ধর্ম অধর্ম

সানিয়া আজাদ
গল্প, পডকাস্ট
Bengali
ধর্ম অধর্ম

ফাল্গুন মাস গিয়ে চৈত্রের আজ তিন দিন। অথচ শেষ রাতে শীতের প্রকোপ রয়ে গেছে পুরো মাঘের মতোই। এই শীতে লেপের ওম বড় আরাম বোধ হয়। একান্ত মুসল্লী না হলে লেপের এই ওম ছেড়ে বের হওয়ার কথা কেউ ভাবে না। ঠাণ্ডা পানিতে ওযুর কথা তো নয়ই। দুই দুইবার ইলেকশনে জেতা চেয়ারম্যান লিয়াকত মাস্টারের অবশ্য পানি নিয়ে ভাবনা নেই, ভাবনা হচ্ছে এখনই তাকে ছোটখাট বেহেস্তি আরামটা ছাড়তে হবে। ফজরের আযানের সাথে সাথেই বদনা ভর্তি গরম পানি গোসলখানায় রেখে সাত বছরের পুরানো বুয়া রহিমা বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে হেঁড়ে গলায় তার আম্মাজানকে ডাকবে “আম্মাজান… আম্মাজান… ও আম্মাজান আযান দিতাছে, উডেন।” রহিমার গলার আওয়াজ ভর দুপুরে শুনলেও মনে হবে এইমাত্র মাঝ রাতের কাঁচা ঘুম ভেংগেছে। রমজান মাসের শেষ রাতে সেহেরি খেতে উঠলে অনেকের কণ্ঠেই এমন স্বর শোনা যায়। যতক্ষণ না তার আম্মাজান “উঠছি” বলবে ততক্ষণ পর্যন্ত হেঁড়ে গলায় ডেকেই যাবে। সরাসরি চেয়ারম্যান সাহেবকে ডাকার সাহস রহিমার হয় না। আম্মাজান উঠলে সাহেবও উঠবে, সে জানে। তাই বুদ্ধি করে আম্মাজানকেই ডাকে। ফজরের নামাযের আযান হচ্ছে। আযান শেষ করেই বাড়ির মোয়াজ্জেম মোঃ আবুল বাশারও নামাযের জন্য ডাকতে আসবে। যতক্ষণ না ঘর থেকে বের হবে ডাকতেই থাকবে “ছেরম্যান সাব, ছেরম্যান সাব অ ছেরম্যান সাব আইয়্যা পড়ুইন যে, জামাতের আর তো সময় বাকি নাই। অ ছেরম্যান সাব”।

গল্পের অডিও শুনুন এখানে: 

সুরেলা কণ্ঠে আযানের জন্য মোয়াজ্জেম মোঃ আবুল বাশার এই অঞ্চলে সবার প্রিয়। চোখে সুরমা, আতরে চুবানো ছোট মার্বেল সাইজের তুলার দুটি বল দুই কানে গুঁজিয়ে রাখেন দিবারাত্রি, আতরের তীব্র গন্ধ তার চারপাশে একটা বলয় তৈরি করে রাখে। চলে গেলেও তার অনুপস্থিতিতে সেখানে আতরের গন্ধ ভুরভুর করে, অনেকক্ষণ থেকে যায় সেই গন্ধ। একেই বোধ হয় বলে – মানুষ চলে যায়, রেখে যায় কায়া।

মোয়াজ্জেম সাহেবের কথায় আঞ্চলিকতার টান প্রচুর – খাইয়ালছি, যাওহাইন যে, গফ কইরুন না যে। কিন্তু আযানটা বড় খাসা, গলা বড়ই মধুর, একেবারে অন্তর ছুঁয়ে যায় আযানের সুর। কাজটিকেও সে খুব মমতার সাথে করে। সবচেয়ে বড় গুণটি হলো মোয়াজ্জেম সাহেব অত্যন্ত বিশ্বস্ত মানুষ। এই সকল গুণের জন্যই সে চেয়ারম্যান সাহেবেরও অত্যন্ত প্রিয়। তিন চার মাস পরপর দেশে গিয়ে স্ত্রী সন্তানদের সাথে দুইদিন কাটিয়েই চলে আসেন। এই দুইদিন ঈমাম সাহেব আযানের কাজ চালায়। সেই আযানে মন ভরেনা কারো।

সারা দেশে ছড়ানো বেশিরভাগ ঈমাম, মুন্সি মোয়াজ্জেম, খাদেমরা যে নোয়াখালী অঞ্চল থেকে আসে, এই মোয়াজ্জেম সে অঞ্চলের লোক নয়। তিনি এসেছেন ময়মনসিংহের গফরগাঁও অঞ্চল থেকে। এই অঞ্চল থেকে ধানকাটার মৌসুমে সকল পুরুষেরা নগদ কিছু উপার্জনের আশায় দলবেঁধে গ্রাম খালি করে বেরিয়ে পড়ে। পুঁজি বলতে লুঙ্গি দিয়ে বানানো গোলাকৃতি বোঁচকার ভেতর প্রয়োজনীয় এক দুটি কাপড় ও পাকানো মোটা দড়ি, বাঁশের ভার ও একটি অর্ধচন্দ্রাকৃতি কাস্তে। কোন এক ধান কাটার মৌসুমে আবুল বাশারও এসেছিলো এমনই একটি দলের সাথে ধান কাটতে। এই সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গ্রীষ্মকালীন ছুটি থাকে বলে এমন ছোট ছোট দল রাত্রি যাপনের জন্য গ্রামের সরকারি স্কুলগুলোকে বেছে নেয়। স্কুলের বারান্দা তখন রাতের বেলায় পরিপূর্ণ হয়ে থাকে সেই অতিথিদের আগমনে। হাই ভলিউমে দোকানগুলোতে হিন্দি গান বাজে “হাওয়া মে উড়তা যায়ে মেরা লাল দুপাট্টা মলমল কা…”। দোকানে দোকানে ঠোঙ্গায় ঝুলানো বনরুটি, কলা, আকিজ বিড়ি ও সুরমা সিগারেটের বিক্রি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। লিয়াকত মাস্টার তখনও লিয়াকত চেয়ারম্যান হয়ে উঠেনি। মাস্টারের বাড়িতে সবে পাকা মসজিদের কাজ অর্ধেক হয়েছে। সে বছরও ধান কাটতে আসা জনা পঞ্চাশেক লোক লিয়াকত মাস্টারের বাহির বাড়িতে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছিল।

