দেখা হবে বন্ধু

ইসরাত জাহান
গল্প
Bengali
দেখা হবে বন্ধু

 

দেখা হবে বন্ধু কারণে আর অকারণে
দেখা হবে বন্ধু চাপা কোন অভিমানে
দেখা হবে বন্ধু সাময়িক বৈরিতায়
অস্থির অপারগতায়।

গানটি গেয়েছিলেন প্রিয় শিল্পী পার্থ বড়ুয়া। অনেক বছর ধরে শুনছি গানটি। গানের কথাগুলো হৃদয় ছুঁয়ে
থাকে যেন। বিশ্বাস ও করি। কারণ এরকম ঘটনা বহুবার আমার সঙ্গে ঘটেছে। তবে এই ঘটনাটা এই গানের “”দেখা হবে বন্ধু সাময়িক বৈরিতায় অস্থির অপারগতায় “”এই লাইনের মতো।
কয়েকদিন আগে একটা দুর্ঘটনায় কোমরে ব্যথা পেয়ে ভুগছি খুব।
থেরাপি দেওয়ার পাশাপাশি হাজার গন্ডা নিয়ম কানুন এবং ঔষধ তো চলছেই। গতকাল আমার ডাক্তার এর সাথে এপয়েন্টমেট নেয়া ছিলো
এপোলো হাসপাতালে। গেলাম হাসপাতালে, একাই। হাসপাতালে সাধারণত আমি একাই যায়। এই তো কিছুদিন আগে একটা অপারেশন ও করিয়ে এনেছি পায়ে। সেটা ও একা।
আমার ডাক্তার দেখানো শেষ। আমি বের হচ্ছি ডাক্তার এর চেম্বার থেকে।
অন্য একজন ঢুকছেন। মুখটা বড্ড চেনা চেনা লাগছে কিন্তু আমি কিছু বলার আগেই তিনি চেম্বারে ঢুকে গেলেন।
আমি কিন্তু চেম্বারের বাইরে বসে রইলাম। হঠাৎ দেখি তিনি চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলেন এবং আমার দিকেই এলেন। এসে একগাল হাসি দিয়ে বললেন, কেমন আছো ইরাবতী?
আর আমি?
খুব সহজ খুব চেনা ভঙ্গিতে বললাম, ভালো আছি মেজর সাহেব।
হ্যাঁ উনি মেজর রাহি। বারো বছর আগে আমার চেনা মেজর রাহি।আমি বললাম, আগে ডাক্তার দেখিয়ে আসুন, আমি অপেক্ষা করছি।
তিনি ডাক্তার এর চেম্বার এ ঢুকলেন।
আমি চলে গেলাম বারো বছর আগের এক বিকেলে। তারিখ মনে নেই তবে বৃহস্পতিবার ছিলো। আমি যাব ঢাকা থেকে রাজশাহী। অফিসের কাজে। বাসে আমার টিকিট। বিকেল চারটা। অফিস থেকে সেদিন আগেই বাসায় ফিরে তারপর তৈরি হয়ে টেকনিক্যাল মোড়ে। বাস এলো। বাসে উঠলাম ও। বাস ছাড়ল সোয়া চারটায়। আমার সিট সি টু তে।
পাশের সিটটা খালি। বাস সাভার এসে থামতেই এক ভদ্রলোক উঠলেন এবং আমার পাশে সি ওয়ান এ।
পাশে বসেই নিজের পরিচয় দিলেন।
রাহিয়ান চৌধুরী, মেজর, যশোর বাড়ি। তবে আজ যাচ্ছেন রাজশাহী , বন্ধুর বিয়েতে যোগদান করবেন বলে।
আমার পরিচয় দিতেই বললেন, সে তোমার নাম যাই হোক না কেন আমি ইরাবতীই বলব। ভীষণ আমুদে।আমার খুব ভালো লাগছিল। বয়সে আমার চেয়ে চার পাঁচ বছর বড় হবে।
গল্প কথায় গাড়ি চলে এলো সিরাজগঞ্জ। গাড়ি থেমেছে হোটেল এরিস্টোগেট এ। আমরা সবাই নেমেছি। রাত আটটা বাজে। হঠাৎ করে বৃষ্টি নামল। ঝুম বৃষ্টি। আমরা দুজন কফি আর স্যান্ডউইচ নিলাম। টাকাটা মেজর রাহি দিলেন। খাওয়া শেষ। বৃষ্টির ভেতরেই সবাই আবার গাড়িতে উঠলাম। তারপর আবার গল্প। বেশির ভাগ গল্পই আমাদের দুজনের কাজের পরিধি পরিবেশ নিয়ে। ব্যক্তিগত কোন গল্পই সেদিন হয়নি। এক অদ্ভুত সম্মোহনী ক্ষমতা আছে ভদ্রলোক এর। আমি মুগ্ধ বিমোহিত শ্রোতা যেন।
