তিনটি আমেরিকান কবিতায় কোভিড-১৯ এর অনুভব

এইচ বি রিতা
অনুবাদ
Bengali
তিনটি আমেরিকান কবিতায় কোভিড-১৯ এর অনুভব

ভূমিকাঃ কোভিড-১৯ বিশ্ববাসীকে নানান অভিজ্ঞতায় প্লাবিত করেছে। কেউ নিজে আক্রান্ত হয়েছেন। কেউ স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশীহারিয়েছেন। এ সময়ে মানুষ যন্ত্রণা, বেদনা, শোক, বিচ্ছেদ, একাকিত্ব, হতাশা, উদ্বেগ, সাইরেনের শব্দে অনিশ্চিত ভবিষ্যত, ভেন্টিলেটর থেকে ফিরে আসা বিস্ময়কর স্মৃতি, জীবনকে ভাবার ভিন্ন চেতনা, অবারিত সেবা, নৈঃশব্দ, অনিশ্চয়তা, নানান ভিন্নঅভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। আমেরিকার অনেক কবিরাই এই সমযকে ধরে রেখেছেন তাঁদের কলমের আঁচড়ে। আবারআমেরিকার অনেক পুরোনো কবিদের কবিতাতেও খুঁজে পাওয়া যায় বর্তমান দৃশ্যপট- বাস্তবতার কঠিন চিত্র। এমনই তিনটিকবিতা প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য জার্নাল অফ আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন’ এর একটি জার্নালে। এই তিন কবি হলেন-এলিজাবেথ বিশপ(১৯১১-১৯৭৯), মেরিলিন চিন(১৯৫৫) এবং এডওয়ার্ড হার্শ(১৯৫০)। জামা জার্নালে মুদ্রিত কবিতা তিনটিনির্বাচন করেছেন চিকিৎসক এবং কবি ডাঃ. রাফায়েল ক্যাম্পো এবং সাহিত্যের অধ্যাপক এলিসা নিউ।

 

ডাঃ. রাফায়েল ক্যাম্পো(১৯৬৮) হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল এবং বোস্টনের বেথ ইসরায়েল ডিকোনেস মেডিকেল সেন্টারে মেডিসিনশিক্ষা দেন এবং অনুশীলন করেন। এলিসা নিউ(১৯৫৮) হলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আমেরিকান লিটারেচারের প্রফেসর।তাদের নির্বাচিত কবিতা তিনটি হল-

‘ওয়ান আর্ট’ বাই এলিজাবেথ বিশপ

‘হসপিটাল ইন অরেগান’ বাই মেরিলিন চিন

‘হুয়্যাট দ্য লাষ্ট ইভিনিং উইল বি লাইক’ বাই এডওয়ার্ড হার্শ।

 

কবিতা তিনটি পড়ে আমি অভিভূত হয়েছি। বর্তমান মহামারীকালে আমরা বিশ্বব্যাপী যে ভয়ংকর মৃত্যু, যন্ত্রণা, শোক এবং ধসদেখছি, তার একটি যোগসূত্রও এই কবিতা তিনটিতে খুঁজে পাওয়া যায়।

কবিতা তিনটি কোভিড-১৯ সময়কালের সাথে মিলে যাওয়া সেরা স্বার্থক কবিতা বলে আমার মনে হয়েছে। তাই কবিতা তিনটি ভাবানুবাদ করার আগ্রহ জেগেছে। আশাকরি পাঠককুল ও কবিতাগুলোতে নিজেদের কিছু ধারণা চিত্র খুঁজে পাবেন।

 

 

মূল ইংরেজি কবিতাটি হলঃ ‘One Art’ by Elizabeth Bishop

 

The art of losing isn’t hard to master;

so many things seem filled with the intent

to be lost that their loss is no disaster.

 

Lose something every day. Accept the fluster

of lost door keys, the hour badly spent.

The art of losing isn’t hard to master.

 

Then practice losing farther, losing faster:

places, and names, and where it was you meant

to travel. None of these will bring disaster.

 

I lost my mother’s watch. And look! my last, or

next-to-last, of three loved houses went.

The art of losing isn’t hard to master.

 

I lost two cities, lovely ones. And, vaster,

some realms I owned, two rivers, a continent.

I miss them, but it wasn’t a disaster.

 

—Even losing you (the joking voice, a gesture

I love) I shan’t have lied. It’s evident

the art of losing’s not too hard to master

though it may look like (Write it!) like disaster.

