ডিভোর্স লেটার

নকিব মুকশি
কবিতা
Bengali
ডিভোর্স লেটার

শিশুভরা পাতা

সম্পর্কের মাঠে ‘আবেগঋদ্ধসেতু’— আরবি ঘোড়া— শিশুভরা হৃদয়…
—এখানে প্রেম মজবুত হয়, ফোটে নকশিকাঁথা— রসের লতাপাতা…

বাতাসের তাগিদে চলে পালতোলা নাও— বাগানের ওড়না—সুরভি…
—এখানে প্রেম মজবুত হয়, গানের আকারে ফেটে পড়ে হরিণী—বৃষ্টি…

কবিদের বিষুবপ্রদেশে নেমে আসে বনের বেয়াড়া পাখির ঢল— হাওয়া…
—এখানে নেই পাণিনি, মাবুদের শাসন, গরাদের ছায়া—মাছের ঝিল…

নিবুনিবু চোখের আজানে ভাসমান সমস্ত দিনের কুচিকুচি ছায়াফ্রেম…
—এখানের আকাশ হয়ে যায় হাইজ্যাক সমস্ত অপারগতা নিয়ে কলবে…

পাতাগুলো হলুদ হওয়ার আগেই চুইয়ে পড়ে কারো খেতাব গ্রিজে…
—এখানে ঢেউগুলোর গন্তব্য কুয়োর তীর, বাড়ির আঙিনা ও মহল্লা…

মেয়েদের তেজপাতার রঙ ফোটার দিনে জোড়া পাখি বাজায় ঘণ্টি…
—এখানে অভিশপ্ত গোলাকার আয়ু নিয়ে আসার আয়োজন চূড়ান্ত…

শিশুভরা আকাশগুলো ধীরে ধীরে হলুদের সহযাত্রী হয়ে ঘুমাতে নামে…
—এখানে সূর্যাস্তের তাগা ছিঁড়তে চেয়েও আরো জড়িয়ে পড়ে হায়াত…

 

ষোলভরা মহল্লা

মানুষের মন কত বড় ডানা নিয়ে উড়তে পারে?
—শিখরের চেয়েও উঁচু, আকাশ-পাথারের চেয়েও বিস্তৃত গালিচা—পৃথুল জলবায়ু…

মানুষ কখন স্কেলের মাপ নিয়ে ফুটে ওঠে পৃথুল সংসারে?
—লাল লালসা যখন পায়রা, কালো লালসা যখন ইলিশের রঙ—নদীমুখ—দুধকলি…

কোথায় ‘সতত ডানা’ নিয়ে সারস ও কবুতর পতপত করে ওড়ে?
—সুড়সুড়িভরা সিনেমাপাড়া—ষোলভরা মহল্লা—কোকিলভরা গুনগুন বাগিচায়…

কোথায়, কেবল কোথায় ‘কলঙ্ক’ নামের বেহুদা ডানা উড়ে বেড়ায়?
—না পশু, ফুল, না মাঠের ফসলে, কেবল মানুষেই উড়ে বেড়ায়—বিধবা পোয়াতি…

টিউমার ফেটে গেলে কী হয়?
—ঢেউ উল্টে তীরগুলো ছড়িয়ে পড়ে জলে ঢিল ছোড়ার ভঙ্গিমা—কালা গন্ধের ব্যাপন…

মানুষ ওলটালে কী দেখা যায়?
—কতগুলো দাঁত, জিহ্বা ও রক্ত‑শরবতের পেয়ালা—কতগুলো বাচ্চা কৃষ্ণগহ্বর…

মরা মাছের চোখের লাহান কখন পিতার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়?
—রক্তের অভিধানে যখন নিজের রাজহাঁসের সামান্য পালক ঝরে যায় হাওয়ায়…

 

 

চারুকলা অনুষদ

গাউন, তামাক, ফলদ বাগান—এসো, আমি রান্নায় চড়ব সমস্ত শতকের ওপারে…
পিপীলিকার বাচ্চা, আকাশের বোতাম, রাত্রিপোশাক—এসো, বসো, খাও গাব-শাঁস…
এখানে জমে উঠছে—
দেশজ ইঁদুর—মাটির জোঁক—শয়তানের শুশ্রূষা খেয়ে ফেলতে চায় হায়াতের মাহুত…