গল্প কথায় সিরাজগঞ্জ, নাটোর ছাড়িয়ে গাড়ি কখন রাজশাহী চলে এসেছে খেয়ালই করিনি। যখন খেয়াল হল তখন গাড়ি রাজশাহী তালইমারি মোড় পেরিয়েছে মাত্র, হঠাৎ কিছু হল। মনে হল প্রচন্ড শব্দে কাঁচ ভাঙছে সাথে শরীরের সব হাঁড়গোড় ও । আমি জানালার পাশে ছিলাম বলে আমার কপালে আঘাত লেগেছে অল্প খোলা জানালার গ্লাসের হুকে। ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে।তবে খুব বেশি নয়। চারিদিকে চিৎকার শুনতে পাচ্ছি। আমাদের বহনকারী বাস আরেক বাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে। কিন্তু মেজর রাহি কোথায়?
তাঁকে কেন দেখতে পাচ্ছি না? তিনি পড়ে আছেন চার সিটের মাঝখানের সরু হাঁটা পথে। তাঁর অবস্থা আরো গুরুতর। উপরের বাংকার থেকে শক্ত কিছু তাঁর মাথায় পড়ে তিনি জ্ঞান হারিয়েছেন। তাঁর মাথা মুখ রক্তে থৈথৈ। ততক্ষণে আশপাশ থেকে লোকজন আসা শুরু হয়েছে।এম্বুলেন্স পুলিশ সব খুব দ্রুত এলো। মেজর রাহিকে কে নেয়া হলো রাজশাহী সদর হাসপাতালে। আমাকে ও নেয়া হলো। আমার সেলাই প্রয়োজন হলোনা। কপালের বা পাশে কেটেছে। ব্যান্ডেজ করে দেয়া হলো। তারপর খোঁজ করলাম মেজর রাহির। কিন্তু খোঁজ পেলাম না।
আমি আমাদের রাজশাহী জোন অফিস এ ফোন করে জোনাল ম্যানেজারকে ডাকলাম। মেজর রাহির খোঁজ পাচ্ছিনা। তার কাছে থাকা ফোন ও যে কোথায় সেটা ও আমার অজানা। গাড়িতে থাকা বেশির ভাগ যাত্রীই কম বেশি আহত হয়েছেন। দুজন চলে গেছেন না ফেরার দেশে। হাসপাতাল জুড়ে আহাজারি, পুলিশ, সাংবাদিক।
কে কার খবর নেবে!!
আমি ও এখানকার কাউকে চিনিনা। কি করব বুঝতে পারছিনা। খুব অসহায় লাগছে। অবশেষে জোনাল ম্যানেজার এলেন। তিনি সেখানকার স্থানীয় হওয়ায় সুবিধা হল। আমরা মেজর রাহির খবর জানতে পারলাম। তার মাথায় আটটি সেলাই লেগেছে।প্রচুর রক্তক্ষরন হয়েছে। রক্ত লাগবে।রক্তের গ্রুপ ও পজিটিভ। জোনাল ম্যানেজার সেখানকার শাখা অফিস এ ফোন করে ও পজিটিভ রক্তের দুজন স্টাফকে আসতে বললেন। তারা দুজন দিলেন দু ব্যাগ রক্ত।
আমার ও রক্তের গ্রুপ “ও” পজিটিভ। আমি ও ঐ অবস্থাতেই দিলাম এক ব্যাগ রক্ত। ভোরের সূর্য ওঠার সাথে সাথে মেজর রাহির ও জ্ঞান ফিরল।
তার সাথে কথা বলে তার বন্ধুকে খবর দিলাম। তিনি এলেন সকাল আটটার দিকে। তিনি লোক মুখে দুর্ঘটনার খবর শুনে এবং ফোনে না পেয়ে হাসপাতালের দিকেই আসছিলেন।
দুপুরে আমি শাখা অফিস এ এসে কাপড় চোপড় বদলে আবার গেলাম হাসপাতালে। আমার তো দুদিনের সফর ছিলো। দুটো পোশাক আমার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগেই ছিলো।
বিকেলে মেজর রাহিকে বেশ ঝরঝরে লাগল। তবে বন্ধুর বিয়েতে আর যোগদান করা হলোনা। সেদিনই বন্ধুর বিয়ে ছিলো। তিনি তাঁর ছোট ভাইকে হাসপাতালে রেখে গেছেন। আমি অফিসের রান্না করা খাবার নিয়ে গেলাম। তিনি খেলেন।আমি চলে এলাম রাতে শাখা অফিস এর আবাসিক এ।
যে কাজের জন্য গিয়েছিলাম সেগুলো সারলাম রাতভর। তারপর ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ।ঘুম থেকে উঠে দেখি দশটা বেজে গেছে।তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে ছুটলাম হাসপাতালে । কিন্তু গিয়ে দেখলাম মেজর রাহি তার নির্ধারিত বিছানায় নেই। তবে কোথায় গেলেন? ডিউটি ডাক্তার কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন মেজর রাহি কে তো তার বাবা এসে নিয়ে গেছেন। আমি বললাম কি বলছেন এসব? উনি তো অসুস্থ। উনাকে কিভাবে ছেড়ে দিলেন? আর আমার ফোন নাম্বার দেয়া আছে ওনার ফাইলে। তাহলে ফোন করেননি কেন? ডিউটি ডাক্তার বললেন মেজর রাহি এখন অনেকটাই ভালো আছেন। আর ওনার বাবা এসেছেন দ্বায়িত্ব নিয়ে। তাই আর আমরা কাউকে ফোন দেয়ার প্রয়োজন মনে করিনি।
