‘ত্রিশূলে ত্রিশূলে চরণচিহ্ন দিয়ে যাও’ – একটি অলৌকিক সংলাপ

সৌরভ মিত্র
প্রবন্ধ
‘ত্রিশূলে ত্রিশূলে চরণচিহ্ন দিয়ে যাও’ – একটি অলৌকিক সংলাপ

শরৎ এসে গেছে, এদিকে বৃষ্টির বিরাম নেই। তবে বামুনপাড়ার বিদ্যেধর চক্কোত্তির বেশ ফুরফুরে মেজাজ। পেশায় করণিক হলেও উপপেশায় ‘চাল-কলা প্রত্যাশী পুরহিত’ কিনা, তাই ক্যালেন্ডারের পাতায় আশ্বিন-কার্ত্তিক দেখালেও আগামী দু’মাস তার কাছে নিখাদ ‘পৌষমাস’! মূল্যবৃদ্ধির কল্যাণে মধ্যবিত্ত বেতনজীবীদের ‘সর্বনাশ’ হতে পারে, -সে কথা অন্য। একে নিম্নচাপের টানা বৃষ্টি, তার ওপর শনিবার সন্ধ্যা। -পার্থিব জগতে পড়ে থাকতে কিছুতেই মন চাইছিল না। এদিকে গতকাল এক সহকর্মী মণিপুর থেকে ফিরে গাঁজা দিয়েছিল কয়েক পুরিয়া। -বাবার প্রসাদ, না করতে নেই। পাশের ঘরে গিন্নি গাঁজাখুরি সিরিয়াল খুলে বসতেই কর্তাও ছিলিম ঠুসতে শুরু করে। -সহধর্মিনী বলে কথা, ‘সহধর্ম’ পালন না করলে কি চলে! মণিপুরি গাঁজা, -প্রবল প্রতাপ। প্রথম টানে অঙ্গার, দ্বিতীয় টানে তুরীয়। তৃতীয় টান মারতেই মাথা-টা বোঁ করে কয়েক পাক খেয়ে গেল। চোখ খুলতেই দেখে, – এ কি, এ যে কৈলাস! সামনে জলজ্যান্ত মা দূর্গা! চাক্ষুষ দর্শনের ঘোরে চক্কোত্তি মায়ের পদতলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ‘মা, মাগো-!’

– আরে ছাড় ছাড় বাবা, করিস কি?

– কত পূণ্যের ফলে এই সুযোগ পেলাম! পদধুলি নিচ্ছি মা, চরণামৃত।

– ওরে ছাগল, তোদের মুনি-ঋষিরা বলে গে’ছিল বেদ-বেদান্ত-মহাকাব্যের শ্লোকের ‘চরণে চরণে’ যে ‘অমৃত’ আছে তা পান করতে, ভজন-কীর্তনের ‘পদে’র ধুলি মাথায় নিতে। আর তোদের কিনা নোংরা মেখে মাথায় ফোঁড়া-ফুস্কুরি আর লোকের পা ধোওয়া কাদা-জল গিলে পেটে আন্ত্রিক! লেখাপড়া-টা যদি মন দিয়ে করতিস! যাকগে, কেন এসেছিস তা খোলসা কর দেখি। তবে আগেই বলি, এবার কিন্তু ওই শারদোৎসব-টুৎসবে আমি নেই।

– কেন মা, সে’বার দেশপ্রিয় পার্কে তোমার সবচে’ বড়ো মূর্তি পুলিশে ঢেকে দেওয়ায় দুঃখ পেয়েছ বুঝি?

– ধ্যুস্। বছর-দশেক ধরেই আমার ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’। ওই ঢাকাঢাকি নিয়ে অত ঢাক পেটানোর কিছু নেই। ছেলেমেয়েগুলো বহুবছর ধরেই ‘যাব না, যাব না’ করত, এবার অসুরটাও বেঁকে বসেছে। ওটাকে কতবার বললাম, -লক্ষ্মী বাবা আমার, এবার পাঁঠা বা উদবেড়াল কিছু একটা ধর। বড়-সড় কিছু লাগলে স্পিলবার্গকে বলে না হয় একখানা ডাইনোসর-ই আনিয়ে দিই। শুধু মোষ-টা বাদ দে। সে হতচ্ছাড়া বলে কিনা, ‘আমায় পাগল পেয়েছ? শেষে নিজের নামের এপিডেপিট করিয়ে পাঁঠাসুর, বেড়ালাসুর –রাখতে হয় আর কি! আমি এসবে নেই, তাতে তোমার যাওয়া হোক কি না হোক।’

– সমস্যাটা কী মা?

– বাপ রে বাপ, নীচে তোরা গরু-মোষ নিয়ে কিসব আন্দোলন জুড়েছিস, ভাবিস -কিছুই খোঁজ পাই না? এই অবস্থায় মহিষ মেরে কেস্ খাব নাকি! তোদের ওই ত্রিশূলওয়ালাদের দাপটে এই সামান্য ত্রিশূলওয়ালি কি আর শান্তিতে চারটে দিন কাটাতে পারবে? কে জানে বাবা, কপালে ‘জয় মাতা দি’ ফেট্টি বেঁধে আন্দোলনের গুঁতোয় আমার মুখেই না চুনকালি মাখিয়ে বসে!

– গরু-মোষ নয়, শুধু গরু। গোমাতাকে রক্ষার জন্য গোমাংস আন্দোলন। শাস্ত্রের নির্দেশ আছে কি না, তাই।

মা দূর্গা চোখে মুখে বিরক্তি, -‘সরস্বতীটা নালিশ করছিল, হামেশাই নাকি লোকে ওর মন্ত্রের ‘বিদ্যাস্থানেভ্য এব চ’-কে বদলে ‘বিদ্যাস্থানে ভয়ে বচঃ’ করে ফেলছে। তুই কি সেই দলের?… কেউ পশু-পাখিকে সন্তানস্নেহে বা মাতৃজ্ঞানে পালন করতেই পারে, -তা মানবিক অনুভূতির বিষয়, ‘শাস্ত্রের নির্দেশ’ নয়।

