নাইটোকোফেলিকা

ইশরাত জাহান
কবিতা
Bengali
নাইটোকোফেলিকা

হৃদমন্ত্র

হা’তে জোনাক জ্বেলে দিয়েছিলাম
ছিলো, চোখের তারায় চাঁদের নীলাভ আলো,
মহাকর্ষের সীমানা পেরিয়ে, আরও বহুদূরে
ছড়িয়ে মিশিয়ে দিয়েছিলাম
ইথারের কম্পনে কম্পনে হৃদমন্ত্র,

কোন কোন ইনসমনিক রাতের শেষে
মিলিয়ে দিয়ে নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসের শব্দদের,
হাজারো কাঙ্খিত সেসব ঘুমেদের ডাকে,
তন্দ্রালু চোখে কত, কতবার হেঁটে চলেছিলাম
মৃত শব যাত্রার দলের, একাকী যাত্রীর মতন।

বহু অলিখিত, অলঙ্ঘনীয়, অমীমাংসিত সেসব ক্ষণ,
বিষাদে তেমনি বিষাদিত দিন বয়ে চলে অবিরাম
তিরতিরিয়ে শান্ত দিঘীর জলে লাগে,
কারো, মৃদু হৃদকম্পন।
মুর্হু মুর্হূ ভাবনার অতলে কখনও কখনও প্রলম্বিত
মৃতপ্রায় আবছায়া সে কৃশকায় অবয়ব।

সয়ে যায় সেসব সান্তনার বাণী
এবার নয় তো কি? পরের কোনবার
পরিভ্রমণ, পরিব্রজও একসাথে,
কখনো ইথারে, আবারো মর্ত্যে, আবারো উর্দ্ধলোকে,

পরের কোন পথে শপথ কড়ে আঙুল ছুঁয়ে
হাজারওবার নয়, একবারই শুধু।
অপেক্ষারাও নির্বিঘ্নে চেয়ে থাকে
নোনা জলে মেশা,ধোয়া ওঠা চায়ের কাপে।।

 

নাইটোকোফেলিকা

এরকম পতিত পবনের তোড়ে
ঝরে যেতে ইচ্ছে করে, চিরতরে,
এক পলকে সহস্র মেপলের পাতার মতন।
যা চাওনা কখনও তুমি,

ছু্ঁয়ে যাক ঈর্ষারা, অহংয়েরা কখনও তীব্র হিংসারাও
একাকী যখন শুধুই বিন্দু
কি আসে যায় কেন্দ্রের দূরত্বতায়?
ঘূর্নণের মাত্রারা আজীবন এক অদ্বিতীয়
অথবা তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম…..

বা, অসীমের কোন সুত্ররাও
আসে না ক্ষমাহীন চোখে নিস্তব্ধতারা
নাইটোকোফেলিয়া অন্ধকারে হাতড়াতে পারে
অবলীলায়।

যেমন ষষ্ঠ, সপ্তম অষ্টম… ইন্দ্রীয়রা
সদা জাগ্রত।
শ্রবনন্দ্রিয়রা কুহুকর্ণে সজাগ অবিচল
মস্তিষ্কে নিউরনেরা ব্রেইলিয়ে
সবজান্তা যেমন,

চায় তো অতলান্দ্রিয় সে কথা শোনাবার
যা বলতে, শুনতে চায় সে হাজারও বার।।
একা ছিলাম ;
একাকিত্বও তখনও সাথেই ছিলো
কিন্তু এতটা একা তো ছিলাম না কখনও!

কষ্ট ছিলো, ছুঁয়ে যাওয়া পলকহীন হাওয়ার মতন
হারাতো নিমিষেই, ফিরতো কখনও সখনও
এতটা গভীর বিষাদতো ছিলনা
যতটা এখনও,

খুব পিপাসিত ছিলাম
তবুও আর্দ্রতা ছুঁয়ে যেত
কখনও শীতলে কখনও শান্তিতে
কেন এক সমুদ্র পিপাসিত
জীবন এখনও?
ভুল ছিল, কত শত
ভুলে যাবার বাহানা হাজারও
বারবার ভোলার তাড়নারাও তখনও
আজন্ম ভুলে না যাওয়ার মতন ভুল
জীবনের ভুলান্তে কেন এখনও??

 

ভুলান্তে কবিতারা

১.

বাস্তবতা সবই মোহময়
তুমি আমি বা সে অথবা তুইয়েরা
বা তাদের অস্তিত্ব
কখনও অবিমিশ্রিয় দীর্ঘমেয়াদী দুঃখে
চুলচেরা বিশ্লেষণে
চিরন্তন সত্যিটা একটাই
ধিক্ ধিক্ হৃৎস্পন্দনে
প্রাণটাই শুধু সাথে আমার।

২.

