ত্রিধারা সঙ্গম এবং তারপর

সৈয়দ মাহমুদ
গল্প
Bengali
ত্রিধারা সঙ্গম এবং তারপর

সুইজারল্যান্ডের জুরিখে দৃষ্টিনন্দন হোটেল “হোটেল অপেরা” য় স্বামী জুনায়েদকে নিয়ে উঠেছে শিশির। সারাদিনের ভ্রমণে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তার চোখে মুখে লেগে আছে। কোথাও কোথাও সর্পিল ড্রাইভওয়ে দিয়ে যেতে এবং ফিরে আসতে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, পাহাড়ের গা থেকে উড়ে যাওয়া তুলোর মতো নরম মেঘ, আকাশের মতো গাঢ় নীল রং লেকের পানি, পরিচ্ছন্ন লোকালয়ে সুদৃশ্য কুটির, সীমাহীন সবুজ প্রান্তরের কোথাওবা লালচে মেঠো ফুল- এ সব দেখে দেখে শিশির বেশ মুগ্ধ।

হোটেলের লবিতে তাকে বসতে বলে জুনায়েদ গ্যাছে টুকটাক কেনা কাটা সারতে। শিশির একটা ম্যাগাজিন নাড়াচাড়া করছিল। হঠাৎ ফ্রন্ট ডেস্কে চোখ পড়তেই সে স্তম্ভিত হয়ে গেল। অনতি দূরে ডেস্কে বসে আছে সেই যুবক, এক মনে কাজ করে যাচ্ছে। ফরমাল পোশাকে তাকে চেনাই যাচ্ছে না। বেশ পরিপাটি চুল, শাদা শার্টের সাথে নেভি ব্লু নেক টাই আর একই রংয়ের ব্লেজার চাপানো। শিশির কি ঠিক দেখছে! কিছুতেই তার বিস্ময়ের ঘোর কাটছে না। যুবক এবার একটু ডানে তাকালো, আবার কাজের মধ্যে ডুবে গেল। একটু পরেই সে ডেস্ক ছেড়ে উঠে চলে যেতেই তার জায়গায় এসে বসল অন্য একজন। শিশির কিংকর্তব্যবিমূঢ় !

ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুটা অস্থিরতা নিয়ে শিশির এবার ধীর পায়ে সেই ডেস্কের সামনে এগিয়ে গিয়ে নূতন মানুষটার কাছে জানতে চায়, কিছুক্ষণ আগে যিনি বসেছিলেন তার নামটা বলবেন কি? ভদ্রলোক উত্তর দেন, সৈকত সাদিক। নিশ্চিত হয়ে শিশির আবারো শিউরে উঠে, তার স্নায়ুর চাপ বেড়ে যায়। এত বছর পর সৈকতকে খুঁজে পেল সে। কিন্তু এখন তাকে কোথায় পাবে! জানতে চায় উনি আবার কখন আসবেন। ভদ্রলোক জানান, এখন তার ডিউটি অফ, রুমে গেছেন, আগামী কাল সকাল ৮ টায় আবার তার শিফট শুরু হবে। রুমটা কোথায় জানতে চাইলে ভদ্রলোক বলেন, ৮ তলায় ৮০০৯ নং রুম। এমন সময় পেছন থেকে জুনায়েদের কন্ঠস্বর, কার রুম নম্বর জানতে চাইছ শিশির? শিশির জুনায়েদের প্রশ্নে আঁৎকে উঠে বলেই ফেলে, সৈকতের রুম নম্বর চেয়েছি।

জুনায়েদ সৈকত কে না চিনলেও তার নামের সাথে পরিচিত। শিশিরের সাথে বিয়ের আগে যেদিন চুড়ান্ত কথা হয়েছিল, সেদিনই জেনেছে সৈকত নামের কেউ একজন শিশিরের হৃদয় জয় করে আছে এবং সে জায়গাটিতে সে আজীবনই থাকবে। সৈকতের সংগ্রামী জীবনের কথা জানার পর ঈর্ষার পরিবর্তে শ্রদ্ধাই জন্ম নিয়েছিল মনে। তাই শিশিরকে বা ওর শর্ত মেনে নিতে জুনায়েদ এতটুকু বাড়তি ভাবনার প্রয়োজন দেখেনি। বরং শিশিরকে সত্য ভাষণের জন্য এক রকম শ্রদ্ধাই করেছিল সে। সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে সুইজারল্যান্ড এসে শিশির তার একান্ত প্রিয় মানুষটাকে খুঁজে পেল। আচ্ছা, শিশির কি জানত সৈকত সুইজারল্যান্ডের জুরিখে বসবাস করছে! না, এমনটা হওয়ার কথা নয়, শিশির তেমন মেয়ে না। এ রকম হলে সে নিশ্চয়ই জানাতো। তাহলে এমনটিও কখনো হয়! হারিয়ে যাওয়া মানুষকে জীবনের কোন একদিন খুঁজে পাওয়া যায়! জুনায়েদ বিস্মিত।