আমি বাকরুদ্ধ যেন,
ভীষণ এক চাপা অভিমান ভর করল আমার মনে। জিজ্ঞেস ও করলাম না ডাক্তার কে আর কিছু।
আমি বের হয়ে আসছি ওয়ার্ড থেকে। পেছন থেকে ডাক্তার বললেন, মেজর রাহি আপনার জন্য একটি নোট রেখে গেছেন। নিয়ে যান।
আমি আবার পিছিয়ে এলাম। ডাক্তার এর হাত থেকে ভাজ করা কাগজটি নিলাম। কিন্তু খুলে দেখলাম না। কেন দেখব? কিন্তু সে ভাজ করা কাগজটি রেখে দিলাম ব্যাগে। তারপর শাখা অফিসে ফিরলাম। রাতের ট্রেনে উঠলাম ঢাকা ফিরব বলে। ফিরে ও এলাম ঢাকায় পরদিন ভোরে। যাওয়া আসা রাজশাহী থাকা সব মিলিয়ে চারটি দিন। কিন্তু সাথে নিয়ে এলাম হাজার ও রোজনামচা।
ঢাকায় ফিরেই আমার নতুন চাকরির নিয়োগ পত্র পেলাম। ঢাকাতেই,,তবে মহাখালী থেকে ধানমন্ডি। আসার আগে আমার অফিসিয়াল ফোন,, সিমকার্ডটি ও দিয়ে এলাম সেখানে।
নতুন কর্মক্ষেত্র নতুন ফোন নতুন সিম কার্ড। নতুন পথচলা। তারপর আজ বারো বছর। কিন্তু কি ছিলো সেই ভাজ করা কাগজে?
সেই ভাজ করা কাগজটি আমি ছিড়িনি, ফেলিনি, হারায় ও নি, তবে খুলি ও নি। সে কাগজ আমি সে বছরের রোজনামচার খাতায় কোন পাতায় রেখে দিয়েছিলাম যত্ন করে।
আমি ফিরে এলাম বর্তমানে। কারণ সেদিনের মেজর রাহি আমায় ডাকছেন।
ইরাবতী ইরাবতী বলে।
আমি এক গাল হাসি হেসে বললাম বসুন।
তিনি বললেন চল বাইরে কোথাও বসি।
সেদিনের সেই সম্মোহনী ক্ষমতা এখনও বুঝি তার আছে। তাই চলে ও এলাম তার সাথে পাশেই একটা কফি শপে।
মেজর রাহি বললেন , ইরাবতী তুমি সেই আগের মতোই আছো। শুধু দীঘল কালো চুলগুলো ছোট করে মেহেদির রঙে রাঙিয়েছো। তবে বদলাওনি এতটুকু। তোমাকে কত খুঁজেছি জানো ?? তোমার অফিসের ফোনে কল দিয়ে জেনেছি তুমি চাকরিটা ছেড়ে অন্য কোথাও যোগ দিয়েছ। বাসা ও বদলেছ? কিন্তু তোমার কোন তথ্যই জানতে পারিনি। কিন্তু আমি তো তোমার জন্য চিঠি লিখে রেখে এসেছিলাম। সেখানে আমার ঠিকানা সমেত ফোন নাম্বার ছিলো। তুমি যোগাযোগ করনি কেন? যাকে নিজের শরীর থেকে রক্ত দিলে, অন্যদের কাছ থেকে রক্ত জোগাড় করে, নিজের টাকা খরচ করে ঔষধ কিনে, চিকিৎসা করালে তার আর খোঁজ নিলে না কেন?
কি বলব আমি? কি বলতে পারি?
তবুও বললাম,চিঠিটা আমি পড়িনি।এমনকি ভাঁজ ও খুলিনি। কারণ আপনি আমার জন্য অপেক্ষা না করেই চলে গিয়েছিলেন।
মেজর রাহি অবাক হয়ে বললেন, তুমি চিঠিটা খোলনি? পড়নি?
তোমার জন্য অপেক্ষা করে বারো বছর কাটল আর তুমি বলছ অপেক্ষা করিনি। সেদিন যদি চিঠিটা খুলতে তাহলে হয়তো জীবনটা অন্যরকম হতো। এরকম বোহেমিয়ান হতো না।
আমি বললাম,,বোহেমিয়ান বুঝি?সেটাই ভালো!!
বললাম এখন যে উঠতে হবে।
মেজর রাহি বললেন,(না এখন আর মেজর নন,পদবী বদলেছে)চল তোমাকে পৌঁছে দিই। আমি বললাম, আমার সঙ্গে গাড়ি আছে।
তারপর বিদায় নিলাম দুজনের কাছ থেকে আবার দেখা হবে বলে।
ঘরে ফিরে বারো বছর আগের রোজনামচার খাতা আগে বের করলাম, চিঠিটা আছে এখনো ভাজ করে চুপ করে।
খুললাম আস্তে আস্তে,
সেখানে লেখা কালো কালিতে

