নারী হয়ে ওঠার অন্য উপাখ্যান: পাকা ধানের গান

সুস্মিতা দাস
গবেষণা, প্রবন্ধ
Bengali
নারী হয়ে ওঠার অন্য উপাখ্যান: পাকা ধানের গান

‘নারী হয়ে কেউ জন্মায় না, কেউ কেউ নারী হয়ে ওঠে’ -একথা বলেছিলেন সিমোন দ্য বোভোয়া । আসলে প্রত্যেক শিশু নিজস্ব লিঙ্গ নিয়ে পৃথিবীতে আসে, জন্মসূত্রে এইটুকু পার্থক্য রয়ে যায় নারী পুরুষের মধ্যে। কিন্তু সমাজ এই পার্থক্যকে গভীরতর করে স্ত্রী পুরুষের মধ্যে তার স্থিরীকৃত কোড অফ কন্ডাক্ট বসিয়ে। ব্যবহারিক আচরণ, পোশাক নির্বাচন, গান, আড্ডা, সাহিত্য, দর্শন – জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কোড অফ কন্ডাক্টকে কাজে লাগিয়ে Sex definition কে Gender division এ পরিণত করে ও বৈষম্যকে দাঁড় করায় সমাজ নির্ধারিত শক্ত ভিত্তির উপর। যা কিছু পৌরুষের প্রতীক তার বিপরীত লক্ষণগুলি নির্ধারিত হয় নারীত্বের সংজ্ঞা রূপে। শিশুদের বেড়ে ওঠা, মানুষ হয়ে ওঠার অন্যতম নির্ধারক তার শিক্ষা পদ্ধতি। অথচ সেই শিশুর শিক্ষা জগৎ লিঙ্গবৈষম্য মুক্ত নয়। ছাত্র বলতে যে শ্রেণীকে বোঝায়, তা হওয়া উচিত লিঙ্গনিরপেক্ষ; তাতে অবাধ প্রবেশাধিকার থাকা প্রয়োজন বালক বালিকা সকলেরই। কিন্তু শিশুপাঠ্যের বইতেও মডেল ছাত্র সব সময় একজন বালক। এভাবে শৈশব কাল থেকে বালক বালিকার মনে Gender Discrimination এর বীজ বুনে দেওয়া হয়। সেখানেও প্রাধান্য থেকে যায় ছেলেদের; মেয়েরা ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ – বোভোয়ার ভাষায় । ভার্জিনিয়া উলফ ১৯২৯ সালে তার ‘এ রুম অফ ওয়ানস ওন’ (১৯২৯) বইতে জানান, এই লিঙ্গ পরিচয় জন্মগত সত্য নয়, সামাজিকভাবে নির্মিত অভ্যেস যার পরিবর্তন সম্ভব । পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামো নারী স্বাধীনতার পরিপন্থী। পুঁজিবাদ নির্ভর পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় লিঙ্গবৈষম্যভিত্তিক পরিবার, শিক্ষা জগতে পুরুষের একচেটিয়া শাসন, পারিবারিক পরিসরে তার কর্তৃত্বপরায়নতা নারীকে নিজের ঘরের পরিসরেই নির্বাসনের সাজা শুনিয়েছিল, নিজের তৈরি করা সংসারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সে ছিল বাইরের লোক। আসলে নারী পুরুষ আলাদাভাবে নয়, অসম ভাবে অবস্থিত। ছেলেদের তুলনায় সম্পদে অধিকার, সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা বা আত্মপ্রতিষ্ঠার সুযোগ নারীর অনেক কম। এই বৈষম্য যেকোন জাতি, বর্ণ বা শ্রেণীর বাস্তব সত্য। যেহেতু প্রকৃতি নির্দিষ্ট কোন পার্থক্য নারী-পুরুষের নেই, তাই প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব চরিত্রধরণ অনুযায়ী আত্মপ্রতিষ্ঠা ও জীবন পরিচালনার সুযোগ পাওয়া উচিত। এই লিঙ্গ সাম্যের ভিত্তিতে সমাজ পুনর্গঠিত হলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষ উপকৃত হবেন বলে লিবারল ও মার্কসিস্ট ফেমিনিস্টরা বিশ্বাস করেন । লিবারাল ফেমিনিজম ও মার্কসিস্ট ফেমিনিজম উভয় মতেই নারীর এই অন্তরবাসিনী সত্তার বন্দিত্বের কারণ তার আর্থিক পরনির্ভরশীলতা। তাকে সমাজ দেখেছে ও দেখিয়েছে মাতৃরূপী সত্তায়। এইভাবে তাকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে উৎপাদন-উপার্জন ক্ষেত্র থেকে। গৃহলক্ষী রূপেই তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কার্যকারিতা নির্ধারণ করেছে সমাজ। সমাজ নির্দিষ্ট হয়ে এই গণ্ডিকৃত ভূমিকা আত্মস্থ হতে হতে সে একজন মানুষ নয়, একজন নারী হয়ে উঠেছে। এইভাবে পিতৃতন্ত্র নারী জগতের চারপাশে লক্ষণরেখা টেনে দিয়েছে যা লঙ্ঘনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামোর জন্মলগ্ন থেকে। শিশু ও রান্না ঘরের সমস্ত দায়-দায়িত্ব মেয়েকূলের একলার যে দায়িত্বভার,তা বোঝা হয়ে তার জীবন চলার পথকে করেছে সংকীর্ণ। কিন্তু কোন জৈবিক বা প্রাকৃতিক নিয়মে এ বিভাজন ভিত্তিহীন। পিতৃতন্ত্র নির্দিষ্ট একপেশে বিভাজনকে কেট মিলেট বলেছেন লিঙ্গাশ্রয়ী রাজনীতি । এই নিয়ম পুরুষেরা যেমন মেনে চলেছে তেমনি নারীরাও এই নিয়মের পক্ষপাত নিয়ে বহুদিন পর্যন্ত বিরোধিতায় নামেনি।তাই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার সামাজিক নিয়মকানুন  পুরুষের মস্তিষ্কপ্রসূত ঠিকই, কিন্তু তার ভিত্তি পাকা করেছে নারী-পুরুষ যুগলেই। নারীর মাতৃত্বকে সমাজ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। নারী জীবনের একমাত্র সার্থকতা তার মাতৃত্ব। সুতরাং সন্তান জন্মদানের সঙ্গে তার লালন-পালনের একচ্ছত্র দায়ী চেপেছে তার কাঁধে। সমাজের স্বাভাবিক গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তার মাতৃত্ব ও নারী শরীরের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে; তাকে গন্ডি কৃত করতে করতে এনে ফেলেছে হারেম, অন্তপুর, অন্দরমহলের সীমায়িত সীমানায়। আটকে রেখেছে পরিবারের পরিসরে।অকুণ্ঠচিত্তে ঘোষণা করা হয়েছে স্বামীর সেবাই নারীত্বের সর্বোৎকৃষ্ট গুণ। আমাদের সাহিত্যেও সেই ঘরানার সৃষ্টি হয়ে চলেছে অবিরল। যে শরৎ সাহিত্যে নারী স্বাধীনতার জন্য বিখ্যাত, সেখানেও পিতৃতন্ত্র নির্ণীত নারীত্বের সংজ্ঞা সাহিত্য রূপ পেয়েছে। ব্যতিক্রমী সাহিত্যিক অবশ্যই উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে ধুমকেতুসম মাইকেল মধুসূদন দত্ত। বীরাঙ্গনা যার স্বতপ্রকাশ। পরবর্তীতে রবীন্দ্রসাহিত্যেও নারীর ব্যতিক্রমী ভূমিকা লক্ষণীয়। লাবণ্য, সুচরিতা, নন্দিনী বা সোহিনীর মধ্য দিয়ে নারীর মেধা, বুদ্ধি, তর্ককুশলতা বা শিল্পানুরাগ প্রকাশ পেয়েছে। ঘটনাচক্রে দুই সাহিত্যিকই ইউরোপীয় চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন।

নারীবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত ইউরোপে, অষ্টাদশ শতকের শেষ অধ্যায়ে। নারীর একজন মানুষ হিসেবে অধিকার নিয়ে সোচ্চার হোন ১৭৯২ সালে জুডিথ সার্জেন্ট মার তার ‘অন দি ইকোয়ালিটি অফ সেক্সেস’ গ্রন্থে এবং মেরি উইলস্টোনক্রাফট তার ‘এ ভিন্ডিকেশন অফ দি রাইটস এন্ড উইমেন’ গ্রন্থে । ফরাসি বিপ্লব বিশ্ববাসীকে শোনাচ্ছে সাম্য মৈত্রী ও স্বাধীনতার বাণী। ইউরোপ সাক্ষ্য দিচ্ছে শিল্প যুগের প্রারম্ভের। সেই সঙ্গে মানব সমাজে প্রবেশ করছে পুঁজিতন্ত্র। এইসময় পর্বের নারী আন্দোলনের প্রারম্ভ কাল এসেছে অভিজাত গৃহবধূদের হাত ধরে। এরা বুর্জোয়া ব্যক্তিকেন্দ্রিক নারীবাদ গোষ্ঠীভুক্ত। শিক্ষা, চাকরি, বিবাহে নারীর স্বার্থরক্ষা বা পিতা বা স্বামীর পরিচয় থেকে বেরিয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠার মতো এদের তরফে এলেও অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মত জীবনের মৌলিক প্রয়োজনের জন্য তাদের প্রাত্যহিক লড়াই চালাতে হতো না। সেই দাবি নিয়ে এলো সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ। রবার্ট আওয়েন, ফুরিয়ের, সাঁ সিমোরা ক্রীতদাসত্ব বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করলেন নারীবাদী আন্দোলনের ঘরানাও।

এঙ্গেলস তার ‘দি অরিজিন অফ ফ্যামিলি, প্রাইভেট প্রপার্টি এন্ড দি স্টেট’ (১৮৮৪) বইতে অধিকারের বিষয়টি উপস্থাপন করেন। মার্কসীয় মতবাদ অনুযায়ী, শ্রেণী নিরপেক্ষ সমাজ গঠন তখনই সম্ভব যখন সমাজে নারী-পুরুষের বিভাজন রেখা মুছে যাবে। আর এই লিঙ্গ সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন পুঁজিবাদের উৎসাদন যে পুঁজিতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করে পরিবার। একক বিবাহ দ্বারা সৃষ্ট পরিবার পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো কে ধারণ করে চলেছে। পূর্বে মাতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীরা গৃহবন্দীর জীবন যাপন করত না। ঘরে ও বাইরে তাদের পুরুষেদের সমান যোগদান ছিল। বংশ-পরম্পরা চলত মেয়েদের মাধ্যমে। পরবর্তীতে সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হলে ব্যক্তিগত মালিকানার প্রশ্ন আসে। এইভাবে উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রভূত পরিমাণ উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হলে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো জন্ম নেয়। মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পিতৃত্ব নির্ণয় করা কঠিন ছিল।তাই পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীকে সতীত্বের বাঁধনে বদ্ধ করে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানা সুরক্ষিত রাখা হলো। নারী পরিণত হল গৃহবন্দী সম্পত্তিতে আর পিতৃ বংশধারায় সম্পত্তির অধিকার বইতে লাগলো।সন্তানের পিতৃত্বকে নির্ণয়ের প্রয়োজনেই নারীর সতীত্বকে এত মূল্য দেয় তান্ত্রিক সমাজ। তাই এঙ্গেলসের মতে পরিবার গঠনের মধ্যে দিয়েই নারীর সবচেয়ে বড় পরাজয় ঘটেছিল । তাছাড়া মার্কসীয় মতবাদ নারীর গৃহকর্ম জনিত পরিশ্রমের কোন মূল্য দেওয়া হয় না। সংসারের কাজকে বিক্রয়যোগ্য মনে করে না সমাজ। অথচ এ কাজের জন্য রাষ্ট্রের তরফ থেকে মজুরি প্রাপ্য নারী জগতের। আসলে পিতৃতন্ত্রের পরিবারকে উৎপাদনের ইউনিট হিসেবে ধরা হয় না। কিন্তু সেখানে পরিষেবা রয়েছে। তাছাড়া পরিবার গণ্ডির মধ্যে সন্তান পালন হয়ে থাকে যারা ভবিষ্যতের পরিষেবক। গৃহকর্ম, সন্তান জন্মদানের মত কঠিন শ্রমযোগ্য কাজ এবং সন্তান পালনের জন্য নারীদের মজুরি পাওয়া প্রয়োজনীয়।

