নদী থেকে সমুদ্রে

দীলতাজ রহমান
গল্প
Bengali
নদী থেকে সমুদ্রে

আমার অতি শৈশবকালটি কেটেছে খুলনাতে। কিন্তু আমার জন্ম গোপালগঞ্জ জেলার চন্দ্রদিঘলিয়া গ্রামে। আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে খুলনা যেতে মাইল তিনেক দূরে শুকতাইলের ঘাট। ঘাট বলতে ছাউনি টাউনি কিছু ছিলো না। ছিলো না ঘাটের অন্য কোনো চিহ্নও। তবু ওই পথে যাওয়া-আসার মানুষ ওখানেই জড়ো হতো। ওখান থেকে আমরা লঞ্চে উঠতাম। নামতাম।

সকালবেলা তাজামাছের ঝোল আর গরমভাত রান্না হতো। কিন্তু আমরা ছোটরা কেউ তা খেতে পারতাম না। ছোটবেলা কোথাও যাওয়া-আসার আগে আমরা ছোটরা খেতে গেলে বমি আসতো। তাই সবাই ছোটরা সে ভাত সুযোগ বুঝে ফেলে দিতাম। আর উঠোনের হাঁস-মুরগি তা দ্রুত খেয়ে, আব্বার মার খাওয়া থেকে আমাদের উদ্ধার করতো।

সবার খাওয়া হলে শ্রেণিমতো পোটলাপুটলি হাতে নিয়ে আমরা এগোতে থাকতাম ঘাটের দিকে। আর পিছনে বাড়ির বয়স্ক মানুষেরা জড়ো হয়ে ভেজা-চোখে অনেকক্ষণ আমাদের গমনপথের দিকে চেয়ে থাকতো। আমরাও বারবার ফিরে-ফিরে তাদের দেখতাম। দেখতাম ছেড়ে যাওয়া বাড়িটি। ওটাই বোধহয় নিয়ম। হয়তো তাও নয়, জড়াজড়ি হয়ে থাকা প্রাণ তখনই কেবল বিরহের আভাস পেয়ে প্রবল কাতরভাবে জেগে উঠতো। গাছ থেকে তাজা ফুলটি ছিন্ন করলে যেমন কষ ঝরে, তেমনি তখন পিছনের সবার চোখে পানি টলটল করতে থাকতো। তবে ছোটরা পায়ে পায়ে আমাদের সঙ্গে অনেক দূর আসতো। একসময় তারা যখন ফিরে যেতো বা কোনো বাঁক থেকে ফেরার জন্য যখন ঘুরে দাঁড়িয়ে পড়তো, তখন আমাদের ছোটদের বুকও ভার হতো। কী যে মায়া লাগতো, টুটাফাটা বাড়িটি এবং লতায়-পাতায় জড়ানো সম্পর্কের ওই মানুষগুলোর জন্য। মাথা তোলা চকচকে টিনের ঘরগুলো যেন তাদের মাথাগুলো আরেকটু জাগিয়ে বলতো, আবার ফিরে এসো!

শুকতাইলের ঘাটে গিয়ে আমাদের মতো অন্যান্য গ্রাম থেকে আসা আরো যাত্রীদের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়ে যেতো। অন্য গ্রামের হলেও বড়দের-

আলাপের ধরণে বুঝতাম সবাই সবার চেনা। কখন লঞ্চ আসবে সেই আশায় উদগ্রীব থেকে বড়রা খালি-চোখের ওপর হাত রেখে রোদ আড়াল করে ঘাড় উঁচিয়ে নিরিখ করতো, লঞ্চ কত দূরে! আর আমরা ছোটরা নদীর ক‚লে ছুটোছুটি করে অবাক হয়ে দেখতাম, একটু-একটু ফাটলধরা পাড় কিছুক্ষণের ভেতর ঝপাৎ-ঝপাৎ করে কীভাবে পড়ে যেতো নদীর ভেতর। বিষয়টি খুব ভয়ঙ্কর। কারণ ওই জয়াল যদি কাউকে নিয়ে পড়ে, তাহলে সে, মানে মানুষ পড়ে আগে। এভাবে কিছুদিন পর-পর নদীতে বহু প্রাণের বিসর্জন ঘটে যায় অসাবধানে-অজান্তে। তাই বড়দের খোশগল্প খুব খোশ হতে পারতো না তাদের নিজেদের জানসহ, গুড়ো এবং ডাগর ছেলেমেয়েও কুক্ষিগত করে রাখতে-রাখতে। তারপর সাইরেন বাজিয়ে আচমকা একখান লঞ্চ এসে পড়লে চিলের ছোঁয়ের মতো সে লঞ্চের যাত্রীরা তাতে যার-যার ছানাপোনাসহ পোটলা-পুটুলি নিয়ে ঢুকে পড়তো। লঞ্চ থেকে নামার আনন্দ থেকে ওঠার এই স্মৃতিগুলো এখনও মনে থরে-থরে মিশ্র হয়ে আছে। কারণ পিছনের টানটা তীব্র ছিলো বলে।

দুই

মুক্তিযুদ্ধের আগেই আমরা ঢাকাতে এসেছিলাম। কিন্তু তখন পুরুষমানুষের জন্য ছিলো পুরো লঞ্চ। আর মহিলা এবং তাদের যুবতী, কিশোরী ও শিশুদের জন্য ছিলো একটি ছোট রুমের মতো জায়গা। যেখানে দরজার জায়গাটুকু বাদ রেখে চারপাশেই বেঞ্চ সাঁটা। তার ভেতর চুষিপিঠার মতো মহিলারা সবাই ভাপা হতো। কাত হয়ে ঢোকার একচিলতে যে দরজাটি ছিলো, তাও দুষ্টুমতি ছেলেমেয়ে কেউ বারবার খোলার চেষ্টা করলে মহিলারা নিজেরাই তাকে ছিঃ-ছাক্কা করে রাখতো না। কারণ সামনে দিয়ে চলাচলের পুরুষদৃষ্টি তাতে ঢুকে পড়লে মহিলাদের পর্দা নষ্ট হয় যে! তারচেয়ে তাদের পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে নিজেদের জন্য দাঁতকপাটি লেগে থাকা অনেক ভালো। অবশ্য নদীর দিকে ছোট ছোট সারবাঁধা কটা জানালা থাকতো বটে। কিন্তু যতোই একদিকে জানালার সার থাক, বিপরীত দিকে একটা অন্তত জানালা না থাক, একটি ফাঁক-ফোকর না থাকলে বাতাস ঢোকে না। বাতাসের চিরকালের এমনি মতি।