করতে পারো তোমার প্রাণঞ্চলে
মুছতে পারো বারেবারে ঘষে,
ঘষে,ইরেজারে… এ নাম!
রঙ্গমঞ্চের অভিনয়ে বা সমাপ্তিতে
জীবন করিডোরটা শুধুই ফাঁকা
একাকি ঝুলে থাকা,
বর্ণহীন অর্কিডে।

৩.

তন্দ্রাচ্ছন্ন প্রিয়তা আমার!
রকিং চেয়ার তোর সাথেই
হৃৎস্পন্দনের দোলাচলে
শূন্য মস্তিষ্ক ওড়ে চলে যায় ইথারে,
রেখে যায়, কল্পলোকের মায়া,সাথে।

৪.

আকাঙ্ক্ষারা অপেক্ষায় তোমার
শেষ বিকেলের বৃষ্টি ছটায় ভেজবার,
অপেক্ষায় সী গাল,
এক নিমিষে ওড়িয়ে নিয়ে যাবে
দূর দৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে যেখানে
শতশত জলকণ্যারা হারায় ঊর্মীদলে।

৫.

নিশচিন্তপুরের নিশি ডাকা পেঁচা হবো
জাগিয়ে রেখে, থেকে, হারাবো কোন
ডাহুক ডাকা ভোরে,
কদমের ডালের টুনটুনি হবো,
পলকে চোখের তারায় করবো বসবাস,
ঘাস ফড়িংয়ের সবুজ হবো
ঘন বিটপির ঝোপে,
অরন্য, তুমি খুঁজে নিও সবুজে সবুজে
কলমী লতায় আমার ঘ্রাণ।

৬.

এই তো! টুপ করে পড়লো ঝরে
ধোয়া কুয়াশা জমা এক ফোঁটা চোখের জল,
গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে
তুলতুল, মখমল, মসলিন পায়ের তল,
ঝরেই যায় সাথে শ্রাবণের রাঙতা মোড়া বিকেলের
শেষ আকাশ ধোঁয়া বৃষ্টিরা।
ঘুম তুমিও এসো কোনদিন
যেমন ফেরে ফেরারী মনের নাবিক।

৭.

একাকী,কষ্ট, বিষাদ,দুঃখেরা
থাকো তো, শুধুই ভালো,
মানুষ জন্মের নাম কষ্ট হলেই
কষ্টগুলো ও মানুষ হয়।
মনুষ্য জন্মের এটাই একমাত্র পোতাশ্রয়।।

হতে পারতো

ঝমঝম বরষার তোড়ে উড়ে যেতে পারতো
তোমার আমার মাথার ছাতাটা-
ভিজে ভিজে কদমের ডালের শালিকটাও
তখনও রোমাঞ্চিত হতে পারতো,

ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চায়ের চুমুকে
চোখে চোখ রাখা একটা সকাল হতে পারতো,
হতে পারতো…
হয়নি- কেন না?? তার উত্তর নেই
হতে পারতো আমাদের জীবন গল্পের শেষটা
আর একটু গোছানো, সাজানো…

তোমার সীমানায় আমি বা আমার সীমানায়
তুমি কতটা বিস্তৃত অথবা বিচ্ছিন্ন
খুব প্রিয় কোন কফি শপের কোণায় বসে
অল্প অল্প করে তা আলোচনা হতে পারতো,
শুধু একবার তুমি বা আমি অনুরোধও করতে পারতাম,
ছাড়াতে তোমার বা আমার বদভ্যাস গুলো।

পারতাম, চলার দিনগুলোর দীর্ঘশ্বাস বারবার লুকাতে,
বা, চোখের কোণ না ভেজার নিখুঁত অভিনয় করতে।
বলতে পারতাম, জেগো না এত রাত….
যত্ন নিও! অথবা একটু সম্পর্কটার যত্ন নিও…
বলা হয়নি!

খুব,চোখে ভাসে করিডোরের কোণায় ঝুলে থাকা
প্রিয় অর্কিডগুলো- বহুক্ষণের স্মৃতি ধরে রাখা চেয়ারটা..
বলা,হয়নি, ভালো থেকো…
অথচ কি কদর্য ভাবে শেষ হলো সব
কিছু অহং আর চাওয়ার তীব্রতার তোড়ে
ওড়ে গেছে আমাদের বিশ্বস্ততার ভীতটা,

বিচ্ছেদের ডাকে পালিয়েছি, তুমি, আমি
পালিয়েছে শ্রদ্ধাবোধ, রাঙতায় মোড়া ভালোবাসা,
বুঝিনি, বুঝি না জীততে গিয়ে আমরা
কতবার হেরে যাই যার যার কাছে,…
হতেও তো পারতো জীবন টা সাদা গোলাপের মতন স্নিগ্ধ!
বিচ্ছেদটাও হতে পারতো আর একটু গোছানো!

ইশরাত জাহান। চিত্রশিল্পী, কবি, গল্পকার ও অনুবাদক। জন্ম বাংলাদেশের বিভাগীয় শহর খুলনায়।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