শিশিরকে জয় করবার জন্য জুনায়েদের চেষ্টার কমতি ছিল না। অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের বড় কর্মকর্তার সুন্দরী মেয়ে শিশির। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হতেই ওরা এসেছিল অস্ট্রেলিয়ায়। জুনায়েদ তখন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়র রিসার্চার। একদিন সিডনি অপেরা হাউজের সামনে ওদের পরিবারের সাথে জুনায়েদকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল এক আত্মীয়। প্রথম দেখাতেই শিশিরকে তার মনে স্থান দিয়েছিল জুনায়েদ। এর পর বিভিন্ন ভাবে সেই পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে সচেষ্ট ছিল জুনায়েদের পরিবার এবং তারাই প্রস্তাব করে শিশিরকে তাদের পরিবারের যুক্ত করার। শিশিরের বাবা বিষয়টা ছেড়ে দিয়েছিলেন তার একমাত্র আদরের কন্যার উপর। শিশিরের মুখে সৈকতের নামটা শোনার পর থেকে জুনায়েদ নিশ্চুপ হয়ে আছে।

দুই

নিজেদের রুমে ফিরে এসে শিশির ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল দীর্ঘ সময়। সন্ধ্যার পূর্ব মুহূর্তে হোটেলের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া লেকের পানিতে মৃদু ঢেউ গুলো কিছুটা কি চঞ্চল মনে হচ্ছে! পরিচ্ছন্ন রোদেলা আকাশে পানির রং থাকে নীলাভ, এখন সেগুলো কালছে সীসার মত হয়ে আছে। দু’পাশের লিকলিকে গাছ গুলো ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেরাও দুলছে। এখান থেকে আল্পসের চূড়া বেশ পরিস্কার দেখা যায়, মনে হয় এই তো কাছেই। শিশির সুইজারল্যান্ডে নিয়ে আসার জন্য জুনায়েদকে মনে মনে ধন্যবাদ জানায়, এখানে এসে সৈকতকে এক নজর দেখতে পেল সে। যে কোনো ভাবে হোক সৈকত বেঁচে আছে  এই স্বস্তির ভাবনাটা শিশিরকে আচ্ছন্ন করে থাকল। শিশির হিসেব করে দেখে সৈকতের সাথে শেষ দেখার পনের বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। জুনায়েদের সাথে তার জীবন গড়াল দশ বছরে। পনের বছর আগে তাকে লেখা সৈকতের শেষ চিঠিটার কথা তার মনে পড়ল, এখনো কত জীবন্ত সেই সব শব্দ গুলো।  ১৯৮৮ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারিতে লেখা পুরো চিঠিটাই শিশিরের হুবহু মুখস্তঃ

শিশির,

ভোর রাতের স্বপ্নটার কথা লিখতে বসেছি। সারা জীবনের জন্য আমরা বিচ্ছিন্ন হতে চলেছি, আর কখনো তোমাকে লেখা হবেনা হয়ত-ভাবতেই কী যে কষ্ট হতে থাকলো রাতে, ঘুম ধরা দিল না। সারা রাত জাগার পর এক ঘন্টার ঘুমটা যে এত প্রশান্তির হতে পারে তা ছিল আমার কল্পনার বাইরে। দেখলাম তুমি-আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। তোমার সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে, সেটা ঠিক এখনকার মতই। আমাদের বাড়ীটা মফস্বল শহরের উপকন্ঠে, ঠিক শহর নয়। বেশ বড় সড় বাড়ি, চারিদিকে বাগান, ফসলের ক্ষেত, প্রকান্ড মাঠ, পুকুর- শহরতলীর সাজানো বাড়ি যেমন হয়। আমি বাড়িতে ছিলাম না। ফিরে দেখি তুমি সেখানে উপস্থিত, আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছি, আসলেই কি তুমি! তখন ভার্সিটি বন্ধ ছিল, তাই তুমি বেড়াতে চলে এসেছ।

দেখলাম আমার বড় বোনের সাথে তোমার খুব সখ্য। আরও এক বোন সেও তোমাকে খুব আপন করে নিয়েছে। কেউ বিষয়টাকে বাঁকা চোখে দেখছে না, এটা আমার ভীষণ ভাল লাগল। দুপুরের পর তুমি বিশ্রাম করছিলে বড় আপার রুমে। আমি সচরাচর তার রুমে সরাসরি ঢুকে পড়ি। কিন্তু তুমি আছ বলে আমি দরজায় নক করলাম। তুমি তখন ঘরের পোশাকে, আপা আমাকে ভিতরে আসতে বললেন। আমি ভিতরে গেলে তিনি বললেন, কিরে বেশ সৌজন্যতা শিখেছিস দেখছি।

