দুটি অণুগল্প

ওয়াহিদার হোসেন
অণুগল্প
Bengali
দুটি অণুগল্প

বুরখা

মানুষের ডানা আছে। ডানায় ভর করে ওড়া যায়। মানুষ উড়তে থাকে। হাত দুটো সামনে দিয়ে সাঁতার কাটার মতো জলকে অনুভব করা যায়।এও উড়ানের মতো। নদীর বাঁকে মাছ ধরছিল মনীশ। ওপার থেকে মাঝমধ্যে হইহই আওয়াজ ভেসে আসছিল।নদীতে স্নান করার সময় বারবার মনে হচ্ছিল অজানা পুরুষ-হাত যেন তাকে স্পর্শ করছে।ইউনিভার্সিটি থেকে বান্ধবীর বাড়িতে এসে নদীতে স্নান করার অনুপম অভিজ্ঞতা নিয়ে শহরে ফিরে যেতে হল তন্নিষ্ঠা চক্রবর্তীকে। সবনমদের বাড়িতে মনীশকে সে দেখল।সবনমের দাদার সঙ্গে একই স্কুলে চাকরি করে মনীশ।

শহরে ফেরার পরে একদিন হঠাৎই শহরের কফিশপে মনীশকে তন্নিষ্ঠা দেখে।টুকটাক কথাবার্তা হয়।ভালোও লেগে যায়। ছেলেটাও খারাপ না। এবং শেষমেষ গ্রামে বাড়ি হলেও বাবা রাজি হন। তার সঙ্গেই তন্নিষ্ঠার বিয়ে ঠিক হয়।

বছর দুই পরে তন্নিষ্ঠা চাকরি পেয়ে যায় মালদায়। মনীশও তাকে খুশি মনে মালদায় রেখে আসে।
মালদায় এসেই তার মনে পড়ে যায় সবনমের মালদাতেই বিয়ে হয়েছে। সে উচ্ছ্বাস প্রবণ হয়ে ওঠে। বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করার জন্য মনটা ছটফট করতে থাকে কবে দেখা হবে।শেষমেশ বান্ধবীর নাম্বার টা ম্যানেজ হয়।দুজনে দেখা করতে যায় একটা রেস্টুরেন্টে।

সকাল দশটা বাজে। আজকে স্কুল নেই, মহালয়ার ছুটি ।সকাল সকাল উঠে তন্নিষ্ঠা মহালয়া দেখেছিল মোবাইলেই।

এখন চোখদুটোতে একটু ঘুমঘুম লাগছে।সে বসে আছে রেস্টুরেন্টের একটা কোনায়। কফি অর্ডার দিয়ে ওয়েট করে আছে বান্ধবীর। এমন সময় একটা ছেলে আর একটা বুরখা পরা মেয়ে রেস্টুরেন্টে ঢোকে এদিক ওদিক দেখে ছেলেটা যেন তন্নিষ্ঠার দিকেই এগিয়ে আসে। তন্নিষ্ঠার দিকে তাকিয়ে টুপি পরা মুসলমান ছেলেটা জিগ্যেস করে দিদি আপনি কি তন্নিষ্ঠা ম্যাডাম?তন্নিষ্ঠার চেহারা খুব একটা বদলায়নি তবু সবনম যে চিনতে পারবে না এমন নয়।দূরে দাঁড়িয়ে আছে তাই হয়তো কথা বলেনি।ছেলেটা টেবিলে বসে সবনমকে ডাকে। বোরখাপরা মেয়েটা যে সবনম সেটা বুঝতেই তন্নিষ্ঠার বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগে যায়।পরে কথায় কথায় জানতে পারে, মেয়েদের পাব্লিক প্লেসে কথা বলতে নেই।দু বান্ধবীতে বেশকিছুক্ষণ কথা হয়।সবনমের স্বামী সোহেল যে কিনা মাদ্রাসার একজন হুজুর (সে জানতে পারে)তার সামনেই কথা হয়।সবনম পুরো সময় আড়ষ্ট হয়ে বসে থাকে। কিছুই মুখে দেয়না, অনেক অনুরোধের পরেও।শেষমেষ সবনমের মুখটা না দেখেই ফিরতে হয় তন্নিষ্ঠাকে।

তন্নিষ্ঠা বুঝতে পারে না একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়া মেয়ে রাতারাতি এতটা চেঞ্জ হতে পারে?তাদের মাঝখানে এক টুপি পরা হুজুর কিংবা যেন শরীয়তের কানুন দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়।

প্রবল যন্ত্রণা নিয়ে তন্নিষ্ঠা হাঁটতে থাকে। আসলে হিজাব বা বুরখা এসবের জন্য তার কোনো প্রব্লেম হয়নি।তন্নিষ্ঠার খারাপ লেগেছে এতকাছে এসেও বান্ধবীকে সে ছুঁয়ে দেখতে পারেনি,তার মুখটাও সে দেখতে পারেনি।

ফেরার প্রত্যেকটি সেকেন্ড যেন সেই উচ্ছ্বাস সেই হাসি,আর ডুয়ার্সের মোহময়ী কোন নদীর উত্তাল জলে ভাসতে থাকা স্নানের মুহূর্তের তুমুল আলোড়িত দুটি উদ্ভিন্নযৌবনা মেয়েকে সে দেখতে পায়।

 