মার্কসীয় মতবাদভুক্ত Idea of Intersectionalityনারীদের দ্বিমুখী শোষণ বা double victimization এর কথা বলে। নারীরা বিশেষত সমাজের অন্ত্যজ তথা প্রান্তবর্তী নারীজগৎ অর্থনৈতিক শোষণে গ্রস্ত। সেই সঙ্গে যদি সংখ্যালঘু ধর্ম বা বর্ণ ভুক্ত হয় তারা, তবে ধর্মীয়বৈষম্যজনিত বা বর্ণবৈষম্যজনিত শোষণেরও সম্মুখীন হতে হয় তাদের। এইভাবে তারা একাধিক স্তরীয় শোষণে জেরবার জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। অন্ত্যজ শ্রেণীর মেয়েদের লড়াই অভিজাত নারীদের তুলনায় পৃথক। তাদের দৈনন্দিন জীবনধারণের লড়াই  নিম্ন স্তর ভুক্ত নারী সমাজের মত নয়। তাই অভিজাত নারী বর্গের লড়াই মূলত বুর্জোয়া নারীবাদে সীমাবদ্ধ। এই নারীবাদ পুঁজিতন্ত্রের পরোক্ষ মদত যোগায়। দারাজে জীবন-যাপনে অভ্যস্ত তা পুঁজিবাদ কেই অপ্রত্যক্ষত তুলে ধরে। এদের থেকে পৃথক অবস্থানে রয়েছে সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ। সেই নারীবাদ নারী স্বাধীনতার সঙ্গে শ্রেণীশত্রুত্ব ধ্বংসের আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িত।

সমাজতান্ত্রিক নারীবাদের সূচনা এঙ্গেলসের ‘দি অরিজিন অফ ফ্যামিলি, প্রাইভেট প্রপার্টি অ্যান্ড দি স্টেট’ বই দিয়ে। তিনি যেখানে শেষ করেছেন সিমোন দ্য বোভোয়া সেখান থেকে শুরু করেছেন। তার বিখ্যাত ‘দি সেকেন্ড সেক্স’ (১৯৪৯) বইটি প্রকাশের সময়ও তিনি সমাজতন্ত্রী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন। সমাজতন্ত্র এলেই নারী মুক্তি সম্ভব- সমাজতান্ত্রিক নারীবাদের এই মতের প্রতি তারও সমর্থন ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তার মতের পরিবর্তন হয়। সমাজতন্ত্র আসা পর্যন্ত আর অপেক্ষা নয়, নারীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন বর্তমানে বলে তিনি মত দিয়েছেন । আবহমান কাল থেকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের জন্য বরাদ্দ করেছে পুরুষদের বিপরীত লক্ষণগুলিকে। পুরুষেদের ইচ্ছা পূরণের জন্যই যেন তাদের জন্ম; তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ। সমাজ, অর্থনীতি, দর্শন, রাজনীতি সর্বত্র এই ধারণা বহাল রয়েছে।

