তিন বন্ধু

সুদেব কুমার বিশ্বাস
গল্প
Bengali
তিন বন্ধু

অফিসে বসে কাজ করছিলাম। কাজ বলতে ঐ লেখার কাজ। দেশের মানুষের কাছে সংবাদ পৌঁছে দিতে হয় আমাদের। কখনও সত্যিটাকে কেটে-ছেঁটে, কখনও আবার খানিকটা রঙ মাখিয়ে জাতির সামনে উপস্থাপন করতে হয়। রোজ রোজ এই ফরমায়েসী রিপোর্ট লিখতে আর ভালো লাগে না। নামেই সাংবাদিক, অনুসন্ধানী রিপোর্টার। আসলে আপাদমস্তক আজ্ঞাবহ কেরানি। যা লিখি, খুব কায়দা করে লিখতে হয়। অনেক মানুষের মন জুগিয়ে লিখতে হয়। নির্ভয়ে সত্যি কথা লেখার কোনো উপায় নেই।

এই মত প্রকাশের স্বাধীনতা উপভোগ করতে করতে বাইরের দিকে তাকালাম। ¯িœগ্ধ আকাশ। একটু আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে। এখন ঝকঝকে রোদ উঠেছে। এখানে পাখিদের আনাগোনাও আছে বেশ। কাজের ফাঁকে এভাবেই একটু জিরিয়ে নিই। হঠাৎ ফোন কেঁপে উঠল। রাসেলের ফোন।

রাসেল আমার খুব কাছের বন্ধু। আমরা একই স্কুলে পড়তাম। আমাদের বাড়িও পাশাপাশি গ্রামেই। ও খুব ভালো ছাত্র ছিল। আমি ছিলাম মোটামুটি মানের। পরে অবশ্য দুজনেই পড়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি ভর্তি হলাম সাংবাদিকতায় আর রাসেল অ্যাকাউন্টিংয়ে। ও তারপর সিএ কমপ্লিট করেছে। এখন একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে খুব ভালো চাকরি করছে। অনেক টাকা বেতন। পেটটাও চলে এসেেেছ আগবাড়িয়ে সামনের দিকে। ওকে নিয়ে গর্ব করি আমরা সবাই। সাফল্যের মাপকাঠিতে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে সফল। বন্ধুদের যে কোনো আলোচনায় রাসেল উদাহরণ হয়ে সামনে চলে আসে। সেই বন্ধুর ফোন অনেকদিন বাদে! তাকে ধরা খুব মুশকিল। ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। আজ দেখছি নিজেই ফোন করেছে।

–    কী রে, কেমন আছিস, রাসেল?

–    এই তো, চলছে রে!

–    এমন করে বলছিস, যেন কষা পায়খানার মতো চলছে। তোর তো উড়ে চলার কথা, শালা!

–    অর্ণব, তোর লেকচার রাখ! বাইরে থেকে অনেক কিছুই মনে হয় তোদের।

–    তো ভেতরে কি সব অন্যরকম?

–    বাদ দে! তোর খবর বল। শালা, ভালোই তো আছিস! জ্ঞান-বুদ্ধির চর্চা নিয়ে আছিস। পত্রিকায় তোর নাম দেখি। ভালোই লাগে।

–    তোর আবার এত নিচে নজর পড়ছে কেন?

–    নিচে মানে?

–    মানে, তুই কোথায় আর আমি কোথায়? আমি যখন পকেটে রিক্সা ভাড়া আছে কি না চেক করি, তুই তখন গাড়ি হাঁকাস।

–    ওসব কিছুই মিন করে না। শোন, বাদ দে ওসব ফাউ কথা। আজ সন্ধ্যায় ব্যস্ততা কেমন?

–    সাধারণ কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতাম, একদম নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। আমার কোটিপতি বন্ধু যখন বলছে, তখন তো বলতেই হয়- আমার হাতে অফুরন্ত সময়। কী করতে হবে, বল না?

–    কিছুই না! চল, কোথাও বসে একটু গল্প করি। আর পারছি না রে! এই শালার চাকরি-ফাকরি আর ভালো লাগছে না।

আজ যথেষ্টই অবাক হলাম রাসেলের কথা শুনে। আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। সমস্যা তো সব আমাদের ঘাড়ের উপরে আশ্রিত, প্রতিপালিত। সমস্যার সাথেই আমাদের সংসার। কিন্তু রাসেলের আবার কী হলো?

সন্ধ্যায় মিলিত হলাম আজিজ সুপার মার্কেটে। রাসেলের পোশাকে যতটা চিকনাই, মুখ ততটাই শুকনো। নিশ্চয়ই কাজের প্রেশার। লাখ লাখ টাকা বেতন তো আর এমনি এমনি দেয় না মাস শেষে।

–    এবার বল, আর কী খবর? তোর ঝা চকচকে কর্পোরেট জীবন কেমন চলছে?

–    চকচকে, না ঘোড়ার ডিম! বাইরে থেকে যতটা রঙিন লাগে, ভেতরে ততটাই অন্ধকার।

–    ইয়ার্কি মারছিস আমার সাথে? শালা, গাড়ি বাড়ি করে ফেলেছিস সেই কবেই। আর আমরা পড়ে আছি দুই রুমের এক ছোট্ট বাসায়। তাও আবার পরের বাসায়। আর ঠেলা খাচ্ছি লোকাল বাসের। পকেটে রিক্সা ভাড়ার সংকট দেখা দিলে চরণ বাবুই ভরসা।

–    তোর গরিব সেজে থাকতে ভালো লাগে, না? জানি, তোর অবস্থা অতটা খারাপ নয়, তবুও তোরাই ভালো আছিস!

