নারী: মহাশ্বেতা দেবীর গল্পে

উৎপল মণ্ডল
নারী, প্রবন্ধ
Bengali
নারী: মহাশ্বেতা দেবীর গল্পে

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা কথা মাথায় ঘুরছে সারাদিন,  যা তিনি বলেছিলেন কুবের মাঝি সম্পর্কে— “গরিবের মধ্যে সে গরিব, ছোটলোকের মধ্যে আরো বেশি ছোটলোক। এমনভাবে তাহাকে বঞ্চিত করিবার অধিকারটা সকলে তাই প্রথার মতো, সামাজিক ও ধর্ম-সম্পর্কীয় দশটা নিয়মের মতো অসংকোচে গ্রহণ করিয়াছে।” হ্যাঁ, এটাই ঘুরছে মাথায়, কারণ মহাশ্বেতা দেবীর নারীভাবনা নিয়ে ভাবছি। মহাশ্বেতা দেবী বললেই ঝপ্‌ করে আমাদের সামনে যে জগৎ ভেসে ওঠে, ভীড় করে মনের চারপাশে তা ত নিম্নবর্গ, অন্ত্যজ, বঞ্চিত, সাবঅলটার্ন …। আর আন্তোনিও গ্রামশি মশায় এই সাবঅলটার্ন কথাটিকে বেশ ব্যপক অর্থে ব্যবহার করেছিলেন— একটি সামাজিক সম্পর্কের প্রক্রিয়ার মধ্যে, যার একপ্রান্তে ‘সাবঅলটার্ন’ বা অধীন আর বিপরীত মেরুতে ‘ডোমিন্যান্ট’ বা প্রভুত্ব।  তাহলে নারী তো সাবঅলটার্ন বটেই। তার মানে, সাধারণভাবে কথাটির যে অর্থ আজ দাঁড়িয়েছে—সেই voiceless class, মহাশ্বেতার চর্চার যা ক্ষেত্র; সে তো রইলোই, তাদের মধ্যে আবার শুধু নারীর কথাই আমাদের ক্ষেত্র। তাই বলছিলাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐ কথাটির কথা।

আর একটা কথা ভেবে দেখার মতো, এই বঞ্চিত, শোষিত বলতে অনায়াসেই যা মনে আসে অর্থাৎ মূলতঃ জাতিগত ভিত্তিতে, মহাশ্বেতা দেবী কিন্তু শুধু সেভাবেই বিষয়টিকে দেখেন নি। যে কোনো ক্ষেত্রেই মহাশ্বেতা দেবীর দৃষ্টিই এই অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া মানুষদের দিকে। যেমন ধরুন, ইতিহাস নিয়ে যখন তিনি লিখছেন, তখন সেই বিষয়ই তিনি লিখেছেন যা ইতিহাসগত দিক থেকে বঞ্চিত। অর্থাৎ যে ঘটনাটি বা চরিত্রটি তথাকথিত ঐতিহাসিকদের চোখে বেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়া বা বঞ্চিত বটে। কথাসাহিত্যে মহাশ্বেতাদেবীর নারীরা সেভাবেই উঠে এসেছে। এখানে শুধু গল্পের দিকেই দৃষ্টি রাখছি।

শুরুতেই আমরা তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘স্তনদায়িনী’র কথা বলি। কারণ, এই মাতৃত্ব বা ‘মা’ নিয়ে মহাশ্বেতা দেবীর বহু লেখা আছে। উপন্যাস তো বটেই, গল্পঅ আছে অনেক —‘সাঁঝ সকালের মা’, ‘জাহ্নবী মা’, ‘কানাই বৈরাগীর মা’, ‘বায়েন’, ‘চিন্তা’, ‘গিরিবালা’ … অনেক। দ্বিতীয়ত, সামাজিক দিক থেকে ভাবলে এই গল্পের যশোদা উচ্চ সম্প্রদায়ের, ব্রাহ্মণ। অথচ দেখুন, যশোদার বঞ্চনা যেমন হালদার বাড়িতে, তেমনি স্বামীর কাছেও।

হালদারবাবুর ছোটোছেলের গাড়ির চালক হওয়ার শখ জাগলে এক দুপুরে সে যশোদার স্বামী কাঙালিচরণের পায়ের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেবার ফলে ব্রাহ্মণ কাঙালিচরণ আরো কাঙল হয়ে পড়ে। ব্রাহ্মণভক্ত হালদারবাবু যথাসাধ্য ব্যবস্থাও করে— কিছুদিন ‘সিধা’ও যায়, তারপর সিংহবাহিনীর মন্দিরের সামনে মুড়ি,-মুড়কি-চিড়ার দোকানের ব্যবস্থাও করে। আর যশোদা?

“কামধেনু কইরা তোমায় পাঠাইছিল বিধাতা। বাঁট টানলেই দুধ। আমার ঘরে যেগুলা আনছি, তাদের .. সিকিভাগ দুধ-অ বুঁটাই নাই!

যশোদা বলে, সে আর বলতে মা! গোপাল ছেড়ে দিল, বয়স হল তিন বছর। এটা তখনো পেটে    আসে নি। তাতেও দুধ যেন বান ডাকতো।” [  শ্রেষ্ঠগল্প /স্তনদায়িনী / পৃ ৮৬]

অর্থাৎ যশোদা হয়ে যায় হালদার গিন্নির নাতি-নাতনিদের দুধ-মা। আর হালদার পুত্রদের নিয়মানুসারে, ‘পঞ্জিকায় যেহেতু প্রায় প্রতি মাসেই স্ত্রী-গ্রহণ অনুমোদিত, যেহেতু গিন্নির বাড়িতে একতলায় সার সার আঁতুর ঘর প্রায়শ ফাঁক যায় না।’

এদিকে, কাঙালিচরণও ব্রহ্মা-ভাবে উদ্দীপিত হয় নিয়মিত। তাই যশোদা গাঁই-গুঁই করতে থাকলে তাকে ভজানো হয় উপযুক্ত যুক্তি দিয়েই—

