নারী, তোমার গন্তব্য কোথায়?

নাসরিন শাপলা
নারী, প্রবন্ধ
Bengali
নারী, তোমার গন্তব্য কোথায়?

নাসরিন শাপলা

-“তোমরা কয় ভাই-বোন”

-“দুই বোন”

-“ভাই নেই”

-“নাহ”

-“আহ হা”

এই হলো আমার শৈশবের নতুন পরিচিত হওয়া মানুষের সাথে কথোপকথনের একটি  নমুনা। কালেভদ্রে নয়, বিষয়টা প্রায়ই ঘটতো আমার সাথে। বিষয়টায় খুব যে কষ্ট পেতাম তাও কিন্ত না। কারণ, আমার মায়ের একটি ছেলে নেই বলে সারাক্ষণের হা-হুতাশ শুনে আমি ততোদিনে অভ্যস্ত। আব্বা বলতেন, ” এদুটোই আমার মেয়ে, এই দুটোই ছেলে”। সুতরাং না চাইলেও নারীবাদ ভার্সেস পুরুষবাদ এই চিন্তাগুলো নিজের অজান্তেই সিন্দাবাদের ভূতের মতো আমার ঘাড়ে চেপে বসেছিলো।

আম্মা তার ছেলের শখ মেটানোর জন্য আমার চুল ছোট রাখতে শুরু করলেন। ফ্রকের পরিবর্তে আমাকে পরানো হতো ছেলেদের পোশাক। বিষয়টির একটি প্রত্যক্ষ প্রভাব আমার উপর পড়লো।ছেলেরা কেন সবার কাছে এতো কাঙখিত সেটা জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে গেলাম আমি। আমার খেলার সাথী হয়ে উঠলো ছেলেরা। সব বিষয়ে ছেলেদের চ্যালেঞ্জ করা আমার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেলো। মেয়েদের পুতুল আর রান্নাবাটি খেলা আমার কাছে অসহ্য লাগতো। সেই অস্থিরতা নিয়েই  স্কুলে আর কলেজে লেখাপড়া বা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে একের পর এক মাড়িয়ে যাচ্ছি অনেককে। গার্লস স্কুলে পড়লেও আমার নজর সব সময় বয়ে’স স্কুলের   দিকে- ওখানকার ছেলেদের কিভাবে টেক্কা দেয়া যায়। নিজেকে প্রুফ করার নেশা যেন আমাকে পেয়ে বসলো।

এই ফেইজ আমার পুরো কৈশোর ধরে চলেছে। তারুণ্যের শুরুতে এসে ধীরে ধীরে একজন নারী হিসেবে  নিজের আইডেনটিটি, নিজের ক্ষমতা আবিষ্কার করতে শুরু করলাম। বুঝলাম কি বোকার মতোই না শৈশব আর কৈশরের মধুর সময়গুলো নষ্ট করেছি।

আজকাল বাঙালির নানা দিবস পালন করতে দেখলে, আমার নিজের সেই কৈশোরের আইডেনটিটি ক্রাইসিসের কথা মনে পড়ে যায়। বাঙালীর ইংরেজী বছরের শুরু হয় ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ সেলেব্রেশন দিয়ে। তারপর পালাক্রমে আসে ১লা ফাল্গুন, ভ্যালেন্টাইন্স ডে, ২১শে ফেব্রুয়ারি, নারী দিবস,.. হ্যান দিবস… ত্যান দিবস ইত্যাদি…ইত্যাদি। খানিকটা সেকেলে আমি নিত্য নতুন এতো দিবসের কথা জানিও না। তবে এটুকু বুঝি দিবস আসে, দিবস যায়- কারণ, বারণ, আনন্দ, শোক সব গুলিয়ে একাকার। সবখানেই মানুষ নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসৎ খোঁজে, মিলন মেলা খোঁজে।

কী উদ্দেশ্যে এতোসব দিবস সেগুলো অধিকাংশ মানুষেরই বোধের বাইরে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় মানুষের বোধবুদ্ধিতে শুধু কুলোয় কোন দিবসে কোন পোশাকে নিজেকে সাজাতে হবে। সাজ হলো, আনন্দ হলো, ম্যাসেঞ্জারের ইনবক্সে শুভেচ্ছা বিনিময় হলো, খাওয়া দাওয়া হলো, সেল্ফিও তোলা হলো- এতোকিছু করতে করতেই তো দিবসের মনে দিবস চলে গেলো। আমরা কি অথবা আমাদের স্ট্রেংথ কি সেটা উপলব্ধি না করে আমরা যেটা নয় প্রানপনে সেটাই হবার চেষ্টা করি।  আসল কাজের কিছু হয়? মাঝখানে সময় চলে যায়