আমরা বাবা ছিলেন ডাকসাইটে অত্যাচারী মানুষ। তার বউ-মেয়ে কাউকে অন্যলোক কেউ দেখে ফেলবে, সেজন্য কখনো তাদের মানুষের সামনে বের করেননি। তাই ওপরের কেবিনে যে ওপর-শ্রেণির মানুষ প্রশস্ত হয়ে বসে-

এলিয়ে চলাচল করে, ওরা যারা প্রাণ খুলে আলো-বাতাস পেতে-পেতে যায়, ওরা যে শুধু স্বপ্নের জগতের মানুষ নয়, তা বুঝতে আমার অনেক বছরই লেগে গেছে।

গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকা আসতে প্রথম যে পদ্মার ওপর দিয়ে এসেছি, হয়তো সমুদ্রে আসতে-আসতে ওই খুপরির ভেতর মাকে ঘেঁষে ঘেমেনেয়ে ঘুমিয়েই ছিলাম। তিনমাস পর ভয়াল পঁচিশে মার্চের তিনদিন আগে আবার ফিরে চলে যেতে আসন্ন যুদ্ধের আশঙ্কায়ই বোধহয় শিশুমন নেতিয়েই ছিলো। না হলে তখন পদ্মা দেখিনি কেন? সমুদ্রের নামে কৌতূহল তো তখনও মনে ঢুকেছিলো। মাকে বলতে শুনেছি, পদ্মা নাকি এতো প্রশস্ত যে, একপাড় থেকে আরেকপাড়ে দাঁড়ানো মানুষকে কাকের সমান মনে হয়! কিন্তু পরে তো অনুমান করতে পেরেছি, মা’র ও গল্প ভুল। কারণ কাক কেন চড়াইয়ের মতোও লাগবে না। পদ্মার একপাড় থেকে আরেক পাড়ের শুধু একটা মানুষ কেন, মানুষের মিছিলও দেখা যায় না।

যুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীনের পর আবার যখন ঢাকাতে ফিরে আসি, সেবার জেগে রইলাম পদ্মা দেখবো বলে। মহিলারা সেই যে খুপরির ভেতর বসতো, তার সামনেই তো লঞ্চের ইঞ্জিন। স্ত্রীজাতি শাসনের বেলায় আমার বাবা ছিলেন জল্লাদের প্রতিমূর্তি। তিনি লঞ্চের ওই খুপরি জায়গাটুকুতে স্ত্রী-কন্যা-শিশুদের সেঁধিয়ে রেখে আবার খোঁজ নিতে আসতেন, স্ত্রী-শাসনের প্রতি ঢিলেঢালা মনেবৃত্তির কেউ আবার তাদের জননী-জায়া-কন্যাদের দেখভালের নামে ভেতরে ঢোকে নাকি! লোলুপদৃষ্টি দিয়ে তারা অন্য নারীদের চাটে নাকি! সেরকম লোককে কতবার যে নিকুচি করতে দেখেছি আমার পিতাকে। আর তাতে মদদ-জোগানো মানুষের সংখ্যাই সবসময় বেশি ছিলো। যেনো তারা নিজেরা কেউ কোনোদিন অন্যনারীর দিকে ভুলেও তাকায় না!

স্বাধীন হওয়া নতুন দেশের গৌরবের সাথে আমার চামড়াও আরেকটু ফর্সা ও টানটান হতে থাকে। তার-ওপর আবার উপুড় হলে বুকে ব্যথা পাই। হাত দিয়ে ব্যথার উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখি, দুই বুকে মটরদানার মতো ভেতরে গুটলি। একদিন ঘরভরা মানুষের ভেতর মা’কে গিয়ে বললাম, ওমা আমার দুধে ব্যথা করে। মা চোখে তিরস্কার ফুটিয়ে নিজের জিহ্বাতে কামড় খেলো। আর ঘরে খোশগল্প করতে আসা বাড়ির চাচা, চাচী, ও ফুপুরা তাতে হেসে কুটিকুটি।

কদিন পরে আবার যখন আমরা লঞ্চে করে ঢাকা রওনা হলাম, আমি প্রবল ইচ্ছে নিয়ে জেগে থাকলাম। ভাবলাম, ওই যে ইঞ্জিনের রুমের পাশে যে জানালা, ওখানে দাঁড়িয়ে পদ্মা দেখবো। কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে যতো চোখে সমুদ্র দেখবো, তার চেয়ে বেশি চোখ জ্বালিয়ে রাখলাম, পাশ দিয়ে লঞ্চের খুপরিতে যেতে আব্বার এসে পড়াটা যেন শতপরত ঘন অন্ধকার ঠেলে হলেও আগে দেখি!

উঁচুশ্রেণির কেউ না। সব খেটে খাওয়া মানুষের ভিড় ওখানে। তখন উঁচুশ্রেণির, সাফ-সুতরো, নতুনের মতোই যাদের নিত্যদিনের পুরোনো পোশাকও, সংখ্যায় অতি নগণ্য তারা সব লঞ্চের দোতলার কেবিনে বসে যায়। আর শুয়ে যাওয়ার মতো কেবিনে তখনও আমার নজর যায়নি। এতই সীমাবদ্ধ ছিলো আমাদের দেখার গণ্ডি। আর এসব সেই আব্বার নারীকুলকে কুক্ষিগত করে রাখা মনেবৃত্তিরই চরম কুফল।

‘পদ্মা! পদ্মা…’ রব উঠতেই ঘেমোগন্ধ মানুষের ভেতর দিয়ে মাথাটা জানালায় একটু গলাতেই কার দুটি হাত আমার সেই মটরদানা বুক এমন চেপে ধরলো, জান বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। লঞ্চের জানালা থেকে পদ্মা মনে হলো হাজার কোটি মাইল দূরে সরে গেলো। আমি নিজেকে ছিঁটকে আবার লঞ্চের সেই জ¦লন্ত চুলোর ওপর পাতিলের মতো খুপরির ভেতর চুষি পিঠার মতো ভাপানো গরম একেকটা পিঠা সেই মহিলাগুলোর ভেতর এসে ঢুকে পড়লাম। আমার শরীর কাঁপছে, ভয়ে। মনে হচ্ছে আমার আব্বা এসে আমার মুখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন, তার মেয়ে কুলি-মজুর কারো দ্বারা এমন চরম নিগৃহীত হয়েছে। আর নিগৃহীত হতে সুযোগ দেয়ার জন্য বাইরের জানালায় দাঁড়ানোর শাস্তি স্বরূপ তিনি আমাকেই এই কূল-কিনারাহীন দরিয়ায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যাবেন। কারণ বেগানা কেউ মেয়েদের ছুঁলেই সে চ‚ড়ান্ত অপবিত্র!

