নষ্ট অনির্বাণ

উজান উপাধ্যায়
কবিতা
Bengali
নষ্ট অনির্বাণ

দুটোই তো মাত্র চাওয়া ছিল

প্রতিটি মানুষের জোড়া ওষ্ঠভাঁজে রাষ্ট্রসংঘ
চুমু এঁকে দেবে
এভাবেই পৃথিবী বানিয়েছিলাম
গোলাপবাগান বানিয়েছিলাম
ভেলভেটে মুড়তে চেয়েছিলাম মানবহৃদয়
আলতো নরম এক চুমু শুধু
প্রতিটি শুকনো চোখে একরাশ স্বস্তি
গরমভাতের মধ্যে মা বাবা সন্তান
উপুড় হয়ে আকাশ দেখবে
এই যেমন কবিতা খুঁজেছিলাম
মানুষের দুদন্ড শান্তির জন্য
কী পেল্লাই আয়োজন করাও হয়েছিল
বড় বড় প্রাসাদতোরণ
চোখ ধাঁধানো আলো
পাথুরে রাস্তায় নরম কার্পেট
এখানে ওখানে সেখানে
শুধুমাত্র কবিতার জন্য ম ম করছে চন্দনসুবাস
ছুটতে ছুটতে হন্যে হয়ে গেলাম
একবার এপাশ একবার ওপাশ
বৃষ্টি নামল হুড়মুড়িয়ে
ভিজে যাচ্ছে চতুর্মাত্রিক বিশ্ব
সব আছে
শুধু ওই দুটো নির্ভেজাল জিনিস ছাড়া
ক্লান্ত বিষণ্ণ দেহটাকে দূরে ছুটে এসে নদী পাড়ে
এক প্রকান্ড মাঠে ঘাসের উপর ছুঁড়ে দিলাম
পিতামহ এত কিছু জোগাড় করলে
শুধু একটু নিষ্পাপ চুম্বন আর একটা স্নিগ্ধ শান্ত কবিতা
পারলে না
তোরণগুলো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাসে ভরিয়ে ফেলছে ফোকলা আকাশ।

নষ্ট অনির্বাণ

ভেবেছিলাম মেয়েটি আমাকে চিনেছে।
ভেবেছিলাম, আমাকেও চিনেছে মেয়েটি। ভেবেছিলাম, মেয়েরাও আমাকেই চেনে। অবলীলায় তাই উলঙ্গ হয়েছি। আমি কাপুরুষ, এইবার দেখানোই যায়।

তাই সব পুরুষাঙ্গ ছিঁড়ে, মাছেদের ভিড়ে, মাছিদের ভিড়ে-
উদ্বাস্তু শিবিরে অশনি সংকেত দিয়ে ভালোবাসা লেখার ভনিতায়।

ভেবেছিলাম, মেয়েটিকে চিনেছি। ভেবেছিলাম চিনেছি তাদের-
আহ্লাদের মাথা খুঁড়ে, পৃথিবীর সমস্ত আস্তিনে-
আমিই পেরেছি চিনে
পথের ভিতর থাকে প্রবঞ্চক প্রহরীর লাশ চেটেপুটে খুব বুঝে নিতে।

আমার শরীর থেকে সম্পূর্ণ প্রেম উপড়ে ফেলে দেখেছি এক চতুর বাল্মীকি নারীবর্জিত একাঙ্ক নাটিকায় হৃদয় লিখতে ভুলে যাচ্ছে।
পিতা আর পিতামহ- আমার মতো চিনে ফেলেননি মেয়েটিকে-
তাই তো এ অন্তহীন সুন্দরের নির্যাসে আবহমান গড়েপিটে নিচ্ছে নষ্ট অনির্বাণ।

 

আলো

আলো বেচাকেনা করব। এখন যে নাম কুড়নোর নির্লজ্জ লেজ উঁচিয়ে দৌড়নোর কাজটা করি, সেটা থেকে স্বেচ্ছাবসর নিয়ে ভাবছি আলো কিনব। প্রথমে চার মুঠো, তারপর যেমন লাভ তেমন ইনভেস্টমেন্ট। কয়েকটি প্রাচ্য আর কয়েকটি পাশ্চাত্যের জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্র উটের পিঠে চাপিয়ে বালির ভিতর থেকে আলো তুলে আনার ওয়েভ ক্রিয়েট করব। পুরনো যা যা আত্মতৃপ্তি জমেছে, দেওয়া নেওয়া চাওয়া পাওয়ার মৌচুক্তির ভিতরে হালুম হুলুম হুলুস্থুল গড়িয়ে গেছে অন্তর্গত উচাটনে-সেখানে দুবেলা আলোর চাষ-হ্যাজাক লন্ঠন আর বিদ্যুৎ এর অতি পরিবহন- চাঁদ তারা জোনাকি ও চন্দননগরের উৎসবের প্রণালী। আলো খুব আবেগবিহীন আড়ম্বর-ওতে বুঝি তেমন শিল্প চিত্রকর্ম এমনকি ছায়াছবি থ্যাটার ফ্যাটার দাঁড়ায়না- এই যে গুজবের কান-সেইসব গভীর শোকের ভানে অন্ধকার ভাষ্কর হতে জানে। অন্ধকারের হাতে চলে গেছে প্রজাপতির হালভাঙা নাবিকের নেশা এবং ব্যাবসা যত অতীতের, প্রণয়ের – বাহান্ন পর্বের সব অচল সংলাপ-ওখানেই জিগির উঠেছে জনপ্রিয় সমবেদনার।