জেন অস্টিন ও মেরি উইলস্টোনক্রাফট প্রথম নারীর অধিকারের দাবি নিয়ে সোচ্চার হোন অষ্টাদশ শতকের শেষ পর্বে। উনবিংশ শতকের প্রারম্ভে নারীবাদ অন্যতম সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয় যা আজও প্রবাহমান এবং ভীষণরকম প্রাসঙ্গিক।নারীবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত চারটি waveএর কথা বলা হয়েছে। First wave of feminism শুরু হয় ঊনবিংশ শতকের প্রথম ভাগ থেকে।সেখানে আন্দোলনের মুখ্য দাবি ছিল সম্পত্তিতে নারীর অধিকার এবং ভোটাধিকার। ভোটাধিকার নিয়ে লড়াই চলেছিল পাশ্চাত্যের ইউরোপ-আমেরিকা জুড়ে। পৃথিবীর প্রথম গণতান্ত্রিক দেশ বলে খ্যাত যে গ্রীস, সেই অ্যারিস্টোটলীয় গ্রীসে গণতন্ত্রের অধিকার ছিল শুধুমাত্র পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাও সেই পুরুষকে হতে হতো শিক্ষিত, অভিজাত বর্গভুক্ত। First waive of feminism সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রবেশের প্রয়োজনে গণতন্ত্রের অধিকার স্বরূপ ভোটাধিকার দাবি করে। আমেরিকা বিশ্বের প্রথম দেশ যেখানে নারীরা ভোটাধিকার পায়। First wave of of feminism দ্বিতীয় স্তরে প্রবেশ করে বিশ শতকের ষাটের দশকে। Second wave of feminism নারীদের সামাজিক অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়। নারীর পরিচয় কেবল গৃহকর্মে গর্ভধারণের সীমাবদ্ধ নয়। শুধু গৃহলক্ষীর ভূমিক্ষয় নয়,একজন মানুষের অস্তিত্বের স্বীকৃতি চাইল নারীবাদী আন্দোলনের দ্বিতীয় স্তর। সমাজ নারীকে যৌনবস্তু হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। তাই আমেরিকার সৌন্দর্য প্রদর্শনীতে মিস আমেরিকা প্রতিযোগিতায় নারীদের দেহরূপের প্রদর্শন নারীরূপে শুধু নয়, মানুষ হিসেবেও চূড়ান্ত অবমাননাকর। তাই নারীর সৌন্দর্য বর্ধনকারী প্রসাধনসামগ্রী যেমন মেক আপের উপকরণ, অন্তর্বাস যা নারীকে পুরুষের মনোরঞ্জনকারী বস্তু হিসেবে প্রমাণ করতে চায়, তার বিরুদ্ধে নারীবাদী আন্দোলনকারীরা প্রতীকী প্রতিবাদ স্বরূপ সেই সমস্ত সামগ্রী পুড়িয়ে ফেলে। নারীবাদী আন্দোলনে এই স্তর যখন পরবর্তী ধাপে পৌঁছায় তখন তা আরো জটিল রূপ নেয়। বিশ শতকের নব্বইয়ের দশকে নারীবাদী আন্দোলনে প্রবেশ করে Third wave of feminism।সেখানে নারীদের প্রতিবাদী আন্দোলন নারী হিসেবে প্রতারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন মানুষ হিসেবে জাতি-ধর্ম-বর্ণ দ্বারাও বঞ্চিত হওয়ার বিরুদ্ধে। Idea of intersectionality নারী হবার সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যালঘু জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভুক্ত হওয়ার কারণে যে দ্বিমুখী শোষণের শিকার হয় নারী, সেই বঞ্চনার কথা তুলে ধরে। এই নারীবাদী আন্দোলনের একাংশ বিশেষত যারা অল্পবয়স্ক তাদের মুখে পূর্ববর্তী স্তরের আন্দোলনের সমালোচনা উঠে আসে। তাদের কাছে পূর্ববর্তী স্তরের আন্দোলনটি আসলে বুর্জোয়া নারীবাদী আন্দোলন। যে প্রসাধন সামগ্রী বর্জন করা হয়েছিল Second wave of feminismএ, সেই সামগ্রীকে তাদের একাংশ গ্রহণ করল নিজেদের মতো করে নিজেদের জীবন পরিচালনা করার প্রতীকী স্বরূপ। সেখানে পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ নয়, নিজের পছন্দ মত জীবন যাপনের অধিকার কে গুরুত্ব দেওয়াই তাদের লক্ষ্য। এই নারী-পুরুষের মধ্যে বিভাজন রেখা টানা হয় যে sex দ্বারা সেই sex আর gender যে এক বিষয় নয় তা জানান জুডিথ বাটলার। তার মতে,sex মানুষের শারীরবৃত্তীয় গঠনকে নির্দেশ করে। কিন্তু একজন মানুষের পরিচয় তো শুধু শারীরবৃত্তীয় গঠনে সীমাবদ্ধ থাকেনা। তার সঙ্গে সমাজ নির্দেশিত আচার বিধির মতো একাধিক বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। সেই সমস্ত নির্দেশ নির্ধারিত হয় gender দ্বারা। তাই জুডিথ বাটলারের gender অনেকটা fluidএর মত। তিনি প্রথম সার্বজনীন নারীত্ব (universal womenhood) তত্ত্বের বিরোধিতা করেন। পুরুষের বিপরীত লক্ষণগুলিই কেবল নারীত্বের সীমাবদ্ধ নয়; এমনকি নারী পুরুষের binaryর মধ্যেও সমাজ সীমাবদ্ধ নয়।Cis Gender (যারা নারী ও পুরুষ নিয়েই সমাজ গঠিত বলে মনে করে) তত্ত্বে বিশ্বাসী ও normative heterosexuality তে (যারা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ স্বাভাবিক ও সাধারণ বলে মানেন) আস্থাবানদের মতবাদের বিরোধিতা করেন ও তৃতীয় লিঙ্গের (transgender) কথা তুলে আনেন জুডিথ বাটলার নারীবাদী আন্দোলনের এই তৃতীয় স্তরে। এই স্তরে উত্তর উপনিবেশবাদজাত প্রবঞ্চনার বিরুদ্ধেও আন্দোলনকারীরা সোচ্চার হোন। এই জুটির তৃতীয় স্তর আজও প্রবহমান যদিও তার মধ্যেই ঢুকে পড়েছে Second wave of feminism। এখানে ablism এর বিরুদ্ধাচারণ করা হয়েছে এবং নারীবাদকে শিক্ষার জগত ও বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্র থেকে বের করে এনে সমাজের প্রান্তবর্গীয় স্তরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যারা শারীরিক ও মানসিক ভাবে সমর্থ তারাই একমাত্র নেতৃত্ব দান করতে পারে এই মনোভাবের বিরোধিতা রয়েছে। এখানে শারীরিক বা মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়া অংশ এবং তথাকথিত শিক্ষা সংস্কৃতির সুযোগবঞ্চিত অংশ যে সমাজের ক্ষেত্রে ন্যূন বা হেঁয় নয়, তারাও যে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ও নেতৃত্ব দানের যোগ্য- এই দাবি নিয়ে আসে fourth wave of feminism। সেখানে আমাদের প্রপিতামহীরা যারা শিক্ষার সুযোগ সেভাবে পায়নি তাদের জীবনে, তারাও নেমেছে এই আন্দোলনে। নিজেদের জীবনে যে অধিকারকে তারা পায়নি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সেই অধিকারের লড়াই তারা করে যাচ্ছে। যেমন শাহীনবাগের দাদিরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন আন্দোলনে১০