“”ইরাবতী,
বাবা এসেছেন আমাকে নিতে।আমার চিন্তায় মা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। তাই আমাকে যেতে হচ্ছে বাবার সাথে গ্রামের বাড়ি যশোর এ। তোমার মোবাইল বন্ধ পেয়ে অফিসের ফোনে কল দিয়ে জানলাম রাত ভর কাজ করে তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ। তাই তোমাকে ডাকতে নিষেধ করেছি। তোমার ঘুমন্ত মুখটা আমায় খুব টানছে।আমি যেখানেই যায় মন পড়ে রইল তোমার কাছে। দেখা হবে নিশ্চয়ই তোমার সাথে। আমার মন তোমাকে খুঁজে নেবে। ভুল বুঝোনা প্লিজ। নীচে বাড়ির ফোন
নাম্বার থাকল। কল দিও প্লিজ।
রাহি।

আমার কেমন জানি অস্বস্তি হচ্ছে। এই শীতে ও আমি ঘামছি। সেদিনের মেজর রাহি কি আজ ও আমাকেই খুঁজে খুঁজে আমারই অপেক্ষায়??কেন দেখা হল?
অস্থির অপারগতায়??
গানের লাইন গুলো আবার ও কানে বাজছে।

ঠিক সতের দিন পর ভোরে ঘুম ভাঙলো ল্যান্ড ফোনের ক্রিংক্রিং আওয়াজ এ। উঠে ফোন তুলতেই মেজর রাহির কন্ঠ। বলছেন, ইরাবতী ফাগুনের প্রথম প্রহরে তোমার জন্য পৃথিবীর সব শুভেচ্ছা, শুভ সকাল।
একটু লজ্জা পেলাম, কেন?জানিনা!!
তারপর বললেন, আজ কি করবে?কোথায় যাবে?
বললাম আজ তো অফিস আছে, অন্য কোথাও যাওয়ার উপায় নেই।মেজর রাহি বললেন, অফিস শেষে কি দেখা হতে পারে?

কিছু না ভেবেই বললাম,পারে। তিনি আমার অফিসের ঠিকানা জেনে নিলেন। বললেন, ঠিক সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় তোমার অফিসের সামনে অপেক্ষা করব। বললাম, ঠিক আছে।
তারপর ফোন রেখে ভাবলাম, দেখা হবে! আবারও!!