ব্যাসদেব তো ডিক্‌টেশন দিয়েই খালাস, আমার বড়ছেলেটা যে ঘাড়ে স্পন্ডিলোলাইটিস বাঁধিয়ে ওই আঠেরো-কাণ্ড মহাভারত যে লিখল, তা কি শুধু সিরিয়াল বানাতে? বনপর্ব-টা একটু উল্টে দেখিস, -সত্যযুগের একজন মহান রাজা ছিল রন্তিদেব। ব্রাহ্মণ অতিথিদের সেবার জন্য তার ভোজনশালায় রোজ দু’হাজার করে গরু মারা হত।[1] শুধু তাই নয়, অতিথিরা এত গোগ্রাসে সেই  মাংস গিলত, যে পাচকদের এসে বলতে হত ‘তত্র স্ম ক্রোশান্তি সুমৃষ্টমণিকুণ্ডলা। সুপং ভূয়িষ্ঠমশ্নীধ্বং নাদ্য মাংসং যথা পুরা।।’ –মানে, মাংসের বদলে ঝোল খাও বেশি করে!… এছাড়া, ইন্দ্র নিজেই বৃষাকপিকে পনেরো-ষোলটি ষাঁড়ের মাংস রান্না করে খাওয়াতে বলেছিল।[2] গোরুর মাংস সুসিদ্ধ হলে তা যাজ্ঞবল্ক্যেরও প্রিয় ছিল।[3] এমনকি পুত্রসন্তানের কামনায় চতুর্বেদ পাঠের পাশাপাশি বউকে ষাঁড়ের মাংস খাওয়ানোর বিধান ছিল।[4]

– শুনেছিলাম আমাদের দেশটা কৃষিপ্রধান বলে একসময় নাকি গরু খাওয়া নিষিদ্ধ হয়েছিল?

– মৎসরাজের গো-ধন রক্ষা করতে গিয়ে বৃহন্নলা, মানে অর্জুনের সাথে কৌরবদের যুদ্ধ হয়। গো মানে শুধু গরু-ই যদি হত, তোর কি মনে হয় -কৌরবদের কি খেয়ে দেয়ে কাজ ছিল না যে, ভীষ্ম, দ্রোন, কৃপ, কর্ণকে নিয়ে সামান্য গরু চুরি করতে যাবে! খোদ হস্তিনাপুরের এমন দূরাবস্থা?

– সত্যিই তো, ভাববার কথা!

– তোর বউ কোনওদিন তোকে ‘ও গো, হ্যাঁ গো’ বলে ডাকে নি?

বিদ্যেধর থতমত খায়, ‘ঠিক তা নয়। তবে মাঝেমাঝে ‘কি গো, শুনছ গো,’ -বলে বটে।’

– কেন, তুই কি গরু?…. যে ‘গো-লোক বৈকুন্ঠপুরী’তে[5] গদাধরের বাস, সে কি গোয়ালঘর? ‘গো-পা’ মানে কি গরুর ঠ্যাং? ‘গো-রা’ মানে কি হাম্বা? ‘গবেষণা’ মানে কি গরু খোঁজা?[6]

চক্কোত্তির চোখমুখের দশা দেখে দশভূজা কিছুটা শান্ত হলেন যেন, ‘গো শব্দের কতরকম মানে হয় জানিস? শোন তবে, -গরু, বৃষরাশি, সূর্য্য, চন্দ্র, ইন্দ্রিয়, ঋষিবিশেষ, গায়ক, দিক, বাক্‌, সরস্বতী, পৃথিবী, স্বর্গ, বজ্র, জল, আকাশ, রশ্মি, চক্ষুঃ, বাণ, কেশ, হীরক, দুধ-ঘী, গৃহপালিত পশু, সিংহ, ইত্যাদি ইত্যাদি।’[7]

বেচারা বিদ্যেধর যাকে বলে, রীতিমত ‘শব্দজব্দ’! –‘এসব কি দিচ্ছ মা?’

– যদি বলি এই ‘গো’ শব্দ-ই লাতিন-ফেরৎ ইংরেজিতে ‘go’ হয়েছে[8], -সে’কথা হজম হবে না। তবু শোন, ‘গো’ মানে ‘যে যায়’[9]। সূর্য্য, চন্দ্র, পৃথিবী, রশ্মি থেকে গায়ক, কথা, মন বা গরু, -যারা ‘যায়’, তারা সবাই ‘গো’। এমনকি, গমনশীল বা যাযাবর মানুষদের-ও ‘গো’ বলা হত, তাদের সমষ্টি বা দল-কে বলা হত ‘গো-ষ্ঠি’।

– সব গোলমাল হয়ে গেল, এ যে পুরো গোলকধাঁধা! একটু আম-আদমির ভাষায় যদি বলতে-।

– নিজের বাচ্চাকাচ্চাদের দিকে ভাল করে নজর দিলেই বুঝতিস বাবা। তারা নাম না জানা লোকের বর্ণনা কিভাবে করে দেখেছিস? –‘যে দাদাটা খেলে’, ‘যে দিদিটা লজেন্স দেয়’, ‘যে কাকুটা বকে’, ‘যে পিসিটা কোলে নেয়’…। তোদের পূর্বপুরুষেরাও আদিকালে তা-ই করত, অর্থাৎ কোনওকিছুকে চিনত ‘সে কী করে’ বা ‘কী তার বৈশিষ্ট্য’ –এই দিয়ে। তোর মতো গো-মূর্খের নাম বিদ্যেধর হত না তখন। সে’ ভাষাও ছিল আলাদা।[10] তোদের ‘নাম-প্রধান’ ভাষায় আগে ‘নাম’, পরে নামধারীর ‘কাজ’। সেকালের ‘কাজ-প্রধান’ ভাষায় বস্তুর ‘কাজ’ দেখে সেই কাজ অনুসারে তার ‘নাম’ দেওয়া হত।[11] যাবতীয় শাস্ত্র লেখা হয়েছিল এই ভাষায়।[12] আসলে, আদি সংস্কৃত বা মঙ্গলকাব্যের বাংলাকে আজকের ভাষাগুলো মোটামুটি চিনলেও সবটা জানে না।

– কোথায় মা? পড়া তো যায়। বোঝা যায়।

– সে’ পড়া ‘পঠন’ নয়, ‘পতন’। আর সে’ ‘বোঝা’ও মাথায় নয়, পিঠে বইতে হয়েছে!… ওরে গাধা, বাংলার সাথে শুধু লিপি মেলে বলেই হঠাৎ করে যদি অসমীয়া, মণিপুরী বা ককবরক পড়তে শুরু করলে ঠিক যে দশা হয়, তোদেরও ঠিক তেমন হয়েছে। কিছুটা বুঝেছিস, বাকিটুকুকে বলেছিস ‘ভগবানের লীলা’ নইলে ‘ধম্মের বিধান’।…

একটু দম নিলেন মা দূর্গা, ‘তবে কি জানিস, পূর্বপুরুষের অভ্যেস তো, থেকেই যায়। তাই এখনও ‘যে লোকটি কাগজ দেয়’ -তার নাম হয় ‘কাগজওয়ালা’, ‘যে কল সেলাই করে’ –তার নাম হয় ‘সেলাইকল’ বা ‘যার মধ্যে পাগলামির বৈশিষ্ট্য থাকে’ তাকে পাগল বলিস।… এবার বুঝলি, -কেন অঙ্কের মাস্টার তোকে ‘গাধা’ বলতো!’