সাধারণত ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকজন এতোটা ধার্মিক হয় না। যারা ধান কাটতে আসে তাদের মধ্যে নামাজি খুব কমই দেখা যায়। স্কুলে আশ্রয় নেয়া শখানিক লোকের মাঝে পাঁচ ছয়জন মাত্র যার যার অতিরিক্ত লুঙ্গিটি দুর্বাঘাসের মাঠেই বিছিয়ে জামাতে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্য হতে আবুল বাশার উঠে গিয়ে আযান দেয়। সুরেলা কণ্ঠের জন্য আবুল বাশার এলাকায় বিখ্যাত। তাদের গ্রামের মসজিদে তাবলিগের লোকজন মেহনতে আসলে, এমনকী কোথাও মাহফিল হলে সেখানে আযান দেওয়ার জন্য আবুল বাশারের ডাক পড়ে তার এই সুরেলা কণ্ঠের জন্য। তাই এখানেও সে-ই আযান দিতে গেল। পাড়া গাঁ, রাত আটটা বাজতে না বাজতেই নিশুতি রাত হয়ে যায়। চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া অন্য কোন শব্দ পাওয়া যায় না। নিঃশব্দ রাতে আযানের মধুর ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে আকাশে বাতাসে। এতো সুন্দর আযানের ধ্বনি শুনে ভেতরবাড়ির অনেকেই থমকে যান। চমৎকার এই সুর শুনে পরদিন লিয়াকত মাস্টার খোঁজ করে আনেন সুরেলা কণ্ঠের মোয়াজ্জেমকে। আবুল বাশারের ভাগ্য সেদিনই খুলে যায়। কথা বার্তা বলে মসজিদের মোয়াজ্জেম পদের জন্য পাকা করে ফেলেন। সেই থেকে এই বাড়িতে আবুল বাশার ‘মোয়াজ্জেম হুজুর’ নামেই পরিচিত। মসজিদ তৈরির সেই প্রথম থেকেই সে আযান দিয়ে যাচ্ছে, আবুল বাশারকে আর ছাড়া হয় নি।

শিল্পী: রিয়া দাস

চেয়ারম্যান সাহেবকে সময়মতো নামাজে দাঁড় করানোর ব্যাপারে মোয়াজ্জেম সাহেব খুবই সতর্ক। যার দেওয়া বেতনে তার সংসার চলে, সেই মানুষটির প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে তাকে আল্লাহর রাস্তায় পুরোপুরি আনার ব্যাপারে মোয়াজ্জেম সাহেবের চেষ্টার কোন কমতি নেই। তাই ফজরের আযান শেষ করেই চেয়ারম্যান সাহেবকে নামাযের জন্য ডাকতে আসে -“ছেরম্যান সাব, অ ছেরম্যান সাব উইট্টা পড়ুন যে, আর তো সময় নাই, অ ছেরম্যান সাব”। মালয়েশিয়া থেকে তিনমাসের ছুটিতে আসা

ছোট শালা যে কীনা বিয়ের জন্য পাত্রী দেখে যাচ্ছে প্রতিদিনই একটি করে, তার দেওয়া গোলাপ ফুলওয়ালা ডাবল কম্বল সরাতে সরাতে চেয়ারম্যান সাহেব অনেকটা বিরক্তি হয়েই বিড়বিড় করে বলে “শালার ছেরম্যান গিরি কইরাও শান্তি নাই। সকাল সকাল যে একটু আরাম করে ঘুমাব সে উপায় আর নাই”।

আসলেও সে উপায় নেই। দশ বারো বছর আগের কথা। চেয়ারম্যান হওয়ার কেবল পূর্ব প্রস্তুতি চলছে। তাও নিজের মনেই নির্বাচনের স্বপ্ন দেখছে। গোপন ইচ্ছাটি কেবল কয়েকজন নিকটাত্মীয় ও কাছের বন্ধু বান্ধবকে বলেছে। এলাকার জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে কী কী করা যায়, তারই চিন্তা ভাবনা করছে। সুহৃদদের কাছ থেকে পরামর্শও চাইছে। যেহেতু পৈতৃক ভিটেতে একটি প্রাইমারী স্কুল রয়েছে, সকলেই গ্রামে একটি মসজিদ নির্মাণের পরামর্শ দিলেন। সেই চিন্তা ভাবনার প্রথম বাস্তবায়ন নিজেদের বাড়ির দক্ষিণ পার্শ্বে বড় রাস্তার সাথে মসজিদ নির্মাণ। এখনও মসজিদ বলতে সারা গাঁয়ে এই একটাই। চারদিকে চারটা মাইক বসানো আছে। মিনারটি বেশ উঁচু করে তৈরি করেছেন, দুই তলার ছাদের সমান। ওখানে দাঁড়িয়ে মোয়াজ্জেন যখন আযান দেয়, নিজেদের গ্রামের সীমানা ছেড়েও সে আযান পৌঁছে যায় পাশের গ্রামে। সারা গাঁয়ের লোকজন পাঁচ বেলা জামাত পড়তে আসে গ্রামের একমাত্র মসজিদটিতে। রমজান মাসে এই মসজিদের আযান শুনেই এই গ্রামসহ আশে পাশের গ্রামের লোকজন রোজা ভাঙ্গে।

চেয়ারম্যান সাহেব যে খুব আল্লাহ পরহেজগার মানুষ, সে রকমটি কিন্তু নয়। একে তো নিজের বাড়িতে মসজিদ, তার ওপর মাথার উপর জনগণের প্রতিনিধিত্বের ভার, তাই বাড়িতে হাজির থাকলে সেই চেয়ারম্যান সাহেবকে জামাতে থাকতেই হয়। ওপরওয়ালার হিসাবটা না হয় পরেই দেওয়া যাবে, দোড়গোড়ার ইলেকশানটাতো সামলাতে হবে আগে।

দুই.

তিন দিনের দাস্ত আর ভেদবমি ভোগ করে করে ছমির মুন্সি যখন ইহলোক ত্যাগ করে, লায়লী বেগমের মাথায় যেন আসমানটি টুকরা টুকরা হয়ে ভেংগে পড়ে। আট বছরের বিবাহিত জীবনে ছয় ছয়টা বাচ্চাকাচ্চা বছরে বছরে জন্ম দিয়ে মধ্যবয়স্ক বনে যাওয়া সাতাশ বছরের লায়লী বেগমের ঘরের মর্দকে তুলে নিয়ে বিধাতা কোন বিচারে তাকে সাদা থান পরালেন, সেই কৈফিয়ত বিধাতার কাছে চেয়ে চেয়ে কেবল সময়ই কাটানো যায় কিন্ত বাচ্চাকটির পেট ভরানো যায় না কোনমতেই। পেট ভরাতে হলে গা গতর কিছুটা নাড়াতে চাড়াতে লাগে।

যে লাইলী কোন দিন অপ্রয়োজনে বাড়ীর বাইরে যায়নি, তাকেই আজ কাজের সন্ধানে বেরোতে হবে, কাজ খুঁজতে হবে পাড়া পাড়া ঘুরে। যে মনোহারি দোকানটি দিয়ে এতদিন ছমির মুন্সি সংসার চালাতো, তাতে মাল বলতে এখন আর কিছুই নেই। মুন্সি দেড় মাস বাড়ির বাইরে থাকার ফলে দোকানে যে অল্পসল্প মাল ছিলো, তা দিয়ে এই কদিন ঘরের খরপোষ চালিয়েছে লায়লী। খালি কাঁচের বৌয়ামগুলো জৌলুসহীন ভাবে পড়ে আছে অন্ধকার দোকানের ধুলো পড়া তাকগুলোতে। দোকানটি এখন পোকামাকড়ের ঘরবসতি। চাষ করার উপযোগী যে এক চিলতে জমি আছে তাতে এতগুলো মানুষের খোরাক দু’তিন মাসও যাবে না। তাও সেই জমি চাষ করতে যে খরচাপাতি লাগবে সেটা জোগানোর উৎস লায়লীর নেই। ছমির মুন্সী বলতেন “মুখ দিয়েছেন যিনি, আহার দিবেন তিনি” – কিন্তু লায়লী বেগম সেই আহার আহরণের সঠিক ঠিকানা বা পথটা খুঁজে পাচ্ছে না কিছুতেই।

