ধর্মের বিবর্তন ও সাংঘর্ষিক বিজ্ঞান 

মেহেরুন্নেছা
প্রবন্ধ
Bengali
ধর্মের বিবর্তন ও সাংঘর্ষিক বিজ্ঞান 

বিজ্ঞান একদিকে পৃথিবীতে নিত্য নতুন আবিষ্কার ও উদ্ভাবন করে চলেছে আর অন্যদিকে মানুষের মাঝে আছে গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস। ধর্ম এবং বিজ্ঞান নিয়ে বর্তমান পৃথিবীর এটাই হলো প্রকৃত চিত্র।

প্রথমেই দেখা যাক,পৃথিবীতে ধর্মের আবির্ভাব এবং ধর্মের বিবর্তনীয় মনস্তত্ত্বটা কি। মানুষের প্রাচীনতম পূর্বপুরুষেরা ( প্রাইমেট) ধর্মানুসারী ছিলোনা বটে তবে তারা এমন কিছু বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে যা ধর্মীয় বিবর্তনের নিয়ামক হিসেবে গণ্য করা যায়। এসব  বৈশিষ্ট্যের অনুকূলে যেসব প্রমাণ তা একদমই অপর্যাপ্ত। তাদের মাঝে সামাজিক নিয়মকে মেনে চলার এক অলিখিত চেতনা কাজ করতো। তারা যেসকল সাঙ্কেতিক যোগাযোগ ব্যবহার করতো সেগুলো ছিলো উচ্চমাত্রায় বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। হোমো নিয়ানডারথাল যারা তারা তাদের মৃত দেহকে কবর দিতো। নিঃসন্দেহে কবর দেয়ার প্রথা ধর্মীয় ক্রিয়ার উদাহরণের অকাট্য প্রমাণ। তারা গুহাচিত্র তৈরি করতো। তার মানে  তারা তাদের ভাবনাকে সঙ্কেতের মাধ্যমে প্রকাশ করতে সক্ষম ছিলো। এসবই তাদের ধর্ম ধারণের নিকটবর্তী ধারণা বৈ কিছু নয়।

অবশ্য মানুষের ব্যবহারে যতদিন না আধুনিকতা এসেছে তার পূর্ব পর্যন্ত মানুষের ইতিহাসে ধর্মের অস্তিত্বের সুস্পষ্ট কোনো উদাহরণ নেই।

স্টিফেন জে গুল্ড এর মতে, উৎপত্তি ও অভিব্যক্তির ক্রমধারায় যখন হোমিনিড সদস্যরা অনুধাবনে সক্ষম হয় যে,  মৃত্যুতে সবকিছুর সমাপ্তি তখনি তারা একতাবদ্ধ থাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এরই ধারাবাহিকতায় পৃথিবীতে ধর্মের উদ্ভব ঘটে।

মানুষ ছাড়া অন্য প্রজাতির মাঝেও ধর্মীয় মননের  প্রাথমিক রুপ পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণ হিসেবে মৃতদেহের চারপাশে হাতি যেসব  প্রথা প্রদর্শন  করে তা উল্লেখ করা যায়। তারা মৃতদেহের চারপাশে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে। এমন শব্দ করে যা আর্তনাদের মতো শোনায়। মৃতদেহের কাছে বারবার ফিরে এসে তাকে আদর করতে থাকে।  আবার অনেক প্রজাতি তাদের সদস্যদের মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান হয়।  উচ্চ শব্দে ক্রন্দন করে।

আসলে বিজ্ঞান  মতে ধর্মীয় মনন গঠনের সম্ভাবনা মস্তিষ্কের ওপর নির্ভর করে। যেমন – মানুষের  মস্তিষ্ক ধর্মীয় এবং দার্শনিক ধারণাকে ধারণ করার জন্য যথেষ্ট বড়। মানুষের বিবর্তনে হোমিনিড মস্তিষ্ক ৫ লক্ষ বছর আগে  ৩ গুণ হয়ে গিয়েছিলো। মস্তিষ্ক সম্প্রসারণের এই পর্যায়ে মানব মস্তিষ্ক উপলব্ধি,  মনোযোগ, স্বেচ্ছায় চলন, ভাষা, ভাবনা, প্রাসঙ্গিক স্মৃতি ধারণের মত ব্যপারগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। সামাজিক জটিল  আচরণ বুঝতে পারে, সামাজিক শ্রেণিবিভাগ বুঝতে পারে, তাদের দল কত বড় হবে এবং যৌন আচরণ কিরুপ হবে তাও বুঝতে পারে। ধীরে ধীরে মানুষের মাঝে ধর্মীয় বোধ পরিণত হয়।

