দাসপরম্পরা

দাসপরম্পরা
গল্প
Bengali
দাসপরম্পরা

দেশে দেশে সাড়া না পড়লেও গাঁয়ে পড়েছে। বছর পঁয়তিরিশের এক মুসকো জোয়ানের নুনুকাটা উৎসব। বাচ্চা নয়, কিশোর নয়, রীতিমতো জোয়ান। তার ওপরে একজন হিন্দুর মুসলমানে পরিণত হওয়া। গাঁ তো বটেই, পুরো ইউপির বাসিন্দাদের মধ্যে বেশ একটা ধর্মীয় জোশ এনে দিয়েছে ব্যাপারটা। এমনিতে গাঁয়ে যা একটু ধর্মভাব জাগে, তা ঈদ-বকরি ঈদ-শবেবরাতে। গাঁয়ের মসজিদ বছরে তিনদিন ছাড়া ফাঁকা। জুম্মাবারেও গাঁয়ের বউ-ঝিরাই বরং মাঝেমধ্যে আসে গাঁয়ের মসজিদে। ইমাম সাহেবের কাছ থেকে তাবিজ-পানিপড়া নিতে। এই নিয়ে ইমাম সাহেবের মনে ভারি দুঃখ। গাঁ ভরতি বেনামাজি। নামাজের জন্য ডাকলে লোকজন ছ্যাবলা হাসে। চাষবাসের জন্যি সারাদিন মাঠেত পড়ি থাকতি হয়, মসজিদে কেমতে আসি। কিংবা, আমার একখান খালি লুঙ্গি, চাদ্দিক ফাটা, কী পড়ি মসজিতে আসপো কন! সাচ্চা কথা। ফাটা লুঙ্গি পরে থাই-পাছা বের করে গাঁয়ের লোকের সামনে বের হওয়া যায়, কারণ প্রায় সবারই এক অবস্থা, কিন্তু আল্লার ঘরে এসে তার সামনে দাঁড়াতে লজ্জা লাগার কথাই। কারণ আল্লা তো রোজকার চেনা মানুষ না! ইমাম সাহেব তখন নবীজির দোস্তো বক্কর খলিফার তালিমারা ফাটা কাপড়ের গল্প বলেন, কিংবা এক অক্ত নামাজ না পড়লে পাঁচ শ বছর দোজখের আগুনে জ্বলতে হবে বলে ভয় দেখান; লোকগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ভয় পায়ও, কিন্তু মসজিদে আসে না। ইমাম সাহেবের তাই বিশ্বাস, এ গাঁয়ের লোকজন প্রায় আধা জানোয়ার। কিন্তু কয়েকদিন হলো গাঁ জুড়ে বলকানো দুধের মতো উথলে উঠছে ধর্মভাব। এর আগে এই গাঁয়ে হিন্দু থেকে কেউ মুসলমান হয়নি, আজ হচ্ছে। একি সোজা কথা!
ইউনিয়ন পরিষদের অফিসে হবে নুনুকাটা। এত বড় একটা ব্যাপার। তাই চেয়ারম্যান নিজে তদারক করছে ব্যাপারটা। বিল্লাল হাজাম তার-ক্ষুর-কাঁচি-চিমটা-পোড়ামাটি নিয়ে রেডি। গোল হয়ে থাকা লোকজনের মধ্যে পাটির ওপর ভ্যাবলার মতো বসে আছে বটকা। বটকা মানে বটকৃষ্ণ দাস। আজকে অবশ্য বটকার নাম পরিবর্তন হবে। আবদুল বারেক। ইমাম সাহেব রেখেছেন। আল্লার নিরানব্বুই নামের এক নাম।
লোকজন ভিড় করে দেখছে। একটু দূরে মেয়েদের জটলা। কাছে আসতে লজ্জা। নিষেধও আছে। পরপুরুষের যৌনাঙ্গ দেখা মেয়েদের মানা। তবুও ঘরে আটকে থাকতে পারেনি তারা। এমন ব্যাপার ছেড়ে ঘরে থাকা যায়! নিজেদের মধ্যে ফিসফিসিয়ে রসিকতা করছে তারা। মুখে আঁচল চেপে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে এ-ওর গায়ে।
হাজাম রেডি। পিঁড়িতে বসে আছে বটকা। নতুন লুঙ্গি দেওয়া হয়েছে তাকে। সেটা এখন কোমরে গোটানো। মর্তমান সাইজের পুরুষাঙ্গ বের করে বসে আরে সে। কিন্তু লজ্জা পাচ্ছে বলে মনে হয় না। তার চেহারায় কিছুটা ভীতি আছে হতচকিত ভাব। বিশালদেহী লোকটা ঢোক গিলে বলল, নুনু না কাটলি হয় না! আমার ভয় করতিছে!
হা হা করে উঠল লোকজন। শতকণ্ঠে অভয়বাণীÑ আরে কুনো ভয় নাই। এট্টুখানি চামড়া কাটতি হবি। বেদনা এট্টুও লাগবি না।
তবুও ভয় যায় না বটকার। কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে সে বসে থাকে পিঁড়িতে।
চেয়ারম্যান নিজে পান দিয়ে চোখ ঢাকে বটকার।
বিল্লাল হাজাম রেডি, বলেÑ ক বটকা, লা এলাহা
লা এলাহা
ইল্লাল্লাহু
ইল লাল লাহু, ভয় লাগছে
মোহাম্মাদুর
মো-মোহাম-মাদুর, ভয়…
রাছুলুল্লাহ
রাছুলুল্লাহ! ওরে বাপরে ই ই ই!
ব্যাস! বটকা এখন আব্দুল বারেক।

