জানিয়ে রাখা ভালো

বিকাশ দাস
কবিতা
জানিয়ে রাখা ভালো

জানিয়ে রাখা ভালো

চন্দ্রিমা
তুমি ও সুখে
আমিও সুখে
জানিয়ে রাখা ভালো তোমার ভালোবাসা
পাথরের পাষাণে সোহাগের আসনপাতা
কাঁসার বাসনে ফুলের অমুল্য সুবাস
ভোরের শিশিরে লজ্জানত শীতল দুটি হাত
মন্ত্রের পবিত্রতার অক্ষরে অক্ষরে বেঁচে থাকার সমস্ত প্রপাত
শীতের দুপুরে নিখাদ রোদ্দুর ভালোথাকা সুখ শান্তির ছলাৎ ।
ঘরদোর উঠোন চৌকাঠ লক্ষ্মীর দু’চোখ সচ্ছলতায়
ফুলের গন্ধ বসন্তবিহীন বনান্ত নির্ভেজাল হাওয়ায়
শাঁখা সিঁদুরে শরীরের ভেতর শরীর মাতানোর রমণ প্রবণ
অঞ্জলিতে অঞ্জলিতে সব অন্ধকার নিংড়ে আলোর শোধন
সন্ধ্যাবাতির অহংকার ভেঙে নিস্তব্ধ রাতের মদির শয়ণ ।
জানিয়ে রাখা ভালো
জেনেছি তোমার বুকে শুয়ে
খুব সহজ ফুল ছিঁড়ে আনা, ফুল ফোটানোর কষ্টখানা
অন্যের দুঃখব্যাথা নিমিষে জলের মতন করতে জানা
আকাশের চেয়েও ভাস্বর তোমার রূপ
অরণ্যের চেয়েও নিবিড় প্রেয়সী বুক
রঙিন উচ্ছ্বাসে
যথাযথ দেখেছি তোমার গোপন গোপনে
গহনের নন্দনে সন্ধ্যাকাম তৃপ্তির ঘাম
ভালোবাসা দহন যজ্ঞ-চিরন্তন নিষ্পাপ নাম
সুখী ঘুমের স্তনের বোটা
আমাদের সংসার গোটা
সুখ আছে বেঁচে বিনোদনের মহার্ঘ আবহ নিয়ে
ফিরে আসি কলঙ্ক ধুয়ে অধিকারের রঙ দিয়ে
তোমার নিকানো উঠোনে নিয়েছি দিব্যি দু’জনে
প্রজাপতির রঙ বাহারি যৌবনের প্রত্যূষ গহনে
জন্মান্তর ধরে তুমি হবে জননী আমি হবো পিতা
সন্ততির সশ্রদ্ধ হাতে উঠবে জ্বলে শান্তির চিতা ।


নিয়তির নিভৃতে

হয়তো কিছুদিন পর আমায় যেতে হবে চলে
তোমার বিপণ্ণতারদিন মাথার থেকে সরে গেলে
জানি, তুমি বলবে স্বস্তির নিশ্বাসে উচ্ছাস ফেলে
বেশ । ভালো থেকো । আবার এসো প্রিয়, দুর্দিনে ।

আমি প্রণয়ের গন্ধে শানিয়ে একটানা জ্বরে
ভালো থাকা মন্দ থাকা সম্পর্কের বাঁধন বলে
দু’চোখ আমার ছেড়ে আসি তোমার ঘরে।

অভিমানে
ভেতর ভেতর পুড়ে হই ছাই
ভেতর ভেতর নষ্ট হয়ে যাই
এক সঙ্গে থাকার পুরোনো অভ্যাস জেগে থাকে শরীরে
মাখামাখি ভালোবাসা বেঁধে অপেক্ষার শালীনের নিবিড়ে।

এখন না হয় থাক প্রত্যাখ্যান থাক অমঙ্গলেচ্ছা অহংকার
নাও নিয়তির নিভৃতে বিছিয়ে দিলাম আমার সর্বস্ব এবার
তোমার শরীরের আঁচ শীতল হলে, ডেকে নিও সেই বেলা।
আমার গলায় তোমার প্রণয়ের আশাবর কলসি বেঁধে খেলা।


বাইশে শ্রাবণ

ছোট্ট বেলার দিন মনে পড়ে
না গেলে তোমার কবিতা মুখস্থ করে
পড়তো দু’হাতে সপাং সপাং দু’ঘা
দু’চোখ জলে আসতো ভরে ।

মন খারাপের দিনে
অঙ্কের খাতায় এঁকে নিতাম পেন পেন্সিলে
তোমার মুখভর্তি তুলোর মতো ধবধবে সাদা দাড়ি
মা, নদীর মতো গুনগুনিয়ে তোমার গানের দোলায়
মাটির গন্ধে হাওয়ার ছন্দে ভরিয়ে দিতো ঘর বাড়ি

