জেলখানা তুমি জবাব দাও

শাম্মী তুলতুল
ছোটগল্প
Bengali
জেলখানা তুমি জবাব দাও

প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাতর রুস্তম মরতে গিয়ে আবার মৃত্যু থেকে ফিরে আসে। কারণ সে মারা গেলে তার মনের কথাগুলো লিখবে কে?

ভাবে সে যা লিখে তা কেউ চোখে দেখে না। কেউ ভাবে না।প্রতীবাদের হুঙ্কার আজ জগন্য।কেউ ভাবে দেশে আইনের শাসন রক্ষার জন্য বাক স্বাধীনতা খর্ব করা হয় কিন্তু  রুস্তম ভাবে  আমাদের বাক স্বাধীনতা  তো কম  নয়। তবে কেন  এতো উড়ানিয়া? কেন মুখ এতো বেলাগাম?কী এতো মজা পায় এইসবে?

রুস্তমের  হাজারও  ভাবনার আকাশে কলিং বেল বেজে উঠে । রুস্তম সিগারেটটা  মাটিতে ফেলে  পা চাপা দিয়ে দরজা খুলতেই দেখে মান্নান হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে  ঘরে ঢুকছে।

রুস্তম একটু ভড়কে গেলো।

…কি হয়েছে তোর?

 …মান্নান দম নিয়ে বলে, মকবুলকে পুলিশে নিয়ে গেছে।

  …কবে কখোন?

  …একটু আগে।

…তুই এতো হাপাচ্ছিস কেন?

চোখ বন্ধ করে নিয়ে গেছে তারা।

দোষ করলে অনেক কিছুই ঘটে। রুস্তম ডাইনিং টেবিল থেকে পানির গ্লাস এনে বলে, নে পানি খা।

মান্নানের চোখ খুব লালচে  হয়ে আছে । পানির গ্লাস  ঢেল দিয়ে মাটিতে ফেলে দিলো সে।

আশ্চর্য? এতো রাগ ভালো নারে।

তুইও একজন লেখক তুই এমন কথা বলতে পারিস না।

হ্যাঁ আমি লেখক তাই  বলে রাষ্ট্র সমাজ সরকারের সুবিধা অস্বীকার করতে পারিনা।নিমক হারামি করতে পারিনা।তাদের প্রতিও আমাদের কিছু দায়িত্ব আছে। প্রতিটি বিষয় বাড়াবাড়ির একটা লিমিট থাকে।

বাড়াবাড়ি ?

দেখ তোর মন এখন ভালো না  তুই বিশ্রাম নে।

মান্নান রুস্তমের কাধে রাখা হাত সরিয়ে দিয়ে বলে, কাল প্রেস ক্লাবের সামনে মানব বন্ধন হবে আশা করি তুই আসবি।

হুমম।

উঠি।

কই যাবি?

জানিনা। তবে অনেক কাজ আছে তাই জানি। মান্নান  চলে গেলো  ক্ষোভ নিয়ে। মান্নান চলে যাওয়ার পর রুস্তম পা  চাপা দেওয়া  সিগারেটটা আবার হাতে নিয়ে আগুণ ধরিয়ে ফুঁক দিতে লাগলো।রুস্তম কি করবে কুল পায়না। একদিকে মকবুল, অন্যদিকে মান্নান মাঝখানে আমার দায়। এক আশাহীন জীবনে দাড়িয়ে গেলাম। জাহাজ চলছে তো চলছে কিন্তু কিনারা পাচ্ছেনা। ঝড় বইছে বাতাস হা করে আছে যেন গিলে তার বোক মিঠাবে। দীর্ঘনিঃশ্বাসে রুস্তম চোখ বুঝল। বুঝলেই যেন দেখতে পায় মকবুলের চেহেরা।যেন বলছে আগের মতো পাশে থাকিস আমরা লিখব একসাথে, পিয়ানো বাজাবো একসাথে ,একসাথেই মিশরের পিরামিড দেখতে যাবো। কি দারুণ কীর্তি।  আরও অবাক লাগে ফেরাউনের লাশ। কি অদ্ভুত তাই না? এসব  দেখব  একদিন তুই আমি মিলে । জানিস  পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর নেই। মানুষ হাবিজাবি দেশ দেখতে যায়। এসব  ছাইপাশ দেখে কি ভালো লাগে কে জানে। আমার হাসি পায়।কিছুদিন আগে মান্নান ঘুরে এলো থাইল্যান্ড থেকে।ন্যাটো মেয়ে ছাড়া আর কিছু আছে নাকি সেখানে। হা হা হা হা। মকবুলের উচ্চ স্বরে হাসি ।