ঘটনা শুরু ভোট নিয়ে। গাঁয়ে বটকাকে সবাই চেনে। রায়বাড়ির মুনিষ। সেখানেই থাকা খাওয়া। রায়বাড়ি মানে গাঁয়ের একমাত্র আর্যবংশ। এ গাঁয়ের লোকজন রায়বাড়িতে ঢুকেছে, তবে তা মুনিষ খাটতে কিংবা পুজোর দান নিতে। বেণী রায়কে দেখলে এখনও পথ ছেড়ে দাঁড়ায় গাঁয়ের চেয়ারম্যান। প্রত্যেক ভোটের সময় খুব নম্রভাবে ভোট চাইতে যায় সেখানে। কেননা বেণী রায় মাথা নাড়লেই সমর্থন জানায় লোকজন। কিন্তু চেয়ারম্যানের চেলারা খেয়াল করেছে বটকা ভোট দিতে যায় না। তার নামও ভোটার লিস্টে নেই। বটকাকে জিজ্ঞেস করলে বলেÑ বাবু জানে।
আরে বাবু জানে মানে! তোর নাম আমরা লিস্টে তুলি দি!
বাবুরে বলতি হবি।
বাবুরে বলতি হবি ক্যান? যেকুনো মানুষের নামই ভোটার লিস্টিতে উঠপি।
না। আমি বাবুর বান্দা মুনিষ। বাবুর হুকুম লাগবি।
ক্যান, বাবুরে বলতি হবি ক্যান? বাবুর মুনিষ তো আরও আছে। তারে নাম ভোটার লিস্টিতে আছে। তোর নাম তুলি দিলি তো ক্ষতি নাই।
লিস্টিতে নাম আমার দরকার নাই। আমার খুব কষ্ট হতিছে। আমারে এট্টা মাগি দে।
মাগি!
হ্যাঁরে দাদা। খুব কুটকুটায়। ঘুম আসে না। আমারে এট্টা বউ দে।
ধুস শালা, বউ কি দেওয়া যায়? তুই নিজে বিয়ে করিস না ক্যান?
বাবু দেয় না যে।
বাবুর দেওয়া লাগবিনানে। তুই মুনিষ খাটিস। টেকা কী করিস?
টেকা তো দেয় না বাবু। কয়, শোদ হতিছে।
ও, তুই বাবুর কাছে ধারিস! টেকা নিছিলি?
আমি না। আমার ঠাকুদ্দার বাপ।
তোর ঠাকুদ্দার বাপ!
এভাবেই বেরিয়ে পড়ে এক বিস্ময়। বটকা হচ্ছে বংশপরম্পরায় রায়বাড়ির ক্রীতদাস। বিংশ শতাব্দীতে এসেও এই গাঁয়ে অনেক আদিম প্রথা দিব্যি বেঁচে-বর্তে আছে। কিন্তু তাই বলে প্রত্যক্ষ ক্রীতদাস! পাকা দলিল বেণী রায়ের কাছে। পড়ে শুনিয়েছে বেণীবাবু বটকাকে। মুড়মুড়ে তুলোট কাগজের সইসাবুদ করা দলিল।
আত্মবিক্রয় পত্র
রূপৈয়া ওজন
দশ মাষ
নিশান সহী।
মহামহিম শ্রীযুক্ত রামেশ্বর রায় মহাশয় বরাবরেষু লিখিত শ্রী সনাতন দাস ওলদ গোপীবল্লভ দাস সাকিন মৌজে বানিয়াজঙ্গ মামুলে পরগণে বোয়ালিয়া সরকার বাজুহার কস্য আত্মবিক্রয় পত্রমিদং কার্য্যাঞ্চ আগে আমি আর আমার স্ত্রী শ্রীমতি বিবানাম্নি দাসী এই দুইজন কহত সালিতে অন্নোপহী ও কর্জ্জোপহতি ক্রমে নগদ পণ ৯ রূপেয়া পাইয়া তোমার স্থানে স্বেচ্ছাপূর্বক আত্মবিক্রয় হইলামÑ ইতি তাং ১১ কার্ত্তিক সন ১১০১ বাংলা মোতাবেক ১৫ সহর রবিনৌয়ন সন ৩৯ জলুষ।
শ্রীমতি বিবানাম্নিদাসী
কস্যাঃ সম্মতিঃ
শ্রীসনাতন দাস
কস্যঃ নিশান সহী
দলিলটা সাপের বশীকরণ তাবিজের মতো বেঁধে রেখেছে বটকাকে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়েছে বাবুর সিন্দুক থেকে চুরি করে পুড়িয়ে ফেলে দলিলটা, তারপর পালিয়ে যায় যেদিকে দুচোখ যায়। বেণী রায় যেন অন্তর্যামী। বলে দিয়েছে দলিল আরও একটা আছে। একই দলিল। রাখা আছে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার দপ্তরে। রাণীর হাত থেকে কারও নিস্তার নেই। একটু আঙুল হেলালেই হাজার হাজার সান্ত্রী-পুলিশ মর্ত্য-পাতাল চষে ফেলবে তার খোঁজে। অতএব, পালানোর জায়গা ভূ-ভারতে নেই।
একবার যখন মুখ খুলেছে বটকা, এসব সমস্ত কথাই একে একে জানা হয়ে যায় গাঁয়ের লোকের। চেয়ারম্যানের মধ্যে চাগিয়ে ওঠে মানবতাবোধ। গম, চাল, চুরি করে, রিলিফ চুরি করে লোক মেরে ফেলা যায়; কিন্তু তাই বলে, একটা মানুষ ক্রীতদাস হয়ে থাকবে! মানুষ কি গরু-বকরি যে বেচাকেনা হবে? বেণী রায় প্রথমে পাত্তাই দিতে চায়নি চেয়ারম্যানকে। কোর্ট-কাচারি-পুলিশের ভয় বেণী রায় করে না। কিন্তু ভড়কে গেল সাংবাদিকের কথায়। এই এক জাত হয়েছে, যাদের ভয় পাওয়া শুরু করেছে লোকজন। পুলিশের চেয়েও নাকি বেশি বিপজ্জনক এই জাত। শেষমেষ মুহুরি ডেকে দলিল করা হলো। বেণী রায় লিখে দিল তার কোনো দাবি-দাওয়া নেই বটকার ওপর। শুধু তা-ই নয়, এতদিনের মাগনা খাটিয়ে নেবার বদলে তিন বিঘা পতিত জমিও দিতে হলো তাকে।
ভেটের হাওয়া এসে দাস বটকা স্বাধীন হলো। বটকার জমি হলো ঘর হলো। কিন্তু বউ যে হয় না! সবচেয়ে নিচু জাতের হিন্দুও মেয়ে দিতে চায় না বটকাকে। তাই চেয়ারম্যানের এবং ইমাম সাহেবের পরামর্শে বটকা মুসলমান হচ্ছে। তাই এই নুনুকাটা অনুষ্ঠান।
বটকা এখন আব্দুল বারেক।
বটকার গল্প শেষ। এখনকার গল্প আব্দুল বারেকের।