মুন্সি বড়ই আল্লাহ পরহেজগার লোক। কারো সাতে পাঁচে নেই কোন কালেই। লায়লী বেগমকে যখন বিয়ে করে আনে, ঘরে মা আর অবিবাহিতা দুই বোন ছিলো। নিজের বিয়ের দুই বছরের মধ্যেই বোনদের পাত্রস্থ করে। যেটুকু ধানিজমি ছিলো, তার বেশিরভাগটাই হাতছাড়া হয়ে যায় দুই বোনের বিবাহের খরচ বাবদ। সতের বছরের লায়লী এ বাড়িতে আসার পর থেকে স্বামীর ঠাণ্ডা মেজাজ, মাতৃভক্তির সাথে বিশেষ পরিচিত। পরহেজগার ছমির মুন্সি পরকালের ভয়ে মাকে সবসময় মাথায় করে রাখে,মায়ের মনে দুঃখ পাবে এমন কোন কাজ কখনো করেনি। শোন,“মার পায়ের তলে সন্তানের বেহেস্ত আর স্ত্রী লোকের বেহেস্ত হইল গিয়া স্বামীর পায়ের তলে”- কথাটি বলে তার মায়ের সেবা যত্নের ব্যাপারে তাগাদা দেয় লায়লীকে। বউ, মা, বোনকে যতটা পারে পর্দার আড়ালে রাখার চেষ্টা করেছে মুন্সি। ধর্মকর্ম বড় কঠোরভাবেই পালন করতো এবং অন্যদেরও করাতো। নিয়মিত তাবলীগের বিভিন্ন চিল্লায়ও যেতো।

তবে চল্লিশ দিনের চিল্লা হতে আসার পর কেমন যেন চুপ হয়ে যেতো, নিঃশব্দে ধর্মীয় আচার আচরণগুলো পালন করতো। বউ মাকেও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চালাতো। তাদের কাছে বয়ান করত চিল্লা থেকে শুনে আসা হাদীস কুরআনের বাণী – “আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনের সূরা বনি ইসরাইলের ২৩ থেকে ৩৭ নম্বর পইযযন্ত আমাদের করণীয় চৌদ্দটি নির্দেশ দিয়েছেন। ওগুলানকে আমাগোর আঁকড়ে ধরতি হবি। ওখানে এক লম্বরে বলেছেন আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত না করতে আর দুই লম্বরেই বলেছেন মা বাবার সাথে ভালো ব্যবহার করতে। আল্লার পরই বাপ মার জায়গা। চিল্লায় হুজুর আরও বয়ান করিছে যারা বাবা-মার মুখের দিকে সুনজরে তাকাবে, তাদের গুনাহ মহান রাব্বুল আলামীন মাফ করে দিবেন। অভাগা আমি, বাপেরে পাইলাম না”- একনাগাড়ে সব কথা বলে বহু বছর আগে মৃত বাপের কথা স্মরণ করে ঢুকরে কাঁদে, নাকের পানি মুছে। আল্লাহর গজবের ভয়ে ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যায় মুন্সি। দুরু দুরু বুকে হাতে রাখা ছোট তসবিহ ঘুরিয়ে তওবা পড়তে থাকে– “লা হাওলা অলা কুয়্যাতা ইল্লাবিল্লাহিল আলিয়্যিল আযিম, লা হাওলা …”। আবুল বাশারের ধর্মীয় চেতনা পুরোপুরিভাবেই ধারণ করেছিলো তার মা, এমনকী তার স্ত্রীও।

৩.

বিয়ের প্রথম বছরে বড় মেয়ে শিউলীর জন্মের পর পরই মাঠপর্যায়ের স্বাস্থকর্মী বাড়ীতে এসেছিলো লায়লী বেগমের কাছে। জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা আর এর সামাজিক প্রভাব বুঝিয়ে লায়লী বেগমকে এক পাতা জন্মনিরোধক পিল দিয়ে যায়। জন্মনিয়ন্ত্রণের যে কোন পিলকেই গ্রামের মানুষ ‘মায়া বড়ি’ বলে। তো সেই মায়া বড়ি খাবার নিয়ম কানুনও লাইলী শিখে নেয় মাঠকর্মী আপার নিকট হতে। আঠাশ দিনের সার্কেলে এক স্ট্রিপে আঠাশটি পিল থাকে। ঋতুস্রাব শুরুর তিন বা পাঁচ দিনের দিন হতে সাদা বড়ি খেতে হবে প্রথম একুশ দিন, এরপর লাল সাতটি খেতে হবে শেষ সাত দিন। কোন দিন খেতে ভুলে গেলে পরের দিন দুইটা একসাথে খেতে হবে। বউয়ের হাতে এই মায়া বড়ির পাতা দেখে মুন্সির সে কী রাগ! স্বাস্থ্যকর্মীকে খবর দিয়ে এনে হাদিস কুরআনের আলোকে বুঝালেন এর কঠিন আযাবের কথা। “আল্লাহতো বলেছেন মুখ দিছেন তিনি, খাওনও দিবেন তিনি। তিনি পবিত্র কুরআনে আরও বলেছেন তোমরা দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করিও না। তোমাদের আর তোমাদের সন্তানদের রিজিকদাতা আমিই। নিশ্চয় সন্তান হত্যা মহাপাপ। তোমাদের খাওন তো আমিই দিয়ে থাকি। তাই খাওনের ভয়ে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে দুনিয়ায় আলোর মুখ না দেখানো আমাদের জন্য গর্হিত অপরাধ। গত চিল্লায়ই জিম্মাদার সাব এই বয়ান করেছিলেন। আমারে এই গুণাহগারের ভাগিদার কইরেন না আফা”।

স্বাস্থ্য কর্মী অনেক চেষ্টা করলেন ছমির মুন্সিকে বুঝাতে। বুঝিয়েছেন পরিবার পরিকল্পনা হতে সরবরাহকৃত বড় কাল ব্যাগে রক্ষিত যে সকল ছবি আছে তার সবগুলো দেখিয়ে, এর পক্ষে যত হাদিস এবং জানামতে যে সকল যুক্তি আছে সকল বিদ্যা দিয়ে -“আপনাকে একেবারে স্থায়ী পদ্ধতি ব্যবহারের কথা বলছি না। লাইগেশন বা ভ্যাসেকটমি ছাড়াও কত অস্থায়ী পদ্ধতি আছে! এমন কিছু উপায় বেছে নিন যাতে বউ গর্ভবতী না হয়। মেয়েদের ডিম্বাশয়ে যে ডিম্ব থাকে তার সাথে ছেলেদের শুক্রানু যোগ হলে জাইগোট তৈরি হয়। সেই জাইগোট থেকে ভ্রূণ তৈরি হবে। সেই ভ্রূণে আসবে আত্মা। আপনি যদি সে প্রক্রিয়াতেই না যান তাহলে গুনাহ হবে কী করে? ভ্রূণই তৈরি হলো না তো মারারও প্রশ্ন আসে না। তাছাড়া আপনি বছরে বছরে পোলাপান নিলেন, অথচ ঠিক মতোন ভরণপোষণ দিতে পারলেন না, সঠিক মানুষ করতে পারলেন না এই দায়ভার কে নিবে?” ছমির মুন্সির এক কথা “যারা দুনিয়ায় আসতে চায় তাদের বাধা না দেওয়নই উচিত। আল্লাহ মানুষ তৈরি করেন, সাথে সাথে তাদের ভাগ্যও নির্ধারণ করেন। তাই যার ভাবনা সেই ভাববে। আমরা খালি খালি অত ভাইবা কী করবো?” মুন্সি খুব ঠাণ্ডা ভাবে নিজের মত প্রকাশ করলেন। এমন কঠিন পণ করা মানুষকে বুঝিয়ে বুঝিয়ে গলদগর্ম হয়ে অবশেষে স্বাস্থ্যকর্মী হাল ছেড়ে দিলেন। জেগে জেগে ঘুমিয়ে থাকার মতো বুঝেও যে বুঝতে চাইবে না তাকে কী করে বুঝানো যায়!