দেখেছি
তোমার কবিতা আকাশ ঢাকা বর্ষা মুখর মেঘের অন্ধকারে
হৃদয় জড়ানো দৃষ্টি।
রোদের আঁচে হলুদ ধানের মাঠ জ্যোৎস্না ক্ষেতের পারে
সবুজ ভরানো সৃষ্টি।

তাই বাংলার হৃদয়
ভুবন জোড়া সকাল সাঁঝে বাজায় বাঁশি
“আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”।

ঘনঘোর বর্ষার নিশীথে
বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদে এলো বান ।
হাত বুলিয়ে ছাতিতে
মা ভয় ভাঙাতো গেয়ে তোমারি গান।

তুমি সামনে দাঁড়িয়ে দেখলে তোমার পুত্র কন্যার
অকাল মরণ
হারালে তোমার কাছের মৃণালিনী
হারালে একান্তে তোমার প্রাণের প্রিয় কাদম্বরী
তোমার দু’চোখ নির্বিকার চূড়ান্ত বেদনায়
তোমার বুক ফাটা কান্নায় এক ফোঁটাও জল আসেনি
তবু তোমার কলমের ছোটাছুটি একটুর জন্যও থামেনি ।
তোমার বুকের দুঃখ কষ্ট নিজের আলখাল্লা কামিজের ভেতর লুকিয়ে
উজার করে লিখে গেছো গোপনে
“আনন্দধারা বহিছে ভুবনে” আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে “
“ ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে”…

তুমি এক বৈশাখের পঁচিশে এলে সূর্যের আলো ভরিয়ে
আর এক শ্রাবণের বাইশে ‘যাই’ বলে নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে।

আজ বাইশে শ্রাবণ মানে না মন
তুমি আর নেই চলে গেছো শ্রাবণী হাওয়ার পথ ধরে
অভিমানের বৃষ্টি আর ঝড়ের আবেগ একাকার করে।

তোমার অনাবৃত শরীর শেষ দেখার তীব্র বাসনার ভিড়ে
নিঃশব্দে চেয়ে সহস্র চোখের শ্রাবণ ধারার বক্ষ চিরে
তুমি বলে গেলে …
“তোমার হল শুরু আমার হল সারা”

আজও
তোমার গানে নিত্য ভোর হয় সন্ধ্যা হয় ঘরে ঘরে
অন্তবিহীন আকাশ তোমার ছন্দের আকুলতা ধরে ।

তুমি জন গণ মন অধিনায়ক
মানব জমিনে ।
তুমি বিশ্ব বাংলার অবিভাবক
মনের গহিনে ।

মেয়েমানুষের সংসার

পুরুষের অসুখ
সারিয়ে নিতে আসে মেয়েমানুষের শারীরিক
সন্ধির সুষমায় ।
পুরুষ নিজের জন্য বাঁচে । নিজের সুতানে নিজের সুরায় ।
পুরুষের সুখ মেয়েমানুষের আঢাকা শরীরের চিকণ শিরীষে ।

মেয়েমানুষ নিজের ঘর ছেড়ে ছুড়ে
অন্য বাড়ির উঠোন থেকে ঘর হয়ে উঠতে
এক জীবনও কম পড়ে জানলা দরজা ঠুকরে ।

শব্দহীন শরীর
মেয়েমানুষের রাত সংসারের এঁটো বাসন ধুয়ে
নিজের লাশ বিছিয়ে পুরুষের বাসনার কাঁটায় শুয়ে ।
পুরুষই পারে জোর করে বাগিয়ে নিতে নিজের ফুর্তি
ছিঁড়ে ছিঁড়ে খুবলে মেয়েমানুষের যুবতী স্তনের মূর্তি ।

দিগন্ত অবধি
নির্লজ্জ ভাঙচুর শরীরের বিরাগ নিরর্থ নিন্দিত রতিসার
দিনরাত্রির চৌকাঠে তবু মেয়েমানুষের নন্দিত সংসার
ঝাড়পোঁছ সেরে নিকিয়ে ঘর দুয়ার ।

বিকাশ দাস। কবি। জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের মালদহ শহরে। পড়াশোনা করেছেন প্রথমে ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জে, এরপর কলকাতায়। বর্তমান নিবাস মুম্বাই। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থঃ এখন আমি একা, জরায়ুজ, নিকুচি করেছে কবিতা, কবির শেষপাতা, তবু ভালো দুঃখ দিও, জীর্ণ ব্যথার মুখবন্দী কথা, নির্বাচিত কবিতা, ঈশ্বর...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

ফেরা

ফেরা

ফেরা অনেক দিন আসিনি তোমার চোখের কোণে, বুকের পাশে, নিঃশ্বাসের চারপাশে। ভেবো না আমি পথ…..