২.
ট্রেনজুড়ে গিজগিজ করছে মানুষ। বসার জায়গা দূরের কথা, দাঁড়াতে পারলেও মানতে হবে ভাগ্যটা ভালো। এই অবস্থাতেও আব্দুল বারেক বসেই এসেছে। বেঞ্চিতে নয়। দুই বেঞ্চির ফাঁকে মেঝেতে দ হয়ে বসে থেকেছে পুরো সময়। মাথা আর হাঁটু চলে এসেছিল একই সমতলে। পিঠ-শিরদাঁড়া বেঁকে সাওতালি ধনুক। সঙ্গীরা এই কামরাতেই আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কিন্তু কে কোথায় তা বলতে পারবে না বারেক। দেখার জন্য বারেক একবারও মাথা তোলেনি। আসলে মাথা তোলার মতো অবস্থা নেইও। ক্ষিধে আর অনিশ্চয়তায় শরীর মন এতটাই ভেঙে পড়েছে যে দুই পা আর কিছুতেই ধড়টিকে বইতে রাজি নয়। হাঁচড়ে-পাঁচড়ে কোনোরকমে মানুষঠাসা ট্রেনে ওঠা। তারপরে বেঞ্চিতে বসে থাকা লোকগুলোর পায়ের ফাঁকে ঝুপ করে ময়দার বস্তার মতো বসে পড়া। কেউ কেউ সর সর বলে চিলচ্যাঁচান দিয়েছিল। কিন্তু বারেক নড়েনি। টি টি এসে টিকিট আছে? না থাকলে ট্যাকা বের কর শালা বলে পাঁজরে লাথি কষেছিল। তখনও সে মাথা তোলেনি। ট্রেনের বগির মেঝেতে পুরু ধুলোর আস্তরণ, বিড়ির টুকরা, পানের পিক, গায়ে গা ঠেকিয়ে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা বগিঠাসা লোকের শরীরের মিশ্রগন্ধ, হেগে-মুতে জল না ঢালা ল্যাট্রিনের দুর্গন্ধÑ সবগুলো মিলে এক বোঁটকা পাঁঠা-শুয়োরে মেলানো গন্ধ থম ধরে ঝুলে আছে বগির মধ্যে। এসবেও সে নির্বিকার। তার যেন একটাই ইচ্ছা, পরাজিত মুখটাকে দুই হাঁটুর জমিনে চিরতরে লুকিয়ে রাখা।
ন্যাকড়ায় প্যাঁচানো কাস্তের সাথে পেতলের থালাবাটি বিক্রি করে চল্লিশটা টাকা নিয়ে গা ছেড়েছিল বারেক। গাঁয়ে তো মঙ্গা। ভাতের স্বাদ ভুলে গেছে ওরা কয়েকদিন ধরে না খেয়ে খেয়ে। শুয়োরের মতো কচুর কন্দ খুঁড়ে তোলে মানুষ। ধুয়ে সেদ্ধ করলে পেটে কিছু দেওয়া যায়। নুরবানু বাটি হাতে রোজ যায় কোঠাবাড়িগুলোতে। রায়বাড়িতেও। ওরা ফ্যান দিলে নুন মিশিয়ে খাওয়ায় নান্নাকে। চার বছরের নান্না। না খেতে পেয়ে শুকিয়ে হাড্ডিগোনা। দেখায় দুই বছরের মতো। কাঠির কাকতাড়ুয়ার মতো শরীরে বড় দুই চোখ। বারেক ঘরে থাকলে নান্না ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। দুই চোখ যেন বলতে চায়Ñ বাপ, বড় খিদে লাগিছে, আমারে চাড্ডি খাতি দে! ছেলের চোখের দিকে তাকালেই বারেকের বুক মোচড়ায়। পালিয়ে পালিয়ে থাকে কন্দ খোঁজার নামে। একদিন দেখল পাঁতিপাড়ার শামছু মিয়া মরা কুঁচোসাপ লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ছেঁড়া গামছায়।
বারেক অবাক হয়ে বলেছিলÑ তুমি কি মেথর হয়ি গেছো শামছু ভাই? কুঁচো সাপ খাবা?
মরার চাইতে মেথর হওয়া ভালো। খেঁকিয়ে উঠে বলেছিল শামছুÑ সাপ না খেয়ি করবোডা কী? কেউ কি খাতি দেবি?
তার বউ রাজি হয়নি রান্না করতে। শামছু নিজেই কেটে সেদ্ধ করেছে। খাবার আগে বউ দোহাই পেড়েছে, ওগো বিষ লাগবেনে!
শামছু শোনেনি। নিজে খেয়ে ছেলেমেয়েদের খাইয়েছে। খা খা, দ্যাখ না বাইন মাছের সোয়াদ! হাগা-বমি কিছু হয়নি। শামছু ভয়ঙ্কর হাসি হেসে বলেছে, দেখলা তো, বিষ হতিছে মানুষের প্যাটের বিষ। সেই বিষের কাছে সব বিষ পানি। ইবার থাকি সব খাবো। সাপ-ব্যাঙ-কুত্তা-শিয়াল সব। মঙ্গা আমারে আর মারতি পারবিনানে।
আশ্বিন-কার্তিকের মঙ্গা। এই সময়ে ফেরিঅলা আসে দল বেঁধে। আজব ফেরিঅলা। ওরা কিছু বিক্রি করতে আসে না। আসে কিনতে। ঘটি-বাটি-গরু-ছাগল-কাস্তে-খুন্তি সব বিক্রি করতে থাকে মঙ্গায় আক্রান্ত গাঁয়ের মানুষগুলো। ঘরে খাবার নেই, কোথাও কোনো কাজ নেই, হাট-বাজারে পসরা নেই। মরদেরা পরণের একটা লুঙ্গি রেখে বিক্রি করে দেয় অন্য কাপড়, মেয়েরা একটা শাড়ি বাদে সবকিছু। বাঁচতে তো হবে! ফেরিঅলারা কিনতে থাকে যা পায়। এত সস্তায় অন্য সময়ে তো এসব কেনা সম্ভব নয়। না-খাওয়া মানুষ কচু-ঘেঁচুর খোঁজে ছোটে ডোবা-নালায়। না খেয়ে থাকতে থাকতে মেয়েরা, যাদের গতরে এখনও চটক অবশিষ্ট আছে, ফেরিঅলাদের হাত ধরে চলে যায় নিজের মরদ ছেড়ে। মঙ্গার বিষ। প্যাটের বিষ। বাঁচতে তো হবে।
মঙ্গার শেষে অঘ্রাণে কাজ জোটে আবার। যাদের শরীরে বেচবার মতো শক্তি থাকে, তারা আবার একরত্তি একরত্তি করে ঘর বানায়। যাদের তা থাকে না তারা হারিয়ে যায়। প্রতিবছর মঙ্গা এভাবেই কেড়ে নেয় কয়েকজনকে। খবরের কাগজে লেখা হয়, সাহায্য আসে, মঙ্গার বিষে জর্জরিতদের কেউ কেউ কিছু পায়। কিন্তু মঙ্গা বন্ধ হয় না। ফি বছর নিজেদের মরদকে ছেড়ে চলে যায় কয়েকজন যৌবনবতী নারী, মৃত্যুর বাড়ি যায় অশক্ত পুরুষ, শিশু কয়েকজন।
বারেক যখন বটকা ছিল, টের পায়নি মঙ্গা। তার মনিবের বাড়িতে ভাতে-কাপড়ে ঠিক থাকত। বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন। আজ টের পায়।
এই গাঁয়ে কাজ নেই, এই জেলায় ভাত নেই। এবারে মঙ্গা এলে গাঁ ছেড়েছিল বারেক। আরও কয়েকজন। বারেকের হাতে ছিল ন্যাকড়ায় জড়ানো কাস্তে আর চল্লিশটা টাকা। নুরবানু খালপাড়ে দাঁড়িয়েছিল নান্নাকে কোলে নিয়ে। ক্ষেতগুলোতে লকলকে ধানচারা কী সবুজ! অথচ গাঁয়ের পর গাঁ জুড়ে মঙ্গার নীল ছোবল।
বারেক বলেছিল নুরবানুকে, যদি সহ্য করি থাকতি পারিস, ভিনগাঁয়ের ফেরিঅলার হাত ধরি চলি না যাস, শুনি রাখ, আমি ফিরে আসপো। টাউনে কাম পাবো। তোর জন্যি ভাত, গ্যাদার জন্যি দুধ পাবো। ভাত-দুধ নিয়া আমি ফিরি আসপো।
ট্রেনের মধ্যে ধ্বসে পড়া বারেক ভাবে, নুরবানু কি এখনও আছে তার অপেক্ষায়? সে তো গাঁয়ে ফিরছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিশ্রুত কিছুই সঙ্গে নেই। শহরেও কাজ জোটেনি। জুটলেও পেট-ভাতায়। বারেক যখনই গরাস মুখে তুলেছে, সঙ্গে সঙ্গে মনে ভেসে উঠেছে নান্নার ড্যাবডেবে দুই চোখÑ বাপরে, আমারে চাড্ডি খাতি দে বাপ!
দুইদিন সাতদিন দশদিন। তারপরে সেই পেটভাতার কাজও যে জোটে না। মঙ্গার বিষে নীল হয়ে দলে দলে লোক আসছে শহরে। কে কাকে কাজ দেবে? এত কাজ তো শহরে বন্দরেও নেই। তাই আবার উপোস। শেষ পর্যন্ত বারেকের মনে হয়, না খেয়েই যদি মরতে হয়, তাহলে দূরে কেন, গাঁয়ে ফিরে একসঙ্গে মরাই তো ভালো। কিন্তু ট্রেনে উঠতি গিয়েও বারবার কুঁকড়ে যায় সে। গাঁয়ে ফিরে কী যে দেখতে হবে তাকে? তার নান্না-নুরবানু কি এখনও বেঁচে আছে! মঙ্গার ছোবলে নীল হয়ে যায়নি তো! যদি এখনও বেঁচে থাকে, যদি ভিটে আঁকড়ে পড়ে থাকে, তাহলে বারেককে দেখে ভাববে, এসে গেছে জীবনের আশ্বাসÑ ভাত আর দুধ। তারপর বারেকের শূন্যহাত দেখে কীভাবে মিইয়ে পড়বে তারা!
ট্রেনের প্রত্যেক ঝাঁকুনির সঙ্গে একটু একটু করে গুটিয়ে যেতে থাকে বারেক। এক সময় গড়িয়ে যেতে চায় পোটলার মতো।
আ মরণ দেখি, ব্যাটায় যানি কোলে উঠতি চায়! সর সর!
ঝাঁকুনি খেয়ে চোখ খোলে বারেক। ফ্যালফ্যাল করে তাকায় তাকে ধাক্কা দেওয়া যাত্রীর দিকে। তার মতোই মেঝেতে গুটিসুটি হয়ে বসে আছে কয়েকজন যুবতী ও মাঝবয়সিনী। প্রত্যেকের কোলে ব্যাগ। চালের, চিনির, জিরার। ইন্ডিয়া থেকে আনা। নিজেদের মধ্যে কলকলিয়ে গল্প করে তারা। ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসে একটা খাকি পোশাক, এই মাগিরা আজকার তোলা দিলি না!
টেকা দিতি পারবোনানে আজ। অন্যকিছু নিলি নিতি পারেন। চোখ ঠারে একজন।
সবার দিকে ঘুরে বেড়ায় খাকি পোশাকের চোখ। এক যুবতীর দিকে তাকিয়ে বলে, তুই আয়!
যুবতী অসংকোচে উঠে দাঁড়ায়। ভিড় মাড়িয়ে খাকি পোশাকের সাথে ঢুকে যায় অপরিচ্ছন্ন বাথরুমে। বন্ধ হয়ে যায় বাথরুমের দরজা। একজন মাঝবয়সিনী দীর্ঘশ্বাস ছাড়েÑ প্যাটের বিষ!
চমকে ওঠে বারেক, প্যাটের বিষ সবখানে!