“পেটে সন্তান থাকলে তবে তো তোর বুকে দুধ আসবে। এখন সেকথা ভেবে তোকে কষ্ট করতে হবে। তুই সতী লক্ষ্মী। নিজেও পোয়াতি হবি, পেটে ছেলে ধরবি, বুকে পালন করবি…’।

এই হলো যশোদার উভমুখী শোষণের ইতিবৃত্ত। প্রায় পঞ্চাশজন বাচ্চাকে বুকের দুধে মানুষ করে। কিন্তু হালদার গিন্নির মৃত্যুর পর বাড়িতে ‘নতুন হাওয়া’ আসে। কাজ যায় যশোদার এবং অবশেষে ব্রেস্ট ক্যান্সার। কিছুদিন পরে মারা যায় যশোদা। তখন কেউ ছিলো না। মহাশ্বেতা দেবী লিখছেন—‘অথচ শেষ সময়টা কারো থাকার কথা ছিল। সে কে? কে সে?’ খুব সহজেই বোঝা যায় মহাশ্বেতা ঠিক কাদের কথা তুলে ধরেন এবং বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে তাদের অবস্থান ঠিক কোথায়। ই

গল্পের পরিণতিতে এসে যশোদার  যে অবস্থান কিন্তুস্পষ্ট, তাতে পাঠকের আবেগ প্রশ্রয় পাবারই কথা, কিন্তু মননশীল পাঠক একটু আগে থেকে লক্ষ্য করলে দেখবেন। নারীর অন্য এক অবস্থানের কথাও রয়েছে গল্পের অন্তরালে এবং অর্থনীতি সাপেক্ষ। সেজন্য, গল্পের চারটি অংশের মধ্যে খুবই ছোটো — এক পাতারও কম, ৩-নং অংশটি তাৎপর্যপুর্ণ।

৩নং অংশটির শুরুতেই দেখি—‘পঞ্চাশের দশকে কাঙালির ঠ্যাং কাটা যায়,… পঁচিশ বছরে, থুড়ু তিরিশ বছরে, যশোদা কুড়িবার আঁতুর ঘরে ঢুকেছে।’ তাহলে এই গল্পের সময় কাল আশির দশক পর্যন্ত। ঘটনাস্থল কলকাতা। সবকিছুই যেখানে শুরু হয়ে তারপর ধীরে ধীরে পৌঁছোয় প্রান্তিক বঙ্গে। আর এই গল্পে পাওয়া যায় তিনটি প্রজন্মের কথা — নারী চরিত্রের দিক থেকে ধরলে , হালদার গিন্নি, তার বৌমারা এবং নাতবৌরা।

এইবার দেখুন, হালদার গিন্নির মৃত্যুর পর বাড়িতে ‘নতুন হাওয়া’ বয়। কেমন তা? –‘কর্তার বড় সাধ ছিল হালদারদের দিয়ে অর্ধেক কলকাতা ভরে ফেলেন’, তা সত্ত্বেও ‘দুর্বুদ্ধিবশত’তার বৌমা-রা সকলেই বারো-তেরো-চোদ্দোতেই ক্ষান্ত ছিলো। এটাই নতুন হাওয়ার কুফল! আর তৃতীয় প্রজন্ম—নাতবৌ-দের ক্ষেত্রে—‘মাতৃত্ব বিষয়ে গিন্নির নাতবৌরা একেবারে উল্টো হাওয়া খেয়ে ঘরে ঢুকল।’  ফলে নাতবৌরা হালদার গিন্নির দাবী অগ্রাহ্য করে ‘স্বামীদের নিয়ে কর্মস্থলে ছুটল।’ পঞ্চাশের দশকে গল্পের শুরু থেকে তিরিশ বছর, আর এই নাতবৌদের প্রজন্ম—এই দু’য়ের হিসেব মেলালে, আশির দশক পর্যন্ত সময়ে পরিবার পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একটু একটু করে উন্নত অবস্থার এক আলট্রাসোনোগ্রাফিক চিত্র উঠে আসে গল্পের ভিতর থেকে। তবে তা অবশ্যই অর্থনৈতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে। এই উন্নতি অবশ্যই হালদার পরিবারদের ক্ষেত্রে, যশোদাদের নয়। না হলে এই সময়ের মধ্যেই ‘যশোদা কুড়ি বার আঁতুড়ে ঢুকেছে’ কেন! কিন্তু সেটাও আর এক ইতিহাস।

নারী সমস্যা-কেন্দ্রিক যে সমস্ত বিষয় মহাশ্বেতা দেবীর গল্পে উঠে এসেছে তার মধ্যে নারীদেহ ব্যবসা এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।  তাঁর বহু গল্পে বিষয়টি ঘুরে ফিরে বার বার এসেছে। এর একটাই কারণ, বিষয়টি তাঁকে ভাবিয়েছে। কখনো নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকতে দেয় নি। এক অদ্ভুত কারণে বর্তমান সময়ে নারীদেহের এক ব্যবসা লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। সম্ভবত এটিই একমাত্র পেশা যেটি আদিম যুগ থেকে শুরু করে আজও সমানতালে চলছে এবং সমগ্র পৃথিবীতেই এই চাহিদা ক্রমবর্ধমান। নারীদেহ ব্যবসায়ীদের কাছে শুধু একটাই, কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মেয়ে কোনো অবস্থাতেইএ পথে আসে না। অসাধু উপায় অবলম্বন করে মেয়েদের তারা এই পেশায় আসতে বাধ্য করে। সমাজ সম্পর্কে সচেতন মহাশ্বেতা দেবী এই স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে বহু গল্প লিখেছেন, যাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়— ‘দৌলতি’, ‘ধৌলী’, ‘গোহুননি’, ‘গিরিবালা’ প্রভৃতি গল্পের কথা।

‘দৌলতি’ গল্পের প্রেক্ষাপট পালামৌ। গল্পটিতে দাসমজুর প্রথাকে হাতিয়ার করে কেমন করে আদিবাসী মেয়েদেরকে শোষণ করা হয় সে কথা বলা হয়েছে। ‘দৌলতি’ গল্পের বিষয় সম্পর্কে মহাশ্বেতা দেবী বলেছেন—