এরপর থেকে আমার কাছে সমুদ্র মানে ওই বুকে চাপ ধরা লজ্জাকর-মর্মান্তিকভাবে ডুবিয়ে মারার স্মৃতি।

তিন

এর আরো ক’বছর পর বিয়ে হলো। সংসার হলো। ছেলেমেয়ে হলো। স্বামী খুব কর্মব্যস্ত মানুষ। চোখে ঠুলিবাঁধা গরুর মতো সুখ-দুঃখ নিজের ছকে সংজ্ঞায়িত করে সংসার করে যেতে লাগলাম। একসময় বিধবাও হলাম।

যদিও তা অকালে হলাম। জীবনের নানানরকম অবস্থার ভেতর কত কত সমুদ্র-নদী ভ্রমণের গল্প শুনি। পড়ি। কিন্তু নেমে গিয়ে আর দেখা হয় না। কেউ আয়োজন করেও দেখায়নি। বিধ্বস্ত শরীরে-মনে একদিন সকালের

দিকে বাসার সামনে থেকে তাজা কৈ মাছ কিনে এনেছি। ড্রয়িংরুমের মাঝখানে জাবড়ে বসে খাবলা খাবলা ছাই দিয়ে তাদের কুটছি। এমন সময় কবি-বনলতাসম্পাদক নাসরীন রহমান এলেন। আসার কারণটা আগেই বলা-কওয়া কিছুটা ছিলো। ‘আমরা ক’জন কক্সবাজার যাচ্ছি। তুমিও চলো আমাদের সাথে।’  নাসরীন ঘরে ঢুকে আমার তখনকার  অবস্থার বাছ-বিচার না করেই বলে উঠলো, ‘টিকেটের টাকা দাও।’ আমি নিজের ইচ্ছেতে নয়, ওর চড়াস্বরের কাছে পরাস্ত ঠেকে হাতের আঠালো ছাই কিছুটা ঘষে ছাড়িয়ে, অনিচ্ছেতেই টিকেটের দামটা ব্যাগ থেকে বের করে দিলাম। আগামীকাল সকাল আটটায় পান্থপথ আমার বাসার কাছেই কলাবাগান থেকে বাস ছাড়বে।

নাসরীনকে তার জোর দাবির মুখে আমি টিকেটের টাকা না দিয়ে পারিনি, তাই দিয়েছি। সে বেরিয়ে যেতেই আবার মাছে মন দিলাম। আর মনে-মনে প্রমাদ গুনলাম, ও কাউন্টারে পৌঁছুনোর আগেই ওকে কল দিয়ে বলবো, আমি যাবো না। আমার টিকেট কেটো না! ছাইমাখা কইমাছ অন্ধচোখে মালসাতে লাফাচ্ছে। সময় হিসেব করে আমি হাত না ধুয়েই সেই জবজবে ছাইমাখা হাতে এক মিনিটে সাত টাকা দরের কল দিতে লাগলাম। মোবাইল বাজছে-থামছে। আমি আবার কল দিচ্ছি। আমার মুখে কথাও গোছানো, আমি যেতে পারবো না। প্লিজ, মাফ করে দাও। আমার টিকেট কেটো না ! ও টাকা তোমরা নিয়ে নাও…! কিন্তু নাসরীন কেন আমার ফোন ধরলো না কে জানে!

পরদিন ভোরে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে আমি গোটা বিশেক রুটি আর একটা আস্ত মুরগি কেটে, বড়-বড় চাক করে পেঁপে দিয়ে রান্না করে নিয়ে সময়মতোই বাসা থেকে বের হলাম। বাসস্ট্যান্ড গিয়ে জনাদশেক বান্ধবীকে সেখানে জড়ো দেখলাম। কলের পুতুলের মতো ওদের সঙ্গে আমিও নিজেকে চালিত করে রাখলাম। তারপর গাড়িও ছাড়লো সময়মতো। গাড়ি চট্টগ্রামের শেষ সীমানায় পৌঁছুলে কক্সবাজারগামী আমাদের দলনেত্রী কবি নাসরীন রহমান বললেন, ‘আমরা এখন এখানে কোনো হোটেলে ঢুকে কিছু খেয়ে তারপর কক্সবাজারের বাসে উঠে পড়বো।’ আমি এতক্ষণে বললাম, ‘আমার কাছে রুটি আর মুরগির মাংস আছে …।’ নাসরীন বললেন, ‘কই?’ তারপর সে-খাবারের চেহারা দেখতে না দেখতে সবাই আমার হাত থেকে নিয়ে সে-কী খাওয়া! ওইভাবে সবার জুঠা সবাই ভদ্রলেডিরা খেতে পারেন তা আমার জানা ছিলো না। সবার খাওয়াদাওয়া সারা হলে তারপরে তাদের জানা হলো, দীলতাজ নিজে তৈরি করে পোটলা বেঁধে এই খাবার এনেছে! আর তাতেই বেঁচে গেলো তাদের তখনকার হাজার টাকা।

হোটেলের রুমে গিয়ে পৌঁছুনোর পর কখন নামবো সমুদ্র দেখতে, সবার ভেতর গভীর উচ্ছ¡াস। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিলো আমি ওদের সাথে তাল মেলাতে পারছি না! আমার ভেতর আগুন নেই যা ওরকম উসকে জ¦লবে। বরং বাসায় যে ছেলেমেয়ে দুটি রেখে গেছি, তারা কী খাচ্ছে, দরজা বন্ধ করে বেরোচ্ছে কি না। পোশাক ইস্ত্রির পর প্লাগটা খোলে কি না। নিজেকে মনে হচ্ছিলো ভেজা বারুদের মতো দশার! তবু চলছি সবার সাথে। আর রুমে যখন ঢুকছি রাশি-রাশি বালি গায়ে। গিয়েছিলাম সেন্টমার্টিন দ্বীপেও। নির্দিষ্ট দিনে ফেরার আগে কবি দিলরুবা শাহাদৎ-এর সাথে নাসরীনের একটু দ্ব›দ্ব লেগে যায়। চাঁদার টাকা চাইলে দিলরুবা বললো, ‘আমি দিয়েছি।’ নাসরীন বললো, ‘কোথাও ভুল হচ্ছে…।’ তবু দিলরুবা পূর্বে টাকা দেয়ার কথা জোর দিয়ে বলেও আবার গজরগজর করতে করতে চাঁদার পুরো টাকাটাই দিলো। তাও আবার আমাকে দিয়ে। আমি তখন শাঁখের করাত। কারণ দুজনকেই আমি টাকাপয়সার বিষয়ে ভীষণভাবে চিনি। তবে টাকার হেফাজতকারী আরেক লেখিকা, কবি রিফাত আরা শাহানা। যাকে আরো ভালো চিনি। বিশ^স্ত আরো একজনের চোখ দিয়ে শানিয়ে চিনি। ওই যে সাংবাদিক-মেয়েটা ছাদ থেকে পড়ে মারা গেল, টুশি, রিফাত আরা শাহানা তার মা।

