জলপাহাড়ি

শাম্মী তুলতুল
গল্প
Bengali
জলপাহাড়ি

হোসেন মিয়াকে অন্যমনস্ক হতে দেখে টিঙ্কু মাঝি নাড়া দেয় । ঘটনা কি কিছু হুনছেন? রোজ রোজ একই ঘটনা।কারো পা নাই,কারো হাত নাই। কারো চেহেরা চিনন যায়না। হুনছেননি হোসেন মিয়াঁ?কানে ঢোকেনি কথা?একটা পর্যায়ে টিঙ্কু মাঝির ধাক্কা খেয়ে সম্বিৎ ফিরে পায় হোসেন।
আসমানে চইলা গেলেন নাকি?হা হা হা হা। উচ্চস্বরে হেসে ওঠে টিঙ্কু মাঝি।
কোন ঘটনার কথা বলছ তুমি?
আরে আপনের তো দেখি হুঁশ আছে।
হোসেন তার কথা শুনে একটু বিব্রত হলো।
রাত-দিন ওই বাজারঘাটের নদীর কিনারায় জীন -পরীরা মিইল্লা মানুষের রক্ত চুইষা খায়। ওই কিনারে ঘেঁষতে নিষেধ করছে মোল্লারা।
টিঙ্কু মাঝির কথাগুলো হোসেন ঠিকই শুনছে কিন্তু অনুভব করছে না। গভীর এক ভাবনার সাথে মনে মনে লড়াই করছে সে। পরশু দিন রাতে একটি স্বপ্ন দেখেছিল সেটি কি বাস্তব নাকি আসলেই স্বপ্ন ছিল মাথায় ভর ধরছেনা তার।বিবস্ত্র ,ধপধপে সাদা মায়াবী শরীর । চুলগুলো ভেজা। টপটপ পানি ঝড়ছে শরীর বেয়ে।লম্বা চুলগুলো তার পেছনের অংশ ঢেকে রেখেছে। গায়ের লোমগুলো দাড়িয়ে যেনো তারই ছোঁয়া পেতে চাইছে। হোসেন ভাবনার পৃথিবীতে একুল থেকে ওকুল ঘোরে।সেই মুহূর্তে টিঙ্কু মাঝি গান ধরে , “নাউরে নাউ আমারে লইয়া যাও কোন অচিন গাঁয়ে,আমার গাঁয়ে নাইরে শান্তি,নাইরে স্বস্তি”। গ্রাম থেকে শহরে নৌকায় চড়ে রোজ আনাগোনা করতে হয় বালিয়ারদির গ্রামবাসীদের।যেতে যেতে চোখে পড়ে ছোট ছোট শিশুদের উলঙ্গ হয়ে গোসল করার দৃশ্য।চোখে পড়ে নদীর জলে স্নান করা ব্লাউজবিহীন সদ্য যৌবনে আবৃত কিশোরীর নাদুস -নুদুস দেহ। এতে তাদের লজ্জা নামক শব্দটির সাথে পরিচয় নেই বললেই চলে। যারা নৌকা দিয়ে পারাপার করতে অভ্যস্থ তাদের কাছে এটা বিনোদনে পরিণত হয়েছে। যার লোম খাড়া হয়না সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। নদীর দৃশ্য দেখতে দেখতে হোসেনের চোখ আটকে যায় নদীর সেই কিনারায়। কি আছে এখানে? এতো ভয়, এতো উৎকণ্ঠা।মৃত দেহের ছড়াছড়ি। তার ধারে ঘেঁষাও ভয়। কিনারার সামনাসামনি নাউ আসতেই একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে লাগে হোসেনের । গন্ধটা প্রাণ ভরে অনুভব করলো হোসেন। আশ্চর্য এই গন্ধটা সেদিনও সে অনুভব করেছিল স্বপ্নের ভেতর। আগ্রহ জাগলো হোসেনের ।
তার হাবভাব দেখে মাঝি বলে,কি দেহেন ওই কিনারে?