“দৌলতি কাহিনীর কেন্দ্রে যে সমস্যা তা নিয়ে একদা ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে’ লিখেছি, ভারত সরকারের সঙ্গে লড়েছি। ভারত সরকার নামে দাসমজুর প্রথা উচ্ছেদ করেছে, কিন্তু এ প্রথা আর কৃষিক্ষেত্রে আবদ্ধ নেই।  ঠিকাদার আনীত শ্রমিক, অন্য রাজ্য থেকে যাদের কোন শিল্পায়ন প্রকল্পে বেগার শ্রমিক হিসাবে আনা হয় তারাও দাসমজুর। হিমালয়ে উত্তরকাশী জেলায় এ প্রথা খুব চলত। উচ্চবর্ণের ঋণদাতার কাছ থেকে স্বামী বা বাবা ঋণ নিলে, কুমারী বা সদ্য বিবাহিতা মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হতো সিধাকোন বড় শহরের’লালবাত্তি’ এলাকায়, যেখানে তারা দেহ বেচে ঋণ শুধতো। ঋণ শোধ হয় না, চক্রবৃদ্ধি হারে শুধ বেড়ে চলে।” [ কথোপকথন : মহাশ্বেতা দেবী ও গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, প্রর ১১৬, মহাশ্বেতা দেবী, অপরাজেয় প্রতিবাদী মুখ, নির্মল ঘোষ, করুণা পাবলিকেশন]

‘দৌলতি’ গল্পে টেঁড়া নাগাসিয়ার চোদ্দো বছরের মেয়ে দৌলতি। আহত গনোরিকে সুস্থ করে তোলার প্রার্থনা নিয়ে দৌলতি ও তার মাটাহারে গিয়েছিলো মন্দির থেকে প্রসাদি ফুল আনতে। সেদিন হনুমান মিশ্রের মন্দিরে বসেছিলো তারই এক আত্মীয় পরমানন্দ। অযাচিত ভাবে সে হঠাৎ দৌলতি ও তার পরিবারের দুঃখে অভিভূত হয়ে তাদের একটা কাপড় ও পনেরোটি টাকা দেয়। এছাড়াও ৩০০ টাকা দিয়ে টেঁরা নাগেসিয়া গনোরিকে মুনাবরের বন্ধুয়া মজদুরি থেকে ছাড়িয়ে আনে এবং দোউলতির বিবাহের প্রলোভন দেখায়। সহজ সরল গনেরি বুঝতেও পারে না, পরমানন্দের সকল ভালোমানুষির পিছনেই রয়েছে গূঢ দূরভিসন্ধি। সে যে মাত্র ৩০০ টাকার বিনিময়ে নিজের যুবতী কন্যাকে পরমানন্দের কাছে বিক্রি করে দিলো এটি তার বোঝার সীমাতেই নেই।

তবে গনোরি বুঝতে না পারলেও পরমানন্দের ব্যবহারে চোদ্দো বছরের দৌলতি বুঝতে পারে গাঁয়ের হরিজন কুমারী মেয়েদের বিবাহ নামে সামাজিক রীতিটি কোনো দিনই হতে পারে না। উচ্চবর্ণের হিন্দুরা কোনো না কোনো উপায়ে তাদের চিরজীবনের মতো বন্‌ডেড দেহ দেহ ব্যবসায়ীতে রূপান্তরিত করে। সেই নীতি অনুযায়ী বিয়ের নাম করে নিয়ে গিয়ে পরমানন্দ লুটিয়া নামে এক বিকৃতরুচি সম্পন্ন ঠিকাদারের হাতে সামান্য টাকার বিনিময়ে দৌলতিকে তুলে দেয়। প্রথম দিকে লাটিয়ার ‘খাস রেণ্ডি’ থাকলেও ক্রমশ নির্যাতিতা দোউলতি নিঃশেষিত হয়ে ‘সাধারণ রেণ্ডি’তে পরিণত হয় এবং স্থান হয় রামপিয়ারীর হাবেলিতে। এবার তার কাজ ওই হাবেলির অন্যান্য মেয়ের মতোই সাধারণ গ্রাহকদের সন্তুষ্ট করা আর তাদের আয় নিঃশেষে পরমানন্দের হাতে তুলে দেওয়া। এভাবেই উচ্চবর্ণের ব্যক্তিরা দৌলতির মতো মেয়েদের ঋণের দায়ে দেহীপজীবিনীর জীবন গ্রহণে ও যাপনে বাধ্য করে। তাদের আয় থেকে মালিকদের ব্যবসা চলে। আর এই সব মেয়েরা না খেয়ে, নানা অসুখে ভুগে, মাতৃত্বের অধিকারে বঞ্চিত হয়ে, প্রয়োজন ফুরালে একদিন ঋণের দায়ে একদিন ভিখমাঙ্‌নি হয়ে বেরিয়ে যায়।

‘গিরিবালা’ গল্পটিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে দেহব্যবসায়ীর দালালরা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মেয়ে কিনে নিয়ে গিয়ে গণিকাপল্লিতে বিক্রি করে দেয়। গল্পের মূল চরিত্র গিরিবালা এবং তার স্বামী অউলাচাঁদ। অভাবের সংসারে তাদের তিন মেয়ে ও দুই ছেলে। দুবেলা দুমুঠো ভাত জোগার করার জন্য গিরিবালা প্রাণপণ খাটলেও অয়াউলাচাঁদ সংসার সম্পর্কে উদাসীন। তাদের বড়ো মেয়ে বেলারানীকে আউলাচাঁদ টাকার লোভে বিয়ে দেয় বিহারের ছেলের সঙ্গে। গিরিবালা এ সম্পর্কে কিছুই জানে না। তবে মূল নাটের গুরু হচ্ছে আউলাচাঁদেরই ইয়ার দোস্ত মোহন—