সামনে আসছে ৮ই মার্চ, বিশ্ব নারী দিবস। বরাবরের মতো ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে এই দিবসটিও পালিত হবে বাংলাদেশে। মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো তাদের বিদেশী উপরওয়ালাদের সামনে  দারুণ কিছু একটা প্রেজেন্ট করার চাপে এইদিনে বেশ ভালো রকম পয়সাপাতিই খরচা করবে। তাদের বাজেটের বিশাল অংশই যাবে বিজ্ঞাপনের খাতে-প্রচারেই প্রসার। সুবেশা, সুসজ্জিত আর সো-কল্ড সাকসেসফুল নারী-পুরুষ হবেন সেই প্রচারের মুখপাত্র। নারী দিবসে এইসব খ্যাতিমান নারী-পুরুষেরা পর্দায় মুখ দেখিয়েই বেশ উপরে উপরে বঞ্চিত নারীকূলের প্রায় সব অধিকারই প্রতিষ্ঠা করে ফেলেন আর কি!

মাঝারি মাপের কোম্পানিগুলোর আবার এতো আবোলতাবোল পয়সা খরচ করার মতো ট্যাকের জোর নেই। তাতে অবশ্য কিছু যায় না। একদল অতি উৎসাহী নারীকর্মিদের এতে উৎসাহে ভাটা পড়বার কোন কারণ নেই। তারা নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে ‘নারী দিবস’ লেখা কেক কিনবেন। আলমারির চিপাচাপা থেকে বেগুনি শাড়ি বা সালোয়ার কামিজের সেট বের করে বেশ সেজেগুজে অফিসে এসে  কেক কাটার দারুনসব ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করবেন। এদের মাঝে অনেকেই ছবি তোলার সময় প্রাণপণে পিরিয়ডের ব্যাথা চেপে বেশ একখানা দেঁতো হাসি দেবেন। কেউ হয়তোবা আজকে একটু বেশী সেজে এসে ভিতরে ভিতরে আতঙ্কে থাকবেন কখন চরিত্রহীন বসের গা ঘিনঘিনে দৃষ্টির সামনে পড়েন। কেউবা মাতৃকালীন ছুটি চাইলে চাকরীটাই না যায়, সেই শঙ্কায় থাকবেন। আর ছুটি পেলেই বা কি, বাচ্চা হলে কার কাছে বাচ্চা রেখে কাজে যোগদান করবেন, সেই ভাবনায়ই তো দিশেহারা-এবার বুঝি চাকরিটা ছাড়তেই হবে। আবার কেউ বা এমন সুন্দর একটা দিন শেষে স্বামী নামের পশুর সাথে দুঃসহ রাতটা কাটাতে হবে এই ভেবেই অফিস কলিগদের সাথে পুরো আনন্দে শরীক হতে পারবেন না।

তবুও নারী দিবসের ব্যাপক উদযাপন চলে এসেছে, আগামীতেও চলবে। সবকিছু চাপা দিয়ে হলেও গ্রুপ বা সলো ছবিগুলো যেন হাসিখুশি আর লাইভলি আসে। ফেসবুক আর ইন্সট্যাগ্রামে পোস্ট হবে, দশজন দেখবে। বাইরের দেখাটাই যে আসল- গতকালও যেমন ছিলো, আজও যেমন আছে আর আগামীকালও যেমনটি থাকবে।

এসব দেখে অধিকাংশ সময়ই হতাশ হই, কষ্ট পাই। আর মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে “ক্ষেপে গিয়ে করি চীৎকার”। আমার ধারণা খুব অল্প নারীই নারী দিবসের পিছনের ইতিহাস বা উদ্দেশ্যটুকু  জানেন বা আদৌ জানতে ইচ্ছুক। আর সবার কথা বাদ দিলেও, নারীদের এই অনাগ্রহটা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে খুব বিস্মিত করে। বাংলাদেশের এক বিশাল অংশ নারীই বিশ্বাস করেন যে নারীর সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন হওয়াটা জরুরী। সেই সাথে তারা এটাও বিশ্বাস করেন যে এই পরিবর্তনটা তাদের জন্য অন্য কেউ এনে দেবে। আপত্তিটা আমার সেখানেই। সেই পরিবর্তন যদি আসতেই হয় তবে সেটা তোমার হাত ধরে নয় কেন মেয়ে?

