টান

আজমত রানা
গল্প
টান

ক্যাঁচচচচচচ ………..

শব্দটা কানে আসতেই তড়াক করে বিছানায় উঠে বসে বিষু ।

বেশ ক’দিন আগে ভোর ভোর সময়ে বিষুর তলপেটটা পেশাবের চাপে টন টন করে উঠেছিল। সে সময়েই চোখ মেলে দেখে মা দরোজা খুলে বাইরে যাচ্ছে। বিষু বিছানা ছেড়ে বাইরে এসে উঠোন পেরিয়ে কল পাড়ের বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে পেশাব করে। হঠাৎ ওর চোখ যায় কোঠা ঘরের দিকে। ওখানে দাঁড়িয়ে মা একটা কাঠি দিয়ে দাগ দিলেন। বিষু মাকে কিছু জিজ্ঞেস না করে চোখ ডলতে ডলতে আবার বিছানায় চলে যায়।

সেদিনই আর একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠে সবার আগে উঠোনের অপর প্রান্তে কোঠা ঘরটার দিকে চোখ যায় বিষুর। অবচেতনভাবেই সেখানে গিয়ে দাঁড়ায় যেখানে ভোর ভোর সময়ে মা কোঠাঘরের মাটির দেয়ালে একটা দাগ টেনে দিয়েছিলেন। দাগটা এখনও স্পষ্ট হয়ে আছে। বিষু কাউকে কিছুই বলেনা।

কোঠা ঘরের মাটির দেয়ালে দাগ দেয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিল বিষু। পাঁচ ছয়দিন পর ছোটভাই দিষুর সাথে লুকোচুরি খেলতে গিয়ে কোঠা ঘরের আড়ালে যেতেই মাটির দেয়ালে চোখে পড়ে দাগগুলো। এখন আর একটা নেই; বিষু দাগগুলোর কাছে এসে একটা একটা করে গুনে দেখে সাতটা দাগ হয়েছে।

ওর মনে প্রশ্ন জাগে মা কেন প্রতিদিন একটা করে দাগ দেয়? কাকে জিজ্ঞেস করবে? মনে মনে ভাবে কাউকে নয় মাকেই জিজ্ঞেস করবে, তবে এখন নয় মা যখন দাগ দেবে তখন।

মা দরজা খুলে বাইরে গেলেন।

বিষু পিছু পিছু বাইরে এলো। চারিদিকে কেবল ফর্সা হতে শুরু করেছে। কলপাড়ের বেড়ার কাছে গিয়ে বিষু পেশাব করছে আর চোখ রাখছে কোঠাঘরের দেয়ালের দিকে।

মা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন দেয়ালের দিকে। আগের দাগগুলোর কাছে দাঁড়ালেন। হাতে একটা কাঠি নিয়ে আবরো একটা দাগ দিলেন।

-এইঠে কিসের দাগ দেওছিস মা?

পায়ে পায়ে কখন বিষু এসে পাশে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি সুতপা। বিষুর গলা শুনে চমকে যায়। হাত বাড়িয়ে বিষুকে বুকের সাথে লেপ্টে নেয়।

– মা কবুনা কিসের দাগ দেওছিস?

বিষু দেখে মায়ের মুখটা উজ্জল হয়ে উঠলো।

– বাবা গনি দেখতো কয়টা দাগ হোইল?

বিষু একটা একটা করে দাগ গুনে বলে, আটটা।

সুতপা হাতের আঙুলের কড়া গুনে বলে আরো তেইশ দিন।

বিষু বিস্মিত হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে – তেইশ দিন বাদে কী হইবে মা ?