বিকেলে যখন সবাই বাগানে ঘুরতে বের হলাম, তখন তুমি শাড়ীতে আবৃত, লাল সবুজের কম্বিনেশন, এলো চুলে তোমার কপালে লাল টিপ, প্রকৃতির সাথে তুমি মিলে মিশে একাকার। হালকা শীত থাকায় একটা শাল জড়িয়ে নিয়েছ। তোমাকে এ সাজে আগে কখনো দেখিনি তাই কী যে ভাল লাগছিল স্বপ্নের ভিতর। আমি সেখানেই মুগ্ধতা নিয়ে তোমার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সবাই মিলে আমরা লিচু আর নারকেল বাগানে অনেক ঘুরেছি। শুধু হাঁটছিলাম আর কথা হচ্ছিল।

রাতে খাবার পর জ্যোৎস্নার দেখা মিলল। বড় আপাই বললেন, চল পিছন বাড়ীতে যাই। তখন শুধু আমরা তিন জন। তুমি তখনো একই সাজে, বাড়ীর পিছনটা বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, অনেক দূরে কিছু কাশ ফুলের দোলা দেখা যায়। উপরে অকৃপণ জ্যোৎস্না বিলাচ্ছে চাঁদ। কী অভূতপূর্ব দৃশ্য। এখনও লিখতে গিয়ে শিহরণে আমার রোমকূপ দাঁড়িয়ে যাচ্ছে । দেখছিলাম, তুমি মাত্র এক দিনের জন্য এসেছ, পরদিনই চলে যাবে আর আমাদের সম্পর্কটা গভীর বন্ধুত্বের, তা সবাই সহজ ভাবেই নিয়েছে। তবুও বড় আপা কেন যেন সেই সময় আমাদের লক্ষ্য করে বললেন, তোরা কি দুজনে কিছুক্ষণ কথা বলতে চাস? আমি নিশ্চুপ, আপা ধীরে ধীরে সরে গেলেন, দেখলাম তুমি লজ্জায় লাল হয়ে আছ, সেটাও ভিন্ন রকম এক সৌন্দর্য। আপার প্রতি আমি দারুণ কৃতজ্ঞ হলাম। কিন্তু স্বপ্নটা অশেষের ব্যঞ্জনা নিয়ে শেষ হয়ে গেল এখানেই। তবুও কেন যেন আমার কষ্ট হলো না।

ঘুম ভাঙতেই মনে পড়ল পুরো ঘটনাটা, যতটা দেখেছি। সারা রাতের কষ্ট ভুলে কী এক গভীর প্রশান্তি অনুভব করলাম, তা তোমাকে বোঝাতে পারব না। এই ভাললাগাটাই আমাকে অনেক দিন ভাল রাখবে। ইচ্ছে করেই অনেকটা সময় বিছানায় পড়ে থাকলাম আর তোমার কথা ভাবলাম। তখনই তোমাকে লিখবার কথা মনে এসেছে। মনে হলো ঈশ্বর আমাকে নিজ হাতে কিছু একটা দান করলেন। আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ হলাম। শেষ বারের মত যেদিন তোমার সাথে দেখা করতে যাব, সেদিন কি তুমি অমন করে সেজে আসবে? আমি একটিবার এমন সাজে তোমাকে দেখব। আর কখনো হয়ত আমাদের দেখা হবে না। একটা অনুরোধ করব, তোমার একটা উষ্ণ চুমু কি আমি পেতে পারি, যা হবে আমার বাকী জীবনের স্মৃতি।

-সৈকত

কী চমৎকার করে চিঠি লিখত সৈকত, যেন গল্প বলে যাচ্ছে আর শিশির তার সামনে বসে শুনছে। শেষ চিঠিতে স্বপ্ন দেখে যে সুখানুভূতির কথা লিখেছে, তা শিশিরকেও অনেকটা প্রবোধ দিয়েছে এই ভেবে যে সে অন্তত বেশ কিছুদিন ভাল থাকবে। ওর দেখা স্বপ্নটার কথা জেনে শিশিরের মনে হয়েছিল সত্যি সত্যি সে সৈকতদের বাড়ীতে চলে গেছে। সেই প্রকৃতির মধ্যে দুজনে বেশ কিছুটা সময় যদি কাটাতে পারত! এই চিঠিটার উত্তরে কিছু লেখার সুযোগ ছিল না শিশিরের। শুধু অপেক্ষা করেছে সেই কষ্টের সময়ের, কবে সৈকত আসবে বিদায় নিতে।

