দ্য পম্পাস ডেথ

সৈয়দ মাহমুদ
গল্প
Bengali
দ্য পম্পাস ডেথ

এবড়ো থেবড়ো মাটির রাস্তা পার হয়ে একটা মেঠো পথের বাঁকে ভ্যান রিক্সাটা দাঁড়িয়ে গেলে অজন্তা রুদ্রকে বলে, নেমে পড়ুন, এখান থেকে পায়ে হাঁটা পথ। দুপাশে ধূ ধূ করছে জনশূণ্য খোলা প্রান্তর। সামনে জঙ্গল, গা শিউরে ওঠা অন্ধকার। অজন্তা নীচু স্বরে বলে, শুনুন, ভ্যান চালকটা ওদের দলের লোক, ওর কাছেও পিস্তল থাকে। কোথাও অযথা কৌতুহল দেখাবেন না, শুধু নির্দেশ পালন করে যাবেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাব, চুপচাপ এগিয়ে চলুন। এখান থেকে ফিরে আজ আপনার সাথে কথা বলা সম্ভব হবে না। আগামীকাল রাতে ঘরের দরজা খোলা রাখবেন, প্রফেসর ঘুমিয়ে গেলে আমি সুযোগ বুঝে আপনার ঘরে আসব, তখন বিস্তারিত কথা হবে। অজন্তা ফিসফিসিয়ে দ্রূত কথা গুলো বলে গেল।

রুদ্র কৌতুহলী হয়ে ওঠে, অজন্তা যাদের সাথে আছে তাদেরকে ‘ওদের দল’ বলছে কেন, তাহলে কি সে ভিন্ন কোন গ্রুপের চর, নাকি বিশেষ উদ্দেশ্যে এখানে এসেছে! ভাগ্যিস সে ভ্যান চালকের সামনে কোন প্রশ্ন করেনি। অজন্তা তারই বয়সী কিংবা অল্প কিছু বড় হতে পারে। এই বয়সী মেয়েরা এ রকম চরমপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকতে পারে দেখে রুদ্র অবাক। অন্ধকার ক্রমে গাঢ় হচ্ছে, ঘন জঙ্গলের পথে যেতে গা ছমছম করছে। পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে অজন্তা, তার মুখাবয়ব পরিস্কার দেখা যাচ্ছে না, মনে হচ্ছে একটা অপরিচিত ছায়ার সাথে হেঁটে যাচ্ছে সে। হঠাৎ চাপা কন্ঠস্বরে চমকে উঠে রুদ্র, স্টপ মুভিং, মাথার উপর দু’হাত তুলে দাঁড়ান। অজন্তা বলে ওঠে, আমরা প্রফেসরের লোক কমরেড! রাইফেলধারী যুবক বলে, চিনেছি, এগিয়ে যান। আস্তানায় পৌঁছতে এরকম আরও দু’বার মাথার উপর হাত তুলতে হলো।

চারিদিকে কবরের নীরবতা, জঙ্গলে ঘেরা টিলা অতিক্রম করে আস্তানায় পৌঁছে গেল ওরা। দলনেতা অভ্যর্থনা জানায় রুদ্রকে, “স্বাগত কমরেড, আপনার কথা প্রফেসর বলেছে। আমাদের মত জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে সময় লেগে যাবে আপনার,  রাইফেল আর পিস্তল চালনা রপ্ত করতে হবে আগে, দক্ষ না হওয়া পর্যন্ত নিজেকে নিরাপদে রাখতে পারবেন না। তাই আপাতত প্রফেসরের বাসায় থাকুন, দু’একদিন পরপর অজন্তা ট্রেনিং নিতে আপনাকে এখানে নিয়ে আসবে। দলনেতা কথা বলার সময় রুদ্র’র পেছনে দু’জন রাইফেলধারী দাঁড়িয়ে রইল, মনে হচ্ছে তাদের হাতে কালাশনিকভ। কিন্তু কালাশনিকভ ওরা পেল কিভাবে, যদিও রুদ্র’র অভিজ্ঞতা শুধু অস্ত্রের ছবি দেখা তবুও ওর মনে হচ্ছে ওগুলো রাশান রাইফেল, অবশ্য নাও হতে পারে। সে যতদূর জানে চরমপন্থীরা চাইনিজ অস্ত্র ব্যবহার করে। দলনেতার হাতের পিস্তলটা চাইনিজ বলেই মনে হচ্ছে। জেমস বন্ড সিরিজ পড়ার বয়সে রুদ্র ওয়ালথার পিপিকে’র ভক্ত হয়ে উঠেছিল, জার্মানীর সেই অস্ত্র নিশ্চয়ই এদের হাতে আসবে না। এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থাটা বেশ জোরদার, কেননা হঠাৎ রুদ্র’র মত একজন নবাগতকে বিশ্বাস করা চলে না। দলের অন্য সাত জন কমরেডের সাথে রুদ্রকে পরিচয় করিয়ে দেন দলনেতা।