বারো বছর পর দেখা হল এই তো সেদিন, তারপর আবার দেখা হবে বলে কথা দিয়েছিলাম। কিন্তু কি বলব দেখা হলে? কিইবা বলার আছে? কি শুনব? কিইবা শোনার আছে?
তারপর কাজে কর্মে সকাল গড়িয়ে দুপুর , দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তারপর সন্ধ্যা। অফিসের কাজ শেষ। সন্ধ্যা ছ’টা।

আজ অফিসের গাড়িতে ফিরব না বলে বেরিয়ে এলাম অফিস থেকে। ভাবছি সাড়ে ছ’টা পর্যন্ত অফিসের পাশে কফি শপে অপেক্ষা করব মেজর রাহির জন্য। কিন্তু নীচে নামতেই চোখ আটকালো কালো করোলা গাড়িটার দিকে। ওটা মেজর রাহির গাড়ি। কিন্তু তিনি কোথায়? আর ওনার তো সাড়ে ছ’টায় আসার কথা। এখন তো ছ’টা বাজে।

ইরাবতী কেমন আছো? চমকে গেলাম মেজর রাহির কন্ঠ শুনে। তিনি আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি ঘুরে দাঁড়ালাম তার দিকে। আমার বুকের ভেতর জল ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছে।
চোখে মুখে প্রশান্তির হাসি হেসে তিনি তাকিয়ে আছেন আমার চোখে। আমি কেমন বিবশ হয়ে যাচ্ছি মনে হল।
তিনি আবার ও কথা বলে উঠলেন, বললেন বিকেল পাঁচটা থেকে অপেক্ষা করছি, এতক্ষণে নামলে?
আমি অবাক হয়ে বললাম, আমাদের তো কথা হয়েছে, সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় দেখা হওয়ার কথা।

মেজর রাহি বললেন, তাতে কি হল?আমি আগেই চলে এসেছি। আর আগে এসেছি বলেই তো আধা ঘন্টা আগেই দেখা হল।
তারপর বললেন, এখন বল কোথায় যাব আমরা?
আমি বললাম, ওয়েস্টিন এ যাওয়া যেতে পারে।
মেজর রাহি ঠিক আছে এসো, বলে গাড়ির বাম পাশের দরজাটা খুলে দিলেন। আমি উঠে বসলাম। তিনি ঘুরে ড্রাইভিং সিটে এসে বসলেন।তারপর একটা সাদা গোলাপ এর তোড়া আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, তুমি কি ফুল পছন্দ কর তা তো আমার জানা নেই তাই আমার পছন্দের ফুল সাদা গোলাপ তোমার জন্য। কিন্তু এবার তুমি বল কি ফুল তুমি পছন্দ কর? সেটা ও দেব তোমাকে। আমি বললাম, আমার প্রিয় ফুল সাদা গোলাপ নয় কিন্তু সাদা গোলাপ আমি অপছন্দ ও করিনা। তাই এটাই যথেষ্ট। তিনি তবুও বললেন, ঠিক আছে অপছন্দ নয় কিন্তু শুনতে দোষ কি? অতঃপর বলি,আমার প্রিয় ফুল দোলন চাঁপা।
তারপর দ্যা ওয়েস্টিন।
আমরা বসেছি ফুড কর্নারে। কফি এলো সাথে স্ন্যাকস। টুকরো টুকরো কথা। কেমন ছিলাম?? কোথায় আছি এসব।
মেজর রাহি এখন আর মেজর নেই। পদোন্নতি হয়ে এখন বিগ্রেডিয়ার জেনারেল।
ফিরে গেলেন সেই বারো বছর আগে। বললেন, কত খুঁজেছি তোমাকে। তোমার পুরোনো অফিসে ও গিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি কোন মেসেজ সেখানে রেখে যাওনি, তারপর আমি পি,এইচ,ডি র জন্য শিকাগো চলে যাই। ফিরে এসে ও মনে মনে তোমাকেই খুঁজেছি।

আমি বলি জড়ানো গলায়, কার জন্য রেখে আসতাম? কেউ তো ছিলো না।
তিনি বললেন , সত্যিই কি কেউ ছিলো না? না সব অভিমানে ঢেকে ছিল? আমি বলি, কিসে অভিমান? কার তরে অভিমান? কেনই বা অভিমান?
মেজর রাহি বললেন-ইরাবতী, সেদিন সত্যিই আমার কোন উপায় ছিলো না। তাই চলে যেতে হয়েছিলো তোমার সাথে দেখা না করে। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমার মন তোমাতেই ছিল। এখনও তোমাতেই আছে।