–    তাহলে তোর যা আছে দিয়ে দে আমাকে। আর আমারটা নিয়ে নে।

–    সব নিতে পারবি তো?

–    অবশ্যই পারব!

–    টেনশন? স্ট্রেস?

–    তাও পারব! আর তোর সুন্দরী বউ সহ তো?

–    পারবি সামলাতে?

–    খুব কঠিন নাকি সামলানো?

–    আগে সহজই ছিল। এখন অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আর পারছি না, বুঝলি!

–    কোনটা পারছিস না? চাকরি করতে, নাকি বউ সামলাতে?

–    কোনোটাই আর পারছি না সামলে উঠতে। এত চাপ আর নিতে পারছি না।

কথা বলতে বলতেই রাসেলের অফিস থেকে ফোন এলো। আমরা উঠে পড়লাম। ওর গাড়িতে বসেই জরুরী ইমেইল লিখতে শুরু করল। আমি পাশে বসে সব দেখছি। ইমেইল পাঠাতে বসে আরও কয়েকবার কথা বলে নিল মোবাইলে। শালা ইংরেজি বলাটা ভালোই শিখেছে। ওখানেই তো মার খেয়ে গেলাম।

এসির ঠা-া হাওয়া খেতে খেতে গল্প করছি আমরা। এগোচ্ছি আমার অফিসের দিকে। এগোতে আর পারছি কোথায়। রাস্তার যা অবস্থা। তার চেয়েও বেশি বিরক্তিকরভাবে রাসেলের ফোন বাজছে একের পর এক। বললাম, “এক কাজ কর। ফোনটার গলা টিপে ধর। খুব জ্বালাচ্ছে, শালা!”

ও আমার কথা শুনে হো হো করে হাসল কতক্ষণ। তারপর বলল, “এত অল্পেই এই অবস্থা তোর? এটা তো কেবল স্যাম্পল। গোডাউনের খবর তো এখনও পাসনি, বন্ধু!”

আরও অনেক কথাই হলো। রাসেলকে নতুন করে দেখলাম। কথার ফাঁকে একবার প্রবীরের কথা উঠেছিল। রাসেলই তুলল। আমাদের আরেক বন্ধু প্রবীর। ও ছিল আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র। স্কুলের সব ক্লাসেই এক রোল হতো ওর। রাসেল থাকত দুইয়ে। আর আমি তিন নম্বরে। কিন্তু ক্লাস টেন-এ ওঠার পর প্রবীর হঠাৎ স্কুলে আসা বন্ধ করে দিল। আমরা খোঁজ নিতে চলে গেলাম ওর বাড়িতে।

প্রবীরের মা মারা গিয়েছিল অনেক আগে। তখন ও খুব ছোট। পরে ওর বাবা আবার বিয়ে করেছিলেন। আগের পক্ষের প্রবীর একাই। পরের পক্ষে আরও তিন কি চার ভাই-বোন আছে। ওদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। কিন্তু তার চেয়েও বড় সমস্যা ছিল ওর বাবা। প্রবীর বলত, বাবা উপলক্ষ্য মাত্র। সব কলকাঠি নাড়তেন ওর সৎ মা।

প্রবীর ওর বাবার মাঠে-ঘাটের সব কাজই করে দিত। নিজে হাতে গরু-ছাগল পালত। স্কুল ছুটি হলে সোজা বাড়িতে চলে যেত। আবার স্কুলে আসতে প্রায়ই দেরি করে ফেলত। ও অবশ্য হেঁটেই আসত স্কুলে। আমার আর রাসেলের সাইকেল ছিল। ওর খুব ইচ্ছে ছিল একটা সাইকেল কেনার। ওর বাবা কিনে দেননি।

প্রবীর প্রাইভেটও পড়ত না। তবুও ক্লাসে কীভাবে যে সব সময় প্রথম হতো, সেটি ছিল আমাদের কাছেও বিস্ময়। রাসেল অনেক চেষ্টা করেও ওকে হারাতে পারেনি। আমি অবশ্য চেষ্টাও করিনি। আমার ক্লাসের বই পড়তে ভালো লাগত না। উপযুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাবে তিন নম্বর আসনটি আমার জন্যেই বরাদ্দ থাকত। আমার স্কুল শিক্ষক বাবা এই নিয়ে অনেক বকাবকি করতেন। আমার সেদিকে খেয়াল ছিল না। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে অন্যসব বই পড়তাম।

প্রবীরের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল। পড়াশোনা বাদ দিয়ে পুরোপুরি চাষের কাজে লেগে গেল। স্কুল থেকে স্যারেরা গিয়েও বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন ওর বাবাকে। তাতেও কাজ হয়নি। আর পড়াশোনা করতে পারেনি প্রবীর। ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্রটি পড়াশোনা বন্ধ করে হয়ে গেল পুরোদস্তুর একজন কৃষক।