একবার আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন লেখক, মিডিয়া-ব্যক্তিত্ব, সম্পাদক, শিক্ষাবিদ মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ বলেছিলেন, ‘জানেন আপা, আজ একটা অনুষ্ঠানে একজনের সাথে পরিচয় হলো। তার স্বামী ইঞ্জিনিয়ার। স্বামী বদলি হয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা এসেছেন। এখন থেকে তারা ঢাকাতেই থাকবেন। তো সেই মহিলা বোরখা পরেন। পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়েন। অথচ আজ তিনিই সবচেয়ে স্মার্টলি, শুদ্ধ উচ্চারণে ভালো কবিতাটি পড়লেন…।’ তারপর বহুদিন পর আমি একদিন লেখিকা সঙ্ঘ’র অনুষ্ঠানে একজনকে কবিতা পড়তে দেখে, মনে হলো, এই সেই শুদ্ধ উচ্চারণের বক্তা ও আবৃত্তিকার, মাসুম বিল্লাহ্’র মতে আদর্শ নারী! কাছাকাছি হতে আমি তাকে এমনিই বলেছিলাম, ‘একজনের কাছে আপনার খুব প্রশংসা শুনেছি।’ রিফাত আরা শাহানা কিছুই না বলে শুধু মৃদু হেসেছিলেন, এমনই তার পরিমিতিবোধ!

কক্সবাজার থেকে যেদিন আমাদের সবার ঢাকা ফেরার কথা, দিলরুবা সেদিন যাবে না। আমাকেও বললো তার সাথে আরো দু’দিন থেকে যেতে। গেলাম থেকে। কিন্তু খাবারের ওয়াক্ত এলে, সে নিজে হোটেলে তার ছোট মেয়ে লিসাকে নিয়ে যা-তা খায়। যা তা মানে নিত্যদিন যা মুখে রোচে। আর আমাকে খাওয়ায় প্লেট ভরে একইরকম বিরিয়ানি। প্রতিবেলাই এই হেরফের। সে বলে, ‘না দোস্ত, তুমি কী সুন্দর করে বলে আমার হোটেলভাড়া কমিয়েছো। আমার জন্য সংসার ফেলে থেকে গেছো। আমার চেয়ে তোমার আরো প্রিয় বন্ধুদের সাথেও তুমি চলে গেলে না। আমি একটু বলাতেই তুমি আমার সাথে থেকে গেলে।’

আমার জীবনে দিলরুবা তার ভালোবাসার প্রমাণ একবারই শুধু রাখেনি, সম্মানজনক ভালোবাসার প্রমাণ সে বারবারই দিয়েছে। একথা বহুখানে প্রসঙ্গত লেখাও হয়েছে। তাই দিলরুবা নিজের জন্য জীবনের এক-দুটো দিন যদি কোথাও আমাকে টেনেই রাখে, তাহলে তার জন্য সেটুকু করাই আমার বাঞ্ছনীয়। একটি নামকরা ব্যাংকের পরিচালক ভিআইপি শাহাদৎ হোসেনের স্ত্রী কবি, ‘অঞ্জলিকা’-সম্পাদক দিলরুবা আরো কদিন তাদের ব্যাংকের ওখানকার এক শাখা-ম্যানেজারের গাড়িতে করে ইতিউতি কতখানে ঘুরলো। ঘোরা দিলরুবার প্যাসন। বেশিক্ষণ গাড়িতে থাকলে আমার বমি আসে। এসি বাসে আরো আগে বমি আসে। আর দিলরুবা বলে, ‘যখন বাস চলে, আমার মনে হয়, এই চলা যদি আর না থামতো!’

নাসরীন যাওয়ার আগে একটি চিঠি আমাকে দিয়ে যায়। দিলরুবাকে দিতে। কিন্তু নাসরীন তাতে আমার মাথার দিব্যি দেয়, সে হোটেল ছেড়ে চলে গেলে তবেই যেন আমি চিঠিটা দিই দিলরুবাকে, তার আগে নয়। এমন অনেক সিনেমা দেখে আমি অনুমান করতে পারি, বিষয়টা কী হতে যাচ্ছে! কিন্তু আমার যে কিছুই করার নেই!

নাসরীনের বন্ধ খামটা দিলরুবার হাতে ধরিয়ে দিলে, দিলরুবা তা খুলতেই সেই কতকগুলো টাকাই প্যাকেট থেকে লাফিয়ে পড়লো। সাথে সাথে দিলরুবার মুখ থেকে বেরোলো পুরনো গজর-গজর ‘…আমি আমাদের ব্যবসার একটি বিভাগ সামলাই। আমার কোনো ভুল কখনো হয়নি।

আমি টাকা দিয়েছিলাম…।’ মানুষের দ্বন্দ্বে বিধাতাও কখনো আমার মতো এমন অসহায় বোধ করেন বলে আমার তখন প্রাণে ঠেকলো!

দিলরুবাসহ যখন ঢাকায় ফিরলাম, ওর ঢাকার গাড়ি আমাদেরকে বাসস্ট্যান্ড থেকে তুললো। ওর তখনকার বাসা কাঁটাবন মসজিদের সামনে; ও যেতে পথে আমাকে আমার বাসায় নামিয়ে দিয়ে গেলো। সারারাত বাসে করে এসে সকালে ঢাকা পৌঁছানো। আমার ছোট মেয়ের তখন নতুন চাকরি। নক করতেই সে ঘুম ভেঙে দরজা খুলে আমাকে দেখে বললো, ‘মানুষ ভ্রমণে গেলে শুকিয়ে আসে। আর তুমি এমন ডাব্বুশ হয়ে আসছো কেন?’

