নবনীতা দেবসেনের কবিতা: সম্পর্কের নানামাত্রা

শৌভিক পাল
প্রবন্ধ, শিল্প ও সাহিত্য
Bengali
নবনীতা দেবসেনের কবিতা: সম্পর্কের নানামাত্রা

কবিতার ঘর

কবির ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক কবিতার সঙ্গে। ব্যক্তিগতস্তরে অনেক মানুষের সঙ্গে কবির যোগাযোগ ঘটে, সামাজিক মানুষ হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবে সামাজিকস্তরেও নানা মানুষের সঙ্গে কবিকে পরিচিত হতে হয়, কিন্তু সকল কবিই হয়তো শেষপর্যন্ত স্বীকার করবেন কবিতার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতম সম্বন্ধের কথা। অন্যান্য কবিদের সম্পর্কে এ-কথা নিশ্চিতভাবে বলতে না পারলেও বর্তমান প্রবন্ধে আলোচ্য কবি নবনীতা দেবসেন  সম্পর্কে এ-কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।  নবনীতা দেবসেন, তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘নটী নবনীতা’-য় লিখছেন, “বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতাকেও আমি ভয় করি না, আমার একটাই ভয়, কবিতা যেন আমাকে শেষদিনে পরিত্যাগ না করে। সে নিঃসঙ্গতা পক্ষাঘাতের মতো: সে বড় ভয়ানক হবে। কবিতা আমার নাড়ীর সঙ্গে জড়ানো কবচকুন্তল। কবিতা আমার অভিমান, আমার প্রার্থনা, আমার নিঃসঙ্গতা, আমার সঙ্গ, আমার পূর্ণতা, আমার অতৃপ্তি।” কবিতাই যাঁর জীবনে এতকিছু, এবং যাঁর একটাই ভয় যে কবিতা যেন শেষদিনে তাঁকে ছেড়ে না যায়, তাঁর কাছে কবিতাই যে সম্পর্কের সর্বোচ্চ চূড়ায় থাকবে, কবিতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যে ঘনিষ্ঠতম হবে, এ-ব্যপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

তবে এই নিশ্চিত সিদ্ধান্ত আমাদের মনে অন্য একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। প্রশ্নটি এই যে কবির চারপাশে এতসব মূর্ত মানব থাকা সত্ত্বেও কবি কেন বিমূর্ত কবিতাকে নিজের সবথেকে কাছের বলে ভাবছেন? মধ্যযুগ থেকে আমরা শুনে আসছি, বড়ু চণ্ডীদাসের মুখে, “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই”, এমনকি আধুনিক যুগের পথপ্রদর্শক কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও তাঁর ‘বৈষ্ণব কবিতা’য় বলতে শুনি:

“সত্য করে কহো মোরে হে বৈষ্ণব কবি,

কোথা তুমি পেয়েছিলে এই প্রেমচ্ছবি,

কোথা তুমি শিখেছিলে এই প্রেমগান

বিরহ তাপিত হেরি কাহার নয়ান,

রাধিকার অশ্রু-আঁখি পড়েছিল মনে?”

(“বৈষ্ণব কবিতা”, ‘সোনার তরী’)

অর্থাৎ বৈষ্ণব কবিদের সৃষ্ট কবিতা, সংগীতের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ জানাতে চাইলেন মর্ত্যের জীবন্ত নর-নারীর প্রেমের অনুভূতিকে বৈষ্ণব কবিরা অনুভব না করে থাকলে, তাঁরা কখনোই আধ্যাত্মিক প্রেমরসের সৃষ্টি করতে পারতেন না। এখানেও সত্য হয়ে ওঠে মধ্যযুগীয় কবি বড়ু চণ্ডীদাসের অমর বাণী, “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।” কারণ মর্ত্যের মূর্ত প্রেমের সোপান বেয়ে তবেই বিমূর্ত আধ্যাত্মিক প্রেমে পৌঁছানো সম্ভব। অথচ আমাদের আলোচ্য কবির ক্ষেত্রে, কবিতাকে নিয়ে তাঁর প্রেমের বিমূর্ততা বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলোকেও ছাপিয়ে যায়। কবিতার কাছে তাঁর যাবতীয় সমপর্ণ, কবিতাকে নিয়ে তার চরম শঙ্কা-উদ্বিগ্নতা, সর্বশ্রেষ্ঠ আবেগ।

কেন সবার উপরে মানুষ সত্য না হয়ে, সবার উপরে কবিতা সত্য হল কবির কাছে? কেন তাঁর কবিতায় সম্পর্কের নানামাত্রা খুঁজতে গিয়ে আমরা দেখতে পাই, প্রেমমনস্তত্ত্বের কেন্দ্রে ‘স্থির বিন্দু’র মতো কবিতা জাজ্বল্যমান? এই প্রশ্নের উত্তর কবি যেমন তাঁর কবিতায় লিখে গেছেন, আবার পূর্বোক্ত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থেও স্পষ্টভাবে জানিয়ে গেছেন। ‘যৌবনের দোহাই! তুমি যেয়ো না’ কবিতায় নবনীতা কবিতার প্রতি তাঁর সৎ আবেগ উচ্চারণ করেছেন অলংকারহীন স্বচ্ছ ভাষায়:

“অসম্ভাব্য মনে হয় যৌবনের অন্তে বেঁচে থাকা

তেমনই সম্ভব নয় তুমি গেলে যৌবন বাঁচানো।…

কবিতা তোমাকে ছেড়ে কতকাল বেঁচে বর্তে আছি!

তা-বলে আমাকে কিন্তু তুমি ছেড়ে থেকো না, আমাকে

তোমার বুকের মধ্যে হেলায়-ফেলায় পুষে রেখো।

তুমি ঘর ছেড়ে গেলে আমি কোন বানপ্রস্থে যাবো!”

(“যৌবনের দোহাই! তুমি যেয়ো না”, ‘স্বাগত দেবদূত’)

যৌবন ক্ষণস্থায়ী, শরীরের সঙ্গে মনেরও যৌবন ফুরালে বেঁচে থাকা দুঃসহ হয়ে ওঠে। মনের যৌবন ফুরানো মানে প্রেমের সংরাগের অবসান, স্বপ্নের প্রেরণা, উদ্যম-প্রচেষ্টার অবসান। তাহলে জীবন বলতে কী থাকলো? শুধু প্রাণের ধুকপুকুনিটাই তো জীবন নয়। তাই বাঁচতে গেলে মনের যৌবনকে ধরে রাখা দরকার, যা সম্ভবপর করে তোলে কবিতা। এই কারণে নবনীতা বলছেন, “শুনি কবিতা নাকি পলায়ন। অথচ আমি তো দেখি কবিতাই স্থিতি। আমার প্রথম প্রত্যয় (উল্লেখ্য কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘প্রথম প্রত্যয়’, ১৯৫৭-১৯৫৯)। পায়ের তলা থেকে যতবারই মাটি কেড়ে নিয়েছে জীবন, ঠেলে দিয়েছে একটা হিমহিম অন্ধকার গর্তে, কবিতা ততবার এসে হাত ধরেছে, টেনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে শক্ত জমির ওপরে। আলোয় উষ্ণতায়। ঈশ্বরের মতো কবিতারও বড় মমতা। শত হেলাফেলাতেও কবিতা কবিকে একেবারে পরিত্যাগ করতে পারে না। ফিরে ডাকার অপেক্ষায় থাকে। আর মানুষ মানুষ চন্দ্র সূর্যের মতো। ঘিরে থাকে, কিন্তু দূরে থাকে। আলো দেয়, তাপ দেয়, কিন্তু আপন হয়ে যায় না। যতই ডাকো। আছে। কিন্তু কাছে নেই।

আপনার বলতে সঙ্গে আছেন, সঙ্গে থাকেন কেবলমাত্র ঈশ্বর। আর হয়তো কবিতা?”

