নমিত সূর্যের দেশে

ঋতো আহমেদ
কবিতা
Bengali
নমিত সূর্যের দেশে

প্রতিবেদন

অজ্ঞাত সংখ্যক সদস্য নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির
প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে
এদেশের এমন ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির পেছনে কে দাঁড়িয়ে আছেন শেষ পর্যন্ত
কার পৈশাচিক হাত সৃষ্টি করেছে এই প্লাবন
আপনারা অবাক হবেন জেনে যে তিনি এমন‌ও হতে পারেন– হেন তাঁর রূপ

তিনি ঈশ্বর
তিনি প্রকৃতি তিনি জলবায়ু

আরও জানা যাচ্ছে যে তিনি একা নন
তাঁর সহযোগী হিসেবে আছেন ইঁদুর সম্প্রদায়
এবং সেইসব গো-মূর্খ কৃষকের বাচ্চা কৃষকেরা
যারা বাঁধ কেটে প্রতিটি যমুনায় ভাসিয়েছে প্রমোদ-তরী

ব্রাভো বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড
ব্রাভো পানি-সম্পদ মন্ত্রী
অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে প্লাবিত জনপদ থেকে জলের পাতাল থেকে
অভিনন্দন আপনাকে

এমন প্রতিবেদন পেয়ে আমরা ধন‍্য

এবার একটু আয়েশ করে এক কাপ উষ্ণ ও নরম ওম খাই
আর ব্যালকনিতে বসে উপভোগ করি জলের অঝোর ধারা–

“আজি ঝরো ঝরো মুখরো বাদল‌ও দিনে…”

 

আমাদের হস্তরেখায়

আমাদের হাতের পাতায় এমন একটি রেখা আছে
যার মধ‍্য দিয়ে এগিয়ে গেলেই
আসন্ন শীতে দেখা হবে সাইদুল অথবা শরিফুলদের সাথে
দিনান্তে যাদের শুষ্ক শরীর এক‌একটি অসহ ভার হিসেবে
প্রতিয়মান হবে প্রত্যেকের কাছে
এক‌একটি রাত হবে দীর্ঘ মহাকাল
নরক যাপন করতে হবে ওদের বরাবরের মতোই
সমস্ত রাত ঘন কুয়াশায় নিজেকে জড়িয়ে জীবনমৃত্যুর মধ‍্যখানে
অন্তরীণ থেকে কেউ কেউ
হয়তো ভূমিষ্ঠ হবে পরবর্তী প্রাতে আর
কেউ হয়তো অপলক তাকিয়ে থাকবে উর্ধ্বে দূর আ-র-শে

আমাদের হস্তরেখায় এইসব পথ যখন পৌঁছায় উত্তরে

কথা দিই বস্ত্র দেবার
কথা দিই অন্ন দেবার
কথা দিই ঠাঁই দেবার

কিন্তু কথা দিই না পাশে থাকবার

আমাদের হস্তরেখায় এইসব পথে সাইদুল অথবা শরিফুলরা
বরাবরই থাকে আদি ও অকৃত্রিম চেহারায়

প্রতিটি পরিক্রমায়

আর মৌসুমী আমি ও আমরা, আর আমাদের হাতের পাতা..

 

ধান্দা

অফিসের গাড়ি থেকে নেমে
প্রতি রাতে এমন টাইমেই ফিরি
৮ টা কী সাড়ে ৮ টা
কখনো হেঁটে আবার কখনো আলসেমি এলে রিক্সায়
অল্প কিছু পর আমার ফ্ল্যাট

সে রাতেও আলসেমি এলো

ভাড়া মিটিয়ে সদ‍্য কেনা জুতোয়
মুড়োনো পা-টা নামিয়েছি কি নামাইনি
অস্ফুটস্বরের কিছু একটা কানে এলো বলে মনে হলো

হয়তো আরও কটা টাকা বেশি ভাড়া দিতে হবে ভেবে
বিরক্তি ভরে তাকালাম ফিরে
আবছা আলোয় ১৬/১৭ বছরের দুটো আধোলাল চোখ
ভয় দ্বিধা ও লজ্জায় আনত
হয়ে বললো
“স‍্যার, আমি সিরাজগঞ্জ থেকে আসছি। এখানে ১০ নাম্বারে এক পরিচিত ভাইয়ের গেরেজে উঠছি। আমার মায়ের খুব অসুখ। চিকিৎসার জন্য ৬০ হাজার টাকা লাগবো। রিক্সা চালাইয়া ৬ হাজার টাকা জমাইছি..”

হ‌ইছে আর বলতে হবে না
বুঝছি
ব’লে থামিয়ে দিয়ে বললাম তোমার ভাগ‍্য খারাপ
এ মুহূর্তে আমার পকেট খালি
অন‍্য কারো কাছে দেখো..