আমার খুব অসহায় লাগছে হঠাৎ করে। অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে কেন দেখা হল অস্থির অপারগতায়?
মেজর রাহি (না তিনি এখন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল)বললেন, তোমাকে কিছু বলতে চাই,
আমি ব্যাকুল হয়ে বলি,
আমাদের গেছে যেদিন
থাক সে সব কথা ব্যাক্তিগত,
যা বলতে পারি
তাই বলি সমষ্টিগত।
তিনি হয়তো বুঝলেন যে আমি আমার ব্যক্তিগত কোন কথা বলতে চাইনা বা তার ও কিছু শুনতে চাইনা।তাই চুপ হয়ে গেলাম দুজনেই কিছুক্ষণ। তার চোখের দিকে না তাকিয়েও আমি বুঝতে পারছি তার চোখের তারায় আমি হাসছি।

কিন্তু এমন কেন মনে হচ্ছে আমার?নাকি ভুল ভাবছি। এত বছর পর কি তার একা থাকার কথা? না। কথা নয়। আমি ও কি একা? কিন্তু এমন হাহাকার করে উঠছে কেন আমার হৃদয়? কেন এত ব্যাকুল আবেগে তারিত হচ্ছে আমার চেতন গুলো?
অস্থিরতা কাটাতে আমি বলি,,আমাকে উঠতে হবে। তিনি ব্যাকুল হয়ে বলেন, আর একটু থেকে যাও প্লিজ।

কিন্তু সাসপেক্ট অসম সাহসী, তাই বলে উঠি-অন্যদিন।
অতঃপর সেদিনের মেজর ,আজকের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাহিয়ান চৌধুরী
আমাকে ছেড়ে গেলেন বাসার সামনে।
গাড়ি থেকে নামার সময় বললেন-ইরাবতী, তোমাকে খুব ভালোবাসি।
আমি কি বলব? আমার চোখে জল।
আমি নীরবে নেমে আসি গাড়ি থেকে।
আমি যেন হারিয়ে ফেলেছি সব সৌজন্যেতা। আনুষ্ঠানিক বিদায় নেবার প্রয়োজনীয়তা যেন নগণ্য। কিন্তু বারো বছর আগের রাহি ? সেই বারো বছর পর এসে ও প্রথম দিনের মতো হাসি হেসে মত্ত।
বললেন,আবার দেখা হবে। আজ তবে এস।
এরপর কেটে গেল বেশ কিছুদিন। অফিসের একটা প্রজেক্ট নিয়ে আমার খুব ব্যস্ত সময় যাচ্ছে। নিজের দিকে তাকানোর ফুরসত ও নেই। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ওরিয়েন্টশন, বিকেলে অফিসে ব্রিফিং, রাতে ঘরে ফেরা। এক দুপুরে একটু বিশ্রাম পেলাম। ভাবছি একটু ঘুমোবো। কিন্তু মোবাইল ফোন এর রিংটোন বাজল।

রাহি ফোন করেছেন।
কিছুদিন আগেই দেখা হল তৃতীয় বারের মত। বসেছিলাম দুজন হোটেল দ্যা ওয়েস্টিন এ ।
আজ হঠাৎ ফোন?
ফোনটা ধরে হ্যালো বলতেই প্রাণখোলা হাসি হেসে রাহি বললেন,
ইরাবতী, সন্ধ্যায় একটু বিমানবন্দর আসবে প্লিজ। জিজ্ঞেস করলাম কেন?
তিনি বললেন আগে এসো পরে বলব।
আমি সময় জেনে নিলাম। সন্ধ্যা ছ”টা। তারপর একটু ঘুমোলাম। চারটার দিকে উঠে তৈরি হলাম। নীচে নেমে গাড়ির স্টিয়ারিং এ যখন হাত দিলাম তখন সাড়ে চারটা বাজে।
প্রথমেই গেলাম শাহবাগ, ফুলের দোকানের সামনে। রাহি সাদা গোলাপ পছন্দ করেন তাই বারোটি সাদা গোলাপ কিনে তোড়া বানিয়ে নিলাম।
পথ মোটামুটি জ্যাম ছাড়া বলা যায়। আসলে অফিস তো এখনও ছুটি হয়নি।