বাক্য শেষের জিজ্ঞাসাচিহ্ন খুব তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়। কারণ এই জিজ্ঞাসাচিহ্নের সূত্র ধরে নবনীতার কবিতায় আবিষ্কার করে ফেলা যায় সম্পর্কের নানা মাত্রা, তার মধ্যেকার দ্বন্দ্ব-বিক্ষুব্ধ জটিল অনুভূতি, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন। কবিতাই যদি কবির ‘প্রথম প্রত্যয়’ এবং সর্বশেষ স্থিতি হয়ে থাকে তাহলে ঈশ্বরের পাশে কবিতাকে স্থান দিতে কবির দ্বিধা কীসের? ঈশ্বরের পরমতা আর ধ্রুবত্বের পাশে কবিতাকে স্থান দিতে কবিকে দ্বিধাগ্রস্ত মনে হয়:

“আমার ক্ষিতিজ ভালোবাসা

দ্বন্দ্বের দোলনপদ্মে শাশ্বত শিশির…

ধ্রুব-অধ্রুবের দ্বন্দ্বে দরিদ্র, দুর্জ্ঞেয় ভালোবাসা।” (দোলনপদ্ম)

কবিতা ঘনিষ্ঠতম হওয়া সত্ত্বেও যে দ্বন্দ্ব, দুর্জ্ঞেয়তার দরুণ কবিতাকেই পরম, ধ্রুব করে তুলতে পারছেন না কবি, তারই ফাঁক দিয়ে কবি-হৃদয় জড়িয়ে পড়ে বিচিত্র মানবসম্পর্কে, আন্দোলিত হয়, উদ্বেলিত হয়। একান্ত ব্যক্তিগত জীবন, সংসার জীবন, সামাজিক জীবনে নানাবিধ সম্পর্ক-সংযোগে কবিতায় তখন ফুটে ওঠে কত-না গন্ধ-বর্ণ-স্পর্শে সংশ্লিষ্ট প্রেমরাগ, অনুভবের বিচ্ছুরিত বর্ণালী। কবিতা তখনও কবির জীবনে ‘স্থির বিন্দু’-র মতোই বিরাজ করে,

কিন্তু অনুভবে কবিতাই একমাত্র জায়গাজুড়ে থাকে না, এসে পড়ে মানুষ, প্রকৃতি, সমাজ। পাঠকদের তখন ধাঁধা লেগে যায় কবিতায় উল্লিখিত ‘তুমি’-কে কেন্দ্র করে। এই দ্বিতীয় পুরুষ কে? এই ‘তুমি’ কি কবি নিজে? না-কি কবিতা? না-কি প্রকৃতি? না-কি অপর কোনো ব্যক্তি? কবি কোন সম্পর্কসূত্রে ‘তুমি’-র সঙ্গে সম্পর্কিত? এই দ্বিতীয় পুরুষের পরিচিতির সন্ধান পেলে মনস্তত্ত্বের অপরাপর জট উন্মোচন সম্ভব হবে।

সম্পর্ক ও সময়ের মাত্রা: স্মৃতির দরদালান

প্রখ্যাত আমেরিকান কবি এমিলি ডিকিনসন, তাঁর ‘The Soul Selects her own Society’ কবিতায় ব্যক্তিগত সম্পর্কের নির্মাণে ব্যক্তির নির্বাচনের পক্ষে চরমপন্থী এক মত ঘোষণা করেছেন। তিনি বহুর মধ্য থেকে একজনকেই নির্বাচন করতে চান যে তাঁর ঘনিষ্ঠতম হতে পারে। বাকিদের জন্য তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের দরজা বন্ধ। এমনকি কোনো সম্রাট এসে যদি তাঁর কাছে নতজানু হয়ে দাঁড়ান, তখনও কবি দরজা বন্ধই রাখবেন:

“The Soul selects her own society—

Then—shuts the Door—

To her divine Majority—

present no more—

I’ve known her—from an ample nation—

Choose One—

Then—close the Valves of her attention—

Like Stone—”

নবনীতা দেবসেন ব্যক্তিগত সম্পর্কের নির্মাণে এমিলি ডিকিনসনের মতো কোনো চরমপন্থী স্থান নেননি, সেখানে অনায়াসেই একাধিক সত্তা আত্মার কাছাকাছি আসে। তাদের সঙ্গে সৌহার্দ্য বিনিময় হয়, যাপনের দৈনন্দিনতায় বেড়ে চলে অকৃত্রিম আতিথ্য, তারপর কবিকে ফিরে আসতে হয় স্বগত চৈতন্যলোকে, স্মৃতির মতো এক শক্তিশালী  অস্তিত্বের  ছত্রছায়ায় তিনি আজীবন প্রতীক্ষমাণ থাকেন ভালোবাসার অটল বিশ্বাসে। সম্পর্ক চিরস্থায়িত্বের দাবি নিয়ে গড়ে ওঠে না, কিন্তু সম্পর্ক তো অনেকটা গাছের মতো—বহু যত্নে, পরিচর্যায় কোনো গাছ সম্পূর্ণতা পায়, কোনো গাছ আবার অবহেলার মধ্যেও টিকে থাকে স্বতঃস্ফূর্ত তাগিদে—একসময় ঝড়ে বা বজ্রপাতে কিংবা অন্য কোনো আকস্মিক বিপর্যয়ে সেই গাছ প্রাণ হারালেও মাটির ভিতরে ছড়িয়ে থাকে তার অজস্র বিশুষ্ক শিকড়। মাটি তাকে কিছুতেই ছাড়াতে পারে না। শিকড়বিদ্ধ  মাটিই যেন কবির স্মৃতির দরদালান যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি অবর্তমান সম্পর্কের দেখা না-হওয়া মানুষের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। দেখা কি আদৌ হয়? কতটুকু বা আর দেখা, পুরানো মুখের সঙ্গে? দেখা যদি বা হল কিন্তু স্পন্দন আর এক থাকে কি, আগের মতো অবিকল?

“স্পন্দন শব্দের অর্থ

তার কাছে সেদিন হঠাৎ

পালটে গেলো। যেমন গভীর

তুষার ফাটিয়ে, ছোটো নীল ফুল একলা প্রথম

ভীষণ সাহস করে, হঠাৎ যেমন

পুরোনো স্মৃতির মতো একফালি আলো

মুখের পাশটিতে পড়ে।”

(“স্পন্দন”, ‘স্বাগত দেবদূত’)

‘বর্তমান’ কবির কাছে হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের মতো। কবি বর্তমানকে খুঁজে বেড়ান কখনো আলোকিত অতীতের রাত্রিজোড়া বিষণ্ণতায়, কখনো অনালোকিত ভবিষ্যতের প্রত্যাশাভূমিতে দাঁড়িয়ে। বর্তমান কবির কাছে সম্পর্কের দ্যোতনা নিয়ে আসে। প্রেমঘন কোনো মুহূর্তে অধরা শাশ্বত সময়কে ধরার বাসনা কার না থাকে? মিলনের ব্রাহ্মমুহূর্ত তখন চিরবর্তমান হয়ে উঠতে চায়, তখন অতীত ও ভবিষ্যতের কোনো সারবত্তা থাকে না। তাই যতটুকু সম্পর্কের পরিসর, ততটুকুই বর্তমান সময়, এবং তা-ই শাশ্বত। ‘শাশ্বত সময়’ কবিতায় কবি লেখেন:

“আধঘন্টার জন্যে

হে পৃথিবী, থমকে দাঁড়ান

সৌরপিতা মাধ্যাকর্ষণ স্থগিত রাখুন

পাপপুণ্য ঘুচে যাক, মুছে যাক দিবসরজনী”

অতীতকে ধরা যায় স্মৃতি-পিঞ্জরে, ভবিষ্যতকে ধরা যায় স্বপ্ন-কল্পনায়, বর্তমান আছে তবু নেই, সে ধরা দিয়েও অধরা। থাকা, না-থাকার ফাঁক দিয়ে যে সময় প্রতি মুহূর্তে মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে আর তারই সঙ্গে বিপন্ন হয়ে গলে পড়ছে  আমাদের অস্তিত্ব—সেই সময়কে শাশ্বত রূপ দিয়ে অস্তিত্বের মূলীভূত সত্যকে ছুঁয়ে থাকতে চান কবি। এ একধরণের আত্মান্বেষণ, প্রেম সে অন্বেষণের একমাত্র পথ, বিশ্বাস শক্তিশালী হাতিয়ার। প্রেমহীন সময় সহজেই ফাঁকি দিয়ে আমাদের অস্তিত্বকে মিথ্যে করে দেয় একসময়ে, প্রেম কালের ক্ষণস্থায়িত্ব ঘুচিয়ে তাকে কালান্তরের গ্রন্থিসূত্রে গেঁথে দিতে পারে।

“অখণ্ডকালের পক্ষপাতধন্য আমি মহাশয়,

আমাকে রাঙাবে চোখ, এত শক্তি রাখে না সময়”

এই কথা বলার স্পর্ধা ভালোবাসার শক্তিতে অর্জন করেন কবি। তাই প্রিয় মানুষের কাছে তাঁর আর্তি:

“কাছে থাকো। ভয় করছে। মনে হচ্ছে

এ মুহূর্ত বুঝি সত্য নয়। ছুঁয়ে থাকো।       …

ভয় করে। মনে হয় এ মুহূর্ত বুঝি সত্য নয়।

যেমন অসত্য ছিল দীর্ঘ গতকাল।

যেমন অসত্য হবে অনন্ত আগামী।”

(“পাণিগ্রহণ”, ‘রক্তে আমি রাজপুত্র’)

কিন্তু দীর্ঘ গতকাল, আর অনন্ত আগামীর সন্ধিক্ষণ, যে সময় বর্তমানের চলমানতাকে দাবি করে, তা বিলুপ্তপ্রায় হয়ে ওঠে কবির জীবনে। তাই দিন আর রাতের সন্ধিলগ্ন বিকেলও ক্রমশ মুছে যেতে থাকে। ‘নিরন্ধ্র দুপুর’ এবং ‘বিবর্ণ রাত্রি’—এর ফাঁকে বিকেলের স্বল্প, অখণ্ড অবসরটুকু বেঁচে থাকে না–যে সময় কোনো সম্পর্কের জন্য বরাদ্দ হতে পারত:

“এ রাজ্যে বিকেল নেই।…

নীরন্ধ্র দুপুর, আর নিদ্রাহীন রাত্রি দ্বিপ্রহর

এই দুই মেরু ছুঁয়ে ছোটো-ছোটো পল-অনুপল

অনর্গল দৌড়োয়” ( “অন্য দেশ”, ‘স্বাগত দেবদূত’)

তাই বর্তমানের অনুপস্থিতি স্মৃতিকেই বতর্মান করে তুলতে চায়। ‘স্মৃতির মতো বর্তমান’ কবিতায় লেখেন:

 “চুলে বিলি কেটে যায় জ্যোৎস্না, তৃণ, স্মৃতির মতন হাহাকার

চেয়ে দেখি প্রিয় মুখ, বহুদিন পরে দেখা হলো,

কোজাগরী চন্দ্রাতপ মাঠ ভরে বাসর সাজায়”

‘স্মৃতির মতন হাহাকার’—শুনে সাময়িকভাবে মনে হতে পারে, কবি বোধহয় স্মৃতিকাতর, স্মৃতি তাঁকে মুহুর্মুহু পীড়িত করছে। তবে কাব্যজগতের সামগ্রিক অবলোকনে  উপলব্ধ হয় যে কবি স্মৃতি কাতর নন, স্মৃতি তাকে পীড়া দেয় না, বরং স্মৃতি বর্তমান অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির সঙ্গে সমন্বিত হয়ে তাঁর চিন্তা-কল্পনাকে এমন এক প্রসার দেয় যে কবি পুরানো সম্পর্কের নিবিড়তা অনুধাবনের ভিতর দিয়ে পৌঁছে যান চলমান যাপনের সারাৎসারে। স্মৃতি-জ্বর নয়, স্মৃতি ঘোর নয়, স্মৃতিই কবির চেতনার সজীব প্রকৃতি। বর্তমান সম্পর্কের অভিজ্ঞতায় সে সঞ্চারিত করে তীব্র রোমান্টিক বোধ, এমন এক প্রেমজ শক্তি যা সমগ্র জীবনকে নিবিড় আলিঙ্গনাবদ্ধ ক’রে তার নির্যাসকে তুলে ধরে দার্শনিক আনন্দময়তায়। আধুনিকতার সর্বব্যাপী বিচ্ছিন্নতার উজান উপেক্ষা করে স্বনির্ভর কবি-হৃদয় শোনায়:

“না হয় দেখা না হলো তাতে কী আর আছে ক্ষতি

মনের মধ্যে নিশি দিবস দেখা

বুকের মধ্যে একটা নদী বইছে একা একা

লাজুক সরস্বতী”  (“দেখা”, ‘রক্তে আমি রাজপুত্র’)

ইংরেজ কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের মনোজগতের সঙ্গে এ বিষয়ে বিশেষ মিল রয়েছে নবনীতা দেবসেনের কাব্যজগতের। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতায় স্মৃতির ভূমিকা প্রবল। শৈশবের স্মৃতি, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম-চারণের অনুষঙ্গ ফিরে ফিরে এসেছে নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মোড়কে। অপস্রিয়মাণ সময়, তবু কবির কাছে থেকে যায় মূল্যবান কিছু স্মরণোজ্জ্বল মুহূর্ত, যা প্রশান্তি ও তৃপ্তির বার্তাবহ:

“Retirement then might hourly look

upon a soothing scene,

Age steal to his allotted nook

Contented and serene” (‘Memory’)

এই প্রসঙ্গে নিজের কাব্য-দর্শন সম্পর্কে ওয়ার্ডসওয়ার্থের মত উল্লেখ্য যেখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, কবিতা রচনায় স্মৃতির ভূমিকা। ‘Preface to the Lyrical Ballads’ কাব্যসংকলনের মুখবন্ধে কবি লিখছেন,

“I have said that poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings: it takes its origin from emotion recollected in tranquillity: the emotion is contemplated till, by a species of reaction, the tranquillity gradually disappears, and an emotion, kindred to that which was before the subject of contemplation, is gradually produced, and does itself actually exist in the mind. In this mood successful composition generally begins…”।

নিস্তরঙ্গ সময়ে অতীত স্মৃতি-চিন্তার উপজীব্যতায় বিশুদ্ধ কবিতার জন্ম। নবনীতা দেবসেনের কবিতায় সময় ও সম্পর্কের মাত্রা বিচারেও এই সত্যই নতুন করে উদ্ভাসিত হয়। স্মৃতি কবির চিন্তাপ্রক্রিয়ার সঙ্গে এমন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত যে বর্তমান অভিজ্ঞতার থেকে স্মৃতিকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। তবে কি বর্তমান সময়, সম্পর্কের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত আশ্রয় পাচ্ছেন না বলেই স্মৃতির দরদালানে কবিকে বসতি ওঠাতে হচ্ছে? না-কি স্মৃতির মাধুর্যকে কবি ভুলতে পারছেন না বলে বর্তমানেও তাতে আবেশিত হয়ে থাকতে চান? না-কি স্মৃতি কবির জীবনে এমন এক অনিবার্য পরিণতি যা প্রকৌশলে ভবিষ্যতের দিকে অভিগমনকে-ই সূচিত করে, অর্থাৎ স্মৃতি আসলে কোনো সম্ভাবনা? এর কোনো সম্ভাবনাকেই অস্বীকার করা যায় না, কোনো একটি সম্ভাবনাকে বিশেষ সত্য বলে চিহ্নিত করা দুরূহ কিন্তু সবের মধ্যে যে আংশিক সত্য রয়েছে, তার প্রমাণ কবির এই কবিতা:

“স্মৃতি আমার চড়ুইপাখি, বেড়ালছানা–

স্মৃতি আমার পাড়া, আমার বাস্তুভিটে

স্মৃতি আমার কাজলাদীঘি, শিউলিতলা,…

স্মৃতি আমার সূর্য চন্দ্র নবগ্রহ

স্মৃতি আমার ক্ষিত্যপ তেজমরুৎব্যোম্।”

(“স্মৃতির ছড়া”, ‘রক্তে আমি রাজপুত্র’)

সহবাসী ঈশ্বর

স্মৃতির প্রতিবেশ থেকে কবি ক্রমশ ঢুকে যান অস্তিত্বের কেন্দ্রে। পূর্বেই বলা হয়েছে স্মৃতি কবির এক আত্মান্বেষণের পথ। সেই পথে শুধু যে প্রিয় মুখ, প্রিয় সম্পর্কের মানস-সাহচর্য লাভ করেন, তা-ই নয়, দেখা হয়ে যায় ঈশ্বরের সঙ্গে। কিন্তু কবি কীভাবে তাঁকে (ঈশ্বর-কে) চিনতে পারেন? ঈশ্বর তো প্রত্যক্ষগোচর কোনো অস্তিত্ব নন যে দেখা হওয়ামাত্র তাকে ‘ঈশ্বর’ বলে চিনে ফেলা যাবে! যখন চিনতে পারেন তখন ঈশ্বরের সাথে তাঁর কী কথা হয়? আর, সমস্ত গূঢ় সাধন পথ বাদ দিয়ে স্মৃতির পথেই বা ঈশ্বরের সঙ্গে কবির সাক্ষাৎ হয় কেন?

কবি প্রথম থেকেই ঈশ্বর এবং দৈবে বিশ্বাসী। ঈশ্বরলাভের জন্য তিনি ব্যাকুল নন, কিংবা অধরার রহস্যময় লীলা-সামীপ্যের অভাবজনিত কাতরতা কবির নেই। কবিতায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্পষ্ট এবং প্রত্যক্ষ, সেখানে ধোঁয়াশার অবকাশ নেই কারণ ঈশ্বরবিশ্বাস প্রগাঢ়। প্রথম কাব্যগ্রন্থের (প্রথম প্রত্যয়) অন্তর্গত প্রথম কবিতাতেই আমরা ঈশ্বরের কথা পাই। একজন অসুস্থ ঈশ্বরের কথা। ঈশ্বর কেন অসুস্থ হলেন, তার কারণ কবিতায় স্পষ্ট বলা নেই। তবে ঈশ্বরের অসুস্থতা এবং তাঁর প্রতি কবির বাক্যালাপে যে আরোগ্যকামনা—এর থেকে একটি বিষয় বোঝা যায় যে কবির ঈশ্বর দৈবীশক্তি বিশিষ্ট স্বর্গলোকের বাসিন্দা নন, তাঁর সঙ্গে মনুষ্যজীবনের ঘনিষ্ঠযোগ এবং তিনি কোনো একক বিচ্ছিন্ন সত্তা নন বা তাঁর সঙ্গে কবির  সম্পর্ককেও পৃথক কোনো সম্পর্করূপে গণ্য করা চলে না, জীবনের প্রত্যেক সম্পর্কের মধ্যে ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংযোগ রয়েছে। ঈশ্বরকে কেন্দ্রে রেখে গড়ে ওঠে মানবসম্পর্কের বৃত্ত। ঈশ্বর যেন সেই সকল সম্পর্কের ভরকেন্দ্র–যার অস্তিত্বে ভর দিয়ে সম্পর্কের বৃত্ত নির্মাণ। তাই তিনি অলৌকিক নন আবার আদ্যন্ত রক্ত-মাংসেও গড়া নন, তিনি অসুস্থ হলে সে অসুখ আশ্লেষে অন্যান্য সম্পর্কগুলোতেও প্রবেশ করে। ঈশ্বরের আরোগ্য কামনা এভাবেই বাস্তব জীবনের অসুস্থ সম্পর্কগুলোর আরোগ্য কামনা হয়ে দাঁড়ায়:

“আসুক, ওরা ফিরে আসুক, যারা চিরকাল

শুধুই চ’লে যাচ্ছে, এখান থেকে অন্যখানে

উৎপাটিত একগুচ্ছ কচি সবুজ দুর্বার মতো…

তার বদলে, ঈশ্বর, তার বদলে আসুক

তোমার কাঙ্ক্ষিত আরোগ্য।।”  (“আরোগ্য”, ‘প্রথম প্রত্যয়’)

সম্পর্কের ভাঙা-গড়ার প্রতি কবির আচরণ অনেকটা অস্তিত্ববাদী দার্শনিকের মতো। জাঁ পল সার্ত্র বলেছিলেন, “It is therefore senseless to think of complaining since nothing foreign has decided what we feel, what we live, or what we are…the peculiar character of human-reality is that it is without excuse”।

সম্পর্কের ক্ষেত্রে এইরকম ‘আত্মদায়’ স্বীকার করেন কবি। কোনো সম্পর্ক বহির্দেশের প্রতিকূলতায় বা অপর কারোর হস্তক্ষেপে ভাঙে না, তা ভাঙে নিজেদেরই দোষে:

“সেই ব্যক্তিগত ঘর যদি ভেঙে যায়–

নিশ্চয় নিজের হাতে শাবল চালিয়ে

খিলেন ভেঙেছো। খিলেনের চাবির পাথর

যে গড়েছে, শুধু তার চেনা।

নতুবা, পিত্তের দোষ দিয়ো।

অন্য-পরে পারে না এসব।” (“অভঙ্গুর’’, ‘স্বাগত দেবদূত’)

অবশ্য এই ‘আত্মদায়’ স্বীকার করে নিয়ে, আধুনিক অস্তিত্ববাদী দার্শনিকদের মতো কবি ‘God is dead’ ঘোষণার পরিবর্তে বলেন ‘আর পারে, কেবল দেবতা’। স্বাবলম্বী, স্বাধীন আত্মসত্তা এবং দেবতা সমরেখায় অবস্থান করে। সম্পর্কের ভাঙা-গড়া, সম্পর্কে অবস্থানকারী ব্যক্তির হাতে এবং ঈশ্বরের হাতে।

একদিকে সম্পর্কের নানামাত্রিক সংযোগে হৃদয়ের বিচিত্র সংরাগ, অন্যদিকে  বৃন্তচ্যুত নিঃসঙ্গ কবি-সত্তা–উভয়ক্ষেত্রেই দৈবের স্পর্শ অনুভব করেন কবি। তবে স্পর্শের সজীব উদ্ভাস নিঃসঙ্গ মুহূর্তেই। চাওয়া-পাওয়ার তীব্রতা ঈশ্বরের উদ্দেশে নয়, প্রিয়ের উদ্দেশে। প্রিয়কে উদ্দেশ করে কবির চাওয়া খুব বেশি না হলেও, তার তীব্রতার মাত্রা বুঝতে অসুবিধে হয় না:

“আমার চাওয়া কি তবে খুব বেশি ছিল?

চেয়েছি কেবল দু’টি চোখ, আর কিছু নয়

ভোর নয়, সন্ধ্যা নয়, মধ্যরাত্রি নয়—

অন্নবস্ত্র ছাদ নয় স্মরণ মনন কিছু নয়

মুহূর্তের মনোযোগ, পরের মুহূর্তে মুছে যাওয়া—’’ (‘ভালোবাসা ৬’)

বেশি কিছু না চেয়ে অল্প কিছু চাওয়ার ভিতরে নিবিষ্ট ব্যাকুলতা, তীব্রতা সম্পর্কের এমন এক অলৌকিকতা দাবি করে যে মহার্ঘ্য অলৌকিক স্পর্শের কাছে হাজার চাওয়ার ইচ্ছে তুচ্ছ হয়ে যায়–

“তবুও তো চাই কিছু জিৎ ইচ্ছের?

চাইবো তো কিছু জন্মান্তরী স্পর্শ?

আছে ইন্দ্রিয় যতদিন, থাক তীব্র

তৃণের সঙ্গে সূর্যকরের সাক্ষাৎ–” (‘ভালোবাসা ৩’)

প্রেমের ইন্দ্রিয়ানুভূতি অতীন্দ্রিয়তাকামী—তীব্র তৃণের সঙ্গে সূর্যকরের সাক্ষাৎ আসলে  প্রেমের কামনায় বিমুক্ত অনুভূতির মিশ্রণের ইঙ্গিত। ইন্দ্রিয়ানুভূতিকে যেমন আলাদা করা যায় না অতীন্দ্রিয়ানুভূতির থেকে, অন্যদিকে তীব্র তৃণের সঙ্গে সূর্যকরের সাক্ষাৎলগ্নে প্রিয় এবং ঈশ্বর একাকার হয়ে যান। তখন কবির আবেগাপ্লুত উচ্চারণ ঠিক কাকে সম্বোধন করে তা বলা দুঃসাধ্য। হয়তো প্রিয়রূপী ঈশ্বরকে বা ঈশ্বররূপী প্রিয়কে। কবি যখন বলেন:

“একবার আমার দিকে চোখ তুলে তাকাও

আমি তোমার চোখের মধ্যে একটু হাসি।…

তোমারি মতো একা ব্যাপ্ত

সহস্রাক্ষ সহস্রবাহু

অনাদি অনন্ত অজর

নিজের অস্তিত্ব নিয়ে অনুক্ষণ লীলায়িত

আমি

তোমার আশ্চর্য অনিবার্য সঙ্গী।” (“দ্বন্দ্ব”, ‘প্রথম প্রত্যয়’)

কার চোখের মধ্যে হাসতে চান কবি? কে এই ‘সহস্রাক্ষ সহস্রবাহু/ অনাদি অনন্ত অজর’? ‘আশ্চর্য অনিবার্য’ সঙ্গ মনে করিয়ে দেয় নবনীতার সেই উক্তি, “আপনার বলতে সঙ্গে আছেন, সঙ্গে থাকেন কেবলমাত্র ঈশ্বর।” তবে পারত্রিক চৈতন্যে ঈশ্বরকে ছুঁয়ে থাকেন না কবি। কবিতায় যতবারই ঈশ্বরের প্রসঙ্গ এসেছে, তা প্রিয় সম্পর্কগুলোর অনুষঙ্গে। প্রিয়মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রাথমিকভাবে ঘোষিত না হলেও, কবি যখন বাস্তব সম্পর্কের বিচ্ছেদ যন্ত্রণাক্লিষ্ট, বা অভিমানাহত, প্রতিশ্রুতির মিথ্যাচারণে দগ্ধ-বিশ্বাসী এবং

দেখেন নিকট সম্পর্কের ‘অনুদ্বিগ্ন পূর্ণচাঁদ শূন্যহাতে নেমে গেলো জলে।’ তখন কবিরও ‘উড়াল’ শুরু হয় ‘অন্য আকাশে’। প্রিয় মুখগুলোকে ভুলে যাবার উদ্দেশ্যে নয়, ‘ভাবানুষঙ্গের দায়’ তাঁর কাব্যলোকের অনুক্ষণিক প্রেষণা। একে একে সকলকে চলে যেতে দেখেও আন্তরিক প্রেরণায় বলেন:

“কখনো শৈবাল হ’য়ে আবার জড়াবো

ওই বর্ণহীন, নগ্ন নিমগ্ন কঙ্কাল

কে ভেবেছে,–এইভাবে নবীন, জান্তব

এমন অখণ্ড হবে জলের তলার জলকেলি?’’