 

 

ভাবানুবাদ 

 

হারানোর শিল্প আয়ত্ত করা কঠিন নয়

হারানোর অনেক কিছুই উদ্দেশেপূর্ণ থাকে;

যা কোন দুর্যোগও নয়।

 

প্রতিদিন কিছু না কিছু হারাতে হবে

দরজার চাবিটি হারাতে প্রস্তুত থাকতে হবে

সময়টা খারাপ যাচ্ছে

তবে, হারানোর শিল্প আয়ত্ত করা কঠিন নয়।

 

তারপর,

আরও কিছু হারানোর অভ্যাস করতে হবে

স্থান, নাম, এবং গন্তব্য

সব খুব দ্রুত হারাচ্ছে

এর কোনোটাই বিপর্যয় ডেকে আনবে না।

 

আমি আমার মায়ের ঘড়িটি হারিয়ে ফেলেছি

এবং দেখো!

আমার শেষ অথবা

পরবর্তি শেষের তিনটি প্রিয় ভালবাসাও

কিন্তু, হারানোর শিল্প আয়ত্ত করা কঠিন নয়।

 

আমি দুটি শহর হারিয়েছি

শহরগুলো সুন্দর ছিল

আমার উৎপাদনশীলতা, মালিকানাধীন কিছু অঞ্চল

দুটি নদী, একটি মহাদেশ

সব হারিযে ফেলেছি

আমি তাদের অনুভব করছি

কিন্তু এটি কোন দুর্যোগ ছিল না।

 

এমনকি তোমাকে হারালেও,

আমি মিথ্যা বলছি না, এটা স্পষ্ট

যদিও এটা দুর্যোগের মতো দেখাবে

তবে, হারানোর শিল্প আয়ত্ত করা খুব কঠিন নয়।

 

 

বিশ্লেষণঃ কোভিড-১৯ এর প্রথম বছর ও বর্তমানে চারদিকে ঘটে যাওয়া মৃত্যু ও ক্ষতির সাথে “ওয়ান আর্ট” কবিতাটি আমাদেরসময়ের জন্য উপযুক্ত বলে মনে হয়। হারানোর শিল্প আয়ত্ত করা কঠিন নয়-বাক্যটি দিয়ে শুরু করা কবিতাটি সম্মানিতআমেরিকান কবি এলিজাবেথ বিশপের সবচেয়ে বিখ্যাত একটি কবিতা। ১৯৭০ এর দশকে লেখা কবিতাটি কবির জীবনকালেরক্ষতি এবং মদ্যপানের সাথে তার সংগ্রামের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

এখানে বিশপ ‘হারানো’কে একটি শিল্প রূপে রূপান্তরিত করেছেন এবং অনুসন্ধান করেছেন কীভাবে এই দক্ষতাকে আয়ত্ত করেআমরা ক্ষতির যন্ত্রণা থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারি। এলিজাবেথ বিশপ আট মাস বয়সে তার বাবাকে হারিয়েছিলেন এবংতার মা মানসিক অসুস্থতায় মারা যান। এরপরে তিনি তার প্রেমিককে আত্মহত্যার জন্য হারিয়েছিলেন। অতএব, আমরা এইকবিতাটিকে আত্মজীবনীমূলক কবিতা হিসেবে বিবেচচনায় আনতে পারি।

বিশপ কবিতাটিতে সম্ভবত বলতে চেয়েছেন যে, ক্ষতি মানুষের অবস্থার একটি অংশ। আমরা ক্রমাগত গুরুত্বপূর্ণ এবং তুচ্ছ বিষয়উভয়ই স্বজনদের হারাই এবং এটাকে জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসাবে গ্রহণ করা উচিত। এমনকি এই অনুশীলনটিআমাদের প্রত্যকের আয়ত্ত করা দরকার যাতে আমরা যে কোন বিপর্যয়ের মুখোমূখী দাঁড়াতে পারি।

 

 

 

মূল ইংরেজি কবিতাটি হলঃ ‘Hospital in Oregon’ by Marilyn Chin

 

Shhh, my grandmother is sleeping,

They doped her up with morphine for her last hours.

Her eyes are black and vacant like a deer’s.

She says she hears my grandfather calling.

A deerfly enters through a tear in the screen,

Must’ve escaped from those there sickly Douglas firs.

Flits from ankle to elbow, then lands on her ear.

Together, they listen to the ancient valley.

 

 

 

ভাবানুবাদ

 

চুপ চুপ!