সেই কথাই বলছিল রাসেল। প্রবীরের জন্যে সব সময়ই খারাপ লাগে আমাদের। কিন্তু রাসেল আজ অন্য কথা বলছিল। বলছিল, “দেখ, প্রবীরই সবচেয়ে ভালো আছে। আগে ওর জন্যে খুব খারাপ লাগত। এখন মনে হয়, ও-ই সবচেয়ে ভালো আছে। ফ্রেশ খাবার খাচ্ছে। নিজের খাবার নিজে উৎপাদন করছে। ও এখন একজন সফল কৃষক। ব্যবসায়ীও বলতে হবে। নিজের স্বাধীন পেশা। আমরা পরের চাকরি করি, আর ও মানুষকে চাকরি দেয় এখন। বিয়ে করেছিল একুশ না বাইশ বছর বয়সে। এখন ওর বড় ছেলের বয়স ষোলো-সতেরো হবে। আমার মেয়ের বয়স সবে ছয়। ছেলের চার। জানি না, মানুষ করে যেতে পারব কি না।”

আমার ছেলের বয়স আট। সে ক্ষেত্রে প্রবীরের চেয়ে একটু পিছিয়েই আছি বলতে হবে। সেই ভালো! থাক না ছেলেটা এক দিক থেকে এগিয়ে! ওর জন্যে আমার এখনও অনেক খারাপ লাগে। রাসেলের থেকেও তো ভালো করার কথা ওর। শালার মাথা ছিল বটে! অংকের জাহাজ। কিন্তু জীবনের যোগ-বিয়োগের হিসেবের কাছে হেরে গেল। কে জানে, হয়তো জিতেও গেছে আরেক দিক থেকে।

আমরা সবাই কৃষক পরিবারের সন্তান। বাবা স্কুল শিক্ষক হলেও কৃষিই আমাদের পারিবারিক পেশা ছিল। কেউ-ই আমরা ধনী পরিবার থেকে আসিনি। রাসেলের বাবার মুদি দোকান ছিল বাজারে। আবার চাষের কাজও ছিল। প্রবীরের অবস্থা একটু বেশিই খারাপ ছিল।  মা না থাকাতে ওকে সাপোর্ট দেওয়ার কেউ ছিল না। ওর বাবাও ছিলেন কেমন যেন। আমার এখনও মনে আছে সেই কথা। আমরা বন্ধুরা মিলে বোঝাতে গিয়েছিলাম উনাকে। আমাদের মুখের উপর বলে দিলেন, “ল্যাহাপড়া করতি হলি, ওরে কও আমার বাড়িত্তেন বাইর হয়া যাতি!” কথার কী ঝাঁঝ!

অনেকদিন কথা হয় না প্রবীরের সাথে। ঐ যা হয়। ওকে দরকার পড়ে না, তাই খোঁজ নেওয়াও হয় না। এখন তো বন্ধুত্বের মধ্যেও স্বার্থ ঢুকে গেছে। বন্ধুর অবস্থা ভালো হলে সবাই খবর নেয়। সবাই যেমন করে নেয় রাসেলের খবর। বলতে দ্বিধা নেই, ভালো অবস্থায় থাকা বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ আমিও রাখি। বিশেষ করে পুলিশে এবং প্রশাসনে থাকা বন্ধুদের সাথে। কখন কোন বিপদে কাজে লাগে। আমার সাথেও রাখে অনেকে। আমার টাকা নেই, কিন্তু অনেক গোপন খবর পাই আগে-ভাগে। সে সব জানতেই অনেকে যোগাযোগ করে।

রাসেলের বাসায় গেছি বেশ কয়েকবার। বউকে নিয়ে গিয়েছিলাম একবারই। ঐ শেষ! বাসায় ঢোকার পর থেকেই শুরু হয়ে গেল খোঁচানো। বলে, “তোমার বন্ধু এতকিছু করে ফেলল, আর তুমি কী করলে? কেবল তো মুখেই বড় বড় কথা!” মেজাজ চড়ে যায় এসব কথা শুনলে! টাকাই কি জীবনে সব নাকি?

ধানমন্ডিতে রাসেলের নিজের অ্যাপার্টমেন্ট। ইন্টেরিয়র ডিজাইনার দিয়ে খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে। আমাদের পুরো বাসা ঘুরিয়ে দেখাল বিশেষ আগ্রহের সাথে। তাই দেখেই প্রাণ কাঁদে আমার স্ত্রীর। আমি হয়ে যাই ব্যর্থ স্বামী। ব্যর্থ মানুষও। তার কষ্টটাও বুঝি। মানুষ এখন শুধুই টাকা দিয়ে তুলনা করে সফলতা ব্যর্থতার। যার যত টাকা, সে তত সফল। আমি অবশ্য তা মানি না। তাতেও স্ত্রীর খোঁচা। আমি নাকি অহেতুক বুদ্ধিজীবী বুদ্ধিজীবী ভাব ধরি আর এসব বলে দারিদ্র্য আড়াল করি। অবশ্য কথা একেবারে মিথ্যে নয়। আগে কবিতা-টবিতা শুনিয়ে ভুলিয়ে রাখতাম। এখন ওসব হাল্কা ডোজে কাজ হয় না। আমিও চেষ্টা করা ছেড়ে দিয়েছি। এক পক্ষ চুপ থাকতে পারলে সংসারে শান্তির অভাব হয় না।

