ধর্ষণের মূহুর্তে ‘ধর্ষিতার মৌনতা‘ মানেই সম্মতির লক্ষণ নয়

অর্পিতা রায়চৌধুরী
নারী, পডকাস্ট, প্রবন্ধ
Bengali
ধর্ষণের মূহুর্তে ‘ধর্ষিতার মৌনতা‘ মানেই সম্মতির লক্ষণ নয়

যৌন নিগ্রহ বা ধর্ষণের মতো ঘটনার সম্মুখীন না হওয়া কারোর কাছে যদি জানতে চাওয়া হয় ‘কখনো এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করলে সে তৎক্ষনাৎ কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে?’।

এক্ষেত্রে হয়তো যে কোনো মানুষেরই উত্তর হবে, আত্মরক্ষার্থে সে বা তারা সেই যৌন শিকারীর বিরুদ্ধে লড়াই করবে অথবা সে স্থান থেকে পলায়নের চেষ্টা করবে। কারণ আপাতদৃষ্টিতে ধর্ষণের সময় প্রতিরোধ গড়ে তোলাকেই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া মনে করা হয়। কিন্তু আদতে কি সকলক্ষেত্রে নির্যাতকের বিরুদ্ধে নির্যাতিতার প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব? ‘কেউ যৌন শিকারীর দ্বারা আক্রান্ত হলে নিজেকে রক্ষার্থে সর্বোচ্চ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে, অন্যথায় বুঝে নিতে হবে যে; সেখানে নির্যাতিতারও পরোক্ষ সম্মতি ছিল’ আমাদের সকলের মাঝে এইযে একটা বদ্ধমূল বিশ্বাস, বাস্তবে সকলক্ষেত্রে এরকমটা না হয়ে কখনো কখনো সম্পূর্ণভাবে বিপরীতও হতে পারে।

এই লেখাটির অডিও শুনুন এখানে:

প্রাণীর নিজের শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার যে সহজাত প্রবৃত্তি, ক্ষেত্রবিশেষে কিছু প্রাণীর মস্তিষ্ক সেই প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে গিয়ে প্রতিকূল অবস্থায় শরীরের কার্যক্ষমতা বন্ধ করে দিতে পারে। মাত্রাতিরিক্ত, আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত ভয় কিংবা মানসিক চাপের কারণে মস্তিষ্ক সাময়িক সময়ের জন্য বিকল হয়ে শরীরে ক্ষণস্থায়ী পক্ষাঘাত বা সাময়িক অসাড়তার সৃষ্টি হয়। ভয় থেকে প্রাণীর শরীরে সৃষ্ট এই অস্থায়ী অসাড়তা বা সাময়িক সময়ের জন্য কোমায় চলে যাওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘টনিক ইমোবিলিটি’ (Tonic Immobility) বা সংক্ষেপে TI বলা হয়।

অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে এই প্রতিক্রিয়াকে কখনো ‘ডেড প্লে’ বা নিতান্তই একটি ‘সাধারণ প্রাকৃতিক অবস্থা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে, যা শিকারীর আক্রমণে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বিবর্তনীয় অভিযোজিত আত্মরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রাণীর মধ্যে উপস্থিত। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রতিরোধ গড়ে তোলা বা পলায়ন অসম্ভব হয়ে পড়লে প্রাণীর মস্তিষ্ক TI এর দ্বারা আক্রান্ত হয়। কেননা, অধিকাংশ শিকারী প্রাণী মৃতের চেয়ে জীবন্ত শিকারই বেশি পছন্দ করে। এর ফলে আক্রান্ত প্রাণীর সামনে উক্ত প্রতিকূল অবস্থায় নিজেকে টিকিয়ে রাখার একটা সুযোগ তৈরি হয়।

চিত্র: রিয়া দাস

বিজ্ঞানীরা শুরুতে TI এর লক্ষণ কতিপয় বিভিন্ন প্রাণীর (বিভিন্ন প্রজাতির হাঙ্গর, কুকুর,খরগোস, কুমীর ইত্যাদি) মাঝে আবিষ্কার করলেও পরবর্তীতে গবেষণায় উঠে আসে অন্যান্য প্রাণীর অনুরূপ চরম হুমকির মুখোমুখি অবস্থায়- যেমন, শারীরিক নির্যাতন, আক্রমণ বা আগ্রাসন, গুরুতর দূর্ঘটনা, গুরুতর আঘাত বা কাছের মানুষের আকস্মিক মৃত্যু সংবাদে মানুষের মস্তিষ্কও এর দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে।

