ধর্ষক

শেলী সেনগুপ্তা
ছোটগল্প
Bengali
ধর্ষক

আজকাল মাতবর বাড়ির দীঘিতে স্নান করে রামী। পরনের কাপড়টা হাঁটু পর্যন্ত তুলে ঘষে ঘষে পা পরিষ্কার করে। জালের ছেঁড়া টুকরো দিয়ে যখন পা ঘষে তখন যেন আকাশটাও লজ্জা পায়, লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে। ধবধবে সাদা ইলিশের পেটের মতো পা দেখতে দেখতে মাতবর বাড়ির অনেক পুরুষও ঢোক গেলে। রামী ৫৭০ সাবান দিয়ে ফেনা তুলে তুলে গলা ঘাড়। ব্লাউজের দু’একটা হুক খুলে বুকের খানিকটা ঘষে নেয়। তারপর পুকুরে নেমে ঝুপ ঝুপ করে ডুব দেয়। দু’একটা ডুব দিতেই রামীর খোঁপাটা খুলে জলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যেকটা ডুবের সাথে সাথে চুলগুলো দুরন্ত সাপের মতো দীঘির জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে যেন পালিয়ে যেতে চায়। পারে না, রামীর কাঠিন্যের কাছে হার মেনে ফিরে আসে।

প্রতিদিন বেশ সকালে রামী স্নান করে। বেশ সময় নিয়েই স্নান করে। সকালে হাঁটতে বের হওয়া লোকগুলো দিঘীর পাড় দিয়ে যাওয়ার সময় হোঁচট খায়, হোঁচট খেতে খেতে হাঁটে, হাঁটতে হাঁটতে ফিরে দেখে।

রামীর এই স্নান-কাহিনি ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। ভোরবেলা দিঘীর পাড়ে লোকজনের আনাগোনাও বেড়ে গেছে।

কথাটা ক্রমে ক্রমে কলিম মাতবরের মা হানুফা বিবির কানেও গেছে। মেয়েটাকে অনেক স্নেহ করেন তিনি। কিন্তু নানাজনের নানা কথা শুনে শুনে হনুফা বিবি ওর ওপর খুব বিরক্ত। ভাবছেন একদিন ডেকে আচ্ছামতো বকে দেবেন।

রামীর বাড়ি মাতবর বাড়ির কাছেই। ছোটবেলা থেকে রামীকে চিনতেন হনুফা বিবি। বলতে গেলে মেয়েটা চোখের সামনেই বড় হয়েছে। রামীর বাবা দীনেশ কৈবর্ত ফি বছর সমুদ্রে মাছ মারতে যেতো। যাওয়ার সময় হনুফাবিবির পা ছুঁয়ে আশির্বাদ নিয়ে যেতো। বলতো,

– কর্তা মা, আমার মাইয়াডারে দেইখেন, শাসন কইরেন, মা মরা মাইয়া, আপনাগো হাওলায় রাইখা গেলাম।

– দেখুম নে, দীনুরে তোরে কত কইলাম , আরেকডা বিয়া কর, মাইয়াডারে দেইখা রাখবো, হুনলি না। মাইয়া বড় অইলে মা’র শাসন লাগে, কথাডা বুঝস না?

– কর্তা মা, হাতাই মা কি কুনদিন মা অয়? আপনেরা আছেন, আমার চিন্তা কি, মাইয়াডারে আপনের পাউত রাইখা গেলাম।

– আইচ্ছা যা, চিন্তা করিস না এইবার আইসা কইলাম বিয়া করবি। মাইডারে মা আইনা দিবি।

রামীর জন্য মা তো আনা হলোই না, দীনেশ কৈবর্তও ফিরে এলো না। সমুদ্রে একটা বড় ঝড় উঠলো। ওদের নৌকাটা ঝড়ে ডুবে গেলো। বারো জন জেলে-মাঝি-মাল্লার মধ্যে দু’জন ফিরে এলো। তাও অনেকদিন পর। সবাই জানলো এ গ্রামের দীনেশ কৈবর্ত সমুদ্রে হারিয়ে গেছে, যেভাবে হারিয়েছিলো দীনেশ কৈবর্ত’র বাবা পরেশ কৈবর্ত।

বাবাহারা রামীর ঠাঁই হলো মাতবর বাড়িতে। মাঝে মাঝে নিজের বাড়িতে এসে থাকতো। সবার আদরে শাসনে বেড়ে উঠছিলো কিন্তু সবার থেকে একেবারে ভিন্নভাবেই।

দিনে দিনে পদ্মফুলের মতো প্রস্ফুটিত হচ্ছিলো রামী। দেখতে দেখতে বদলেও যাচ্ছিলো। সবসময় চড়া স্বরে কথা বলে। পান খেয়ে ঠোঁটদু’টো লাল করে। পরনের কাপড় ওকে যতটুকু আড়াল করে, তার চেয়ে বেশি বিকশিত করে যেন।

