টের পাচ্ছনা

শিখা কর্মকার
কবিতা
Bengali
টের পাচ্ছনা

টের পাচ্ছনা

সারারাত জেগে আছো তুমি
মাথার কাছে খাতা ও কলম
আকাশে বিলম্বিত চাঁদ,
উড়ে আসছে ছেঁড়াখোঁড়া মেঘ,
হাওয়ায় কুয়াসা।

এদিকে উত্তুরে বাতাসের তীব্রতায়
বেঁকে যাচ্ছে পৌষের গমশীষ মাটির দিকেতে।
মৌরি চা বানাচ্ছে কেউ এমন ঘন শীতে,
সুগন্ধে ভরিয়ে দিয়ে সিঁড়ি বারান্দা, ছাদ।
সদ্য ছেঁড়া ঘাসের গন্ধ হরিণ শাবকের দাঁতে;
গায়ে মাখা চোকবেরির সুঘ্রানে মাতাল পাখিরা
কিছুতেই ফিরতে পারছেনা নীড়ের ওমেতে ।

তুমি ভাবছ, আর মগ্ন হচ্ছে পাহাড়ের নির্জনতায়
সন্ন্যাসী পাথর। খয়েরি হয়ে আসা বয়স্ক পাতাগুলি
কথা বলছে ফিসফিসিয়ে খাদ থেকে উড়ে আসা
হালকা নীল জলফড়িঙের সাথে।

শীতের রেণুমাখা ভোর পেরিয়ে তুমি
চলেছ মাঠের দিকে, নাকি নিজের কাছেতে।
ফড়িং, পাথর, মেঘ, ধানশীষ, পাতা ও হরিণ,
সবাই দেখছে তোমার ছড়ানো-ছিটনো জীবনের
ধ্যানমনস্ক নিবিড় সখ্যতা প্রিয় অক্ষরের সাথে।

হাওয়ায় অক্সিজেন হয়ে মিশে থাকা কবিতা এসে
ভরে দিচ্ছে ফুসফুস, দুলিয়ে দিচ্ছে স্নায়ু ও ধমনী,
জেগে উঠছে অনাহতা চক্র। তুমি টের পাচ্ছনা,
আকাশ-ভুবন আচ্ছন্ন করে দেওয়া এত ভালোবাসা ।

কবি

পৃথিবীজুড়ে শস্যের সম্ভার, ভরে আছে মরাই ও ক্ষেত দ্বিধাহীন প্রতিশ্রুতিতে। এই সব গভীর উৎসবের দিনে কবি কোথায় যে গেল? সেকি গেছে পাহাড়ে আবার শুনে নিতে প্রতিধ্বনি ফেলে আসা শব্দ-ঢেউদের? ছুঁয়ে দেখতে সময়ের অ্যালবামে ঝাপসা হতে থাকা মুখ, মায়ের যে কোমল হাত চিবুক ছুঁয়ে ঝরিয়েছে স্নেহ একদিন, তাও ! সে কি গেছে বুক থেকে ঘষে তুলতে জন্মদাগের মত স্থির ভালোবাসা ?
নাকি গেছে লিখে রাখতে একান্ত চিরকুট প্রিয় কবিতা্য়। হিসেববিহীন হয়ে হাঁটতে হাঁটতে পার হয়ে গেছে খাল, বিল, গুহা ও প্রান্তর, দেখেওনি চেয়ে রঙবেরঙের দিনের মত পাতাগুলি, খসে পড়ে সাজাচ্ছে শীতল মাটিকে । তারই মত বোবা যন্ত্রণা বুকে জমিয়ে দিগন্তের দিকে চেয়ে আছে শূন্য গাছগুলি।
মাঝে মাঝে মনে হয় তাকে ফিরিয়ে আনি অভিমানী জতুগৃহ থেকে, সমস্ত ভয় ও সংশয়, অশুদ্ধ ও বিশুদ্ধ মোহ সরিয়ে, সমস্ত বিক্ষোভ মুছে, যত্ন ভরে শুশ্রূষা করি অঙ্কুরের মত।
অতীত ছায়ার মত কাছে আসে, কুচিকাচা পাখীদের গান শোনে চুপ করে বসে। দ্যাখে কাঠবেড়ালির চোখে জ্বলে ওঠা ঋতুর ঝিলিক। ঘাস থেকে ঘাসে, গাছ থেকে গাছে, পাহাড় ও বনে, জেগে থাকে মায়া । প্রত্যাশাহীন কবির গায়ে লেগে থাকে অনন্তকাল ধরে ঝরে যাওয়া সময়ের শিহরন-রেনু।
হৃদয়ের সমস্ত উষ্ণতা ও অভিমান বুকে নিয়ে এমন হেমন্তে, ঝরতে থাকা রঙের প্রহরে, বিদায় না নিয়ে, কবি কোথায় যে গেল!

কোভিড ১৯, ২০০০

শীত আসার আগে সরে গেলে মানুষেরা, বনের গভীর থেকে ফিরে আসে সারসের দল। ওদেরও মিটিং চলে, ওঠা বসা, ওড়াওড়ি, চঞ্চুর আলাপ। সূর্য অস্ত যায় ধীরে, স্তূপীকৃত ঘাসের আড়ালে ।
সরিয়ে রাখি স্কুলের ইয়ারবুক, ছুঁচ-সুতো, রঙিন উলের গোলা, কাঁটা, ক্যানভাস । বাগানে মরচে ধরা কোদাল-কুড়ুলে ভাসে জ্যোৎস্না ও ছায়া। খেলা করে মাঠের গোফার এসে তার চারপাশে। যত বেশি শীত পড়ে, পড়িমরি করে গর্তে ফেরে লাল-শেয়ালেরা। মরে যায় বাতাস আর গিলে খায় দিনটুকু অন্ধকার এসে। খাতা ও কলমের পাশে চায়ের কাপটি বসে থাকে ধৈর্য ধরে। যেন যুগান্তের প্রহরী সে, দেখছে বানান ভুল, অশুদ্ধ সমাস।

