জাহানারা পারভীনের সাতটি কবিতা

জাহানারা পারভীন
কবিতা
Bengali
জাহানারা পারভীনের সাতটি কবিতা

অপরাধ

এক চিলতে বারান্দার দোতলা বাড়ি
বাড়িতে আসা যাওয়া দখিন হাওয়ার
আর আসত চড়ুই
ছানাপোনাসহ চড়ুই মা শিকার করতেন কখনও কখনও

বন্ধ দরোজা, জানালা, ঘুলঘুলি,
পাখিদের ছুটোছুটি, আর্তচৎিকার
এখনও মনে আছে মায়ের নিষ্ঠুরতা

শিশু সন্তানের পাতে মা তুলে দিতেন পাখি মায়ের ডানা, পা, কলিজা
যার সন্তানেরা তার জন্য অপেক্ষায়,

বাড়ির গ্রিলে বসা চড়ুইয়ের কাছে তাই ক্ষমা চাই
আমার মায়ের অপরাধের

 

পাখিজন্ম

দেয়ালে কয়লায় আকা ছবি
পাখিটা উড়তে শেখে একদিন
খড়কুটো জড়ো করে বাসা বাধে ঘুলঘুলিতে,
তা দেয় ডিমে, ডিম ফেটে বের হয় ফুটফুটে ছানা

মা পাখিটা ছবি হয়ে আবার ফিরে যায় দেয়ালে
ক্ষুধার্ত পাখিছানার চিৎকারে আমার ঘুম আসে না…

কাকতাড়ুয়ার মুখ

উঠোনে উঠোনে শুধুই প্রস্থান;
ছাপ রেখে যাওয়া পায়ের প্রতিভা
চৌকাঠে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি
কথা ছিল কলাপাতায় আকব পিকাসোর মুখ;
তাহিতির মেয়েদের হলুদ হাতের নমুনা…

উঠোনে একে রাখি কাকতাড়ুয়ার মুখ
হলুদ ধানক্ষেতে দাড়িয়ে থাকে, একা…

মসলার গান….

আমার মুঠোতে কোনও ঈশ্বর নেই
একটা পিপড়ে ছিল, সেও চলে গেছে
দাদীর সিন্দুক থেকে যে সবুজ মার্বেল
এনেছিলাম, সেও ছিল কিছুদিন..
সেও জানে, মুগ্ধতাও অনুতাপের মা

অথচ একটি এলাচ আমাকে বলেছিল-
মসলার বন তার ভালো লাগে না
সে চায় অভিশপ্ত হাতের মুঠোবন্দী জীবন…
কাচের বয়ামে ভরে রাখি মুঠোভর্তি এলাচের ইচ্ছে

 

প্রহসন…

পাল তোলা জাহাজে ধানের বীজ জড়ো করে
ভেবেছি চলে যাব কোথাও
কৃষকেরা নিশ্চিত নয় এগুলো বীজধান, নাকি চিটেধান….
অথচ ফসল ফসল করে সারা আশ্বিন দাড়িয়ে থেকেছি মাঠে
অপেক্ষা এমনই…
মেঘের মুখোমুখি দাড় করিয়ে রাখে বৈশাখের পর্বত
কখনও কখনও উচ্চতাও অপরাধ এক
গজ ফিতায় মেপে রাখে সব অসুখের দৈর্ঘ
চিটেধানসহ জাহাজ ডুবে গেলে নদীতে
আকাশ থেকে ঝড়ে পড়ে বীজধানের বৃষ্টি…
হুদহুদ পাখির পালক

 

শহরের অভিধান…

অবশেষে জেনে গেছি সেই শহরের নাম,
যেখানে জুতো পায়ে প্রথম হেটেছে মানুষ;
মেলেনি জুতো ও পায়ের মাপ…

মৌলভীর পকেটে পাওয়া ট্রেনের টিকেট
সেখানে নেই যাত্রীর নাম, আসন নাম্বার
চেনা ষ্টেশনে চায়ের লিকারের গাঢ় ঘুম
পানের পিকের মতো ছুড়ে দিলে দেয়ালে…

সারল্য ছাড়া তার কোনও অপরাধ নেই
শহরের ঠিকানা খুজতে খুজতে সেও জেনে যায়
সেদ্ধ ধানের পিঠে জন্মানো গাঢ় তিলের অপরাধ

 

হোচট…

উঠে দাড়ানোর চেষ্টা করছি,
মেরামত হয়ে যাবে হোচটের আঘাত;
গেরেজে পাঠিয়ে দিয়েছি ভাঙা পা…

যদিও সূর্য ওঠেনি, তোমার হাতে নেই রোদ কিংবা আলো
তবুও এই সম্পর্কের নাম দেওয়া যাক সকাল
ভাবা যাক, খুজে পাব সেই বানরের থাবা
লোকালয়ে হারিয়েছে সবকটি আঙুল
যার পায়ের চিহ্ন ধরে পৌছেছিলাম এস্কিমোদের বাড়ি
সেই উম্মদের সাথেও দেখা হয়ে যাক
হোলির দিনে মুখে লেপে দিয়েছে আলকাতরা
তোমাকে বলে দেব নর্তকীকে ঘৃণা করা মানুষের নাম
কিশোরীর ঘুম কিনতে যেত বন্দরের পাশে

সাদা হয়ে যাওয়া চুলে লিখে দিও বয়স
কাউকে বলো না, কাঠপেন্সিলের খোজে
কত দুপুর দাড়িয়ে থেকেছি স্কুলের বারান্দায়
দপ্তরির পিতলের ঘন্টা মনে করিয়ে দিয়েছে
সাপ শুধু মেনে চলে ছোবলের ধর্ম…

জাহানারা পারভীন। কবি, অনুবাদক ও সাংবাদিক। জন্ম ৩০ মে ১৯৭৫, বাংলাদেশ। পেশাগত জীবনে তিনি একজন সাংবাদিক, লেখাপড়া করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রথমসারির অসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত বই: 'নোঙরের গল্প বাচাচ্ছি' (২০০২...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

প্রতিভাস

প্রতিভাস

স্পষ্টতা অন্ধকারের মতো স্পষ্টতা আলোর মধ্যগগনে নেই। উত্তাপে ঝলসে যাওয়া চোখে শীতলপাটি বিছিয়ে দেয় রাত…..

চিঠি

ক্ষোভ রোদের দোকানি হয়ে, ছুঁয়ে গ্যাছি দূর পরবাস আলোর ক্রেতারা দেখে, শূন্য ঝুলি খালি সর্বনাশ।…..