বললাম, ‘ওই যে তোমার দিলরুবা আন্টি …।’

 

চার

জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা আয়োজিত তাঁর চট্টগ্রামের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে, তাঁর সাথেও অনেক ঘুরেছি। আমাদের থাকা-খাওয়া-ঘোরা, সেন্টমার্টিন বেড়ানো সেবারই তুমুল হৈচৈএর সাথে হয়েছিলো। সাথে কবিতা পড়া। সেন্টমার্টিনে হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি দেখেছিলাম। বারান্দাতে বসেছিলাম, তাও মনে আছে। কিন্তু বিষয়টা এতদিনে স্মৃতিতে ব্যাপক জট লেগে গেছে। তাই জট খুলতে স্মৃতিতে আর সূ² বা হেঁচকা টান নাই-বা মারলাম।

এরপর অস্ট্রেলিয়া গেলে আমার বড় ছেলে, যার সাথে আমার বয়স কাছাকাছি বলে ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকে। তবু ছবির এ্যালবামে ঢুকলে চোখ পড়ে-পড়ে দেখা যায়, সেও বহুবার আমাকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করতে টেনে-টেনে বা ঝুলিয়ে সমুদ্রে নিয়েছে। টেনে মানে না বকে। আর ঝুলিয়ে মানে বকতে-বকতে। আর সেসব যাত্রায় আমি ছবি তুলতে এত মগ্ন হয়ে গেছি, পরে মনে হয়েছে, আমি কি শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের দিকে দৃষ্টি বিস্ফারিত করে দেখেছিলাম? দেখেছিলাম কি, সমুদ্র থেকে আকাশ কত দূরে?

এজন্যই ছেলেমেয়েরা বলে, ‘ছবি পরে তুলো। আগে দেখো। যারা দেখে তারা ছবি তোলে না। সমুদ্র দেখতে হয় মগ্ন হয়ে। স্মৃতি হিসাবে দু-চারখানা ছবি হয়তো তারা তোলে। কিন্তু তুমি ছবি তুলতে এতো ক্রেজি হয়ে যাও যে, আসল বিষয় তোমার হৃদয়ে পশে না।’

এইবার বুঝলাম কথাটি একেবারেই খাঁটি! নাহলে সমুদ্রের একখানা গল্প সে একজন গল্পকারকে দিয়ে এতোদিনে লিখিয়ে নিতে পারতো না!

পাঁচ

সমুদ্রদর্শনের আমার সবচেয়ে ভালো স্মৃতি হচ্ছে, ডিনা চৌধুরীর সাথে যখন পরিচয় হলো, সে কিছুদিন পর মাহবুব ভাই, মানে ডিনা তার হাজবেন্ডকে দিয়ে আমাকে তার বাসায় নেয়ালো। অনেক রাত পর্যন্ত খাওয়া-দাওয়া আড্ডা হলো। রাতে আমাকে আমার ছেলের বাসায় তারা দুজনে মিলে পৌঁছে দিয়ে যাবে। কিন্তু ডিনা মাহবুবভাইকে বললো, ‘এক কাজ করো। দীলতাজ আপাকে সমুদ্র দেখিয়ে নিই।’ স্ত্রীর কথার ওপর মাহবুবভাই আমার বাবার মতো আর তার পুরুষবুদ্ধি ও দাপট প্রয়োগ করলেন না। এই আইটি-স্পেশালিস্ট মানুষটি এই বয়সে এসেও একবারও তার বুদ্ধির প্রাখর্য দেখাতে বললেন না যে, ‘এখন অনেক রাত বা এখন অন্ধকার রাত। দেখছো না আকাশে চাঁদ নেই! আজ, এইবেলা থাক। আপা তো কিছুদিন আছেনই। আরেকদিন আয়োজন করা যাবে।’

ডিনা বিভোর হয়ে একের পর এক তার পাশে এবং আমার সামনে বসে গান গেয়ে চলেছে। তিনি তাকেও নিরুৎসাহিত হওয়ার মতো কিছু বললেন না। আর তখনই আমার মনে হয়েছিল, ঈশ^র নারী-পুরুষের এই পৃথিবীটাই দেখতে চেয়েছেন। নাহলে, এমন সূ² কলাকৌশলে একমাত্র তাদের শরীর গড়েন! কী ধাত হতো যদি সব প্রাণীর মতো তাদের শরীরের ভেতরও একটি লেজ গুঁজে দিতেন?

ডিনা পল্লীগীতি থেকে কমবেশি অনেক রকম গান জানে। কিন্তু সে গাড়িতে বসে প্রথম যে গানটি শুনিয়েছিলো,

‘তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে সুপ্তরাতে
আমার ভাঙল যা তা ধন্য হল চরণপাতে
আমি রাখব গেঁথে তারে রক্তমনিহারে,
বক্ষে দুলিবে গোপনে নিভৃত বেদনাতে
তুমি কোলে নিয়েছিলে সেতার, মীড় দিলে নিষ্ঠুর করে…
ছিন্ন হল যবে তার ফেলে গেলে ভ‚মি’পরে
নীরব তাহারি গান আমি তাই জানি তোমারি দান…
ফেরে সে ফাল্গুন-হাওয়ায় হাওয়ায় সুরহারা মুর্ছনাতে।।’

এই গানটিই যেন ডিনার কন্ঠে বেশি মানায়। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ওরা আমাকে বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো যতো বাড়ি বেড়াতে নিয়ে যায়, আমি অপেক্ষা করে থাকি, ডিনা কখন এই গানটি গাইবে!

সে-রাতে গান গাইতে-গাইতে, শুনতে-শুনতে, কবিতা আবৃত্তি করতে করতে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের মর্ডিয়ালাক বিচে গিয়ে তিনজনেই হতাশ হয়ে-

দেখলাম, সমুদ্র অন্ধকারে ঢাকা! মানুষের অস্তিত্ব টের পেলে যে লাইট জ¦লে, আমাদের অস্তিত্ব টের পেয়ে পেয়ে রাস্তার লাইট জ¦লেছে বটে! কিন্তু তা দিয়ে আমরা ষাটের এদিক-ওদিক বয়সী তিনজন মানুষ হাপুশহুপুশ কিছু আঁধার জড়ানো ছবিই তুললাম শুধু এবং তা ফেসবুকে-পোস্টও দিলাম ঘরে এনে।

তবে সেদিন সমুদ্র অন্ধকারে ঢেকে থাকলেও, চাঁদও জ¦লে উঠে সমুদ্র দেখতে একটু সহযোগিতা না করলেও, মাহবুব ভাইয়ের প্রচেষ্টা আমার মনন ও বোধে এক অন্যরকম জোছনার জন্ম দিয়েছে। যে আঁধার আমার পিতা সমস্ত জীবন পরত-পরত পোচে শুধু ভারীই করে দিয়েছিলেন, মাহবুব ভাইয়ের স্বতঃস্ফ‚র্ত আচরণে তাতে যেন ক্ষয় ধরলো। পুরুষমানুষ মানেই নারী ও শিশুর জবরদস্ত হত্তাকত্তাই কেবলমাত্র নন, তাদের স-ব সুখ-দুঃখ, আবেগের সাথীও!