আলুনি কচুসেদ্ধ খেয়ে বিড়ি ধরাল বারেক। নুরবানু কোনো প্রশ্ন করেনি ভাত-দুধহীন খালি হাতে আরও নিস্ব হয়ে বারেককে ফিরতে দেখে। বুক ঠেলে হতশ্বাস বেরিয়ে আসতে চাইলেও মুখে তা আসতে দেয়নি নুরবানু। নিঃশব্দে বারেকের সামনে তুলে দিয়েছে কচুসেদ্ধ। খাওয়া শেষ হবার পর মৃদুস্বরে স্বামীকে জিজ্ঞেস করল, ইবারে কী বেচবা?

আবার এলো আদম আলী। গেল মঙ্গাতেও এসেছিল। তাকে দেখেই বুকটা ধক করে উঠল বারেকের। আদম আলী বিড়ি এগিয়ে দিল তার দিকে। কিছুক্ষণ ধোঁয়া টেনে বলল, ইবারে কি ভাবতিছ?
দিমু না। দিতি পারব না। বারেক গত বছরের মতো করেই বলে।
নুরবানু খাবারের সন্ধনে বেরিয়েছে।
আদম আলী নড়েচড়ে যুত হয়ে বসে। গেলবার তো টিকে গেছিলা। ইবার পারবানা। বাচতি চাইলে এর চায়ে ভাল রাস্তা আর নেই। ধরি লও, এই মঙ্গাও পার করলা। তারপর সামনে বার? হয়তো না খেয়েই মরি যাবা গুষ্টিসুদ্দো।
খেঁকিয়ে ওঠে বারেকÑ মরলি মরব। ঐ কাম করতি পারব না।
ছাওয়ালডার ফ্যান মেগে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতিছে তুমার বউ। তাও রোজ জুটতিছে না। বাপ হয়ি তুমি ছাওয়ালডার জন্যি এট্টু দুধ জোটাতি পারো না। অসুক-বিসুকে এক ফোঁটা অসুদ-পথ্যি দিতি পারো না। ভাবি দেখো, কামডা করলি তুমার ছাওয়ালের সব জুটপি। ভাত-গোস-ফলমূল-কাপড়Ñ কুনো কিছুর কমতি থাকবি না।
একটু নরম হয়ে আসে বারেকের চোখ। কোনো কথা বলে না।
আবার খেই ধরল আদম আলীÑ ধরগে এই মঙ্গাও তুমি পার করতি পারলা। লাভডা কী হবি? জমি তো আগেই বিককিরি করিছ। এখন তুমার জমি নাই যে চষি খাবা। জাল নাই যে খ্যাপ মাইরা খাবা। তার চেয়ে কামডা করলি এক থোক টেকা পাবা। গঞ্জে একটা দুকান খুলতি পারবা। ছাওয়ালডা বাঁচপে, তুমরাও বাঁচপে।
বারেক আর্তস্বরে বলে, কিন্তু নুরবানু! ছাওয়ালের মা!
পথ্থম কয়দিন আহাজারি, তারপরেই সব ঠিক, বুজলা, সব ঠিক।
আদম আলী আশ্বাস দেয়। তারপর চোখ ঠেরে বলে, তুমার জমিন তো থাকল। আবার বীজ বুনবা। বছর না ঘুরতিই কোল ভর্তি।
আদিম মানুষের মতো মোচড়ানো বুক নিয়ে ফোঁস ফোঁস করে বারেক, যেন ভাষা প্রকাশের উপায় জানা নেই। বুঁজে আসা গলায় শুধু বলতে পারেÑ আমার ছাওয়াল! আহারে!
আরে তুমার ছাওয়ালের জন্যিই তো সবকিছু। ছাওয়াল ভালো থাকপে। তুমরাও। ভাবি দেখো এক থোক টেকা। এক সাথে কুনোদিন চোখেও দেখোনি। গঞ্জে দুকান দিতি পারবা। বউডারে গতরের কাপড় দিতি পারবা। মঙ্গা এলে না খেয়ে মরার ভয় নাই। কত সুবিদা একবার ভাবো দিনি!
আমি পারব না! পারব না!
বললেও বারেকের গলায় সেই দৃঢ় সংকল্প নেই আর। অভিজ্ঞ আদম আলীর কান এড়ায় না। উঠে দাঁড়ায় সেÑ ভেইবে দেখো আরাকবার। করবা কী করবা না। আমি কাল ধলপহরের আগে গাঁও ছাড়ি চলি যাব। কিন্তু আবার বলি, তুমার ছেলে মরুভূমিত পড়ে থাকপে না। আরবের মানুষ সব এক-একজন বাদশা। তানারা যে বাড়ি বানাইছে বেহেস্তও ফেল। তানারা বাড়ির কুত্তারে যা খাওযায়, তা আমরা ঈদের দিনেও খাইতি পারি না। তুমার ছাওয়াল ভালো থাকপে। বছরে কয়ডা দিন খালি উটের পিঠে দৌড়। বড় হলি আবার ফিরত আসপে কাঁড়ি কাঁড়ি মোহর নিয়া। এখন তুমার ইচ্ছা। তয় যাই করো, আজ রাতেই। আমি কিন্তু ধলপহরে গাঁও ছাড়ি চলি যাবো।