প্রথম মেয়ে শিউলীর জন্মের এগার মাস পরেই দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম। একটা ছেলের মুখ আশা করেছিল সকলেই। ফজর ওয়াক্তে দাইয়ের হাতে নবজাতক যখন ফুসফুসের সমস্ত শক্তি দিয়ে ট্যাঁ ট্যাঁ করে চিৎকার করে উঠল, বাইরে ছেলে সন্তানের জন্য অপেক্ষমাণ সকলের আশায় পানি দিয়ে দাই বেটি কন্যা সন্তানের খবর দিল। ছমির মুন্সি পুত্র ভেবে অযু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন আযান দেবেন বলে। মেয়ের কথা শুনে আর আযান দেওয়া হলো না, আযানের পরিবর্তে একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন সকলের অলক্ষে। দ্বিতীয় কন্যাটির নাম রাখা হলো আফসানা।

পরের বছর রোকসানা, তার পরের বছর পারভীন, তারপরের বছর আইরীন। ছমির মুন্সি পুত্র সন্তানের মুখ দেখবার জন্য যেন উতলা হয়ে গেলেন। বছরে বছরে সন্তান জন্ম দিতে লাগলো, কিন্তু দয়াময় একটি পুত্রের মুখ দেখালেন না। লায়লী বেগমের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে এমনই হাল হল যে, বুঝার আর উপায় নেই লাইলীর আসল বয়স কত চলছে। অচেনা কেউ দেখলে মনে করবে বয়স পঁয়তাল্লিশের ওপর। বাচ্চাগুলোরও ঠিকমতো যত্ন নিতে পারে না। কোনটা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, কোনটার গোসল হয়নি, কাঁদতে কাঁদতে কোনটার চোখের পানির সাথে নাকের তরল সিকনী দুই ধারা হয়ে মুখের ভেতর গড়িয়ে পড়ছে। এতসব খেয়াল রাখা লাইলীর পক্ষে অসম্ভব। বাতের ব্যথায় সারারাত প্রলাপ বকা বাচ্চাদের বুড়ি দাদীর পক্ষেও সবগুলো নাতনীর দেখাশুনা করা সম্ভব নয়। তার ওপর নাতনীগুলো সব বাপের মাথার বোঝা, দুইএকটা নাতি হলেও যত্ন আত্তি কাজে লাগতো। কামাই রুজি করে খাওয়াতো।

মুন্সি সারাদিন দোকানদারী করে। পাড়ার দোকানে খুব একটা বেচাবিক্রি নেই। অবসরে কিতাব পড়ে। দোকানের সামনের বেঞ্চে যারা আড্ডা দিতে আসে তাদের মাঝেও তাবলীগের শিক্ষার কথা প্রচার করে। নামায পড়ে লম্বা মোনাজাতে বসে বংশ রক্ষার একজন বাহকের আশায়। অবশেষে আল্লাহ ছমির মুন্সির ডাক শুনেন। এক রাত এক দিন প্রসব বেদনা সয়ে মাঝরাতের পর যখন লাইলী একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়, তার অপুষ্ট শরীরে আর একফোঁটা শক্তি অবশিষ্ট ছিলো না পুত্রের মুখ দেখার। সে অচেতন হয়ে পড়ে। অসময়ে ছমির মুন্সির গলা ফাটা আযানের শব্দ নবজাতক আর প্রতিবেশীদের কানে গেলেও লায়লী বেগমের কানে যায়নি। আযান দিয়ে দুই রাকাত শুকরানা নামায পড়তে পড়তে ছমির মুন্সি মানত করে সামনের সপ্তাহেই চিল্লায় যাবে, একেবারে চল্লিশ দিনের চিল্লা। আল্লাহ তার খায়েশ পুরা করেছে, তারও আল্লাহর রাস্তায় কিছু করা উচিত।

বছরে বছরে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে লায়লী বেগমের নিম্নাঙ্গের যে অবস্থা হয়েছে দাই বেটি বলে গেছে এর পর কোন ব্যবস্থা না নিলে প্রস্রাব আর পায়খানার রাস্তা এক হয়ে যাবে। যেটাকে ডাক্তারগণ ফিসচুলা বলে। একমাত্র চিকিৎসা অপারেশন। ঢাকার বড় ডাক্তাররাই পারবে অপারেশন করে জোড়া লাগাতে। লায়লী ভয়ে কুঁকড়ে ডুকরে কেঁদে বলে “পরপুরুষের হাত পড়বে ওই গোপন জায়গায়? তারচে আল্লাহ মরণ দেও, এতবড় অপমান তুমি দিও না আল্লাহ”। লায়লী বেগম স্বামীকে আল্লাহর দোহাই দেয় স্বাস্থ্যকর্মীকে বাড়িতে ডেকে আনার জন্য। ছমির মুন্সি বউকে অভয় দেয় “আল্লাহর উপর ভরসা রাখ”। লাইলীতো আর স্বামীর কথার বাইরে যেতে পারে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেই স্বামীকে তাবলীগের উদ্দেশ্যে বিদায় দিল।

.

দোকানের ক্যাশে যে কয়টি টাকা ছিলো তার প্রায় সব কটি টাকা নিয়েই ছমির মুন্সি “আলমী মারকাজ” অর্থাৎ কাঁকরাইলের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের উদ্দেশে রওয়ানা দেয়। মারকাজ থেকে মেহনত করার স্থান ঠিক করে রংপুর। খোদার দ্বীনের মেহনতে আসলে আর বাড়ি যেতে মন চায় না ছমির মুন্সির। মনে হয় জীবনটা খোদার পথেই কাটাইয়া দেয়। আসরের পর ছমির মুন্সি “গাস্তে” অর্থাৎ দাওয়াতে বের হয়। কোন কোন দিন দুই চারজনকে বুঝিয়ে সুজিয়ে নিয়ে আসে মসজিদে বয়ান শুনানোর জন্য। জিম্মাদার সাহেব মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে এই নশ্বর পৃথিবীর মায়ায় কেমন করে আমরা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছি তা বয়ান করেন। এক মেহনতে তেরোটি মসজিদ নির্ধারণ করা হয়। কেমন কেমন করে যে তেরোটি মসজিদে মেহনত করার কাজ শেষ হয়ে যায় সে এক অলৌকিক ব্যাপার মনে হয় ছমির মুন্সীর কাছে। চল্লিশ দিন পার করে তাদের কাফেলা ফের ঢাকায় পৌঁছাল এক শুক্রবার বিকেলে।