দীর্ঘ-শ্বাস ফেলে হোসেন বলে,আমাকে জায়গাটিতে নামিয়ে দাও মাঝি।
কথাটা শুনে টিঙ্কু মাঝি অবাক দৃষ্টিতে হা করে তাকিয়ে থাকে হোসেনের দিকে। মনে হলো এই মাত্র নদীতে পড়ে গিয়ে বাঁচতে বাঁচতে উঠলো।তাকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে হোসেন বলল,কি হলো মাঝি মুখ বন্ধ কর, মশা -মাছি ঢুকবেতো ।
টিঙ্কু মাঝি মুখ বন্ধ করে ঢোক গিলে বলে, মশকরা কইরেন না মিয়া,ভাং খাইছেননি,আউলা জাউলা কথা কন।
কথা বাড়িওনা ।নামিয়ে দাও। অনেক জোর করে ওই কিনারায় নামলো হোসেন।
টিঙ্কু মাঝির গা কাঁপছে ।শরীর বেয়ে ঘাম ঝড়ছে।মনে মনে বলল,আল্লাহ রক্ষা কইরো হোসেন মিয়াঁরে। জানি ,কাল হেও ভাসবো জলে।নিজের মওত নিজের হাতে নেয় কেউ।পুরায় পাগল।
নেমে সোজা হাটা দিলো হোসেন। হেটে একটু বামে ঢুকতেই হোসেনের শরীর ভারী হয়ে গেলো। ভর দুপুর কিন্তু জায়গাটা অন্ধকার।অদ্ভুদ সেই মিষ্টি গন্ধটা আরো তীব্র হয়ে ধরা দিচ্ছে নাসারন্দ্রে। নূপুরের শব্দ কানে এলো হোসেনের । এতে হোসেন বিন্দু মাত্র ভয় পায়নি। কারণ সে এমনই কিছুর জন্যেই প্রস্তুত ছিল।কিন্তু আচমকা পিছন থেকে লাঠির আঘাতে হোসেন মাটিতে লুটিয়ে পরলো।ভাগ্যিস মাথায় আঘাতটা কম পেয়েছিল হোসেন।
হোসেন কথা বলতে চাইলো, ইয়ে মানে আমি আসলে…।
চুপ করেন।সব জানি। মেয়েলী একটা কণ্ঠ শুনতে পেলো হোসেন।ঝাপসা চোখে গভীর ভাবে দেখল একটি মেয়ে দেবীর মতো তীর হাতে দাড়িয়ে আছে।
বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগলো হোসেন।আপনি ভুল বুঝছেন। আমি আপনার ক্ষতি করতে আসিনি।
তো কি করতে আসছেন,শুইতে আইছেন?
দেখুন আবারও ভুল ভাবছেন।আপনার যদি কোন সাহায্যে আসতে পারি আমাকে বলতে পারেন।
হা হা হা হা করে উচ্চস্বরে হাসে সে।
আমি সত্যি বলছি।বিশ্বাস না হলে আমাকে পরখ করে দেখুন ।
মেয়েটি এবার ভ্রু কুচকে বলল,তাইলে কেন আইছেন?
হোসেন এবার শোয়া থেকে বসে পরল।এই কর্নারটা নিয়ে সবাই উলট–পালট কথা বলছিল দীর্ঘদিন।যা আমি বিশ্বাস করি নাই।
ওওও তাইলে আফনি গোয়েন্দা?
হোসেন একটু বিরক্ত হয়ে বলল,আমি কিছুই না । নিজের মনের স্বস্তির জন্য দেখতে আসা। কেন এতো মানুষ মরছে।কি আছে এখানে।
বুঝলাম।হাত ধরেন আমার। উইঠ্যা পরেন।পাশের একটি গাছ থেকে পাতা ছিঁড়ে হোসেনের হাতে দিয়ে বলে এই নেন কচলাইয়া পাতার রস মাথায় লাগান।রক্ত বন্ধ হইয়্যা যাইব। মেয়েটা আরো সামনে আসতেই অন্ধকার জায়গাটা আলোকিত হয়ে গেলো ।
এতো সুন্দর? পরী নাতো মনে মনে বলল হোসেন । অনেকক্ষণ হোসেন তার দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল। বিশ্রী করে পান চিবুচ্ছিল মেয়েটি । মুখ থেকে আবর্জনাগুলো ফেলে দিয়ে বলল , কি দেহেন অমন কইরা?
তোমার সুন্দর ওই মুখটাতে এসব কি?
হি হি হি করে হেসে মেয়েটি বলল ,নিজের কিছুর ঠিক নাই,তার আবার সুন্দর মুখ। আপনি একজন যে আমারে এতক্ষণ না ছুইইয়া থাকতে পারছেন।এই রুপের উফরে কত না অত্যাচার হইছে,কোথাও যাইতে পারিনা,লুকায় ,লুকায় থাহি। এমনকি আমার মা শয়তান বেডির দ্বিতীয় মরদের কাছ থেকেও বাঁচবার পারি নাই। এই আস্তানায়ও আমার ঘুম নষ্ট।তাই খুনি হইয়া গেলাম।
কয়জনকে মারবা তুমি?এর তো শেষ নেই।
তাতে কি ,মনের একটা শান্তি আছে না। যে আমার শইরের পিয়াসী তারে খতম করুম। আর যে আমারে তছনছ করার পিয়াসী নয়,তারে পায়ে ধইরা বলুম আমারে বিয়া করেন। আমার যৌবনটারে বাঁচান। আর ক্ষয় হইতে ছাইনা।
কিন্তু ভালো মানুষ তোমার মতো মেয়েকে কেন বিয়ে করবে ?
কি কইলেন আমার মতো মাইয়া? আমার কি এইহানে কোন দোষ আছে? আমি তো কোন অন্যায় করিনি। আমার উফরে অন্যায় হইছে। আমার ভিতর একটা পবিত্র মন আছে,যেটা কেউ ছুঁইতে পারে নাই। কাউরে আমি খুশী মনে দেহ দিই নাই। তইলে আমি কেন কারো পবিত্র ভালবাসা হমুনা কন?