সেদিন আমাকে বাসায় পৌঁছে দিতে-দিতে ডিনা বলেছিল, ‘আপা, আজ সমুদ্র দেখাতে এনে দেখাতে পারলাম না বটে; কিন্তু আমরা জিলং গিয়ে দিনের আলোতে সমুদ্র দেখবো।’ হলোও তাই। ডিনা এবং মাহবুব ভাইয়ের সাথে আরেকবার সত্যিই সমুদ্র দেখা হলো। সেখানে তখন কখনো ঝকঝকে রোদ এবং কখনো একটু মেঘলাও হয়ে উঠেছিলো আকাশ। দুইরকম আলোতে ছবিও তোলা হয়েছিলো বেশুমার। তাই বলে সেদিন রাতের সমুদ্রদর্শন ব্যর্থ হয়েছে, সে কথা ঘুণাক্ষরেও ভাবা যাবে না!

আমার মেয়ে-জামাই মেলবোর্ন থেকে বদলি হয়ে কুইন্সল্যান্ডে গেলে আমার বড় ছেলে আশিকও মাঝে-মাঝে সেখানে বউ-বাচ্চা নিয়ে বেড়াতে যায়। একবার গোল্ডকোস্টে সমুদ্রপাড়ে এক লাইটহাউস দেখতে গিয়ে গাড়ি রাখতে পারেনি বলে, ঘন্টাদুয়েকের পথ ছেলে ও জামাতা দুজনে দুটো গাড়ি চালিয়ে গিয়ে আবার সেভাবেই তাদের ফেরত চলে আসতে হয়েছে। পথে যে বিরতি হয়েছে, তাতে তাদের ড্রাইভ করার কষ্ট পোষায়নি। মনে কোনো বিনোদনও বোধ হয়নি। তবে যা হয়েছিলো, আমার ছেলেকে বলছিলাম, এখানে মহিবুল আলম নামে এক লেখক-মামা আছে। ‘তালপাতার পুঁথি’ নামে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার কয়েক খণ্ড লেখা বিশাল উপন্যাস আছে। সেই মগ্ন মানুষটিকে তোমাকে একটু দেখে যেতে হবে। তাতে সে খুশিই হবে।

মহিবুলের সাথে দেখা করতে যেখানে সবাই গেলাম, সেই অন্ধকার সাগরের আরেক কোনো কূলে দেখা হলেও, মহিবুল-জলি টেনে আমাদের সবাইকে সেই তাদের বাসাতেই নিলো। তারপর কয়েক বাক্স পিজা অর্ডার করে-

বাড়িটাকে জলি-মহিবুল রেস্তোরা বানিয়ে ছেড়েছিলো। আর হরেক রকম পিজার রোদে ভরে গিয়েছিলো সবার ক্ষুধার্ত মুখ।

পুত্র ও জামাতার সাথে অমন আটঘাট বেঁধে গিয়েও আমার লাইটহাউস দেখা হয়নি এই কথা শুনে, বাংলাদেশ থেকে কুইন্সল্যান্ড মেয়ে ঐশির কাছে যাওয়া মিডিয়াব্যক্তিত্ব সাঈদা রোকেয়া তার জামাতা মোনাজকে পটিয়ে, ঐশীসহ ভালোমন্দ রান্না করে নিয়ে, ঠিক পরদিনই আমাকে নিয়ে পুরো লাইটহাউসসহ, লাইটহাউসের খুটিনাটিও সব দেখিয়ে এনেছে। আর লাইট হাউস মানেই চারপাশে সমুদ্র।  বয়স্করা ঘরে বসে বা অবসর থেকে সময় নষ্ট না করে লাইট হাউসে কীভাবে স্বেচ্ছাসেবক হয়ে কাজ করে, তাদের সঙ্গে কথা বলিয়ে, অভিজ্ঞতাকে ঋদ্ধ করে দিয়েছে। ছবি তুলে স্মৃতিকে করে দিয়েছে সমৃদ্ধ!

অতএব এইসব মনে পড়ে সমুদ্রের রূপ ক্রমশ আমার সামনে গড়াতে-গড়াতে পাল্টাতে লাগলো। সমুদ্র দেখতে গিয়ে দেখি কেবলি মানুষের হৃদয়ের রকমফের। আর সেটুকু না হলে বুঝি সমুদ্রের মরণই হতো। সে জীবন্ত কোনো উপমা হতো না মানুষের সৃষ্টিতে।

ছয়

২০১৯-এর জন্মদিন পার হয়ে গেছে তিনদিন আগে। ভূমিকা করে এবার লেখা উচিত এভাবে, অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যাণ্ডের গোল্ডকোস্টে কথাসাহিত্যিক মহিবুল আলম থাকে। মহিবুলের সাথে পরিচয় অল্পদিনের হলেও, দেশে চলে আসার আগে  সে আবার যেতে বললো জামাই-মেয়েকে নিয়ে। আমি মহিবুল আলমকে জামাই মাহফুজ চৌধুরীর সাথে কথা বলে প্রোগ্রাম ঠিক করতে বললাম। তারপর এক ছুটির দিনে মাহফুজ আমাদেরকে নিয়ে রওনা হলো। প্রথম গিয়ে উঠলাম মহিবুলের বাসায়। তারপর সেখান থেকে তাদেরকে নিয়ে একসঙ্গে বের হলাম। মানে মহিবুলের গাড়ির পিছনে মাহফুজের গাড়ি। জলি-মহিবুলের কন্যা অবন্তী মাহফুজের গাড়িতে। কারণ আমার আট বছরের দৌহিত্রী জাহরার সাথে তার অদম্য ভাব হয়ে গেছে। আর মহিবুলপুত্র অনিম ক্রিকেট খেলে বলে, সে আর যখন-তখন, যেখানে সেখানে যাত্রা শুরু করতে পারে না। আরো ক’বারই দেখেছি, সে ক্লাসে, না হয় ক্লাবে, না হয় ঘরেই থেকে গেছে তার কাজকর্ম-চিন্তা-ভাবনা নিয়ে।

সেদিন আমাদেরকে মহিবুলের যেখানে নেয়ার কথা সেখানে সরকারিভাবে কাজ হচ্ছিল। সেখান পর্যন্ত যাওয়ার আগে পুলিশ গাড়ি ফিরিয়ে দিলো।