তিন

সেটা ছিল সামরিক শাসনের কাল। বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে লাশের সারি দীর্ঘ হতো প্রতিদিন। আর সাম্প্রদায়িক-স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে প্রগতির যোদ্ধাদের হাত পায়ের রগ কেটে ফেলার মহোৎসব চলতো। সামরিক জান্তার গোয়েন্দা বাহিনীর তালিকার শীর্ষে জ্বল জ্বল করতো একটা নাম- সৈকত সাদিক। দুর্দান্ত সাহসী এই ছাত্র নেতাকে কিনে নিতে চেষ্টা করেছে তারা অনেক বার। অনেকেই বিক্রি হয়েছে কিন্তু সৈকতকে কিনতে পারেনি তারা। শেষে হত্যা মামলায় জড়িয়ে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর চক্রান্ত পাকা হয়ে গেল। সৈকত ধরা দিলেই আর রেহাই থাকবে না। বিষয়টা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের উপ সচিব বন্ধুর কাছে জেনে গিয়েছিলেন শিশিরের বাবা, তিনি তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। মুশফিক সাহেব তার কন্যা শিশিরের সাথে সৈকতের হৃদ্যতার কথাটা জানতেন এবং তাতে তার অসম্মতি ছিল না। সৈকত ভাল ছেলে, তাছাড়া সে যে আদর্শের জন্য লড়ছে তার প্রতি মুশফিক সাহেবের সমর্থন আগা গোড়াই ছিল। তাই নিজের কন্যাকে সেই আদর্শের পতাকা তলে দেখে তার ভাল লেগেছিল।

সৈকতের এই অবস্থা জানার পর থেকে মুশফিক সাহেব বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। মেয়েকে ডেকে এ তথ্য দিতেই শিশির কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সৈকতকে কিভাবে রক্ষা করা যায় তা নিয়ে মেয়ের সাথে আলোচনায় বসেন তিনি। দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি বলেন, সৈকতকে হয়ত কোনো ভাবে দেশ থেকে পার করে দিয়ে জীবন বাঁচানো যাবে, কিন্তু বড় দুর্বিষহ হবে সেই জীবন। পাসপোর্ট ছাড়া পরিচয়হীন একটা মানুষ কিভাবে বিদেশের মাটিতে টিকে থাকবে তা ভেবে তিনি বেশ চিন্তিত। সৈকত যদি এ ব্যবস্থা মেনেও নেয় তাহলে শিশিরের কি হবে! তিনি সস্নেহে বলেন, “সৈকতকে তুই মুক্তি দিয়ে দে মা, আমি দেখি ওকে বর্ডার পার করিয়ে দিতে পারি কি না।” শিশির বাবার বুকে আশ্রয় নিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। এক সময় মনকে শক্ত করে বলে, “তুমি তাই করো বাবা”।

গোপন দূতের মাধ্যমে সব সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। ২১ ফেব্রুয়ারি ভারত-বাংলাদেশ বেনাপোল বর্ডারে যে যৌথ অনুষ্ঠান করবে, মুশফিক সাহেব সেই প্রোগ্রামে যশোর যাচ্ছেন, সেই সময় ব্যবস্থাটা করতে হবে। ২০ তারিখ সন্ধ্যায় তিনি সৈকতকে একটু ভিন্ন গেটআপে সাবধানে তার বাসায় আসতে বললেন, সাথে করে নিয়ে যাওয়াটাই তার কাছে নিরাপদ মনে হয়েছে। শিশির তিন দিন আগে পাওয়া চিঠিটা বার বার পড়ছে, চরম উৎকন্ঠায় তার সময় গুলো অতিক্রান্ত হচ্ছে। এক সময় সৈকত এলো, তাকে হঠাৎ চেনা দায়। লম্বাটে চুল ছেঁটে ফেলেছে, সুদৃশ্য গোঁফের অস্তিত্ব নেই, বেশ পরিপাটি পোশাক। শিশির এবং সৈকত দু’জনার ভিতরেই তখন চলছে তোলপাড়, ওদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে দ্রুত, কেউই কথা বলতে পাচ্ছে না। বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, মুশফিক সাহেব রেডি হয়ে নীচে নেমে বললেন, “সৈকত চলো, আর দেরি করা যাবে না।” এই বলে তিনি এগিয়ে যেতে লাগলেন। শিশিরের চোখের সামনে তখন সৈকতের চিঠি ভাসছে। সে সৈকতের ইচ্ছের সাজটা দিয়েছিল ঠিকই কিন্তু ইচ্ছের বাকী অংশ আর পুরণ করা হলো না। সৈকত ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে যেতে শিশিরকে দেখছে। শিশির তার কাছাকাছি এসে বাবাকে এড়িয়ে শুধু এটুকু বলতে পেরেছিল, যদি আবার কখনো দেখা হয়, সেদিনের জন্য সেটি তোলা রইল।

