নারীবাদ, নারীদিবস ও শ্রমজীবী নারী

নাজনীন খলিল
নারী, প্রবন্ধ
Bengali
নারীবাদ, নারীদিবস ও শ্রমজীবী নারী

‘নারীবাদ’ নারীর বৈষম্যমুক্ত মৌলিক অধিকারের ন্যায্য দাবীর সাথে একাত্ম একটি শব্দ।

একজন মানুষের মানুষ হিসেবে প্রাপ্য মৌলিক অধিকারের প্রতি যদি আপনি শ্রদ্ধাশীল হন, আপনি যদি প্রকৃতই একজন বিবেকবোধ সম্পন্ন মানুষ হন তাহলে আপনাকে ‘নারীবাদী’ তকমা এঁটে নিজেকে পরিচিত করার প্রয়োজন হয়না।হ্যাঁ এই কথাটা আমি একজন পুরুষকেই বলছি। মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব হলো অন্যের প্রয়োজনে এগিয়ে যাওয়া। অন্যকে কোন নিপীড়ন – নির্যাতনের শিকার হতে দেখলে তার পাশে দাঁড়ানো, তার প্রতি সংঘটিত অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। আর এই অন্যায়- অবিচারের কোনটা আপনি নিজে প্রত্যক্ষে- পরোক্ষে করবেননা বলে সচেতন এবং সতর্ক থাকা।

এবং একজন নারীকে আমি একথাটাই বলবো যে, নিজেকে শ্রদ্ধা করতে শিখুন। নিজের অধিকারের প্রতি সচেতন হয়ে উঠুন। জীবনের শত ঘাত-প্রতিঘাত সত্ত্বেও মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখুন। আর শুধু নিজেকে নিয়ে নয়, আপনার আশপাশের সুবিধাবঞ্চিত নারীদের নিয়েও ভাবুন। তাদের মাঝে আত্মমর্যাদার অনুভব জাগিয়ে তুলুন।আপনার বাসায় কাজ করতে আসা নারীটি তার নিজের ঘরে কীভাবে আছে, কোন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে কীনা খোঁজ নিন। যদি হয় তাকে এই নির্যাতন থেকে পরিত্রাণ পেতে যতোদূর সম্ভব সাহায্য করুন।

নারীদিবস পালনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন যারা তারা এই দিবসের ইতিহাস সম্পর্কে নিতান্তই অজ্ঞ বলতে হবে। অথবা তারা হলো সুবিধাবাদী গোষ্ঠীভুক্ত লোকজন। শ্রমিক দিবস পালন যদি গুরুত্বপূর্ণ হয় তবে নারীদিবস পালন কেন তাৎপর্যহীন হয়ে যাবে? এটাওতো শ্রমিকেরই(নারীশ্রমিক) ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামের সূচনার ইতিহাস। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরী বৈষম্য, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, অনুকূল কর্ম-পরিবেশের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার শ্রমিক নারীরা। সহ্য করেছিলেন অনেক অত্যাচার। কিন্তু দমে যাননি। তাদের এই প্রতিবাদের সাথে একাত্মতা পোষণ করেছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নারীনেত্রীরা।

বিশ্ব যতো উন্নয়নের পথে, সভ্যতার পথে এগিয়ে গেছে নারীদেরও সুযোগ হয়েছে উন্নততর জীবনযাপনের। কিন্তু নারীদের সাথে পুরুষশাসিত সমাজের দমন-পীড়ন কি সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়েছে? হয়নি। এখনো পৃথিবীর নানাপ্রান্তে নারীর প্রতি সহিংসতার হাজার ঘটনা ঘটে যাচ্ছে প্রতিদিন।

আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের বেশীরভাগ অশিক্ষিত, অর্ধ-শিক্ষিত, কুশিক্ষিত সমাজের মানুষের কাছে নারীবাদ শব্দটির ব্যাঞ্জনা নেতিবাচক। হাজার বছরের জেনেটিক – কোডবাহিত পুরুষতান্ত্রিকতা এসব সমাজের মানুষের ভাবনা-চিন্তার পরিধিকে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীতে আবদ্ধ করে রেখেছে। এদের চিন্তার স্বাধীনতা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে আজন্ম-লালিত সংস্কারের কাছে। এরা এই কথা মানতে রাজী নয় নারী এবং পুরুষের পার্থক্য কেবলমাত্র শারীরিক শক্তিতে। মেধায় বা মননে নয়। শারীরিক শক্তিনির্ভর শ্রেষ্ঠত্ব সভ্যতার ধারক নয়। আদিমতম পাশবিক, অসভ্য একটা ধারণামাত্র।

সভা-সমিতি,সেমিনারে নারী-অধিকারের পক্ষে সোচ্চার পুরুষটিকেও প্রায়শই দেখা যায় পারিবারিক সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পরিকল্পনার মাস্টার- কী নিজের কুক্ষিগত করে রাখতে। এদের স্ত্রীরা এদের কাছে একটা শো-পিস বা ট্রফি ওয়াইফ। ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ প্রায় প্রতিটি পরিবারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সংসারের নারীর জীবনযাপনও এর আওতাধীন। এই কর্তাটি যে একজন পুরুষ তা বলাই বাহুল্য। এখানে হয়তো কেউ কেউ সংসারের নারীটিকেই দায়ী করবেন। যোগ্যতার প্রশ্ন তুলবেন। কেন নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে পারেননা সেই প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হবেন। কিন্তু ওপর ওপর মতামত দেওয়ার লোকের অভাব না হলেও যখন একটি নারী নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় তখনই ঘটে বিপত্তি। পরিবার, সমাজ সব একযোগে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের এই সমাজ নারীবান্ধব নয়।

আমার মতে, অর্থনৈতিক মুক্তিতেই নারীর মুক্তি এটাও সঠিক ধারণা নয়। একজন নারীর সুস্থ, স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ জীবন-যাপনের জন্য তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার আনুকূল্য প্রয়োজন। আর আমাদের মতো সমাজে এই পরিবেশের আনুকুল্যেরই মারাত্মক অভাব।

স্বনির্ভর অথবা পরনির্ভরশীল নারী উভয়ের জন্যই নিরাপত্তাহীন এক বাতাবরণে আমাদের বসবাস। ঘরে- বাইরে কোথাও নারীর জন্য সুরক্ষিত স্থান নেই। পুরুষের পাশবিক যৌন- লালসা, নারীকে অধীনস্থ করে রাখার প্রবণতা, নারীকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখা, নারীর প্রতি ঘৃণাপ্রসূত সহিংসতা এসবই নারীর স্বাধীন বা স্বকীয় সত্তার বিকাশের পথে পথে কাঁটা বিছিয়ে রেখেছে।

অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নে উচ্চবিত্তের মানুষের প্রশ্ন চলে আসে। কিন্তু উচ্চবিত্তের নারীরাই কি সম্পুর্ণ স্বাধীন? কোন না কোনভাবে বেশীরভাগই কোন না কোন পুরুষের হাতের ক্রীড়নক।

কর্মজীবী নারীদের বাইরে থেকে যতোটা স্বাধীন মনে করা হয় বাস্তব চিত্রটা কিন্তু বেশিরভাগই ভিন্ন। পুরুষ বস, সহকর্মী পুরুষ, চলার পথে, যানবাহনে লালসাগ্রস্ত পুরুষদের সাথে এক অঘোষিত যুদ্ধ করেই প্রতিনিয়ত চলতে হয় তাদের।