ভ্যান রিক্সা পর্যন্ত ফিরে আসতে আসতে আবারো তিন দফা পাহারারত রাইফেলধারী যুবকের মুখোমুখি। অজন্তা এই পথের ক্লিয়ারেন্স তা বুঝতে অসুবিধা হলো না রুদ্র’র। প্রফেসরের বাংলো পর্যন্ত আসতে পথে একটি কথাও বলেনি অজন্তা, ইশারায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, আগে যা বলেছে তা যেন মনে থাকে। বাংলোয় ঢুকে প্রফেসরের মুখোমুখি, পরিচয় পর্ব কেমন হলো কমরেড? রুদ্র কৃত্রিম উচ্ছ্বাস দেখিয়ে বলে জ্বি ভাল। তাহলে শুরু করে দাও কাজ, অজন্তা ট্রেনিং এ নিয়ে যাবে। রুদ্র বুঝতে পারে এখানে সে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত, তাকে একাকী ছেড়ে দেয়া হবে না। প্রফেসরের বয়স আন্দাজ করা কঠিন হলেও ষাটের কাছাকাছি, তবে পঞ্চাশ বলে চালিয়ে দেয়া খুব সহজ। বাংলোটায় অনেক গুলো ঘর। প্রফেসরের জন্য বরাদ্দ শোবার ঘর, বসার ঘর ছাড়াও তিনি আরও দুটো ঘর ব্যবহার করেন। একটি লাইব্রেরী আর অন্যটি তার ল্যাব। এছাড়াও আরও চারটি ঘর, একটিতে তার স্ত্রী মাঝে মাঝে এসে থাকেন, অজন্তার জন্য একটি বরাদ্দ, রুদ্রকে দেয়া হয়েছে একটি আর অন্যটি খালি পড়ে আছে। গেটের কাছে একটা পৃথক ঘরে থাকে প্রহরী, সে দিনের বেলা পুরোটাই ঘুমিয়ে কাটায়। বাংলোর পেছনে কাঁঠাল বাগান আর বাঁশ ঝাড়, দিনের বেলাতেও আলোহীন হয়ে থাকে।

রাশভারি প্রকৃতির প্রফেসরের ব্যক্তিত্ব এতটাই প্রখর যে, প্রতিবাদ করে কথা বলা যে কারোর পক্ষে সম্ভব নয়, প্রথম দিনের আলোচনায় রুদ্র তা অনুধাবন করে ফেলেছে। রুদ্র’র ব্যাপারটা আলাদা, সে তো স্বেচ্ছায় কনভিন্সড হওয়ার অভিনয় করেই এসেছে। কিন্তু অজন্তা! সে এখানে কেন! যদি এই দলের লোক হয়ে থাকে তাহলে ওভাবে কথা বলবে কেন, রুদ্রকে সে কতটা চেনে! নাকি রুদ্র’র মোটিভ বোঝার চেষ্টা করছে- কতখানি বিশ্বস্ত সে! এসব দলে এমনটাই হবার কথা, বিশ্বস্ততা অর্জন করা বড় কঠিন। নানা মুখী পরীক্ষার মধ্যদিয়ে যেতে হয়, পদে পদে বিপদের সম্ভাবনা, মুহূর্তেই ভুল বোঝাবুঝি আর জীবনের ঝুঁকি। একুশ বছরের তরুন রুদ্র বিছানায় শুয়ে ভাবছে, সে ভয়ঙ্কর কোন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে না তো! এমনিতেই প্রচন্ড সাহসী রুদ্র। প্রগতিশীল বামপন্থার রাজনীতি তার পছন্দ। তার দক্ষ-সাহসী ভূমিকা দেখেই পিছে লেগেছিল আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি-প্রফেসরের দল। রুদ্রকে দলে টানতে চেষ্টা করে গেছে তিন বছর।

প্রফেসরের দলের সদস্য সৌরভকে  রুদ্র বার বার বুঝিয়ে দিয়েছে তাদের পথ ভুল, এভাবে শ্রেণী শত্রু আখ্যা দিয়ে মানুষ হত্যা করে, প্রকারান্তরে খুন এবং ডাকাতি করে বিপ্লব তো দূরের কথা, বরং সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্নতাই বাড়বে। মানুষের সহানুভূতি-সমর্থন যদি না থাকে তাহলে গুটি কয়েক রাইফেলধারী বিপ্লবীর পক্ষে দেশের ক্ষমতা নেয়া বা তা রক্ষা করা অসম্ভব। এক সময় ভারতবর্ষে নকশাল পন্থীরা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সৌরভ অর্থহীন কিছু পাল্টা যুক্তি হাজির করার চেষ্টা করেছে মাত্র। রুদ্র বুঝেছিল সৌরভের মত ছেলেদের বোঝানো যাবে না, ওদের ব্রেইন ওয়াশ হয়ে গেছে, হাতে আছে অস্ত্র, বয়সে তরুন, তাই এক ধরনের রোমান্টিসিজমে ভুগছে ওরা। এ নিয়ে রুদ্র আর বেশী আলোচনায় বসতে চায়নি। কিন্তু সৌরভ তার পিছে লেগেই থেকেছে, তাদের আস্তানায় গিয়ে ওদের আদর্শিক গুরু প্রফেসরের সাথে দেখা করতে অনুরোধ করেছে। রুদ্র জানতো একবার সেই অন্ধকার গুহায় প্রবেশ করা মানেই আর কখনো বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। তবুও রুদ্র’র মাথায় কি ভুত চেপেছিল সে নিজেই জানেনা। রাজপথের আন্দোলন তখন থিতিয়ে গেছে, মনের মধ্যে বিষণ্ণ ভাব তো ছিলই। লেখাপড়ায় মনোযোগি সে কখনোই ছিলনা, শুধু দেশোদ্ধারের ভাবনা মাথায়। একদিন মনে হলো সৌরভদের জগৎটা একবার দেখে এলে কেমন হয়।

