নতুন শহরের গল্প

এ কে এম আব্দুল্লাহ
কবিতা
Bengali
নতুন শহরের গল্প

নতুন শহরের গল্প

এই নাও হাত। ধরো। এবার চলো হাঁটি। পানের-পিক ফেলা দেয়ালটা অতিক্রম করলেই— নতুন শহর। জোনাকির ডানা থেকে ঝরে পড়া সোডিয়াম আলোয় ভিজে, আমাদের কিছুক্ষণ চুমো’র গন্ধ মাখা গলি-ঘুপচি দিয়ে হাঁটতে হবে। আর আমাদের সাথে ছায়াবেশে আসতে পারে— কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু সংবাদ।

মাঝেমধ্যে ঘামভেজা দরজার ফাঁকে শোনবে— চুড়ি আর বিচিত্র হাসির ব্যাকুল ধ্বনি। ফুটপাতে পাতা অসংখ্য সংসারগুলোর মতো,নতুন শহরে পাবে অসংখ্য রঙিন শামিয়ানা টাঙানো সংসার। আর সেখানে প্রদর্শিত হবে হিমোগ্লোবিনের ঘনত্ব। আধুনিকতার ডিজিটালস্ক্রিনে দেখবে ফ্যাশনশো, টকশো এবং নতুন শহর গড়ার মার্জিতকাহিনী।

আমি নতুন শহরের বারান্দায় বসে, তোমাকে রাতভর শোনাবো; শহরের চিকামারা-দেয়ালের দীর্ঘশ্বাসের আতঙ্কিত আত্মকথা।

 

জনম

আকাশের খোঁপার ফাঁক দিয়ে নেমে এলে
দুফোঁটা রোদ— পথ খোঁজে পায় তার গন্তব্য।
আর পৃথিবী খোলে রাখে তার আদি দুটো চোখ।
অ্যামাজনের গহীন ছায়ায়— জলজলিলির নিরবতা ভেঙে কেউ বাগাড় দেয় বিদঘুটে অন্ধকার। আমার দেহে পাখির মত ডানা গজায়। আমার পা দুটো নীল হয়ে যায়। আমি বেদনার্ত দেহ নিয়ে— ক্লান্ত ডানায় ভর করে করে ওড়তে থাকি। আর ডানা ভেঙে ভেঙে— ডানা ভেঙে ভেঙে— ঝরে ঝরে পড়তে থাকে আমার একেকটি জনম।

অতপর, কামরূপ কামাক্ষ্যার আকাশ ছিন্ন করে— হাড্ডিগুলো উড়তে থাকে বরফের দেশে।

 

জলায়িত সুবাস

প্রিপারেশন নিতে না নিতেই ডুবে যাচ্ছে চোখ। আর নামহীন যে ঝড় বয়ে গেলো কাল। তার তান্ডবে ছিঁড়ে যাওয়া কারেন্টের তারে— যে গাভীটির মৃত্যু হলো, তার পাশ দিয়েই ভেসে যাচ্ছে সুবাসিত ফুল— হিযলের পাপড়ি।

এখন মৃত গাভী— ডুবে যাওয়া খেত— আর সুবাসিত হিযল কম্বিনেশনটা ভাবতে ভাবতে মাথাটা ঘুরছে জলকুন্ডলীর ভেতর ছোট ডিঙির মত।

আর আকাশ থেকে টিনের চালে ঝরে পড়া বৃষ্টির ছন্দে— রবি ঠাকুরের বৃষ্টির গান নেমে এলে ঘরে; অকস্মাৎ ঝড়ের ধাক্কায় ভেঙে যাওয়া সুপারিগাছ— জানালার র্কাচ চূর্ণ করে ঢুকে পড়ে বিছানায়। ঝড়ের ঝাপটায় আঙুল বেয়ে নেমে আসে রক্ত। ভেতরে ভেতরে শুনতে পাই কৃষকের— হাড় ভাঙচুরের শব্দ।

এভাবে আমরা বর্ষার চরিত্র ভেঙে যখন ঢুকে পড়ি হেডলাইন-রং পোশাকের ভেতর; ডুবে যাওয়া সড়কের পাশে কেউ টাঙিয়ে দেয় বিজ্ঞাপনী ভঙ্গিতে। আর কেউ গেঁথে রাখে কবিতার পাতায়।

 

বিগত পাপড়ি

জানালার মেহগনিকাঠের ফ্রেম ভেঙে নেমে এলে— নতুন ভোরের গন্ধ; সংবাদপত্রের মৃত হেডলাইন জীবিত হয়ে ওঠে। আর শিমুলের ডালে চেয়ে থাকে সদ্য ঘুমভাঙা দোয়েলের শিস। সন্ধ্যা ভেঙে— কোকিলের কণ্ঠে নেমে আসে ফুলের ব্যাকুলতা।

আমাকে প্যেচিয়ে রাখে যে রাতেরা— জেগে ওঠে আবার— কৃষ্ণচুড়া লাল। আর আকাশের বর্ণ হলুদ -লাল হতে থাকে। ইচ্ছে করে স্পর্শ করি সূর্যের দীর্ঘতা। দুহাত ফিরিয়ে দেয়— স্থগিত অন্ধকার।

অতপর, আমি পাশ ফিরে তাকাই। দেখি— দক্ষিণ জানালার গ্রিলে পড়ে আছে— গাঁদাফুলের কিছু বিগত পাপড়ি।

 

আঁধারবাস

অত:পর, সূর্যের বুক ফুটো হয়ে গেলে; পৃথিবী লেপটে যায় ঘন অন্ধকারে। আর অন্ধকার গুহায় এখন— অন্ধপরিদের সঙ্গে আমার বাস। রাত গভীর হলে— দরজায় এসে দাঁড়ায় অদ্ভুত পাহারাদার। আমি তার হাতে তুলে দিই জীবনের সব সঞ্চয়। আর স্বজ্ঞানে সাজাই আঁধার— আনন্দ উৎসবে।অকস্মাৎ, আমার পাশে গড়িয়ে আসে পরিদের নিথর আরাধনা। কেঁপে ওঠে বুক। ভয়ে করি চিৎকার—

এ চিৎকার; কেউ শুনতে পায় না। ফিরে আসে আমার কাছে — জীর্ণ, শীর্ণ, ক্ষীণ হয়ে। আর আমি পালাতে থাকি ভেতরে ভেতরে অন্ধকার গুহার দিকে…

 

সম্পাদনা: অয়ন্ত ইমরুল

এ কে এম আব্দুল্লাহ। লেখক। জন্ম বাংলাদেশে, বর্তমান নিবাস যুক্তরাজ্যের লন্ডন। প্রকাশিত বই: 'ক্ষুধা ও সৌন্দর্য' (উপন্যাস)। এছাড়া সম্পাদনা করেছেন অণুগল্প সঙ্কলন 'শব্দবিন্দু'। ড.শ্যাম সুন্দর মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, ভারত থেকে পেয়েছেন 'গোল্ড মেডেল এওয়ার্ড'।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