টিকটক অপু রোস্টেড বাই সুপারকপ

মাসকাওয়াথ আহসান
রম্য রচনা
Bengali
টিকটক অপু রোস্টেড বাই সুপারকপ

উত্তরা থেকে কুখ্যাত সন্ত্রাসী টিকটক অপু গ্রেফতার হওয়ার পর শান্তির সুবাতাস নেমে আসে ধরণীতে। এরকম একজন শত্রু ভয়ংকরকে গ্রেফতারের পর শান্তি প্রকৌশলীরা মোমবাতি মিছিল নিয়ে পুলিশ স্টেশনে পৌঁছে যায়। বীর পুলিশদের ঘিরে শান্তি প্রকৌশলীরা সমবেত কন্ঠে গান করে,

বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি
শুষ্ক হৃদয় লয়ে আছে দাঁড়াইয়ে
ঊর্ধ্বমুখে নরনারী॥
না থাকে অন্ধকার, না থাকে মোহপাপ,
না থাকে শোকপরিতাপ।
হৃদয় বিমল হোক, প্রাণ সবল হোক,
বিঘ্ন দাও অপসারি॥…
জয় জয় হোক তোমারি॥

এই গান শুনে সুপারকপ খুশি হয়। শান্তি প্রকৌশলীরা তাকে মিষ্টি মুখ করায়। এইসময় ফোন আসে লাস্য কন্ঠের, হ্যালো, আমি কী সুপারকপের সঙ্গে কথা বলছি! আমি এতোদিন টিকটক অপুর ফ্যান ছিলাম। কিন্তু আজ থেকে আমি বীর সুপারকপের ফলোয়ার ও ফ্যান হতে চাই। আপনার তো ইউটিউব আইডি পেলাম না; কোথায় লাইক দিয়ে সাবস্ক্রাইপ বাটনে টিপ দেবো! সেজন্য কী আমাকে থানায় আসতে হবে!

সুপারকপ শিহরিত হয়। সেলিব্রেটি কী জিনিস তা কিছুটা বুঝতে পারে যেন; তার ব্রেন কেমিক্যালে একটা শোবিজ ইউফোরিয়া দোল দেয়।

ফোনের অপর প্রান্ত থেকে রিনি রিনি কন্ঠের মেয়েটি বলে, এতো বড় বীর পুরুষ; যিনি কুখ্যাত টিকটক অপুকে গ্রেপ্তার করে আনলেন; তিনি আমাকে ভয় পাচ্ছেন কেন; আমি কী বাঘ নাকি ভালুক!

সুপার কপ শান্তি প্রকৌশলীদের অনুরোধ করে, অনেক ধন্যবাদ; আপনারা এখন ঘরে ফিরে ফেসবুকে মোমবাতি জ্বালুন; ইতিহাসের অংশ হোন।

এরপর সুপার কপ দুরু দুরু কন্ঠে রিনি রিনিকে বলেন, আসেন দেখি সাবস্কাইব বাটনের কী ব্যবস্থা করা যায়।

শান্তি প্রকৌশলীরা ফেসবুকে মোমবাতি জ্বেলে #ধন্যবাদসুপারকপ লিখে; এরপর কুখ্যাত অপুকে কীভাবে রোস্ট করে তার কান-মাথা চিবিয়ে খাওয়া উচিত তার রেসিপি লিখতে থাকে।

সহমত ভাইয়েরা এসে যোগ দেয়, হাউ মাউ খাও; টিকটক অপুর গন্ধ পাঁও বলে যোগ দেয় ফেসবুক পিটুনিতে। টিকটক অপু গ্রেফতার দিবসটিকে “জাতীয় ন্যায় বিচার দিবস” হিসেবে পালনের দাবি জানায় সহমত ভাইয়েরা।

বিশুদ্ধ সংস্কৃতির পুরোহিত মামারা, স্বতন্ত্রভাবে বিবৃতি দেয়, টিক টক অপুর গ্রেফতারে সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ সমুন্নত হইলো। টিকটক ব্যান করে তরুণ প্রজন্মের গলায় গামছা দিয়ে হারমোনিয়াম বেঁধে দেবার দাবী জানায় বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ মাহফুজুর রহমান। পুরোহিত পবিত্র কর এসে বলে, টিকটক অপুর গ্রেপ্তারে দুষ্টের দমন হইয়াছে; আমরা এখন শিষ্টের মাহফুজ পালনের প্রশস্ত সুযোগ পেলাম।

পবিত্র কর বিবৃতি দিতেই হাটহাজারি ভ্যাটিকেনের পোপের দপ্তর থেকে গোলাম সার্জিল খান পোপের পক্ষে বিবৃতি দেয়, টিকটকটা হইলো শয়তানের যন্ত্র। জ্ঞান তাপস নরেন্দ্র মোদির অনুসরণে, এইসব শয়তানি টিকটক বন্ধ করা হোক। নালায়েক অপুরে আচ্ছা কইরা ছ্যাঁচা দিয়া দেন।