বিদ্যেধর অপমান গায়ে মাখে না। ‘গো না হয় হল, ‘গোমাংসে’র কেস্‌টার ফয়সলা তো এখনও করলে না?’

– সংক্ষেপে যতটা বলা যায়, শোন। -আদিতে মানুষ উৎপাদন যা করত, তা শুধুমাত্র প্রয়োজনটুকু মেটানোর জন্য। প্রয়োজনের বেশি উৎপাদন বা তার বেচাকেনা ছিল দণ্ডনীয় পাপ।[13] কারণ, এই জল-মাটি-বাতাস-গাছপালা-পশুপাখির দুনিয়ায় সবার সবকিছুর ‘অধিকার’ ছিল, তারা ভাবতেও পারত না সেখানে ‘মালিকানা’ বলে কিছু থাকতে পারে![14] … যাই হোক, একদিন মানুষ প্রয়োজনের বেশি উৎপাদন শুরু করল। ‘উৎপন্ন’ পরিণত হল ‘পণ্যে’ বা ‘মালে’।[15] ‘মালে’র পিছুপিছু ঢুকল ‘মালিকানা’বোধ। ‘মালিক’ তৈরি হল।[16] বাজার সৃষ্টি হল। বিনিময় প্রথার বদলে শুরু হল মালের বেচাকেনা। দরকার পড়ল মুদ্রার। পণ্য তো ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে ‘যাতায়াত করত’ই, এবার নব-আবিষ্কার মুদ্রাও বাজারে ‘যাতায়াত করতে’ শুরু করল।[17] আর আগেই শুনেছিস, ‘গো’ মানে ‘যে যায়’, সুতরাং-।…

– ঠিক বলেছ মা। স্কুলে থাকতে ইতিহাসে পড়েছিলাম, -ভারতের প্রথম মুদ্রা ছিল গরু।[18]

– এই তো, গরুর বুদ্ধি খুলেছে! বাহ্, খুব ভাল।

– কিন্তু, গোমাংসের কী হল?

– একটু সবুর কর বাবা। বাছুরের মতো লাফাচ্ছিস কেন?… যাই হোক, -পণ্য, মালিকানা বা বেচাকেনাকে শুরুতে সেই আদি ‘যৌথসমাজ’ মোটেই ভাল চোখে দেখে নি। পণ্য বা তার মালিকানাকে তারা তখনও ‘পাপ’ বলত। তখনকার মূল্যবোধে ও’সব ছিল চরিত্রের পতন, দণ্ডনীয়। ফলে যারা বেচাকেনা করত তারা ছিল সমাজের চোখে ‘পতিত’।[19] নদী ছিল প্রধাণ বাণিজ্যপথ, সে’পথে বেচুবাবুরা পণ্য বা ‘পাপ’ মুদ্রায় বদলে নিত বা ‘ধুয়ে ফেলত’। তখনও নদীর ধারেই ‘গঞ্জ’ বা বাজার বসত। আজকের উত্তরাখণ্ডে, ‘গৌ-চর’ নামে একটা জায়গা আছে। বদ্রীনাথ মন্দিরের সম্পত্তি এই জমিতে গরু চড়ানো দূরে থাক, চাষ অবধি হয় না। সেই আদিকাল থেকে আজ-ও সেটা বাণিজ্যক্ষেত্র। সে’ শহর অলকানন্দার তীরে। আর এই সেদিন-ই তো ক্লাইভ-হেস্টিংগসের দলবল গঙ্গা বেয়েই তো ব্যবসা করতে ঢুকল!

– তার মানে, এই নদীগুলো ‘পতিত’দের ‘পাবন’ করত, অর্থাৎ তারা ‘পতিতপাবনী’। -তাই তো!… কিন্তু, গোমাংস-?

– গাধার বংশ। -এত উতলা কেন? বলছিই তো… কিছুদিন পর বেচাকেনায় মুদ্রা হিসেবে গরুর পরিবর্তে সোনার ব্যবহার শুরু হল।[20] বেচাকেনা দিনকে দিন বাড়তে লাগল, সেই সাথে ‘পুঁজে’র মতো জমতে শুরু করল ‘পুঁজি’[21] । সমাজ এতদিন তবু আজকের ভাষায় ‘সাম্যবাদ’ থেকে ‘রাষ্ট্রীয় পুঁজি’ বা রাজকোষের উদ্ভব দেখেছিল, তা মেনেও নিয়েছিল। রাজকোষের পাশাপাশি এবার দেখল বৈশ্য-পুঁজির রমরমা। ‘কর’ বা ‘রাজস্ব’ নেওয়া শুরু হল। ‘কাজ করে অধিকার অর্জনে’র বদলে ‘কাজের বিনিময়ে মজুরীর মালিকানা’ প্রথা চালু হল। সমাজের ‘সুর’টাই গেল বদলে। সেই আদি ‘সাম্যবাদী’দের একাংশ, – যারা এই নতুন ‘সুর’ মানতে চাইল না, সেই ‘অ-সুর’দের ভাগিয়ে দেওয়া হল মূল সমাজ বা সংসার থেকে।

– সেই অসুরকে তুমি বধ করলে কেন?

– একদিনেই সব শুনবি! আমারও তো সংসার-টংসার আছে, নাকি?

চক্কোত্তি আমতা আমতা করে, ‘না, সে ঠিক আছে। আরেকদিন না হয়-। কিন্তু, গোমাংস-?’

‘খাবি নাকি… থাপ্পর?’ -তেড়ে ধমক লাগালেন দশভূজা। ‘সেই থেকে পোঁ ধরেছে! সবসময় শর্টকাট্! ‘ওহ্‌মে’র সূত্র শুনলেই ভ্যাক্ করে উগরে দেয় ‘প্রবাহমাত্রা বিভবপার্থক্যের সমানুপাতিক’!… আরে, তার আগে যে উষ্ণতা-টুষ্ণতা সামলে রাখতে হয়, না রাখলে যে হিসেবে একগাদা ভুলভ্রান্তি ঢোকে, -সে’টুকু বোঝার ধৈর্য্য নেই!

