলে, আকাশে একঝাঁক
উজ্জ্বল পায়রা ওড়ে
নীল অবগাহনে এত ভয় পাই
নীল খামে চিঠি এলে
আজো বড়ো ভালো লাগে।

অবগুণ্ঠনে রক্তিম কপাল
ভরে দিলে কাচপোকা টিপ
সসাগরা জ্যোৎস্নায় চাঁদ ভাসলে,
তুমুল চৈতি হাওয়ায়
পিয়াশাল বন নিষ্পত্র হলে
সমুদ্রমন্থনের তৃষ্ণা জাগে।

অনুভব

অনুভবে তোমার সাথে হেঁটেছি
দীর্ঘ পথ,
মিছিলের প্রথম সারিতে
উত্তোলিত দু’হাত
তুমি যখন প্রতিবাদে বাঙ্ময়
আমি এসেছি এক বুক
দমকা বাতাসের মতো,
তুমুল প্রলয় শেষ হলে
তুমি নির্মল আকাশ হয়েছো
আমি আকাশ প্রদীপ হয়ে
তুলে ধরেছি আলোকবর্তিকা।

আঘাতে, যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত
তোমার মুখ যখন
মরা চাঁদের আলোর মতো আবছায়া
আমি শেষ হেমন্তের
হৈমন্তী শিশির হয়ে
তোমার বুকে ঝরেছি সারারাত।

অনুভবে আজও, তোমার সাথে
সারারাত দীর্ঘপথ হেঁটে চলি।

জলপরি

ভরা ঘট হাতে জল থেকে উঠে আসছে মেয়ে
জড়ানো শাড়িতে ভেজা শরীর, কৌমুদী কুসুম
ডালে ডালে মুকুলিত সলাজ মঞ্জরী
সুঠাম গোড়ালি ছুঁয়ে নামছে শরীর জল
রজঃস্বলা জতুরস পায়ের পাতায়
নির্জন নদীঘাট ডাকছে আমায়
যাওয়া না যাওয়ার দ্বন্দ্বময়তায়
বুকের মধ্যে বেয়ারা লাট্টু ঘোরে

সর্বনাশ নাচছে মেয়ের চোখের পাতায়
নরকের আমন্ত্রণ নিষ্পাপ হাসিতে
রোদে চলকায় শরীরের ঢেউ
মাঝনদীতে নৌকার ছই থেকে
ভেসে আসছে মাইক-ভাঙা গান
ইয়ারা সিলি সিলি…
বিরহা কি রাত কাটল না
ইয়ারা সিলি সিলি…

বেঁচে থাকা

বেঁচে থাকা মানে রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়
ভিতরে ভিতরে সেই রাগ নীরবে সহ্য করে
প্রতিকারহীন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া
কেউ জানছে না
রাগের শীতল আগুনে পুড়ে যেতে যেতে
কীভাবে মোমের মতো গলে যাচ্ছে জীবন

বেঁচে থাকা মানে দু-গালে অকারণ থাপ্পড় খেয়ে
অমায়িক হেসে বলে ওঠা
এ তো আমার প্রাপ্যই ছিল
কেউ জানছে না
এভাবে মেরুদণ্ডহীন থাপ্পড় খেতে খেতে
সুগন্ধি গোলাপের পাপড়ি
কবে অপরাজিতার মতো বিষে নীল হয়ে গেল।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

অহমিকা

অহমিকা

অহমিকা আত্মগরিমায় আজ অন্ধ হয়ে আছো, বিবেকের দংশনে মননে নেই বিশ্বাস। কর্মে ব্যস্ততা সময়ের আবর্তে…..