এই যে তুলে রাখা হলো, পাঁচ বছর পর জুনাইদের সাথে বিয়ের কথা চুড়ান্ত করার সময় শিশির অবলীলায় তাকে তা বলেছে। বলেছে, বিয়ে করতে হলে আমার শর্তের অন্যথা করা যাবে না, তেমনটি করা হলে আপনা আপনি সম্পর্কটা চলে যাবে। জুনায়েদ বিষয়টাকে কি ভাবে নিয়েছিল তা সেই জানে, কিন্তু শিশির দৃঢ়তার সাথে বলেছিল তার সিদ্ধান্তের কথা। জুনায়েদ অবশ্য হাসতে হাসতে মেনে নিয়েছিল। সে কি বিষয়টাকে হাস্যকর কিছু ভেবে নিয়েছিল! শিশির যদিও বার বার তাকে ভাবতে বলেছে।

চার

মুশফিক সাহেবের গাড়ীতে বসে সৈকত তার নির্দেশিকা গুলো শুনছিল। যশোর শহরের একটা জায়গায় তাকে নামিয়ে দেয়া হবে। সেখান থেকে তাকে যেতে হবে এক জনের বাসায়, তিনি সৈকতকে বাইকে করে বেনাপোলের সন্নিকটে এক গ্রামের মাতবরের কাছে পৌঁছে দেবেন। মাতবর তার নিজের লোক দিয়ে গ্রামের পথেই বর্ডার পার করে বনগাঁয় রেখে আসবে। সেখান থেকে সে চলে যাবে কলকাতায়। মুশফিক সাহেব এই ব্যবস্থাটা করছিলেন তার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বন্ধুর অধীনস্ত বিডিআর এর এক কর্মকর্তার পরামর্শ এবং ছক অনুযায়ী, যাতে সৈকত নিরাপদে দেশ ছাড়তে পারে। বাড়তি সতর্কতা হিসেবে সৈকতকে কোন প্রকার কাগজ পত্র যা তার পরিচয় বহন করে, সাথে না রাখতে বলে দিয়েছেন। সকল বর্ডার এবং এয়ারপোর্টে তার নামে রেড এলার্ট জারি আছে। তাই ঝুকি নিয়ে গ্রামের পথে বিডিআর এর নিরাপত্তা চৌকি এড়িয়ে এ ব্যবস্থা করা এবং বিডিআর এর লোকেরও সহযোগিতা নেয়া, যাতে বিপদের মুখোমুখি হলেও পার পাওয়া যায়। মুশফিক সাহেব এবং সৈকত কেউই জানেন না আদৌ এভাবে সৈকত দেশের সীমানা অতিক্রম করতে পারবে কি না। কিন্তু চেষ্টা তো করতেই হবে। এক জন সরকারী কর্মকর্তা হয়ে মুশফিক সাহেব আইনের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রদোহী কাজ করছেন তা সৈকত বুঝতে পেরেছে, কিন্তু সৈকতের যেমন উপায় নেই, তেমনি মুশফিক সাহেবও সৈকতকে অপার স্নেহে এমন পথে বাঁচাতে চেয়েছেন। তার কাজটা হয়ত রাষ্ট্রদ্রোহী কিন্তু রাষ্ট্র কি সঠিক পথে চলছে! বিবেক বর্জিত হয়ে সব কিছু কি মেনে নেয়া যায়!

দেশ এবং শিশির, এই দুই তীব্র পিছুটান উপেক্ষা করে সৈকত এগিয়ে যাচ্ছে অজানা গন্তব্যে। শিশির সৈকতের অনুরোধে সেই সাজে তার সামনে এসেছিল কিন্তু পরের আব্দারটুকু রাখতে পারেনি, সে সুযোগ ছিল না। সৈকতের চোখের সামনে ভাসছে শিশিরের লাল টিপ, লাল-সবুজের কম্বিনেশনে আবৃত সদ্য নারী হয়ে ওঠা এক মানবী, আর মুশফিক সাহেব দিয়ে যাচ্ছেন তার নির্দেশনা। সৈকত এমনটা চায়নি , ভেবেছিল দেশেই আত্মগোপনে থেকে যাবে, ধরা পড়লে পড়বে, হোক জেল কিংবা ফাঁসি। কিন্তু পরিস্থিতি আসলে তেমন ছিল না। প্রাণে বেঁচে থাকলে পুনরায় সংগ্রাম গড়ে তোলা যাবে। যেহেতু দেশের অভ্যন্তরে থেকে কিছু করা যাচ্ছে না, তার চেয়ে বরং কিছুদিন বাইরে থাকা ভাল, এই যুক্তির কাছে হার মেনেছে সৈকত। শিশিরও তাকে দিব্যি দিয়ে বলেছে তার বাবার পরিকল্পনা মতো কাজ করতে।