কিন্তু আশংকার বিষয় হচ্ছে, বিশেষ করে ধর্ষণের সময় নারীরা এই অনাকাঙ্খিত ঘটনা ও অঙ্গসঞ্চালনে সাময়িক প্রতিবন্ধকতার দ্বারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। যৌন শিকারীর দ্বারা আক্রান্ত কোন নারী মাত্রাতিরিক্ত ভয়ের কারণে টনিক ইমোবিলিটির দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে যার ফলে সেসময় সে নারীর শরীর আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে অসাড় হয়ে পড়তে পারে, এমনকী সেসময় একজন আক্রান্ত নারী কথা বলা, পলায়নের চেষ্টা করা বা সাহায্যের জন্য চিৎকার করার মতো অবস্থাতে নাও থাকতে পারে। এক্ষেত্রে নির্যাতিতা তার সাথে কী নৃশংস ঘটনা ঘটছে সে সবকিছু বুঝতে পারলেও মস্তিস্ক ও শরীরের বিরূপ আচরণের কারণে তার কাছে তখন প্রতিরোধের কোনো উপায় থাকে না। এবং শরীর ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতিরোধ করা বন্ধ রাখতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত না মস্তিষ্কের ভয় কেটে যায়।

সুইডেনের একদল গবেষকের গবেষণায় এমনটাই উঠে এসেছিল। স্টকহোমের ‘রেপ ক্রাইসিস সেন্টার’-এ এক মাসের মধ্যে চিকিৎসা নিতে আসা ধর্ষণের শিকার ২৯৮ জন নারীর মধ্যে টনিক ইমোবিলিটির মাত্রা মূল্যায়ন করা হয়।

গবেষণার নেতৃত্বে থাকা লেখক ড. আন্না ম্যুলার[1] ও তার সহকর্মীরা টনিক ইমোবিলিটি স্কেল নামে একটি প্রশ্নমালা ব্যবহার করে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের সাক্ষাৎকার নেন, যে স্কেলে শরীর সম্পূর্ণভাবে জমে যাওয়া বা অচল হয়ে যাওয়া; নড়াচড়ায় অসক্ষমতা; কথা বলা বা চিৎকার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা; অসাড়তা; ঠাণ্ডা অনুভব করা; নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার অনুভূতি হওয়াসহ আরও কয়েকধাপে নির্যাতনের শিকার নারীদের কাছে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়।

এই গবেষণায় উঠে আসে, তাদের মধ্যে ৭০ শতাংশ মহিলা এমন ছিল যারা নিগ্রহের মুহূর্তে নড়াচড়া করতে পারে নি। ৪৮ শতাংশ নারীর শরীর একেবারেই নড়াচড়া করা বন্ধ করে দিয়েছিল এবং ১৮৯ জন নারীই নির্যাতন পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে দুর্ঘটনা পরবর্তী মানসিক বৈকল্য (Post‐Traumatic Stress Disorder বা PTSD) ও অবসাদে আক্রান্ত হয়েছিল। যাদের মধ্যে ২২ শতাংশ মহিলা চূড়ান্ত অবসাদে চলে যায়, যেখান থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা মুশকিল।

এই গবেষণায় এটাও উঠে আসে, টনিক ইমোবিলিটির দ্বারা আক্রান্ত নারীদের দূর্ঘটনা পরবর্তী মানসিক বৈকল্য বা PTSD, গুরুতর অবসাদ ও অন্যান্য মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা, এর দ্বারা আক্রান্ত না হওয়া নারীদের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। যৌন নির্যাতন ছয়ভাবে একজন নারীর স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে থাকে যা একজন নির্যাতিতার নির্যাতন পরবর্তী বিভিন্ন মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সাথে টনিক ইমোবিলিটির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে।

