দুয়ার দিই না ঘরে

বিকাশ দাস
কবিতা
Bengali
দুয়ার দিই না ঘরে

দুঃখ বলে কিছু হয়না

দুয়ার দিয়ে দুঃখ আসে
ভাবলে সারা জীবন দুঃখ তোমায় বেঁধে যাবে।
হাত বাড়িয়ে সুখ আসে
ভাবলে আকাশ মাটি ছুঁয়ে তোমায় সেধে যাবে।
মানুষের হাত ধরো
প্রকৃতির মাটির জমিনে সোজা হেঁটে চলো।
ভাবনা চৌচির করো
অতীতের কাসুন্দি গা থেকে ঝেড়ে ফেলো ।
জেনে মানুষ ক’দিনের বাসিন্দা সংসারের বাসরে।

আজ বাঁচার আনন্দে বেঁচে থাকা শুধু বোকামির নির্মম খেলার মেলা
বাঁচার ফুর্তি জীবন কুর্তির রঙ বদলে বদলে ক্ষ্যাপামির ক্ষনিক বেলা।
এসো
বিলাপের মুখোশ ছিঁড়ে সুখের আলাপের গোলাপ ফোটায়
দুঃখের দরিয়ার বালুচরের প্রান্তিকে সাগরের আনন্দ ছড়ায়।
গলা খুলে বলো। দুঃখ বলে কিছু হয়না।
জন্ম আসুক
মৃত্যু আসুক
বাঁচার আনন্দে নিষ্পাপ সংরাগের হাতে হাত ধরে।

দুয়ার দিই না ঘরে

দুয়ার দিই না ঘরে
যখন তখন সে আসতে পারে বলে ঘরে ।
এই প্রত্যাশা ধরে
সময় অন্তিম বেলা মাটিতে পড়বে ঝরে।

প্রতীক্ষার অন্তরালে
আমি আজ পর্যন্ত কত কোয়া মাটি কেটেছি, জানিনা।
মাটির হিমপাতাল কতটা নদী হয়ে উঠেছে, জানিনা।
পদ্মপাতার উলঙ্গতায় কতটা স্বচ্ছতা মেখেছি, জানিনা।

আমার নিদ্রার নিবিড়ে এসে
আমাকে পুরুষ করে যাবে সে
শয্যার আবর্তে সংসারী করে যাবে সে
সহধর্মিণীর মর্যাদার আরশির স্পর্শে
রেখে যাবে তার বাম স্তনে সন্তান সন্ততির আবদার
দক্ষিন স্তনে আকাশ ব্যাপ্তি আমার একান্ত অধিকার।

 

কবিতার সৃষ্টি

ভোর লগ্ন উঠোন তুলসিপাতার শয়ন তুলে তুমি
আমার ঠোঁটে আঙুলের স্পর্শমেখে; বলতে
জানো? ‘এই আকাশ আমার’।
আমি শুধু তোমাকে দেখতাম।
কাজলপোড়া সূর্যডোবা সাঁঝের নিবিড়ে তুমি
আমার হাত তোমার হাতে রেখে; বলতে
জানো? ‘এই পদ্মচাঁদ আমার’।
আমি শুধু তোমাকে দেখতাম।
মাটির সুবাসে মৃন্ময়ী বাতাস বিবস্ত্র হলে তুমি
আলোর আঁচের লহমা আমার গা জড়িয়ে; বলতে
জানো? ‘এই শিশিরস্নাত ফুলগুলো আমার’।
আমি শুধু তোমাকে দেখতাম।
দহনোন্মুখ শয্যার আলিঙ্গনোৎসব উর্বশী রাতে তুমি
সমস্ত চুলের বোঝা নামিয়ে আমার বুকে; বলতে
জানো? ‘এই গোটা জগৎ আমার’।
আমি শুধু তোমাকে দেখতাম।
শরীরের কোলাহল আগলে প্রকৃতির নিঃশ্বাসে তুমি
তোমার স্তনের বোটায় আমার দেখার দ্যুতি বসিয়ে; বলতে
জানো? ‘তুমি একান্ত আমার’।
আমি শুধু তোমাকে দেখতাম।
গাছের ভেতর গাছ; পাতার লাবণ্যে সর্বস্ব বেঁধে
উত্তাপের শীত দু’চোখের জলের লোনায় কবিতার সৃষ্টি ।

 

শুধু তোমাকে ভালোবেসেছি

তুমি জানো।
আমি কোনদিন তোমাকে ছুঁয়ে দেখেনি।
ছুঁয়ে নেবার সুযোগ নিতে পারিনি, বলতে পারো।
তোমার পাশে শুয়ে থাকার কথাতো ছেড়েই দিচ্ছি।
হোঁচট গিলে তোমার অনেক কাছে এসেছিলাম।
তোমার শরীরের সুবাসে বহুবার বেসামাল হয়েছিলাম।
তোমাকে ‘ভালোবাসি’ বলতে গিয়ে ঠোঁট নাড়াতে পারিনি।
বুকের কুণ্ডে গলার স্বর শুকিয়ে অশঙ্খ হয়েছিলো।
বিশ্বাস করো। মাটির দিব্যি দিয়ে বলছি ।
তোমার ঈশ্বরকে জিজ্ঞেস করো।
শুনেছি ঈশ্বর আদৌ মিথ্যে বলেনা।