রাসেল সবকিছু দিয়েছে ওর পরিবারকে, কেবল সময়টাই দিতে পারছে না। দিনটা বত্রিশ ঘণ্টায় হলে হয়তো খানিকটা সময় বের করতে পারত। ওর ছেলে-মেয়েদেরকে সময় দিতে পারে না। খেলতে পাঠায় ড্রাইভারের সাথে। ছুটির দিনেও কাজ নিয়ে আসে বাসায়। নয়তো এই পার্টি সেই পার্টি। ওরা বাবার সাথে খেলতে চাইলে হাতে ট্যাব ধরিয়ে দেয়। ওরা খেলা করে, যন্ত্রের সাথে। ওদিকে যান্ত্রিক বাবা ব্যস্ত তার কাজ নিয়ে। নিজের সন্তানের সাথে খেলার সময় আর হয় না। সকালে বের হওয়ার সময় ওরা ঘুমিয়ে থাকে। অফিস থেকে ফেরার পরে ঘণ্টাখানেকের জন্যে দেখতে পায়। কোনো কোনো দিন অবশ্য তাও পায় না। ঘুমন্ত সন্তানকে আদর করতে হয়। রাসেলের এখন সব আছে, কিন্তু সময় নেই।

তবুও ভালো, পেটে খেলে পিঠে সয়। বেতন-কড়ি দিয়ে পুষিয়ে যায় রাসেলের। বছরে অন্তত দুবার দেশের বাইরে যায়। কিছু পেতে হলে কিছু তো ছাড়তেও হয়। ওদের শ্রেণির কম বেশি সবাই এভাবেই সাফল্য উপভোগ করছে।

আমি খেটে খাওয়া মানুষ। খাটুনিই আছে কেবল, পয়সা নেই। স্ত্রীর কাছে তাই পাত্তাও নেই। নাম-টাম এতদিনে একটু হয়েছে বটে। তাই শুনলে আবার তিনি বলেন, “ঐ নাম ধুয়েই জল খাও!”

বুঝতে পারছি, খুব তার নিন্দা করা হয়ে যাচ্ছে। এমনিতে সে অল্পেই খুশি। মাঝে মাঝে ওসবের ঢেঁকুর তোলে আর কি। তবুও বেশ সুখেই আছি। সংসারের খবর তো আমি রাখি না। অফিসে শরীর ঢোকানোর পর কাজে ডুবে যাই। আর বের হয়ে আসার সময় মাথায় করে নিয়ে আসি এরপর কী লিখব। সেই সংসারের সব সামলে নিচ্ছে অল্প-স্বপ্ল দিয়েই।

মাঝে মধ্যে ঝগড়াঝাটি করে একসাথে থাকাই এখন যথেষ্ট সুখে থাকা। চারপাশে যা দেখছি। উঠল বাই, তো আলাদা হয়ে যাই! সমস্যায় পড়ে কেবল ঐ শিশুসন্তানেরা।

আমাদের অবশ্য ঝগড়া-টগড়া হয় না খুব একটা। আর কিছু না হোক সক্রেটিস মহাশয় একটি জিনিস খুব ভালো করে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। ঝড়-ঝাপটা যাই আসুক, চুপ থাক। চুপ থাকলেই সংসারে শান্তি বজায় থাকবে।

কদিন ধরে রাসেলের উল্টোপাল্টা পোস্ট দেখছি ফেইসবুকে। এমনিতে ও ফেইসবুকে থাকে না খুব একটা। সময় কোথায় ওর! তবু ইদানিং দেখছি খুব সময় কাটাচ্ছে এখানে।

সেদিন বড় একটি নিউজ হলো সুশান্ত সিং রাজপুত-কে নিয়ে। দুর্ভাগ্যজনক! ছেলেটা দারুণ অভিনয় করত। দেখতেও ছিল সেইরকম। কী চমৎকার একটা হাসি লেগে থাকে মুখে। এত সফল একজন মানুষ এভাবে নিজেকে শেষ করে দিল? আত্মহত্যা করতে হলো শেষ পর্যন্ত? ভেবে পাই না।

একটি কথা খুব সত্যি মনে হয়। মানুষ যত সফল, তত একা। কখনও কখনও এতটাই একা যে, তার চেনা পৃথিবী থেকে সে আলাদা হতে হতে অনেক দূরে চলে যায়। সে তখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার শেকড় থেকে। সবরকমের বন্ধন ছিঁড়ে যেতে থাকে। আর যাদের নিয়ে সে বাঁচে, তারা প্রায় কেউই তার আপন নয়। সেখানে সব স্বার্থের সম্পর্ক। স্বার্থে টান পড়লেই পালিয়ে যায় সবাই। আর তালগাছের একাকিত্ব নিয়ে সব চাপ তাকেই সামলাতে হয়। কেউ সামলে উঠতে পারে। আর কেউ না পেরে সুশান্ত সিং-এর মতো পরিণতি বরণ করে।

আজকাল রাসেলকে নিয়ে খুব ভয় হচ্ছে আমার। দেখা করতে চাইলে বলে, সময় নেই এখন। তাই আমি নিজেই একদিন চলে গেলাম ওর অফিসে। গুলশানের ওদিকে একটু কাজও ছিল। দুপুরের খাবারের নিমন্ত্রণ নিয়ে নিলাম জোর করে। গিয়ে বসলাম কোলকাতার বিখ্যাত ‘দা ভোজ কোম্পানি’ রেস্টুরেন্টে। না, কোলকাতায় যেতে হয়নি, ওটা এখন বনানীতে শাখা খুলেছে।

আজ কেমন যেন প্রাণ খুলে কথা বলছে না রাসেল। বুঝতে পারছি, ওর মন ভালো নেই একেবারেই।

–    কী হয়েছে একটু বলবি? ওসব পোস্ট দিচ্ছিস কেন, বল তো?