নারী শক্তির অধিকার দিয়ে আন্দোলন আমাদের দেশে শুরু হয়েছিল হাজার উনিশ শতকেই। সেই আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগরের মতো পুরোধা ব্যক্তিত্ব। অর্থাৎ নারীর অধিকারের কথা এসেছিল পুরুষের হাত ধরে। কিন্তু প্রয়োজন ছিল নারীদের মুখ থেকেই তার অধিকারের দাবি উঠে আসার। পরবর্তীতে নিজেদের অধিকারের অধিকারের বিষয়ে নিজেরাই সোচ্চার হোন নারীরা। রাসসুন্দরী দেবীর ‘আমার জীবন’তার অন্যতম সাহিত্য ফসল। বিশ শতক জুড়ে টুকরো টুকরো হবে নারীদের লেখনীতে পুরুষতান্ত্রিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। প্রায় অনালোচিত লেখিকা সাবিত্রী রায় এই নারী ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম। তার কথাসাহিত্যে বিস্তৃত অংশজুড়ে সূক্ষ্মভাবে উঠে এসেছে পিতৃতান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে নারীতন্ত্রের প্রতিরোধ। তার অন্যতম পরিচিত উপন্যাস ‘পাকা ধানের গান’তার ব্যতিক্রম নয়। এই উপন্যাসটি ইংরেজি অনুবাদও পাওয়া যায়- ‘The harvest song’। তিনটি পর্বের এই বিশালায়তন উপন্যাসে এসেছে বহু ও বিচিত্র ধরনের চরিত্র। তারা বুনেছে এক জটিল কাহিনী জাল। সেই কাহিনী জাল ভেদ করলে নারীবাদী প্রতিরোধ সহজেই অনুমান করা যায়। সেই নারীবাদী প্রতিরোধ কে তুলে ধরাই আলোচ্য প্রবন্ধে মূল লক্ষ্য।

‘পাকা ধানের গান’উপন্যাসটির আরম্ভ বিন্দু মনসাডাঙ্গা গ্রাম ও তৎসংলগ্ন এলাকার সাধারণ গার্হস্থ্য জীবন নিয়ে। দীনবন্ধু মাস্টারমশাইয়ের স্ত্রী তার কন্যা সন্তানদের ভবিষ্যৎ একমাত্র বিয়ের মধ্যেই দেখেন, যেমন দেখে আর পাঁচটা সাধারণ মা। বিয়ের যোগ্য মেয়ে দেবকীর প্রতি তার সতর্ক দৃষ্টি সদা জাগরুক, যাতে দেবকী শ্বশুরবাড়ির মন যুগিয়ে চলতে পারে। গ্রামের বামুন কালা ঠাকুরুনের মেয়ে মেঘীর জন্য সেই ভাবনা নেই। তার জন্য আরও অধিক চিন্তা অপেক্ষারত। বিধবা মেঘীকে শাশুড়ির গঞ্জনা সহ্য করতে হয় না, তার বৈধব্যের দশা তার গর্ভধারিনী মায়ের কাছেই তাকে চক্ষুশূল করে তুলেছে। মায়ের তীব্র শাসন ও নিষ্ঠুর গণনা তাকে সইতে হয় বৈধব্যের অন্যান্য কঠোর আচারগুলি পালনের সঙ্গেই। এই ভয়ংকর জীবন তার ভরা যৌবনেই। সেই গ্রামে জগাই বাড়ুজ্যের মত ঘৃণ্য, নারী লোলুপ মানুষ আছে যে কিশোরী দেবকীকে একা পেয়ে যৌন হেনস্থা করার চেষ্টা করে। মেঘীর উপরেও তার কুনজর। প্রতিদিনের জীবনের মধ্যেই নারীকে গড়ে তোলা হয় পুরুষ সমাজের উপযোগী রূপে, স্বামী-শ্বশুরালয়ের মত করে। আবার সেই স্বামীর মৃত্যু তার জীবন রেখা কে সম্পূর্ণ উল্টো টানে ঘুরিয়ে দেয় দেবসেবায় নিয়োজিত কৃচ্ছসাধনের আদর্শে। এরই মধ্যে চলে অন্য পুরুষ কর্তৃক যৌন লাঞ্ছনা। সেই লাঞ্ছনা অধিকাংশ সময়ই চেপে দেওয়া হয় পারিবারিক সম্মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায়। তাই জগাই বাড়ুজ্যের কুকীর্তির কথা দেবকী মা সুবলাকে জানায়নি। দেবকীর মত আজকের সমাজের বহু মেয়ে আছে যারা পুরুষের এই ঘৃণ্য কীর্তির যথোচিত শাস্তি বিধানের কথা ভাবতেও পারে না। কারন সে অর্ধচেতনে এই সত্য উপলব্ধি করে ফেলে যে, হয় তাকে বিশ্বাসই করা হবে না, নয়তো এই অপ্রীতিকর ঘটনা যার পিছনে তার কোনো ভূমিকা নেই তার দায় তাকে চুকাতে হবে তার ও তার পরিবারের সম্মানের মূল্য দিয়ে। তাই যৌনহেনস্থাকারীরা, ধর্ষকেরা আজও বুয় সম্মানের ভয় দেখিয়ে সমাজে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে।

এই অভ্যস্ত কিন্তু অনভিপ্রেত জীবনচর্চার ছবি যেমন রয়েছে, তেমনি ব্যতিক্রমী ঘটনারও সাক্ষী এই মনসাডাঙ্গা। রাজনীতি সভা বা প্রতিবাদ মিছিল বাড়ির পুরুষদের মধ্যেই চর্চিত বিষয়। তার সঙ্গে মেয়ে মানুষের যোগ কী -সমাজের এটি অতি পরিচিত, পক্ষপাতদুষ্ট ধারণা। কিন্তু সেই ধারণার উল্টো চিত্র তুলে ধরে মনসাডাঙ্গার খেটেখাওয়া পরিবারভুক্ত নারী সম্প্রদায়। পথকর না দেওয়ার অপরাধে পুলিশ এসে গ্রামে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালায়, বৃদ্ধদের গায়ে হাত পর্যন্ত চলে, গ্রামের পুরুষেদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় থানায়। এরই প্রতিবাদে লক্ষ্মী, মঙ্গলা, দাসুর মা এমনকি লুকিয়ে মেঘী পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিবাদ সভায় অংশ নেয়। যে সমস্ত মেয়েরা ঘর সংসার করেই জীবন কাটিয়েছে, রাজনীতির মত জটিল ক্ষেত্রের সঙ্গে যাদের ন্যূনতম পরিচয়টুকু নেই, তারা সময়ের দাবী কে অনুভব করতে পেরেছে। সেই দাবি অনুযায়ী সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার গুরুত্ব তাদেরকে ঘরের উঠোনের গন্ডি পেরিয়ে নিয়ে আসতে পেরেছে প্রতিবাদ সভায়।