প্রফেসর লাইব্রেরীতে আপনাকে ডাকছেন, অজন্তার কন্ঠস্বরে রুদ্র’র ভাবনায় ছেদ পড়ে, সে লোইব্রেরীতে অপেক্ষমান প্রফেসরের সামনে চলে যায়। আলমারীতে থরে থরে সাজানো কার্ল মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, মাও সেতুং আর চারু মজুমদারের বই। নকশাল বাড়ী আন্দোলনের উপর বেশ কিছু প্রবন্ধ সংকলন। প্রফেসর তাকে বিশাল বইয়ের ভান্ডার দেখিয়ে বলেন, এখান থেকে তোমার যেটি ইচ্ছে নিয়ে পড়তে পারো, অজন্তার কাছে চাবি আছে। আর আমাদের রাজনীতির লাইন নিয়ে তোমার যদি আরও আলোচনার কিছু থাকে বা কনফিউশন থাকে তাহলে গতকালের মত আমরা আলোচনায় বসতে পারি। রুদ্র এখানে আসার উদ্দেশ্যে সৌরভের কাছে যেমন যুক্তিতে হেরে যাওয়ার ভান করেছিল, প্রফেসরের সামনেও তাই করেছে। শুধু কৌশল হিসেবে কিছু প্রশ্ন সে তুলেছিল, উত্তর পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার অভিনয় করতে হয়েছে মাত্র। আজ আর নূতন করে কিছু জানার আগ্রহ দেখালো না সে। প্রফেসর জানান, তুমি ট্রেনিংটা শেষ করো, তার পর কাজ নিয়ে কথা হবে।

ওদের কথার মাঝেই ঘরে প্রবেশ করেন এক আকর্ষণীয়া ভদ্র মহিলা, বয়স আন্দাজ করা যায় বড় জোর পঁয়তাল্লিশ। প্রফেসর তার স্ত্রী বলে পরিচয় করিয়ে দেন, নাম সেঁজুতি, দূরে কোন এক স্কুলে পড়ান। মাঝে মাঝে এখানে এসে থাকেন। তিনি রুদ্রকে স্বাগত জানান, বলেন তোমাদের মত শিক্ষিত তরুনরা এগিয়ে এলে এদেশে হয়ত কিছু করা সম্ভব হবে। রুদ্র ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তার ঘরে চলে যায়। অজন্তা বিছানায় চিরকুট রেখে গেছে, আজ রাতে কথা বলা সহজ হবে, দরজা খোলা রাখবেন। সৌরভ ভাবতে থাকে নিতান্তই কৌতুহলী হয়ে এতদূর আসাটা কি তার ঠিক হলো! রুদ্র সম্মতি জানানোর পর সৌরভরা তাকে এখানে এনেছে বেশ গোপনীয়তা বজায় রেখে, তাকে পথঘাট চেনানো হয়নি। কিছু দূর এসে তাকে চায়ের সাথে কিছু একটা মিশিয়ে খাইয়েছে, সে তখন তন্দ্রালু, অনেকটা স্বপ্নাবিষ্ট, যা বলেছে তাই করেছে। শুধু মনে পড়ে সৌরভের বাইকের পেছনে বসে আছে সে আর অন্য একজন তাকে পিছন থেকে ধরে রেখেছে। কিছু দূর এসে কালো কাপড়ে তার চোখ বেঁধে দেয়া হয়েছিল, তার পর এই বাংলোয়।

রুদ্র বিছানায় বসে একটা প্রবন্ধ পড়ছিল, কিন্তু তার মনযোগ নেই। ভিতরে এক ধরণের চাঞ্চল্য কাজ করছে। প্রথমত, প্রফেসরের এই দলের কর্মকান্ড, যা সে সঠিক বলে মনে করে না, সেখান থেকে বের হবে কি করে! ঝোঁকের মাথায় কেন যে সে চলে এলো, কেন ভাল করে ভাবল না। দ্বিতীয়ত, অজন্তা কিসের যেন একটা ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই দলের ভিতরে কি তবে ভিন্ন একটা গ্রুপ সক্রিয়! এসব ভাবতে ভাবতে রাত গভীর হয়ে গেছে। দরজায় মৃদু আওয়াজ করে অজন্তা প্রবেশ করলো। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে আলোটা নিভিয়ে দেয় সে, রুদ্রকে বিছানা থেকে টেনে নিয়ে ঘরের এক প্রান্তে গিয়ে বলে, এখানে চুপি চুপি কথা বলা যেতে পরে, পাশের ঘরটা খালি। রুদ্র জানতে চায়, সবাই কি ঘুমিয়েছে, এ ভাবে কথা বলা ঠিক হবে! অজন্তা জানিয়ে দেয়, প্রফেসর আর সেজুঁতি এক বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েছে। রুদ্র ভাবে সেটাই তো স্বাভাবিক, অজন্তা বুঝতে পারে রুদ্র ‍কি ভাবছে। তাই ফিসফিসিয়ে বলতে থাকে- রসায়নের এই অধ্যাপক আসলে একটা জ্ঞান পাপী, সে স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে এই চরমপন্থী দলের গোপন নেতা হয়েছে। তার নির্দেশেই চলে সব কিছু। সেজুঁতি তার স্ত্রী নয়, দলের একজন সহযোগী। জেসুঁতির দায়িত্ব হচ্ছে ছলনা করে বিত্তবানদের নাড়ীর খবর বের করে আনা, কখনো কখনো সে অপারেশনেও যোগ দেয়, তবে যোদ্ধা হিসেবে নয়, কৌশলে শিকারীকে ঘায়েল করা বা অজ্ঞান করে ফেলার জন্য।

