টুম্পা, তুই কাঁদিস না

মহসীন হাবিব
গল্প, নারী, পডকাস্ট
Bengali
টুম্পা, তুই কাঁদিস না

(২০০৫ সালে ফরিদপুর শহরে চারটি মেয়ের বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ ওঠে। প্রথমে মেয়ে চারজনকে নিয়ে কানাকানি, তারপর কিছু মানুষের উচ্চস্বর, অবশেষে ফলাও করে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ‘রসময়’ প্রতিবেদন। অতঃপর দুজন দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন সচেতন মেয়েকে পুলিশ আটক করে মেজিস্ট্রেটের কোর্টে চালান করে। এই নিয়ে চলে যথেচ্ছা রাজনীতি, বিকৃত সামাজিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। লেখকের দৃষ্টি কাড়ে ওই ঘটনা। অপদস্থ মেয়েদু’টির অনুকূলে লেখক এই গল্পটি লেখেন। উল্লেখ্য, তখনো জুডিশিয়ারি ও নির্বাহী বিভাগ পৃথক হয়নি।)

দারোগার চোখমুখে বিরক্তি। ওসি সাহেবের কক্ষে প্রবেশ করে বলল, স্যার, এই বদ মেয়ে দুইটারে এক গারদে রাখা যাবে না।

ওসি মুখটা ভার করে আছেন। কিন্তু চোখের কোণে উৎসাহের ছাপ। মনে হচ্ছে মেয়ে দুটোর ঘটনা নিয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ।  বললেন, কেন, এক গারদে সমস্যা কী?

খুবই বজ্জাত টাইপের মেয়ে স্যার! কেলেঙ্কারির ঘটনায় একটা মেয়ে আর ছেলেকে যেমুন আলাদা রাখি, এই দুইটারেও তো তাই করা দরকার। বোঝেন স্যার, কত বড় বজ্জাত অইলে  মেয়েতে মেয়েতে  দেহের সম্পর্ক বানায়! যে কোনো সময় আবার নিজেদের মধ্যে চুমাচুমি শুরু করবে!

একটুখানি থেমে দারোগা বলল, একজন আরেকজনের ঠোটের উপর চুমা খাবে স্যার, দীর্ঘ চুমা!

ওসি সাহেবের চোখ ক্ষণিকের জন্য জ্বলজ্বল করে উঠল। একবার ছোট করে ঢোক গিললেন।  তারপর ডান হাত উপরে তুলে হাতের আঙুলগুলো বাকিয়ে বললেন, তাতে কিছুই হবে না! ছেলেও হবে না, মেয়েও হবে না!

কিন্তু ভয়ানক একটা দৃশ্য হবে স্যার!  একটা ছেলে আর একটা মেয়ের চুমাচুমি দেখলে আমাগো মাথায় প্রেসার উইঠা যায়। আর মেয়েতে মেয়েতে চুমা দেখলে সেন্ট্রির চোখ মাটিত পইরা টেনিস বলের মত লাফাবে স্যার!

এই লেখাটির অডিও শুনুন এখানে:

ওসি মাথা দোলাতে দোলাতে একটু চিন্তা করলেন। তারপর বললেন,এক কাজ করেন, দুইটাকে দুই গারদে রাখেন আপাতত। রেহানা আর সাবিনারে ডিউটিতে দেন।

দুইটারে দুই গারদে রাখা সম্ভব না স্যার। অন্য গারদটায় একটা মাদকের আসামী আছে।

তাহলে তো সমস্যা। এবার ওসি চেয়ারে পেছন দিকে হেলান দিয়ে ঢুলতে ঢুলতে বললেন, কেমন সমস্যা জানেন? সেই বাঘ, ছাগল আর পানের গল্প শুনেছেন না, নদী পার করার গল্প?

এই গল্প শোনার ব্যাপারে দারোগাকে খুব আগ্রহী মনে হল না। তাকে খুবই সিরিয়াস দেখা গেল। বলল, এক কাজ করি স্যার। সন্ধ্যা থিকা সারা রাইত গারদের সামনে একজন সেন্ট্রি বসায় রাখি। ও সামনে বইসা ড্যাব ড্যাব কইরা তাকাইয়া থাকপে। ওরা কোনো সুযোগ পাবে না।