গল্পটা বিশ্বাস হয়নি আমার.. অনেকেই এমন করে
সিম্পেথি অর্জন ক’রে টাকা নেয়.. ধান্দা

শার্ট প্যান্ট খুলে মানিব্যাগটা ড্রয়ারে রাখতে গিয়ে মনে হলো
ভুল হলো কী
যদি সত্যিই ওর মা অসুস্থ হয়ে থাকে
আমি ব‍্যালকনি দিয়ে নিচে তাকালাম
রিক্সাটি নেই

আমার মতো ভদ্রলোক স‍্যারের বিরক্তি অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্যে
কতটা বিস্মিত হয়েছিল ও
কতটা কষ্ট পেয়েছিল
কতটা অপমানিত হয়েছিল
হীনমন্যতায় ডুবে যাচ্ছিলো কি

হালকা দাঁড়ির কচি মুখখানা মনে করতে চাইলাম
মা-এর কথা ভাবতে গিয়ে
মনে পড়লো নিজের মা-কে

কীভাবে পারলাম আমি
আর কী দেখা হবে ওর সাথে

আজ‌ও ওখানে নেমেছিলাম
অনেকগুলো রিক্সা অনেক অনেক মুখ.. “স‍্যার ক‌ই যাইবেন আয়েন”

আমি হেঁটে বাসায় ফিরলাম

 

ডায়েট প্ল্যান

কোলবালিশের মতো মোটা চাল‌ও আজকাল বাজারে হাঁকছে
সত্তুর
আমি কী খাবো
আমরা কী খেয়ে বেঁচে থাকবো

মানছি বয়স হচ্ছে
দু’বেলা রুটিতে আমার এখন ডায়েট প্ল্যান নেবার সময় এসছে–
তা না-হয় নিলাম‌ও

কিন্তু
যেসব রিক্সায় বাসায় ফিরছি প্রতিদিন
যে লোকগুলো হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকছে মসজিদের পাশে
যে দাঁড়োয়ানটি গেট খুলে দিচ্ছে আমি এলেই
তাদের জন্য কী প্ল্যান মাননীয় খাদ্য প্রতিমন্ত্রী

যেসব হাজার/সহস্র শ্রমিক আমাদের কারখানায় অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে
এনে দিচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা
তাদের জন্য কী প্ল্যান আপনার
কী প্ল‍্যান কোদাল ও খাঁচি হাতে ঘর্মাক্ত ওইসব দিনমজুর-এর জন্য
নির্মাণ শ্রমিকের জন্য
কী প্ল্যান আজ নিম্ন মধ্যবিত্তের সংসার চালানোর

আমরা কি ভাতের বদলে আলু খেয়ে বেঁচে থাকবো
ফ্রেন্চ-ফ্রাই বার্গার অথবা হট-ডগ..

 

সাইনবোর্ড

‘এই উদাসী হাওয়ায় পথে পথে মুকুলগুলি ঝরে
আমি কুড়িয়ে নিয়েছি তোমার চরণে দিয়েছি..’

এইরকম অসম্ভব সুন্দর এক সুর লহরীর ভেতর দিয়ে যখন
এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা
আমাদের সেই আ-ন-ন্দ-লো-কে
ঠিক তখনই
শহরের কোথাও কোনো এক রাজপথে
হঠাৎ
কাঙ্ক্ষিত ও মনোমুগ্ধকর এক সাইনবোর্ড আমাদের
দৃষ্টিকে আকর্ষণ করে
আর আমরা ধীরে এবং আরো ধীরে নির্ভার হ‌তে গিয়ে
স্বস্তির কিছু নিঃশ্বাস ফেলি ও
প্রফুল্ল হ‌ই

কিন্তু কে জানতো

এখানে কোনো হাওয়ার‌-ই আসলে উদাস হ‌ওয়ার কোনো উপায় নেই
কেননা
বাতাস এখানে অসুর
আর শব্দ মানে সেইসব অবাঞ্ছিত আওয়াজ
যা একনাগাড়ে ঢুকে যায় আমাদের কর্ণকুহরে আর উদ্রেক করে
বিরক্তির
উৎপাদন করে ঘৃণার

কী মানে হয় এইসবের যদি

‘ভিক্ষুক মুক্ত ঘোষিত এলাকা’ লিখার পর‌ও ওইসব
ফকিন্নির বাচ্চা ফকিন্নিরা একে একে আসে
হাত পাতে–
আমরা কি দানবীর হাজী মোহাম্মদ মহসিনের বংশধর যে গাড়িতে যাবো আর
ডলার ছিটিয়ে দেবো প্রত্যেককে
ওরা কি জানে না
এই বাংলায় কোনো গরীব থাকবে না– আর– ভিক্ষুক তো নয়ই
শালারা কি জানে না এটা বঙ্গবন্ধুর মহান স্বপ্ন ছিল
যা আজ
আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অসামান‍্য অঙ্গীকার হিসেবে প্রতিয়মান এখানে

 