কিন্তু ধারে-কাছে কোনো এক জায়গাকে মহিবুল বেছে নিলো, বিশ্রাম ও বাড়ি থেকে বয়ে নেয়া খাবার খাওয়ানোর জন্য। আর এই জায়গা বেছে নেয়ার দায়িত্ব মহিবুলেরই ছিলো। কারণ সে গোল্ডকোস্টকে বড় ভালোবাসে। সেখানকার প্রতি ইঞ্চি জায়গা সে চেনে। আলিশান এক বাড়িও সে ওখানে কিনেছে। এখনও সেটাতে ভাড়াটিয়া থাকে। তাই কাছে গাড়ি ভিড়িয়ে মহিবুল আমাকে সে বাড়িও দেখিয়ে এনেছে। কিন্তু আমি অস্ট্রেলিয়ার আইনুসারে সীমানার বাইরে থেকেই একলা ওর ভেতরবাড়ি উড়ে-উড়ে ঘুরে এসেছি। কারণ বাড়ি শব্দটি শুনলেই তো মানুষের মন আর মানুষের থাকে না। পাখি হয়ে যায়। মহিবুল আমার জন্য এত কিছু করলো, আর আমি ওর বাড়িটা ঘুরে দেখতে, আশিস স্থাপন করে রেখে আসতে পাখি হতে পারবো না!

অবশেষে হিঞ্জ ড্যাম নামের পানির বাঁধের কাছে চাদর বিছিয়ে আমাদের বসানোর ব্যবস্থা করা হলো। আমি হাত-পা ছড়িয়ে বসে পড়লে মহিবুল গাড়ি থেকে টেনে-টেনে সব খাবার নামাতে লাগলো। বিশাল রাইস-কুকারভর্তি জলির রান্না খিচুড়ি আর যতো যা করেছে, পোড়া-পোড়া মুরগি, শুটকি, আলুভাজি, আলুভর্তা থেকে গরুর মাংস সব তারা স্বামী-স্ত্রী ছুটির দিনে দুজনে মিলে করেছে। খাবার সব বের করা হয়ে গেলে মহিবুল আমার দিকে এমনভাবে তার মোবাইলের ক্যামেরা তাক করলো যে, তার এই আপা যে তার কাছে ঘাসের ওপর বসে একদিন খেতে চেয়েছিলো, তাই যেন সে আজকের এই আয়োজনের মাধ্যমে সফল করতে পেরেছে। ক্যামেরার তাকেই তার সে তৃপ্তি আকাশের রঙের মতো আমার চোখে ধরা পড়ে গেলো। তার এই সফলতার পরিতৃপ্তিটুকু আমাকে ভীষণভাবে ছুঁয়ে গেলো। পৃথিবীতে কে কার ইচ্ছের দাম দেয়! যদি কেউ কারো সেটুকু দেয়, তাই যেন একটি আগরবাতি না জ¦লেও সুবাস ছড়ানোর মতো পবিত্র ও মহার্ঘ হয়ে ওঠে।

খাওয়া-দাওয়া, ঘোরা, ছবি তোলা, সবই হচ্ছে বাসনার মাপ ছাড়িয়ে। হিঞ্জ ড্যাম বাঁধের ওপাশে পাহাড়ের ওপর গাছগাছালির ফাঁক গলিয়ে মাঝে-মাঝে কিছু বাড়ির টিনের ও টালির চাল দেখা যাচ্ছিলো। অস্ট্রেলিয়াতে আবাসিক এলাকাতে ইট-পাথরের বিল্ডিং নেই। সব ইটের দেয়াল আর ওপরে টিন বা টালির চাল। আমার মন ছুটে যায় গাছ-গাছালির ফাঁক গলিয়ে দূরের উঁকি দেয়া সেইসব বাড়িঘরে। আমি মহিবুলকে বললাম, ‘আমি যদি ইংরেজি বলতে পারতাম, তাহলে হেঁটে ওইসব বাড়িঘরে বসবাস করা মানুষদের গিয়ে বলতাম, ‘আমি তোমাদের জীবনের গল্প শুনতে এসেছি। আমার জন্য চা-কফির আয়োজন করো!’ তারপর তাদের থেকে গল্প কুড়িয়ে আনতাম।

আমার কথা শুনে মহিবুল বললো, ‘আপা, আমি জানি আপনি তা পারবেন। তবে দেশ থেকে ঘুরে আসেন। আমি আর আপনি একসাথে যাবো গল্প কুড়াতে।’

দেশে ফিরে আমি মহিবুলভক্ত, মহিবুলের অনুজপ্রতিম অন্তরঙ্গ বন্ধু লেখক শামস সাইদকে মহিবুলের কথা যতোবার বলতে যাই, সে এইভাবে কথার ফুলঝুরি ঝুড়িসহ আমার কাছে উপুড় করে দেয়, তার ভাব, ‘আপনার আপনিকে আপনি কী জানেন, আমি স-ব জানি। মহিবুলভাই আপনার ভেতর তার মা-বোন দুজনের ছবিই একসাথে খুঁজে পেয়েছে! আপনি জানেন না, আপনার জায়গা তার মনে কোথায়…।’ শামস সাইদ কথাসাহিত্যিক হারুন পাশা সম্পদিত পত্রিকা ‘পাতাদের সংসার’এ আমার ‘চিলেকোঠা’ নামের একটি গল্প পড়ে। আগে-পরে ইতিউতি আরো নাকি পড়েছে। তবে চিলেকোঠার পর থেকে নাকি সে আমাকে ঈর্ষা করে। ওর এই ঈর্ষা যে ভালোবাসার চেয়ে দামি, আর তা যে আমি বুঝি, তা ওকে আর বলা হয় না। কিন্তু শামস সাইদ কখনো এলে আমার পাণ্ডুলিপিটা খুলে দিয়ে আশ্বস্ত হই। বলি, ‘শোনো সাইদ, একমাত্র আমি সেই লেখক যে কি না, লেখাপড়া না করে গল্প লিখি। তার-ওপর ওই যে সব তাজা-তাজা মানুষ নিয়ে লিখি বলে আরো ঝামেলা। কাকে কোথায় ছোট করি, কারো সম্পর্কে উল্টাপাল্টা কি লিখি, শেষে কোথায় কে আমাকে বাগে পেয়ে ধরে নিয়ে কিলিয়ে সাইজ করবে…। তাই তোমার মতো লেখক, যে কি-না আমার গল্পকে চিনেছো, সে যদি পড়ে একটু বলে যাও, মানে অভয় দিয়ে যাও যে, না আপা ভাঙাভাঙির মতো কিছু হয়নি। তাহলে পরানের পানিটা আগামী দিনের জন্য ধরা থাকে। নাহলে শুকানোর উপক্রম মাথায় বয়ে বেড়াই।’