ওসির কাছে বুদ্ধিটা মন্দ মনে হল না। বললেন, তাই করেন।  আইডিয়া খারাপ না।

টুম্পা আর নিপা গারদের ভেতরে  ফ্লোরে বসে আছে। নোংরা ফ্লোর। কিন্তু করার কিছু নাই। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায়। মাথার উপর হলুদ একটা বাল্ব জ্বলছে। গারদের লোহার শিকগুলোর ওপাশেই এক সেন্ট্রি বসে আছে। পিট পিট করে তাকাচ্ছে। চোখে চোখ পড়লেই  মেরুদন্ড সোজা করে চোখ দুটো রাগি রাগি করে তুলছে। পুলিশ সেন্ট্রির মুখে দাড়ি। মধ্য বয়স্ক। বুকের উপর লেখা গিয়াস। তার মুখ-চোখের ভাষা বলছে, মাইয়া দুইটার মধ্যে লজ্জা, ভয় কিছু নাই! একবার সে নিপার পুরো শরীর দেখছে, তারপর টুম্পার।

টুম্পার চোখে মুখে দুঃশ্চিন্তা দেখা গেল। বলল, দুটি মেয়ের মধ্যে কী সম্পর্ক তা নিয়ে পুলিশের মাথাব্যথা কী বলতো?  দেশে কি কোনো আইন আছে যে দুটো মেয়ে একসঙ্গে থাকতে পারবে না!

নিপা বলল, শুনিস নাই, উপরের নির্দেশ।

টুম্পা এবার বিরক্ত গলায় বলল, উপরওয়ালাদের আর কোনো কাজ নাই? ওদের কাজ কি শুধু মানুষের দেহের দিকে তাকিয়ে থাকা?

নিপা বলল, ওরা আসলে দেহস্বর্বস্ব। ভুলক্রমে ওদের নাম হয় ওপরওয়ালা।

টুম্পা চোখে মুখে দুঃশ্চিন্তা নিয়ে বলল, কী হবে নিপা!

নিপা স্বাভাবিক গলায় বলল, দেখা যাক। পুলিশরাও একটু ঝামেলায় পড়েছে। এমন কেস তো প্রতিদিন আসে না। দেখিস না, আমাদের গ্রেফতারের আগে কেমন গবেষণা করল।

নিপা এবার সেন্ট্রির দিকে তাকাল। বলল, এই যে গিয়াস ভাই, কয়টা বাজে?

গিয়াস বলল, রাত দুইটা চল্লিশ।

আপনি একটু ঘুরে আসেন।

গিয়াস বলল, ক্যান?

আমরা এখন চুমা খাবো।

কী!

শোনেন নাই? এখন আমরা চুমাচুমি করবো।

সেন্ট্রি গিয়াস যেন গলে পড়ল। মুচকি হেসে নিচু স্বরে বলল, খান, বড় কইরা চুমা খান!

আপনি ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে থাকবেন আর আমরা চুমা খাবো, এটা হয় বলেন?

পারমিশান নাই! আমার অন্যদিকে ঘোরার পারমিশান নাই। ড্যাপ ড্যাপ কইরা তাকায় থাকার অর্ডার। খান আপা!

নিপা ছোট্ট করে টুম্পাকে চুমা দিল। সাথে সাথে গিয়াস নড়ে চড়ে উঠল। নার্ভাস হলে পুলিশ নিজের বন্দুকটায় হাত দেয়। পুলিশের পরিক্ষীত স্বভাব। সে বন্দুকটা আলতো করে ছুঁয়ে বলল, আপা বড় কইরা চুমা খান!

নিপা আর টুম্পা দুজনই পুলিশের দিকে তাকিয়ে থাকল।

গিয়াস বিনয়ের সঙ্গে বলল, একটা কোয়েশ্চন আইছে মনে, জিগাই?

নিপা বলল, জিজ্ঞেস করুন। মধ্যবয়স্ক পুলিশ শরীর মোচড়াতে মোচড়াতে বলল, মাইয়ায় মাইয়ায় আপনেরা ক্যামনে কামডা সারেন, আফা?

নিপা প্রায় সাথে সাথে বলল, আপনি মাদ্রাসায় পড়তেন না?

গিয়াস ভড়কে গেল। বলল, জ্বে। আপনি জানলেন ক্যামনে?

নিপা গিয়াসের কথার উত্তর না দিয়ে বলল, পাশের সিটের অল্প বয়সী ছেলেটাকে যেভাবে সেরেছেন, ঠিক সেইভাবে।

গিয়াস লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল,  তোগো মত মাইয়াগো কুত্তা দিয়া …নো দরকার।

আপনি হলফ করে বলেন তো, মাদ্রাসায় কামডা করেন নাই?