গ্রামের মেয়েদের স্কুল নেই আর পাঁচটা সাধারণ গ্রামের মতই। তাই দেবকীকে দ্বিতীয় ভাগ অব্দি পড়ে তার পড়াশোনা স্থগিত রাখতে হয়। মনোযোগ দিতে হয় সংসারের কাজে, ভাই বোনদের লালন-পালনের দায়িত্বে। আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই একদিন তারও বিয়ে হয় নিজের অসম্মতি এবং পরিবারের ইচ্ছানুসারে। কিন্তু এই দুই জীবন পর্বের মাঝে ঢুকে পড়ে ঈশানি দেবীর স্কুলে গিয়ে পড়ার উপপর্বটি যা দেবকীর গড়নকে আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো হওয়া সত্ত্বেও পৃথক সত্তা দান করে। পার্থর দৌত্য এবং দেবকীর পড়ার অদম্য আকাংখা দীনবন্ধু ও সুবলাকে গ্রামের সাধারণ চল ভেঙে মেয়েদের বাইরে পড়তে পাঠাতে একপ্রকার বাধ্য করে। ঈশানি দেবীর আশ্রমে দেবকী প্রথম অনুভব করে ঘর সংসারের কাজে মেয়েদের যেসকল দক্ষতা যার কোনো পৃথক মূল্য দেয় না সংসার, সেই দক্ষতাগুলিকেই বিশেষ গুণ হিসেবে চিনতে চেনাতে শেখায় এই স্কুলের শিক্ষিকারা। রান্না যা প্রতি ঘরে অতি তুচ্ছ বিষয় হিসেবেই পরিগণিত, তার জন্য পৃথক কোর্স আছে। এইভাবে সংসারে প্রচলিত ও নারীদের দ্বারা অনুষ্ঠিত কার্যপ্রক্রিয়া যাকে পুরুষ সমাজ অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখতেই অভ্যস্ত, সেই সমস্ত কাজের গুরুত্ব পৃথকভাবে অনুভব করে দেবকী এবং সেই সঙ্গে নতুন করে জীবনের যৌক্তিকতা ও মূল্য উপলব্ধি করে – ‘দেবকীর এ যেন এক নতুন জীবন। যেন সাপের খোলসের মত পুরনো জীবনের খোলসটা খসে পড়ে যাচ্ছে মন থেকে’১১। এই খোলস মোচনে অন্য মাত্রা যোগ করে পার্থর সঙ্গে তার বয়সন্ধিকালীন সম্পর্ক। পার্থকে ভালোবেসেছে দেবকী। সেই প্রথম প্রেমের রোমাঞ্চ ভিন্ন মাত্রা এনে দেয় যখন স্বদেশী করা পার্থ পিস্তল লুকিয়ে রাখার মতো ভীষণ কাজের দায়িত্ব দেয় কিশোরী দেবকীকে, ‘চলার পথে’র মত নিষিদ্ধ বই দেয় পড়তে। এইভাবে পার্থর স্বদেশী আন্দোলনের কাজে খুব ছোট্ট অংশে হলেও  নিজেকে জড়িয়ে দেবকী পায় চিরাচরিত গণ্ডি ভেঙে নতুন পথে চলার দুর্দমনীয় আনন্দ। কিন্তু দেবকীর এই পথ চলা স্তব্ধ করে শিববাড়ির জমিদার কর্ত্রীর ভাইপো রাজেন এর সঙ্গে বিয়ে হয়ে যাওয়ার ঘটনা।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী অবদমনের পিছনে কারণ স্বরূপ রয়েছে পুরুষের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রায়ন। তাই সে ক্ষমতার আস্ফলন ঘটায় তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পর্ক গুলির উপরও। সেক্ষেত্রে ব্যক্তি সম্পর্কও সহ্য করে সেই আস্ফালন।পুরুষ ছাড়াও যেসব নারীদের হাতে রয়ে যায় কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা ব্যবহারের চাবিকাঠি, তারাও স্বজাতির উপর সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে। তাই শ্বশুরবাড়িতে স্বামী রাজেনের অধ্যাদেশ সঙ্গে দেবকীকে সহ্য করতে হয়েছে জমিদার বাড়ির কর্ত্রী মামি শাশুড়ির গঞ্জনা। দেবকীর উপর মামিশাশুড়ি তার অত্যাচারের মাত্রা তীব্রতর করতে পেরেছেন দেবকীর বাপের বাড়ির আর্থিক দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে। তার যে পয়সাওয়ালা বাপের বাড়ির জোর নেই, এই সত্য মামি শাশুড়িকে ঔদ্ধত্য প্রকাশের অবকাশ দেয়। তার বিবাহিত কন্যা মায়ের বাড়িতে অতিরিক্ত আদর-যত্ন পায় তার সম্পন্ন শ্বশুরালয়ের সূত্রে। অর্থাৎ হাসির প্রতি তার মায়েরে আপ্যায়ন কেবল আত্মজার প্রতি স্নেহ বন্ধনের কারণে নয়। এক্ষেত্রে তার আর্থিক সচ্ছলতা তার সামাজিক অবস্থানকে দৃঢ় করেছে। অর্থের অভাব হাসির বয়সী দেবকীকে শ্বশুরবাড়িতে তীব্র অসম্মান ও গঞ্জনার দ্বারস্থ করেছে। শুধু বাড়ির বউয়ের উপর কর্ত্রীর আস্ফালন নয়, গরিব বাড়ির মেয়ের প্রতি জমিদার গিন্নির এই ক্ষমতা প্রদর্শন। তাই মেয়ে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক দৈন্য দেবকীকে দ্বিমুখী শোষণ বা double victimizationএর শিকার করেছে। স্বামীর চোখে দেবকীর স্থান কেবলমাত্র নৈশশয্যাসঙ্গিনীরূপেই। বাঈজীর আচরণ সে প্রত্যাশা করে বউয়ের কাছ থেকে কপাট দেওয়া বন্ধ দুয়ারের ভিতর। রাজেনের কাছে স্ত্রী নয়, দেবকী তার বিকৃত কামনা চরিতার্থ করার শরীরমাত্ররূপে উপস্থিত। এই চূড়ান্ত অবমাননাকর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ফল দেবকীকে ভোগ করতে হয় শারীরিক নির্যাতন সহ্য করে। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক বিবাহ সূত্রে বৈধতা প্রাপ্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, স্ত্রীর অনিচ্ছা সত্বেও স্বামী তার ওপর বল প্রয়োগ করে তার সঙ্গে যৌন মিলন ঘটাতে পারবে। বিয়ের বৈধতা সত্বেও ঘরের মধ্যে হয়ে চলা এই যৌন নির্যাতন নিশ্চিতরূপে ধর্ষণ। কিন্তু আমাদের দেশে ঘরে-ঘরে ধর্ষিতা বধূদের নির্যাতনের কাহিনী চেপে দেওয়া হয়। আর্থিক স্বনির্ভরতার জোর না থাকায় দেবকী মামিশাশুড়ি বারাজের এই অত্যাচার সহ্য করলেও নারীত্বের চূড়ান্ত অপমানজনক যে প্রস্তাব রাজেন তার স্ত্রীকে দিয়েছে, সে প্রস্তাবে শত মারধোর করেও স্ত্রীকে রাজি করাতে পারেনি। বন্ধ দরজার এপারেও বেশ্যার ন্যায় স্ত্রীকে ভোগ করতে পারিনি স্ত্রীর কাছে ‘পতি পরমেশ্বর’ বলে খ্যাত স্বামীও। দেবকীর প্রতিরোধ ক্ষমতা তাকে দিয়েছে কাঞ্চনপুরের শনিদেবের আশ্রম কাটানোর জীবনের উপপর্ব এবং পার্থর ভালবাসার চিহ্ন স্বরূপ ‘চলার পথে’ বইটি।