শামস সাইদ বললো, ‘না না, ঠিকাছে।’ সে গভীর মনোযোগ দিয়ে আমার সমুদ্র নিয়ে লেখাটা পড়তে থাকে।

আমি শামসকে আরো বললাম, দেখো, আমি কী উজবুক! ‘ঋতবর্ণ’ সম্পাদক ইবরাহীম মুহাম্মদ এবার তার ঋতবর্ণকে সমুদ্র দিয়ে ভরাবেন। আমাকে বলেছেন, গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, সমৃতিকথা, লেখা যা-ই হোক সমুদ্র  থাকতে হবে। আমি ভেবেছিলাম, হাতের লেখাগুলো গুছিয়ে সমুদ্র নিয়ে উত্তম পুরুষে লেখা শুরু করবো এক প্রেমের কাহিনি। জাহাজের ডেকে বসে ইচ্ছেমতো প্রেম করবো একটি পুরুষ-চরিত্র একটু-একটু নিজের মতো গড়ে। তাতে প্রেম-প্রেমভাবে আলগা হলেও হৃদয়ে একটা আরাম ভাব আসবে। যেন প্রেমটা স্বয়ং লেখকের। কিন্তু সমুদ্রের তেমন স্মৃতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে না। তাই শুরুটা হচ্ছিলো না। কিন্তু হঠাৎই নিজেকে ডেকে বলে উঠলাম, আরে কুইন্সল্যান্ড থেকে আসার মাত্র দিন তিনেক আগে মহিবুল তোর হাতে শুধু নয়, আস্ত একটা সমুদ্র মহিবুল তোর প্রাণের ভেতর তুলে দিলো। আর তবু তোর হাহাকার গেলো না? সাইদ বললো, ‘সেই গল্পটাই কন তো আপা। যদিও তখনকার ছবি পোস্ট দিছেন মেলা। তবু আপনার মুখ থেকে শুনি!’

কিন্তু বিষয়টা হলো কি, ওই যে সেদিন হিঞ্জ ড্যাম থেকে সন্ধ্যা মাথায় করে মহিবুল আমাদের নিয়ে যাচ্ছিলো প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে। পথে আবার গাড়ি ভিড়িয়ে কী-কী যেন কিনলো। যা কিনলো জামাতা মাহফুজ চৌধুরীও আমার কাছে গোপন করে গেলো।

মহিবুলের গাড়িতে আমি আর জলি। আমি যে কদিনই মহিবুলের সাথে গেলাম, জলি আমাকে ঠেলে সামনে বসিয়ে সে পিছনে গিয়ে বসে। বেচারি সারা সপ্তাহের ক্লান্তি নিয়ে ঘুমিয়েও পড়ে। আর আমার আর মহিবুলের কত-কত কথা যে বলা হয়। যেন আমরা বুঝতে পারি, আমাদের সময় খুব বেশি না। গলা বেয়ে আসা কথাগুলো তাড়াতাড়ি সারতে হবে। সারিও। দেশের লেখালেখি ও লেখকদের নিয়ে যা জানি। যে যতটুকু নতুন কিছু পড়ি, তার থেকেও বলি!

সাত

আমরা যখন সাগরপাড়ে গিয়ে পৌঁছুলাম, তখন সাগর তো রাতের কালো চাদরে ঢাকা। কিন্তু হু হু উত্তাল বাতাসের ভেতর মহিবুল তার গাড়ি থেকে অনেকরকম সরঞ্জাম বের করলো। তার ভেতর কেক মিষ্টি, কাগজের কাপ-প্লেট, প্লাস্টিকের চামচ। ম্যাচ, মোমবাতি। সাথে একখানা ছুরিও। তারপর কেকের ওপর সবগুলো হ্যাপি বার্থ লেখা মোমবাতি ফিট করে শেষ পর্যন্ত যে সে মোমবাতিগুলো সব জ¦ালিয়েই ছাড়লো ওরকম ঝাপটার বাতাসে। দীর্ঘ সময় গেলো মহিবুলের সেই মোমবাতিগুলো জ্বালাতে।

একেকবার বাতাস একেকটি নিবিয়ে দেয়, সে আবার শুরু করে। আর আমি বিমূঢ় হয়ে তাই দেখতে থাকি। কতবার মনে হয়েছিলো, এবার মহিবুল নিস্তার হবে। কিন্তু আমার মূঢ়তাকে মুগ্ধতায় উদ্ভাসিত করে মহিবুল আমাকে অপরিশোধ্য অগ্নিঋণে আবদ্ধ করেই ছাড়লো। সে সবগুলো মোমবাতি জ্বালিয়েই নিস্তার হলো। আর আমি একটা মহাপ্রাপ্তির ভারে ক্রমশ বুঁদ হয়ে উঠতে থাকলাম সেই মাহেন্দ্র সন্ধ্যা থেকে। আর সেই সমুদ্রের স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে নদী ও ঝোরার মতো আরো কত স্মৃতি ফল্গুধারায় তাতে ছুটে এসে কত বাঁক, কত মোহনা, বিনিসুতার মালার মতো কতো সম্পর্ক ও মুখকে ভাস্বর করে তুলেছে! একজীবনে এই পাওয়া খুব কম মানুষের ভাগ্যে জোটে। খুব কম মানুষ এই প্রাপ্তি দিয়ে হৃদয় নামক অদৃশ্য অস্তিত্বকে প্রসন্ন করে রাখতে পারে। তাই সেই কম মানুষের একজন হয়ে থাকতে সব সময় কলুষ থেকে বাঁচিয়ে প্রাণ পবিত্র ও জাগর করে রাখি আর ভাবি, পারছি তো প্রসাদকে আহার না ভেবে প্রসাদ করেই রাখতে!

দীলতাজ রহমান। কবি, লেখক ও গল্পকার। দীলতাজ রহমানের জন্ম ১৯৬১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার চন্দ্রদিঘলিয়া গ্রামে। মা রাহিলা বেগম। বাবা সূফী ভূইয়া মোহাম্মদ জহুরুল হক। ব্যক্তিগত জীবনে দীলতাজ আশিক, ফারহানা, ফারজানা ও আরিফ এই চার সন্তানের জননী। আর এদের...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..