ষোলো আনার আলোর কারবার নিয়ে এই যে তোড়জোড়, জানিনা এসবের জন্য কেউ কোথাও পারিতোষিক রেখেছে কিনা। একদমই জরুরি নয় বলেই খুচরো জীবন থেকে দশাসই আকারে সাজিয়ে তুলছি এই আলোর বেচাকেনা। বয়সের নামগন্ধ, অনুশোচনার ধারবাকি এবং আসল সুদে প্রবল হয়েও যার অনন্তের কাছে কোনও দিন মূল্য রইলনা- সেই আলো মাটিতে ছড়িয়ে এইবার বিক্রি করব উজ্জ্বল আকর্ষণের সমস্ত প্রতারণা।

 

নষ্ট শ্লোকের

লেখা অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভিতরে যেসব চারকোলদাগ-সালফার গন্ধে সেসব এখন শব্দের চেয়েও বেশি উচ্চারিত। কোট মার্শাল আর পোস্টমর্টেম পেরিয়ে উঠতে উঠতে উবে যাচ্ছে অন্তরীণ সব কোড। ব্যক্তিগত ফ্রেমের হাত থেকে নিস্তার পাচ্ছেনা ফুল পাখি এবং নদীরাও। ক্রোধ এখন বিচারক। তাই জীবনানন্দ ড্রেনেজের সাথে তলিয়ে যাচ্ছেন, ডেন ব্রাউন আর বুকোওস্কি ফুটপাতে হিমশিম খাচ্ছেন প্রেমের অন্তরালে। প্রকৃত হস্তরেখার খাপে আটকে যাচ্ছে লোভাতুর পুরুষ। এই এক নারী, এই এক শহরের বাড়ি- কতবার সিঁড়ি বেয়ে সাঁকো চড়ে পাতালে নেমেছে দুবৃত্ত বাউল। বিকেলের রঙে তন্ময় ফেরিওয়ালা শরীর থেকে ছাড়িয়ে নিচ্ছে প্রত্নতত্ত্ব। নিবৃত্তির সাথে লিপিবদ্ধ থাকেনা সময়। এইটুকু স্বীকারোক্তি অবশিষ্ট থেকে যায়, অথচ জানাই ছিল- নিঙড়ে ফেলা ছায়াস্বর, অভিব্যক্তির গুপ্ত ভাস্বর আলো, অনুপম অন্ধকারের সত্যিই কি কোনও পাঠ হয়! কে তবে পাঠক…কেন তার অধিকারবোধ শব্দের পাঁজরে ঢোকার-ওখানে যে বৃষ্টি মেঘ কুয়াশাপ্রত্যয়-তার কাছে স্মৃতিজল, রক্তছাপ, প্রণয়-বিস্তার- এইসব মিথ্যে বলয়ে ঘেরা নির্বাপিত বোধিগাছে ভরে ওঠা শুধু।

কে করবে পাঠ অনর্থক এই নির্মাণের-কে হবে পাঠক এই স্থবির বিস্ময়ের অন্তহীন ঝোঁকে।
অনন্ত আসলে এক মিথ্যে প্ররোচনা- ক্রমাগত আমাদের ব্যস্ত করে রাখা অতিকথনের পাঁকে-
অতিক্রম কে করবে এই নিঃস্ব বিস্ফোরণ-এখানে কবি ও পাঠক যুথবদ্ধ নির্বুদ্ধিতায় আয়োজন করে যাচ্ছে এক পরম প্রহসন-
কে আছে পাঠক আর কে আছে লেখক এই নষ্ট শ্লোকের…..