ধমক খেয়েও বিকার নেই চক্কোত্তির, ‘ঠেলায় পড়লে সতী বেহুলাকেও পায়ে ঘুঙুর বাঁধতে হয়। লেখাপড়া তুলে গালি দিও না। -সবকিছুই পেটের দায়ে। ফলাফলও তেমন। একটায় সত্তর, দু’টোয় চুয়ান্ন, বাকিগুলোয় টেনেটুনে পাশ, -সব মিলিয়ে চিরকালই ‘হায়ার সেকেন্ড ডিভিশন’। -ঠিক এদেশের ‘পার-ক্যাপিটা’র মতো।

– তাও ঠিক। এখন তো কেউ ‘বিদ্যার্থী’ হয় না, সবাই ‘পরীক্ষার্থী’! ফলে ‘জ্ঞান’ আর ‘বিদ্যা’র তফাৎ না বুঝেও সব মাস্টার হয়, ‘আরোগ্য’ আর ‘নিরাময়ে’র তফাৎ না বুঝে হয় ডাক্তার!

– আবার কেন কাটা ঘায়ে নুন দিচ্ছ মা?

দূর্গা কিছুটা নরম হলেন, ‘ধনসম্পদ যে ‘গো’, তা শুরুতেই বলেছি। রাজকোষ-ই হোক বা বৈশ্য-পুঁজি, তার যে শরীর বা ‘মাংস’, সেখানে তোর মতো রামা-শ্যামারা কি দাঁত ফোটাতে পারে বা পারত? –না, তাই সেই ‘গো’-এর ‘মাংস’ ছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু তার আশীর্বাদ বা ‘বর’-দান, যাকে বলে ‘গো-বর’, -তা পরম পূজনীয়, চরম কাঙ্খিত।

– গোবর আসলে গ্রান্ট-ইন-এইড্! বলো কী?

– পুজো-আচ্চা বা বিয়ে-অন্নপ্রাশনে ঘরের দেওয়ালে গোবর দিতে দেখেছিস নিশ্চয়, -যার ওপর চারটে কড়ি গুঁজে, নিচে তেল গড়িয়ে দেওয়া হয়?… দিনের মধ্যে হাজারবার ‘টাকা-কড়ি’র নাম জপ করেও ভুলে যাস ‘কড়ি’ ছিল আদি খুচরো পয়সা। আর কে না জানে -‘তেল’ আসলে ‘স্নেহপদার্থ’। না বুঝে পালন করা ওই আচারটির বক্তব্য ‘ঘরে ধনসম্পদ সস্নেহে লালিত হোক’।

– তাহলে যে গোমুত্র পবিত্র, তা নিশ্চয় ‘লিকুইড মানি’[22]?

কোরাসে হাততালি দিয়ে উঠলেন দশভূজা, ‘সহজ করে বললে, তা-ই।’

কিছুক্ষণ মাথা চুলকোয় বিদ্যেধর, ‘এই ‘গো’ হঠাৎ সব ছেড়ে শুধু ‘গরু’ হল কেন?’

– সমাজে উৎপাদন যখন হু-হু করে বাড়তে লাগল। কুটিরশিল্প, ব্যবসাবাণিজ্য যখন পুরোদমে শুরু হয়ে গেল, খুব দরকার পড়েছিল ‘নির্দিষ্ট করে’ বলার। ভেবে দেখ না, কেউ যদি হাটে বসে আরেকজনকে বলে, -ওরে, একটা ‘অজ’ নিয়ে আয়। আর সেই লোকটা যদি দিশা না পায়, সে কাকে ধরে আনবে? –ছাগল, আগুন, রাম-লক্ষ্মণের ঠাকুরদা নাকি স্বয়ং ব্রহ্মাকে! –কী ঝামেলা পাকবে টের পাচ্ছিস? – ধীরে ধীরে তাই ভাষার চরিত্র বদলাতে লাগল। এই ‘নির্দিষ্ট করে বলা’কে নিয়মে বাঁধতে রচনা হল ‘অমরকোষ’। যেহেতু আজকের ভাষার সাথে সেটির ধাত-টি মেলে, তাই আজকাল সেটির কদর বেশি। কিন্তু, ততদিনে বেদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত -সব লেখা হয়ে গেছে। কিন্তু, জ্ঞানীগুণিরা টের পাচ্ছিলেন খুব শিগ্‌গির লোকে পুরোনো ভাষা ভুলে যাবে। তখন গোমাংস হবে গরুর মাংস, ‘বরাহনগর’[23] -কে ভাববে বুঝি শুয়োরের খোঁয়াড়, ‘সতীদাহ’[24] পালিত হবে কয়েক লক্ষ বিধবাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে। – বেদ-পুরাণের আসল অর্থ ভাষার চক্করে আলিবাবার গুহায় আটকা পড়লে, ‘চিচিং ফাঁক’ মন্ত্র তো লাগেই। -যাকে ‘ডিক্রিপ্‌শন’ না কি একটা যেন বলে আজকাল।… বেদ আর পুরাণ ঠিকঠাক বোঝার জন্য লেখা হয়েছিল ‘নিরুক্ত’ আর ‘খিল হরিবংশ’। এ’দুটিকে গুলে না খেয়ে বেদ, পুরাণ বা মহাভারত পড়ার ফল যেমন হাস্যকর, তেমন শোচনীয়! –সে’জন্যই ভক্তিবাদীরা ‘ভক্তি’র চোটে কানা হয়েছে, যুক্তিবাদীরা ‘যুক্তি’র ঘোঁটে হয়েছে কালা। দু’দলই ‘বিচারের আগেই বিধান’ ঠিক করে বসেছে। তারা একে-অপরকে দেখলেই শিং উঁচিয়ে তাড়া করে, আর তাদের খুরের ধুলোয় চাপা পড়তে থাকে পূর্বপুরুষের জ্ঞানভাণ্ডার। কোনও হতভাগা মধ্যস্থতা করতে এলে বা নতুন কিছু বলতে গেলে সে দু’দিকেরই গুঁতো খায়![25]

– বুঝলাম। কিন্তু, নিরুক্ত বা হরিবংশ লিখেও শেষরক্ষা হল না কেন? লোকে সব ভুলেই বা গেল কেন?

– একসময়ে এসে গভীর চর্চা বন্ধ হল বলে।…

– তাই বলে এমন ‘উল্টো বুঝলি রাম’!?

– কিছুই রাতারাতি বদলায় নি। একটা লম্বা সময় ধরে, মূলতঃ বৌদ্ধযুগের শেষ ভাগ থেকে, পুরো ব্যাপারটা ঘটেছে।

– বৌদ্ধযুগ? বলো কী!

