দ্ব্যণুক, স্টিগমা কিংবা ম্যালানকলিয়া

পাপিয়া জেরীন
কবিতা
Bengali
দ্ব্যণুক, স্টিগমা কিংবা ম্যালানকলিয়া

স্টিগমা

যমজ তিলে ঝুলে ক্রুশিফায়েড জিভ
কম্পনে খুলে যায় রোমের দুয়ার
ধমনীর অনুনাদ —
ভ্যাটিক্যানের ঘন্টায় ঘন্টায়,

কাঠের কীলকের কাছে বুক পেতে থাকি
আঘাতে ভেঙে যায় শরীর-গ্রন্থ, ক্বলব;
তারপর ডেভিলস্ আওয়ার নামে,
পবিত্র আত্মার কাছে শীৎকৃতি জমা দিয়ে
আমি কোথাও যেতে পারি না;
এইখানে নাভীর ওপর নামে ব্যাপটাইজড্ রথ
শিথিল শরীরে সুঁই এর মত বিঁধে তার প্রতিধ্বনি…
” ইন দ্য নেইম অফ হোলি স্পিরিট এন্ড গড…”
আমি জিভ পেতে হামাগুড়ি দিতে দিতে
পেয়ে যাই ক্রুশ, পবিত্র নরম পানি!

দ্ব্যণুক

জ্বলতে আছো টলতে আছো চিকন আগুন
তোমার উপর বইসা আছি রূপার হাঁড়ি
ফুটতে থাকে হাঁড়ির ভেতর জলের কুমুদ

বইসা থাকি পন্নগী এক তোমার ডাঁটে
বিষের নেশায় টলতে আছো… দুলতে আছো
শঙ্খবীণে জমতে থাকে ফেনার ঝিলিক

তোমার-আমার দেহ ভাসে নাওয়ে নাওয়ে
জলের ভিতর চান্দে দেখে চান্দেরই মুখ
জলের উপর দুইলা ওঠে শাপলা শালুক

দুলতে দুলতে তোমার আমার যুগল অণু
প্রবল চাপে হইয়া ওঠে সরস দ্ব্যণুক!

ঘোর

এইখানে আমি আর আমার ভ্রমের সংসার
পৃথিবীর সবকিছু এসে
আমারে দিয়ে গেছে ভোগ,
শিশুর কোমল হাত —
তার ঠোঁটের নরম চাপে
গড়ায়ে পড়েছে বোটার চিকন দুধ;

আরো আছে ঘোরের ভিতর
নীল হয়ে থাকা শীতে
জামের মত কালো চোখ নিয়ে ধূসর শিশু,
তীব্র কালো ঠোঁটে ছোঁয়ায় স্তনের বাট–
গাল বেয়ে নামে শ্বেতশুভ্র নদী;
সে নদীতে বসে দেখি দারকিনা মাছ
মাছরাঙা এসে ছোঁ মারে তারে,
তুমিও কি একদিন প্রবলবেগে…
নিয়ে যাবে আমারে!

স্বপ্নগুণ

তোমার যুগল চন্দ্রবিন্দুর মধ্যমা ছেদ করে আসি ভরকেন্দ্রে,আলুনি জিভে চেখে নিই কস্তুর- লবণ
এরপর, অশ্বের আড়াই চালে
নেমে আসি ডান উপত্যকায়;
চোখ মেলে দেখি রক্তিম অর্কিড
জোঁকের মত জেঁকে বসি, অলজ্জে!

অযৌন

একাধিক অযৌন দৃশ্য নিয়ে
আমার আমৃত্যু কৈশোরকাল ভাসে;

স্বপ্নঘোর ঘন হলে
ঝপ্ করে খুলে আসে নির্মোক
তোর অনাঘ্রাত ফুলের কাছে
আমি ঝুঁকে থাকি
শুঁকে নিই বাহুভাঁজ–

এক এক করে উড়ে যায়
কৌটার সব কালো ভ্রমর

তোর বুকে চড়ে বসে… আমার চুলেরা জাল পাতে
মাছেদের মত কেঁপে ওঠে ওষ্ঠ-অধর -চোখ।

অসঙ্গত

মৃত্যু
পাশে আসে
পিঠে মৃদু শ্বাস
পথে পড়ে থাকে
সবুজ নোটের মতো
তোমার মতো প্রেম নিয়ে
আসে
হাসে
আমি দেখি
মৃত্যু আসে
রেখে যায় কাছে
যা ছিলো সব
অথবা দূরে নেয়
যেন অগ্রহায়ণ
যেন ধান চলে গেছে বাড়ি বাড়ি
মাটিতে গেঁথে আছে
তবু নেই কিছু
যেমন অসঙ্গত বিকেল
তুমি অপেক্ষায়
শরীর আছে
প্রেমহীন
তবু অপেক্ষায়
আসি বারবার
চলে যাবো বলে
কিংবা আসিনি কোনোদিন
তবু আসার পথে
ঝরে আছো তুমি
ম্লান
পাতার নীলে
মৃত্যু আসে
প্রসবিতার কাছে
জন্মাতে একবার
বুকে রাখে মুখ
ক্ষুধার কথা বলে
মৃত্যুর মতো তুমি আসো
তোমার মতো আসে
মৃত্যুর ডাক
সব আছে পাশে
তবু মোহনিয়া ডাক
তুলে নিয়ে যায়
শেষে
ঝুলায়ে রাখে
শোয়ায়ে রাখে
বসায়ে রাখে
নিসাড়!