সুতপা ছেলেকে নিয়ে উঠোনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে – তুই এলাও ছোট ছাওয়া, সব কিছু বুঝির পাবুনা।

বিষু জেদ ধরে – মা মুই অনেক বড়, দিষুর চায়া বড়। মোক কবার নাইকবে, মুই শুনিম।

– আইচ্ছা বাবা তোক মুই সবে কইম কিন্তু এলা নোয়ায়। মোর হাতত দুনিয়ার কাম পড়ি আছে। গরু বার করির নাইকবে, কান্দরত ছাগল বান্ধির নাইগবে, মুরগীক আধার দেওয়া নাইগবে আরো কত কাম।

বিষু আর জেদ করে না। মা যখন বলেছে তখন বলবেই।

কারো কান্নার শব্দে ঘুম ভাঙ্গে বিষুর। পাশের ঘরে হারিকেন জ্বলছে। লাগালাগি দুটো ঘর, মাঝখানে সনের বেড়া। এ পাশের ঘরটাতে একটা চকি পাতা। এটাতে বিষু একাই থাকে। পাশের ঘরেও একটা চকি, তাতে মা বাবা আর দিশু থাকে।

বিষু অন্ধকারেই ঠাওর করে, শব্দটা মা বাবার ঘর থেকেই আসছে। কান্নার শব্দটা এখন আর পাওয়া যাচ্ছেনা। একবার ভাবে কান্নাটা বোধ হয় দিষুর। ও প্রায়ই রাতে কেঁদে ওঠে। ওর কান্নায় সবারই ঘুম ভেঙ্গে যায়। বাবা ধমক মারেন, মা পিঠ থাপরে আবার ঘুম পাড়িয়ে দেন। বিষুর ঘুম ভাঙলে আর ঘুম আসেনা সকাল পর্যন্ত বিছানায় এপিঠ ওপিঠ করে। শোধটা নিতেও দেরি করেনা। সকাল হলেই যে কোন ছুতোয় আগে দিষুকে একটা থাপ্পর মেরে নেয়।

দিষুকে খুব হিংসে করে বিষু। ও হওয়ার পর থেকেই বিষু আর বাবা মায়ের সাথে এক বিছানায় থাকতে পারেনা। প্রথম প্রথম বিছানা আলাদা করার পরেও একসাথে থাকার জন্য খুব জেদ করেছিল। মা একদিন দিষুকে কোলে নিয়ে দুখ খাওয়াতে খাওয়াতে বলে – বাবা জেদ করা ভালো নোয়ায়, এলা তুই অনেক বড় হইছিস। তোর ভাই আসিল তাক তুই জাগা ছাড়ি দিবুনা?

বিষুও জেদ ধরে – না মা মুই এ্যালাও ছোটয় আছু। এই এই দেখ মা মুই কত ছোট।

বিষু ছোট নাকি বড় সে বিচারে কেউ যায়না। বিছানাটা আলাদা হয়েই গেল। প্রায় রাতেই বিষুর ঘুম ভেঙ্গে যায় দিষুর কান্নায়। মা’র বকাবকি শুনে বুঝতে পারে দিষু বিছানা ভিজিয়ে দিয়েছে। ঘুম ভাঙ্গায় কিছুটা বিরক্ত হলেও বিছানা ভিজিয়েছে জানার পর খুশিই হয়।

আবার কান্নার শব্দ শোনা যায়। মা’র কান্না। কিছুক্ষণ পর কান্নার শব্দ থেমে যায়। মা বলছে – এতদিন হামরা একসাথে থাকিনু, এলা তোমার কোন্ অসুবিধা হইল যে এইঠে থাকা যাবেনি?

বাবার গলা শোনা যায় – কেনে বুঝিসনা, হামরা হিন্দু, হামার দেশ এন্ডিয়া। কত বড় দ্যাশ, কত কাম ….

– অইলা কোন্ কাথা কওছেন ! এইডা কী হামার দেশ নোয়ায়? কই হামরা যে এতদিন ছিটত আছি কায়ওতো কিছু কইলনা। হামার বিয়াও হইল এইঠে, ছাওয়া হইল, এইঠে হামার বাড়ি ঘর, জমি জিরাত, গরু ছাগল, আমের গাছ জামের গাছ আরো কত কী। এইলা ফেলায় তোমরা এন্ডিয়া যাওয়ার কথা ভাবেন কেং করি ?

– তুই না যাইস, মোর যাওয়াই নাইগবে। মোর বাপ দাদা অই পাকে আছে। মুই চলি যাইম।

আবার মায়ের কান্না শব্দ শোনা যায়।

– মুই তোমাক ছাড়ি কেমন করি একলায় এইঠে থাকিম? তোমার কী কোন রহম নাই ?