– হ্যাঁ। বৌদ্ধদের তাড়াতে গিয়েই তোরা চরম গোঁড়ামি-টা ধরলি।[26] শাস্ত্রের গায়ে ‘ধম্মশাস্ত্র’ তকমা এঁটে বামুনরা লেখাপড়া ছেড়ে কথায় কথায় ‘ফতোয়া’ ঝাড়তে শুরু করল। চোখের সামনেই তো দেখলাম, ফতোয়ার দাপটে মানুষ তখন সদা তটস্থ, -এই বুঝি তার ধোপা-নাপিত বন্ধ হয়!

     – শাস্ত্রচর্চাও বন্ধ হয়ে গেল?

     – চর্চার নামে পাঁচ-ছ’শো বছর ধরে একদল ‘ভণ্ডিৎ’[27] ‘তাল পড়িলে ঢিপ্ হয়, নাকি ঢিপ্ করিয়া তাল পড়ে’ –এই জাতীয় তর্কের মীমাংসার(!) ভয় দেখাতে শুরু করল।[28] সঠিক পড়াশোনা যে একেবারেই চলছিল না, -তা নয়, তবে তা অতি সামান্য। একমাত্র নবদ্বীপ ছাড়া মুসলমান শাসনে তা আরও কমে গেল, ইংরেজ আমলে এসে ঠেকল তলানিতে। ‘চর্চা’র গোড়া কেটে ‘শাস্ত্রচর্চা’র নামে হতে লাগল বিকৃত অর্থে শাস্ত্রপাঠ। সংস্কারের নামে চলতে লাগল কুসংস্কারের অষ্টপ্রহর নামকীর্তন।

     লজ্জায় বিদ্যেধরের মাথা হেঁট। মা দূর্গা বলে চলেছেন, ‘…উদ্ভট লম্ফঝম্ফ দেখতে দেখতে তিতিবিরক্ত মানুষ এই ‘ভণ্ডিৎ’দের ব্যঙ্গ করতে শুরু করে।[29] কয়েকজন তো সংস্কৃত টোল বন্ধ করতে উঠেপড়ে লাগল।[30] নিজের মতলবে বিলিতি সরকারও এ’তে উৎসাহ দিচ্ছিল। -লোকে ইংরিজী শিখলে তবেই না সরকার সহজে প্রভুভক্ত চাকর পায়!… গোড়া আগেই কাটা হয়েছিল, এবার ডালপালাও ছাঁটা সারা। বৃক্ষের পরিণতি চ্যালাকাঠ! শাস্ত্রের গায়ে ধম্মের তকমাটাও আলকাতরার দাগের মতো চিরদিনের জন্য লেপ্টে গেল।’

     ‘দেশ স্বাধীন হয়েও কিছু বদলাল না?’ –বিদ্যেধর করুণ মুখে প্রশ্ন করে।

     – চ্যালাকাঠ থেকে ছায়া পাওয়া যায় না বাবা। -তা দিয়ে শুধু পেটানো আর জ্বালানো যায়।… দেশ স্বাধীন করে মুণ্ডকোপনিষদ থেকে ‘সত্যমেব জয়তে’ কথাটা জাতীয় প্রতীকে জুড়লি বটে, খেয়াল করলি না সেই মুণ্ডক উপনিষদ-ই বলে –‘যাগযজ্ঞ অনিত্য ও অক্ষম। কিন্তু, কিছু নির্বোধ এই কর্মকে মুক্তিলাভের উপায় বলে মনে করে।[31]… আসলে ততদিনে একদল ধান্দাবাজ সেই ‘ভণ্ডিৎ’দের সাথে মিলে ধম্মের দোকান খুলে বসেছে। লোকে ধম্মের নামে কখনও ফুর্তি করে, কখনও একে-তাকে খুঁচিয়ে মারে।

     – আচ্ছা, ধার্মিক মানুষদের মধ্যে কি কেউ ছিল না এদের আটকানোর?

     – ছিল তো। যখন ব্রাহ্মণরা ধান্দাবাজ পুরুতঠাকুরে পরিণত হতে শুরু করল, কর্ম ছেড়ে জন্মের ছুতো ধরতে শুরু করল, ছোঁয়াছুঁয়িতে জাত যেতে শুরু করল, -অধঃপতনের সেই গোড়াতেই সনাতনবাদীরা ধর্মের এই নতুন চেহারাকে ‘হীন দোষে দুষ্ট’ বলে খুব চেঁচামেচি করেছিল।[32] -আজকেও যেমন অনেকে করে। কিন্তু ধম্মের দোকানদাররা শুনলে তো!… এরা তো আমার বড়ছেলেটাকেও ছাড়ে নি! -গ্যলন গ্যালন দুধ গিলিয়ে[33] বেচারার পেটখারাপ বাঁধিয়েছিল! আরও যা যা করে তা না-ই বা বললাম। এ-হেন ‘জাগ্রত জনগণ’ গোমাংস আন্দোলনের মতো রগরগে বস্তু কি ছেড়ে দেবে? সে’জন্যেই ঠিক করেছি এবার আর যাব না।

     – মিছেই ভয় পাচ্ছ মা। ওরা তোমারই ভক্ত।

– ভরসা হয় না বাবা। বাচ্চাকাচ্চা ‏‏‏‏নিয়ে একবার ওই ঝামেলার মধ্যে পড়লে কে সামলাবে বলতো? মাত্র একখানা ত্রিশূল দিয়ে কি আর হাজারটা ত্রিশূল ঠেকানো যায়!

     – কিন্তু, তুমি তো পারো সবার ভুল ভাঙাতে। অন্ততঃ স্বপ্নে দর্শন-টর্শন দিয়েও যদি কিছু-?

     – পাগল পেয়েছিস!… যে অভাগা পিতৃপরিচয় জানে না, তাকে বাবার নাম শেখানো যায়। কিন্তু, যে আহাম্মক চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বাপের নাম ভুল জানে, তাকে শেখানো? -আমি কেন, আমার ‘উঁনা’র-ও অসাধ্য।…

     মনের দুঃখে ঝিমিয়ে পড়েছিল বিদ্যেধর। হঠাৎ জলের প্রবল ঝাপটা!