বোকা নারী, কবে বুঝবে নিজের অবস্থার পরিবর্তনটা নিজেকেই ঘটাতে হবে। নিজের শক্তিতে নিজেকে বিশ্বাস আনতে হবে। আর কোন বিপ্লবই রাতারাতি সফল হয় না। সাফল্যের জন্য সময়, নেতৃত্ব, সাহসিকতা, ডিপ্লোম্যাসি আর একটি সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার প্রয়োজন। তবে এতোকিছু কবে ঘটবে সেই আশায় না থেকে নিজের ঘর থেকেই একটু একটু করে শুদ্ধি অভিযান শুরু করুন, অদূর ভবিষ্যতে পরিবর্তন আসতে বাধ্য।

একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই যে, নারীর সাথে প্রতিটি মানুষেরই তো নাড়ির টান। অথচ এই কুলাঙ্গার সমাজের সেই নাড়ির টান অস্বীকার করতেও কোন দ্বিধা নেই। ঠোঁটের উপর গোঁফের রেখা গজাতে না গজাতে নারীকে দেখতে শেখে কামের চোখে, মা-বাবা বা সমাজ ছেলে আর মেয়ের মাঝে বিশাল সীমারেখা টেনে দেয়। মা হিসেবে নয়, একজন নারী হিসেবে রুখে দাঁড়ান ঠিক এই জায়গাটিতেই। ছেলে সন্তানকে শেখান, শুধুমাত্র ভিন্ন শারিরীক গঠন তাকে নারীর মাথার উপর ছড়ি ঘোরানোর লাইসেন্স দেয় না। ছেলে বলেই ঘরের কাজ থেকে তার মুক্তি নেই। একজন মা, একজন বোন প্রতিদিন সংসারের চার দেয়ালের ভিতরে যে জীবনটি যাপন করে, সেই পথে হাঁটান তাকেও। তাতেই না সেই দূরহ অথচ সমাজের চোখে মুল্যহীন কাজ এবং কাজের পিছনের মানুষগুলোর প্রতি তার সমীহ তৈরি হবে।

আর হ্যাঁ, ভুলেও আপনার বাচ্চাদেরকে দয়া করে বলবেন না, এটা ছেলেদের কাজ, এটা মেয়েদের কাজ। ছেলেকে শেখাবেন না, বউ এসে তার সংসারের হাল ধরবে আর মজার মজার খাবার রান্না করে খাওয়াবে। মেয়ের মাথায় দয়া করে এই পোঁকাটা ঢোকাবেন না যে বিয়েতেই তারপরম মুক্তি। জামাই মানেই টাকার গাছ আর দেশে বিদেশে উড়ার টিকিট। বরং মেয়েকে শেখান, জীবন নিয়ে যদি তার নিজের কোন স্বপ্ন থাকে, সেই স্বপ্ন পূরনের দায়টা তারই- সেটা তার বাবার নয়, ভাইয়ের নয় অথবা স্বামীরও নয়।

ছেলেমেয়ে দু’জনের মাঝেই শরীর নিয়ে যে সামাজিক ট্যাবুগুলো আছে সেগুলো ভাঙার চেষ্টা করুন-মা হিসেবে এটা আপনারই দ্বায়িত্ব। একটা বিষয় মাথায় রাখবেন, নিষিদ্ধ বিষয় নিয়েই কৈশোরের আগ্রহটা বেশী আবর্তীত হয়। পিরিয়ড, পিউবার্টি, প্রেগনেন্সীর মতো সায়েন্টিফিক বিষয়গুলো আজকের ইন্টারনেটের যুগে রাখঢাক করার আর কোন সুযোগই নেই।

এ তো গেলো ঘরের কথা। আর বাইরে যেসব মেয়েরা সমাজে আজকে সফল, তারা রোল মডেল হয়ে পিছিয়ে পরা বা আগামী প্রজন্মের মেয়েদের সামনে যেয়ে দাঁড়ান। দুঃখজনক হলেও সত্যি অধিকাংশ সফল নারীরা মনে হয় তাঁদের উপরে ওঠার সিঁড়িটা খুঁজে পেলে আর সেই সিঁড়িতে যেন অন্যকোন নারীর যেন পা আর না পড়ে সেটা নিশ্চিত করতে উঠে পড়ে লাগেন। অথচ তাদের সুযোগ রয়েছে আরও নারীকে কর্মক্ষেত্রে টেনে এনে কাজের জায়গাগুলোকে আরও খানিকটা নারী বান্ধব করে তোলা।