কবি

তরুণ কবি ঋতুরাজ দাঁড়িয়ে ছিল নিউ কোচবিহার রেলস্টেশনে । এখানেই আসার কথা কলকাতা থেকে বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক সজল চক্রবর্তীর।উনি লোক সঙ্গীত নিয়ে গবেষণাও করেন।এবার তার ইচ্ছে আব্বাসউদ্দীন এর গান নিয়ে একটা গবেষণামূলক লেখা।উনি নিজে পিএইচডি ডক্টরেট হওয়া সত্ত্বেও ডক্টর কথাটা বিশেষ একটা লেখেন না।মূলত কলকাতার একটি পত্রিকায় কবিতা লেখার সূত্রে দুই অসমবয়সী মানুষের কাছে আসা। এবার সস্ত্রীক আসছেন কবি সজল চক্রবর্তী। ওরা প্রথমে হোটেলে থাকতে চেয়েছিল কিন্তু ঋতুরাজের কাকা একথা শোনার পরে বলে দেন বাড়িতেই ওদের থাকার ব্যবস্থা করবেন।ঋতুরাজের বাবা নেই,মাকে নিয়ে ঋতুরাজ থাকে। বড় বাড়ির দোতলায় কাকা থাকেন তিনিই দেখাশোনা করেন বউদি আর ভাইপোর।কাকা প্রচণ্ড রকম পড়ুয়া ফেলুদা থেকে ব্যাসদেব আর সফোক্লিস থেকে হোমার মিলটন তার মুখস্থ।উত্তরাধিকার সূত্রে কাকার কাছ থেকে এটা পেয়েছে ঋতুরাজ। যদিও কাকা নির্ভেজাল পড়ুয়া,লেখালেখি করার শখ তার নেই।

নিউ কোচবিহার থেকে ঘড়িমোরের বাড়ি। ঘড়ি মোর থেকে বইমেলা কাছেই। দশ টাকার ভাড়া।রাসমেলার মাঠে প্রত্যেকবার জেলা বইমেলা বসে।এবার ঋতুরাজ ভেবেছিল বই করবে।কিন্তু হলনা।

শেষমেষ কবি সাহিত্যিক সজল চক্রবর্তী এলেন তবে তার স্ত্রী বিশেষ কারণে আসতে পারেননি তার শরীর ভালো ছিলনা।সকালে ঋতুরাজ বেশ কয়েকবার ফোন করেও কবিকে পায়নি।উনি রাতের বেলা আটটার দিকে বললেন বউ যাবে।কিন্তু এখন কবিকে একা দেখে বরঞ্চ বেশি ভালো লাগলো। আড্ডাটা এবার চুটিয়ে হবে।

বইমেলা শেষ হল।ঋতুরাজ আড্ডা কবিতায় মগ্ন ছিল এই ক’টা দিন।কবি সজল তাদের বাড়িতে থাকায় আরও বেশি উপভোগ করেছে বইমেলা, আড্ডা। তিনদিন জম্পেশ মজা হল।কাকুও ওদের জয়েন করেছিল।

কয়েকদিন পরে রাতের বেলা ঋতুরাজ ফোন করলো কবিকে। কবি ফোন তুললেন না।তারপর দুদিন পরে হোয়াটসঅ্যাপের রিপ্লাই বন্ধ হল।তারপর বেশকয়েকদিন যোগাযোগ করার পরে আর ওপাশ থেকে কোনো রকম সাড়া পাওয়া গেলনা কলকাতার বিখ্যাত কবি সাহিত্যিক সজল চক্রবর্তীর। একদিন ভুল করে ঋতুরাজ মোবাইলে কল করলে কবিপত্নী রিসিভ করলেন।কবিপত্নী যা বললেন তার মর্মার্থ এই যে লেখক খুবই ব্যস্ত একটা বই লিখতে,তিনি বিজি।এরকম বারবার ফোন করে ঋতুরাজ যেন ডিস্টার্ব না করে।ঋতুরাজের মনটা তেতে উঠলো কলকাতার লোকের ওপর।

কয়েকদিন পরে কাকু এসে দুপুরবেলা
ঋতুরাজকে ডেকে বলল “দ্যাখ লেখক সজল
চক্রবর্তীর আব্বাসউদ্দীনকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধের সেই বইটা বাজারে বেরিয়েছে। লোকটাকে এত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আব্বাসউদ্দীনের বাড়ি ঘর লেখা পত্র, লাইব্রেরি নিয়ে যাওয়াতে হেল্প করলাম, ঋণ স্বীকারে তোর নাম টা অন্তত দিতে পারতো।”

“দাও দেখি” বলে ঋতুরাজ বইটা হাতে নিল।তারপর ম্লান হেসে বইটার প্রথম পাতা উলটে দ্যাখে উৎসর্গের জায়গায় বড় করে লেখা আছে-
“বইটা যার সাহায্য এবং নিরলস পরিশ্রম ছাড়া লেখা সম্ভব হতনা উত্তরের সেই তরুণ কবি ঋতুরাজ সেন কে বইটা উৎসর্গ করলাম।”

ওয়াহিদার হোসেন। কবি। জন্ম ১৯৮৬, ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের আলিপুরদুয়ার জেলার দক্ষিণ খয়েরবাড়ি রাঙ্গালিবাজনায়। লেখাপড়া করেছেন ইংরেজি সাহিত্যে। পেশাগত জীবনে তিনি একজন শিক্ষক। চাকরি করছেন ডুয়ার্সের এক প্রত্যন্ত চা বাগানের প্রাথমিক স্কুলে। প্রকাশিত বই: 'মধ্যরাতের দোজখ যাপন' (কাব্যগ্রন্থ, ২০১৩) এবং 'পরিন্দা' (কাব্যগ্রন্থ,...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মানুষ 

মানুষ 

মানুষ  অকৃতদার মাস্টার মশাই পাঁচজন ছাত্রীকে পড়ান নিজের ঘরে । প্রতিবেশীদের সন্দেহ ক্রমশ দানা বাঁধে…..