এভাবে ধর্ম তার আদি হতে উন্নত – এই ক্রমধায় আজকের পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে।

এবারে মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে ধর্মীয় বোধের ভূমিকা বিশ্লেষণের পূর্বে ধর্ম মানব সম্প্রদায়ের জন্য কতটা প্রয়োজন সেটা বলে নেই।

মানুষ স্বভাবগতভাবেই প্রথমে সামাজিক ছিলো তারপরে ধার্মিক। সমাজও ধর্ম বিচ্যুত মানুষ সমাজের চোখে স্বাভাবিক নয়। দুঃখ কষ্টে জর্জরিত মানব বরাবর  অদৃশ্য শক্তির কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করে। অবচেতনে সে ধর্মের কোলে আশ্রয় নেয়। নৃবিজ্ঞান আমাদের বলে যে, প্রত্যেকটি আদিম  সভ্যতা বা সংস্কৃতিতে ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল। অতীত এবং বর্তমান, সর্বকালের মানুষ  নিজের চেয়ে অনেক বড় কোন সত্ত্বার প্রতি বিশ্বাস রাখলে সাহস পেতো। ফলে ধর্ম হয়ে গেলো মানুষের বিশ্বাসের প্রতিফলন। ধার্মিক মনোভাবসম্পন্ন  ব্যক্তির পাশাপাশি ধর্মবিরোধী সম্প্রদায়ও তাদের  অস্তিত্বের জানান দেয়।

নৃবিজ্ঞান (Anthropology)  এই ধর্মবিরুদ্ধতারও ব্যাখ্যা দেয়। ধর্মবিরোধীরা সবসময় ধর্মকে জনগণের আফিম বলে আসছে। তারা মনে করে ধর্ম মানুষের জ্ঞান ভিত্তিক স্বাধীনতাকে হরণ করে। সর্বোপরি জীবনাচারে ধর্মকে পুরোপুরি বাঁধা নিষেধের  প্রতীক হিসেবে  গণ্য করে।

ধর্ম সম্পর্কে ভলতেয়ারের বিখ্যাত উক্তি “প্রথম দুষ্কৃতিকারী যখন প্রথম বোকাকে ঠকিয়েছিল তখন থেকেই ধর্মের সূচনা”। আর ধর্ম সম্পর্কে  মার্ক্সবাদ যা বলে তা বর্তমান পৃথিবীতে বহুল প্রচলিত। মার্ক্সের মতে, পুঁজিবাদের হাতিয়ার হল ধর্ম যা শোষণ  প্রক্রিয়া চালু রাখে।

সুতরাং এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে ধর্ম যতটা ভিত্তিহীন হয়ে ওঠেছিলো, সর্বসাধারণ্যে ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পৃথিবীর বিভিন্ন বিপর্যয়, যেমন-যুদ্ধ, মহামারীকালীন এই মানুষগুলোর মাঝে ধর্মের শক্তি প্রচন্ড মাত্রায় পুঞ্জীভূত হতে থাকে। এরা যত অসহায় হয় ততই ধর্মের মাঝে মুক্তি খুঁজে নেয়। ধর্মের নিরাপত্তার ছায়ায় নিজেদের সমর্পণ করে।

প্রতিপত্তির বলয়ে থাকা একজন বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ যেভাবে ধর্মকে অবজ্ঞা করে, একজন হতদরিদ্র স্বল্প জ্ঞানের মানুষ কখনো তা সাহস করবেনা ; বরং তারা এ মনোভাবকে পাপ মনে করে।  অদৃশ্য মহাশক্তির বন্দনাই হয় এদের ব্রত। পাপ-পূণ্যের চক্রবাকে পাক খায় জগতের এই অসহায়দের জীবন। কিন্তু যারা স্বচ্ছল এবং যুক্তি ও জ্ঞানের পথে হাঁটে তাদের আবার নিয়ম করে ধর্ম পালন হয় না। পৃথিবীতে এমনতরো ব্যক্তির সংখ্যা কম হলেও  উচ্চতর বুদ্ধিবৃত্তিক এই মানুষগুলো ধর্মবিরুদ্ধতাকেই বেলাশেষে তাদের সাথী করে নেয়।