–    সুশান্ত সিং রাজপুত-এর খবরটা দেখেছিস?

–    দেখব না কেন? খবর তো আমরাই তৈরি করি। তৈরি করি বলতে, আমাদের কাছেই তো আগে আসে। তো?

–    ও আসলে বেঁচেই গেছে! আমিও যদি …

–    শালা! পাছায় কষে মারব এক লাত্থি। সুখে থাকতে ভুতে কিলায়, না?

–    জানিস, আমরা এখন আলাদা থাকি?

–    মানে? এসব কী বলছিস? তোরা পারিসও! ডিভোর্স হয়ে গেল?

–    না, এখনও ওসব করা হয়নি।

–    তোহ, করে ফেল যত তাড়াতাড়ি পারিস!

–    তুই কি ইয়ার্কি মারছিস আমার সাথে?

–    ইয়ার্কি কেন মারব, সত্যি বলছি!

–    আর ছেলে-মেয়েরা?

–    ওদের কথা বাদ দে! ওদের কথা কেউ ভাবে নাকি? যদি ভাবত, তাহলে এরকম খেলা খেলা করত না সংসার করা নিয়ে। তাড়াতাড়ি ঝামেলা শেষ করে ফেল। আর একা তো আর থাকতে পারবি না। আরেকটা বিয়ে কর! মেয়ে দেখব?

–    তার মানে, এসবের জন্য তুই কি আমাকেই দায়ী করছিস?

–    অবশ্যই করছি!

আমাদের আর খাওয়া হলো না। রাসেল রেগে-মেগে টেবিলে মারল এক ঘুষি। উঠে দ্রুত বের হয়ে চলে গেল। আমি কি একটু বেশিই বলে ফেললাম?

আমি ইচ্ছে করেই ওকে আঘাত করছিলাম। ওদের মধ্যে ঠিক কী হয়েছে জানি না। সমস্যা সব সংসারেই থাকে। কিন্তু ও সেখানে কী ভূমিকা পালন করল যে, আলাদা হওয়া ঠেকাতেই পারল না? জীবনে এত কষ্ট করে এতদূর এসে জীবনটাকে সব দিকে থেকে উপভোগ করার কথা। তা না হয়ে কষ্ট করে অর্জন করা সাফল্য কেন যন্ত্রণার কারণ হবে?

আমি জানি, রাসেল ওর স্ত্রীকে নিয়ে পুরোপুরি সুখি ছিল না। ও একটু উচ্চাভিলাষী ছিল আগে থেকেই। সেটি বাড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে। আরও বাড়ে সিএ কমপ্লিট করার পর। চাকরি শুরুর পর ও তো কেবল আকাশে উড়ছিল। বিয়ের ব্যাপারে বলত, “পাত্রী দেখার ব্যাপারে আমার তিন শর্ত। এক. মেয়েকে সুন্দরী হতে হবে, দুই. মেধাবী হতে হবে; আর তিন. ভালো পরিবারের মেয়ে হতে হবে।”

আমার তো শুনে বিষম খাওয়ার অবস্থা। তার মানে, ওর তো সবই চাই। আমি একবার বলেই ফেলেছিলাম, একবার নিজের দিকে তাকিয়েছিস? শুধু ভালো চাকরি করলেই তো হয় না।

আমার কথায় কষ্ট পেয়েছিল। তাই আর কিছু বলিনি। ওর স্ত্রী দেখতে সুন্দর এবং মোটামুটি ধনী পরিবারে মেয়ে। পড়াশোনায় তেমন ভালো ছিল না। তাই নিয়ে ওর আক্ষেপও ছিল বিয়ের পর। ভাবি চাকরি-বাকরি কিছু করবে কি না জানতে চেয়েছিলাম একবার। ও যেভাবে তাচ্ছিল্যের সাথে উত্তর দিয়েছিল, তাতেই সব বুঝে গেছি। বলেছিল, “সে করবে চাকরি? কোন যোগ্যতায়? তুই আর প্রশ্ন খুঁজে পাস না! সে এখন আমার কিচেন ম্যানেজার।”

আসলে আমাদের এই সাফল্য অর্জনের পথে অনেক গলদ আছে। এক জীবনে বেশি পরিবর্তন হজম করা শক্ত। চৌদ্দ পুরুষের চিরচেনা পরিবেশ থেকে অনেক বেশি আলাদা হয়ে যাওয়াও বোধহয় এর আরেকটি কারণ। তার মানে এই নয় যে, মানুষ এগিয়ে যাবে না। অবশ্যই যাবে এবং নিত্য নতুন পরিবর্তনকে আলিঙ্গন করে নেবে। কিন্তু কতদূর পর্যন্ত যাবে, সে ব্যাপারেও একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিৎ। এক জীবনে বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো উচিৎ নয় বলেই মনে হয়।

এই যেমন আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বন্ধুর কথাই বলি। সেও সাধারণ পরিবারের ছেলে। পাশ করেই খুব ভালো চাকরি পেয়ে গেল। কয়েক বছরের মধ্যেই কয়েক দফা প্রমোশন এবং উচ্চ বেতনে আসীন। ওর স্ত্রীও চাকরি করতেন একটি প্রাইভেট ব্যাংকে। হঠাৎ কী মতি হলো, সব ফেলে চলে গেল কানাডায়। জিজ্ঞেস করলে বলল, এ দেশে নাকি কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ওখানে গিয়ে কাজ করত সুপারশপে, তারপর পেট্রোল পাম্পে। এখন করোনা মহামারীর ধাক্কায় পুরোপুরি বেকার। সংসার চলছে সরকারি সাহায্যে। তাহলে একটি গোছানো জীবন ফেলে উন্নত দেশে গিয়ে কী ভবিষ্যৎ গড়ল এতদিনে?

