তোমাকেই

ইসরাত জাহান
কবিতা
Bengali
তোমাকেই

তোমাকেই

কতদিন দেখি না স্বচ্ছ চোখের ঘোলাটে চাহনি
ঠোঁটের কোনে শব্দের হাসি,
বেশ তো আছো মৃগভিলাষেই!
বাবলার বাগানে হলদে ফুলের আনন্দ,
মরু তৃষা বুকে নিয়ে ফুল ঝরিয়ে ওরা তোমার চোখে দেয় অর্ঘ্যের নিশ্চয়তা,
তুমি নিশ্চিত ভেসে যাও ডুব ডুব লুকোচুরি প্রেম নামক অপ্রেমের প্রসন্ন বাসরে।
অথচ পাইন ঝোঁপের সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝিঁ ডাকের আড়ালে!
অপেক্ষার আস্তরনে নির্মোহ সুরে হারায় আমার মৃদুল কন্ঠের তরঙ্গের তারতম্য?
ঘুমহীন, জলহীন চোখ ধূপের মতো জ্বলে শুধু
স্মৃতির বিমর্ষ কীট কুড়ে কুড়ে খায় বিস্মৃত করতে আমায়।
ভুলেই বসেছ একেবারেই?
এ পথে এখন আগাছা জমে আটকে যাওয়া ভোর
ভুলে যাও মানা নেই যদি মন চায়
শুধু জানতে ইচ্ছে করে তো!
কেমন আছো হারানো?

 

দ্বিখণ্ডিত অপ্রাপ্তি

কি ভাবছ??
তুমি চাইলেই আমি কবিতা লেখা ছেড়ে দিতাম…
কবিতা গুলো জমা করে মেঘের খামে ভাসাতাম,
তারপর
তোমাকে ভেজাবো বলে শ্রাবণ জলের ধারা হতাম।

তুমি চাইলেই আমি গল্প গুলো
হারাতাম
গল্পের ছলে গল্প গুলো দুঃখ জমাট নিরেট খাঁচায় বাঁধতাম,
তারপর
কপাট তুলে বিষাদ গুলো আজন্ম কাল স্বপ্ন ধোয়া চোখের কোনে
সাজাতাম।

তুমি চাইলেই আমি উপন্যাসের পাতা গুলো ওড়াতাম
উড়িয়ে শেষের পাতাটি যত্নে রাখা মলাট খানি কবর খুঁড়ে শোয়াতাম,
তারপর
চন্দন ঘিয়ের আগুন জ্বলা দহন তাপে ছাই হয়ে মনঝিরি ঐ নদীর জলে ঢেউ হয়ে বইতাম।

তুমি চাইলেই আমি তোমার সব মিথ্যাচার আড়াল করতাম
গল্প কবিতা উপন্যাসের তুমি নামক
অগোত্র কে বর সপতাম,
তারপর
তোমার চাওয়া পূরণ করে আমার আমির ইচ্ছে গুলো মৃত করে আমি ও মরতাম।

না ,

দীর্ঘ নিঃশ্বাসের সাথে নয় বিশ্বাসের আশ্বাসে তোমাকেই যেতে দিতাম।
তারপর
দীপান্বীতার আলো নিয়ে আলোয় আলোয় আমার ভুবন ভরাতাম,
বলতে ও আমার দ্বিধা নেই
বোকামিতে ভরা ভুল প্রাক্তন ও বহু প্রাচীন ঘরটি তোমার নিজের হাতে ভাঙতাম।

 