দেবকীর এই শক্তি ছিলনা তার বিধবা বড়জা আন্নার শাশুড়ির অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জন্য। স্বামীর অত্যাচার নয়, ভালোবাসা ভরিয়ে রেখেছিল তার দাম্পত্য জীবনকে। কিন্তু সেই স্বামীর মৃত্যু আন্নার জীবনে বৈধব্যের যন্ত্রণাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় বিধবাদের জন্য নির্দিষ্ট কৃচ্ছসাধনের অনুশাসনগুলি। দীর্ঘ পাঁচ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলার পর জ্যৈষ্ঠের তীব্র দাবদাহে কৃষ্টান্না চোখেমুখে একটু জল দিয়ে একাদশীর নিয়ম ভঙ্গ করার অপরাধ করেছিল। স্বামীর মৃত্যু যন্ত্রণা বিধবার জীবন যন্ত্রণা দুইই সহ্য করলেও বিধবার নিয়মভঙ্গের অপবাদ ও সমাজে তাকে নিয়ে চলা নিন্দার মহল সে সহ্য করতে পারেনি। সামাজিক কুৎসা থেকে রেহাই পেতে ফাঁসি কাঠে ঝুলতে হয়েছে তাকে। এই ফাঁসিকাঠ যেন সকল বিধবার ভয়ানক পরিণতির ইঙ্গিত দেয়। শ্বশুরবাড়িতে আন্নাকে যাবতীয় নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে, কারণ সে সহায় সম্বলহীন। বাপের বাড়ির আশ্রয়টুকুও তার নেই। সে আশ্রয় অবশ্য আছে মনসাডাঙ্গার বিধবা মেঘীর। কিন্তু মায়ের স্নেহ স্নিগ্ধ আশ্রয় নয়, মা কালাঠাকরুন তার কাছে সমাজের মূর্তিমান অনুশাসনকারী যে নিয়মের পাশে বেঁধে যুবতী মেয়ের বাড়ন্ত শরীরকেও পারলে দমিয়ে রাখেন। ব্রাহ্মণ ঘরের বয়স্থা মেয়ে মেঘীকে এইরকম ভবিষ্যৎ জীবনের দিকে একরকম ঠেলে দেয় তার মা নিজেই ষাট বছরের বয়স্ক বৃদ্ধের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়ে। যার নিশ্চিত পরিণতি অকাল বৈধব্য।মেয়েদের জন্য প্রয়োজনীয় স্কুলের ব্যবস্থা করে না সমাজ; বিয়েকেই একমাত্র জীবন পথ হিসেবে নির্দিষ্ট করে সেই সমাজ। সামাজিক অনুশাসনকে কঠোরভাবে প্রয়োগের অস্ত্র স্বরূপ নিয়োগ করা হয় লোকলজ্জার অতন্দ্র প্রহরাকে। সেই লোকলজ্জার ভয় যে মাকে মেয়ের সঙ্গে ষাট বছরের বয়স্ক বৃদ্ধের বিয়ে দেওয়াতে প্রণোদিত করে, সেই ভয়ই মাকে দিয়ে বিধবা কন্যার সমস্ত জীবন পিপাসাকে নষ্ট করতে সচেষ্ট করে।এখানে মায়ের স্নেহের স্থান কেড়ে নিচ্ছে মেয়ের জন্য সমাজ নির্দিষ্ট অসম আচরণ প্রথা। যে প্রথার বলি হয়েছে আন্না; যে প্রথায় পিষছে মেঘী। কেবল তাদের দুর্বিসহ, অতৃপ্ত জীবনই রূপরেখা পায়নি উপন্যাসে; সেই ব্যর্থ জীবনপথের দিশা ঘুরিয়ে জীবনকে উপভোগের জন্য লেখিকা দৃষ্টান্ত স্বরূপ গড়েছেন মেঘীর পরবর্তী জীবন।