আমি কোনো কাজকেই ছোট করছি না। কিন্তু এটাও তো ঠিক, পেট্রোল পাম্পে চাকরি করার জন্যে তো আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী হতে হয় না। মানুষের আসলে সুখে থাকতে ভূতে কিলায়। অথবা আমিই হয়তো সেকেলে ভাবনা ভাবছি।

রাসেলের চৌদ্দ পুরুষের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েনি। ঘরের বাইরে এসে চাকরিও করেনি। গ্রামে ওদের জমি-জমা আছে কিছু। আর ওর বাবা ব্যবসা করাতে ভালোই চলে যেত। তবু ওর শৈশবের জীবন থেকে আজকের জীবন কত আলাদা। পরিবারের বাকি মানুষদের থেকেও অনেক আলাদা। তাই একটু খেই হারিয়ে ফেলাটা ওর পক্ষে অসম্ভব নয়। আমি বলছি না যে, এই জীবনে ওর অধিকার নেই। অবশ্যই আছে। কিন্তু এখানেও একটি পরিমিতি বোধের হিসেব থাকা দরকার। বেশি বেশি ভোগের মধ্যে পড়ে গেলে দুর্ভোগ তো একটু সামলাতে হবেই।

আমারও একটু একটু অসুবিধে হতো। কিন্তু আমি তো রাসেলের মতো এতটা পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি না। আমার বাবা একজন শিক্ষক ছিলেন। একটু জ্ঞানবুদ্ধির চর্চা তাই পারিবারিকভাবেই পেয়েছি। বাবা কৃপণ ছিলেন না, তবে ফুটানি একদম পছন্দ করতেন না। আমার অবশ্য সে সামর্থ্যও নেই। আর এই সাংবাদিকতার জীবন আমাকে আমার চেনা পৃথিবী থেকে বেশি আলাদা করে ফেলেনি। সব দেখে শুনে প্রায়ই ভাবি, খানিকটা দারিদ্র্য তাহলে আমাকে মহানই করেছে বোধহয়।

প্রবীর আসলেই ভালো আছে এখন। চিরচেনা পরিবেশ ছেড়ে ওকে দূরে চলে আসতে হয়নি। তাছাড়া ওর কামাইপাতিও বেশ ভালো এখন। আমার চেয়ে তো ঢের ভালো। প্রথম প্রথম অনেক কষ্ট করেছে। একে তো পড়াশোনা না করতে পারার কষ্ট। তার উপর আমরা এগোতে এগোতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত চলে এলাম। আর ও পড়ে রইল গ্রামেই। অথচ ওরই সবচেয়ে ভালো জায়গার পড়ার কথা। নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট পেত আমাদের দেখে। মুখে কখনও প্রকাশ করেনি আবার।

প্রবীরের বাড়িতে গিয়ে অনেক খেয়েছি। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ও তখন পুরোপুরি সংসারী। রাসেল সহ আরও অনেক বন্ধু মিলে চলে যেতাম আড্ডা দিতে ওর বাড়িতে। বৌদিও খুব ভালো মানুষ। ঈশ্বর তো আর একজনকে সবদিক থেকে মারতে পারে না।

প্রথম প্রথম প্রবীর খুব মন মরা হয়ে থাকত। অনেক কান্নাকাটিও করেছে পড়াশোনা না করতে পেরে। ওর বাবার সাথে কথা বলত না একদম। মায়ের সাথে তো নয়ই। কোনো কাজও করত না। এসব দেখে ওকে আলাদা করে দিল ওর পরিবার। কোনো জমিজমার ভাগ না দিয়েই।

পরে ওদের গ্রামেরই এক জ্যেঠামশাইয়ের সহায়তায় কাজ শুরু করে। থাকা, খাওয়া সে বাড়িতেই চলতে থাকে। প্রথমে শুরু করে তার জমিতে কাজ করা দিয়ে। সেখান থেকে কিছু টাকা জমিয়ে শুরু করে মাছের চাষ। ওর জ্যেঠামশাইয়ের পুকুরে মাছের চাষ করতে দেয় প্রায় বিনে পয়সায়। প্রথম অভিজ্ঞতায় দেখল বেশ লাভ হয় এই কাজে। পরের বছর আরও একটি পুকুর লিজ নিল। এভাবে পুকুর লিজ নিয়ে মাছের চাষ, জমি লিজ নিয়ে ধান-সবজির চাষ করতে করতে ছোট্ট একখ- জমি কিনে বাড়ি করে ফেলল। প্রবীরের নিজের বাড়ি হলো! তারপর বিয়ে। তারপর একটু একটু করে বেড়েই চলেছে ওর সম্পদের পরিমাণ। এরপর আরও অনেক জমি কিনেছে। সেই জমিতেই গড়ে তুলেছে আম-লিচুর বাগান।

প্রবীরকে ফোন করলাম অনেকদিন বাদে। রাসেলের কথা বলতে ইচ্ছে হলো একবার। আবার ভাবলাম, ও না গুলিয়ে ফেলে ব্যাপারটা। গ্রামে কথা ছড়াতে সময় লাগে না। আমার আবার একটু পেট পাতলা। তাই এ কথা, সে কথায় বলেই ফেললাম। ও তো আকাশ থেকে পড়ল শুনে। বছর দশেক আগের একটি ঘটনার কথা বলছিল আর আফসোস করছিল খুব।