লালবাগ, ধূলিয়ান, জঙ্গীপুর, জিয়াগঞ্জ, ফারাক্কা কোথায় কোথায় যায় না সে? দিল্লিতে, মিরাটে, ধানবাদে, টাটায় গণিকালয়ের ব্যবসা জেঁকে বসেছে। পশ্চিমবঙ্গের কচি কচি মেয়েদের চাহিদা খুব বরলোক ও ব্যবসায়ী খদ্দেররা কচি মেয়ে পছন্দ করে। খাওয়ালে মাখালে কয়েক বছর বাদেই মেয়েটিকে দিয়ে সব খরচ উসুল করা যায়।

বিয়ের একটা ভুজুং দরকার পরে বাপু। সিধা টাকা ফেললে গ্রামের মানুষ গবধোলাই দেবে। তাই বলতে হয়, বিহারে মেয়ের বড় আকাল…। [‘গিরিবালা’, পৃ ৪০৯-৪১০, মহাশ্বেতা দেবীর পঞ্চাশটি গল্প, প্রতিক্ষণ পাবলিকেশনস্‌ প্রাইভেট লিমিটেড। ]

বড়ো মেয়ে বেলারানী বিক্রি হয়ে যাবার পর গিরিবালা চেষ্টা করে সেজো মেয়ে পরীরানীর ভালো জায়গায় বিয়ে দেবার। কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাসে তারও যখন একই পরিণতি হয় তখন শোকে দুঃখে গিরিবালা ছোটো মেয়ে মরুনি ও ছেলে রাজীবকে নিয়ে চলে যায় টাউনে ঝি খাটতে। কারণ সে বুঝতে পারে স্বামী আউলাচাঁদ ঘর তৈরির লোভে যেভাবে বরো ও মেজো মেয়েকে বিক্রি করেছে, সেই একই লোভে সে একদিন ছোটো মেয়েকে বিক্রি করে দেবে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, সমাজের লোকজন আউলাচাঁদকে নয়, গিরিবালাকেই শেষ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত করে—

কী আশ্চর্য, কি আশ্চর্য, গিরিবালা মরুনিকে কোলে নিয়ে রাজীবের হাত ধরে সদর পথে বাস ধরে টাউনে চলে গেছে।।..

একথা জেনে সবাই অবাক হয়ে গেল, মাথা নাড়ল। বেলা বা পরীর যা হয়েছে, সে তো এখন ঘরে ঘরে হচ্ছে। তা বলে স্বামী ছেড়ে চলে যায় কে? কোন মেয়েছেলে?

সবাই নিশ্চিত হল যে আউলাচাঁদ নয়, গিরিবালা মেয়েটি আসলে মন্দ। এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে তবে সবাই কী স্বস্তি যে পেল, তা কী বলি![ পৃ ৪১৩, ঐ]

তা তো বটেই! স্বামীকে এই সামান্য কারণে কেউ ছেড়ে চলে যায়! তাই দোষ গিরিবালার। এজন্যই শুরুতেই বলেছিলাম — শোষিতের মধ্যেও শোষিত, বঞ্চিতের মধ্যেও বঞ্চিত। তবে মহাশ্বেতা দেবীর মানসিকতাটি ফুটে ওঠে ব্যঙ্গের চাবুকে — ‘সবাই কি স্বস্তি যে পেল, তা কি বলি!’

রামমোহন,বিদ্যাসাগর থেকে নারীকল্যাণমূলক সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল এদেশে। তখন তাঁদের বিরোধিতাও কম হয় নি! আর একেবারে নারীবাদ নিয়ে আলোচনার শুরু মুলত বিশ শতকের ষাটের দশকের শেষ থেকে। ক্রমশ যে সব আলোচনা এবং নারীর অধিকারের বিষয় যেমন উঠে আসে সাহিত্য শিল্পে, তেমনি কিছুটা হলেও সমাজেতার প্রতিফলন ঘটে। আর এই একুশ শতকে এসে চোখে পড়ার মতো একটা পরিবর্তন অনুভব করাও যায় গ্লোবালেইজেশন থেকে গ্লোকালাইজেশন, বিজ্ঞাপন, মিডিয়া বিস্ফোরণ… এই, এই সব কিছুর ডামাডোলে বাইরের দিকে একটা পরিবর্তন হয় ঠিকই। কিন্তু পুরুষের আত্মিক অবক্ষয়েই হোক আর ক্রমবিকশিত নারীকে দমিয়ে রাখার আক্রোশ বা অবদমিত বাসনা থেকেই হোক ; বাড়তে থাকে অন্য অসুখ। গভীর গভীরতর সে অসুখ— ধর্ষণ।  মহাশ্বেতা দেবীর কলমে বার বার দেখা যায় ধর্ষণ প্রসঙ্গ, ধর্ষিতার অবস্থান, এমন কি অনেক ক্ষেত্রে উত্তরণ বা প্রতিবাদের প্রসঙ্গও— ভিন্ন পথে, ভিন্ন মাত্রায়।

‘প্রতি ৫৪ মিনিটে’ গল্পটিকে গল্প না বলে উপন্যাস বলাই শ্রেয়। কিন্তু বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনা করে আমরা এটি আলোচনা করছি। এক্ষেত্রে নারী পরিসরের এক বিশেষ বিপন্নতার দিকটাই বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে আশি-নব্বই দশকের প্রেক্ষাপটে, যেখানে নির্দোষ নারী ধর্ষিতা হলে পরিবার সমাজ ও আইন ব্যবস্থার কাছ থেকে সহযোগিতার বদলে অসহযোগিতাই পায়। মহাশ্বেতা দেবী এই ভূমিকায় দিল্লির ন্যাশনাল ক্রাইম রিসার্চ ব্যুরোর (১৯৯১ সালের) একটা রিপোর্টের কথা উল্লেখ করেছেন। যেখানে বলা হয়েছে, প্রতি চুয়ান্ন মিনিটে একজন নারী ধর্ষিতা হয়, প্রতি দু ঘন্টায় পণের জন্য একজন বধূর মৃত্যু ঘটে। প্রতি ছাব্বিশ্মিনিটে একজন নারী নিগৃহীত হয়, প্রতি তেতাল্লিশ মিনিটে একজন নারী অপহৃত হয়। মূলত এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই মহাশ্বেতা দেবী গল্পটির নাম করেছেন ‘প্রতি ৫৪ মিনিটে’। পরবর্তী সময়ে ভারত প্রভূত উন্নতি করেছে। অপরাধীরাই বা পিছিয়ে থাকবে কেন?  তাই ২০১১ সালের সরকারী সমীক্ষা অনুযায়ী এখন ভারতে প্রতি ত্রিশ মিনিটে একজন মেয়ে ধর্ষিতা হয়।  নারী ধর্ষণের এই প্রতিযোগিতায় দেশের রাজধানী দিল্লির স্থান সবার উপরে। আর দ্বিতীয় স্থানে আছে আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ।