অতীতে আদিম মানুষদের মাঝে যেসব  ধর্মীয় প্রথা ছিল বর্তমানে অনেক আদিম গোষ্ঠীর মাঝেই তার সরব উপস্থিত দেখা যায়। যেমন— নিউজিল্যান্ডের মাউরি গোষ্ঠির লোকেরা একটি নৌকা বানাতে গেলে, প্রথমবার একটি নৌকা ভাসাতে গেলে কিংবা যে কোন কাজের শুরুতে  ঐশীবাণী পড়ে নেয়। উত্তর ব্রাজিলের আপিনাই গোষ্ঠীর লোকেরা সূর্যকে প্রচন্ডরকম সম্মান করে। তারই ফলশ্রুতিতে তারা প্রতিদিন সূর্যের সম্মানে ধর্মীয় সঙ্গীত গায়।

উপরোক্ত  ঘটনাগুলো এটাই নির্দেশ করে, বর্তমানে আদিবাসীদের  জীবন সেই ফেলে আসা পূর্বপুরুষের জীবনের ন্যায় ধর্মের ঘেরাটাপেই চলছে।

মানুষের জীবনাচরণকে গভীর ও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণের আওতায় আনলে দেখা যায়, মানুষ যখনই ব্যর্থতা ও হতাশায় নিমজ্জিত হয় তখনই ধর্মের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেয়। সর্বকালেই সমাজ ও ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ  করেছে ধর্ম। মানুষ এজন্যই ধর্মকে পুষে রাখে যে, তার নিরাপত্তা দিবে ধর্ম এবং ধর্মের মধ্যেই সে নির্বাণ লাভ করবে।

প্রশ্ন হচ্ছে কেবলমাত্র ধর্মই কি মানুষকে মুক্তি দিতে পারে? অবশ্যই না। বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীতও মানুষকে মুক্তি দিতে পারে। একজন মানুষ  কিসে মুক্তি পাবে তা নির্ভর করে সে কিসের  সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছে ; অর্থাৎ সে ধর্ম, বিজ্ঞান,  শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীতের যেকোনোটিকেই ভালোবেসে মুক্তি পেতে পারে।

তবে বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্পও সঙ্গীতের সাথে একাত্ম হতে পারে মাত্র পৃথিবীর মানুষের একটি নির্দিষ্ট অংশ। অবশিষ্টের বেশিরভাগ ধর্মের সাথে একাত্ম হয়ে যায়। এই অবশিষ্ট সাধারণরাই ধর্মের অস্তিত্ব ধারণ  করে।

এতোক্ষণ যা আলোচনা করেছি তা একেবারেই  ধর্মের প্রভাব বলয়ের একটি সরলীকরণ বৈ কিছু নয়। যেদিন থেকে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে রাষ্ট্র, সমাজ ব্যবহার শুরু করলো সেদিন থেকেই ধর্ম তার সরল পটভূমি থেকে সরে গেলো।

ধর্ম পৃথিবীর  মানব সম্প্রদায়কে বিভাজন করতে লাগলো। শিয়া-সুন্নী-কাদিয়ানী বিরোধ,  ক্যাথলিক-প্রোটেস্ট্যান্ট কিংবা ব্রাহ্মণ-শূদ্র হলো ধর্মীয় বিভাজনের সুস্পষ্ট উদাহরণ। মুষ্টিমেয় ধার্মিক সম্প্রদায় মনে করে, ধর্ম ছাড়া মানুষের নৈতিক  শিক্ষা  সম্পূর্ণ  হয় না।  কিন্তু  আমি মনে করি এটি অবশ্যই একটি ভ্রান্ত ধারণা।  আমার দেখা অনেক নাস্তিক ব্যক্তিকে অসম্ভব নৈতিক হতে যেমন দেখেছি তেমনি অহর্নিশি ধর্মের আচার পালনকারীকেও ঘুষ-দূর্নীতিসহ নানা অনৈতিক  কাজে লিপ্ত হতে দেখেছি। এছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেখানে ধর্ম ক্রমবিলুপ্তির পথে সেসব দেশ থেকে নৈতিকতা কিংবা মূল্যবোধ মোটেই উধাও হয়ে যায়নি। সুতরাং, ধর্ম ছাড়া নৈতিক  শিক্ষা  অসম্পূর্ণ — এটি ধর্মানুসারীদের সমাজে ছড়িয়ে দেয়া একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অমূলক বার্তা।