বলা বাহুল্য যে নাঙেলীর স্তন্য করের যুগ থেকে নারীরা সামনে এগিয়ে এসেছে অনেকটা পথ। মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে গেলে সামনে হাঁটতে হবে আরও অনেকটা পথ। নিঃসন্দেহে সেই পথ খুব মসৃণ নয়৷ পদে পদে সমাজের ভ্রুকুটি, সমাজ কর্তাদের ধমক ধামক এমনকি বাধাঁ আসবে এই সমাজ ব্যবস্থায় অভ্যস্ত নারীকূলের কাছ থেকেও। আবার নারীর স্বার্থ নিয়ে কাজ করতে যেয়ে ‘নারীবাদি’ তকমা লাগানো কিছু মানুষের এলোমেলো পদক্ষেপও থামিয়ে দেবে নারীর সামনের পথচলা। তবুও থামলে চলবে না, ফোকাসটা ধরে রাখতে হবে। নারীবাদের নামে নিজেদের মাঝের ‘ক্যাট ফাইট’ শুধু নারীকে পিছিয়েই দেবে, আর কিছু না।

খুব ছোটবেলায় শিশু সাহিত্যিক জুবায়দা গুলশান আরা-র একটা অনুষ্ঠানের কথা আবছা মনে আছে। উনার মিষ্টি করে কথার দারুণ ভক্ত ছিলাম। কি অনুষ্ঠান ছিলো, সঠিক মনে নেই। শুধু মনে আছে, প্রথম অনুষ্ঠানের শুরুতে বলেছিলেন, “আজকে আমাদের প্রথম অনুষ্ঠান তো, তাই একটু এলোমেলো হচ্ছে। মা যখন আলমারী গোছান, সব কাপড় নীচে নামিয়ে একটা বিশাল হুলুস্থুল তৈরি হয়। তারপর একে একে কাপড় ভাঁজ করে এক সময় সুন্দর গুছিয়ে নেন। তো আমরাও এখন গুছাচ্ছি বলে খানিকটা এলোমেলো”।

বাংলাদেশের নারীমুক্তির আন্দোলন বা নারীবাদ যাই বলি না কেন, সেটাও আমার মতে এখন এই গুছানোর প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। হাজার মানুষের, হাজারও চিন্তা, হাজারও পদক্ষেপ মিলে অনেক এলোমেলো অবস্থায় আছে। এর মাঝে কিছু পদক্ষেপ সমাদৃত হবে, কিছু পদক্ষেপ আস্তাকুঁড়ে যাবে- তারপর আশাকরি সবাই মিলে এক সময় আন্দোলনটা গুছিয়ে নেবে।

তবে তার আগে নারীরা চিন্তা-ভাবনার পরিধি বাড়ান। আরও গভীরে ভাবুন। বুঝতে চেষ্টা ক্রুন, আমাদের যুদ্ধটা কোন ব্যক্তি বা ধর্মের সাথে নয়, আমাদের যুদ্ধটা নারীর প্রাপ্য জায়গাটির জন্য। এরজন্য যেমন পাশে চাই নারীদের, তেমনি পাশে চাই পুরুষদেরও। তাই এসব দিবস শুধু নারীরা মিলে না করে আপনাদের পুরুষ সঙীটিকে সবার আগে ডাকুন। বাংলাদেশের পুরুষকুলের এক বিশাল অংশ তাদের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার কারণে নারীর জুতোয় পা রেখে জীবনটাকে কখনও বোঝার সুযোগ পায়নি। আপনি সেই সুযোগটি করে দিন, দেখবেন তাদের অনেকেরই মানসিকতার পরিবর্তন আসবে।

বিশ্ব নারী দিবসে, এই বিশ্বের প্রতিটি নারীর জন্য রইলো নারী হিসেবে জন্ম নেবার জন্য অভিনন্দন আর শুভেচ্ছা। আসুন আমাদের যোগ্যতাকে আমরা যথাযথভাবে উদযাপন করতে শিখি বছরের প্রতিটি দিন।

নাসরিন শাপলা। লেখক ও অ্যাকটিভিস্ট। জন্ম বাংলাদেশে, বর্তমান নিবাস কানাডার টরেন্টোতে।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