যাই হোক, ‘প্রতি ৫৪ মিনিটে’-এর মূল চরিত্র পুতুলি বা পল্লবির বিপন্নতার মধ্য দিয়ে মহাশ্বেতা দেবী ভারতীয় আইন ও সমাজ ব্যবস্থার শূন্যায়তনকেই চিহ্নিত করেছেন। এই পুতুলি যখন গণধর্ষণের স্বীকার হয় সমাজে প্রশ্ন উঠে যায় পুতুলিরই চরিত্রের শুদ্ধতা নিয়ে। সমাজের এই অন্ধ মানসিকতাকে মহাশ্বেতা দেবী এভাবে ধরেছেন—

যাদের মেয়েরা এভাবে নিগৃহীত হয় নি, তারা বলতে থাকে, নীহার ও অশ্রু ওই মেয়েকে লাগামছাড়া স্বাধীনতা দিয়েছিলেন বলতে হবে। নইলে সুজাতা সিংহের মা মরছে বলে ওখানে গিয়ে থেকেই যায়? একা একা রওনা হয় অন্ধকারে? বাইরে থেকে দেখে মেয়েদের চেনা যায়? [প্রতি ৫৪ মিনিটে, পৃ ৫৩, মহাশ্বেতা দেবী, করুণা প্রকাশনি]

এই বিপন্নতার দিকটি আরও স্পষ্টতা পায় সুজাতা চরিত্রের বচনে—

ধর্ষিতা মেয়েদের ট্র্যাজিডি কি জান? কেস থেকে সুবিচার পাবার পথ অতীব ঘোরালো। ট্র্যাজিডি হলো সমাজ আগে ভাগেই রায় দিয়ে রাখে ধর্ষিতা মেয়েটিই দোষী। পুলিশ বা জজ বা উকিল, এই সমাজেরই একজন। তাই ধর্ষিতা মেয়েটি মানবিক বিচার পায় না। [পৃ ৬৪, ঐ]

পুতুলও তার সমাজ এমনকি পরিবারের আপনজনদের কাছ থেকেও কোনো সাহায্য পায় নি। কিছুটা সুস্থ হবার পর পুতুলির দাদা তাকে সরাসরি জানিয়েছেন যে, তাঁর দিল্লির বাড়িতে তাকে রাখা সম্ভব নয়। দিদির কাছ থেকেও পুতুলি মানসিক সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়। এমনকি যে সমু পুতুলিকে ভালোবাসতো এবং তাদের বিয়েও ঠিক হয়েছিলো সেই সমুও পুতুলিকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে।

এভাবে পুতিলি, সমুদের মত চরিত্রের মধ্য দিয়ে মহাশ্বেতা দেবীয়ামাদের সমাজব্যবস্থা, আমাদের সংস্কৃতিতে নারীসত্তার বিপন্নতাকেই প্রতিফলিত করেছেন।

‘প্রতি ৫৪ মিনিটে’-এর মতো ‘চিরাচরিত’ গল্পেও দেখানো হয়েছে এক উচ্চশিক্ষিত মহিলার এমন পরবর্তীকালীন দুরবস্থার চিত্র, যেখানে সম্পূর্ণ বিনা দোষে ধর্ষিত হবার কারণে তার স্বশুরবাড়ি, আত্মীয়পরিজন, বন্ধু বান্ধব, কর্মক্ষেত্রে সকলেই তাকে একজন এদস্‌ রোগীর মতো ত্যাগ করে। এমনকি তার স্বামীও প্রথম দিকে তার প্রতি সহানুভূতিশীল থাকলেও শেষ পর্যন্ত পরিবারের চাপে পিছিয়ে আসে।

অন্যদিকে ‘চোলি কা পিছে’ গল্পে এক আদিবাসি রমনীর ধর্ষণের কথা বলা হয়েছে। গল্পে সাংবাদিক উপীন গাঙ্গোর নামে এক আদিবাসি রমনীর বাচ্চাকে ব্রেস্ট ফিড করার ছবি তুলে কাগজে ছাপায়। গাঙ্গোরের জন্য এটাই কাল হয়ে দাঁড়ায়। সে নজরে পড়ে বদ লোকের। সেই বদ লোকের মধ্যে থাকে আমাদের আইন রক্ষক কিছু পুলিশও। অসহায় গাঙ্গোর ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে কেস করে। যেহেতু সেই ধর্ষণকারীদের মধ্যে একজন পুলিশও ছিলো তাই লক-আপে তাকে আবার গণধর্ষণের স্বীকার হতে হয়।

গল্পটিতে লেখক পুলিশ সম্পর্কে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করে বলেছেন—

একটা মেয়ের জন্য পুলিশ এখানে এতবার এল এত বার এল… ঔরত যখন বোঝে না যে পুলিশও মরদ, আর তাকে খেপালে সে খেপে যাবে।।..[‘চোলি কা পিছে’ মহাশ্বেতা দেবীর পঞ্চাশটি গল্প, প্রতিক্ষণ পাবলিকেশনস্‌ প্রাইভেট লিমিটেড।]

 কোনো সোমত্ত যুবতী দেখলে পুরুষের কাম প্রবৃত্তিজেগে ওঠা এবং তা জোর করে হলেও চরিতার্থ করা যেন যে কোনো পুরুষেরই এক মৌলিক অধিকার!