আমি তখন সবে বিয়ে করেছি। রাসেলও করেছে তার বছর খানিক আগে। ওদিকে প্রবীর তো পুরোদস্তুর সংসারী। ওর ছেলের বয়সই তখন আট কি নয় বছর। ছুটিতে বাড়িতে গিয়েছিলাম সবাই। প্রবীর নিমন্ত্রণ করল আম-লিচু খাওয়ার। ওর নিজের বাগান এবং পুরোপুরি জৈব-প্রযুক্তিতে চাষ করা।

ওর বাগানে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিল আমাদের। গাছ পাকা লিচু, আম টান মেরে ছিঁড়ছি আর খাচ্ছি। রাসেলের বউ শহুরে মানুষ। এরকম বাগান জীবনে দেখেনি। তাই সে মহাখুশি। তাই দেখে খুশি আমরা সবাই। প্রবীর একটু বেশিই। ওর আম-লিচু সব সাবাড় হয়ে যাচ্ছে, অথচ ওর মুখের হাসি থামে না। সেদিন বুঝেছিলাম, ওর মনটা অনেক বড়। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও ওর মতো উদার হতে পারিনি। কত কষ্ট করে আজ ও এই জায়গায়।

প্রবীর বলল, “এইটা হতেই পারে না! আমি যাব ঢাকায়। রাসেলের সাথে কথা বলব। ভাবির সাথেও কথা বলব। ও কি ইয়ার্কি মারতিছে নাকি? ওর বউকে তো খারাপ মানুষ মনে হয় নাই। কত ভালো একটা মেয়ে। কোনো অহংকার নাই। সবার সাথে কী সুন্দর কথা বলে। না, এইটা হতেই পারে না! আমি ঢাকায় যাবই!”

প্রবীর সত্যিই পাগল। ঠিক চলে এলো ঢাকায়। আমার বাসায় উঠতে বললাম। ও ঠিক গিয়ে উঠল রাসেলের বাসায়। পরে ওর কাছ থেকে আলাদা করে সব কথা শুনেছি। এক হাতে তালি বাজেনি সত্যি, কিন্তু দোষ রাসেলেরই বেশি বলে মনে হয়েছে। এই নতুন জীবনের স্বাদ পেয়ে বেশ বেসামাল হয়ে পড়েছে। ক্লাবে যাওয়া, মদ খাওয়া, অহেতুক দেরি করে বাসায় ফেরা এখন নাকি ওর রোজকার বিষয়। তার উপরে ভাবির সন্দেহ, ওর নাকি অন্য কোনো মেয়ের দিকে নজর পড়েছে। তার হাতে কোনো প্রমাণ নেই, কিন্তু সন্দেহ খুব জোরালো। এসব নিয়েই ঝগড়া, হাতাহাতি চলছিল কিছুদিন ধরেই। ওদিকে রাসেলের অভিযোগ, ভাবি নাকি টাকা-পয়সা নয়-ছয় করছে। তার চাহিদা বেড়ে গেছে। রাসেল কথায় কথায় নাকি বলে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে। ও নাকি একটা মাকাল ফল বিয়ে করেছে। এরকম আরও কত কথা।

প্রবীরকে বললাম, দেখ, এটা ওদের দুজনের বিষয়। তুই কি পারবি এখানে কিছু করতে? ও শুনে বলল-

–    শোন অর্ণব, তোরা একেকজন বিদ্যের লঞ্চ আর জাহাজ। আর আমি কোথাকার এক ডিঙি নৌকা। তয় মনে রাখিস, লঞ্চ-জাহাজ হালে পানি না পেলে, নৌকা নিয়েই এগোয়ে যেতে হয়। শোন ভাই, তোদের তুলনায় আমি প্রায় মূর্খ একজন মানুষ। তোদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারি নাই। তবে মনে রাখিস, সংসার করার অভিজ্ঞতা কিন্তু তোদের চাইতে আমার অনেক বেশি।

–    তা অবশ্য ঠিক!

–    শোন, অপমান সহ্য করতে কেউ পারে না। আমার বউয়ের কথাই ধর। সত্যি কথা বলতে কি, আগে দুএকবার আমিও গায়ে হাত তুলছি।

–    বলিস কী? তোর ওরকম লক্ষ্মী বউয়ের গায়ে হাত তুলেছিস?

–    কী করব, মাথা গরম হয়ে যেত। তখন তো এত বুঝতামও না। অন্যের উপর রাগ করেও বউকে ধরে মারছি। আর এসব দেখে দেখেই তো বড় হইছি। সে অবশ্য কোনো প্রতি উত্তর করত না। কান্না-টান্না করে আবার সংসারের কাজে মন দিত।

–    খুব খারাপ কাজ করেছিস, শালা!

–    তা তো করেছিই! তবে বাচ্চা হওয়ার আর গায়ে হাত তুলি নাই। সে তো আমার ঘরের লক্ষ্মী! শোন, একটা উপায় আমরা বের করে নিয়েছিলাম। একজন রেগে গেলে আরেকজন কোনো কথা বলবে না। সে কেউ অন্যায় করলেও না। পরে মাথা ঠা-া হলে খোলা মনে আলাপ করে ঠিক করে নিতাম।

–    দারুণ বুদ্ধি তো! আর অন্যায়ভাবে রাগ কে বেশি করত?