– এ কী রে বাবা, সমুদ্রমন্থন নাকি? নাকি একেবারে মহাপ্রলয়?…

না। চক্কোত্তি চোখ খুলে দেখে, –দশদিকে দশভূজার চিহ্নমাত্র নেই। জলের বালতি হাতে সিংহনাদ ছাড়ছে তার গিন্নি, ‘ভরসন্ধেয় গাঁজা টেনে বসে আছ! লজ্জাও করে না?‍… ইতর, ছোটোলোক…’

     কিছুক্ষণ আচ্ছা করে রগরানোর পর গজগজ করতে করতে চক্কোত্তিগিন্নি গজগামিনী ছন্দে রওনা দেয়।

বিদ্যেধর তখনও ভেবে পাচ্ছে না, –গাঁজা আসলে কে টেনেছে?…।।

***

মুচলেকা: ‘ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধি’ নিয়ে এই গদ্যটি লিখিত হলেও, লেখার ভাষা যেহেতু ‘প্রতীকী’, তাই বিষয়টির সাথে অপরিচিত পাঠক কিছু ক্ষেত্রে হোঁচট খেতে পারেন। লেখক তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী, কিন্তু নিরুপায়।

=============

টীকা:

[1] ‘রাজ্ঞো মহানসে পূর্ব রন্তিদেবস্য বৈ দ্বিজ। অহন্যহনি বধ্যতে দ্বে সহস্রে গবাং তথা।।’ – মহাভারত, বনপর্ব ২০৮/৮।

[2] ‘উক্ষ্ণোমো হি মে পঞ্চদশ সাকং পচন্তি বিংশতিম্। উতাহমদ্মি পীব ইদুভা কুক্ষী পৃণন্তি মে বিশ্মস্মাদিন্দ্র উত্তরঃ।।’ -ঋগ্বেদ, ১০/৮৬/১৪।

[3] ‘…তস্মদ্ধেন্বনডুহোনার্শ্নীয়াত্তদু হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যোহ শ্নাম্যেবাহমংসলং চেদ্ভবতীতি।’ – শতপথব্রাহ্মণ, ৩/১/২/২১।

[4] দ্রষ্টব্য: বৃহদারোণ্যক উপনিষদ, ৬/৪/১৪-১৮।

[5] ‘গোলোক বৈকণ্ঠপুরী সবার উপর। লক্ষ্মী সহ আছেন তথায় গদাধর।।’ –কৃত্তিবাসী রামায়ণ, আদিকাণ্ড, প্রথম ছত্র।

[6] (‘গো’ + √ইষ = গবেষ। √গবেষ + অন = গবেষণ। – বঙ্গীয় শব্দকোষ, হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়)  ‘গবেষণা’ শব্দের অর্থ আমরা জানি, ‘যে কোনও’ (অবশ্য শুধুই ‘গরু’ নয়!) বিষয়ের, যার দৃশ্য বা অদৃশ্য গতি আছে (যা ‘dynamic’, সুতরাং সে ‘গো’), তার তত্ত্ব অন্বেষণ। পুরোপুরি ‘static’ কোনও বিষয়ের ওপর ‘study’ হয়, ‘research’ হয় না। -‘Research Methodology’ by C.R. Kothari.

[7] গো শব্দের বিভিন্ন অর্থের জন্য দ্রষ্টব্য: বঙ্গীয় শব্দকোষ – হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়, যাস্কের ‘নিরুক্ত’, ইত্যাদি।

[8] ‘গো’ শব্দ-ই লাতিন-ফেরৎ ইংরেজিতে ‘go’ হয়েছে: Bloomsbury Dictionary of Word Origins – John Ayto.

[9] ‘গো’ শব্দ ‘গম্’ বা ‘গা’ ধাতু হইতে নিষ্পন্ন, ইহার অর্থ ‘যে যায়’ (গচ্ছতীতি)। -যাস্কের ‘নিরুক্ত’ (Calcutta University Press), এবং বঙ্গীয় শব্দকোষ, হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় (Sahitya Academy)

[10] আদি ভাষায় ছিল ‘ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধি’র (verb based semantics) ব্যবহার। আধুনিক সংস্কৃত সহ বর্তমান ভাষাগুলি হল ‘প্রতীকী’ (logo-centric) বা ‘বিশেষ্যভিত্তিক’। – বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ। উদাহরণ: প্রতীকী অর্থে গাছের আরেক নাম পাদপ। কারণ সে তার পদ বা শিকড়ের দ্বারা পান করে (বৃহৎ অর্থে ‘পালিত হয়’)। প্রতীকী ভাষায় আমরা গাছ বা পাদপ নামক ‘আকার’টিকে আগে দেখে পরে তার ‘পালিত হওয়া’ ক্রিয়া বা বৈশিষ্ট্যটি দেখি। আর ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধিতে শব্দটি তৈরি হয়েছিল ঠিক উল্টোপথে। প্রথমে ‘পালিত হওয়া’ নামক ক্রিয়াটি চিন্হিত হয়। আর যেহেতু গাছের মধ্যে এই ক্রিয়াটি চলে, তাই তার নাম হয় পাদপ। উল্লেখ্য, ‘পদ’-এর আরেকটি অর্থ ‘designation’। এই ‘designation’–দ্বারাও অনেককিছু ‘পালিত হয়’ বলেই ‘জ্ঞানবৃক্ষ’, ‘সমাজবৃক্ষ’ বা ‘management tree’ জাতীয় শব্দ বা ধারণাগুলি আজও আমাদের চারপাশে ঘোরাফেরা করে। যে ‘management tree’ আবার ‘শাখা’ বা ‘branch’ অফিসও খোলে! (শব্দের উৎস না জানলেও প্রকৃত অর্থ টের পাওয়া যায়। শুধু তার ‘সমস্ত ধরণের’ ব্যবহার দেখতে হয়। – ‘Philosophical Investigations’, Ludwig Wittgenstein)

[11] ‘I learned very early the difference between knowing the name of something and knowing something.’ – Richard Feynman, Nobel Laureate (1965) Physicist.

[12] ‘ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধি’র আরেকটা নমুনা; ‘ক্রিয়াকারী’(ক)-এর ‘রয়ে যাওয়া’(র) –এই পুরো ‘কাজ’টা যেখানে ঘটে, তা হল ‘কর’। -সে ‘হাত’, ‘রাজস্ব’, ‘কিরণ’ যা কিছুই হোক না কেন। আবার কোনও কিছু যদি একাধিক ‘কাজ’ করে, তাহলে কাজ অনুসারে তার একাধিক ‘নাম’ হয়। ‘নাম’ খুঁজতে অভ্যস্ত আমরা যাকে ‘সমার্থক শব্দ’ বলেই খালাশ! মানুষের ‘body’-এর বৃদ্ধি বা ‘দিহ্ ক্রিয়া’ হয়, তাই সে ‘দেহ’। তার ক্ষয় বা ‘শৃ ক্রিয়া’ হয়, তাই সে ‘শরীর’। তার ‘গমন ক্রিয়া’ হয়, তাই সে ‘গা’ বা ‘গাত্র’। সে ‘বপন করা বীজ(শুক্র)-এর নবোত্তীর্ণ’ রূপ, তাই সে ‘বপু’। তার মধ্যে তাড়ন (ত্) বা ‘impulsion’ বহমান, তাই সে ‘তন’ বা ‘তনু’। সে ‘কারী’র অংশ (অয়), তাই সে ‘কায়া’।… সত্যিই কি এগুলি ‘সমার্থক’ শব্দ?