রুদ্র বিস্মিত, অজন্তা বলতে থাকে – এছাড়া সেজুঁতির আর একটা কাজ হলো প্রফেসরকে বিছানায় সঙ্গ দেয়া। আজ ওরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকবে। দেখে এলাম নৈশ প্রহরী বেটা গাঁজা খাচ্ছে, ও এখন আর আসন ছেড়ে আসবে না। রুদ্র জানতে চায়, আপনি আমার সাথে কি বিষয়ে আলোচনা করতে চান, আর তা এত গোপনে কেন, অপনি কি ভিন্ন কোনো গ্রুপের হয়ে কাজ করছেন? রুদ্রর প্রায় সম বয়সী কিংবা কিছুটা বড় অজন্তা বলে যায়, উলফা’র সাথে সে কাজ করতো, বাড়ি আসামে। বাংলাদেশ হয়ে একটা অস্ত্রের চালান উলফার কাছে পৌঁছানোর অপারেশনের সময় সে ওদেরই এক নেতার সাথে এসেছিল, তার সাথে খুব ভাল সখ্য ছিল প্রফেসরের। এ বাংলোতেই উঠেছিল সেই নেতা, একদিন শহরে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়লে তাকে ভারতীয় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। উলফা’র অন্য কেউ এসে অজন্তার খোঁজ করেনি, সেও কঠোর পরিস্থিতিতে একা বর্ডার পাড়ি দেয়ার সাহস করেনি। দিনে দিনে সে প্রফেসরের বিশ্বস্ত সহচরে পরিনত হয়েছে। কিন্তু প্রফেসরের দলের কর্মকান্ড তার ভাল লাগেনি, একটা মহৎ আদর্শের নাম ভাঙ্গিয়ে স্রেফ ডাকাতি। উলফার অন্তত একটা লক্ষ্য রয়েছে, যা অজন্তাকে আকৃষ্ট করেছিল। কেউ কেউ বিচ্ছিন্নতাবাদী বলতে পারে কিন্তু অজন্তা স্বাধীনতার জন্যই লড়ে যচ্ছিলো। এখান থেকে ওকে উদ্ধার করার কেউ নেই, তাই বাধ্য হয়ে এদের কাজ করে যাচ্ছে। সে প্রফেসরের বিশ্বস্ত লোক হওয়ায় গোপন ক্যাম্পে তার অবাধ যাতায়াত। সেজুঁতি যখন থাকে না তখন প্রফেসরের ইচ্ছে হলে অজন্তাকে তার সাথে শুতে হয়। আলোহীন ঘরেও রুদ্র দেখে অজন্তার চোখে প্রফেসরের প্রতি তীব্র ঘৃণা আর ক্রোধের আগুন জ্বলছে।

রুদ্র জানতে চায়, আপনি আমাকে বিশ্বাস করে এত সব কথা বলছেন কেন, যদি আমি প্রকাশ করে দিই যে আপনি ওদের প্রতি বিশ্বস্ত নন! অজন্তা রুদ্র’র হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলে, আমি দীর্ঘ সাত বছর আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির সাথে যুক্ত, এ লাইনে অনেক মানুষ দেখেছি। আপনাকে দেখেই বুঝেছি যে আপনি এখনো ওদের অসৎ আদর্শের সাথে মিশে যাননি। কিন্তু আপনি যে ফাঁদে পা দিয়েছেন সেখান থেকে বের হতে পারবেন না। জীবনের ঝুঁকি আছে। কথার অবাধ্য হয়েছেন কিংবা পালানোর চেষ্টা করছেন তো পুলিশে ধরিয়ে দেবে, পুলিশ আপনাকে পালাতে বলে পিছন থেকে গুলি করে চরমপন্থী মেরেছে বলে সরকারের কাছে বাহবা নেবে। রুদ্র বিস্মিত হয়ে যায়, তার মানে বলছেন পুলিশের সাথে এদের আঁতাত! অজন্তা বলে, লোকাল থানাকে ওরা মাসিক চাঁদা দেয়, এখানে পোস্টিং নেয়ার জন্য ওসিরা উন্মুখ হয়ে থাকে। প্রতি মাসে দলের ইনকাম তো কম নয়, ব্যবসায়ীরা মোটা দাগের চাঁদা দেয়, নইলে বিপদ। আশে পাশের সব জেলায়ে এদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। রুদ্র’র শরীর ঘেমে যায়, তার সহকর্মীদের কথা মনে পড়ে, বাড়ীর কথা মনে পড়ে, ভেসে ওঠে ঈষিকা’র মুখ, যাকে সে একান্ত আপন বলে জানে। অজন্তাকে কেন যেন মনে হলো  ঈষিকা, রুদ্র’র হাতে হাত রেখে সে এই অন্ধকার জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে, নূতন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে। অজন্তার কন্ঠস্বরে রুদ্র অন্যমনস্কতা থেকে বেরিয়ে আসে, আমরা কি বন্ধু হতে পারি? অজন্তার হাত দুটো আরো দৃঢ়তায় আঁকড়ে ধরে রুদ্র বলে, নিশ্চয়ই কমরেড! ওরা পরস্পর বন্ধুত্বের অঙ্গীকারে আবদ্ধ হলো।