ঢাকায় পৌঁছে ছমির মুন্সীর দল দেখে মারকাজের সামনে অসংখ্য পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনা কী জানার জন্য এই দলের জিম্মাদার আনোয়ার সাহেব মারকাজের একজন শুরা সদস্যকে ফোন দেয়। খবর নিয়ে জানতে পারলো ভেতরে আমীর মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বিরোধীরা মারকাজ দখল নিয়ে রেখেছে। সে লক্ষ্যে বিভিন্ন মাদ্রাসা হতে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীকে এনে কাঁকরাইল মসজিদে সাদ বিরোধীরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। বিভিন্ন সময় ইসলাম ধর্ম নিয়ে তাঁর কিছু বক্তব্যের জের ধরে এই বিরোধের সূত্রপাত হলেও নেপথ্যে আসলে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব রয়েছে।

১৯২০ সালের দিকে ভারতে তাবলীগ জামাতের সূচনা করেন মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী (রহ.)। উনার মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ মারকাজের নেতৃত্বে আসেন। মাওলানা ইউসুফের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মাওলানা সাদ কান্ধলভী আমির হন। তাবলীগ জামাতের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এগারোজন শুরা সদস্য আছেন। এই এগারোজনের যে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন ছয়জন, যাঁদের ফয়সাল (সিদ্ধান্তদাতা) বলা হয়। শুরা সদস্যের মধ্যে কারা ফয়সাল হবেন, তা এতদিন মাওলানা সাদ নির্ধারণ করে দিতেন। এইবার বেঁকে বসলেন সাধারণ তাবলীগ অনুসারীরা। তাদের বক্তব্য এই যে, দেশে তাবলীগের দায়িত্বে যে সকল মুরুব্বীরা রয়েছেন, এই ব্যাপারে তাঁরাই সিদ্ধান্ত নেবেন। এ দেশে মাওলানা সাদের কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে না। সম্প্রতি আরও দু’জন শুরা সদস্যকে তিনি ফয়সাল হিসেবে নিয়োগ দেন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন পাঁচ শুরা সদস্য। দিল্লী থেকে এই দু’জন শুরা সদস্য নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করেই এই বিশৃংখলা।

এদিকে বাহিরে পুলিশের সংখ্যা বাড়ছে। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ যারা চিল্লায় যাবে বলে এসেছে তারাও বাইরে ঘোরাঘুরি করছে। এই অবস্থায় ছমীর মুন্সী ভেতরে যাওয়ার সুযোগ পেল না। এই দিকে হাতের টাকা পয়সা একেবারেই শেষ। ভেতরে ঢুকে যেতে পারলে খাবার ও পানির চিন্তা ছিল না। যেহেতু যেতে পারেনি, মসজিদের সাথে অস্থায়ী দোকান থেকে কলা পাউরুটি খেয়ে ড্রামের ঢাকনার উপর রাখা স্টিলের গ্লাস দিয়ে নীল রঙ এর বড় ড্রাম থেকে পানি তুলে খেল । রাতটুকুও কলা পাউরুটি আর ড্রামের পানি খেয়ে রমনা পার্কের একটা টুলে শুয়ে বসে কাটিয়ে দিল। ভোর রাত থেকে পেটে ব্যথা শুরু হলো। তাই আর দেরী না করে সায়েদাবাদ এসে বাসের টিকিট কিনে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল।

বাস ছুটে চলছে বাড়ীর উদ্দেশ্যে। দুই মাস বয়সি পুত্রের মুখটি দেখার জন্য মনটা খুব ব্যাকুল হয়ে উঠলো। এতোদিন তাবলীগের মেহনতের কাজ নিয়ে যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলো, কাজ শেষে ঘোর কেটে যাওয়ায় মনে পড়ল ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে নিয়ে মা আর লায়লী কত কষ্টে যে দিন কাটাচ্ছে! ভাবতে ভাবতেই পেটে মোচড় দিয়ে উঠলো। কোনমতে একটা পেট্রোল পাম্পে বাস থামিয়ে কাজ সেরে নিলো। মাঝ রাস্তায় আবার পেট মোচড় দিলো। দুনিয়া উথাল পাতাল মোচড়ে বার বার বাস থামিয়ে, বাসের সকল যাত্রীদের বিরক্তির চরমে পৌঁছিয়ে, সহযাত্রী কারো গালিগালাজ কারো বা সহানুভূতি পেয়ে কীভাবে যে ছমির মুন্সি বাড়ি পৌঁছেছিলো সে কেবল আল্লাহ জানে। বাড়িতে গিয়ে সেই যে সটান শুয়েছিলো বিছানায়, দাস্ত আর বমিতে একেবারে কাহিল হয়ে তিন দিনের দিন সব কটি মুখ লায়লী বেগমের হাতে জিম্মা রেখে যমের হাত ধরে স্বার্থপরের মতো চলে গেলো না ফেরার দেশে।

কথায় বলে অল্প শোকে কাতর অধিক শোকে পাথর। ছয়টি সন্তান আর শাশুড়ির মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চিন্তায় লায়লী বেগম শোকে পাথর নয় লোহায় পরিণত হলো। মরা বাড়িতে চারদিক থেকে যে সাহায্য সহযোগিতা আসছে তা দিয়ে আর কদিনই বা চলা যায়? তুলা দুধে কি পুলা বাঁচে? উপায়ন্তর না দেখে লায়লী কতক্ষণ বিলাপ করে কাঁদে, আবার গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়। বউ শাশুড়ি পরামর্শ করে কি করা যায়। “আম্মা, আপনে যদি ওদের দেখাশুনা করতে পারেন, তো আমি বাইর অইয়া দেখি কোন কাম জুটাইতে পারি কি না”। শাশুড়ির বুকে শেল পড়ে পুত্রবধূর এই কথা শুনে। শাশুড়ি ফ্যালফ্যাল করে বউমার দিকে তাকিয়ে থাকে। কোন উত্তর মুখে আসে না। পুত্র হারানোর শোকের চেয়ে নাতিনাতনীদের অনাহারে চিমসে যাওয়া মুখটা যেন শেল হয়ে বুকে বাজে। লায়লী উপায়ান্তর না দেখে পাগলের মতো গুণ গুণ করে একা একাই মৃত স্বামীর সাথে কথা বলে “ওগো, কী করে দিন কাটাবো? বাচ্চাদের কী খাওয়াবো? উপায় বলে যাও। কোথায় আছে খাবারের খোঁজ আমায় বলে দিয়ে যাও…”। এই বাড়ি ওই বাড়ি থেকে চেয়ে চিন্তে যা খাবার পায় বাচ্চাদের মুখে দিতেই শেষ। অনাহারে লায়লী আর তার শাশুড়ির স্বাস্থ্য আরও খারাপ হতে থাকে। অসুস্থ শাশুড়ি সারা রাত কাশে। ওষুধ পথ্যি খাওয়াতে পারে না। ওষুধ পথ্যি দূরের কথা, পেট ভরে ভাতই জুটে না। কাশতে কাশতে রাতে ঘুমাতে পারে না। কখন যে কাশির দমকে শ্বাস আটকে যায় লায়লী ভয়ে ভয়ে থাকে।