না খাওয়া শরীরে ঘুম আসে যেন সমস্ত অস্তিত্বের বাতি নিভিয়ে দিয়ে। নেতিয়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে নুরবানু। নান্নাও। এমনিতেই কচি শিশু, তার ওপরে সারাদিনে জুটেছে শুধু আধাবাটি ফ্যান। ক্ষিধেয় কেঁদে কেঁদে ওইটুকু শরীরের সবটুকু শক্তি শেষ।
রাতের শেয়ালগুলো দ্বিতীয়বার ডেকে চলে যাবার পরে উঠে দাঁড়িয়ে ছেলেকে বুকে তুলে নিল বারেক। ঝাঁপ ঠেলে ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় একবার তাকাল করুণ ঘুমন্ত নুরবানুর দিকে। তিন পহরের শেয়াল ডাকলেই রোজ ঘুম পাতলা হয়ে আসে নুরবানুর। পাশ ফিরে ছেলের গায়ে হাত দেওয়া তখন তার অভ্যেস। আজকে হাত বাড়ালেই ছেলের বদলে নুবানুর হাতে ঠেকবে কড়কড়ে একটা তাড়া নোট।

স্বপ্নযাত্রা কিংবা উদ্বাস্তুপুরাণ

তারা জেগে দেখল পৃথিবী অপেক্ষা করেনি।

অবশ্য এটাই তো ছিল তাদের প্রার্থনা। দুঃস্বপ্নের মতো ভয়ঙ্কর সময়টুকু এড়ানোর আর কোনো পন্থা তাদের সামনে ছিল না। তারা তাই, আসহাবে ক্বাহাফ, ঈশ্বরেচ্ছাকে স্বাগত জানিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল সুগভীর নিদ্রার ছায়ায়। ঈশ্বরের আদেশে সময় এড়িয়ে গেছে আটটি প্রাণীকে।
কিন্তু সময়ের অমোঘ লাঙল ক্রমাগত খুঁড়ে গেছে মহাজগতের মাটি। যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে গেছে সময়ের সর্বংসহা ডানায় ভর করে।
তাই জেগে উঠে দেখল, তারা রাহুমুক্ত। যে অত্যাচারী শাসকের রুদ্ররোষ এড়াতে তাদের এই ঘুমের শরণ, সে আজ সুদূর ইতিহাসের অন্তর্গত। তারা সাতজন সমস্বরে গেয়ে উঠল ঈশ্বরের জয়গান। তাদের সঙ্গী কুকুরটিও লেজ নেড়ে প্রকাশ করল নিজের আনন্দ। তারা সাতজন পরস্পরের হাত ধরে গুহার আশ্রয় থেকে বেরিয়ে এলো নতুন পৃথিবীতে।
তখন প্রত্যুষ।
তাদের সম্মুখে বুক মেলে দাঁড়াল পরিবর্তিত পৃথিবী। তারা জানত পৃথিবী বদলাবেই। তবু তারা চমকে উঠল পরিবর্তনের অকল্পনীয় চেহারা দেখে। তাদের গুহা থেকে কয়েক শ গজ নিচে অপরূপ নগর। এত ওপর থেকেও বোঝা যায় আকাশমুখো অট্টালিকার সারি বিছানো, নাতিপ্রশস্ত গালিচার মতো রাজপথ, আলোকোজ্জ্বল তোরণ। তাদের দৃষ্টি বিস্ফারিত হয়ে যায়। তারা ব্যাকুল মন নিয়ে ভাবতে থাকে তাদের ফেলে যাওয়া চামড়ার তাঁবু, ধূলিওড়ানো পথ, বালিয়াড়ি, ক্রীতদাসদের চাবুক মারতে থাকা দাসপ্রভুদের নৃশংস মুখ, একটিমাত্র জলাশয় ঘিরে গড়ে ওঠা তাদের গোত্রবসতির কথা।
কিন্তু হায় নিচের নগর দেখে মনে হচ্ছে, তাদের গোত্রববসতির বিবর্তিত রূপ তো এটা নয়! একপুরুষের বিবর্তন তো কল্পনাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না। তাহলে কী তাদের গোত্রবসতি এখন ঐতিহাসিক যুগের স্মৃতি!
সাত যুবকের মনের উল্লাস ততক্ষনে থিতিয়ে এসেছে। পরিবর্তে জাগছে অনিশ্চয়তার শঙ্কা। কেননা এতটা পরিবর্তন কেউ প্রত্যাশা করেনি। তাদের একজন খুব দ্বিধান্বিত গলায় বলল, ‘এ কোথায় পদার্পণ করতে হচ্ছে আমাদের! তার চেয়ে চলো গুহাতেই থাকি।’
কিন্তু পেছনে ফেরতেই বিস্ময়ে আতঙ্কে মন জড়ত্ব গ্রাস করল তাদের। নেই! তাদের পেছনে আর নেই কয়েক মুহূর্ত আগে ছেড়ে আসা গুহা। এমনকি উধাও পাহাড়টিও। বরং তারা আবার সামনে তাকাতেই দেখল, তারা দাঁড়িয়ে আছে নগর তোরণে।
তাদের মধ্যে সর্বাধিক প্রত্যুৎপন্নমতি যুবক, যে তাদের অঘোষিত নেতা, বলল, ‘সময় এতদিন আমাদের জন্য গুহাটিকে অক্ষত রেখেছিল। আজ তার ফুরিয়েছে প্রয়োজন। তাই গুহা এবং পাহাড় নিক্ষেপিত হলো ইতিহাসের অধ্যায়ে। এখন, এই নগরই আমাদের আবাসভূমি। চল, ঈশ্বরেচ্ছায় নগরে প্রবেশ করি।’
নগর তখনও সুপ্তিমোড়া। পথে গুটিকয়মাত্র পথচারী। প্রভাত-প্রার্থনায় যোগদানেচ্ছু, আর কিছু গৃহচিহ্ন ভুলে যাওয়া মাতাল। কেউ খেয়াল করল না সাতজন যুবকের এই দলটিকে। স্তিমিত আলো হয়তো একটা কারণ।
আসহাবে ক্বাহাফের দল শুরু করল নগর পরিভ্রমণ। তারা কেউ ইতোপূর্বে সুরম্য স্থাপত্য দেখেনি, দেখেনি সযতœরোপিত বাগিচা, কৃত্রিম ফোয়ারা। শোনেনি সুমিষ্ট কাকলির মতো নহবতের সুর। একজন বিস্ময়াভিভূত বলল, ‘ঈশ্বর কি আমাদের স্বর্গে তুলে নিয়েছেন? আমরা কি এতদিন ছিলাম কবরের আশ্রয়ে? হাশরের পরে কি আমাদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে এই স্বর্গনগরী?’
অন্যদের মনেও দোলা দেয় একই চিন্তা। আর তারা বিহ্বলের মতো ঘুরতে থাকে সুরম্য নগরীর পথে পথে। তাদের শরীরে জেগে উঠছে ক্ষুধার অনুভূতি। তাদের শরীর পরিশ্রান্ত হয়ে ধারণ করেছে লবণাক্ত ঘামের চিহ্ন। তারা তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারে, মরণোত্তর স্বর্গজীবন এটা নয়। এ সেই রূঢ় পৃথিবীই, যেখানে ক্ষুধার আগুন প্রাণীকুলকে অবিরত জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়।
তারা পরিশ্রান্ত সাতজন একটি ফোয়ারার ধারে সমবেত হয় আর আঁজলা বিছিয়ে পান করে সুপেয় জয়। এত সুমিষ্ট হতে পারে পৃথিবীর পানি! তারা আবার দ্বিধান্বিত হয়। এতো সেই প্রতিশ্রুত ‘হাওজে কাওসর’-এর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ‘হাওজে কাওসর’-এর পানির যে স্বাদের কথা পাঠ করেছে তারা ধর্মপুস্তকে, শুনেছে ধর্মপ্রচারকের মুখে, এর স্বাদটি তো সেই রকমই।
আসহাবে ক্বাহাফ এবার খাদ্যের কথা ভাবে। জানা আছে, পণ্য বিনিময়ের মধ্যস্থতাকারী হচ্ছে মুদ্রা। তারা মুদ্রা হাতড়ায় নিজ নিজ জেবে। তারা কেউ ধনাঢ্য নয়। তবে কপর্দকশূন্যও নয়। মুদ্রাসমষ্টি তাদের খাদ্য সংগ্রহের জন্য। যথেষ্ট মনে হলো। ছয়জন বিশ্রামের আশায় শুয়ে পড়ল বৃক্ষছায়ায়। একজন চলল বিপণীর দিকে খাদ্য সংগ্রহে। তার সঙ্গী হলো কুকুরটি।