–    সে তো আমিই করতাম! তবে এই বুদ্ধি খুব কাজে দিয়েছে আমাদের ক্ষেত্রে। চাইলে তোরাও কাজে লাগাতে পারিস।

–    আমাদের লাগবে না রে! কারণ আমাদের ঝগড়া হয় না।

–    বলিস কী? একসাথে থাকলে একটু ঠোকাঠুকি লাগে না?

–    আমাদের লাগে না। কারণ বাসায় আমি একদম চুপ। ঝড় বয়ে গেলেও চুপ, বজ্রপাত ঘটে গেলেও চুপ। আমি ভাই গৃহী সন্ন্যাসী! সন্ন্যাসী দুঃখ-সুখে সমজ্ঞানী।

বৌদি আসলেই একজন লক্ষ্মী বউ। চেহারাটাও খুব মিষ্টি। শ্যামলা গায়ের রঙ আর চাহনি দেখে ঠিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কৃষ্ণকলির কথা মনে পড়ে যায়। প্রবীরের এতদূর আমার পেছনে তার অবদান অপরিসীম। হাতে টাকা হলেই নাকি বলত জমি কিনে রাখতে। প্রবীর চায় ঘরবাড়ি পাকা করতে, বৌদি বলে ওসব পরে করা যাবে।

বৌদির একটা কথা শুনে আমার চোখে জল চলে এসেছিল। আমি ঠাট্টা করতে করতেই জানতে চেয়েছিলাম, প্রবীরকে উনি কেমন ভালোবাসেন। উত্তরে বললেন, “এই মানুষটাকে যে কুনু মেয়েই ভালোবাসত। মানুষটা তো খুব ভালো, তাই না! আর আমি ছাড়া তো তার আর কেউ নাই। যার মা নাই, বাপ থেকেও নাই; সে রাগ করলিও তাই কিচু মনে করি নে।”

একসাথে থাকার এটাই তো আসল শক্তি। প্রবীরের নিজের গ্রামই ওর সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়। অনেক কিছু শেখার আছে সেখান থেকে। উদার প্রকৃতি থেকে শেখা সেই বিদ্যাই কাজে লাগিয়েছে রাসেল আর ওর স্ত্রীকে এক করে দিতে। দুপক্ষের সাথে কী সব দেন-দরবার করে তিন দিনের মধ্যে রাসেলের স্ত্রীকে বাসায় এনে হাজির করল প্রবীর। তারপর আমাকে ফোন করে বলল সপরিবারে চলে আসতে রাসেলের বাসায়। আমরাও গেলাম ওর ম্যাজিক দেখতে।

প্রবীরের মুখে সেই হাসি। এবার আরও চওড়া। আমি ভেবে পাচ্ছি না, কীভাবে কী হলো। ও বলল, “বিশ্বাস! নিজের উপরে বিশ্বাস! মানুষের উপরে বিশ্বাস! তোরা মনে করেছিলি- ওদের এক করা সম্ভব না। আর আমি বিশ্বাস করছিলাম, ওরা আলাদা হতে পারেই না। কোনোভাবেই না! এবার দেখলি তো! ভুলে যাস না, আমি কিন্তু ক্লাসে প্রথম হতাম!”

প্রবীরের শেষের কথাটায় আমরা হাসলাম সবাই। কথা সত্যি বটে। মরা হাতিও লাখ টাকায় বিক্রি হয়। আর ও তো রীতিমতো জ্যান্ত হাতি।

শেষ বাণীও প্রবীরের মুখ থেকেই বের হলো। আমাদের খুব করে বলল, “তোরা যত ব্যস্তই থাকিস, গ্রামকে ভুলে যাস না। ওটাই তো তোদের আসল ঠিকানা। ছেলে-মেয়েদের জন্য তো আরও বেশি দরকার। শিকড় কেটে গেলে গাছ বাঁচবে কী করে? তোদের এই লোহার খাঁচায় বন্দি জীবন থেকে বের হওয়া দরকার মাঝে মাঝে। চলে আয় আবার যত তাড়াতাড়ি পারিস।

প্রবীর ফিরে গেল বিজয়ী হয়ে। শিখিয়ে গেল আমাদের। ভাবছি, খুব তাড়াতাড়িই আবার যাব বাড়িতে। প্রবীরদের নিজে হাতে তৈরি করা সুখের সংসার দেখে আসতে হবে আবার। বৌদির মুখের হাসি দেখতে, হাতের রান্না খেতে যেতেই হবে। তিন বন্ধু আবার এক হব।

সুদেব কুমার বিশ্বাস। লেখক। জন্ম ও বাস বাংলাদেশে। পড়াশুনো করেছেন ইংরেজি সাহিত্য বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, এরপর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাক-শৈশব উন্নয়ন বিষয়ে। বর্তমানে একটি  আন্তজার্তিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত রয়েছেন। প্রকাশিত বই: 'এবং একটি স্বপ্ন' (ছোটগল্প), 'ম্যাজিক দাদু' (শিশুতোষ ছোটগল্প), 'ইকরির ইচ্ছেঘুড়ি'...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

লিফট

লিফট

গুলশান এক থেকে দুইয়ের দিকে যাওয়ার পথে চৌরাস্তার পঞ্চাশ গজ দক্ষিণে পঁচিশতলা আর্কেডিয়া টাওয়ারের তেরতলায়…..

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..