আমার একখানা ঘুপচি ঘর। হাওয়া বাতাস না ঢোকার মতো।
বুঝি, পাখির বাসা এর চেয়ে ঢের ভালো।
সূর্যোদয় সূর্যাস্তের আধোদূর আলোয় কতোটা বাস; ঘরবাড়ি
উলসে ভালোবাসার নির্জনতাপ ভালো।

তোমার আসার আহ্লাদের গন্ধে
দীর্ঘরাত বুকের ভেতর নিস্তব্ধ রঙবাহারি তুবড়ি জ্বালিয়ে
দু’চোখ উল্লাসে তোমার দিকে ছুঁড়ে দিয়েছি জন্মের মতো
অবিরল বিশ্বাসে।
নিজের ছায়ার মধ্যে শরীর গড়িয়ে নিচ্ছি
এতদিনের একতরফা ভালোবাসার মৌচাক
অন্ধকারের জরুলে জেগে আছে।
আলিঙ্গনের মতো ভোরের সকাল;
কল্পনার চৌচির ঘরে।

আমি ভ্রমের সজলতায়
বয়স ধরে ধরে বেঁচে থাকার উচ্ছ্বাস কুড়িয়ে নিয়েছি।
বয়স বাড়ে উচ্ছ্বাস বাড়ে।
তোমাকে জড়িয়ে ধরার ছিটকিনি খুলে
বুকে মধ্যে নতুন ধরার ঝনৎকারে আত্নহারা আছি।
তোমার রূপ রঙের পরাগে জীবনের পরিধি মেখেছি।
দৃশ্যপিপাসু শীতের শাক সব্জির বুকভারি সবুজ হাসির
ফাঁসিকাঠে মরতে চেয়েছি।
অভিমানে যত দূর গেছি
তোমাকে আমার বুকের হৃৎপিণ্ডে বেঁধে নিয়ে গেছি।

নিচুমুখে সিঁড়িমুখে বসে আছি।
এখন আর সিঁড়ি ভেঙে ছাদে যাওয়ার সাহস কুলোয় না।
নড়ে চরে ধপাস শরীর আর খোলা আকাশ দেখতে পাইনা।
খাটে শুয়ে শুয়ে যতোটুকু আকাশ দেখা যায় বৃষ্টির শীতে
তোমার উত্তাপ ভোগ করেছি।

অন্ধকার নামলে পায়ের নীচে, রাতে অবৈধ জ্বর আসে।
নিঃশ্বাস কমে আসে। দু’চোখের দৃষ্টি ফুরিয়ে আসে।
শরীর ক্রমশ শবের দিকে নুয়ে পড়ে মৃত্যুর আঠা ধরে।
আমার ঈশ্বর জানে।
আমি জন্ম নিয়েছিলাম শুধু তোমার জন্য।
তোমার আদল ছুঁয়ে বেঁচে থাকার আনন্দবিলাস
শতাব্দীর কৈশোর যৌবন বয়সী বেঁধে অধিকার।

শুধু তোমার জন্য।
আমি বেঁচেছিলাম শরীরে তোমাকে ভালোবেসে।
শরীরে মৃত্যু জড়িয়ে যাবো তোমাকে ভালোবেসে।

বিশ্বাস করো। আগুনের দিব্যি দিয়ে বলছি ।
তোমার ঈশ্বরকে তলব করে জানতে পারো। নিশ্চয় বলবেন।
আমার চিতার আগুন চিতিয়ে কতটা সত্যির আলোর ফুলকি ধরেছি।
কতটা তোমাকে ভালোবেসে আমার জীবন এ’পাশ ও’পাশ করেছি।

একদিন হয়ত

একদিন হয়ত সূর্য দেখা যাবে না আকাশে
ভুলে যাবে আলোর ভেলা ভাসাতে।
মৃত্যুর চিহ্ন পড়ে থাকবে অবহেলায়।

একদিন হয়ত শাসন সোহাগ
ঘুমের পিল ছাড়া আসবে না চোখে।
শরীর জাগিয়ে যাবে অস্বস্তি চাওয়ায়।
দিনদুপুর দুম করে বন্ধুর যাওয়া আসা।
বয়স বাড়বে বয়স ধরে ভালোবাসা।

একদিন হয়তো আলো জ্বলবে না চাঁদ ঝলসে
মৃত্যু শুয়ে ফুলের গন্ধে মরতে আসবে পূর্ণিমা রাতে।

বিকাশ দাস। কবি। জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের মালদহ শহরে। পড়াশোনা করেছেন প্রথমে ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জে, এরপর কলকাতায়। বর্তমান নিবাস মুম্বাই। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থঃ এখন আমি একা, জরায়ুজ, নিকুচি করেছে কবিতা, কবির শেষপাতা, তবু ভালো দুঃখ দিও, জীর্ণ ব্যথার মুখবন্দী কথা, নির্বাচিত কবিতা, ঈশ্বর...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

বেশরম

বেশরম

বেশরম কি কঠিন ছিলো, ডুব সাঁতারের রুদ্ধ দম তোমাকে ভুলেছি ঠিক এক বেশরম- আবার পড়েছি…..

তোমার জন্য

তোমার জন্য

পাষাণের প্রেম বিকট স্তব্ধতায় সুনিপুণ সীমানা প্রাচীর তুলেছ, বেসামাল ভালোবাসার জাগতিক জায়নামাজে। প্রার্থনার গতিরোধ করো…..