সদ্য পসরা বিছিয়েছে দোকানি। দিবসের প্রথম খরিদ্দারকে সব দোকানিই ব্যবসালক্ষ্মি হিসাবে গণ্য করে চিরকাল। তাই সমাদর একটু বেশিই জোটে। খরিদ্দার তাজিমে পুলকিত হয়ে বলল, ‘আমি খাদ্যবস্তু কিনতে চাই।’
দোকানি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর তড়বড় করে কিছু বলল। যুবক একবর্ণও বুঝল না দোকানির কথা। সে পুনরাবৃত্তি করল চাহিদার। জবাবও একই রকম।
কিছুক্ষণ এভাবে চলার পরে যুবক উপলব্ধি করল তার ভাষা দোকানির অচেনা। দোকানির ভাষা তারও অজানা। সে এবার অনন্যোপায় হয়ে আশ্রয় নিল ইশারার। পৃথিবীর এই সার্বজনীন ভাষা বুঝতে অসুবিধা হয় না কারও। দোকানির মুখ থেকে মেঘ সরে গেল। যুবককে ভিনদেশী ভেবে সে ইশারা-মতো দ্রব্যাদি সরবরাহ করল। যুবক হৃষ্টচিত্তে খাবার নিয়ে মুদ্রা অর্পণ করল দোকানির হাতে। কিন্তু সে ঘুরে দাঁড়াবার আগেই দোকানি খামচে ধরল তার কাঁধ। সে অবাক হয়ে দেখল দোকানির চেহারায় জমেছে রাজ্যের ক্রোধ। দোকানি প্রচ- আক্রোশে বর্তমানে অচল মুদ্রাগুলো ছুঁড়ে ফেলল মাটিতে আর খাবারগুলো কেড়ে নেবার জন্য হাত বাড়াল যুবকের দিকে। মানুষের সহজাত প্রতিসংবেদনার কারণেই যুবকের খাদ্যধরা হাত সরে যেতে চাইল দোকানির আওতার বাইরে। অমনি দোকানি ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। তাকে আঁকড়ে ধরে শুরু করল চ্যাঁচাতে। যুবকের কুকুর ধরে নিল, আক্রান্ত হয়েছে তার প্রভু। সে-ও ঝাঁপিয়ে পড়ল দোকানির ওপর। পায়ে কুকুরের দাঁত বসতেই দোকানির চিৎকার বেড়ে গেল কয়েক পর্দা। ছুটে এলো অন্য ব্যবসায়ীরা।
বোঝা গেল, এ ধরনের পরিস্থিতিতে অভ্যস্থ ব্যবসায়ীরা। তারা সম্ভবত মোকাবেলা করছে বহুবার তাদের ব্যবসার ওপর নেমে আসা বিভিন্ন সন্ত্রাস। কেউ কেউ লাঠি এনে আঘাত করল কুকুরটাকে। কয়েকজন একত্রে পাকড়াও করল যুবককে।
দোকানি হাত-পা নেড়ে হাউমাউ করে সম্ভবত ঘটনা জানাল তাদের। তারা যুবকে ঘিরে ধরল। তাদের কথার ভঙ্গিতে ফুটে উঠেছে কৈফিয়তের ক্ষুব্ধ দাবি। কিন্তু যুবক ঘটনার আকস্মিকতায় চরম বিভ্রান্ত। বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে ক্রুদ্ধ মানুষগুলোর দিকে।
এ সময় সম্ভবত দোকানির মনে এলো ভাষাবিভ্রাটের কথা। অন্যদের সে কথা জানালে তারাও হকচকিয়ে গেল খানিকটা। বেশ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে অভিজ্ঞ একজন এসে মুদ্রাগুলো কুড়িয়ে গুঁজে দিল যুবকের হাতে। খাবারগুলো নিয়ে রাখল দোকানের যথাস্থানে আর ইশারা করল তাকে চলে যেতে।
ধ্বস্তাধ্বস্তিতে ছিঁড়ে গেছে যুবকের কামিজ। সে করুণ দৃষ্টিতে দেখল নিজের বিধ্বস্ত শরীর আর ছিন্নভিন্ন কামিজ। এদিক-ওদিক তাকাল সঙ্গী কুকুরের খোঁজে। তারপর ভগ্নমনোরথ পদক্ষেপ ফিরে চলল সঙ্গীদের কাছে।
সঙ্গীরা অপেক্ষায় ছিল নির্ধারিত স্থানেই। ব্যর্থ যুবকের মুখে সবকথা শুনে মুষড়ে পড়ল তারাও। খাদ্য জোটানোর ব্যর্থতাতে ক্ষুধা যেন বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। এ সময় হাজির হলো তাদের কুকুর। মুখে হাড়ের টুকরো। সাত যুবক দীর্ঘশ্বাস ফেলল সেদিকে তাকিয়ে। মানুষের খাবার জোটেনি কিন্তু কুকুরের ঠিকই জুটেছে। কুকুরজন্মের প্রতি মানবিক অসূয়া কী উঁকি দিল তাদের মনে!
ক্ষিধের হাত ধরে আসে অবসন্নতা। তারা আবার ভরপেট পানি পান করল। তারপর শুয়ে পড়ল মাটিতে পিঠ বিছিয়ে। আবার শরণ নিল ঘুমের।
সর্বদুঃখহর ঘুমের।
কিন্তু একটু পরেই তারা জেগে উঠল জনসমাগমের শব্দে। তাদের কুকুর জেগেছে আগেই। এগিয়ে আসতে থাকা সমাবেশের দিকে দাঁত খিঁচিয়ে চিৎকার করছে অবিরাম।
সাত যুবক সভয়ে দেখল দারুণ বৈরীভাব সমাবেশের। কেউ কেউ আবার সশস্ত্র।
আসহাবে ক্বাহাফের একজন কাঁপা গলায় অনুনয়ের সুরে বলল, ‘তোমরা কী চাও? তোমাদের মুখম-ল ক্রোধাচ্ছন্ন কেন? আমরা তো তোমাদের কোনো ক্ষতি করিনি!’
উত্তরে সমাবেশে উঠল ক্রুদ্ধ গুঞ্জন। সে গুঞ্জনের ভাষা যথারীতি যুবকদের অচেনা। যুবক আবার গলা উচ্চগ্রামে নিয়ে ব্যক্ত করল পূর্বোক্তি। এসময় ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন একজন সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ। তিনি এই জনপদের একজন শ্রদ্ধেয় প-িত। তিনি সমাবেশকে বললেন, ‘তোমরা ধৈর্যধারণ করো! দেখি আমি আগন্তুকদের ভাষা বুঝতে পারি কি না!’
তিনি একাকি এগুলেন যুবকদের দিকে।
যুবকরা বারবার নিবেদন করছে তাদের সানুনয় বক্তব্য। বৃদ্ধপ-িত খুব মনোযোগ সহকারে তাদের কথা শুনলেন। তার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি সমাবেশের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বললেন, ‘আমি বুঝতে পারছি। এরা যে ভাষায় কথা বলছে, সে ভাষায় আমাদের পূর্বপুরুষগণ কথা বলতেন হাজার বছর আগে। আমি এদের বক্তব্য বুঝতে পারছি।’
এবার তিনি যুবকদের দিকে ফিরলেন। ভাঙা ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা কারা? কী চাও? কেন এখানে এসেছো?’
যুবকরা অকূল পাথারে খোঁজ পেল তৃণখ-ের। সবিস্তারে ব্যক্ত করল নিজেদের কাহিনী। জ্ঞানীবৃদ্ধ তাদের বক্তব্য অনুবাদ করলেন জনপদবাসীদের কাছে, ‘এই সাত যুবক সঙ্গী কুকুরসহ হাজার বছর ধরে ঘুমিয়ে ছিল বিলুপ্ত পর্বতের গুহায়। অত্যাচারী শাসকের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ঈশ্বর ওদের জন্য বরাদ্দ করেছিলেন সেই আলৌকিক ঘুম। ওরা এখন আমাদের সাথে থাকতে চায়, আশ্রয় চায়, খাদ্য চায়। বাকি জীবনটা আমাদের মাঝে কাটাতে চায়।’
জনতা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। কেউ বিশ্বাস করেনি ওদের বক্তব্য। এই জনপদের মানুষ এখন বিজ্ঞানের যুগে বাস করে। বিজ্ঞানের ভিত্তি নেই এমন কোনো কিংবদন্তি-অলৌকিকত্বে কেউ বিশ্বাস করে না। কেউ বলল, ‘ঐ সাতজন তো আমাদের বৈরী রাষ্ট্রের গুপ্তচর’ কেউ বলল, ‘ওরা বদমাশ, গাঁজাখুরি গল্প শোনাতে এসেছে।’
সাত যুবকের আশ্রয়দানের বিরোধিতায় সবাই একমত। বলল, ‘ঐ সাতজন যদি থাকতে চায়, তবে থাকুক নগর সীমানার বাইরে বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে। আর সত্যি সত্যিই ওরা যদি হাজার বছর আগের মানুষ হয়ে থাকে, তবে না হয় ওদের রেখে দেব আমাদের যাদুঘরে, ঐতিহাসিক নিদর্শনের সারিতে।’ নিজেদের রসিকতায় জনতা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল আবার।