 (“জলকেলি”, ‘স্বাগত দেবদূত’)

প্রিয়-মিলনের ভাবানুষঙ্গে মগ্ন সময়ে, যে ‘শুভ্র ধ্রুবতারা’-র সঙ্গে কবির সাক্ষাৎ হয়—তিনিই ঈশ্বর–বেদনার কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে যেতে দেন না, সম্পর্কের নির্জীব উপত্যকায় জীবনবিমুখ হতে দেন না, সব প্রেম, সব আলো, রং ফিরিয়ে দেন ‘অন্য আকাশ’-এ এক আত্মিক সুষমায়।

কবি উপলব্ধি করেন—নশ্বর জীবনে সবই ক্ষণস্থায়ী। যে কোনো আলিঙ্গন সময়-সমুদ্রে শামুকের খোলার মতো ভেসে যাবে। জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ মূল্য দিয়ে যাকে পাওয়া তারও পরিণতি অলীক ভাসানে। তবু মানুষ যত্নে রাখে প্রেম, প্রণয়। আগলে রাখে সকল নৈকট্য। কারণ:

“কবিতাও চলে যায়, সুতো ছেড়ে দিলে

মহাশূন্যে লাট খায়

পৃথিবী-সংযোগছিন্ন মহাকাশযান কোনো” (‘তত্রাচ, জীবন’)

প্রেমের ক্ষণস্থায়িত্ব, অনিশ্চয়তার মধ্যে একমাত্র স্বয়ং জীবনকেই কবি দেখেন সব উপেক্ষা, অবহেলা সত্ত্বেও টিকে থাকতে:

“তত্রাচ জীবন থাকে, যেমন তেমন

যেভাবে রাখবে, তেমনি…

তুমি যতোদিন।”

এই ‘তুমি’ ঈশ্বরকেই নির্দেশিত করে। যতদিন ঈশ্বরের মৃত্যু না ঘটছে ততদিন তাঁর সৃষ্ট জীবন যে-কোনো আধারে নিজের প্রাণস্পন্দনটুকু বজায় রাখবে। অধারটি হয়তো আমাদের সৃষ্টি—প্রেমের আধার। কবির কাছে কবিতাই সেই আধার নির্মাণের উপাদান। কিন্তু কখনও অগোচরে প্রণয়ের বন্ধন শিথিল হয়ে পড়লে আধারটিও দুর্বল হয়ে পড়ে—তখন জীবনকে একটি নির্দিষ্টরূপে ধারণ করাই দায় হয়ে দাঁড়ায়। জীবনের উপর আত্মকর্তৃত্বের অভাব জীবনকে স্বেচ্ছাচারী করে ঠিকই, কিন্তু এই স্বেচ্ছাচারিতায় সত্তার নিজস্ব ভূমিকা কতটুকু! প্রায় নেই বললেই চলে। এ একধরনের পরাধীনতা। একে যাঁরা টের পান, তাঁরা আত্মনিয়ন্ত্রণহীন স্বেচ্ছাচারিতায় বিতৃষ্ণ হয়ে প্রবল ঈশ্বরবিরোধী হয়ে ওঠেন, কেউ-বা ঈশ্বরকেই জীবন-কাণ্ডারী নির্বাচন ক’রে তাঁর শরণাপন্ন হন। বর্তমান কবি দ্বিতীয় দলের—

‘কাণ্ডারী তোমার হাতে ছেড়ে দিই সব ভাসা, ডোবা—’ (‘ভাসান যাত্রা’)

ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস অচ্ছিদ্র বলেই, প্রতিকূল সংগ্রামে ‘স্বাগত দেবদূত’-এর ভাস্বর উপস্থিতি কবির জীবনে, এবং কবির দৃঢ় অভিব্যক্তি:

“…তোমাদের পোশাকী ঈশ্বর

আমার সংসারে বাঁধা চিরকাল অন্য অঙ্গীকারে।

প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জন্মলগ্নে আমাকে ঈশ্বর:

‘তোমার আনন্দ কাড়ে হেন শক্তি রাখিনি সংসারে।’

এখন তাকেই ডেকে হেঁকে বলবো: ‘বুঝে নাও কড়ি

নৌকো ডুবু-ডুবু হলো, সুবাতাস ভরে দাও পালে।

অন্তত দেখুক ওড়া কার ভরসায় আমি লড়ি।’’

(“উন্মথিত”, ‘রক্তে আমি রাজপুত্র’)

 

নারী: এক বিবর্তিত সত্তা (নারীবাদের প্রেক্ষাপটে)

বিংশ শতকেই মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড ‘লিবিডো’ বা কামশক্তিকে মানবচরিত্রের যে-কোনো আচরণ এবং অভিব্যক্তির মূল বলে ঘোষণা করেছিলেন। ফলে প্রেম যে যৌনতানিরপেক্ষ নয়—প্রেমের এ অনিবার্য শারীর-সম্বন্ধ আগের শতকেই এক বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পেয়ে গিয়েছিল। সম্পর্ক দাঁড়িয়ে থাকল না কেবল বিশুদ্ধ আবেগ কিংবা হৃদয়ানুভূতির উপরে। উনিশ শতকের ছ’য়ের দশক থেকেই এই মত ব্যাপকভাবে প্রচলিত হল—‘The personal is political’।

১৯৭০-এ Carol Hanisch উক্ত উদ্ধৃতির শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখলেন। ১৯২৯-এ প্রকাশিত Virginia woolf এর ‘The Room of One’s Own’—এই আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থটিতে সমাজে নারীর অবস্থান এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোকে দেখালেন নারী-স্বাধীনতাকামী যুক্তিপূর্ণ আবশ্যকতার দৃষ্টিতে। ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার ১৯৪৯-এ রচনা করছেন ‘The Second Sex’। এই গ্রন্থে তিনি পুরাণ, ইতিহাস, মনোবিজ্ঞান, অস্তিত্ববাদ, ইত্যাদি নানান দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘তথ্য এবং কিংবদন্তী’-তে নারীর অবস্থানগত স্বরূপ বিচার এবং ‘নারীর আজকের জীবন’-এর পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে সর্বজনবিদিত এই মতকে প্রতিষ্ঠা দিচ্ছেন যে, ‘কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না, বরং নারী হয়ে ওঠে।’ স্পষ্টত নারীর যৌনপরিচিতি এবং লিঙ্গ-পরিচিতি দুটি স্বতন্ত্র মাত্রা পেয়ে গেল। লিঙ্গপরিচিতি সম্পূর্ণরূপে সামাজিক নির্মাণ, যৌন-পরিচিতি স্বাভাবিক। কিন্তু যৌন-পরিচয়েই বা নারীর সত্তার স্বাধীনবিকাশ কতটুকু? তা-ও কি পুরুষতন্ত্র শাসিত নয়? দ্বিতীয় পর্যায়ের নারীবাদীরা বোভোয়ারের দর্শন অবলম্বনে এই প্রশ্নই তুললেন। নারীবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হলেন মাননীয় ফ্রয়েডও। তাঁরা বিশ্লেষণ করে দেখালেন ইলেক্ট্রা কমপ্লেক্স, পেনিস এনভি, অবদমন ইত্যাদি ফ্রয়েডীয় ধারণাগুলো পুরুষতান্ত্রিক ভিত্তির উপর স্থাপিত। নারী ভগাঙ্কুরের মাধ্যমে যৌনসুখ অনুভব করবে নাকি যোনিকে গুরুত্ব দেবে তা নারীর স্বাধীন নির্বাচন। ফ্রয়েড মহাশয় তা স্থির করে দিতে পারেন না। ইলিয়েরসেন অভিযোগ তুললেন, “(যৌনবিজ্ঞানীরা) পরামর্শ দেন যে সঙ্গমের অবতরণিকা হিসেবে নাড়তে হবে ভগাঙ্কুরটিকে, সঙ্গমকেই অধিকাংশ পুরুষ মনে করে ‘আসল জিনিস’। নারীর জন্যে তা পুরোপুরি সুখানুভূতিহীন। ভগাঙ্কুরই হচ্ছে মূল জিনিস। যাকে বিনীত, লজ্জাশীল ও অনুগত নারীরা শত শত বছর লুকিয়ে রেখেছে।”

উপরের কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য হল এটা বোঝানো—পরিবর্তনশীল বিশ্বে নারীরা তাদের অধিকার এবং স্বাধীনতা সম্পর্কে যত সচেতন হতে থাকল, নারীবাদের নতুন নতুন ধারা এসে দর্শনে এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে যত প্রবল অভিঘাতের সৃষ্টি করল বিশ্বের নানা প্রান্তের সমাজে, সংস্কৃতিতে—ব্যক্তিগত জীবন বিশেষ করে নারীর ব্যক্তিগত জীবন চার দেওয়ালের চৌহদ্দি এবং হৃদয়ানুরাগের সীমা লঙ্ঘন করে তা বৃহত্তর সমাজিক কাঠামো, রাজনীতি, লিঙ্গবৈষম্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার্য বিষয় হয়ে উঠল। নারী-পুরুষের একান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কও হয়ে উঠল ‘রাজনৈতিক’। পুরুষের প্রতি সর্বাঙ্গীণ আনুগত্য, নিঃস্বার্থ প্রেমের একরৈখিক ধারণা বর্জন করে বিশ্বের চিন্তাশীল নারীদের লিখনে প্রকাশ পেল জটিল মনস্তত্ত্ব, স্বাধীন-আত্মতান্ত্রিক ব্যক্তিঅনুভূতি যেখানে শরীর নিরপেক্ষ আত্মিক সমর্পণের চেয়ে বড় হয়ে উঠল সূক্ষ্ম যৌনচেতনা, যে কোনোরকম লিঙ্গ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রতিবাদ। নারীর যে শরীর এতদিন পুরুষের দখলে ছিল, তার সুখ-স্বাধীনতাকে বুঝে নিতে চাইল নারীরা। Maya Angelou, Emily Dickinson, Sylvia Plath, Anne Sexton প্রমুখ কবির কবিতায় আধুনিক নারী-মন প্রেমের আবেগে-দ্বন্দ্বে খুঁজে নিতে চাইল নিজেদের আত্মপ্রকাশের ভাষা, আত্মবিকাশের স্ফূর্তি, শরীর-মনের পরিপূর্ণ অনন্দ উদযাপনের অবকাশ, সর্বোপরি ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে স্বাধীন বিচরণের সুযোগ। যখন প্রেমের মধ্যে এগুলো খুঁজে পাওয়া গেল, প্রেমকে তাঁরা পূজ্য করলেন, আর যখন সমাজ-রাষ্ট্রের রাঙা দৃষ্টি প্রেমের ছদ্মবেশে উপস্থিত হল, প্রেমকে পরিত্যাজ্য করলেন।

