দেউলিয়া

শ্রীপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
কবিতা
Bengali
দেউলিয়া

অস্থিমজ্জায়

মিশে আছো আমার অস্থিমজ্জায়
ধমনী জুড়ে বয়ে চলা
জতুরস স্রোতের আধারে,
এত কাছে কাছে থাকো
দর্পণভীত কাকের মতো
দু’ডানা মেলে প্রাণপণে সরে যাই
কর্কশ শব্দ করে,
জন্মভীতু আমি
তোমার হাতের তালুতে আমার হৃদয়
হৃৎপিণ্ডের ভিতরে তক্ষক
চোদ্দোপুরুষ ক্রীতদাসের মতো
তোমার কাছে নতজানু হয়।

মিশে থাকো রক্ত, ক্লেদ, অনুচাক্রিকায়
আমি তো তোমার কেউ না
তোমার মঙ্গল-অমঙ্গলের কোনো খবর রাখি না
সুবচনি বা শান্তিজল
কনকাঞ্জলির দিনেও
উথলে ওঠে না স্নেহের বলক
তোমার নগণ্য তিলকাঞ্চন, এমনকী
দানসাগরেও আমার কোনো
অনাত্মীয় ছায়া কখনো পড়ে না
তবুও নাছোড়বান্দা, অকপট মিশে থাকো
আমার অস্থিমজ্জায় জুড়ে।

 

বেঁচে আছি

আমার তো কিছু চাওয়ার নেই
অষ্টপ্রহর বা নগরকীর্তনে
কোনো ঈশ্বরের কাছে
নতজানু হতে হয়নি কখনো
অর্থ বা পরমার্থ পলান্নের ভোগে
লালায়িত থাকিনি
বিশ্বাস-এর মাধুকরী যাচ্ঞা করি না
দু-বেলা দু-মুঠো শাকান্নের যুগী
পদ্য লেখার জন্য ঔরসজাত
যৎকিঞ্চিত পরমায়ু, বহাল তবিয়তে
বেঁচেবর্তে আছি
সচেতনে এই বোধ একাত্ম করে রাখে
পরকাল রসাতলে দিয়ে
ইহকাল মেপে চলা জীবন-ব্যপারী
মানুষের পাশে বিবাদে-খেউড়ে
মাতাল, ভাঁড়, চোরেদের সাথে
রৌরব নরকের কালনেমি আঁচড়কামড়
সভ্যতার দারুচিনি আতর সুবাসে
ডালে – ভাতে
দিব্যি বেঁচে আছি
নিজের কাছে নতজানু হয়ে।

 

দেউলিয়া

এক সাগর বৃষ্টিজলে
তৃষ্ণা মেটে না কারো
এক আকাশ ভালোবাসা নিয়েও
নিঃস্ব হয় কেউ
বুকের বন্দিশালায় পাথর ভাঙে
আদিম মানব, সর্বস্ব জলাঞ্জলি দিয়ে
পরকাল ভিক্ষা মাগে রসিক কাঙাল
সবকিছু রসাতলে দিয়ে
রাজার মতো বেঁচে থাকার অধিকার চায়
সে কোন আহাম্মক

গুহামানবীর অবয়বে নিরাভরণ
হেঁটে যায় একলা পাগল
সময় ভারবাহী-ভৃত্য নতজানু হয়।
এক আলোকবর্ষ আয়ুর পুঁজি নিয়ে
গতায়ু হয় বটের বনসাই
বুড়ি চাঁদ নদীজলে ভেসে গেলে
জ্যোৎস্নাগুঁড়ো ভেসে যায়
ঢেউয়ে ঢেউয়ে রুপালি ছলাকলায়।

 

জীবনখেলা

মন নিয়ে খেলা
বড় বেশি সেকেলে এখন
ক্ষত -বিক্ষত হতে হয় ক্রমাগত
বড় বেশি রক্তপাত ভিতরে ভিতরে
কেটে যায় কত-কত উজাগর রাত
জয়ী কেউ হয় না কখনও
চলে না কোনো খেলার নিয়মে
ফলাফলহীন খেলা
নিশিদিন কে আর খেলতে চায়

এসো, আজ অন্য খেলা খেলি
বন্দরে নোঙর ফেলার আগে
মেপে নিই কত তীব্র জোয়ারের জল
বাঁকে বাঁকে চোরাটান কতটা জোরালো
উত্তমাশা অন্তরীপ
কতটা ভাসিয়ে নিতে পারে

শান দিই ঘষেমেজে পুরাতন তূণে
ফলামুখ তীব্র করি পরস্পরে
যত তূণ রাখা আছে অমেয় তূণীরে
এ – খেলায় পরাজয় হয় না যখন
এসো মাতি মরণখেলায়।

 

হারিয়ে যেও না

এভাবে হারিয়ে যেও না
অনেক জন্ম পথ হাঁটা বাকী
বাতাসে বাজছে নিষিদ্ধ তানপুরা
যন্ত্রণার সব আগুন নিভিয়ে দিতে
অভিমান মাত্র সম্বল এখন
হাঁটু ভেঙে ঝরে পড়ে নিস্পত্র বকুলের ছায়া
এই অসম্ভব রাতে
মায়াবী সত্যরা মেঘ ভেঙে নেমে আসে
তুমি সেদিন বৃষ্টি ভিজেছিলে ছাতিম তলায়।

কোন অমোঘ রক্ষাকবচ নেই
গন্তব্যহীন এক অনস্বর অপেক্ষামাণতা
জমাট শিকড়ে অন্ধকার
মুখোশের আড়ালেই মুখের ঠিকানা
এখনও মাঝে মাঝে ক্যুরিয়ার খাম
না বলা কথার অনেক অলিগলি
দর্পণে নিজের মুখ এখন দেখিনা
পলাতক ছায়া লুকিয়েছে জলে
এভাবে হারিয়ে যেও না।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