২.
খাটিয়া চেপে গোবিন্দ ড্যাঙডেঙিয়ে শ্মশানে চলল।
গোবিন্দ মানে বুড়ি মা, বউ, দুই বোন, চার মেয়ে। নুন থেকে পরমান্ন, পূজার ভোগ। ভোর থেকে রাত আটটা অব্দি নাকগুঁজে কাজ। ফাঁকফোকড় খুঁজে নাকেমুখে কিছু গুঁজে দেওয়া। মেয়ের মাস্টার, বোনের পাত্র খোঁজা। মাসে-দুমাসে সিনেমা দেখা।
বুড়ি মায়ের অত্যাচার ক্রমেই বাড়ছিলÑ ও বাবা গোবিন্দ গোপাল, ও পাড়ের একখান ব্যবস্থা করতি পারলি? এই মেলেচ্ছো দ্যাশেই আমারে পোড়াবি? মুখে এট্টু গঙ্গাজলের ছিটে, একবার বেন্দাবন-কাশি দশশন কি কপালে জুটপি নারে বাপ?
চুপ চুপ! কেউ শুনি ফেলবি!
তা শুনুক না। শুনলি ক্ষতি কীসের? চল বাপ আমাগের নিয়ি চল!
ওখেনে গিয়ে যে রাস্তায় পড়ি থাকতি হবি।
বুড়ি অবিশ্বাসে চোখ গোল্লা বানায়Ñ শুনো কথা! রাস্তায় থাকতি হবি ক্যানে? ঐটে যে রামরাজ্য! ইন্দেরা গান্ধীর রাজ্য।
তোর ইন্দেরা গান্ধী তোরে কোলে নেবার জন্যি বসি আছে না?
কী যে কস বাবা! তোর খালি ব্যাঁকা ব্যাঁকা কথা। ওরে ইন্দেরা যে আমাগের মা। কলির দুগ্গা, অসুরনাশিনী।
হ্যাঁ অসুরনাশিনী! আর ওদিক যে তিনিই নাশ হয়ি গেছেন, সে খবর তো পাসনি?
মরেনি রে বাবা মরেনি! দেবী কি মরে? দেবী দেহ বদলায়।
গোবিন্দ ক্ষেপে গেলÑ না মরেনি! গুলিত ঝাঁঝরা হয়ি মলো, আর বুড়ি কয় মরেনি।
বুড়ি এবার ডুকরে উঠলÑ সেও তো ঐ মেলেচ্ছোরা মেরি ফেলল। সব ঐ মেলেচ্ছো মুছলমানেরা।
চুপ থাক তো! গোবিন্দ ধমকে ওঠেÑ মুসলমান না, তানি মরিছে শিখগের হাতে।
ঐ একই কতা বাপ। তুই আমারে নিয়ি চল বাপ! আমি পুণ্যিদ্যাশে গিয়ি মরব। এট্টু গঙ্গাজলের ছিটে, ক্যাওড়াতলার চিতা।
তো বুড়ি ইন্দিরা গান্ধীর রামরাজ্যের স্বপ্ন দেখতে থাকুক; গোবিন্দ ড্যাঙডেঙিয়ে খাটিয়া চেপে শ্মশানের চলল।
পাড়ার ক্লাবের থিয়েটারে গোবিন্দ পারমানেন্ট অ্যাক্টর। ‘কাঁটার ফুলশয্যা’, ‘সিংহদরজা’, ‘গরিবের ছেলে’ থেকে ‘নূরজাহান’ পর্যন্ত করেছে। গোবিন্দর কখনো প্রম্পট লাগেনি, পার্ট মুখস্ত। একবার ওরা করেছিল ‘একই বৃন্তে দুইটি কুসুম’। দুই সম্প্রদায়ের সহমর্মিতার জন্য সে কী প্রবল আকুতি নাটক জুড়ে। আবেগ ফুঁসে উঠত গোবিন্দর ভেতরে। ডায়লগ বলতে বলতে কান্নার সিন এলে বুক ঠেলে বেরিয়ে আসত বিশুদ্ধ কান্না। শুধু নাটকে নয়, জীবনেও করে দেখাতে হবে একটা কিছু। সেই একটা কিছু কীÑ তা ভাবল গোবিন্দ ঝিম মেরে কয়েকদিন ধরে। থিয়েটারের পরে সবাই দল বেঁধে খেতে গিয়েছিল পচুর হোটেলে। দোকানভর্তি মানুষের সামনে গোবিন্দ ঝট করে একটুকরো গরুর মাংস তুলে মুখে দিল। সবাই হা। অধ্যাপক আনোয়ার ওদের পরিচালক, বললেন, ‘এটা কী করলি তুই?’
‘আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলন চাই!’ ধরা গলায় বলল গোবিন্দ।
‘তার জন্য গরুর গোস্ত খেতে হবে তোকে? বোকা কোথাকার! ধর্মে নিষ্ঠা রেখেও অসাম্প্রদায়িক হওয়া যায় বুঝলি?’
গোবিন্দ বোঝেনি।
সেই গোবিন্দ চলল শ্মশানে। আর বুড়ি রইল ইন্দিরা গান্ধীর রামরাজ্যের আশায়। বুড়ি ডুকরাতে ডুকরাতে পাথর হয়, পাথর ফাটিয়ে নামে ফের বিলাপের সুরÑ ‘ওরে আমার অন্দের যষ্টি কেড়ে নিল রে! কে আমার বংশ রক্ষা করবি! কে এখন আমার ধম্ম বাঁচাবি রে!’
কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতেই হয়। সুধাকান্ত মহাপাত্র এগিয়ে এলোÑ ‘কেন আমি!’
ভিটেমাটি রেজিস্ট্রি হলো মহাপাত্রের নামে। নইলে যে এনিমি প্রপার্টি হয়ে যাবে। বাড়ি বিক্রির অর্ধেক টাকায় হলো শ্রাদ্ধ। অর্ধেক টাকা আর বোঁচকা নিয়ে গোবিন্দর বউ, দুই বোন, চার মেয়ে নিয়ে বুড়ি রামরাজ্যে চলল। সুধাকান্ত মহাপাত্র অভয় দিয়েছেÑ যাচ্ছ তো তীর্থভূমিতে। ওটাই আসল দেশ। মাথা গুঁজার ঠাঁই, লজ্জার বস্ত্র, সতীত্বের নিশ্চয়তাÑ সব পাবে!

