ঝরা পাতার শিখন

বৈশালী নাগ
কবিতা
Bengali
ঝরা পাতার শিখন

একটা তুমি চাই

পুতুল খেলার বায়না যেদিন সাঙ্গ হলো,
মেয়ে বেলার আতর মেখে কন্যে হলুম।
কনে দেখা মেঘের গায়ে সোনা রোদ দেখে
বাবাকে গিয়ে বললুম, “বাবা, একটা তুমি চাই।”
তোমার মতো করে কেউ কি বুঝবে আমায়?
তোমার মতো প্রশ্রয় কেউ কি দেবে আমায়?
তোমার মতো করে ভালো কেউ কি বাসবে আমায়?
তাই তো, ‘একটা তুমিই চাই।’

সোনার ভাগ্যে বাবারই প্রতিচ্ছবি।
সিঁথির গনগনে লালিমায় ভালোবাসার লাভাস্রোত।
আপন করা বোধে উদ্বেলিত হয়ে
তারে বললুম, “ওহে প্রিয়, জন্ম জন্মান্তরে একটা তুমিই চাই।”
তোমার মতো করে কেউ কি জানবে মোরে?
তোমার মতো করে কেউ কি রাখবে যত্নে ভরে?
তোমার মতো করে কেউ কি বাঁধবে বাহুডোরে?
তাই তো, ‘একটা তুমিই চাই।’

কোলের ওমে স্বপ্নের বাস।
আলোকিত মাতৃত্বে আশার গোলাপি বাষ্প।
নিয়নের রোশনাই যেন ফিকে!
আদুরে উদ্ভাসে বললুম, “ওরে রোদ্দুর, কোলের ওম যে শুধু তোর।”
তোর কওয়া মা – ডাকে আমার জগত সুখ।
তোর আদুরে আব্দারেই আমার হাসিমুখ।
তোর চেনা গন্ধেই আমার মাতৃত্ব উন্মুখ।
তাই তো, ‘একটা তুইই চাই।’

এ জীবন বড় মধুময়।
প্রশ্রয়ে ,ভালোবাসায়, আদরে উত্তরণের স্বাদ ।
এমন জিজীবিষার তুলনা মেলা ভার।
অবদানে নতজানু হয়ে বললুম , “ওহে সময়ের স্রোত, থামো একবার।”
এমন জীবনসুধা কোথা নাহি পাই।
বিশ্বাস ভরসায় আমার পরম ঠাঁই ।
না চাইতে পেয়েছি যা, তুলনা তার নাই।
তাই তো বারে বারে, ‘এমনই একটা জীবন চাই।’

 

হয়তো বা!

স্বপ্নে বোনা নকশিকাঁথায় রূপকথারা লিখে চলে
অলীক কথামালা ।
ফেরারি স্রোতে ভেসে গেছে কবে বাস্তবতার আঁশটে মোড়ক কে জানে!
আজানুলম্বিত চাহিদারা রনপায় ভর করে ছুঁতে চায়
বিহগের ডানা।
যেন মহুয়ার নেশায় সেঁধিয়ে আছে আফিমের শোক।
ভুরি ভুরি বাসনায় লোভাতুর লম্ফনের স্বাদে সততার ভরাডুবি।
আদর্শের ভাঁড়ারে মন্বন্তরের থাবা, সুনামির জলোচ্ছ্বাসে
হারিয়েছে আপোস না করার অঙ্গীকার ।
যোগ্যতমের উদবর্তনের মাপকাঠিটা বিবেক বেচা অভিযোজনের তুলাযন্ত্রে।
ইঁদুর দৌড়ে জিতেই কাঁকড়ার দাঁড় টানা কর্মশালায় হাত পাকিয়ে চলেছে অবিরত।
এগিয়ে দেওয়ার ভাবনারা সব ব্যাস্তানুপাতিক সূত্রে বিশ্বাসী ।
মিথ্যার জোব্বায়, ঈর্ষার আলখাল্লায়, সমালোচনার ফতুয়ায় বেশ সেজে চলেছে রোজ।
তৈলাচারের পরবে পিচ্ছিল উপাচারে পদলেহনের অহমিকাই যেন সঠিক জীবনপথ।
এভাবেই গতিময় আস্ফালনকারি মানবসভ্যতা
প্রগতির ফানুসে ভর করে হয়তো বা পৌঁছাবে কোনো অনাম্নী গ্যালাক্সিতে।
সংক্রামিত হবে আবার কোনো অজানা পৃথিবী মান-হুঁশ বর্জিত মানবতার অসুখে।