বারান্দায় বসে রুদ্র ভাবছে অজন্তা তার দায়িত্বটা অনেক বাড়িয়ে দিল। যে ভাবেই হোক এখান থেকে তাকে যেমন বেরুতে হবে, তেমনি অজন্তাকেও উদ্ধার করতে হবে। কিছুতেই সে অজন্তাকে উপেক্ষা করে একা পালাবার কথা ভাবতে পাচ্ছে না। অজন্তার জায়গায় ঈষিকা’র কথা ভাবতেই তার সংকল্প আরো দৃঢ় হয়,  কি করে উদ্ধার পাওয়া যেতে পারে তা নিয়েই ভাবতে থাকে। দিনের বেলা বের হওয়ার কোন সুযোগ নেই, প্রফেসরের বাড়ির চার দিকে ঘাপটি মেরে ওদের চর থাকে আর রাতে থাকে কড়া পাহাড়া। তবুও যা কিছু করার রাতের অন্ধকারেই করতে হবে। অজন্তা জানে রাতে কোন কোন পয়েন্টে যুবকেরা পাহাড়ায় থাকে, ওর সাথে পরামর্শ করে রুদ্র একটা একশন প্ল্যান দাঁড় করিয়েছে। অন্ধকার রাত হতে হবে, সেজুঁতি যে রাতে থাকবে না এবং প্রফেসরের বিছানায় অজন্তার ডাক পড়বে যে রাতে সে রাতেটাই হবে ওদের পালানোর জন্য সঠিক সময়। অজন্তা প্রফেসরের পিস্তলের অবস্থানটা জানে এবং ল্যাবের কোন আলমারিতে ক্লোরোফর্ম মজুদ আছে তাও জানে। অজন্তা পিস্তল এবং রাইফেল চালাতে সিদ্ধহস্ত। অপেক্ষা করতে হবে রুদ্র কবে নাগাদ পিস্তল চালনায় দক্ষ হয়ে ওঠে।

কাক ডাকা ভোরে গোপন ট্রেনিং ক্যাম্পে চলে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ। জঙ্গলের মাঝে টিলা, তার পর বির্স্তীর্ণ মাঠ, তাই বুঝি ওরা এমন জায়গাকেই বেছে নিয়েছে। রুদ্র’র হাতের ক্ষমতা দেখে অবাক দলনেতা, তার পিঠ চাপড়ে বলে, সাবাশ কমরেড। অজন্তা রুদ্র’র কাছে এমনটাই আশা করেছিল, যেন তার হাতের নিশনা খুব ভাল হয়। দু সপ্তাহ যেতেই রুদ্র পিস্তল চালনায় নিজের উপর আস্থাশীল হয়ে ওঠে। রাইফেল ট্রেনিং পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা দেখে না সে। এখন শুধু অপেক্ষার পালা, অন্ধকার রাত আর প্রফেসরের বিছানায় অজন্তার ডাক পড়া। অজন্তার সাথে একশন প্ল্যানটা নিয়ে বার কয়েক আলোচনায় বসেছে রুদ্র। ওরা বেশ প্রত্যয়ী, যে কোন মূল্যে অভিযান সফল করতেই হবে। বেশী দিন অতিবাহিত হলে রুদ্রকে ওরা দলের সাথে সম্পৃক্ত করে দেবে, তখন আর বেরুনো সম্ভব হবে না।

অজন্তা জানিয়ে গেছে প্রফেসরের ঘরে রাতে তার ডাক পড়েছে। রুদ্র’র শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেছে, রাত গভীর হচ্ছে, সে প্রস্তুত। প্রহরীর কুটির রেকি করে দেখে এসেছে সে গাঁজায় দম দিচ্ছে। প্রফেসরের রুমে মৃদু গোঙ্গানীর আওয়াজ হলো, তারপর নিস্তব্ধতা। রুদ্র নিশ্চিত প্রহরীর কানে এ আওয়াজ যাবে না। অজন্তা ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে, ওরা গেটের দিকে এগিয়ে যায় সন্তস্পর্ণে, দুজনেরই সজাগ দৃষ্টি, কালো মুখোশে ঢেকে রেখেছে নিজেদের। নেশাগ্রস্ত প্রহরীর কপালে অজন্তার দেয়া পিস্তল ঠেকিয়ে রুদ্র বলে, একদম চুপ, মাথার উপর হাত তোলো। প্রহরী হতভম্ভ হয়ে হাত উচু করে দাঁড়ায়। অজন্তা প্রহরীর কোমরের পিস্তলটা বের করে নিজের কাছে নিয়ে মুখে চেপে ধরে ক্লোরোফর্ম মাখানো রুমাল। নেশাগ্রস্ত শরীর ধীরে ধীরে এলিয়ে পড়ে। ভিন্ন একটা রুমাল মুখে গুঁজে দিয়ে প্রহরীর হাত-পা বেঁধে ফেলে ওরা। বাকী কাজটা সেরে আসি, বলে অজন্তা প্রফেসরের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়, রুদ্র তার পিছু নেয়। ক্লোরোফর্মের কল্যাণে প্রফেসর নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে বিছানায়। অজন্তা প্রফেসরের শরীরের উপর চেপে বসে বুক বরাবর পিস্তল ঠেকায়। রুদ্র অজন্তাকে বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করে বলে, মেরো না, ওকে বেঁধে রেখেও তো আমরা সরে যেতে পারি। অজন্তার চোখে প্রতিশোধের আগুন লকলক করছে, বলে, আজ আমায় বাঁধা দিও না কমরেড, দিনের পর দিন এই কুকুরটার কামড় খেয়েছি আমি। বুকের সাথে পিস্তলের আগা চেপে রাখায় ট্রিগার টিপলেও তেমন শব্দ হলো না, শুধু প্রফেসরের দেহটা নড়ে উঠল একবার।