সমাজের অলিখিত সংবিধান অনুযায়ী এক্ষেত্রেও সবাই গাঙ্গোরকেই দোষী সাব্যস্ত করে। গাঁয়ে তাকে কেউ ঢুকতে দেয় না, স্বামী গ্রহণ করে না, এমনকি যেখানে সে থাকে সেখানেও তার সঙ্গে কেউ কথা বলে না।

সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, সমাজের যে কোনো শ্রেণির একজন নারী ধর্ষিতা হলে ধর্ষণ পরবর্তী ঘটনা সবার ক্ষেত্রেই অদ্ভুতভাবে এক। তাই দেখি, প্রথম দুটি গল্পের চরিত্র পুতুলি এবং রিমকির জায়গা হয় মেয়েদের আশ্রমে আর গাঙ্গোর গণিকাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিতে বাধ্য হয়।

ধর্ষিতার এইরকম পরিণতি, এই সামাজিক অবস্থানই বাস্তব। কিন্তু তার মানে এই নয় যে কোথাও প্রতিবাদ সেই সমাজের প্রতি বা আত্মীয়স্বজনের প্রতি। কখনো কখনো সে প্রতিবাদ আভাসিত, তার তীব্রতা কম কিন্তু শক্তিশালী। কখনো বা প্রতিবাদ অন্যমাত্রায়— আতঙ্কে শিউড়ে ওঠার মতো। সে আলোচনায় পরে যাবো।

‘চিরাচরিত’ গল্পেই তিনি দেখিয়েছেন, স্বামীর প্রতি, সমাজের প্রতিনারীর প্রতিবাদের সেই ঈশারা। কোনো মেয়েই নিজে থেকে স্বেচ্ছায় ধর্ষিতা হয় না। তারা ধর্ষণ করে অবাধেঘোরে। যদিও ওরা সমাজবিরীধী কিন্তু ধর্ষিতা মেয়েটি গর্ভবতী হলেও দোষ হয় মেয়েটির এই চিন্তাধারার বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করে রিমকি তার স্বামীকে বলে—

আমি জানি আমার জন্যে তুমি কষ্ট পাচ্ছ। তোমার পরিবার, তোমার অফিস। তোমার পাড়াপড়শি…আমি রেপ হলাম আর একটি ধর্ষিতা মেয়েকে নিয়ে আছ বলে ভয় পাচ্ছ  সর্বদা! তোমার চেনা জগৎ ছেড়ে থাকতে হচ্ছে। তোমার মনে রিঅ্যাকশন হচ্ছে! কে কবে জেনে ফেলে, তারপর কী হবে!

প্রত্যেকের ব্যাপার দেখলাম। পরিবার, স্কুল পাড়া, আমি যেন একটা এডস্‌ রোগী। কিন্তু রেপ তো আমি ইচ্ছে করে হইনি। কোন মেয়েই হয় না।  তাকে কেন দাম দিতে হয়? আমাকে যারা ঘেন্না বা ভয় করেছে; আমি তো তাদেরই গৃণ্য মনে করি। …

আমার মতো অভিজ্ঞতা কত মেয়ের?

এ যেন একটা ধারাবাহিক উপন্যাস। লেখাই হচ্ছে। কবে শেষ হবে? [‘চিরাচরিত’, পৃ ২৫১-২৫২, মহাশ্বেতা দেবীর পঞ্চাশটি গল্প, প্রতিক্ষণ পাবলিকেশনস্‌ প্রাইভেট লিমিটেড।]

রিমকি স্বেচ্ছায় বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। মুক্তি দেয় তার স্বামী, পরিবার, ছেলেকে।যোগ দেয় এক মহিলা সংগঠনে যেখানে তার মতো আরও ধর্ষিতা মেয়ে থাকে, কাজ করে। যাবার আগে আরঅ একটি কথা তার স্বামী বীরুকে বলে—

আমি তো আমাকেই খুঁজতে যাচ্ছি। আমার নিজের চাকরির যে টাকা রাখেছিলাম, তাই নিয়ে চললাম। …

আত্মহত্যা করেছি এ কথাটা শুধু বোলো না, কেননা আমি বেঁচে থাকব। [‘চিরাচরিত’, পীই ৭৫২, ঐ]

‘কেননা আমি বেঁচে থাকব’- বাক্যটিই জীবনের প্রতি, নিজের প্রতি রিমকির ইতিবাচক ভাবনারই পরিচয় বহন করে।

কিন্তু ‘দ্রৌপদী’গল্পের পরিণতিতে পৌঁছে পাঠক স্তম্ভিত হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ধরনে। বাংলাসাহিত্যে এরকম মনে হয় আর কোথাও নেই। নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা এই গল্পের দোপ্‌দিমেঝেন ও তার স্বামী দুলন মাঝি সংসার সন্তানের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে নামে আন্দোলনে। জোতদার সূর্য সাহুকে দল বেঁধে হত্যা করে। কয়েকজনের বিশ্বাসঘাতকতায় দুলন ধরা পড়ে ও নিহত হইয়। আর দোপ্‌দির মাথার দাম ঘোষিত হয় দু’শো টাকা। অবশেষে, একসমইয় ধরা পড়ে দোপ্‌দিও।

অ্যাপ্রিহেন্‌টেড হওয়ার পর এক ঘন্টা জেরা চলে। তারপর সেনা নায়কের নির্দেশ—‘ওকে বানিয়ে নিয়ে এসস। ডু দি  নিডফুল।’ আসামীকে ‘কাঁউটার’ করা হয় জানতো দোপ্‌দি কিন্তু ও তো নারী! তাই ওকে সারারাত ধরে ‘বানানো’ হয়। কত জন তা সে জানে না। একের পর এক।

আবার বানিয়ে নেবার প্রক্রিয়া শুরু হয়। চলতে থাকে। চাঁদ কিছু জ্যোৎস্না বমি করে ঘুমাতে যায়। থাকে শুধু অন্ধকার। একটি বাধ্য হয়ে পা ফাঁক করে চিতিয়ে থাকা নিশ্চল দেহ। তার ওপর সক্রিয় মাংসের পিস্টন ওঠে ও নামে, ওঠে ও নামে।  তারপর সকাল হয়।’ [শ্রেষ্ঠ গল্প’/দে’জ/ পৃ ৭০]