ঝরা পাতার শিখন

ঝরা পাতা বলে যায় নির্মম জীবনযাপন সূত্র
কিশলয় হতে বর্ধিত হরিৎ কায়ে কাইনিনের ইতিবৃত্ত।
বার্ধক্যের থাবায় হলদে হওয়ার আগে নিত্য জ্বলে ক্লোরোফিলের চুলা,
শর্করার প্রাত্যহিক খোরাকে অব্যাহত জীবনদোলা।
টুপ করে খসে পড়ার আগে বিটপ জুড়ে পালিত হয় শোক।
বৃন্তে বেজে ওঠে রুদালি সুর , ছিন্ন বাঁধনে ত্যাজি ইহলোক।
জমা খরচের হিসাব শেষে মনে রাখবে না কেহ বেশিদিন
রিক্ত পর্বে মুকুলোদগমে নব কিশলয়ের আগমন সমীচীন।
তবু নিজ স্থান বড় প্রিয় ! স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিতে কেহ নাহি চায়,
তবু নতুনের আবাহনে সময়ের দাবি মেনে নিতে হয়।
ভূপতিত কায়ে নিঃশেষ হতে হতে স্মৃতিচারণ পিছুটানে,
দেনা পাওনার গড়মিল যত আক্ষেপি অভিধানে।
খসে পড়া পাতা সম মানব জীবনও ক্ষণিকের তরে
কর্ম বীনা জীবনধারণে নাহি সুখ, দিন কাটে দুখের সাগরে।
মনে যদি পাও ঠাঁই তবে সে অমরতাই জেনো অক্ষয়,
কীর্তি যা কিছু রেখে যাবে নিজ কর্মগুণে তাই সঞ্চয়।

 

তুমি যদি জানতে

তুমি যদি জানতে না বলা সে কথাগুলো কাঁদে একান্তে!
নোনতা ধারায় বহমান আক্ষেপ সব গুমরে মরে অজান্তে।
সম্পূরক সূত্রে হেরেছিল যে বাঁধন কোনো এক সোনাঝরা বিকেলে,
আজও তার হার মানা সুর বেদনার সিম্ফনিতে বেজে চলে ।
কাটাছেঁড়া ভুলে নিজেকেই যে ভাঙি-গড়ি কত শত বার,
যদি তুমি জানতে আমার সে অনুতাপের লোনা হাহাকার!
তোমার দেওয়া কলমেই রচি কবিতায় মনস্তাপের পারাবার,
আঁধারের কোলে জলছবিতে প্রকাশিত বেদনের ইস্তেহার।
কেন যে লাজুক শব্দের ঝাঁপি মূক বেশে সেজেছিল সে লহমায় !
যদি তুমি জানতে , আজও উৎসুক শব্দেরা বিলাপে কাতরায়!
অঘোষিত আবেগে ভিজেছি কতবার অপলক চাউনিতে।
উদ্বায়ী ইচ্ছেরা ভিড়তে চেয়েছে শত বার প্রকাশের ছাউনিতে।
তবু কেন ঘেরাটোপে বন্দী সে ইচ্ছেরা হারাবার ভয়েতে,
যদি তুমি জানতে, স্বপ্নেরা আজও বেঁচে তুমিময় আমিতে!
আমি জানি তুমি ভালো আছো ভালো থাকার অধিকারে,
সিঁথির আঁচে ,সংসার সুখে আছো কারো আদুরে বাহুডোরে।
ভুলের ঘাণিতে পিষে চলেছি আমি সংশোধনের রুদ্ধ দ্বারে,
যদি তুমি জানতে, তোমাকে যে আজও বড্ড মনে পড়ে!
তুমি যদি জানতে গুমরে মরি আজও একাকী মনের ঘরে!

বৈশালী নাগ। কবি। জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের বর্ধমানে। পেশাগত জীবনে তিনি স্কুল শিক্ষক।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