ভয়ানক ক্ষিপ্ত  গিয়াস পুলিশ ডিউটি দারোগার রুমের দিকে ফিরে উচ্চস্বরে বলল, স্যার আমি এইখানে ডিউটি করতে পারবো না!

ডিউটি দারোগা ছুটে এলো। গিয়াসের দিকে তাকিয়ে বলল, কী সমস্যা? কী হইছে?

এরা স্যার আমার সামনে কাপড়-চোপড় খুলতে শুরু করছে। আমি তো স্যার শুধু পুলিশ না। আমার একটা ইজ্জত আছে! একজন মুসলমানের সন্তান হইয়া এই দৃশ্য দেখা সম্ভব?

নিপা আর টুম্পা একে অপরের দিকে তাকালো।  দারোগা ওদের দিকে ফিরে বলল, সকাল হইলেই কোর্টে চালান দেওয়া হবে। জামিনে মুক্ত হইয়া যা খুশি কইরো। থানার গারোদটা নোংরা কইরো না, বুঝলা!

নিপা দারোগার দিকে তাকিয়ে বলল, ঘন্টা দুয়েক আগে দেখলাম ১৬-১৭ বছর বয়সের একটি ছেলেকে পেটাতে শুরু করলেন। ওর বাবার সামনে। তারপর ওর বাবা পকেট থেকে দুই হাজার টাকা বের করে আপনার হাতে মুঠ করে দিল। অবলিলায় সেটা পকেটে পুরে রাখলেন। তারপর সন্তানের মত করে আদর করলেন। দুই হাজার টাকা দামের আদর। এর চেয়ে বেশি গারদ নোংরা করা কী সম্ভব?

এই মাগী, চুপ!

নিপা আর টুম্পাকে সকালে কোর্টে চালান দেওয়া হল। ওদের কারো বাড়ি থেকে বাবা-মা কেউ আসেনি। শুধু টুম্পার আব্বা উকিল পাঠিয়েছেন।  উকিল এসে সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, মেজিস্ট্রেট মেহরাব হোসেন প্রগতিশীল মানুষ। অসুবিধা হবে না। কিন্তু এডিএম এর কোর্টে পড়লে ভয় আছে। সিলেটের লোক। সাংঘাতিক গোড়া। জামিন দেওয়ার সম্ভাবনা কম।

টুম্পা বিস্মিত কন্ঠে বলল, বিষয়টি তো আইনের। ব্যক্তি বিশেষের পছন্দে কি জামিন নির্ভর করে?

বৃদ্ধ উকিল মাথা দুলিয়ে বললেন, করে। আইন তো ব্যক্তি দ্বারাই পরিচালিত হয়।

ঘন্টা দুয়েক পর ওদেরকে ডকে তোলা হল। বহু উৎসুক মানুষ এসেছে। কালেক্টরেটের নিচের এই বিচারকক্ষে সব মানুষ তাকিয়ে আছে নিপা আর টুম্পার দিকে।  ড্রাইভার ধরণের একজন ডকের প্রায় সামনে এসে দাড়িয়ে দাঁত বের করে হাসছে। নিপা লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, দাঁত মাজেন না কতদিন?

সঙ্গে সঙ্গে লোকটি মুখ বুজে ফেলল। চারদিকে সবাই গুনগুন করে আলাপ করছে। কী আলাপ কে জানে। দু-একজন দূর থেকে নানা অশ্লীল মন্তব্য করছে। চারদিকে সবার কৌতুহলি চোখ। শুধু একজন গম্ভীর হয়ে এজলাসে বসে আছেন। এডিএম। এসব দেখে টুম্পার বুক ভেঙে কান্না আসছে। নিপা ওর হাতে হাত রেখে বলল, টুম্পা, এটা সভ্য মানুষের জায়গা নয়। একদিন এখানে সভ্যতার আলো জ্বলবে। তুই কাঁদিস না।

মহসীন হাবিব। সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক ও অনুবাদক। ১৯৬৫ সালের ১ এপ্রিল ফরিদপুরের টেপাখোলায় জন্ম। কর্মজীবন: বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক সমকাল, ডেসটিনি ও সর্বশেষ কালের কণ্ঠ-এ কাজ করেছেন সম্পাদকীয় বিভাগে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জীবন নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে লিখেছেন মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস ‘শেকড়ের দাগ’। অনুবাদ...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..