সৈকতের ভিতরে ক্ষরণ হতে থাকে। সে ভয়ঙ্কর এক যাত্রায় বেরিয়েছে, যেখানে প্রতি মুহূর্তে তার এবং যিনি অপার স্নেহে তাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তারও মারাত্মক বিপদ হতে পারে, সেই ভাবনা ছাপিয়ে তার মনে নাড়া দিতে থাকে দেশত্যাগ এবং শিশিরকে ছেড়ে যাবার ভাবনা। যুগে যুগে এভাবেই কি প্রতিবাদীদের স্বপ্নের রং ফিকে হয়ে গেছে। সে যেমন করে ভেবেছে, অনেকে তেমন ভাবতে পারেনি, আপোষ করেছে, ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়ে, ক্ষমতার অংশীদারিত্ব নিয়ে, মন্ত্রী হয়ে আন্দোলনের পিঠে ছুরিকাঘাত করেছে, ন্যায়ের সংগ্রাম এভাবেই থেকে থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু স্বৈর শাসকের বিরুদ্ধে তার সংগ্রামকে অতি পবিত্র মনে করে সৈকত তার দায়িত্ব পালন করে গেছে নির্দ্বিধায়। লোভ-লালসা কিংবা অন্যায় কিছু প্রাপ্তির কাছে নতি স্বীকার করার মত নিকৃষ্ট ভাবনা সৈকতের মনে কখনোই স্থান পায়নি। চলে যাবার মুহূর্তে তার ভিতরে তবুও এক রকম অনুশোচনা তৈরি হচ্ছে, সে কি তবে নিজে বাঁচতে চাচ্ছে! দেশে থাকলে গোয়েন্দা তৎপরতায় তাকে ধরা পড়তেই হবে এবং একটা অন্যায় মৃত্যুকে মেনে নিতে হবে। সে অন্যায়টাকে মেনে না নেয়াটাও তো এক রকম প্রতিবাদ। তাই ভিতরের ঝড়টাকে আর প্রাধান্য দিতে চাইল না সৈকত, শুধু শিশিরের জন্য তার মনের উত্তাপ আগ্নেয়গিরি হয়ে লাভা উদগীরণ করে চলেছে।

পাঁচ

শিশিরের মনের অস্থিরতাটা বেশ বুঝতে পাচ্ছে জুনায়েদ। ওর সেদিনের কথাকে খুব সহজ ভাবে নিয়েছিল সে, ভেবেছিল এমন কোনো পরিস্থিতি কখনো তৈরি হবে না। কিন্তু এখন সে কি করবে, সে তো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তাই শিশিরের কাছে নিজেকে ছোট করার কথা ভাবতে পাচ্ছে না। দুজনার ভেতরেই চলছে স্নায়ুর যুদ্ধ। কেউ কাউকে স্পর্শ না করেই বিছানায় পড়ে আছে, দুজনেই জানে কেউ ঘুমাচ্ছে না।  এক সময় শিশির উঠে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরে বেশ শীত, তা সে উপেক্ষা করে। আকাশ পরিস্কার থাকায় দূরে আল্পসের আবছা অবয়ব দেখা যাচ্ছে। হালকা কিছু মেঘ চাঁদকে অতিক্রম করে গেল। সেই যে ক্ষণিকের আলো কমে যাওয়া এবং ফিরে আসা, তাতে লেকের পানিতে আলো-আঁধারীর এক লুকোচুরি খেলা চলছে, এই আলো এই আঁধার। শিশিরের মনেও হ্যা কিংবা না এর খেলা চলছে। সে কি সৈকতের সাথে দেখা করবে, পনের বছর আগের দেয়া প্রতিশ্রুতি যদি রাখতে যায় তাহলে জুনায়েদ কি ভাবে নেবে ব্যাপারটা, যদিও তাকে আগেই বলেছে সে। শিশির পিছন থেকে জুনাইদের কন্ঠ শুনতে পায়, তুমি তোমার প্রতিশ্রুতি রাখতে পার।

পর দিন বেশ বেলা করে ওরা ঘুম থেকে জাগে। বাইরে বের হওয়া হলো না আর। দুপুরের খাবার পর জুনায়েদ শিশিরকে বিশ্রাম নিতে বলে একাকী বাইরে চলে যায়। শিশির বুঝতে পারে জুনায়েদ তাকে ভেবে নেয়ার জন্য একটা স্পেস দিচ্ছে, সেই সাথে সুযোগও দিচ্ছে সৈকতের সাথে দেখা করার। কিন্তু গত রাতেই শিশিরের নিজের সাথে যুদ্ধ শেষ। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সৈকতের সাথে দেখা করবে। সৈকতের ডিউটি গতকাল বিকেল পাঁচটায় শেষ হয়েছিল। এই সময়টায় সৈকত তার রুমে যাবে। শিশির এক মুহূর্ত ভেবে নেয়, ফ্রন্টডেস্কে গিয়ে দেখা করবে নাকি সৈকতের রুমেই যাবে। সরাসরি রুমে যাওয়াই তার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়। বেশ স্নায়ু চাপে ভুগতে থাকে সে, সময় যেন আর গড়াতে চায় না।