পাঁচটা পঁয়তাল্লিশে পৌঁছে গেলাম বিমানবন্দর। ভি আই পি লাউঞ্জের পার্কিং লটে গাড়ী পার্ক করে ফুলের তোড়া হাতে নেমে এলাম। রাহি এলেন আমার দিকে। ওনার হাতে এক গুচ্ছ দোলন চাঁপার ঝাড়।আমার দিকে বাড়িয়ে বললেন,,তোমার প্রিয় ফুল। সেদিন জানা ছিলোনা বলে আমার প্রিয় ফুল সাদা গোলাপ নিয়ে গিয়েছিলাম। আজ দোলন চাঁপা। আমি হাত বাড়িয়ে দোলন চাঁপা নিই।তারপর সাদা গোলাপ এর তোড়া রাহির হাতে দিই। হা হা করে হাসলেন একচোট। বললেন আমার পছন্দ সাদা গোলাপ মনে রেখেছো? আমি বলি আরেকটা উপহার আছে আপনার জন্য।
তিনি বললেন আপ্লুত হয়ে, দাও তাড়াতাড়ি। আমি সলজ হেসে বলি,এ উপহার ছোঁয়া যায় না, হৃদয় দিয়ে হৃদয়ে নিতে হবে।
রাহির চোখে রাজ্যের বিস্ময়!!
আমি রাহির চোখে চোখ রেখে আবৃত্তির মত করে বলি!!

“”দেখা হল কত বছর পর,,
বদলেছে দুজনের শারীরিক গঠন
একটু বুঝি মন ও!!
তবুও দেখা হয়ে উল্লসিত মন
বলতে পারি, আছো গো কেমন?
বেলা বয়ে বেলা শেষে ,,
ইচ্ছে করে হারিয়ে ছিলাম অপেক্ষায় ছিলেনা বলে!!
বললে তুমি তাকিয়ে গভীর চোখে,
তোমার জন্য তোমার অপেক্ষায়
কেটে গেছে,, কেটে যাচ্ছে বারোটি বছর,,
তবুও অভিমান পুষে রেখে থাকবে দূরে কেন আপনজন??
বলতে পারিনি কেন যে তোমাকে,,
আমার জীবন গেছে বয়ে
তোমার যাপন থেমে!!
দেখা হল কেন তবে??
অস্থির অপারগতায়,,
ভালোবাসার শ্রুভ্র তরি বেয়ে খেয়ালি মনের কোনে?””

রাহি নিশ্চুপ নির্বিকার। তারপর ধ্যান ভাঙার মত আশ্চর্য হয়ে বললেন, ইরাবতী–এই কবিতা আমার জন্য? আমি উদাশ গলায় বলি,,জ্বি আপনার জন্য। রাহি কেমন যেন হয়ে যায়! কেমন যেন বড্ড চুপ!

আমি চুপ ভাঙাতে বলি,
এখানে কেন ডেকেছেন? কেউ কি বাইরে থেকে আসছে? রাহি বললেন, না। আমি যাচ্ছি।
আমার বুকের ভেতর জল ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছে কেন জানি।
কোথায় যাচ্ছেন? আধ খানা কথা আধ খানা শব্দ হয়ে রাহির কানে পৌঁছালো না বোধ হয়। কিন্তু রাহি বললেন ভেতরে এসো বলছি।
অতঃপর আমরা অপক্ষেমান রুমে।
পাশাপাশি সোফায় বসে আছি।
রাহি বলছেন,
ইরাবতী কেমন আছো??
আমি অবাক চোখে তাকালাম রাহির চোখে। এ চোখের ভাষা আমার খুব চেনা। আমার খুব আপন।
তবু মেঘ থমথমে ভিজে গলায় বলি,
ভালো তো।
রাহি বলছেন,,ইরাবতী,সেই তো দেখা হল তবে কেন এত পরে?
পরে ও যদি বা তবে দুজনের পথ কেন ভিন্ন ছন্নছাড়া? কেন সেদিনের সেই চিঠিটা খুলে দেখলে না?
জানি অভিমান হয়েছিল কিন্তু তাই বলে বারো বছর? তোমার জীবন বয়ে গেছে আমার যাপন থেমে। কি করব আমি?
কোথায় যাব? কোথায় আমার দুদণ্ড শান্তি??
বলতে পারো ইরাবতী??
তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
ইরাবতী,আমার ব্রেনে একটা টিউমার আছে, অপারেশন করতে যাচ্ছি লন্ডনে।
আমার প্রেশারটা হঠাৎ
করে নেমে এলো বোধ করি। সারা শরীর ঘামছে। আমি আকুল হয়ে বলি ,কবে থেকে? কতদিন?
রাহি উত্তর না দিয়ে আমার গা ঘেষে বসেন। তারপর বা হাতে আমাকে আলতো করে ছুঁয়ে ডান হাতে পানির বোতল এগিয়ে দেন।