একটি শিরোনাম

প্রথমে ৮ শেষে ১
মাঝে একটি কমা’র মাধ‍্যমে আগুন ও মৃত্যুকে দুটি পৃথক সত্তায়
আলাদা করা হয়েছে
পাশাপাশি
সাদা ও কালোয় লিখে-
তবে এখানে মৃত্যু কেবল মৃত্যুই নয়
কেননা
একটি বুলেট
মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলে তা আর নিছক মৃত্যু থাকে না
প্রকৃতপক্ষে
‘হত‍্যা’ নামক অদ্ভুত ও ভয়ানক ব্যাপার হয়

যা আমরা বুঝতে পারি ফেসবুকের একটি আপত্তিকর স্ট্যাটাসের পর

 

গুম

জানা গেছে
গুম শুধু এদেশেই নয়
বৃটেন আমেরিকা সহ পৃথিবীর অন‍্য অনেক দেশেই হয়

আসলে গুম শব্দটি আন্তর্জাতিক স্তরের
এটি একটি অতি উচ্চমাত্রার মানসম্পন্ন অর্থবহ শব্দ..(যাহা
অতীব গুরুত্বপূর্ণ)

অত‌এব গুম নিয়ে ঘুম দেয়ার কোনো সুযোগ নেই মাননীয়
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
আপনি জাগুন
আসন্ন অধিবেশনে উত্থাপন করুন-
আমরা চাই
‘গুম: দমনের একটি বৈধ পদ্ধতি’ হিসেবে স্বীকৃতি পাক
সর্বসম্মতিক্রমে ‘হাঁ’-কে জয়যুক্ত করুন আপনারা-
কেননা

আমরা সবাই গুম-কে চাই
আমরা সবাই গুম হতে চাই

বৈধ গুম

 

কচুক্ষেত

মৃত্যুর আগে কী খেতে চাইবো আমি

মনে আছে ৯ বছর পূর্বে আমার শশুড় তখন খুব অসুস্থ হয়ে
গলদা চিংড়ি খেতে চেয়েছিলেন
বড় বড় সুন্দরী বাইম খেতে চেয়েছিলেন
আমরা দিইনি
ডাক্তারের বারণ ছিল

অথচ বাঁচলেন না

আমিও তো মৃত্যুর আগে কিছু একটা খেতে চাইবো নিশ্চয়ই
কিন্তু সেটা কী
ঈশ্বর ভদ্রলোক আমার অদৃষ্টে কী লিখে রেখেছেন
জানতে ইচ্ছে করছে

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী
এ বিষয়ে আপনার শরণাপন্ন হতে চাই
একের পর এক
প্রশ্নপত্র ফাঁসের যে ভয়াবহ ইতিহাস সৃষ্টি করে চলেছে আপনার দল
ভেবে দেখলাম একমাত্র আপনিই পারেন
আমাকে সাহায্য করতে

ফাঁস করে দিন আমার অদৃষ্ট

ফেসবুকে..
হোয়াটসঅ্যাপে..
ভাইবারে..
অথবা চাইলে ইমোতেও দিতে পারেন

উপযুক্ত মূল্য দিতে দ্বিধা করবো না.. আপনি দিন

এ দেশের সাধারণ মানুষগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে
শিক্ষা ব্যবস্থার যে চৌদ্দটা বাজিয়ে যাচ্ছেন আপনারা
সে তুলনায় ..
আমিও না হয় ঈশ্বরকে আজ একটুকরো কচুক্ষেত দেখিয়ে দি

 

একটি একশান সিন

স্থানীয় উঠতি বয়সের হামলাকারীরা পালানোর সময় পুলিশ
গুলি চালালেও তাদের কার‌ও গায়ে লাগেনি..
অত‌এব, পুলিশ সম্প্রদায়ের ট্রেনিং প্রয়োজন
নিখুঁত নিশানা লাগানোর ট্রেনিং
শুটিং
(লাইট ক্যামেরা একশান নয় কিন্তু)
শুটিং মানে শুট + ইং .. মানে ঢিসিয়া.. ঢিসিয়া..

পশু শব্দটি সন্মানের

পশু শব্দটি সন্মানের সাথে উচ্চারণ করুন
কারণ সে পশু
মানুষ নয়

পশু শব্দটি ইজ্জতের সাথে উচ্চারণ করুন
কারণ সে পশু
পুরুষ নয়

পশু শব্দটি সম্ভ্রমের সাথে উচ্চারণ করুন
কারণ সে পশু
পিশাচ নয়

আপনারা জানুন
আপনারা শিখুন
আপনারা জাগুন

নয়তো যে হারামজাদা পশুদের নাম গালি হিসেবে ব্যবহার
করবে
আমি হলফ করে বলছি
আজ থেকে তার গালে আমার জুতো।

ঋতো আহমেদ। কবি ও প্রকৌশলী। পৈতৃক বাড়ি মুর্শিদাবাদ। জন্ম ময়মনসিংহ শহরের কালিবাড়ি বাইলেন, কর্মসূত্রে ঢাকায় বসবাস। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট থেকে শিল্প প্রকৌশলে স্নাতক। বর্তমানে একটি টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: 'শতাব্দীর অপার প্রান্তরে', 'ভাঙনের...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