উপায়ান্তর না দেখে গাঁয়ের চেয়ারম্যান লিয়াকত মাস্টারের শরণাপন্ন হয় লায়লী। লম্বা ঘোমটা টেনে, অন্তরের সব জড়তা দূর করে, ধুকপুক ধুকপুক বুকে নিজের আবেদন পেশ করে “বাচ্চাগুলানরে বাঁচান ছেরম্যান সাব, একমাত্র আপনিই ভরসা। একটু দয়া না করলে যে এতগুলো জান বাঁচাতে পারবো না”। চেয়ারম্যান সকল কথা শুনে, কী কাজে আপাতত লাগানো যায় তা ভেবে ভেবে কিছুই না পেয়ে অবশেষে রাস্তা মেরামতের প্রস্তাব দেন। সেই সাথে বিধবাভাতার জন্য নাম লিখে নেন। কিন্তু সেই ভাতা আসে বছরে একবার তাও মাথাপিছু মাত্র পাঁচ হাজার। সরকারি কাজ কারবার, কখন আসবে সেটা চেয়ারম্যান সাহেব নিজেই জানে না।

অনেক ভেবে চিন্তে ছটি অবুঝ সন্তানকে বাঁচানোর আশায় লায়লী অবশেষে রাস্তা মেরামতের কাজটিই নিলো। স্বামী শ্বশুরের মানের কথা ভাবলে বাচ্চাগুলো মারা পড়বে। বাড়িতে শাশুড়ি বাচ্চাদের সামলায়, লায়লী সারাদিন রাস্তার কাজ করে। কোদাল কুপিয়ে মাটি কাটে, সেই মাটি বড় খলুই ভরে রাস্তার গর্তে ফেলে। সেখানে লায়লীর মতো আরও দীনহীনারা কাজ করে। সপ্তাহ শেষে মজুরী পায় রোজ একশত টাকা করে সাত দিনে সাতশত টাকা। প্রথম সপ্তাহে মজুরী পেয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জিনিশটির দিকে। এতো পাতলা কিন্তু এতো শক্তি! মজুরী পেয়ে লায়লী দোকান থেকে চাল, ডাল, আলু, তেল, রসুন পেঁয়াজ, মসলাপাতি কিনে ঘরে ফিরে। সাথে সাহস করে ছোট একটা পাঙ্গাস মাছও কিনে ফেলে।

ছমির মুন্সির বাড়িতে যেন আজ উৎসব লেগেছে। বড় পাতিলে ভাত রান্না হচ্ছে, মাছ ধুয়ে কুটে মিটসেফে তুলে রেখেছে বিড়ালের ভয়ে। তাদের মা মশলা বাটছে, ভাত হয়ে এলেই মাছ রান্না হবে। মেয়েগুলো চুলার পাশেই ঘোরাফেরা করছে। কতদিন পর তারা পেটপুরে আজ মাছ ভাত খাবে! মাছ রান্নার সুঘ্রাণে বাচ্চাগুলোর ক্ষিধা চনমন করে জেগে উঠছে।

সুখ জিনিসটাই এমন যে এক জায়গায় বেশি দিন থাকতে পারে না বোধহয়। সুখ বড় চঞ্চল, বড় উড়ুউড়ু। এই মহারথী লাইলীর বাড়ি থেকেও বিদায় নেবে নেবে করছে। বর্ষাকালে রাস্তা যখন পানির তলে তলিয়ে গেল, লায়লী পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়ে। ফের চেয়ারম্যানের দ্বারস্থ হয়। সেও যখন কোন কাজ দিতে পারে না, তখন চেয়ারম্যান বাড়িতেই ঘুরে ঘুরে তাদের ঘর গৃহস্থালির কাজ করে দেয়, বউঝিদের মন টোকায়। তিনবেলা পেটপুরে খেতে তো পায়। দিন শেষে আরও কয়েক ঘর থেকে ভাত তোলে খাবারগুলো একটা বোলে করে বাড়িতে নিয়ে আসে। বাচ্চাদের খাইয়ে শাশুড়িকে খাওয়ায়। তারপর অবশিষ্ট কিছু থাকলে সকালের জন্য পানি দিয়ে রেখে দেয়।

স্বাস্থ্যকর্মী আপার সাথে দেখা হলে লায়লী লজ্জায় চোখ নামায়, চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না। মনে পড়ে যায় স্বামীর রাগী মুখের কথা “মুখ দিছেন যিনি, আহার দিবেন তিনি”। লাইলী দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আহা রে! তখন যদি আপার কথা শুনতেন তিনি, আজ হয়তো এতোগুলো পেটকে ক্ষুধার কষ্ট সইতে হতো না। স্বাস্থ্যকর্মী আপাও দাঁড়িয়ে অযথা সময় নষ্ট করেন না। এই লায়লীকে তার প্রয়োজন নেই, তার প্রয়োজন মরদওয়ালা লায়লীদের।

৫.

অভাবের মুখের হাঁ-টা এতো বিশাল যে গতর খাটিয়ে চেয়ে- চিন্তে যতটুকুই আনে, ফুটো নৌকার মতো পানি কুলকুলিয়ে উঠে সেটুকু তলিয়ে দেয়। সারাদিন কাজ শেষে এশারের আযানের পর লাইলীর ছুটি। এতো রাতে বাচ্চা গুলো খাবারের অপেক্ষা করে করে ঘুমিয়ে পড়ে। বর্ষাকালে মেঘ বৃষ্টির তোয়াক্কা করে না সে, বৃষ্টিতে ভিজেই রওয়ানা দেয়। লাইলীর আনা ভাতই বাচ্চাদের একমাত্র ক্ষুধা নিবারণের উপায়। বর্ষাকালটিতে আনাজ পাতির বড়ই অভাব। সকাল দুপুরে বাচ্চাগুলোর মুখে ভাতের সাথে কোন তরিতরকারি দিতে পারে না। কটা চাল হয়তো ফোটায় ঠিকই, কিন্তু তরকারির অভাবে লবণ আর কয়েক ফোঁটা সর্ষের তেল মেখে গরম ভাত খাওয়ায় তাদের বুড়ি দাদি। অথচ চেয়ারম্যানের বাড়িতে সারা বছরই প্রাচুর্য্য। চাল, ডাল, আনাজ-তরকারি কোন কিছুরই অভাব নেই। অভাব শুধু হানা দেয় গরীবের ঘরেই। গরীবের সাথেই এর সখ্যতা আদ্যিকালের। অভাবের লকলকে লোভী জিহ্বার সাথে লাইলী পেরে ওঠে না। বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকালে লাইলী ন্যায় নীতির কথা ভুলে যায়। আজকাল কাউকে না বলে অল্প অল্প চাল, আনাজপাতি কাপড়ের আড়াল করে নিয়ে আসতে শুরু করেছে সে। এতে করে বিবেকের সাথে চলে সারাদিন লড়াই। এই লড়াইয়ে বিবেককে সে হারিয়ে দেয় – “কারো ঘরে অফুরন্ত খাবার, আবার কারো ঘরে খাওয়নের অভাবে মানুষ মরবে, এইটা তো হইতে পারে না”। তাই জীবন বাঁচাতে অনুমতি না নিয়ে কিছু জিনিস এদিক সেদিক করাকে সে চুরি বা অপরাধের মধ্যে গণ্য করে না। বাচ্চাদের বাঁচাতে হবে তো! এমন নিষ্পাপ চোখগুলোর দিকে তাকালে ভুলে যায় ধর্মের কথা, ভুলে যায় ন্যায় নীতির কথা, ভুলে যায় পর্দার কথা। এতগুলো প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখাই তার আসল ধর্ম। ধর্মের আচার অনুষ্ঠান পালন লাইলীর কাছে এখন বিলাসিতা মাত্র!