ঠিক সাড়ে পাঁচটায় শিশির সৈকতের দরজায় নক করে। দু’বার-তিন বার, ভেতর থেকে কোন সাড়া নেই। তবে কি ফেরেনি! এবার নবটা একটু ঘোরাতেই দরজ খুলে গেল। ধীরে ধীরে সে ভিতরে উঁকি দেয়, কেউ নেই কিন্তু মৃদু গিটারের সুর ভেসে আসছে- আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ…। শিশিরের মনে পড়ে সৈকতের অনেক শখ ছিল গিটার শেখার। তবে কি সে শখ এখন পূর্ণ করতে পেরেছে! সে ধীরে ধীরে রুমের ভিতরে প্রবেশ করে, সুরটা আরও স্পষ্ট হয়। ভেতরের দরজা খোলা, বেলকনি থেকে আওয়াজটা আসছে। রুমে খুব সামান্য আসবাব কিন্তু বেশ গোছানো, সব কিছু পরিচ্ছন্ন তকতকে। দেয়ালে একটা বিশাল স্কেচ চোখে পড়ে তার। বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে ওঠে শিশিরের, এ যে তারই স্কেচ। কিন্তু সৈকতের কাছে তার তো কোনো ছবি ছিলনা, যা দেখে স্কেচ করা যেতে পারে! বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের জলের মতো কান্না চলে আসে শিশিরের, খুব কষ্টে নিজেকে সামলে সে ধীরে ধীরে সুর লক্ষ্য করে বেলকনিতে যায়। সামনে পরিচ্ছন্ন মুক্ত আকাশ তখনো লালচে হতে শুরু করেনি। লেকের পানিতে স্বচ্ছ ঢেউ তুলছে মৃদু বাতাস। একটা চেয়ারে বসে গিটারে সুর তুলছে তার সব থেকে প্রিয় মানুষটা-

সারাদিন আঁখি মেলে দুয়ারে রব একা
শুভক্ষণ হঠাৎ এলে তখনি পাব দেখা
ততক্ষণ ক্ষণে ক্ষণে হাসি গাই আপন মনে
ততক্ষণ রহি রহি ভেসে আসে, ভেসে আসে সুগন্ধ
আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ…

সৈকত তাহলে এভাবেই তার আনন্দ খুঁজে নিয়েছে। ডিউটি থেকে ফিরেই সে তার গিটার কে সাথী করেছে, ইউনিফর্মটাও চেঞ্জ করেনি, টাইয়ের নটটা শুধু ঢিলে করে রেখেছে। একটু পাশ ফিরে থাকায় সে শিশিরকে দেখতে পায়নি। শিশিরের হাতের চুড়িতে একটু শব্দ হতেই সৈকতের গিটার থেমে যায়। মুখ ফিরিয়ে শিশিরের উপর চোখ পড়তেই সে চমকে উঠে দাঁড়ায়। দীর্ঘ পনের বছর পর দু’জনে পরস্পরের দৃষ্টির মাঝে হারিয়ে গেল।