তৃণমূল থেকে দেখতে গেলেও দেখা যায় শ্রমজীবী নারীরা কতো বৈষম্য আর নিগ্রহের শিকার। আমাদের নারীশ্রমিকের একটা বড় অংশ গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করে। অন্যভাবে বলতে গেলে গার্মেন্টস কারখানাগুলোয় শ্রমিকের অধিকাংশই নারী। সীমাহীন দুর্গতির এবং অব্যাবস্থাপনার মাঝেই প্রতিদিন কাজ করতে হয় তাদের। কাজের মাঝখানে অধিকাংশক্ষেত্রে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার অনুমতিও মেলেনা তাদের। এতে করে কিডনিসহ শরীরের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একসময় বিকল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে তারা। একসময় এর নানা অসুখ- বিসুখে ভোগে তাদের কর্মক্ষমতাও হারিয়ে ফেলবে। মুনাফালোভী গার্মেন্টস মালিকেরা কি ভবিষ্যতের জন্য একটা পঙ্গু জনগোষ্ঠী তৈরী করে ফেলছে না? কারখানায় আগুনে পুড়ে জীবন্ত মানুষের লাশ হয়ে যাওয়া অনেক দেখেছে এদেশের মানুষ। শ্রমিকদের তালাবদ্ধ করে রেখে কাজ করানো হয়, যাতে কেউ কিছু চুরি করে বাইরে নিয়ে যেতে না পারে। এর পরেও আছে মজুরী বৈষম্য এবং যৌননির্যাতনের ঘটনা। সহকর্মী পুরুষ থেকে শুরু করে বিদেশী বায়ার পর্যন্ত যৌননিপীড়ক এটাতো প্রমাণিত সত্য। স্বাস্থ্যবান্ধব এবং নিরাপদ কর্ম-পরিবেশ একজন শ্রমিকের অতি আবশ্যক এবং ন্যায্য অধিকার।

শুধু গার্মেন্টসেই নয়, ইটভাঙার কাজ, মাটিকাটার বা পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ অথবা অন্যান্য শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করে যে করে যে নারীটি; তাদের সকলকেই একই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এতো প্রতিকূলতার ভিতরেও কাজ করে তাদের শ্রমের কেন যথাযথ মূল্যায়ন হয়না? কেন তাদের মজুরী তাদের পুরুষ সহকর্মীর সমান নয়? কেন তারা উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা বা নিরাপদ কর্ম- পরিবেশ পায় না? একজন শিক্ষিত নারী কর্মজীবী, সরকারি- অসরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী, শিক্ষক, ডাক্তার বা অন্যান্য সেক্টরে কাজ করা নারীরা কি তাদের পুরুষ সহকর্মী থেকে কম বেতন পায়? অবশ্যই না। তাহলে নিম্নবিত্তের যেসব নারীরা দু’মুঠো ভাতের জন্য এই প্রাণপাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে প্রতিদিন তাদের ব্যাপারে কেন এই বৈষম্য?

এই বৈষম্যের শিকার তৃণমূল নারীদের যথোপযুক্ত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রকেই উদ্যোগ নিতে হবে। এদের সুযোগ-সুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় আইন এবং তার যথার্থ প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের চলার পথ নিরাপদ এবং স্বচ্ছন্দ করতে হবে। সমাজ তথা দেশের উন্নয়নের শুরু কিন্তু এই তৃণমূল থেকেই সেটা ভুলে গেলে চলবেনা।

প্রজন্ম হোক সমতার, সকল নারীর অধিকার‘। এই প্রতিপাদ্য’র বাস্তবায়ন শুরু হোক তৃণমূলের নারীদের হাত ধরেই।

নাজনীন খলিল। জন্ম ৬ নভেম্বর, ১৯৫৭ সাল; সিলেট। পড়াশুনা এবং কর্মক্ষেত্র সিলেট। সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে লেখালেখির শুরু। বিভিন্ন পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি দীর্ঘদিন রেডিও বাংলাদেশ সিলেটের একজন নিয়মিত কথক, গ্রন্থক এবং উপস্থাপকের দায়িত্বপালন করেছেন। লেখালেখির বিষয়বস্তু মূলত কবিতা, প্রবন্ধ এবং...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