দুজনার হাতে দু’টো পিস্তল এসে গেছে। বাংলোর বাঁধা অতিক্রম করা গেছে, এবার পথে নামার পালা। বাংলো থেকে বা দিকে আস্তানায় যাওয়ার যে পথ সেটি কিছুদূর গিয়ে দু’ভাগ হয়ে গেছে। আর ডান দিকের পথটা গেছে শহরের দিকে। কিন্তু সে পথে যেতে গেলেই পাহারারত যুবকেরা পথ রোধ করে দাঁড়াবে, কেননা সে পথে যাবার অনুমতি নেই অজন্তার, সাথে আবার রুদ্র রয়েছে। তাই বা দিকের পথে গিয়ে আস্তানায় যাওয়ার পথের ঠিক উল্টো পাশের পথে উঠতে হবে ওদের। সেই তিন মাথার কাছে একজন যুবক পাহাড়ায় থাকবে। যদি ওরা আস্তানায় যায় তবে সমস্যা নেই, সে বাঁধা দেবে না, কিন্তু উল্টোপথ ধরতে গেলেই সন্দেহ করে রাইফেলের গুলি চালিয়ে দিতে বিন্দু মাত্র দ্বিধা করবে না যুবক। অথচ ওটাই পালাবার একমাত্র পথ। গাঢ় অন্ধকার ভেদ করে ওরা এগিয়ে যায় আর থেমে থেমে দেখে নেয় কেউ ফলো করছে কি না। তিন মাথায় পৌঁছার ঠিক আগে অজন্তা রুদ্রকে রাস্তার পাশে একটা ঝোপের আড়ালে রেখে দৌড়ে চলে যায় পাহারায় থাকা যুবকের কাছে, যুবক তাকে থামিয়ে দেয়। অজন্তা হাঁপিয়ে পড়ার ভঙ্গিতে জানতে চায়, নূতন ছেলেটাকে দেখেছে কিনা, সে প্রফেসরকে হত্যা করে পালিয়েছে। যুবক স্তম্ভিত। অজন্তা তাকে প্রফেসরের বাড়ীর দিকে যেতে অনুরোধ করে এবং বলে সে আস্তানায় যাচ্ছে খবর দিতে। যুবক তার কথায় বিশ্বাস করে দৌড়াতে থাকে, ওদের পালাবার পথ পরিস্কার হয়ে যায়। অজন্তা রুদ্রকে আড়াল থেকে বের করে এনে আস্তানার উল্টোদিকের পথে উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে থাকে।

বেশ কিছুটা পথ যাওয়ার পর ওরা মোটর বাইকের আওয়াজ পায়, থেমে গিয়ে শব্দের উৎস কোথায় বুঝতে চেষ্টা করে। অজন্তা বলে, মনে হয় এদিকেই আসছে ওরা, আমাদের লুকিয়ে পড়তে হবে। রাস্তা থেকে জমিতে নেমে পাট খেতের মাঝের আইল দিয়ে অনেক ভিতরে চলে যায়, কিছু পাট গাছ ভেঙ্গে শুয়ে পড়ে দুজনে। অজন্তা বলে, খুব সাবধান একদম নড়াচড়া করবে না, পাট গাছের আগা নড়ে উঠলে ওদের টর্চের আলোয় তা ধরা পড়ে যেতে পারে। ওরা যে পথে এগুচ্ছিল সে পথেই বাইকটা চলে গেলে অজন্তা বলে, আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে, যদি বাইকটা ওদের হয় তাহলে আবার ফিরে আসবে। রুদ্র অজন্তার বিচক্ষণতায় মুগ্ধ হয়, বুঝতে পারে অভিজ্ঞতার মূল্য অনেক। প্রায় আধাঘন্টা পর বাইকটা আবার ফিরে আসে এবং যে পথে এসেছিল সে পথেই ফিরে যায়। ওরাও ক্লান্ত থাকায় বিশ্রাম পেয়ে পুনরায় এগিয়ে যাওয়ার শক্তি সঞ্চয় করে। স্বল্প প্রশস্ত রাস্তার দুই পাশ ঘেঁষে ওরা দৌড়াতে থাকে। হঠাৎ অজন্তা থেমে গিয়ে বলে এভাবে দৌড়ানো ঠিক হচ্ছে না, এমন হতে পারে ওরা পথে পথে ওদের লোক নামিয়ে রেখে গেছে, তারা ঘাপটি মেরে থাকবে এবং হাতে রাইফেল থাকবে নিশ্চিত ভাবেই। রুদ্র অজন্তার দূরদর্শী ভাবনায় আবারো মুগ্ধ হয়।