ছয়

সেই ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে সৈকত শিশিরের বাবার সাথে চলে যাবার পর তার জীবনের দুঃসহ সময়ের বিশদ ঘটনা সংক্ষেপে শিশিরকে বলে সৈকত। বিশেষ করে কোলকাতার কষ্টের জীবন, সমমনা রাজনৈতিক দলের একজনের অনুগ্রহে ছাপাখানায় প্রুফ রিডারের চাকুরী, ইউরোপে পাড়ি দিতে ট্রাভেল ডকুমেন্ট আর অর্থ সংগ্রহের মর্মান্তিক যুদ্ধের কাহিনীটা শিশিরকে বেশ কষ্ট দেয়। কোলকাতা থাকতেই সে দেশে তার বোনের কাছে ভিন্ন একজনকে দিয়ে চিঠি লিখে খবর পেয়েছিল, শিশিরের বাবা অস্ট্রেলিয়ায় বদলী হয়েছেন। সৈকত যে কোলকাতায় অবস্থান করছে তা যেন কোনো ভাবেই প্রকাশ না হয় এজন্য তাকে চিঠি লিখতেও বারণ করা হয়েছিল, কারণ সে ক্ষেত্রে উভয় দিকেই বিপদের সম্ভাবনা ছিল। এর পর তার সুইজারল্যান্ডে এসে পলিটিক্যাল এসাইলাম হিসেবে আশ্রয় পাওয়া, হোটেল ম্যানেজমেন্টে ডিপ্লোমা করা, মিউজিক কলেজে গিটার শেখা, হোটেলে চাকুরী পাওয়ার বৃত্তান্ত বলে যায় সৈকত। স্বৈর শাসকের পতনের পর দুটো সরকারের পরিবর্তন হলেও তার কেসটা বাতিল করেনি কেউই, নিজের দলের লোকেরাও গা করেনি, অনেকটা অভিমানে সৈকত এখানেই থেকে গেছে। শিশিরও জুনায়েদের সাথে তার বিয়ের কথা জানায়, সেই সাথে এটিও বলতে ভোলেনা যে, জুনায়েদকে সে সবই বলেছে, এমনকি এর পর সৈকতের সাথে দেখা হলে শিশির তার প্রতিশ্রুতি রাখবে, সেই শর্তে জুনায়েদকে সে মেনে নিয়েছে। সৈকতের চোখে-মুখে বিস্ময়! শিশির বলে, গত রাতেও জুনায়েদ তাকে তার প্রতিশ্রুতি রাখতে বলেছে। এর পর আর কারো মুখে কথা নেই। বেশ কিছু সময় পর দেখা যায় দুটো অবয়ব পরস্পরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ধীর পায়ে। সেই অন্তরঙ্গ সময়ের ব্যাপ্তিটা কত দীর্ঘ হয়েছিল তা বোধ করি ওরা কেউই অনুমান করতে পারেনি। শিশিরেরও জানার কথা নয় জুনায়েদ সেই সময় তার জন্য লিখছে চিঠিঃ

শিশির,

একা চলে যাবার সিদ্ধান্তটা নিতে হলো। যদি তোমাকে সাথে নিয়ে যাই, তবে সারা জীবন আমার মনে একটা প্রশ্ন থেকে যাবে যে, তুমি কি ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমার সাথে যাচ্ছ! কখনো হয়ত মনে উদয় হবে, আমি তোমার মনের উপর চেপে বসেছি কিংবা তুমি আমাকে আজীবন ঠকিয়ে এসেছ। আর যাই হোক তোমাকে অমন অশ্রদ্ধা করতে আমার ভাল লাগবে না। সৈকতকে সেদিন দেখার পর থেকে তুমি যেখানে বিচরণ করছ, সেখানে আমার অস্তিত্ব একেবারেই নেই বলে আমার মনে হয়েছে। আমার এই ভাবনাটাও সত্য কিনা সেটিও যাচাই করবার আছে। তুমি যে প্রতিটা মুহূর্তে মনের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছ, তা আমার বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না। এই যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে তোমাকে উঠে আসতেই হবে। এখানে অন্য কারো সহযোগিতা অবান্তর, কেননা যুদ্ধটা একান্ত তোমার নিজের। আমি সামনে থাকলে বরং সিদ্ধান্ত নিতে তোমাকে প্রভাবিত করে ফেলতে পারি, সেটিও আমি চাইছি না।  তুমি থেকে গেলেও তোমার উপর আমার কোনো অনুযোগ থাকবে না। নিজেকে না ঠকিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তটা নিতে তোমার সময় লেগে যেতে পারে ভেবে তোমাকে রেখেই আমি চললাম। নির্ধারিত তারিখেই তোমার টিকেট রি-কনফার্ম করা আছে, ক্রেডিট কার্ডও রিচার্জ করে দিলাম। যদি ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে পার তবে বুঝে নেব আমি জিতে গেছি, তোমাকে নিয়ে আমার মনে কোনো সংশয় থাকবে না। অপেক্ষায় থাকব তোমার পথ চেয়ে, হয়ত সেই সময়ের ব্যাপ্তি কাল বাকী জীবনের পুরোটাও হতে পারে। এমন অপেক্ষার মাঝে এক ধরণের আনন্দ আছে, আমি না হয় সেই আনন্দ নিয়েই বেঁচে থাকব।

-জুনায়েদ

সৈয়দ মাহমুদ। কবি ও গল্পকার। উত্তর জনপদের এক ছোট শহর গাইবান্ধায় জন্ম মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে। ছোট বেলা থেকেই কিছুটা বোহেমিয়ান সৈয়দ মাহমুদ বেড়ে ওঠেন অনেকটা রক্ষণশীল পরিবারে। শৈশব থেকেই প্রকৃতি তাকে টানতো। বিরাণ প্রান্তরে, সারি সারি বৃক্ষের ছায়ায় হাঁটতে কিংবা...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..