ধর্মকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা রাজনীতি, বিজ্ঞান আর ধর্মকে মুখোমুখি এনে দাঁড় করালো। কখনো আবার একটা সম্প্রদায় ধর্মের মাঝে বিজ্ঞানকে খুঁজতে লাগলো। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন,  ধর্ম আর বিজ্ঞান ভিন্ন প্রভাব বলয়ে থাকা উচিত ছিলো। কিন্তু  রাজনীতি তাদের  স্বকীয়তা নষ্ট করে একই প্রাঙ্গণে লড়াইয়ের  দিকে ঠেলে দিয়েছে।  ধর্ম মানে অদৃশ্য  এক মহা শক্তিশালী স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস; আর বিজ্ঞান অবিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে এবং পদ্ধতিগতভাবে  উত্তর খুঁজে বের করে।  ধর্মীয় বোধ ধর্মগ্রন্থ, পরকাল, স্বর্গ-নরক কেন্দ্রিক; অপরদিকে বিজ্ঞান পুরোপুরি সত্যের সন্ধানী।

সমাজে ধর্ম ব্যক্তির চরিত্রের উৎকর্ষ সাধনের রত থাকে; অন্যদিকে বিজ্ঞানের সকল আবিষ্কার সার্বজনীন। ধর্ম বিবর্তনে অনীহা প্রকাশ করে এবং অন্ধকারেই নিজেকে সমর্পিত রাখতে চায়। কিন্তু বিজ্ঞানের অমোঘ নিয়তি বিবর্তন এবং বিজ্ঞান সন্দেহাতীতভাবে সত্যের প্রকাশক।এতো গেলো ধর্ম বনাম বিজ্ঞানের কথকতা।

আরেকদিকে ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের সমন্বয় সাধনকারী গোষ্ঠীও কিন্তু যথেষ্ট তৎপর। তারা বিভিন্ন  ধর্মগ্রন্থের প্রাচীন আয়াত আর শ্লোকের সাথে সমন্বয় সাধন করে আধুনিক বিজ্ঞানের নব আবিষ্কারকে নিজেদের মতো করেই চাওর করে বেড়ায়। যেমন চাঁদে কল্পিত আযানের কাহিনি এমনি সমন্বয়ের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। চাঁদের সেই কল্পিত আযান শুনে নীল আর্মস্ট্রং এর মুসলমান হওয়ার মিথ্যা রটনা ছিল সময়ের সেরা  উদ্দীপিত গালগল্প। এসব বিপদজনক ও বিভ্রান্তিকর কাহিনি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতাকে সাধারণের কাছ থেকে বহুদূরে ঠেলে দেয়া ছাড়া আর কিছুই করতে সক্ষম নয়। ব্যক্তি যত বেশি ধর্মের গোঁড়ামিকে আঁকড়ে ধরে ,  আধুনিক শিক্ষা ও তার থেকে তত বেশি দূরে থাকে। ফলে ইতিহাসের  পরতে পরতে আছে ধর্ম ও বিজ্ঞানের দ্বন্দ্বযুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাস।  সূর্যকে ঘিরে অন্য সকল গ্রহের মতো পৃথিবী ও ঘুরছে। ধর্মবিরোধী( বাইবেল বিরোধী) এই তত্ত্বের জন্য কোপার্নিকাসকে ভয়ঙ্কর অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল৷ আর ঈশ্বরের সুপুত্ররা ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারলেও সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর ঘোরা কিন্তু ঠেকাতে পারেনি।

পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাস এগিয়েছে বটে তবে ধর্মান্ধদের হাতে নির্যাতনের ও নিগ্রহের শিকলটাও কেবল দিনে দিনে অনেক বড় হয়েছে। খ্রীষ্টের জন্মের চারশ পঞ্চাশ বছর আগে এনাক্সাগোরাস বলেছিলেন, চন্দ্রের নিজের কোনো আলো নেই। তাঁর এই আবিষ্কারের জন্য তাঁকে নিষ্ঠুর আর কঠিন  নির্যাতনের পর দেশ থেকে নির্বাসিত করা হয়।