ধ্রুবতারা বলছি

নাবিক,
শুনতে পাচ্ছ কি হৃদয় ডংকায় আমার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ?
নাকি সে শব্দকে ঝড়ের শোঁ শোঁ আওয়াজ ভেবে মানিয়ে নিয়েছ সহজ যাপনের আশ্বাদনে?
নাকি আমাকে ও মানিয়ে নিয়েছ ভুলে যাওয়ার ভুলক্রমে?
ছিলে তো দিকভ্রান্ত!
হারিয়েছিলে দিশা,
তোমার নৌকা, বৈঠা, পাল সব ছন্নছাড়ার দলে নাম লিখিয়েছিল, সাথে তোমার মন ও!
দিকভ্রান্ত তুমি,
দিকের সন্ধান পেতে চিঠি লিখেছিলে ধ্রুবতারার কাছে,
বোতল বন্দী করে ভাসিয়েছিলে সমুদ্রের অথৈ নোনা জলে।
ভাসতে ভাসতে সে বোতল কত নটিক্যাল মাইল গতিতে ছুটে খুঁজে নিয়েছে আমাকে,
জেনেছ কখনও?
না! জানোনি!
তার চেয়েও দুর্বার গতিতে
তোমাকে পথ দেখাব বলে জ্বলে জ্বলে ক্লান্তিহীন আমি পথ চলেছি নিরন্তর।
তুমি জলের শব্দ চেনো, জানো বালির দাগ কত’টা সময় থাকে, পারদ মেপে বুঝতে পার কখন ঝড়ে মেঘ করবে,
কখন সে মেঘে বৃষ্টি হবে।
সমুদ্রের জলে পড়তে পারো ঢেউ এর মেজাজ।
আমার জ্বলজ্বলে বিচ্ছুরিত আলোর আড়ালে কতটা জ্বলতে হয় জানো কি?
জানবার সময় কোথায়??
যার আলোয় তোমার নৌকা ভাসিয়েছো দিকভ্রান্ত নাবিক তুমি পথের খোঁজে।
যে পথে তোমার শেকল, তোমার সংসার, তোমার যাপিত জীবনের টান।
সে টান কি শুধুই নিজের শেকলে ফিরবে বলে??
ঘর তোমাকে শেকল দিয়েছে কিন্তু মন?
ঘর কি তাকে ও শেকল দেয়?
তবে কেন সবাই বলে?
অতৃপ্ত প্রেম নিয়ে নাবিক ঘোরে বন্দরে বন্দরে,
রেখে আসে নোনাজল নোঙর ফেলে মাটির অন্তরে।
এসব কি কথার কথা?
না কি ব্যথার ব্যথা??
তরঙ্গে ভেসে ভেসে তুমি বদলেছ ঠিকানা, বদলেছ মন, বদলেছ পথের রেখা।
বদলে বদলে তবু তুমি চেয়েছ শেকলের নেশা,
তোমার পথের শেষ রেখায় পৌঁছে দিতে আমি পেয়েছি নোনতা কাব্য।
তোমার ঠিকানা বদল হতে হতে মিশে যাও অনন্ত শেষের আশ্বাদনে।
আমার ঠিকানা তো সেই আগের আকাশ!
পথ দেখাতেই রই আজন্ম আজীবনg
ভ্রান্তিতে আবার ও যদি দেখতে চাও ধ্রুবতারার আলোকছ্বটা,
চিঠি লিখ সেই আগের ঠিকানায় একটু সময় করে,
ফেরারি তোমাকে পথ দেখাতে
বিচ্ছুরিত হব সেতো নিশ্চয়ই,
নিশ্চয়ই।

অপ্রেমিকের জন্য

আমি সত্যিই চাই
মন্থর থেকে আরও মন্থর হোক
তোমার হৃদস্পন্দনের গতি,
পেসমেকার অকার্যকর হোক উদ্দীপ্ত করতে সেই হৃদপিন্ড।
হাঁপড়ের মতো ওঠানামা বুকের ওপর একশ মণ পাথরের চাপ অনুভব কর তুমি।
তোমার হৃদপিন্ডের অলিন্দ নিলয়ের ছন্দ হোক ছন্নছাড়া।
আমি সত্যিই চাই
যন্ত্রণার অসহ্যতা সহ্য করে তুমি পৌঁছে যাও গোঙানির তীব্রতায়!
ছটফটে তবু নিঃসাড় শরীর ভেদ করে তোমার প্রাণ ওষ্ঠে এসে আটকে থাক।
তোমার মরতে চাওয়া চোখ জীবিত থাক ধুঁকে ধুঁকে।
তুমি মৃত সঞ্জীবনী হয়ে মরে থাকো জীবনের কাছে।
আমি সত্যিই চাই।

ইসরাত জাহান। কবি। জন্ম বাংলাদেশের পাবনা জেলার ঈশ্বরদী। বর্তমান নিবাস ঢাকায়। তেরোবছর বয়স থেকে লেখালিখি শুরু। লেখা শুরু করেছিলেন দৈনিক বাংলার বাণীর মাধ্যমে। তারপর দৈনিক আজকের কাগজে নিয়মিত লেখালিখিতে ছিলেন। এরপর হঠাৎ করে বারোবছর লেখালিখি থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন। প্রকাশিত বই: 'তোমার...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

তৃষ্ণা

প্রাচীন সভ্যতা নিমগাছের ডালে বসে থাকা কাকের কন্ঠস্বর চিরে বেরিয়ে আসছে বুভুক্ষু পৃথিবীর আর্তনাদ মহেঞ্জোদাড়ো…..