নারীবাদের দ্বিতীয় পর্যায় (১৯৭০-১৯৯০)-এর চিন্তাভাবনার প্রত্যক্ষ অভিঘাত লক্ষ করা যায় নবনীতার কবিতায়। সংসারে নারীর অবস্থান অবদমিত আর এই অবদমিত অবস্থান সম্পর্কে অধিকাংশ নারীই সচেতন নয়। গৃহবধূ স্বাধীনতা বলতে তা-ই বোঝে, তার স্বামী তাকে যেটুকু স্বাধীনতা দেয়। এর বেশি স্বাধীন হওয়ার চিন্তা স্ত্রী-ধর্মের পক্ষে ব্যাঘাতজনক। যুগযুগ ধরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দ্বারা পেষিত হওয়ার দরুণ নারীর এই মানসিকতা গড়ে উঠেছে। তাই নারীবাদের প্রধান লক্ষ্য যে নারীস্বাধীনতা, লিঙ্গসাম্যের প্রতিষ্ঠা, তা অর্জন করতে গেলে আগে নারীকে তার অবদমিত অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নারীকে সচেতন হতে হবে যে প্রেমের নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদনে মনুষ্যত্ব ব্যাহত হচ্ছে না তো, পুরুষের প্রদত্ত মূল্যে সত্যিকারের গৌরব কতটা আছে, আদৌ আছে কি-না, না-কি পুরুষ নারীর প্রেমের আত্মনিবেদনকে গৌরবান্বিত করছে—‘বিবাহ’ নামক এক শর্তমূলক সামাজিক কাঠামোয় তাদের বেঁধে ফেলে নিজেদের ব্যবহারের সুবিধার্থে। স্ত্রী-এর ভাবনা-চিন্তা সবসময় স্বামীর স্বীকৃতি-প্রদানের মুখাপেক্ষী, এমনকি এই স্বীকৃতি যদি চরম অবহেলারও হয়, তবু স্ত্রী খুশি হয় স্বামীকে মনোরঞ্জন করতে পেরে। সাংসারিক নারীর এই মানসিকতাকে নবনীতা বিদ্রুপ করেছেন ‘স্বামীর জন্যে টাটকা স্যালাড’ কবিতায়:

“আমার মাথার মধ্যে থরে থরে সাজানো রয়েছে

একরাশ টাটকা ভাবনাচিন্তা, তরতাজা,

আঃ কী ঝকঝকে সবুজ!…

স্বামীদেবতার জন্যে চমৎকার কাঁচা স্যালাড।”

(“স্বামীর জন্যে টাটকা স্যালাড”, ‘লায়নটেমারকে’)

উল্লেখ্য বিষয়: উক্ত কবিতাটি কবি উৎসর্গ করেছেন শ্রীমতী জারমেইন গ্রীয়রকে। গ্রীয়র একজন প্রখ্যাত অস্ট্রেলিয়ান নারীবাদী লেখক। তাঁর রচনা নারীবাদের দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্ভাবনে ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। বিশ শতকের সাতের দশকে (১৯৭০) অর্থাৎ নারীবাদ যখন নতুন করে তরঙ্গায়িত হচ্ছে, সে-সময় গ্রীয়র রচনা করছেন ব্যাপক জনপ্রিয় একটি গ্রন্থ, ‘The Female Eunuch’। সিমোন দ্য বোভোয়ারের মত অনুসরণ করে গ্রীয়রও এই গ্রন্থে ‘প্রেম’, ‘ঘৃণা’, ‘যৌনতা’ ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনার মাধ্যমে দেখিয়েছেন নারীলিঙ্গের নির্মাণে সামাজিক অবদমনের ভূমিকা। গৃহবধূর অসহায় নিঃসঙ্গতার কথা গ্রন্থটিতে ফুটে উঠেছে এইভাবে, “Many a housewife staring at the back of her husband’s newspaper, and listening to his breath on bed is lonelier than any spinster in a rented room’’। নারীর যে মানসিকতাকে নবনীতা বিদ্রুপবিদ্ধ করেছিলেন, সেই মানসিকতাই নারীকে অন্তঃসারশূন্য, একাকী করে তুললে কবির কথনে নারীর প্রতি সহানুভূতি জাগে:

“একচোখে অশ্রু ঝুঁকে আছে

অন্য চোখ খালি। অহর্নিশি।

তার কানে বাজে

বর্ষার ঝরনার মত্ত করতালি

সে-মেয়ে ঘুমিয়ে থাকে, এক চোখে

অ্রশ্রু নিয়ে, অন্য চোখ খালি।”

(“জন্মদিনের কবিতা”, ‘লায়নটেমারকে’)

এই অন্তঃসারশূন্যতা, একাকিত্বের জন্য নারী নিজে কতটা দায়ী? আসলে সমাজ সংসারের নিয়ম-কাঠামোই তো প্রকৃত দায়ী নারীর অশ্রুসিক্ত নিঃসঙ্গতার জন্য। আমেরিকার অপেক্ষাকৃত উন্মুক্ত সমাজেও কেন সিলভিয়া প্ল্যাথ, অ্যানি সেক্সটন-এর মতো প্রতিভাবান কবিদের আত্মহত্যা করতে হয়? সমাজ তো তাঁদের আত্মহননের দায় অস্বীকার করতে পারে না, আমরাও পারি না ‘ব্যক্তিগত’-র তকমা সাঁটিয়ে নির্লজ্জ পুরুষ-স্বার্থের রাজনীতিকে, নিয়মতন্ত্রের মজ্জায় প্রোথিত বানিয়ে তোলা পুরুষ-নারীর উত্তমর্ণ-অধমর্ণ অবস্থানকে বেমালুম ভুলে থাকতে। নারী যখন বুঝতে পারে সংসারের দুর্লঙ্ঘ্য চক্রান্ত, উপলব্ধি করতে পারে প্রবল লৈঙ্গিক অবদমন, তার মনের হতাশা, গ্লানি বাড়তে থাকে—এ অবস্থায় প্রেমিক পুরুষ অজ্ঞাতসারে শত্রুর স্থানে পর্যবসিত হয়। সিলভিয়া লেখেন:

“আর তোমার প্রথম ক্ষমতা হল সবকিছু পাথর করে দেবার

আমি জেগে উঠি এক জাঁকালো সমাধিতে; তুমি এখানে

মার্বেল পাথরের টেবিলে আঙুল ঠুকছ, সিগারেট খুঁজছ,

এক নারীর মতোই বিদ্বেষপূর্ণ, কিন্তু তেমন দুর্বলস্নায়ু নও,

আর মরিয়া হয়ে আছ যে এমন একটা কিছু বলবে যার কোনো উত্তর হয় না।”

(‘প্রতিদ্বন্দ্বিনী’: দ্য রাইভ্যাল)

প্রেমের রাশ হাতে রেখে পুরুষই বলতে চেয়েছে শেষকথা, নারী বাধ্য হয়েছে তা পালন করতে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, আত্মস্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে অর্জিত প্রেমের রাজদণ্ডধারী রূপ ক্রমে প্রকট হবার সঙ্গে সঙ্গে, নিঃস্বার্থ সমর্পণের অবমূল্যায়ন বুঝতে শিখেছে নারী। এর মধ্যেকার ‘ঐতিহ্যপ্রসূত’    মহনীয়তা শিকারি ও শিকারের বাস্তব সম্পর্কে জর্জরিত। প্রেমিক হলেন প্রভু, নারীর আত্মোপলব্ধি ‘শিকার’ হিসাবে। নবনীতা তাঁর কাব্যগ্রন্থের নাম রাখলেন ‘লায়নটেমারকে’ (১৯৮৯-১৯৯৫)। নামকরণের মধ্যে পুরুষতন্ত্রকে আক্রমণের প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত। তবে এই আক্রমণ, প্রতিবাদ ধ্বনিত হল নারীর নিজস্ব যন্ত্রণার সমাজতাত্ত্বিক প্রকাশে। কবি যেন নিজের থেকে এক নৈর্ব্যক্তিক দূরত্ব বজায় রেখে নিজের চোখে আঙুল দিয়ে নিজেকেই চেনাতে চাইলেন প্রহার-দগ্ধ নারীর বিকৃত স্বরূপ।