অনেকক্ষণ বাবার বথা শোনা যায়না। মায়ের কান্নার শব্দ আস্তে আস্তে কমে আসে। মায়ের গলা শোনা যায়

– কী হইল মোর কাথার কোন উত্তর দেন না কেনে? মুই এইঠে তোমাক ছাড়ি একলা কেং করে থাকিম?

– একলা থাকির কায় কইল? তুই দিষুক ধরি থাকিস মুই বিষুক ধরি এন্ডিয়া যাইম।

–  কী! কী কইনেন? তোমার হুশ-বেশ কী খায়া ফেলাইছেন?

মা চিৎকার করে ওঠেন।

একটু পরেই মা ডুকরে কেঁদে ওঠেন। কান্না থামে না। মা’র জন্য বিষুর কষ্ট হয় ইচ্ছে করে ও ঘরে গিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে। সেটা আর হয়ে ওঠেনা। একটু পরেই মা এ ঘরে এসে বিষুকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে। বিষু ইচ্ছে করেই চুপ করে থেকে মায়ের বুকের সাথে লেপ্টে থাকে। মা বুঝতেও পারেনা বিষু জেগে আছে না ঘুমিয়ে গেছে।

পরের দিন সকালে বিষু ছোট ভাইকে নিয়ে উঠোনে খেলছে। মা কাজ সেরে এসে দিষুকে কোলে তুলে নিল।

– চলতো বাবা স্কুলের মাঠ থাকি ঘুরি আইসো।

-কেনে মা ?

-তুইতো কথাত কথাত মোকে পুছারি করিস, কই তোর বাপকতো কবার পারিসনা ‘বাবা কেনে মুই তোমার সাথত এন্ডিয়া যাইম? মোর মাক থুইয়া কেনে যাইম?

থমকে দাঁড়ায় বিষু, মা হাত ধরে টান মারেন

– চল, ইসকুলের মাঠত কত সাহেব আসি বসি আছে। হামার দেরি হইলে ওমরা চলি যাবার পারে। কিরে অমন মূর্তির মতন মোর পাকে চায়া আছিস কেনে?

বিষু মায়ের হাতটা ছাড়িয়ে মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে – মা তুই কী কলু! বাবা মোক ধরি এন্ডিয়া চলি যাইবে?

–  মুই কি কউছু নাকি তোর বাপে তো মোর সাথে পাছাড় শুরু করিছে। মোর কোন কথায়  মানির চায়না।

–   না মা মুই তোক ছাড়ি কোনঠে যাইমনা।

– তোর বাপক কবার পাবু?

– কী?

– মোক যেইলা কথা কলু?

– মুই তোক ছাড়ি কোনঠে যাইমনা, দিষুকও নিবার দেইমনা। মুই বাবাাক কইম ।

সুতপা বিষুকে কাছে টেনে নেয় তারপর হাঁটতে শুরু করে। স্কুল ঘরের সামনে জটলা। দু’টো টেবিল সাজিয়ে তাতে চারজন লোক বসে আছে। তাদের ঘিরেই জটলাটা। একজনের পর একজন টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। চেয়ারে বসা মানুষগুলোর মধ্যে দু’জন প্রশ্ন করছে একজন লিখছে আর একজন ফাইলপত্র নিয়ে বসে আছে।

সুতপা পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় জটলার দিকে।

– নাম কী?

– সুতপা

– স্বামী?

– জি মোর স্বামী আছে ।

– আরে, তোমার স্বামীর নাম কী?

সুতপা চুপ করে থাকে, পাশ থেকে একজন বলে – ওর স্বামীর নাম পরিমল।

চেয়ারে বসা একজন বলে – এই তুমি চুপ কর, যারটা তাকে বলতে দাও ।

সুতপা ফিস ফিস করে বলে – জি ছার অমরা যেইডা কইছে অইডায় মোর স্বামীর নাম।

তুমি বাংলাদেশে থাকতে চাও নাকি ইন্ডিয়া যেতে চাও?