এসেই লিখব  চোখের দেখা এক  বিস্ময়কর  শহর। মকবুলের কথাবার্তা আর প্রাণ খোলা হাসি বার বার রুস্তমকে নাড়া দেয়। মান্নানকে যতই সহজ দেখানোর ভানে ছিল ততই সে দুমড়ে যাচ্ছিলো ভেতরে ভেতরে। সিগারেট শেষ  হয়ে তার আঙ্গুলকে স্পর্শ করে জানান দিলো পুড়ে যাচ্ছে তখন রুস্তম হুঁশে এলো। সিগারেট আবার  ফেলে  দিয়ে  ওয়াশ রুমের দিকে এগোল সে।ওয়াশরুমে পানির ঝরনা ছেড়ে অনেকক্ষণ ঝর্নায় গা ভেজাল সে। একে একে সব কাপড় ছেঁড়ে সে তার রুমে এসে কাপড় পরল। মান্নান যাওয়ার পর তার অস্থির লাগছে। কাল কি যাবে কি যাবে না তাই মাথায় খেলছে। দন্ধ চলছে মনের সাথে। হায় আমরা অনেক  বেইমান জাতি।নিজের লাভটা ছাড়া আর কিছুই  ভাবিনা। কি দরকার ছিল এসব লিখা। এসব লিখতে পারলেই যেন …। উঃ বিরক্ত লাগছে।

তবুও  যায় দেখি…।

পরদিন রুস্তম প্রেসক্লাবের সামনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হঠাৎ মান্নানের ফোন আসে। ফোন রিসিভ করতেই…  কিরে তুই সকাল থেকে ফোন বন্ধ রেখেছিস কেন?  আসলে…কথা শেষ করতে না দিয়েই মান্নান বলে, মকবুল আজ সকালে মারা গেছে।  কিভাবে ?

জানি না । শুধু জানি যেসব কথা শুনতে শুনতে অভ্যস্ত ,মুখস্থ তাই  শুনছি।

তদন্ত করে দেখা হচ্ছে, কমিটি গঠন করা হবে।

দেখ রুস্তম কারো প্রতি আমাদের রাগ নেই। কিন্তু আমরা  বিচার চাই আমাদের  বিচারকের কাছে।

রুস্তম ফোন রেখে দিলো। রুস্তম তৈরি হতে আয়নার সামনে দাঁড়াল কাপড় পরা শেষ হলে রুস্তম চোখে সুরমা দিলো যেঁটা সে কোনোদিন করেনি। মাথায় প্রথম টুপি দিলো। টুপি দিয়ে সে অনেকক্ষণ নিজেকে দেখল  তার চেহেরাটা আজ অন্যরকম লাগছে, নতুন বাচ্চাকে তার মা  কাজল লাগিয়ে তৈরি করে সেরকমই। মায়ের কথা আজ তার বেশ মনে পড়ছে।আহা মা। মায়ের মুখখানি ভেবে ভেবে দরজায় হুক লাগিয়ে রাস্তায় নেমে রিকশা  চড়ে প্রেস ক্লাবের সামনে হাজির হলো রুস্তম।মান্নান  রুস্তমকে দেখে হাত  নেরে কাছে আসতে বলল।

রুস্তম একই সারিতে দাঁড়াল  দাড়িয়েই  স্লোগান,“জেলখানা তুমি জবাব দাও, মকবুলের রক্তের হিসেব দাও”। এই কথা বলতে না বলতেই পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পুলিশ  তাদের অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু নাহ…। মানুষ এর মাথা যখন উত্তাল হয় রক্ত তখন আর কথা শোনেনা।

এক পর্যায়ে পুলিশ  তাদের সভা ভঙ্গ করে দেয় । পুলিশের সাথে তাদের ধস্তাধস্তি হয়।

পুলিশ এর সাথে ধস্তাধস্তির পর রুস্তম আধমরা হয়ে  ছিটকে পড়ে রাস্তায়। মান্নান তাকে দেখে বিমর্ষ হয়ে পড়ে।সমস্ত রাস্তা যেন কেঁদে বাঁচে।

শাম্মী তুলতুল। ঔপন্যাসিক ও শিশু সাহিত্যিক। জন্ম বাংলাদেশের চট্টগ্রাম শহরে। শাম্মীর নানা ডাক্তার কাজী এজহারুল ইসলাম ছিলেন দৌলত কবির বংশধর। নানি কাজী লতিফা হক ছিলেন বিখ্যাত বেগম পত্রিকার লেখক ও গীতিকার। অপরদিকে দাদা আলহাজ্ব আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার ছিলেন সুপরিচিত লেখক,...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