ষোড়শ শতকে অধ্যাপক প্যারাসেলসাস অসুস্থতার কারণ বললেন জীবাণু। তিনি আরো বললেন, মানুষের অসুস্থতা কোনো পাপের  ফল কিংবা অশুভ  শক্তি নয়। কেবল এই মহৎ আবিস্কারের জন্য প্যারাসেলসাসকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল। অবশ্য তিনি মাতৃভূমি থেকে পালিয়ে জীবন বাঁচিয়েছিলেন। আজকের দিনে ধর্মান্ধরা ডাইনী পোড়ানোর সু্যোগ না পেলেও বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে কিন্তু তারা সহজভাবে নেয়না কিংবা স্বীকৃতিও দিতে কুণ্ঠাবোধ করে। এখনো মাঝে মাঝে এমন পরিস্থিতি গড়ায় যে, বিজ্ঞানের কোনো আবিষ্কার ধর্মগ্রন্থের বিপরীতে গেলেই তারা বিজ্ঞানকে আগুনমুখে তেড়ে আসে।

অথচ সৃষ্টির প্রথমে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ ঝড়- তুফান- সুনামি,  আকাশে বিদ্যুৎ চমক দেখে মানুষ ভয় পেতো। ভয়াল প্রকৃতি ও রোগ -ব্যাধির কাছে অসহায় মানুষগুলো  অদৃশ্য শক্তি কল্পনা করে তারই নিকট আত্মসমর্পণ করতো। ধীরে ধীরে মানুষের  অজ্ঞতা দূর হতে থাকে। মানুষ জ্ঞানবৃক্ষের ফসল  কুড়োতে থাকে। তারা প্রতিকূলতাকে জয় করে টিকে থাকতে শিখে যায়। আর এই প্রতিকূলতাকে জয় করা সম্ভব হয়েছে বিজ্ঞানের কারণে।  একথা অস্বীকার  করার উপায় নেই যে,  বিজ্ঞান পৃথিবীর সভ্যতাকে  আজ এই পর্যায়ে  নিয়ে এসেছে। বিজ্ঞান পৃথিবীকে বাসযোগ্য করেছে। পাথরে পাথর ঘষে গুহাবাসী যেদিন আগুন জ্বালিয়ে ফেললো সেদিনই মনুষ্য প্রজাতি পৃথিবীতে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের শুভ সূচনা করলো।

আজকের পৃথিবীতে যে ভয়ানক ব্যপারটি মাথাচড়া দিয়ে উঠেছে  তা হলো ধর্মানুসারীরা মানুষের ধর্ম বিষয়ক কটু সমালোচনা ঢাকার জন্য নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে একটা ধর্মান্ধ শ্রেণীকে প্রশ্রয় দিয়ে মহীরুহ করে তুলেছে।  আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি  যে, এই ধর্মান্ধদের তারা পছন্দ করেনা বটে তবে তাদের কোনো কর্মকান্ডকেই আবার বাধা প্রদান করেনা। এধরণের নীরব সমর্থন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সভ্যতার জন্য ভয়ানক বার্তা বহন করছে।

আসলে সভ্যতার এই লগ্নে এসে স্পষ্ট প্রতীয়মান যে, পুরো পৃথিবী জুড়ে একদিকে  ধর্মান্ধদের উন্মাদনা এবং আরেকদিকে ধর্ম বিদ্বেষীদের নীরব পদচারণা। এসব ধর্মীয় বৈচিত্র্য বুকে ধারণ করেই পৃথিবীর সভ্যতা ধাবমান এক অনিশ্চিত মহাকালের পথে।

মেহেরুন্নেছা। গল্পকার ও শিক্ষক। জন্ম ও বাস বাংলাদেশ। পেশাগত জীবনে তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

একটি পরাধীন দেশ আর তার বাসিন্দাদের মনে স্বাধীনতার আকুতি আমরা দেখেছিলাম ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে। এর…..

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

  কেতুগ্রামে যেখানে চন্ডীদাস বাস করতেন সেইস্থানটি চন্ডীভিটে নামে লোকমুখে প্রচারিত। চোদ্দপুরুষের ভিটে বাঙালির মনে…..

নারীর আপন ভাগ্য জয় করিবার: নারীজাগৃতি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা।

নারীর আপন ভাগ্য জয় করিবার: নারীজাগৃতি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা।

নবজাগরণের সঙ্গে নারীর জাগরণ, নারীর মর্যাদা ও সুরক্ষা, এবং নারীমুক্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভারতে এই নবজাগরণের…..