আমার দাদী ঘুমাচ্ছেন

শেষ মুহূর্তটার জন্য তাঁকে মরফিন দিয়ে রাখা হয়েছে

তার চোখ দুটি কালো এবং হরিণের মত শূন্য

তিনি বলছেন,

তিনি আমার দাদার ডাক শুনতে পাচ্ছেন।

চোখের জলের মধ্য দিয়ে একটি মাছি

দৃশ্যপটে প্রবেশ করেছে

অসুস্থ্য শঙ্কু প্রজাতি থেকে এটি নিশ্চয়ই

পালিয়ে এসেছে

গোড়ালি থেকে কনুই পর্যন্ত

তারপর, পোকাটি তাঁর কান পর্যন্ত পৌঁছেছে

এখন একসাথে তারা প্রাচীন উপত্যকার কথা শুনছে।

 

 

 

বিশ্লেষণ-পুরস্কারপ্রাপ্ত এসিয়ান-আমেরিকান কবি ও লেখক মেরিলিন চিন তার ‘হসপিটাল ইন অরিগান’ কবিতায় একজন মুমূর্ষুরোগীর অভ্যন্তরীণ প্রলাপ-উপলদ্ধির সাথে ক্লিনিকাল বাস্তবতার দূরত্বের কথা বলতে চেয়েছেন।

আমাদের অত্যাধুনিক যত্নব্যবস্থার পরেও স্বাস্থ্যসেবীদের উপস্থিতে এমনকি নাতনী-কবির চেয়েও জীবনের শেষ মুহূর্তে মাছিটি তারঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেছিল। এই কবিতাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রেও রোগীদের সাথে থাকা একটি সহজরুপেযত্ন হতে পারে। মাছির সাথে দাদীমার অন্তর্নিহিত গুঞ্জন অন্যান্য ভাষা, সময়, ইতিহাস এবং সংস্কৃতির শব্দকে উদ্দীপিত করে যাস্বাস্থ্যসেবীদের অবশ্যই শুনতে হবে, বুঝতে হবে। অবশেষে, হাসপাতালের কক্ষের এন্টিসেপটিক স্পেসে মাছি লঙ্ঘন হল প্রকৃতিএবং মৃত্যুর বাস্তবতা, স্বাস্থ্যসেবা স্পেসগুলির স্বাস্থ্যকর সুশৃঙ্খলতা নিয়ে বিশ্বের মধ্যে দ্বন্দ্ব, যা এখন অবিরাম হাত ধোয়া এবংকঠোর পিপিই প্রোটোকল দ্বারা প্রয়োগ করা হচ্ছে। চিকিৎসকরা প্রযুক্তি এবং প্রযুক্তিগত চিন্তাভাবনা দ্বারা রোগীর সাথেযোগাগোগ স্থাপন করেন, কিন্তু রোগীর অন্তরনিহিত অনুভূতি, আবেগ দ্বারা সৃষ্ট শব্দগুলোর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতেপারেন না।

কবিতাটি আজকে অনেক স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, করোনাভাইরাস রোগীদের উপর কঠোর বিচ্ছিন্নতা আরোপ করতে পারে, যেখানে শেষপর্যন্ত করোনা আক্রান্ত একজন রোগী সকল যন্ত্রণা একাই ভোগ করে মারা যান এবং এই রোগীরা তাদের মন দ্বারা যা দেখতেএবং শুনতে পান, তা বন্ধ্যাত্বের বাইরে, হাসপাতালের কোলাহলের বিপরীতে।

 

 

 

মূল ইংরেজি কবিতাটি হলঃ ‘What the Last Evening Will Be Like’ by Edward Hirsch

 

You’re sitting at a small bay window

in an empty café by the sea.

It’s nightfall, and the owner is locking up,

though you’re still hunched over the radiator,

which is slowly losing warmth.

 

Now you’re walking down to the shore

to watch the last blues fading on the waves.

You’ve lived in small houses, tight spaces—

the walls around you kept closing in—

but the sea and the sky were also yours.

 

No one else is around to drink with you

from the watery fog, shadowy depths.

You’re alone with the whirling cosmos.

Goodbye, love, far away, in a warm place.

Night is endless here, silence infinite.