তোমার আর্টের খাতায় পার হয় সাগর আজো মোনার্কের ঝাঁক । আগুনের ফুলকি ঘিরে নাচতে থাকে আদিম মানুষেরা । অন্ধকারে বসে থাকলে জানো, তোমার গন্ধ আমি ঠিক টের পাই ।এ ঘরের বীমে, দরজার চতুষ্কোণে, শূন্য সোফায়, জেগে থাকে অভিমান, একাকীত্ব, কথা দিয়ে কথা না রাখার জন্য ভেতর জুড়ে দ্রোহ । কিছু ফটো, বাতাসের খেলনাগুলি, মাছ, ঘুড়ি, ড্রাগন ও প্রজাপতি, রয়ে গেছে নিঃশব্দে কাতর অপেক্ষায় ।

নিউনান শহরে রাতে, সবাই ঘুমিয়ে গেলে, বার করে আনি ম্লান পরীক্ষার খাতা। লজ্জায় মিশতে মাটিতে একশোর চেয়ে যদি এক কমে যেত । অঙ্কে একশো দশ। বানানের ফলাফল ঘোষণার আগেই ভাইরাসে মুছে দিল জীবন তোমার । প্রতিটি খাতায় বসা ঝলমলে স্টিকারগুলি চেয়ে থাকে আলোর দিকে। কিই বা এসে যায় বলো এবছর তুমি যাই পাও। স্ক্রীনের পর্দায় ভাসা ক্লান্ত চোখদুটি জেগে থাকে মনের ভিতরে। আর একবারও কাছে এসে জড়াবেনা গলা, ভাবতেই বুক ফেটে যায় । সারারাত জেগে সর পড়া চা ও আমি, বসে বসে দেখি, হৃদয় মোচড়ানো ব্যথায় ঝরে যাওয়া কান্না তারাদের।

 

মনে পড়ে?

কতকাল ধরে পাথরের মত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছি জানো ? আধখাওয়া চাঁদের মত মনের আকাশ জুড়ে একটা প্রশ্ন নিয়ে শুধুমাত্র জানতে চেয়েছিলাম তোমার এখনো আমাকে মনে পড়ে কিনা। জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম খুব চেনা পদ্মসৌরভ তুমি এখনো পাও কিনা আমি ভিড়ের ভেতরে মিশে থাকলে। আমার মুখের দিকে তাকালে রূপকথারা ভেসে ওঠে কিনা আজো শিশিরের কণায়, পাতা থেকে ঝরে পড়া মুক্তোর রাশিতে। গল্পের গর্ভগৃহে মগ্ন থেকে ভুল করে ছুঁয়ে দিলে আমার আঙ্গুল, আজো ভেসে যায় কিনা স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল একসাথে।

তুমি কি জানো শুধু তোমার চোখের আলোর মুগ্ধতা আমাকে পরম রূপবতী করে তোলে? বিশ্বাস করতে পারো একমাত্র তোমার ভালোবাসা বয়ে আনে নিবিড় স্নিগ্ধতা আমার ধমনীতে? কোনদিন তুমি এসে বসবে বলে, অদেখা ঝর্ণারা বুনে দেয় সবুজ আসন দিক জুড়ে আর তোমার নিরুচ্চারিত মুগ্ধতার একমগ্নতার ভেতরে সময় স্থির হয়ে গেলে, তার ভেতরে আমি দেখতে পাই এক অমোঘ আলো যার আভায় ভরে থাকে চেনা পৃথিবীটা। মনে পড়ে প্রিয় বন্ধু ছিলাম একসময়, ছিলাম আত্মারও অধিক আত্মা? মনে পড়ে ?

 

এসো, ভালোবাসা

অথচ তখন তোমার প্রতি রোমকূপে ফুটে উঠছে
জাদুর ছোঁয়া লাগা মন্ত্রশব্দ, প্রতিটি ঘাস কবিতা হয়ে
দুলছে আহ্লাদে, জলের প্রতিটি তরঙ্গে সুর বাজছে গ্যালাক্সির।

ভালোবাসা এসো, যদি ভরে দিতেই হয় আলোয়,
এসো, এইবেলা। একতিল ফাঁক না রেখে ছড়াও নিজেকে
যতদূর ও যতক্ষণ পারো। এ জীবন স্বাদ পাক সেই অমৃতের ।

শিখা কর্মকার। কবি। জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যে, বর্তমান নিবাস উত্তর আমেরিকার আটলান্টা, জর্জিয়া। পেশায় শিক্ষিকা, নেশায় ফটোগ্রাফার, ও ভালোবাসায় কবিতা। পনেরো বছরের অধিককাল স্বেচ্ছাসেবিকা বিভিন্ন স্কুল ও লাইব্রেরিতে। দশ বছরের অধিক জর্জিয়াতেই সঞ্চালিকা ও মুখপাত্রী একটি বিশিষ্ট...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

প্রতিভাস

প্রতিভাস

স্পষ্টতা অন্ধকারের মতো স্পষ্টতা আলোর মধ্যগগনে নেই। উত্তাপে ঝলসে যাওয়া চোখে শীতলপাটি বিছিয়ে দেয় রাত…..

চিঠি

ক্ষোভ রোদের দোকানি হয়ে, ছুঁয়ে গ্যাছি দূর পরবাস আলোর ক্রেতারা দেখে, শূন্য ঝুলি খালি সর্বনাশ।…..