সুতপা টান হয়ে দাঁড়ায়। কিছক্ষণ আগেও কেমন যেন ভয় ভয় লাগছিল। এখন সেটা আর লাগেনা।

– ছার মুই বাংলাদেশতে থাকিম। মোর নাম নেখি নেন, মুই বাংলাদেশতে থাকিম। এইযে মোর দুই বেটা বিষু আর দিষু ওমরাও মোর সাথে বাংলাদেশতে থাকিবে।

– তোমার স্বামী? সাহেবদের মধ্যে একজন প্রশ্ন করেন।

সুতপা চুপ করে থাকেন।

আবার একজন তাড়া দেয় – তোমার স্বামী কোথায়?

সুতপা মাথা নুইয়ে বলে মুই কবার পারুনা ছার।

লোকগুলো একটা ফরমে আরো কিছু লিখে সুতপাকে চলে যেতে বলে।

বাড়িতে এসে দেখে দু’টো বড় বড় গাছ কারা যেন কাটছে। কোঠাঘরের বারান্দায় বিষুর বাপ বসা। সুতপা চিৎকার করে ওঠে – এই এই মোর গাছত কায়ও হাত দিবেননি। মোরে হাতত ওজা গাছ মোকে না কয়া কাটতোছেন! কায় তোমাক এতবড় সাহস দিল্?

সুতপা চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় তোলে। পরিমল তখনও বারান্দায় বসে বিড়ির ধোঁয়া টানে।

সুতপা গাছের গোড়ায় এসে দাঁড়ায় যেখানে অপরিচিত লোক দু’টো কুড়াল দিয়ে গাছ কাটছিল।

– খবরদার মোর গাছত কায়ও হাত দিবেন না।

লোক দু’টো গাছ কাটা থামায়, কণ্ঠস্বর নিচু করে বলে – বৌদি হামার কী দোষ? দাদা মহাজনের কাছত গাছ বেচে দিছে।

সুতপা ধাক্কা খায়, চোখ গড়িয়ে পানি আসে। পায়ে পায়ে পরিমলের সামনে এসে আবার চেঁচাতে শুরু করে

– এই বিষুর বাপ এইলা কী হছে? গাছ কেন বেচাইতোছেন? তোমার কোন্ ঠেকা পড়িল?

পরিমল বিড়িটা উঠোনে ছুঁড়ে ফেলে তারপর সুতপার দিকে চোখ বড় করে তাকায় – সর এইঠে চেচা চিল্লা করিসনা, গাছ থুইয়া এটে কী করিম?

– কী করিম মানে; তোমরা কী করিবা চায়ছেন? সুতপা চোখে আগুন ঝরিয়ে প্রশ্ন করে।

মানে আর কী; সউগ বেচা বিক্রি করি সবায় মিলি এন্ডিয়া চলি যাইম।

– না।

– না মানে?

– না মানে হামরা অইঠে কেন যামো? এইঠে হামার বাড়ি ঘর জিরাত সউগ, তাকে ছাড়ি হামারাগুলা কেন যাই এন্ডিয়া?

– হামরাগুলা ফের কোটে পালো! তুই না যাইস তোর ব্যাপার, মুই ছাওয়া ধরি এন্ডিয়া যাইম।

– না, মুই মাক ছাড়ি কোনঠেও যাইমনা। বিষু এতক্ষণ পর কথা বলে। বাপের মুখের ওপর কথা বলে কিছুটা ভয়ও পেয়ে যায়, তাই মায়ের গা ঘেষে কোমড় পেঁচিয়ে ধরে।

– বাহ, ছাওয়াকতো ভালয় শিখাইছিস। এতকোনা ছইল তায় মোর মুখের ওপর কথা কয়! থাক তুই তোর ছাওয়া ধরি মুই চলি যাইম।

পরিমল হন হন করে উঠোন পেরিয়ে চলে যায়। কী মনে করে আবার ফিরে আসে। সুতপার মুখের কাছে আঙ্গুল নিয়ে বলে – খবরদার কথা কবার পাবুনা। অমরা গাছ কাটে ধরে যাবে। মুই গরুও বেচে দেইম। অইলা নিবার আসিবে। কাকো কোন কথা কবুনা।

সুতপা কোন কথা বলেনা। চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি গড়িয়ে পড়ে। গাছ কাটতে আসা লোকগুলো এতক্ষণ সুতপা আর পরিমলের বাক বিতন্ডা দেখছিল। পরিমল বাইরে বের হয়ে যেতেই নিজেদের কুড়াল আবার সচল করে। ছন্দবদ্ধ সুরে শব্দ হয় ঠক ঠক ঠক ঠক…। সুতপার ভেতরটায় প্রতিটা শব্দ কিছুটা করে কেটে নিয়ে যায়। গাছটা মাটিতে পড়ার আগেই মনে হয় সুতপা মাটিতে পড়ে যাবে। ও তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়ে।

-বিষু, বিষু ….