রামীর এই স্নানপর্ব নিয়ে গ্রামে রীতিমতো আলোচনার ঝড় বয়। হাটবারে চায়ের দোকানে বেশ রসিয়ে রসিয়ে গল্প চলে। রামী এখন উঠতি বয়সের ছেলেদের রাতের কল্পনার সাথী হলো, ক্রমে ক্রমে বাড়ির বউঝিদের মুখরোচক আলোচনার বিষয়ও হয়ে উঠলো। বৃদ্ধরা ওর কথা বলতে গেলে আগে মনের সুখে গালি দিয়ে নেয়।

এক শুক্রবারে নামাজের পর মসজিদে বৈঠক বসলো, বিষয় রামীর বেলেল্লাপনা। সিদ্ধান্ত হলো মেয়েটাকে শাসন করতে হবে। সবাই একসাথে কলিম মাতবরের সাথে দেখা করে বলে রামীর এ বেলাল্লাপনার জন্য গ্রামের উঠতি ছেলেরা উচ্ছন্নে যাচ্ছে। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। তিনি সবাইকে আশ্বস্ত করলেন, বললেন,

– রামীরে তো আমি ছোডবেলা তন চিনি, আমাগোডা খাইয়াপইরা বড় অইছে। দেহুমনে, যেইডা কইতে অয় আমি কমুনে। আপনেরা অহন যান।

আজও রামী মাতবর বাড়ির পুকুরে স্নান করছিলো। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে গা ঘষছে। হাঁটুর ওপরে কাপড় তুলে পায়ের ডিম ঘষছে। পিঠ ঘষছে আঁচল সরিয়ে।

পুকুরের পাড় দিয়ে যাচ্ছিলো মাতবর কলিম শাহ। পুকুর ঘাটের দিকের তাকিয়ে রামীকে দেখলেন। দাঁড়িয়ে পড়লেন, মাতবরের দেখাদেখি আরো অনেকেই জড়ো হলো সেখানে, অপেক্ষা করছে তিনি রামীকে কি বলেন তা শোনার জন্য।

– রামী, তুই কি করতাছস?

মুখে সাবান ঘষে জলের ঝাপটা দিয়ে ধুয়ে নিচ্ছিলো। ডাক শুনে চোখ মুছতে মুছতে বললো,

– কে ডাহে? দেহেন না কি করতাছি, চক্ষের মাথা খাইছেন নি?

বলতে বলতে মুখ তুলে দেখে জিব কাটলো,

– অ, বড় মাতবর সাব , আপনে ? আমি মনে করলাম কেডা না কেডা।

– তুই এমন উদাম অইয়া পুস্কুনিত গোসল করস, এইডা কি ঠিক?

– ক্যান , কি অইছে?

– অই ছেমড়ি, আবার জিগাস কি অইছে? এরুম খোলামেলা গোসল করনডা ঠিক অইলো?

– সমইস্যাডা কি হেইডা কইবেন তো। হেইডা না কইয়া খালি ফেচর ফেচর করতাছেন।

– এত্তোগুলান মানুষ এইহান দিয়া যাওয়াআসা করে, আর তুই এইহানে এমুন কইরা গোসল করস। তরে যে মাইনসে দেহে শরম করে না ? বেতমিজ মাইয়ামানুষ কোনহানকার।

– বালা কইছেন মাতবর সাব। শরম তো করনের কথা। আমারে মানইষে দেইকলেই তো শরম করনের কথা।

– কি কস ছেমড়ি, আমরা মানুষ না, এত্তোজন যে এইহানে খাড়াইয়া আছে, এরা কি মানুষ না?

– না, আমি তো মানুষ দেহি না, একডাও মানুষ দেহি না।

মাতবর সাহেব গর্জে উঠলো,

– কি দেহস, ক ছেমড়ি ক কি দেহস?

– আমার চাইরপাশে আমি মানুষ দেহি না, ধর্ষক দেহি, হুদাই ধর্ষক দেহি, মানুষ তো দেহি না? আমনে দেহেন মানুষ?

বলেই সাপের ফনার মতো চুলের গোছা পেছনে ফেলে সবার বিস্ফোরিত চোখের সামনে দিয়ে দিঘীর কোমর জলে নেমে গেলো।

শেলী সেনগুপ্তা। কবি, গল্পকার ও শিশু সাহিত্যিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পর পেশাগত জীবনে কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। বর্তমানে অবসর গ্রহণ করে লেখালিখি ও সংসার দেখাশুনা করে সময় কাটান। শেলী সেনগুপ্তা তার ভাবনায় ও রচনায় কাব্য...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

প্রাণপাখির খাঁচা ও মধুর মুক্তি

প্রাণপাখির খাঁচা ও মধুর মুক্তি

  চান্ডুলি গ্রামের মধু লরির ড্রাইভার।মধু বলছে মালিকের মাল লরি করে চলে যায় ত্রিপুরা,ঝাড়খন্ড,বিহার,উত্তরপ্রদেশ,পাঞ্জাব পর্যন্ত।…..