ভালো মানুষ

মা তখন পুড়ছেন। বাবা কবরের ভিতরে ঘাপটি মেরে ঐ আগুনের কিছুটা টেনে নেন।
বাগানের পশ্চিমে যে মেহগনি গাছ রথের মেলা থেকে আনা, গাছ ব্যবসায়ী হাতে দিয়ে বলেছিল।
বড্ড ভালো ছেলে তুমি। তোমার কাছে পয়সা নেবোনা।

বাবা বলেছিল, সে কি করে হয়। আপনার তো লোকসান।
–না না, ও কিছু নয়।
দেখবেন, এই গাছটা ওর খুব বন্ধু হবে।
ভালো ছেলে।
বাংলার স্যার বলেছিলেন, জীবনে কখনও মানুষকে ছোট করে দেখবি না।
তুই সত্যি খুব ভালো রে, পাক্কা ভালো মানুষ হবি। দেখে নিস।
মেয়েদের তাকিয়ে দেখবি মাথা উঁচু করে, যেন ওরা সব হিমালয়ের অংশ।
ভালো ছেলে তুই, কাউকে আঘাত করে কষ্ট দিলে মার চিতা নিভবে না কোনওদিন।মনে রাখিস।
এখন মেহগনি গাছটার অনেক দাম।
যদিও আমাদের বন্ধুত্ব তেমন আঁঠালো নেই আগের মতো।
চাল বাড়ন্ত হলে, মেয়ের ওষুধ ফুরোলে, বউএর হাঁফের টান খুব বেড়ে গেলে বারবার লোক ডেকে ওর দরদাম করি। কত টাকায় বেচে দিলে লোকসান হবেনা একেবারে!
ভালো ছেলে বলে ওঠে মেহগিনির লুকোনো হৎপিন্ড।
আদ্যোপান্ত গাছ বেঁকে বসে।
একা রেখে যেতে ভয় পায় খুব।
আকাশ বললো, ভালো ছেলে।
নদী বললো, ভালো ছেলে।
পাহাড়, পাখি, রাতের নক্ষত্রেরা বললো, এমনটি আর দেখিনি। বড্ড ভালো ছেলে।
জোনাকি আর প্রজাপতি আমার জামার বোতামে, বুকপকেটে খুনসুটি আর চু কিতকিত।
ভালো ভালো ভালো,
বড্ড ভালো ছেলে।
এখন মেয়ের শরীরে দাঁতাল পোকা, মেহগিনির উঁচু ডাল থেকে ঝুলছে অর্ধাঙ্গিনীর লাশ।
স্থানীয় প্রশাসন এসে বললো, ভালো মানুষ।
পাড়ার মাতব্বর চোখ মুছলেন, এত বছর দেখছি, তুলনাই হয়না।
ভালো মানুষ।
বন্ধু কবি, কাঁধে হাত রেখে বললো–
এখন কদিন কলমে কাজ নেই – ভালো মানুষ তুই, সামলাতে পারবি না।
আমার ধর্ষিতা মেয়েটি ছুটে এসে আমার গোটা শরীর আঁচড়ে কামড়ে জামা প্যান্ট গামছা লুঙ্গি ছিঁড়ে কুটিকুটি করে আমাকে উলঙ্গ করে মেহগনি গাছে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে চাবুক মারতে মারতে চীৎকার করে উঠল-
শালা।
মর্কট, বেজন্মা, নপুংসক।
অমানুষ, অমানুষ –
তুই একটা অমানুষ।

 

জন্মান্তর

চল মেয়ে নেয়ে আসি তোর সাথে
নক্ষত্রের গভীরে এক স্নান
জলকেলি হল তো অনেক
এবার আগুনে ধুয়ে সেরে নিবি
অসম্পূর্ণ সব উপাসনা!

শরীরে অসুখ তোর
ঘাসজন্মে জমে গেছে ঋণ
নিপুণ বুননে তুই নারী
প্রকৃতির অসীম সাধনা
মায়াবী উঠোনে লেপে রাখা
তিমির স্নিগ্ধ মাদকতা-

আমি তো দহনজাত ছাই
তোর গুপ্তস্বরে আমি তো
নিজেকে খুঁজে যাই!

নিমগ্ন গিরিপথে
গুহাগর্ভে বিলীন হয়েছি
নারী ও নাবিক পাশাপাশি-
দশদিকে মশালের উষ্ণতর ঘ্রাণ!
চল তবে এই পর্বে
ছায়াপথে শুদ্ধতা কুড়াই
সেরে নিই আলোকিত মৈথুন
গহনে চুম্বন রেখে…

পরজন্মে রাধা হয়ে যাব!
মধুবংশী গলি জুড়ে
বসন্তের আবীর ছড়াব।

উজান উপাধ্যায়। কবি। কবিতাপুরুষ। জন্মের আগেই প্রথম দোয়াত শূন্যে কুড়িয়ে নেওয়া। যাপনের প্রতিটি কার্নিশে, ভ্রমণের প্রতিটি আক্ষেপে কবিতার মেয়ে কবি উজানের অক্ষরবৃষ্টিকে ছুঁয়ে থাকে প্রেমে-অপ্রেমে। শুষ্ক নগরীতে ভালোবাসা লিখতে এলাম - এই উচ্চারণে একাকীত্বের গর্ভে লালিত তার নির্জন, ম্যাজিকাল, অভিকেন্দ্রীয় রূপান্তর।...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..