বিষু ঘুমের চোখে আড়মোড়া ভাঙে, জেগে ওঠেনা। সুতপা আবার ডাকে – বিষু, বাবা বিষু……

– কেনে ডাকিস, মুই এলা দিষুক কোলাত করিবা পারিমনি।

– না বাবা, দিষুক ধরির নাইকবেনা।

– তাইলে কেন ডাকাইস?

– চল বাবা দেখবু তো চল, ছিটের নয়া স্কুল ঘরটার বারান্দাত অনেক মোমবাতি জ্বালাইবে। আলোয় আলো, হামার ছিট আলোয় ভরে যাবে। কত মানুষ দূর দূর থাকি এটে আইতোছে দেখিবা, আর হামরাগুলা এটে থাকি কেমন না দেখি। চল বাবা বিষু দেখি আসি।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিষু ঘুম জড়ানো চোখে মায়ের পিছু নেয়। পরিমল শুয়ে ছিল, একবার শুধু মাথা তুলে দেখে। কাউকে কিছু বলেনা।

কিছুদূর যেতেই বিষু চোখ ডলে, সত্যিইতো বলেছে মা। নতুন বানানো স্কুল ঘরের বারান্দার এমাথা ওমাথা লম্বালম্বি ভাবে আলো জ্বলছে। বিষু চোখ ডলে, না কোন  ভুল দেখেনি ও। বাতাসের মৃদু ঝাপটায় মাঝে মাঝে আলোর লাইনটা আঁকাবাঁকা হয়ে যাচ্ছে অল্প পরেই আবার এক লাইনে সব আলো। একটার পর একটা মোমবাতি সাজিয়ে জ্বালানো হয়েছে।

কাছে আসতেই দেখে স্কুলের মাঠে অনেক মানুষ। আলোর কাছাকাছি যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের মুখে আলোর ছটা পড়েছে। বিষুর খেলার সাথী রহিম, কালু, সোমানাথ, হরি আরো অনেককে দেখে বিষু খুব খুশি হয়। মায়ের পিছ ছেড়ে দিয়ে ওদের সাথে এক লাইনে গিয়ে দাঁড়ায়। সুতপা ভিড়ের মধ্যে এক কোণে দাড়াঁয়। এতকাল ছিটে আছে এত আলো ও কোন দিন দেখেনি। দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকায় আস্তে করে বলে – সবার মনত আলো দেন ভগমান।

মাঠের এক কোণে একটা ম্যাশিন বসানো হয়েছে। সবাই সেদিকে যাচ্ছে। সুতপাও পা বাড়ায় সেদিকে। কিছু লোক লম্বা তার বাঁেশর খুঁটিতে লাগাচ্ছে। তারের মাথায় কাচের বোতলের মত কিছু একটা। সুতপা পাশের গ্রামের স্কুল পড়–য়া ছেলে মেঘনাদকে ডেকে জিজ্ঞেস করে

– বাপ, কবার পারিস এইডা কী ?

– কেনে পারিমনা; এইডার নাম হইল জেনারেটর। অইযে তার দেখা যায় তাকে দিয়া কারেন যাইবে তারপর অইযে বোতলের মতন, অই বোতলকোনাত আলো জ্বলিবে, হারিকেনের মতন।

সুতপা বিস্ময়ে আঁচল দিয়ে মুখ চেপে ধরে। ও অবাক হয় কাল থেকে স্বাধীন দেশের মানুষ ও আর আজই এত পরিবর্তন! বিষু কোথায় আছে কে জানে। সেটা নিয়ে তার কোন মাথা ব্যথাও নেই। আছে হয়তো আসে পাশে কোথাও। দিষুকে কোলে নিয়ে অন্ধকার স্কুল মাঠটাকে এমাথা ওমাথা কয়েকবার হেঁটে আসে। বাচ্চাটা কোলে না থাকলে মন খুলে দৌড়াতো।