[13] প্রয়োজনের বেশি উৎপাদন বা তার বেচাকেনা ছিল দণ্ডনীয়: ‘য়াবদ্ ভ্রিয়তে জঠরং তাবত্ স্বত্ত্বং হি দেহিনাম্। অধিকং য়োহভিমন্যেত স স্তেনো দণ্ডমর্হতি।।’ – শ্রীমদ্ভগবদ্‌ পুরাণ, (৭/১৪/৮৯)

[14] নিঃশ্বাস নেওয়ার ‘অধিকার’ মানে বাতাসের ‘মালিকানা পাওয়া’ নয়। পৃথিবীতে (সভ্য জীব!) মানুষই একমাত্র মালিকানা নিয়ে লড়াই করে। পশুরা অধিকারের জন্য লড়তে পারে, মালিকানার জন্য নয়।

[15] (উৎপন্ন) Product = any object which is produced for consumption, (পণ্য) Commodity = any object which is produced for consumption and exchange in markets – Dictionary of Modern Economics.

[16] ‘His (owner’s) commodity possesses for himself no immediate use-value… for himself its only direct use-value is that of being a depository of exchange-value, and, consequently, a means of exchange’ – Karl Marx (Das Kapital).

[17] ‘Currency’ শব্দটি এসেছে ‘Current’ থেকে। (Bloomsbury Dictionary of Word Origins) লক্ষনীয়, ‘Current’-এর অর্থও প্রবাহ বা গতিময়তা।

[18] ‘ব্রাহ্মণকে গো-দানে’র রীতি আসলে সমাজের / রাষ্ট্রের / ব্যক্তিবিশেষের তরফ থেকে জ্ঞানচর্চাকারীদের ‘পাঠবৃত্তি’ বা ‘scholarship’ দান।

[19] প্রসঙ্গ – ‘পতিতপাবনী’: উল্লেখ্য, বৈদিক সমাজে ‘বৈশ্য’রা ছিল দ্বিতীয় সর্বনিম্ন শ্রেণী।

[20] ‘গো প্রভৃতি পবিত্রতা-সম্পাদক পদার্থসমূহের মধ্যে সুবর্ণই সর্ব্বাপেক্ষা অধিক পবিত্রতা-সম্পাদক পাদার্থ।’ -কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত।

[21] পুঁজ ও পুঁজি, -শব্দদুটির উৎস একই। – বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, চাষীর ভাগের ধান জোতদার বা জমিদারের খামারে জমে থাকলে তাকে ‘পুঁজ’ বলা হয়। তেভাগা সংগ্রামের (১৯৪৬-৪৭) একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় ছিল ‘পুঁজ ভাঙা আন্দোলন’।

[22] গোমূত্র = পণ্যমূল্য (গো) সীমায়িত রূপে ত্রাণ পায় (মূত্র) যাহাতে।  – বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ।

[23] বরাহ = যাকে ‘বরণ’ করে ‘আহরণ’ (কাজে সংযুক্ত / সংগ্রহ) করা হয়। -উঁচুপদের কর্মকারী বা আমলা। (বরাহাবতার, বরাহমিহির, বরাহকল্প, বরাহনগর…) -বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ। ‘নিরুক্ত’ মতে বরাহ = মেঘ, অঙ্গিরা ঋষির বংশধর, বৃহস্পতির সখা, ইত্যাদি। আর যে পশু বাছাই করে (বরণ করে) মূল আহরণ করে, -সে বরাহ। ‘অয়মপীতরো বরাহ এতস্মাদেব; বৃহতি মূলানি বরং বরং বৃহতীতি বা।।’

[24] সতী = ‘সত’-এর ভাব সক্রিয় (ই) যাহাতে। – যে জনগণ সামাজিক আইন-শৃঙ্খলা মেনে চলে। (বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ) আইন-শৃঙ্খলার ‘মৃত্যু’ হলেই ‘সতী’দের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়, তারা ভেতরে ভেতরে ‘জ্বলে-পুড়ে মরে’। -এই হল ‘সতীদাহ’। বাইরে থেকে গায়ে আগুন দিতে হয় না! (সচ্চরিত্রের মহিলার মধ্যেও ‘সত-এর ভাব সক্রিয়’, তাই সে-ও সতী।)

[25] শুধু এদেশে নয়, বিশ্বজুড়ে ভক্তিবাদীদের গোঁড়ামির বহু নিদর্শন আমরা জানি। গ্যালিলিওর কাছে ক্ষমা চাইতে চার্চের ৩৫০ বছর লেগে যায়!   শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বৈজ্ঞানিকদের বন্দী করা, অত্যাচার করা, জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার পর অবশেষে ৩১ অক্টোবর, ১৯৯২ পোপ দ্বিতীয় জন পল আনুষ্ঠানিকভাবে চার্চের ভুল স্বীকার করেন। (তথ্যসূত্র: ‘John Paul II: Man of History’ by Edward Stourton, Hodder & Stoughton Publication) যুক্তিবাদীদের গোঁড়ামির একটি উদাহরণ: কমিউনিস্ট পার্টি একসময় মেন্ডেলের ‘জিনতত্ত্ব’কে ‘অবৈজ্ঞানিক’ ঘোষণা করে। কারণ, সূত্রপ্রবক্তা গ্রেগর জোহান মেন্ডেল পেশায় ধর্মযাজক ছিলেন। (তথ্যসূত্র: ‘The Methodology of Scientific Research Programmes’ by Imre Lakatos, Cambridge University Press).