বাঁকিয়ে দাও জয়ন্তী নদীর হাঙর, গাড়লের কণ্ঠ, বিধবার শোক…তুলে ফেল শজারু…
বিস্মরণ-শিশুকাল বেয়ে নেমে আসে যে মুখে তার জ্বলজ্বল করছে গুহা ও গন্ধম…
এখানে ফুটে আছে—
ভূপাতিত কাফেলা—বাগানের ঘ্রাণ—এজমালি ফসলের খেত—শিরস্ত্রাণের আয়ু…

জুনের পেহেলগামে যে ভেড়ার লোম পেঁজা মেঘের লাহান প্রেম ছড়ায় ভূ‑নকশায়…
তার পাশেই জেগে আছে ঘোড়ার জিন—সমূহ রৌশন—ব্যথার পর যেমন সেবাশ্রী…
এখানে জমে আছে—
সারি সারি পাইনছায়া, ইলিশের রঙভরা ঝরনা—পুরুষের বীর্য—টিকটিকির রক্ত…

বেতাব ভ্যালির পথের নমুনায় যে নারী গভীর রাতের বনে এঁকেবেঁকে জেগে ওঠে
তার প্যাঁচানোর তামাম ভঙ্গিমায় জলের মাছের ঘুম ভাঙে, দেখি চোখে লোনা গন্ধ…
এখানে গলে যায়—
বরফের চন্দনবাড়ি—নবীদের হৃদয়—মাতৃস্তনের দুধ ছড়িয়ে পড়ে পাথরের ওপর…

নামজাদা বৈঠকখানায় নেমে পড়ে মানচিত্রের সমূহ সৌরভ, গুলমার্গ টাইপ ডানা…
পৃথিবীতে পশুর হৃদয়ে যে ধর্ম থাকে তার পাশেও পাই কদমকেশর—প্রকৃতিচুল…
এখানে নেমে আসে—
মক্ষিকার অভিধান, জলের রেওয়াজ, খগোল-খিড়কি—বাগানের মিনারশ্রী—টানেল…

রাষ্ট্র যখন লাল চক দিয়ে দাগ কেটে বেওয়ারিশ করে জিরাফ ও বিড়ালের লাশ
তখন মাবুদের গান বেঁকে যায় অন্য পাড়ে যেখানে না-দেখার ভান জমাট বাঁধে…
এখানে ফুলে ওঠে—
তিমির ভূগোল, জারজ দরিয়া, দাঁতের মাস্তুল—সর্বভুক—আহাম্মক চেইন স্মোকার…

পর্দার আবছা আলোয় যে মাসুম চেহারায় পৃথিবীর পৃথুল মিউজিক ও সুরভিরশ্মি
সেই সব ক্লিনিক দিয়ে মানুষের হৃদয়ে ভ্যাকসিন তখন জানালায় কাননকুসুম রটে…
এখানে গন্ধেন্দ্রিয়ে পাই—
পূরবীর মাতৃদুধ—অপার দরিয়া—নবীদের রহম—বাতাসের প্রেম—বৃষ্টিধারা…

একদিন তুষার-ওড়নায় ঢেকে যায় ছবিরানিদের অটোগ্রাফের মূল সারস ও কণ্ঠ…
যেখানে সমূহ বিধবা রোদে শুকায় শুঁটকি মাছের লাহান থমথমে আবহাওয়ার ছাদে…
এখানে নেমে দেখি—
সাক্ষীসাবুদ এই গন্ধমৃগের জলসা, বেনার ভাষাসরোবর, ডাহুকাজান—পরপুরুষ…

ইন্টারমিডিয়েটপ্রেমে জুলাইয়ের বন্যার তোড়ে প্লাবিত আমাদের সমস্ত তীর ও বন,
জঙ্ঘা বেয়ে ওঠে তখন বিপুল মাছের গন্ধ—মধ্যরাতের ঢেউ—ফুলেফেঁপে কুসুমবান…
এখানে গমগম করে—
মর্বিড ঘুম, পাতলা রাত, ঝুলবারান্দার টগর—চারুকলা অনুষদ—কেউ হৃদয়ে পোষে…