পূব আকাশটা লাল হয়ে উঠেছে। সবাই দৌড়া দৌড়ি করে স্কুলের সামনে জড়ো হচ্ছে। সুতপাও সবার সাথে সেদিকে যায়। রাতে খেয়াল করেনি, স্কুলের ঠিক সামনেই একটা বাঁশ খাড়া করে রাখা হয়েছে। বাঁশটাতে একটা রশি লাগানো। রশিটাতে একটা কাপড় আটকে দেয়া আছে। কাপড়টা সবুজ মাঝখানে টকটকে লাল।

কয়েকজন এগিয়ে গেল বাঁশটার সামনে। একজন হাতদিয়ে রশিটা আস্তে আস্তে টানছে আর অমনি লাল সবুজ কাপড়টা উপড়ে উঠছে। সবাই চুপ করে আছে। কেউ কোন কথা বলছেনা। ব্যাপারটা যে খুব গুরুত্বপূর্ণ সেটা সুতপা বুঝতে পারে।

লাল সবুজ কাপড়টা ওঠানো শেষ হতেই একদল ছেলে মেয়ে সুর করে গাইতে শুরু করলো – ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। সুতপা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। যেটা গাওয়া হচ্ছে সেটা যে একটা গান সেটা সুতপাকে কেউ না বলে দিলেও বুঝতে পারছে। জীবনে ও অনেক গান শুনেছে কিন্তু এ গানটা এমন কেন? সুতপার ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। চোখ ফেটে পানি আসতে চায়। সকালের ভেজা ভেজা বাতাস শরীর মন সব ভিজিয়ে দেয় ।

কে যেন পেছন থেকে সুতপাকে টান মারে। ও সম্বিত ফিরে পায়। দেখে বিষু; কখন যেন পাশে এসে দাঁড়িয়ে ওর অঁচল ধরে টানছে। সুতপা জটলা থেকে বের হয়ে আসে। বিষু বলে

– গরু বেরকাবু না?

– হয় বাপ এলায় যাওছু।

সুতপা ছেলের হাত ধরে জমির আইল বেয়ে বাড়ির পথ ধরে। আরো কিছুক্ষণ থাকতে ইচ্ছে করছিল। এত বছরের অভ্যেস সূর্য ওঠার আগেই গরু ছাগল বের করার কথাও আজ তার মনে ছিলনা।

কিছুটা গিয়ে সুতপা স্কুলের মাঠটার দিকে তাকায়। সবার আগে চোখে পড়ে বাঁেশর আগায় কিছুক্ষণ আগে টানিয়ে দেয়া লাল সবুজ কাপড়টা। সুতপা থমকে দাঁড়ায়, বিষুর হাত ধরে টান মারে

– আচ্ছা বাপ অইযে, অইডা কেনে টানাইল ?

– কোনটা ?

– আরে অইযে লাল সবুজ ।

– ওহ… বিষু হেসেই মরে। মাও, তুই এইডাও কবার পারিসনা!

– না বাপ মুই কবার পাওনা ।

– আরে অইডা হইল জাতীয় পতাকা। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।

– তারমানে এইডা বাংলাদেশ …. বাং   লা  দে  শ …

সুতপা আবার হাঁটছে। শাড়ির আঁচল দিয়ে একবার চোখের কোণা মুছে নেয়। যতই এগিয়ে যায় ততই যেন টেনে ধরে স্কুলের মাঠ, লাল সবুজ রঙের কাপড় আর সুর করে গাওয়া – আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি ….।

আজমত রানা। লেখক ও সাংবাদিক। নিম্নবিত্ত ঘরে জন্ম বলে জন্মের সঠিক দিন তারিখটা তাঁর জানা নেই। লেখাপড়াটাও এগোয়নি ইচ্ছের কমতি আর অভাবের কারণে। বাংলাদেশের মানচিত্রের একেবারে উত্তরের প্রান্ত শহর ঠাকুরগাঁওয়ে শ্রমিক বাবার ঘরে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। বয়স আঠার হতেই...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..