বললেন একটু পানি খাও, ভালো লাগবে। চিন্তা করোনা। আমি সুস্থ আছি।
আমি চেষ্টা করি স্বাভাবিক হওয়ার।
তারপর রাহি বলতে শুরু করেন,,দুবছর আগে হঠাৎ মাথায় প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করি। মাঝে মাঝেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে শুরু করি। ডাক্তার দেখিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর নিশ্চিত হই ব্রেন টিউমার। এত দিন ঔষধ চলেছে, রেডিও থেরাপি চলেছে।এখন অপারেশন করতে হবে।তারপর কেমোথেরাপি।
আমি কাঁদছি। কেন? এই পৃথিবীতে আমাকে যারা ভালোবেসেছে তাদের নিয়তি তাদের আমার সাথে থাকতে দেয়নি। আর আমি যাদের ভালোবেসেছি তারা আমার সাথে থাকেনি।
রাহি একটা রুমাল দিলেন। আমি বলি টিস্যু আছে আমার কাছে। রাহি বললেন –থাক টিস্যু। রুমালে তোমার চোখের জলের গন্ধটা থেকে যাক। এটা আমাকে শক্তি যোগাবে শেষ পর্যন্ত। আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারছিনা। আমার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।

আমি আকুল হয়ে রাহিকে বলি,,
যেখানে যতদূর যান না কেন, ফিরে আসবেন তো? এবার ফিরলে আমরা একদিন রাজশাহী যাব। সেই ভ্রমণটা তো অসমাপ্ত রয়ে গেছে আপনার।
রাহি আমার চোখে চোখ রেখে বললেন,
পুরো জীবনটাই যে অসমাপ্ত রয়ে গেল ইরাবতী। তোমাকে দেখার পর আবার ও বাঁচতে খুব ইচ্ছে করে।এক ছাদের নীচে না থাকি এক আকাশের নীচে তো থাকতেই পারি।
রাহির চোখে জল। আমার চোখে ও জল। আমরা জানি আমাদের হৃদয় কি বলতে চাই!! আমরা জানি আমাদের হৃদয় কতটা সমুদ্রের ঢেউয়ে খাবি খায়।
সব কথা যায় না বলা। সব কথা হয়না বলা।

রাহি কে এখন যেতে হবে।
রাহি সামনে এগোচ্ছে।
এই প্রথম আমি রাহি কে নাম ধরে ডেকে বলি,
রাহি, ফিরে আসবেন বলুন!!
রাহি চমকে পেছন ফিরে তাকায়। তারপর ফিরে আসে আমার সামনে। এক ঝটকায় আমাকে বুকের ভেতর শক্ত করে ধরে রাখে।
জড়ানো গলায় বলে,,
আবার যদি ফিরি, তোমার জন্য তোমার কাছেই ফিরব। শুধু ভালোবেসে। শুধু ভালোবেসে।

আমাকে ছেড়ে দিয়ে রাহি এগিয়ে যাচ্ছে একটা অনিশ্চিত জীবনের দিকে। একটা অন্য পৃথিবীর দিকে। আমার সুপ্ত চিৎকার সুপ্ত হয়ে গুমরে মরে হারিয়ে ফেরা ভালোবাসার অগোচরে।
কেন সব প্রেম হয়না অমর??

ইসরাত জাহান। কবি। জন্ম বাংলাদেশের পাবনা জেলার ঈশ্বরদী। বর্তমান নিবাস ঢাকায়। তেরোবছর বয়স থেকে লেখালিখি শুরু। লেখা শুরু করেছিলেন দৈনিক বাংলার বাণীর মাধ্যমে। তারপর দৈনিক আজকের কাগজে নিয়মিত লেখালিখিতে ছিলেন। এরপর হঠাৎ করে বারোবছর লেখালিখি থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন। প্রকাশিত বই: 'তোমার...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..