“প্রভুর কুকুর হয়ে কেটে গেছে অগুনতি বছর

কেবল বাতাস শুঁকে শত্রুতার গন্ধ চিনে নেওয়া

তারপর অবিশ্রান্ত যুদ্ধের হুংকার, ছুটোছুটি

শিকার কামড়ে এনে শ্রীচরণে নম্র নিবেদন

অতঃপর লেজ নেড়ে পদতল চেটে

বকশিশের অস্থিখণ্ড মুখে ধরে চুষির মতন

তৃপ্ত শুয়ে পড়া। এইভাবে ক্লান্তিহীন অগুনতি বছর

প্রভুর আদর।”

(“প্রভুর আদর”, ‘রক্তে আমি রাজপুত্র’)

আত্মছলনায় নিজেকে ভুলিয়ে রাখার মতো ‘প্রভুর আদর’-টুকুও যখন নারীর কপালে জোটে না, তখন নিজেই নিজের শিকার হয় নারী। ক্লান্তি, কান্না, অনুতাপমগ্ন ধিক্কার শাণিত ফলা নিয়ে তার দিকে ছুটে আসে, নবনীতার কণ্ঠে তখন বেদনার্ত চিৎকার:

“আকণ্ঠ চীৎকৃত কান্না,

শূন্যভেদী বিলোল ধিক্কার।

বহুকাল প্রভুহীন, বহুকাল পথের কুকুর।

বহুকাল, নিজেই শিকার।’’

(“প্রভুর কুকুর”, ‘রক্তে আমি রাজপুত্র’)

নিজেই নিজের বিষণ্ণতা, শূন্যতাবোধের শিকার হয়ে অ্যানি সেক্সটন, সিলভিয়া প্ল্যাথের মতো মহৎ কবিদের আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়। দিনান্তে আত্মিক মৃত্যুর (ontological death) মুখোমুখি হলে ‘জৈবিক মৃত্যু’ (biological death)-কে তাঁরা গ্রহণ করেন পলায়নবাদী মনোবৃত্তি থেকে নয়–বঞ্চনা, শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কার ও প্রতিবাদের স্বতন্ত্র ভাষা খুঁজে নিতে। অ্যানি সেক্সটন ‘SYLVIA’S DEATH’ কবিতায় নিজের মৃত্যু-আকাঙ্ক্ষা থেকে বলেন:

“crawl down alone into the death I wanted so badly and for so long,”

নবনীতাকে ইচ্ছামৃত্যুর পথ বেছে নিতে হয় না। কারণ পুরুষকে ভালোবাসলেও, তাঁর হৃদয় শেষপর্যন্ত পুরুষশাসিত থাকে না, ঈশ্বর তাঁর চেতনায় সাম্য, স্বাধীনতা, সৌহার্দ্য, মূল্যবোধের ‘ইউটোপিয়ান’ জগৎ নিয়ে আবির্ভূত হন—নবনীতার কাছে সে জগৎ অমোঘ বিশল্যকরণী যার স্পর্শে যে-কোনো আঘাত, কষ্ট, শূন্যতাবোধ নিঃশেষিত হয়ে পৃথিবীর সম্ভাবনাময় পরিসীমা বাড়িয়ে চলে:

“সুতরাং আমার আর ইচ্ছাশর্তে পতন হল না।

তিনি বাড়ালেন তাঁর অমোঘ অঙ্গুলি

তিনি বাড়ালেন হাত

স্পর্শ মাত্রে দাউদাউ জ্বলে গেল সমস্ত শূন্যতা।”

(“সুতরাং’’, ‘রক্তে আমি রাজপুত্র’)

প্রেমের প্রাথমিক রোমান্টিক বোধে অনেকটা রাবীন্দ্রিক সুরে আঘাতের পটভূমিকায় কবি সুন্দরের উত্তরণ নির্মাণ করেছিলেন। এই নির্মাণ সম্ভব ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ আঘাত-অবহেলার ভিতরেও গোপন প্রেমস্পর্শ নিহিত থাকে। ভালোবাসার অপ্রত্যক্ষতা সত্ত্বেও কবি সেই প্রেমস্পর্শের আঘাত পান বলেই সৌন্দর্যাভিষিক্ত হবার প্রয়াস অর্জন করেন:

“তুমি মেরেছিলে বলে আজ আমার ফুলন্ত বাগান।

প্রতিটি আঘাত কাঁপে কণ্টকিত কেতকীর ঝাড়ে…

কোনোখানে লেখা নেই সেদিনের বিস্মৃত বানান

সমস্ত বেদনা এক পুষ্পময় প্রহারে সংহত।”

(“পুষ্পিত প্রহার”, ‘স্বাগত দেবদূত’)

কিন্তু কবির সচেতন মানস, পরিণত বুদ্ধি সমাজ ও সময়ের অঙ্গীভূত হলে সম্পর্কের ছদ্মবেশী আব্রু খসে পড়ে, তখন ফুল ঝরে গিয়ে গোপন অভিসন্ধির মতো কাঁটাটুকুই টিকে থাকে। সেখানে আর নতুন করে মাধুর্যের চাষ করা যায় না। সৌন্দর্যের ভিতস্বরূপ আঘাতের কল্পিত অদৃশ্য সান্ত্বনা ‘কেতকীর ঝাড়ে’ কিংবা ‘পুষ্পময় প্রহারে’ সঞ্চিত থাকতে পারে না। চাবুকের দাগ, আর কালশিটে-তে জমা হওয়া অলজ্জ যন্ত্রণাটুকুই কেবল ব্যক্ত হয়, তিক্ত শ্লেষে:

“মনে থাকবে না? বাঃ! সবগুলো

চাবুকের দাগ, যত কালশিটে, সব

বাদামি চামড়ার নিচে ঢাকা।

খুব মনে আছে।”

(“লায়নটেমারকে’’, ‘লায়নটেমারকে’)

তবে নারীবাদ যৌনতা এবং নারীর কামপরিতৃপ্তিকে যে-মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে—তার সঙ্গে কবির ভাবনা-অনুভূতি হুবহু সমতুল নয়। নারীবাদ বলে, নারীকে প্রধানত নিজের শরীরের প্রতি অধিকার ফিরে পেতে হবে—যে শরীর পুরুষতন্ত্রের মুখ্য আক্রমণের বিষয়, এই অধিকার ফিরে পেতে গেল নারীকে তার কামনা অপরিতৃপ্ত রাখলে চলবে না, তাকে যৌনজীবনে স্বাধীন হতে হবে। মার্গারেট স্যাংগার বলেন, “কোনো নারী নিজেকে স্বাধীন বলতে পারে না, যে তার নিজের শরীরের মালিক ও নিয়ন্ত্রক নয়।’’ হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন,

“নারীর জীবনে কাম এক প্রধান ব্যাপার, তবে নারী যেমন তার জীবনকেই সমর্পণ করে কোনো পুরুষের কাছে, তেমনি সমর্পণ করে তার কামকেও। তার শরীর তার অধিকারে নয়, তার কামও তার অধিকারে নয়;…নারীর কামকে অপরিতৃপ্ত রাখাই পুরুষতন্ত্রের রীতি। নারী কামে সক্রিয় সম্ভোগী হতে পারে না, কোনো সংস্কৃতিই চায় না কামে নারী উদ্যোগী ভূমিকা নিক, সব সংস্কৃতিই চায় নিজের কাম দিয়ে নারী সেবা করবে পুরুষের।”

নারীর অস্তিত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত যৌন-আকাঙ্ক্ষা নবনীতার কবিতায় অত্মপ্রকাশ করে এভাবে:

“মূল ধরে নাড়া দাও–

মাঝে মাঝে দু’আঙুলে শুধু

মূল ধ’রে নাড়াচাড়া করো—

তখন ভিতর দিকে গভীর অরণ্য ভেদ ক’রে

অতিবৃদ্ধ বটগাছ আমূল উৎক্ষিপ্ত হয়—”

(“আমূল’’, ‘রক্তে আমি রাজপুত্র’)

তবে কবি পাশ্চাত্য নারীবাদীদের মতো পুরুষতন্ত্রের কবল থেকে নিজের শরীরকে মুক্ত করতে স্বাধীন যৌনসুখ উপভোগকে মাতৃত্বের অনুভবের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখেননি। তাঁর যৌন-সুখ কেবলমাত্র শরীরের স্বাধীন উদযাপনের জন্য নয়, টের পাওয়া যায় অতলশায়ী মাতৃত্ব-চরিতার্থতার কামনা (প্রচলিত যে মাতৃত্বের ধারণাকে নারীবাদীরা বর্জন করতে চান):

“পুরোনো মাটিতে

কুণ্ডের মতো গর্ত জেগে থাকে গভীর তৃষ্ণায়

আষাঢ়ের তিল-তুলসী চেয়ে…” (‘আমূল’)

পুরুষ নারীর এই মাতৃত্বের কামনা চরিতার্থ করতে না চাইলে, বা নারীকে মাতৃত্বের থেকে বঞ্চিত রাখলে, কবির আক্ষেপঘন স্বর:

“প্রতিশ্রুত ছিলে, কিন্তু

উদাসীন সঙ্গম নয়, ভিতরে ভিতরে

নির্বিকার হত্যা শিখিয়েছো।” (‘আমূল’)

পুরুষতন্ত্রের শোষণ, নারীর অবদমিত অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হয়েও এবং তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েও কবি নারী-হৃদয়ের শাশ্বত কামনার ঐতিহ্যবাহী। এখানেই মিলেমিশে একাকার হয় যায় একজন নারীর প্রেমিকা, গৃহিণী ও মাতৃসত্তা। শরীর এবং আত্মা মিশে গিয়ে অখণ্ড বোধের উন্মেষ ঘটায়:

“জিহ্বা তত দীন নয়,

জিহ্বা আরো গূঢ় ভাষা জানে।

এসো, চুম্বন দাও,

সেই ভাষা তোমাকে শেখাই

জিহ্বায়, ওষ্ঠাধরে, শিরাধমনীতে—

শ্রবণে যা শাশ্বত আধরা,

রক্তে কলস্বরা।” (“ভাষান্তর’’, ‘রক্তে আমি রাজপুত্র’)

যৌনতা ও মাতৃত্ব-কে অবিচ্ছিন্ন অনুভূতিরূপে দেখে কবি যেমন নারীবাদের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসেছেন, অপরদিকে ফ্রয়েডের নির্দেশকেও অতিক্রম করে গেছেন ভালোবাসার তীব্র আত্মিক অনুভবে:

“যখনই       আমাকে তুমি ভালোবাসো

এমনকি কপালের উড়োচুলও প্রণয়কাতর

ফ্রয়েডীয় তালিকার নির্দেশ ছাপিয়ে

যৌনতার তীব্রতায় হয়ে ওঠে কামনা কুলীন।

যখনই আমাকে তুমি ভালোবাসো।”

(‘‘ভালোবাসা ১’’, ‘লায়নটেমারকে’)

সম্পর্কের নানামাত্রা: আত্মস্বরূপের সন্ধান

বাস্তব জীবনের সম্পর্ক এবং কবিতায় কবি যে-সম্পর্কের কথা বলেন—দুইয়ের স্বরূপ সম্পূর্ণ এক নয়। জীবনানন্দ দাশ ‘বনলতা সেন’-কে নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতায় ‘নীরা’ এবং নিখিলেশ চরিত্রকে আমরা পাই। এই চরিত্রগুলিকে কবির ব্যক্তিজীবনে খুঁজতে যাওয়া বৃথা। ব্যক্তিজীবনের বাস্তব সম্পর্কগুলি দিয়ে কবিতায় প্রকাশিত সম্পর্কের স্বরূপ বিচার করতে গেলে কবিতা-শিল্পের বড় গুণ যে নৈর্ব্যক্তিকতা, সমালোচক তাকেই লঙ্ঘন করেন। তবে কি কবিতায় যে সম্পর্কের কথা বলা হয় তা বাস্তব জীবন-অভিজ্ঞতা বিবর্জিত? তা মোটেই নয়। সম্পর্কের এক ভিন্ন মাত্রা নির্মাণ করেন কবি। সেখানে ব্যক্তি আবহমানকালের মানব-সত্তার আড়ালে থেকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাগুলিকে সর্বজনীনতার আলোয় তুলে ধরেন। তাই, সুখ, দুঃখ, মান, অভিমান ইত্যাদি মনের বিচিত্র অনুরণন মহৎ জীবনরসে সম্পৃক্ত হয়।

নবনীতার কবিতায় বারবার এসেছে ভালোবাসার কথা,  ভালোবাসার প্রতিশ্রুত উচ্চারণ, আঘাতের ম্লান উদাসীনতা, এবং প্রেমের পূর্বস্মৃতির আকাশ পরিক্রমা করেছেন কবি। আমরা বুঝতে পারি ব্যক্তিজীবনের  প্রত্যক্ষ অভিঘাত ছাড়া এইসব শব্দপুঞ্জ-মেঘের সৃষ্টি হয় না, কিন্তু কবিতায় কোথাও কোনো ব্যক্তির নাম মেলে না, এমনকি কোনো চরিত্রের নামও নয়, সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে একটি মাত্র সর্বনাম ‘তুমি’। আশ্চর্য এই দ্বিতীয় পুরুষবাচক সর্বনামে কখনো উদ্দিষ্ট হয় কবিতা, কখনো ঈশ্বর, কখনো স্মৃতি-সত্তা, কখনো শাশ্বত পুরুষ, কখনো বা নারীর সামাজিক সত্তা।

“দু’একটা মুখের সামনে দাঁড়াতে পারি না

মনে হয় মুখ ধোওয়া নেই

মনে হয় মুখে বুঝি ময়লা লেগে আছে

কোনো কোনো মুগ্ধ মুখ দর্পণের মত স্বচ্ছ কিনা,

দেখা যায় স্পষ্ট নিজেকেই–

নিজের চেয়েও বেশি কাছে।” (“মুখোমুখি”, ‘রক্তে আমি রাজপুত্র’)

এভাবেই সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় কবির আত্মান্বেষণ, সম্পর্কগুলো তখন দর্পণের মতো যার সামনে দাঁড়িয়ে আত্মপ্রতিবিম্বে মুখ দেখেন কবি। সম্পর্কের উল্টোদিকে দাঁড়ানো মানুষটি বা সত্তাটি হয়ে ওঠে কবিরই এক বিকল্প সত্তা যাকে তিনি হারিয়ে ফেলেছেন, যাকে খুঁজছেন, বা যার জন্য কবি প্রতীক্ষারত।

===

তথ্যসূত্র:

১. দেবসেন, নবনীতা, জানুয়ারি ২০১০, নটী নবনীতা, ২য় সং, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, পৃ. ২৩

২.দেবসেন, নবনীতা, জানুয়ারি ২০১০, নটী নবনীতা, ২য় সং, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, পৃ. ৫০

৩. Wordsworth, William, 1801, Preface to the Lyrical Ballads, pdf, p. 15

৪. Sartre, Jean-paul, 1957, Existentialism and Human emotion, Castle, Los Angeles, p. 53

৫. Beauvoir, de Simone, 1949, The Second Sex (Le Deuxieme Sexe), (অনুবাদ: আজাদ, হুমায়ুন, দ্বিতীয় লিঙ্গ, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, পৃ. ১-৩০)

৬. আজাদ, হুমায়ুন, মার্চ ২০১৭, নারী, তৃতীয় সং, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, পৃ. ১৮৪

৭. Greer, Germaine, The Female Eunuch (Herper Collins e-books) p. 12-27

৮. আজাদ, হুমায়ুন, মার্চ ২০১৭, নারী, তৃতীয় সং, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, পৃ. ২২৮

৯. আজাদ, হুমায়ুন, মার্চ ২০১৭, নারী, তৃতীয় সং, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, পৃ. ২২৮-২৯

গ্রন্থসূত্র:

বাংলা গ্রন্থ:

আজাদ, হুমায়ুন। মার্চ ২০১৭। নারী। তৃতীয় সং। আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

আজাদ, হুমায়ুন (অনূদিত)। জুলাই ২০০১। দ্বিতীয় লিঙ্গ। আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

গুহ, অনসূয়া (অনূদিত)। জানুয়ারি ২০০২। নিজস্ব এক ঘর। দে’জ পাবলিশিং, ঢাকা।

চক্রবর্তী, ঊর্মিলা। নভেম্বর ২০১৪। সিলভিয়া প্ল্যাথ কবিতার জীবন জীবনের কবিতা। পরম্পরা, কলকাতা।

চট্টোপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদ। ২০০৯। নিষিদ্ধ কথা আর নিষিদ্ধ দেশ। নিউ এজ পাবলিশার্স, কলকাতা।

দেবসেন, নবনীতা। মাঘ ১৪০৯। শ্রেষ্ঠ কবিতা। ৩য় সং। দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।

দেবসেন, নবনীতা। জুলাই ২০১০। নটী নবনীতা। ২য় সং। আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

মুখোপাধ্যায়, ধ্রুবকুমার (সম্পা)। জুন ২০০৬। প্রেমমনস্তত্ত্ব রবীন্দ্রোত্তর কবিতা। রত্নাবলী, কলকাতা।

মৈত্র, শেফালী। নভেম্বর ২০০৩। নৈতিকতা ও নারীবাদ। নিউ এজ পাবলিশার্স, কলকাতা।

ইংরেজি গ্রন্থ:

Freud, Sigmund. The Psychology of Love. (Translated by Shaun Whiteside. 2006. The Psychology of Love. Penguin Books, London.)

Greer, Germaine. 1970. The Female Eunuch (Herper Collins e-books).

Sartre, Jean-paul. 1957. Existentialism and Human emotion. Castle, Los Angeles.

Wordsworth, William. 1801. Preface to the Lyrical Ballads. Pdf

শৌভিক পাল। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যানুরাগী। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতা। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কবিতার প্রতি কৈশোরের সখ্য আজ যাপনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বর্তমানে আধুনিক বাংলা কবিতার গবেষক।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