তারপর, কাপড়টা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে প্রখর সূর্যের আলোয় সেনা নায়কের দিকে এগিয়ে আসে দ্রৌপদি, সামনে দাঁড়ায় সেনা নায়কের। ‘উলঙ্গ। উরু ও যোনি কেশে চাপ চাপ রক্ত। স্তন দুটিক্ষত বিক্ষত’। আর কাপড় কোথায় ওর— সেনা নায়কের এই জিজ্ঞাসার উত্তরে দুর্বোধ্য এক অদম্য হাসিতে কাঁপে দ্রৌপদি, আর বলে—

কুলকুলি দেবার মতো ভীষণ, আকাশচেরা, তীক্ষ্ণ গলায় বলে, কাপড় কী হবে, কাপড়? লেংটা করতে পারিস, কাপড় পড়াবি কেমন করে? মরদ তু?

এখানেই শেষ নয়। রক্তমাখা থু থু ফেলার জন্য সেনা নায়কের শাদা সার্টটিকেই বেছে নেয় দ্রৌপদি। বলে কাপড় পরাতে দেবে না। ‘আর কী করবি?’ গল্প শেষ হয় আরো মারাত্মক একটি বাক্যে, পাঠককে স্তম্ভিত করে দেয় অকল্পনীয় এই প্রতিবাদের ধরন এবং তার ফলাফল—

দ্রৌপদি মর্দিত স্তনে সেনানায়ককে ঠেলতে থাকে এবং এই প্রথম সেনানায়ক নিরস্ত্র টার্গেটের সামনে দাঁড়াতে ভয় পান, ভীষণ ভয়।’

নারীর বিচিত্র সমস্যার কথা মহাশ্বেতা দেবীর বেশির ভাগ গল্পের বিষয় হয়েছে বার বার। এমন কি ইতিহাস ঘেঁটেও তিনি তুলে এনেছেন নারীর বঞ্চনা-নিপীড়নের কথাই। ‘সতীরানীর ঘাট’, ‘রোমথা’, ‘চস্মা’ প্রভৃতি গল্পে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। আবার ‘বিশালাক্ষীর ঘর’ গল্পে দেখি এক প্রৌঢাকে কীভাবে শ্রেণি হারাতে হারাতে শেষ পর্যন্ত ভিখারি হয়ে যেতে হয়। কিন্তু সমস্যার মধ্যেই শেষ হয় না সব গল্প। উত্তরণের কথাও আছে এবং সে উত্তরণের পথও পরিস্থিতির সাপেক্ষে ভিন্ন। ‘গিরিবালা’ গল্পে গিরিবালার স্বামী যখন তার ছোটো মেয়ে মরুনিকেও বিক্রি করার ধান্দায় থাকে , সেটা বুঝতে পেরে মেয়ের হাত ধরে বেড়িয়ে আসে গিরিবালা স্বামীর সংসার থেকে। টাউনে ঝি খাটতে বেড়িয়ে পড়ে—‘ভাবতে ভাবতে তার মুখ চোখের জলে ভেসে গেল। তবু সে হেঁটে চলল’— এই চলা আসলে উত্তরণের ইঙ্গিত। সমস্যা থেকে উত্তরণের এক চমৎকার গল্প ‘নেয় না’ যা প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালের মে মাসে ‘আমার সময়’ পত্রিকায়।

‘নেয় না’ গল্পের মুল চরিত্র বেংচি। তারা দ বোন তেংটি আর বেংচি। দুজনেরই বিয়ে হয়েছিলো। কিন্তু তাদের স্বামীরা গ্রহণ না করায় তাদের বাড়ির নামই হয়ে যায় ‘নেয় না’ দের বাড়ি। তেংটি, বেংচি, আর তাদের বিধবা মা লোকের বাড়ি কাজ করে সংসার চালায়। তেংটি একটু ঠাণ্ডা প্রকৃতির হলেও বেংচি মুখরা ও তেজি।  দুই বোনের পিতৃদত্ত নাম সুমঙ্গলা ও সরস্বতী।

বেংচি সে নাম পরিবর্তন করে নাম নেয় পূজা আর রিনা। বেংচি ওরফে রিনা সবসময় চায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে। মা ও দিদির মতো স্বামীর লাথি খেয়ে সে বাঁচতে চায় না। চেষ্টা করতে করতে একদিন অপ্রত্যাসিত সুযোগও এসে যায়। সে কাজ করতো আনন্দনগরের দুটো ফ্ল্যাটে। দুটো ফ্ল্যাটের দুটো বাচ্চাকে আনতো স্কুল থেকে। তার মধ্যে একটি বাচ্চার মা বিকেলে ফেরে। ফলে বেংচি বাচ্চাটিকে খাইয়ে, ঘুম পারিয়ে ওর মা না ফেরা অবধি বসে বসে কাঁথা স্টিচ করে। তার হাতের এই কাঁথা স্টিচের কাজ দেখেই তার মনিবানি ও মনিবানির বান্ধবী কাঁথা-স্টিচের শাড়ি-স্কার্ফ-দোপাট্টার ব্যবসা খুলতে চায়। আর বেংচিকে বলে সকলকে ট্রেনিং দেওয়ার দায়িত্ব নিতে। মওকা বুঝে বেংচিও নিজের দর হাঁকে মাসিক পাঁচ হাজার টাকা, আর মনে মনে ওর স্বামীকে বলে—

‘নেব না’ বলে বের করে দিয়েছিলে তো? এবারে এসো। আমার দোরে এসো। টাকার গন্ধে গন্ধে ঠিকই আসবে। তখন বলে দোব, দূর হও তুমি! তোমাকেও বলতে হবে, বউ আমায় নেয় না।

কাঁথা-স্টিচ বলে কথা! টিভিতে ১০/২০ হাজারের কাঁথা-স্টিচের শাড়ি-ঘাগরা-সালোয়ার বেংচি অনেক দেখেছে। সব কিছুই হাজার হাজার টাকা দাম হয়। বেংচি মনে মনে বলে, “নেউ না” কী? পায়ে দাঁড়াব, তোমারে “নেয় না” করে ছাড়ব। [‘নেয় না’, পৃ৮, আমার সময়, মে, ২০০৯, প্রথম বর্ষ, প্রত্থম সংখ্যা]