সুপার কপ বার বার মোবাইল ফোনে সময় দেখে; রিনি রিনির অপেক্ষায় অফিস রুম গোছায়। হলুদ তোয়ালে দিয়ে সিংহাসন আচ্ছাদিত করে। দায়িত্বরত অন্য কপদের নির্দেশ দেয়, তোমরা যাও, টিকটক অপুর চুল তোমাগো চুলের লগে ইঞ্চি ইঞ্চি মিলাইয়া ইঞ্চিমত কাট দিয়া দেও। তবে সাবধান; টপ টিকটক টেররডারে দেইখা রাখবা; ফুড়ুত কইরা উইড়া গেলে বিপদ। প্রোমোশান তো দূরের কথা; ডাইরেক্ট বান্দরবান পাঠাইয়া দিবো কইলাম।

বান্দরবানের কথা মনে আসতেই চট করে টিকটক অপুর আব্বাকে ফোন করে সুপারকপ জিজ্ঞেস করে, আপনি শিওর তো; টিকটক অপুর জন্ম বান্দরবানে হয় নাই তো আবার!

টিকটক অপুর আব্বা জবাব দেয়, আমার কাছে তো আইজকাল পুরা দেশটারেই বান্দরবান মনে হয় স্যার। আমার বদ পোলারে ছাইড়া দ্যান জাঁহাপনা। ওর প্রতিভা আছিলো এক্টিং করার; অন্যরে ভেংচাইতো সারাক্ষণ; আমি ধমক দিয়া তারে কইছিলাম, এক্টিং কইরা প্যাটের ভাত জোগাড় করছে কে কবে! সবাই এক্টররেই তো দেহি প্রাইম মিনিস্টারের কাছে ধন্যবাদ দিয়া কাঁইদা-কাইটা দুস্থ-ভাতা নিতে।

পোলায় কইলো, সে ইউটিউব থিকা টিকটক কইরা টেকাটুকা কামাইবো। সেই থিকা পোলা আউট অফ কন্ট্রোল স্যার। রক্ষা করেন হুজুর; আমি গরীব মানুষ; আপনারে নজরানা দেয়ার এবিলিটি নাই আলেমপনা। গোস্তাকি মাফ করুন টিক টক অপুর।

রিনিরিনিকে অফিস রুমে ঢুকতে দেখে মন্ত্রমুগ্ধের মত ফোনের লাইন কেটে দেয় সুপারকপ। মেয়েটা যেন তার সুগন্ধীর সৌরভে সুপার কপের ঘরটিকে চুল কাটার সেলুনের মৌ মৌ ঘ্রাণ দেয়। মেয়েটি সুপারকপের হাত থেকে তার স্মার্ট ফোন কেড়ে নিয়ে সুপারকপ নামে ইউটিউব আইডি খোলে। টিকটক অপু গ্রেপ্তারে সুপারকপের বীরত্বগাথা নিয়ে সুপারকপের একটা ছোট্ট ইন্টারভিউ করে আপলোড করে ইউটিউবে, “টিকটক অপু রোস্টেড বাই সুপারকপ।” সেখানে লাইক আর সাবস্ত্রাইব বাটনে অনবরত চাপ পড়তে শুরু করে।

রিনি রিনি হাহাহাহা করে হেসে বলে, ইউ আর আ রিয়াল হিরো সুপারকপ; ইউ আর আ সেলিব্রেটি না-ও।

সুপারকপের মস্তিষ্কের নিউরনে সেলিব্রেটি শব্দটি যেন মরফিন ছড়িয়ে দেয়; স্বপ্নাহতের মতো লাগে; তন্দ্রাচ্ছন্ন লাগে। সোফায় বসে পড়ে টিভির দিকে তাকিয়ে দেখে ব্রেকিং নিউজঃকুখ্যাত সন্ত্রাসী টিকটক অপুর গ্রেফতারে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। সততা ও আইনের শাসনের এই মহতী অর্জনের পর সৎ সমাজের ‘করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট’-কে চোখ বুঁজে বিশ্বাস করা যাবে; এমন আশাবাদ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এক ফাঁকে রিনি রিনি সন্তর্পণে গিয়ে হাজতের পাশে দাঁড়িয়ে টিকটক অপুর সঙ্গে সেলফি তুলে ইন্সটাগ্রামে ছেড়ে দেয়। তারপর পা টিপে টিপে বেরিয়ে যায় পুলিশ স্টেশান থেকে।

মাসকাওয়াথ আহসান। লেখক, শিক্ষক ও সাংবাদিক। 'শিল্পের জন্য শিল্প নয়, সমাজ-রাজনৈতিক উত্তরণের জন্য শিল্প' এই ভাবনাটিই মাসকাওয়াথ আহসানের লেখালেখির প্রণোদনা। নাগরিক বিচ্ছিন্নতার বিচূর্ণীভাবনার গদ্য ‘বিষণ্ণতার শহর’-এর মাঝ দিয়েই লেখকের প্রকাশনার অভিষেক ঘটে। একটি পাঠক সমাজ তৈরি হয় যারা নাগরিক জীবনের...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মোরা একটি সেকেন্ড হোমকে বাঁচাবো বলে

মোরা একটি সেকেন্ড হোমকে বাঁচাবো বলে

নতুন দিল্লিতে প্রণব মুখার্জি নেই। কোয়ালিশন ইয়ারস-এর সেই প্রাজ্ঞ চাণক্যের কলমটি ধুলোমাখা ডেস্কের কলমদানিতে আকুল…..