ওর কথাগুলো শুনে হোসেনের চোখ ছলছল করে উঠলো। মেয়েটির কথার মধ্যে কত স্পষ্ট ধার। অনেক যুক্তি দিয়ে কথা বলল সে।
কি হইল কান্তাছেন? বেডা মানুষ আবার কান্দে নাকি?মাইয়া মাইনষের মন পোড়াইয়া মারে হেরা। যতক্ষণ না ওই মধুর মতো যৌবনটা পানসে না হয়,তিতা না লাগে, তার উফর হ্যাঁগো হাতিয়ার চালাইতেই থাকে। থু হ্যাঁগোরে।
অনেক্ষন চুপ থেকে হোসেন জানতে চাইলো তোমার নাম কি?
যখন স্কুলে পড়তাম নাম ছিল পাহাড়ি খানম। বাড়িতেও ডাকতো পাহাড়ি।এখন আমার নাম কিনারি।
তুমি স্কুলে পড়েছ?
হ, মা পাঁচ কেলাস পড়াইছিল। হেইখানেও সমস্যা । সুযোগ পাইলেই মাষ্টাররা হাত ধইরা টানাটানি করতো। মাই আর না পাইরা ঘরে বসাইয়া রাখল।কিন্তু ঘরেও রক্ষা পাইলাম কই?
হোসেন পাতা কচলাতে কচলাতে বলে,শোনো এই পৃথিবীতে কেউ খারাপ-অপবিত্র হয়ে জন্মে না। মানুষই মানুষকে খারাপ বানায় । অপবিত্র করে।এখানে কারো কোন দোষ নেই। যার যার জায়গায় সবাই সমান ,সবাই দামী। সবায় সন্মানিত।
আপনের বই মার্কা কথা আমি বুঝিনা।চাইছিলাম কেউ আমারে ভালবাসুক। সন্মান দিক। পাইলাম না কিছু।
বসা থেকে উঠলো হোসেন,পাহাড়ির পা থেকে পরে যাওয়া একটা নূপুর তার হাতে দিয়ে বলল,আজ আসি পাহাড়ি।
চইলা যাইবেন?
হ্যাঁ।
হ,যাইবেনইতো,আফনেরা মানুষ। সামাজিক মানুষ। সমাজে আফনেদের মান সন্মান আছে। আমার লগে থাকলে সন্মান যাইবো ।
আমি অতো সন্মান- টন্মান নিয়ে ভাবি না। একটা চাকরি করি পেটের দায়ে। নইলে আজকের দিনটা তোমার সাথেই কাটাতাম।
নূপুরটা আফনে নিয়া যান । এইহানে কেউ ফেরত যায় না। খাইয়া যায় নইতো লাশ হইয়া যায় । আপনে একজনই যার কিছু দরকার হয় নাই। এইডা পবিত্র। আমার নানি অনেক শখ কইরা বানাইছে। ছোডবেলা যতবার পায়ে পরাইত নানি ততবারই সোনা- রুপার পানিতে ভিজাইয়া ধুইয়া পরাইত।কেন জানেন,যেন আমি সব সময় পাক থাকি। অসুখ -বিসুখ আমারে যেন ছুঁইতে না পারে।এই কথা বলতেই পাহাড়ি আবার হি, হি হি করে হাসতে লাগলো । হাসতে হাসতে পাহাড়ির চোখ ভিজে উঠলো।
পাহাড়ি হোসেনকে ছাড়তে চাইছে না। এই অল্পক্ষণে হোসেনের ব্যাবহার তাকে বাধ্য করেছে ভালোবাসতে।কিন্তু উপায় নেই।
হোসেন বলল,আবার আসবো। দিন গুনতে থেকো।ঠকাবো না।আর মনে রেখো সব পুরুষ নিচে নামতে পারেনা।তাদেরও আত্মসন্মান আছে।
আপনের ছোঁয়া আমার মনে থাইকবো যদি নাও আহেন।
পাহাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে হোসেন নদীর কিনারে দাড়িয়ে টিঙ্কু মাঝিকে দূর থেকে হাক দিলো।টিঙ্কু মাঝি হোসেনকে দেখে বেহুঁশ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।
ভাবে এইডা ক্যামনে সম্ভব? হোসেন মিয়া জ্যান্ত?না না এইডা নিশ্চয় জীন-পরীদের নতুন কারসাজী।টিঙ্কু মাঝি ভয় পেয়ে তার নৌকা দ্রুত বেগে চালিয়ে আরো দূরে চলে গেলো……। হোসেন তার কাণ্ড দেখে মনে মনে হাসতে লাগলো।

শাম্মী তুলতুল। ঔপন্যাসিক ও শিশু সাহিত্যিক। জন্ম বাংলাদেশের চট্টগ্রাম শহরে। শাম্মীর নানা ডাক্তার কাজী এজহারুল ইসলাম ছিলেন দৌলত কবির বংশধর। নানি কাজী লতিফা হক ছিলেন বিখ্যাত বেগম পত্রিকার লেখক ও গীতিকার। অপরদিকে দাদা আলহাজ্ব আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার ছিলেন সুপরিচিত লেখক,...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..