বুড়ির ক্যাওড়াতলা জুটেছে। গঙ্গাজলের ছিটে।
তারপর এক রমণী, দুই যুবতী, চার কিশোরীÑ মোট সাতজন নারী উঠে বসেছে ট্রেনে। হাতবদল ট্রেনবদল। ট্রেনবদল হাতবদল। ট্রেনবদল… হাতবদল…

৩.
সাতজন বিধ্বস্ত নারী একসারিতে হেঁটে যাচ্ছে রুক্ষ মাটিতে পা ঘষটে ঘষটে। তাদের মুখম-ল অভিব্যক্তিহীন। তারা যেন আবছা কারও পদরেখা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। অনন্তকাল ধরে। সাতজনের একজন জিজ্ঞেস করল, ‘কদ্দুর?’
সাতজনের একজন পাল্টা জিজ্ঞেস করল, ‘কী কদ্দুর?’
‘উদ্বাস্তুপুর।’
‘কী জানি!’
তারা হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে গান ধরে ‘রামরাজত্ব পেইছি…নিজের মাটি হারাইছি… এখন খুঁজি… উদ্বাস্তুপুর।’
বহুদূরের দূরত্ব পেরিয়ে, ভাষার ব্যবধান পেরিয়ে সাতনারীর গান পৌঁছে যায় আসহাবে ক্বাহাফের কাছে। তারা তখন ক্ষুধায় কাতর থেকে কাতরতর। তাদের গোত্রবসতি হারিয়ে গেছে নগরঅরণ্যে। তাদের ঈশ্বরভক্তি রূপান্তরিত হতে থাকে ক্ষোভে। একজন আকাশমুখো হয়ে চেঁচিয়ে ওঠেÑ ‘হায় ঈশ্বর! আমরা তোমার কাছে চেয়েছিলাম অত্যাচারী শাসকের হাত থেকে মুক্তি। তুমি কেন আমাদের বানালে উদ্বাস্তু!’

দেশে দেশে সাড়া না পড়লেও গাঁয়ে পড়েছে। বছর পঁয়তিরিশের এক মুসকো জোয়ানের নুনুকাটা উৎসব। বাচ্চা নয়, কিশোর নয়, রীতিমতো জোয়ান। তার ওপরে একজন হিন্দুর মুসলমানে পরিণত হওয়া। গাঁ তো বটেই, পুরো ইউপির বাসিন্দাদের মধ্যে বেশ একটা ধর্মীয় জোশ এনে দিয়েছে...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..