 

অবেলায়

একটা দুর্বার বিকেল
পৃথিবীর অর্ধেক পুরুষ জেলেনৌকা নিয়ে ভেসে আছে কালদরিয়ায়;

এই বিকেলে, রূপালী বটী বরাবর দুইভাগা হয়ে গেছি।
শেষ কশেরুকায় গোর খুঁড়ছে লোমশ নেউল —
উঠে আসছে মেদ, তরুণিমা হাড় আর বিষল মধুকূপি রোম।

একটা দুর্বার বিকেল, অর্ধেক পুরুষের পেয়েছে শবেদের ঘুম। শরীরের গলে পড়া মোমে জমে গেছে নিরুপায় কীট । সরে যাওয়া কৌপিনে ফুলে ওঠা নির্বিষ নাগ !

একটা বারুণের মতো চৌকাঠে আমি, শরীরের ভাঁজে ভাঁজে দারুণ শলাকা হয়ে গেঁথে আছে পাপ,অপাপ । আষাঢ়ের ঝাপটায় ধুয়ে গেল পাটুয়া আঁচল, গন্ধক শ্বাসমূল।

এই দুর্বার বিকেলে অর্ধেক পুরুষ ভেসে গেছে কালদরিয়ার, বাকি অর্ধেক পড়ে আছে শবেদের ঘুমে।

আঙুলের পাকে সলতের মতো আমি, প্রদীপের নীচে তরুণিমা হাড়… বিষল মধুকূপি রোম!

 

ম্যালানকলিয়া ও অন্যান্য

তুমি সর্বময়–একথা অস্বীকার করিনি, বস্তুত আমার এ আঙুল-নখ তোমারই প্রতিনিধিত্ব করে;

তুমি বলেছো, ‘এতোটুকুও ক্ষতি করবোনা তোমার’
অথচ, কতোবার নিজের ক্ষতি চেয়ে শুধু তোমাকেই বলেছি–
কবে কোথায় ফুটে থাকে আমার অনাঘ্রাত বিষফুল!

তুমি জানো আমি নিঃসঙ্গ, এমনকি সঙ্গমমুহূর্তেও!
তারপরও, আমি সন্তানবতী — এ কথা শুনে
চায়ের কাপে চুমুক দাও
অসাবধানে পুড়ে ফ্যালো অনঙ্গ জিভ!

 

দুই.

মতবাদ, তন্ত্র, অধিকার–
কিচ্ছু বুঝিনা আমি
প্রেম বলতে আমি দাসত্ব বুঝি,
তোমার রক্ত-মাংস-জিভ-লিঙ্গ
স্থাবর-অস্থাবর, ষোলোআনা…সব আমার;

‘প্রেম’ একটা অসম চুক্তি
তুমি শুধুু দিয়েই যাবে।

তিন.

এ গ্যালাক্সির কোথায় তুমি
শরীরে সন্তরণরত বীজ,
অন্য প্রান্তে সৃজিত উপগম্যা
ধরে আছে জলের আকর

তুমি জানো না
তোমারে কে নেবে গর্ভে আবার!

চার.

এইযে অন্ধকারে অস্পষ্ট গাছেরা দীর্ঘায়িত ছায়া নিয়ে বসে আছে,

এইযে অহেতুক আলো
সন্ধ্যায় ঢুকে পড়ে মৃতমুখ নিয়ে ,
নারীর গুটানো চুলের ভিতর দুটি-একটি রুদ্ধশ্বাস জোনাকি–
ওদেরও পথ নেই পালাবার;

পাঁচ.

যতোবার তুমি ঢুকে গ্যাছো এই সীমানায়
আমার জঠর, শিরা-উপশিরা, ধমনী
রক্তের প্রতিটা বিন্দু —
শুধু তোমকেই ধরে রাখতে চেয়েছে।

ছয়.

তুমি জায়নামাজের উপর দাঁড়িয়ে ছিলে
গোলাপের মতো ফুটেছিলো আরক্ত আঙুল
আনত চোখ, ঠোঁটে অজস্র আয়াত;
তুমি তখনও জানো না–
তোমার প্রার্থনার পাশে একটা বাসনাবিদ্ধ বকুল ঝরে আছে!

সাত.

জট লাগা হিজল নেমে আসে নীচে,
নেমে আসে ঘেমে থাকা মেঘ চিমনির গর্দানে —
কুকুরের মাস, পারিজাত ভোর
বাসন্তী পথ দিকচিহ্নহীন, তুমি রেখার মতো নিঃশব্দে বেঁকে গ্যালে যেদিকে–
বিচূর্ণ শঙ্খেের মতো ধেয়ে গ্যালো বক;

আট.

শীতলক্ষ্যার পর নীল বন্দর
সেখানে ঊরু তুলে রাখা সান্দ্র শরীরে বেপরোয়া ঢুকে পড়ি
শরীর থাকে কিছু ঢুকে পড়ার–
ঘরহীন ঘোর।

পাপিয়া জেরীন। কবি। বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জে জন্ম (১৯ জুলাই, ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে), মুন্সীগঞ্জেই বেড়ে ওঠা। দর্শন নিয়ে পড়াশুনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রকাশিত বই 'ঊনসপ্ততি', প্রকাশিত হয়েছে বৈভব প্রকাশনী থেকে।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

অহমিকা

অহমিকা

অহমিকা আত্মগরিমায় আজ অন্ধ হয়ে আছো, বিবেকের দংশনে মননে নেই বিশ্বাস। কর্মে ব্যস্ততা সময়ের আবর্তে…..