ওরা এবার ধীরে ধীরে সাবধানে এগুতে থাকে। অন্ধকারে চোখ সয়ে গেলে বেশ খানিকটা দূরের বস্তুও দেখা যায়। ভোর হতে খুব বেশী দেরি নেই, দূরে একটা গ্রামের ছায়া দেখতে পায় ওরা, গাছ পালা বেষ্টিত উঁচু টিলাও চোখে পড়ে। টিলার রাস্তাটা গ্রামের পথে ডানদিকে নেমে গেছে। অজন্তা বলে, ভোর হবার আগেই আমাদের একটা শেল্টার দরকার, ওই টিলাটাকেই বেছে নিতে হবে। কথাটা শেষ না করেই সে একলাফে রুদ্রকে ধাক্কা দিয়ে নীচের জমিতে ফেলে দেয়, রুদ্র নিজেকে সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে যায়, অজন্তাও তার শরীরের উপর আছড়ে পড়ে। জানতে চাওয়ার আগেই রুদ্র বুঝে যায় বিষয়টা কি- কিছু দূর সামনে থেকে ওদের দিকে একটা টর্চের আলো জ্বলে উঠে আবার নিভে গেল। অজন্তা ফিসফিসিয়ে বলে, সামনে ওদের লোক আছে, সন্দেহ হলেই আলো জ্বেলে দেখে নিচ্ছে, গ্রামের লোক নিশ্চয়ই এত রাতে বের হবে না। আলোর উৎস ঠিক তিন মাথাটায় যেখান থেকে টিলার রাস্তাটা নেমে গেছে। বড় বড় কয়েকটা গাছও দেখা যায় সেখানে। ওরা সিদ্ধান্ত নেয় গেরিলা কায়দায় ওকে পরাস্ত করতে হবে, পিস্তলের গুলি ব্যবহার করা যাবে না, তাতে দুরে আরও কেউ থেকে থাকলে তারা জেনে যাবে। রাস্তা ছেড়ে জমির আইল বেয়ে ঘুর পথে ওরা সেই গাছ গুলোর কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

একটা খোলা মাঠে গোটা বিশেক প্রাচীন আমগাছ দাঁড়িয়ে আছে। ওরা একদম পিছন থেকে সাবধানে লক্ষ্য রেখে একটার পর একটা গাছ টপকে রাস্তার কাছাকাছি এগুতে থাকে, দুজনার হাতে লোডেড পিস্তল, মাত্র একটা গুলি ব্যবহার করা হয়েছে। রাইফেল ধারী একটা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে টর্চের আলো ফেলছে কখনো ডানে কখনো বামে, রাইফেলটা কাঁধে ঝোলানো। অজন্তা ক্ষিপ্রতার সাথে বেরিয়ে পিছন থেকে রাইফেলধারীর কোমরে জোড়া পায়ের লাথি ঝাড়ে। যুবক ছিটকে দূরে পড়ে যায়, রাইফেল আর টর্চ তার হাত থেকে পড়ে যায়। যুবক ওঠার আগেই ওরা দুজনে দু’দিক থেকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বলে, একদম নড়াচড়া করবে না। অজন্তা কোমর থেকে নাইলনের দড়ি বের করে পিছমোড়া করে যুবকের হাত-পা বেঁধে ফেলে, তার পর চিৎ করে যুবকের শার্ট ছিড়ে তার মুখে পুড়ে দিয়ে দুজনে দেহটাকে টেনে আম বাগান পেরিয়ে দূরে জমিতে রেখে আসে। অজন্তা যুবকের রাইফেল থেকে ম্যাগজিন বের করে রাইফেল একদিকে আর ম্যাগজিন অন্য দিকে ফেলে দেয়। এত সহজে ওরা কাজটা করতে পেরে দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে তার পর টিলার পথে এগিয়ে যায়।

রাস্তা থেকে টিলাটা কাছে মনে হলেও আসলে বেশ দূরে, গ্রামের পথ এমনটাই হয়ে থাকে। টিলার কাছাকাছি অনেক ঝোপ ঝাড় এবং বড় বড় গাছ গাছালী। পাহাড়ের মতো আঁকা বাঁকা পথ বেয়ে ওরা টিলার উপর উঠতে থাকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। দূর থেকে একাধিক বাইকের শব্দ ভেসে আসে। দু’জনেরই কান খাড়া হয়- হ্যা, নির্ভূল বাইকের শব্দ এগিয়ে আসছে। ওরা দ্রূত উপরে উঠতে থাকে, অজন্তা শঙ্কিত হয়ে বলে, এই পথে এলে ওরা টিলাতে খুঁজতে আসবেই। রুদ্র বুঝতে পারে অজন্তা বেশ ঘাবড়ে গেছে, সে সাহস জোগাতে হাতে হাত মিলিয়ে বলে, দেখো আমরা জিতে যাবো। টিলার মাথা একে বারে পাহাড়ের মত নয়, খানিকটা সমতল এবং অনেক গাছ সেখানে। ওরা উপরে উঠে শুয়ে পড়ে,  ক্লান্তি আর শঙ্কায় অবসন্ন। বাইকের শব্দ বেশ কাছাকাছি চলে আসে, অনুমান করতে হচ্ছে ওরা টিলায় আসছে কিনা। শব্দ গুলো মিলিয়ে গেল, তবে দূরে চলে গেল বলে মনে হচ্ছে না। অর্থাৎ বাইকের স্টার্ট বন্ধ হলো, এই এলাকাটা তন্ন তন্ন করে খুঁজবে ওরা, যেহেতু তিন মাথায় ওদের লোককে দেখতে পায়নি। অজন্তা আর রুদ্র অনেকটা শ্বাস বন্ধ করে শুয়ে থাকে। হঠাৎ হ্যান্ড মাইকের আওয়াজ,“ অজন্তা এবং রুদ্র, তোমরা এখানে থেকে থাকলে বেরিয়ে এসো, আমরা চারিদিক থেকে এলাকাটা ঘিরে ফেলেছি, তোমরা পালাতে পারবে না।” অজন্তা এবং রুদ্র দুজনে দুজনের হাত চেপে ধরেছে, ওরা ঘামছে দর দর করে। অজন্তা ধীরে ধীরে মাথা তুলে চারিদিক দেখার চেষ্টা করে, ভোরের আলো ফুটে উঠেছে তখন। আবারো হ্যান্ড মাইকের আওয়াজ,“আমরা তোমাদের ঘিরে ফেলেছি, সারেন্ডার করো, পালাতে পারবে না।”