তরমুজের লাল নিয়ে যখন সূর্যাস্ত পেকে ওঠে তার পাশে অজস্র করুণ চোখের সারি
পিলপিল করে ছেয়ে যায় আবহাওয়ার সপ্তস্তর ক্ষতবিক্ষত প্রেমিকের হৃদয়ের আবিরে…
এখানে জড়ো হয়—
বৃষ্টির হাউমাউ বিপুল এলিজি—বাঁশপাতার খুনখুন কান্না—পেট্রলপাম্পের ক্ষুধা…

রাতভর হারিকেনের চিমনিজুড়ে যে টিমটিমে আলো খেলা করল কালো হাওয়ায়
আমার মায়ের মুখও তেমন ব্ল্যাকবোর্ডের পেটে টিমটিম করা বাতি—রাতের মাস্তুল…
এখানে তকতক করে—
মাছের বিচূর্ণ চোখের সমাবেশ—পাঁজা পাঁজা সাবুর দানার চোখমারা—উষাবালাসমূহ…

সন্ধ্যারাগে মাঝে মাঝে ধুলায় ডোবে কোঁকড়া চুলের লাহান গাঁয়ের পথে বাইসাইক্লিস্ট…
ধুয়ে কি দেওয়া যায় কাছারি শিক্ষা—আঁতুড় মানচিত্রের পাঠ—শিশুভূগোলের গ্রাফবুক?
এখানে লেগে আছে—
বেদের পায়ের পিলপিল—ফড়িংয়ের তড়িংবিড়িং—সুঠাম গাছের কাঁপা কাঁপা লটকন…

অবকাশে গুমরে ওঠে ফাঁকা মাঠ, নদীর তীর শুকিয়ে চৌচির, শ্মশান গ্রস্ত কাজুবাদাম…
ঘোড়ানিমের ফুলের আকার নিয়ে যে পৃথিবী ঘূর্ণমান তার পিঠের দাঁড়া চাবায় মানুষ…
এখানে কিলবিল করে—
(ঠোঁট ও দাঁত)—(জরায়ু ও পিস্টন)— (মাটি ও পাথর)—(হাঁস ও শিয়াল)—ক্ষয়িষ্ণু…

লটকনের উর্বর ভূমি যে কলরোলের ভঙ্গিমায় নিজেতে ফোটায় ফিডার ও কনসার্ট
সেখানেও বয়ে যায় নয়নজুলি বিশ্রুত অন্ধকারের তেপান্তরে নীরস অসুরবিথারে…
এখানে ছলছল করে—
অরণ্যের কাওলি, নির্জনে পড়ে থাকা গাজরের হ্রদ ও বেনামি কবিতার দোয়াতকালি…

 

ডিভোর্স লেটার

লাল চোখের নোটিশবোর্ড—পরিত্যক্ত এক বাড়ির মুখ…
যেখানে সাপেদের শ্বাসঘন সুলুম পড়ে আছে, পড়ে আছে
যৌথ নামের স্বাক্ষর, গিটারের ছেঁড়া তার, মধ্যরাতের সুর…

 

বোরকা

এই যে বোরকা—এর নিচেও হয়তো জমে আছে
কোনো এক ঝকমকে চাঁদের আভা, পড়ে আছে
সজ্জিত বাগান—ফুল্লমনয়…

তিলের লাহান উদার নয়
হয়তো তাই, এই গড়—আশ্রম—মুখোশ ছলনার…!

নকিব মুকশি। কবি। জন্ম ও নিবাস বাংলাদেশের শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাটে। পড়ালেখা করেছেন জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। তিনি সাহিত্যের ছোট কাগজ 'চাতর' এর সম্পাদক। প্রকাশিত বই: ‘প্রতিশিসে অর্ধজিরাফ’ (কাব্যগ্রন্থ, ২০১৯)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