 

 

 

ভাবানুবাদ 

 

সমুদ্রের কাছে একটি খালি ক্যাফেতে

একটি ছোট উপসাগরের জানালায় আপনি বসে আছেন

রাত হয়ে গেছে

তাই মালিক ক্যাফেটি বন্ধ করে দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন

কিন্তু আপনি এখনও রশ্মিবিকিরণকর ধরে আছেন;

যা ধীরে ধীরে উষ্ণতা হারাচ্ছে।

 

তরঙ্গের উপর ম্লান হয়ে যাওয়া নীল দেখতে

এখন আপনি তীরে হাঁটছেন।

আপনি একটি ছোট বাড়িতে বদ্ধ জায়গায় ছিলেন

যেখানে আপনার চারপাশের দেয়ালগুলি বন্ধ থাকত

তবে সমুদ্র এবং আকাশটি কিন্তু আপনারই ছিল।

 

জলীয় কুয়াশা, ছায়াময় গভীরতা থেকে কিছু পান করতে,

আপনার সাথে কেউ নেই

আপনি ঘূর্ণায়মান মহাবিশ্বের সাথে একা লড়ছেন

দূরে একটি উষ্ণ জায়গায় যেতে বিদায় আপনাকে

সাথে ভালবাসা

এখানে রাত অনন্ত, নিরবতা অসীম।

 

 

বিশ্লেষণ-‘কবি এডওয়ার্ড হার্শ এর ‘হুয়্যাট দ্য লাষ্ট ইভিনিং উইল বি লাইক’ কবিতাটিতে ‘ক্যাফেতে বসে থাকা বলতে’ কোয়ারেন্টাইনে থাকাকে বুঝে নিতে পারি আমরা যেখানে মালিক ক্যাফেটি বন্ধ করে দিতে চাচ্ছেন, কিন্তু ব্যক্তি তখনো রশ্মিবিকিরণ ধরে আছেন যা উষ্ণতা হারাচ্ছে, অর্থাৎ এখানে মালিক বলতে ঈশ্বরের প্রতিকীকরণ দেকতে পাই আমরা যেখানে ব্যক্তিটিতার শেষ সময়কালেও আশা ধরে আছেন। ছোট্ট রেডিয়েটর, যা একজন চিকিৎসকের দৃষ্টিকোণে ভেন্টিলেটরকে উদ্দীপিত করে, যা ব্যক্তিটির পুনরুজ্জীবনের ক্ষমতা হারাচ্ছে।

কবিতাটিতে রুপকের বেশ সমাহার! উত্তাপে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা রঙ এবং আলোর সাথে কবি ও দর্শনার্থী সন্ধ্যার সময় সমুদ্রের তীরেশেষ হয়ে যাওয়া নীল দেখতে হাঁটছেন। এখানে ‘নীল’ হতে পারে রং, শব্দ, কষ্ট বা রাগ। ঘূর্ণায়মান মহাবিশ্বের সাথে লড়ছেন তিনিএকা অর্থাৎ কোভিড-১৯ মানুষকে একাই লড়াই করতে শিখায়।

এইচ বি রিতা। কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক। জন্ম বাংলাদেশের নরসিংদী জেলায়। বর্তমান নিবাস কুইন্স, নিউইয়র্ক। তিনি নিউইয়র্ক সিটি পাবলিক স্কুল শিক্ষকতায় জড়িত রয়েছেন দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে। পাশাপাশি কাজ করছেন দৈনিক প্রথম আলোর উত্তর আমেরিকা ভার্সনে। এছাড়াও নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

প্যাটাক্যুয়রিক্যাল নাইটশোয়ে আপনাকে স্বাগতম (পঞ্চম পর্ব )

প্যাটাক্যুয়রিক্যাল নাইটশোয়ে আপনাকে স্বাগতম (পঞ্চম পর্ব )

ইংরেজি ভার্সান এখানে >>> Welcome to the Pataquerical Night Show (Episode-5) পূর্ববর্তী পর্ব এখানে>>> শেষ…..

প্যাটাক্যুয়রিক্যাল নাইটশোয়ে আপনাকে স্বাগতম (৪র্থ পর্ব)

প্যাটাক্যুয়রিক্যাল নাইটশোয়ে আপনাকে স্বাগতম (৪র্থ পর্ব)

ইংরেজি ভার্সান এখানে >>> Welcome to the Pataquerical Night Show (Episode-4) পরবর্তী পর্ব পড়ুন এখানে>>>>…..

প্যাটাক্যুয়রিক্যাল নাইটশোয়ে আপনাকে স্বাগতম (৩য় পর্ব)

প্যাটাক্যুয়রিক্যাল নাইটশোয়ে আপনাকে স্বাগতম (৩য় পর্ব)

ইংরেজি ভার্সান এখানে >>> Welcome to the Pataquerical Night Show পরবর্তী পর্ব এখানে>>>> পূর্ববর্তী পর্ব…..