[26] ‘বৌদ্ধধর্ম বৌদ্ধচর্চা করিতে নির্মূল। এতদৃশ অনুষ্ঠান করে সাধুকুল।।’ -তারকেশ্বরের শিবত্বত্ত্ব পুঁথি। ‘…স্তূপে যে করিবে অর্ঘরচনা শূলের উপর মরিবে সে জনা অথবা নির্বাসনে…’ -‘পূজারিনী’ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। (এই সময়টিকে রবীন্দ্রনাথ চিহ্নিত করেছেন হিন্দু প্রতিক্রিয়া যুগ হিসেবে।) বৌদ্ধদের একভাগ চলে গেল হিমালয়ের ওপারে। এদেশে রয়ে যাওয়া অন্যভাগ পরবর্তী কালে পরিণত হয় ‘নেড়ে-মুসলমানে’। বৌদ্ধযুগে বা মুসলমানযুগে হিন্দুসমাজের নিচুতলার মানুষের মধ্যে ধর্ম পরিবর্তনের ঝোঁক ছিল সবচেয়ে বেশি। এই বহির্মুখি স্রোত আটকাতে গোঁড়ামির পাশাপাশি স্রোতের মুখ ঘোরাতে সে’ সময় কিছু ‘religious concession’-ও দেওয়া হয়। তখনই বৌদ্ধ দেবতা ধর্মরাজ (যম নয়), অন্তজদের উপাস্য আটেশ্বর, পাঁচুঠাকুর, ঢোলাইচণ্ডী -দের কখনও ‘শিবের ভাই’ বা ‘দূর্গার বোন’ –গোছের পরিচয় দিয়ে ‘দেবতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। (তথ্যসূত্র: ‘বাংলার লৌকিক দেবতা’ –গোপালকৃষ্ণ বসু) সত্যনারায়ণ বা সত্যপীর, গাজীপীর, মানিকপীর, প্রমুখ মুসলমান পীর হিন্দু দেবতা হিসেবে পুজো পেতে শুরু করে! সত্যনারায়ণ/ সত্যপীরের পাঁচালিতে ‘জয় জয় সত্যপীর, সনাতন দস্তগীর’ বা ‘কলিতে যবন দুষ্ট, হৈন্দবী করেন নষ্ট, দেখি রহিম শেষ হইল রাম’ {সূত্র: ‘সত্যপীরের কথা’ –রামেশ্বর ভট্টাচার্য্য (Calcutta University Press, 1930) ও পুরোহিত-দর্পণ, ৫ম খণ্ড} –কথাগুলি তার মুসলমান-পরিচয়ের প্রমাণ।

[27] ভণ্ড + পণ্ডিত = ‘ভণ্ডিৎ’! (ব্যাকরণে নয়, ইহা রসিকতায় সিদ্ধ।)… মজার বিষয় হল, এই অভিধান বহির্ভূত শব্দটিকেও ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধিতে analysis করলে তার ভাবার্থ পাওয়া যায়। যথা: ভণ্ডিৎ = ভণ্ড + ই (সক্রিয়ন) + ৎ (উল্লম্ফন)!… বর্তমান বাংলা সিনেমার কল্যাণে ‘পাগলু’, ‘ছাগলু’ গোছের সদ্যসৃষ্ট শব্দগুলির ক্ষেত্রেও তা সম্ভব। ‘উ’-এর ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ ‘নবরূপে উত্তীর্ণন’ বা ‘transformation’। শব্দের শেষে ‘উ’ যুক্ত হলে বা শেষ স্বরবর্ণটি ‘উ’-এ পরিণত হলে তা মূল শব্দটির ‘লঘুকরণ’ (one kind of transformation) সাধন করে। পাগল, ছাগল, কালো, সোনা, বাপ, কাকা, মামা, মূর্খ, সন্ত্, বাবা, এমনকি বিদেশী bubble, প্রভৃতি শব্দের ‘লঘুকৃত’ বা ‘নরম’ রূপ হল পাগলু, ছাগলু, কালু, সোনু, বাপু, কাকু, মামু, মুখ্যু, সন্তু, বাবু, বাবলু -শব্দগুলি। প্রশ্ন উঠতেই পারে –তা হলে কি ‘আল’ থেকে ‘আলু’? -উত্তর: জমিতে মালিকানার বা বিভাজনের ‘অস্তিত্ব’কে (আ) বা তার ‘boundary’-কে ‘লালন’কারীর (ল) নাম ‘আল’ (‘আলাভোলা’ = যে মালিকানা বা উচ্চনীচভেদ জাতীয় বিষয়বুদ্ধি ভুলে গেছে / জানে না)। আর মানবশরীরের ‘অস্তিত্বে’র (আ) ‘লালন’কারীর (ল) বা ‘খাদ্যে’র একপ্রকার ‘নবরূপে উত্তীর্ণ’ (উ) বা ‘transformed’ রূপ হল ‘আলু’।… এই পদ্ধতিতে তথাকথিত ইতর গালাগালগুলির-ও ভাবার্থ নির্ধারণ সম্ভব। কারণ, বর্তমানের একাডেমিক শিক্ষায় ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধির অস্তিত্ব না থাকলেও, আমাদের অজান্তে আমাদের মস্তিষ্ক ক্রিয়াভিত্তিক বিধিতেই চলে।

[28] ‘বাঙালীর মস্তিষ্ক ও তার অপব্যবহার’ – আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়।

[29] ‘…হগলই ব্যাদে আছে!’ –বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার একটি বিখ্যাত উক্তি।

[30] রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, প্রমুখ। -তথ্যসূত্র: নীরদচন্দ্র চৌধুরী।

[31] ‘প্লবা হ্যেতে অদৃঢ়া যজ্ঞরূপা অষ্টাদশোক্তমবরং যেষু কর্ম। এতচ্ছ্রেয়ো যেহভিনন্দন্তি মূঢ়া জরামৃত্যুং তে পুনরেবাপি যন্তি।।’ – মুণ্ডকোপনিষদ।

[32] আদি ধর্ম্মের নাম সনাতন ধর্ম্ম। হিন্দু ধর্ম্ম হল সনাতন ধর্ম্মের অধঃপতিত রূপ। (‘হিন্দু: হীনং দুষয়তীতি’ – শব্দকল্পদ্রুম। ‘হিন্দু: হীন দোষে দুষ্ট যে’ – ছাত্রবোধ অভিধান, ১৯১৭)

[33] সেপ্টেম্বর ২১, ১৯৯৫: দিল্লী থেকে “গণেশের দুধ খাওয়া’-র গুজবের প্রচার হয়। তারপর সেই দুধ খাওয়া দেখতে শহরে-গ্রামে হাজারে হাজারে লোক মন্দিরে ছোটে। সারা ভারতে সেদিন কয়েক লক্ষ গ্যালন (কয়েক কোটি-ও হতে পারে!) দুধ নষ্ট হয়েছিল এই গুজবের দাপটে।

সৌরভ মিত্র। লেখক ও বাঙলা ভাষার গবেষক। জন্ম কলকাতা, ভারত। তাঁর লেখার বিষয় বাংলা ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব, ছোটগল্প, উপন্যাস ও রম্যরচনা। প্রকাশিত বইপত্র: 'আয় বৃষ্টি' (ভাষালিপি প্রকাশনী, ২০১০), 'আদরের মরাগাঙ' (প্রতিভাস প্রকাশনী, ২০১১), 'টিপিক্যাল মিডিলক্লাস' (একুশশতক প্রকাশনী, ২০১৩), 'হুক' (সৃষ্টিসুখ প্রকাশনী, ২০১৮)...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