বছরে বছরে সন্তান জন্ম দেওয়া অপুষ্ট লাইলীর মাতৃত্বের বিরতির জন্যই হোক কিংবা তিন বেলা পেট পুরে খাওয়ার জন্যই হোক গায়ে কিছুটা মাংস লেগেছে। যুবতী বয়সের লাবণ্য ফিরে এসেছে মুখে। ছোট ছেলের বয়স এখন নয় মাস, বিয়ের পর এতোটা লম্বা সময় খালি থাকার সুযোগ পায়নি তার ক্লান্ত জরায়ু। এতোদিন অনাহারে বুকের দুধ বুকেই শুকিয়েছে, ছেলেটা একফোঁটা দুধ খেতে পায় নি। ছটাক খানি গুড় কিনে টিউবওয়েলের পানির সাথে বোতলে ভরে ঝাঁকিয়ে বান লাগিয়ে মুখে দিয়ে রেখেছে। এই মিষ্টি পানিটুকুই ছিল ছেলেটার বাঁচার রসদ। অপুষ্টিতে এক বছরের বাচ্চাটিকে চার মাসের মতো দেখাত। আজকাল লাইলীর বুক দুটো বেশ ভারী ভারী ঠেকে। একদিন কাজ করতে করতে আবিষ্কার করে তার ব্লাউজ ভিজে উঠেছে। হাত দিয়ে দেখে দুধের ধারা। তা দেখে একমুহূর্ত দেরী করেনি সে। দৌড়ে বাড়িতে গিয়ে অপুষ্ট ছেলের মুখে গুঁজে দিয়েছে হঠাৎ করে সতেজ হয়ে উঠা রসে ভরপুর মাই।

লাইলী আবিষ্কার করে তার দিকে আজকাল কতগুলো চোখ কারণে অকারণেই যেন ছায়া ফেলে। মেঘের ছায়া যেমন ঘরবাড়ির ওপর দিয়ে দৌড়ে চলে যায় মুহূর্তেই, তেমন করেই বাড়ির কামলারাও যেন বিনা কারণেই ভেতর বাড়িতে আসা যাওয়ার পথে একদুবার দৃষ্টি বুলিয়ে যায়। মসজিদের মোয়াজ্জেম হুজুরও আজকাল বাচ্চাদের খোঁজ খবর নিচ্ছে। চেয়ারম্যানের সামনে কথা বলতে লাইলী এখন অস্বস্তি বোধ করে, কেননা তার দৃষ্টি আর লাইলীর লম্বা ঘোমটা দেওয়া মুখে সীমাবদ্ধ থাকে না। সে দৃষ্টি পিছলে পিছলে নিচে নামতে থাকে। কখনো ঠোঁটে, কখনো বুকে, কখনো বা শাড়িতে আবৃত নাভীমূলে। কাপড় ভেদ করে চেয়ারম্যানের দৃষ্টি লাইলীর শরীর নিয়ে খেলা করে তার সবই লাইলী বুঝে। অভাব অনেক কিছুই কেড়ে নিয়েছে। পর্দা, ন্যায় নীতি, ধর্মকর্ম। কিন্তু আঁকড়ে ধরে রেখেছে নিজের সতীত্ব। এ কিছুতেই বিসর্জন দিতে পারবে না সে। তাই দ্রুত চেয়ারম্যানের দৃষ্টির আড়াল হতে পারলেই যেন বাঁচে।

অভাবই মানুষকে নিজের চাহিদা যোগাতে রাস্তা শিখিয়ে দেয়। নিজের এই আকাশ পাতাল পরিবর্তনে নিজেই অবাক। লাইলী শিখে গেছে কী করে ইনিয়ে বিনিয়ে বাড়ির মালকিনদের কাছ থেকে নিজের প্রয়োজনীয় সব আদায় করে নিতে হয়। ও বাড়িতে নিজে তিন বেলা পেট পুরে খাওয়ার সময় গলা দিয়ে ভাত নামতে চায় না। বাচ্চাদের মুখগুলো চোখে ভেসে ওঠে। সন্ধ্যা থকেই লাইলী ভাবছে রোজ রোজ পটিয়ে, একটু আধটু না বলে কত আর নেওয়া যায়? একদিন একটু বেশি করে চাল নিলে কয়েকদিন নিশ্চিন্ত। মহিলারা যখন টিভি দেখতে বসবে, তখনই কামডা সারতে হইব। বেশি করে চাল ভরে নেবে কাপড়ের তৈরি খৈলতায়। তিন চারদিন বাচ্চাগুলো যেন পেট পুরে ভাত খেতে পারে। যেমন ভাবা তেমন কাজ।

অমাবস্যার রাত, ঘুট ঘুটে অন্ধকার। মাগরিবের আযানের পর বিবিসাহেবরা সব পানের ডিব্বা নিয়ে টিভির সামনে বসেছে জি-বাংলা’র নাটক দেখতে। এমন নেশা ধরানো নাটকে ভূমিকম্প হয়ে গেলেও নড়বে না। বাড়ির কামলা কোমলারাও আজ তিন মাথার মোড়ে গেছে টিভি দেখতে। আজ কিরকেট খেলা চলবে। আমাদের দেশ নাকি শাদা চামড়াদের সাথে জিততে পারে। সকাল থেকেই সবার মুখে শুনে আসছে সম্ভাব্য এই বিজয়ের কথা। খেলা শুরু হতে সকলেই খেলা নিয়ে ব্যস্ত। লাইলীর সেই খবর নিয়ে কাজ নেই। দেশ, দুনিয়া রসাতলে যাক, তার একমাত্র চিন্তা বাচ্চাদের উদরপূর্তি। আনন্দ তার কাছে কেবলমাত্র বাচ্চাদের সামনে এক থালা ভাত।

কোমরে ভাঁজ করে আনা কাপড়ের খৈলতায় চাল ভরে সুতলি দিয়ে মুখ বেঁধে মাথায় নিয়ে বাড়ির পেছনের রাস্তা দিয়ে বেরুনের সময় মুখোমুখি হয়ে গেলো চেয়ারম্যান সাহেবের। লাইলী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চেয়ারম্যানের পায়ে পড়ে যায় “আমারে মাফ কইরা দিন ছেরমেন ছাব, আমি আর ইমুন কাম করুম না। আমারে মাফ কইরা দিন। বাচ্চাগুলোর মুখের দিকে আর চাইতে পারি না সাব”। চেয়ারম্যানের বড় দয়ার শরীর। সে পা থেকে লাইলীকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে “অত ডরাস ক্যান? আমি আছি না। আমি হগলই বুঝি। ল, তরে আগাই দিই”।

আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে লাইলী চেয়ারম্যানের কথায় আর না করতে পারে না। ভরসা পেয়ে চেয়ারম্যানের সাথে এগিয়ে যায়। বাড়ির পিছনের দিকে জংলার কাছে এনে লাইলীকে বাঁচার রাস্তা দেখিয়ে দেয় চেয়ারম্যান সাহেব। “আমার কথা শুনলে তোর কোন অভাব নাই। তোরা খুরি-বউ দুই জনার জন্যই দুইডা রেশন কার্ড কইরা দিমু। পাড়ার স্কুলে দপ্তরির কামে লাগাইয়া দিমু তুরে। আমার লাইলীরে রাজরানী কইরা রাখুম। খালি এই মজনুর দিকে একটু নজর দিস”। কথা বলতে বলতে লাইলীকে জড়িয়ে ধরে তপ্ত নিঃশ্বাসে পুড়িয়ে দিতে লাগলো। ধরা না দিয়ে আর কোন উপায় নেই! চুরির দায়ে বাড়ি থেকে বের করে দিলে মরণ ছাড়া কোন গতি নেই লাইলীর। চারদিকের পথ বন্ধ।

কতক্ষণ জঙ্গলার মধ্যে ছিলো তারা, দুজনের কারোরই খেয়াল ছিলো না। খেয়াল হলো রাস্তার ধার থেকে ভেসে আসা বিকট চিৎকারে “জিত্তা গেছি রে! জিত্তা গেছি”। দেশ জিতে গেছে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট টিমের সাথে, ক্রিকেটে বিশ্ব শাসন করা পরাশক্তির সাথে, দেশের এক বিরাট অর্জন। খেলা শেষে অনেক ক্রিকেটপ্রেমির চোখেই আনন্দাশ্রু ঝরছে। লাইলীর দু’চোখ বেয়েও অঝোর ধারায় ঝরছে চোখের পানি। সে পানি অর্জনের নয়, বিসর্জনের। দেশের সোনার ছেলেরা যখন দেশের বিরাট অর্জনে ব্যস্ত, লাইলী তখন সব হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব।

চেয়ারম্যান সাহেবের সত্যিই দয়ার শরীর। বউ শাশুড়ি দুইজনের নামেই দুইটা রেশন কার্ড করে দিয়েছে। চাল, গম, বিস্কুট, আটা সবই পায় নিয়ম করে। গ্রামের হাইস্কুলে লাইলী এখন দপ্তরি। চেয়ারম্যান সাহেব কথা রেখেছেন, তার অনুগ্রহে লাইলীর সন্তানগুলো তিনবেলা খাবার খেতে পায় পেট পুরে। বিনিময়ে শুধু চেয়ারম্যান সাহেবের ইচ্ছার মূল্য দিতে হয় সময়ে সময়ে। লাইলীর শাশুড়ি সব দেখে, সব বুঝে কিন্তু বউকে দোষ দিতে পারে না, সব দোষ নিয়তিকেই দেয়। ক্ষিধার জ্বালা বড় জ্বালা, ক্ষিধার জ্বালা পুত্র শোকও ভুলিয়ে দেয়।

আজকাল স্বাস্থ্যকর্মী আপার আনাগোনা দেখা যায় এই বাড়িতে। লাইলী বড় যত্ন করে ঘরে বসায়। ওষুধ শেষ হলে আপাকে খবর দিয়ে আনে। এতো সতর্কতার মাঝেও বড় ধরনের বিপদে পড়ে যায় লাইলী। একেই বলে চোরের দশ দিন আর গৃহস্থের এক দিন। একদিন ঠিকই ধরা পড়ে গেল লাইলী। তবে মানুষের কাছে নয়, প্রকৃতির বিচারের কাছে। খেতে বসে অরুচি। দিনে দিনে খোলতাই হচ্ছে লাইলীর রূপ। এই লক্ষণ লাইলীরও বড় চেনা। অতীতে এই লক্ষণ দেখেছে বহুবার। শাশুড়ির চোখকে ফাঁকি দিতে পারে না। শাশুড়ির কলিজা কাঁপে অজানা ভয়ে। এইদিকে চেয়ারম্যান সাহেব গিয়েছেন ঢাকায়। নির্বাচনী কাজে খুব ব্যস্ত। যখন বাড়ি আসে চারদিকে মানুষের জন্য কিছু বলার সুযোগ পায় না। অবশেষে বাধ্য হয়ে সেই প্রথমবার দেখা করার মতো ভেতরের তাগাদা নিয়ে আবার দাঁড়ালো চেয়ারম্যানের সামনে। ঘটনা শুনে চেয়ারম্যানের পায়ের তলার মাটি দু’ফাঁক হয়ে যায়। দুই তিন রাত্রি জেগেও কোন সমাধান বের করতে পারেনি। অবশেষে মোয়াজ্জেম আবুল বাশারের শরণাপন্ন হন লিয়াকত চেয়ারম্যান। দেশে ছেলেমেয়ে, সংসার থাকা সত্ত্বেও চেয়ারম্যানের অনুরোধ ঠেলে দিতে পারে না সে। কোন এক জুম্মা বার দেখে চেয়ারম্যান নিজে উপস্থিত থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দেনমোহর ধরে মোয়াজ্জেম আবুল বাশার ও লাইলী বেগমের বিয়ে পড়িয়ে দেন। মোয়াজ্জেমকে কিছু স্থাবর সম্পত্তিও দান করে আজীবন মসজিদের মোয়াজ্জেম পদে বসিয়ে দেন।

শেষ রাতে আযানের সুর শুনে বুড়ি শাশুড়ির ঘুম ভেঙে যায়। বুড়ি কাঁথার ওম ছেড়ে উঠে অযু করে, ফজরের নামাযের জন্য তৈরি হয়, বউকেও ডাকে নামায পড়তে। শাশুড়ির ডাক শুনে আজ আর লাইলী প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। বহুদিন পর ওযু করে নামাযে দাঁড়ায়। পরম সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে এসে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারে না, হু হু করে কেঁদে ওঠে। যেন প্রিয়জনের সাথে লম্বা বিরহের পর মিলিত হয়েছে। পেটে হাত দিয়ে পরখ করে পাপের চিহ্ন। কান্নার দমক আস্তে আস্তে বাড়তেই থাকে। দূর থেকে শুনলে মনে হবে কেউ যেন করুণ সুরে কোরআন পড়ছে। বুক ফাঁটা কান্না শুনে বউকে প্রবোধ দেবে সে ভাষা সে খুঁজে পায় না শাশুড়ি। বুড়ির বুকটাও হু হু করে উঠে সব হারানোর কষ্টে। নির্জন ভোরে অসহায় দুই নারীর বুক ফাটা কান্না ভারী করে তোলে নির্মল বাতাস।

ফজরের আযান শেষে ঈমাম আবুল বাশারও বরাবরের মতই ডেকে ওঠে “ছেরম্যান সাব, অ ছেরম্যান সাব উইঠ্যা পড়ুন যে, আর তো সময় নাই। অ ছেরম্যান সাব…”

সানিয়া আজাদ। গল্পকার।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..