অজন্তার বুঝতে বাকী রইল না ওরা টিলার চারদিক এমনকি পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেছে, এখান থেকে পালানোর চেষ্টা করা মানে কুকুরের মতো গুলি খেয়ে মারা যাওয়া। সারেন্ডার করলেও ওরা গুলিতে গুলিতে ঝাঝরা করে ফেলবে শুধু তাই না মারার আগে প্রফেসরের চাইতে আরো খারাপ ভাবে তাকে ব্যবহার করবে। রুদ্রকেও ওরা ছাড়বে না। সে ত্বড়িৎ একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, রুদ্র কে শোয়া অবস্থা থেকে তুলে দুজনে হাঁটু গেড়ে বসে। রুদ্র কি যেন ভাবছে। অজন্তা বলে, মাত্র এগারটা গুলি সম্বল করে আমরা এত গুলো রাইফেলের সামনে দাঁড়াতে পারব না, দেখলাম চারিদিকে অন্তত বিশ জন রাইফেল হাতে ঘিরে আছে, ধীরে ধীরে ওরা উপরে আসবে। রুদ্র বুঝে গেছে বিষয়টা, এখান থেকে আর পালাবার পথ নেই, ওদের তাত্ত্বিক গুরু কাম দলনেতা খুন হয়েছে, পাগলা কুকুরের মেজাজে আছে ওরা, সে অজন্তার কাছে জানতে চায় কি করবে এখন? অজন্তা বলে, মরতে যেহেতু হবেই তাহলে কুকুরের মত নয়, সারেন্ডার না করে বীরের মতো নিজেরা নিজেদের হাতে জীবন নিলে কেমন হয়! রুদ্র অজন্তার ইঙ্গিত বুঝতে পারে।

দু’জনেই হাঁটু গেড়ে দুজনার দিকে পিস্তল তাক করে আছে, ট্রিগারে হাত। অজন্তা গুনছে, এক-দুই-তিন, একই সাথে দুটো গুলির আওয়াজ হলো। ভোরের আকাশ তখন ফর্সা হয়ে যাচ্ছে, ডানা ঝাপটে আতঙ্কে উড়ে গেল এক ঝাঁক পাখি। অজন্তা এবং রুদ্র-দুজনার বুকের বা পাশে লেগেছে গুলি। ওরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে, হাতে পিস্তল। নীচ থেকে হ্যান্ড মাইকের আওয়াজ ভেসে আসে, তোমাদের অবস্থান জানান দেয়ার জন্য ধন্যবাদ, আমাদের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই, আমরা তোমাদের ঘিরে ফেলেছি, পিস্তল ফেলে সারেন্ডার করো।” রুদ্র দেখে অজন্তার চোখে দু’ফোঁটা অশ্রু টলমল করছে, ভিনদেশী এই তরুনীকে বাঁচাতে চেয়েছিল সে, ভেবেছিল তার নিজের শহরে গিয়ে অজন্তাকে আপাতত ঈষিকার কাছে রেখে ওর বাবা মায়ের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে। কত গুলো সমাজ বিরোধীর কাছে ওদের এই পরাজয় মৃত্যু পথযাত্রী রুদ্রকে আপ্লুত করে। তার চোখের সামনে একে একে ভেসে ওঠে রাজপথের সহযোদ্ধাদের মুখ, ঈষিকার মুখটা ধীরে ধীরে ভেসে এসে অজন্তার মুখে প্রতিস্থাপিত হয়ে গেল, যার গন্ড বেয়ে নেমে যাচ্ছে তপ্ত জলের ধারা, চোখ দুটো ভীষণ মায়াবী। ঈষিকা হাত বাড়িয়ে দিয়েছে অথচ রুদ্র’র এগিয়ে যাওয়ার শক্তি নেই, তবুও যে কথাটি এতদিন বলা হয়ে উঠেনি তা সে বলতে চেষ্টা করে। তার আগেই রুদ্র দেখে ঈষিকার দেহটা মাটিতে লুটিয়ে পড়লো আর কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে সে নিজের শরীরটা মাটিতে এলিয়ে দিয়ে ভোরের আকাশের পানে তাকিয়ে না বলা কথাটা বলার শেষ চেষ্টা করলো। সদ্য জেগে ওঠা সূর্যের কিরণে রুদ্র’র মুখ তখন স্বর্গীয় দীপ্তিতে ক্রমশঃ উজ্জ্বল হয়ে  উঠছে।

সৈয়দ মাহমুদ। কবি ও গল্পকার। উত্তর জনপদের এক ছোট শহর গাইবান্ধায় জন্ম মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে। ছোট বেলা থেকেই কিছুটা বোহেমিয়ান সৈয়দ মাহমুদ বেড়ে ওঠেন অনেকটা রক্ষণশীল পরিবারে। শৈশব থেকেই প্রকৃতি তাকে টানতো। বিরাণ প্রান্তরে, সারি সারি বৃক্ষের ছায়ায় হাঁটতে কিংবা...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..