লক্ষ করার যে, সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ নিজেই করেছে।শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে প্রতিবাদের অভিপ্রায়ও বেড়িয়ে আসে—‘নেয় না করে ছাড়ব।’

‘শিকার’ গল্পের মেরী ওঁরাও এর মতো চরিত্র বাংলা ছোটো গল্পে বিরল। মেরীর যে সমস্যা এবং তার যে সমাধান সে নিজেই যেভাবে করে তাতেও চমকে উঠতে হয় দ্রৌপদির মতোই। তবে দ্রৌপদির অসহায়তার প্রক্ষিতে তার পথ ছিলো ভিন্ন। আর মেরী আরো ভয়ঙ্কর ,এতটাই ভয়ঙ্কর যে অসচেতন পাঠকের মনে হতেই পারে যেন লেখকের ইচ্ছেপূরণ। কিন্তু মেরী যেভাবে গল্পে অঙ্কিত এবং তার যে কৌশল তাতে শিল্পগত দিক থেকে মেরী অসাধারণ। আর তথাকথিত ভদ্র সমাজের বা উচ্চবিত্তের নারীরা যা পারে না সহজে সামাজিক বন্ধনের নানা জটিল মানসিকতায়, মেরী ওঁরাও –রা যে সেটা পারে, তা মহাশ্বেতার অন্য একটি সাক্ষাৎকার থেকে বোঝা যায়—

 সাধারণ, অতি সাধারণ মানুষের কাছাকাছি গিয়েছি—তারাও আমার কাছে আসেন। আমি ওই সব মেয়েদের খুব কাছ থেকে দেখেছি। দেখিও।  ওদের মধ্যে প্রতিবাদটা অনেক আগেই শুরু হয়েছিল—তা আমরা ধরতে পারি নি। মেয়েদের স্বাধীনতার উপলব্ধিটা জীবন দিয়ে ওরা সহজভাবে বুঝেছে। এই যে দেখি শহরে ঠাণ্ডা ঘরে শিক্ষিত মেয়েরা ডিবেট-ট্রিবেট করে, তার হয়তো রিয়েল লাইফ কেসগুলির কথা জানেই না। খবরই রাখে না।

সো কলড্‌ উইম্যানস্‌ লিব-এ আমার কোনও কালেই বিশ্বাস ছিল না। আমি মনে করি কোনও মেয়ে নিজেকে লিবারেট করতে চািলে করতেই পারে। কাজের মাধ্যমে তা করতে হবে। [ মহাশ্বেতা দেবীর সাক্ষাৎকার, আমার সময়, মে, ২০০৯, প্রথম বর্ষ, প্রত্থম সংখ্যা , পৃ ৬৪]

আদিবাসী সমাজেরই মেয়ে মেরী, যদিও তার শরীরে বইয়ে চলে বিদেশি সাহেবের রক্ত। আর এই কারণেই আদিবাসী সমাজে মেরী কিছুটা ব্রাত্যও বটে। আপন সমাজে ব্রাত্য থাকার এই যন্ত্রণাই ওকে করে তোলে অনেক বেশি সাহসী, জেদী আর বেপরোয়া। তশীলদার সিং কে সহজেই চিনে ফেলে মেরী, যদিও গ্রামের সবাইকে বোকা বানিয়ে শাল কাঠ কিনতে থাকে তশীলদার সিং। তার লালসার দৃষ্টিকে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করে মেরী। জেদ আর স্পর্ধা বাড়ে তশীলদারেরও, ঘুরতে থাকে মেরীর পিছনে। ধৈর্য্য হারিয়ে একদিন নির্জন রাস্তায়হাত চেপে ধরে মেরীর। মেরীও আশ্বাস দেয় মিলিত হবার—শিকার পরবের দিন।

হোলির দিন, আদিবাসীদের শিকারের দিন। বারো বছর পর একবার করে শিকারে যায় মেয়েরা আর বাকি বছরগুলি ছেলেরা। এবার মেয়েদের পালা। ঐ পরবের দিন তারা বনভোজন করে, মদ খায়,গান গায়।মেরীর আহ্বানে লোলুপ তশীলদার সবাইকে মদ-মাংস খাওয়ায়। আর মেরী চলেছে আজ শিকারে।

মেরী আদরে তশীলদারের মুখে হাত বোলাল, ঠোঁটে চুমকুড়ি খেল। তশীলদারের চোখে আগুন, মুখ হাঁ, ঠোঁট লালা মাখা, দাঁতে ঝিলিক, মেরী দেখছে, দেখছে, মুখটা বদলাতে বদলাতে এবার? এবার? হ্যাঁ জানোয়ার হয়ে গেল।

অব লে মুঝকো?

মেরী হেসে ওকে জড়ালো, মাটিতে শোয়াল, তশীলদার হাসছে, মেরী দা-টা ওঠাল, নামাল, ওঠাল নামাল।

বেড়িয়ে এসে নালার জলে নগ্ন হয়ে স্নান করতে করতে  তৃপ্তিতে ভরে ওঠে মেরীর মুখ। তারপর রেললাইন ধরে যেতে যেতে ভয় পায় না আর। কারণ বড়ো জানোয়ার মেরেছে সে— এই শিকারের দিনে।

মহাশ্বেতার নারীভাবনা— তাঁর মেয়েদের সুখ-দুঃখ-অভাব-সমস্যা-উত্তরণ-প্রতিবাদ, সব, সবকিছু এই মেরীতে এসে এমন জায়গা স্পষ্ট করলো, এরপর আর এ লেখা বাড়ালে ঠিক হবে না। তাহলে আবার নীচে নেমে এসে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে! সে হবে পরে।

উৎপল মণ্ডল, পিএইচডি। লেখক ও অধ্যাপক। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের বীরভূম। পেশাগত জীবনে তিনি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