ধর্ষণের সময় টনিক ইমোবিলিটির মতো অনৈচ্ছিক পক্ষাঘাত একটি সাধারণ শারীরিক প্রতিক্রিয়া হলেও একে এখনো উপেক্ষিত রাখা রয়েছে। বিশেষত, আইনি কার্যক্রমের সময় এর দ্বারা আক্রান্ত নির্যাতিতা নারীর নিজের স্বপক্ষে পোক্ত যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করাটাও কোন কোন ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিচার ব্যবস্থা ও সাধারণ জনগণের মধ্যে টনিক ইমোবিলিটি সম্পর্কে সচেতনতার অভাবের সুযোগ নিয়ে আইনের ফাঁক গলে অনেক সময়ই অপরাধীরা পার পেয়ে যায় এবং একজন নির্যাতিতাকেই প্রতিবাদ না করার কারণে উল্টো দোষারোপ করা হয়। এমনকী অনেক নির্যাতিতাও তার এই দ্বিমুখী আচরণ নিয়ে সংশয়ে ভোগে এবং ধর্ষকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারার কারণে উক্ত ঘটনার জন্য নিজেদেরকেই দোষী ও দায়ী মনে করে।

আন্না ম্যুলারের মতে, এক্ষেত্রে উক্ত নারীকে বুঝাতে হবে যে এটা সম্পূর্ণই তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। সে নিজে এটা বেছে নেয় নি। আর এর জন্য যথাযথ শিক্ষার প্রয়োজন, যা উক্ত আচরণকে ব্যাখ্যার মাধ্যমে একজন নির্যাতিতার লজ্জা ও অপরাধবোধ কমিয়ে আনতে সহায়ক হবে।

২০০৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীদের মধ্যে ৫২ শতাংশ নারী এই পক্ষাঘাতের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল[2]। জেনিফার য়ং[3] বলেন,

“একজন আক্রান্ত নারী হয়তো আক্রমণের কিছু সময়ের মধ্যে জমে যেতে পারে, নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন অথবা অসাড় হয়ে পড়তে পারে কিন্তু প্রাথমিক অবস্থায় মৌখিক বা শারীরিকভাবে তার আক্রমণকারীকে প্রতিহত করার চেষ্টা করতে পারে”।

তাই‚ ‘মৌনতা সম্মতির লক্ষণ‘ বা ধর্ষণের সময় নির্যাতিতা নারী প্রতিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ না হওয়ার মানে এই নয়, যে সে একজন যৌন শিকারীকে তাকে ধর্ষণ করার সম্মতি প্রদান করে। আমাদের বুঝতে হবে, যে এটা একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ামাত্র। এক্ষেত্রে একজন নির্যাতিতাকে কোনভাবেই উক্ত ঘটনার জন্য দায়ী করা সমীচিন নয়। বরং একজন ধর্ষক যেন এক্ষেত্রে আইনের অপব্যবহার করে নিজের কৃত অপরাধ থেকে রেহাই পেতে না পারে, সেদিকে দেশের আইন ও বিচারকাঠামো প্রণেতাদের কঠোরভাবে নজর দেওয়া ও আরও সচেতন ভূমিকা পালন করা উচিত।

==============

রেফারেন্স ও টীকা:

Acta Obstetricia et Gynecologica Scandinavica, online June 7, 2017.

[1] Anna Möllar, Gynecologist; Stockholm South General Hospital and the Karolinska Institute.

[2] Behaviour Research and Therapy, September 2005

[3] Jennifer S. Wong; Simon Fraser University in Vancouver, school of Criminology.

অর্পিতা রায়চৌধুরী (জন্ম ১৯৯৫- মৃত্যু ২০১৮)। জার্মানি প্রবাসী নির্বাসিত লেখক, সেক্যুলার ব্লগার ও মানবাধিকার কর্মী। তিনি ছিলেন অংশুমালীর ইউরোপ চ্যাপ্টারের সম্পাদক। অর্পিতা রায়চৌধুরী বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষাসহ বহুভাষিক মাসিক সাহিত্যপত্র (অন্তর্জালে) অংশুমালীর অন্যতম পরিকল্পক। তাঁর অনুপ্রেরণা ও কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বের বাঙালি...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