রাজেনের কাছে দেবকী কেবল ভোগ্যা রূপেই গৃহীত – ‘গরিব অভাগাদের এই ঘরের বাঈজীই সম্বল’১২।  বারবণিতাবৃত্তি সমাজের আদিমতম পেশা যাকে বর্তমান যুগে শাস্তিযোগ্য অপরাধ রূপে গণ্য করা হয়। দেহ বিক্রি করে পেট চালাতে হয় নারীদের। কিন্তু এই পণ্যের উপভোক্তা পুরুষেরা সমাজের সসম্মানে বাঁচে; যেমন শিববাড়ির জমিদারবাবু। তাই রাজেনের কন্ঠে শ্লেষ ঝরে পড়ে -‘জমিদার বাবুদের পোষা বাঈজী  রয়েছে বাজারে’। সেই আর্থিক সামর্থ্য রাজিন-এর না থাকায় বেশ্যাদের ভোগ করার বৃত্তি সে মেটাতে চায় নিজের স্ত্রীকে দিয়ে। তাই দেব কি তার কাছে স্ত্রী নয়;’ঘরের বাঈজী’। অর্থাৎ মাঝে কেবল বিয়ে একটা সামাজিক বৈধতার আড়াল; অধিকাংশ পুরুষের চোখে নারী যৌন কামনা পরিতৃপ্তির উপায় মাত্র। একই ধারণার বশবর্তী হয়ে অন্তরীণে থাকা পার্থর কাছে কাজের মেয়ের অছিলায় আলাপীকে পাঠায় দারোগা। উদ্দেশ্য রাজবন্দিদের চারিত্রিক কলঙ্ক রটিয়ে তাদের ঘায়েল করার শেষ অপচেষ্টা যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। অর্থাৎ শাসকদের কাছে বিদ্রোহীদের দমন কাজেও নারীকে ভোগ্য বস্তুর টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এইভাবেই আলাপীরা ব্যবহৃত হয় দারোগাদের দ্বারা। সমাজের প্রায় সর্বত্র নারীকে হেয় চোখে দেখার চল; অথচ তাকেই সতীত্বের, মাতৃত্বের মহিমায় সাজিয়ে ঘরের গন্ডিতে আটকে রাখতে চায় এই পুরুষ সমাজই। একদিকে নারীর শরীর অশুচি, বীর্য ত্যাগের ও রক্তস্রাবের পাত্র, পৌরুষের পক্ষে বিপদজনক, নৈতিক ও শারীরিক পতনের উৎস, নরকের দরজা। যা পুরুষের পক্ষে বিপদজনক, তাকেই পুরুষ সমাজ অন্যের চরিত্রহননের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। নারী অপমানিত, লাঞ্ছিত, ব্যবহৃত হচ্ছে পুরুষ হস্তে। অন্যদিকে মা হিসেবে সেই নারীই শুচি, পবিত্র, কামগন্ধহীন, মমতাময়ী; আর মাতৃত্বে সেই শারীরিক উৎস – রহস্য ও রক্তস্রাবে ভরা সেই একই নারীশরীর-নারীর একমাত্র নিয়তি, তার জীবনের একমাত্র সার্থকতা ১৩।  অ্যাড্রিয়েন রিচের এই তীক্ষ্ণ ভাষণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ব্যভিচারী এবং দ্বিচারী চারিত্র্য বৈশিষ্ট্যকে খোলস ছাড়িয়ে সমাজের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

কিন্তু আলিপীকে দিয়ে বিছানো চক্রান্তের ফাঁদে পা দেয়নি গল্পের নায়ক পার্থ – ‘তার নগ্ন দেহকেও উপেক্ষা করতে পারে, এমন পুরুষও আছে পৃথিবীতে, এই প্রথম জানলো আলাপী সে কথা’১৪। পার্থর সঙ্গে সেই পাহাড়পুরের আদিবাসী পুত্র সারথিও ব্যতিক্রমী পুরুষ চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছে। নারীর উপর শক্তি  প্রদর্শনই যে সমাজে পৌরুষের লক্ষণ হিসেবে পরিচিত, সেই সমাজের চেনা পৌরুষের সংজ্ঞা বদলে দেয় সারথি – ‘পুরুষ মানুষ হয়ে জন্মেছি মেয়ে মানুষের চোখের জল দেখার জন্য নয়’১৫। দেবকীকে রাজিন অত্যাচার করেছে স্বামী হওয়ার সুবাদে। একই অধিকারের থাবা বসিয়েছে কার্তিক শ্রী সরস্বতীর উপর। দেবকীকে শ্বশুরালয়ে থাকতে হয়েছে মধ্যবিত্ত সামাজিকতার দায়ে। কিন্তু সমাজের যারা প্রান্তের বাসিন্দা, সামাজিক সুযোগ সুবিধা যাদের কাছে তেমনভাবে পৌঁছয় না, সামাজিক নিয়মের শিথিলতা তাদের সমাজব্যবস্থায় সত্য। সরস্বতী আদিবাসী মেয়ে হওয়ার সূত্র সমাজের চলকে ভেঙে সারথির সঙ্গে নতুন করে ঘর বাধার স্বপ্ন দেখতে পারে যে স্বপ্ন দেবকী দেখতে পারেনি শিববাড়িতে থাকাকালীন।

সারথীর এই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সত্তার প্রতিবিম্ব পড়ে মনসাডাঙ্গার আলীর উপর। মনে রাখতে হবে সারথি থেকে আলীর সিদ্ধান্ত আরো দুঃসাহসিক। কারণ পাহাড়পুরের আদিবাসীদের গ্রামে যে সামাজিক নিয়মের শিথিলতার সুযোগ ছিল, সেই সুযোগ নেই মনসাডাঙ্গায়। সেখানে সামাজিক অনুশাসনের কড়াকড়ি পূর্ণমাত্রায়। মেঘী একে হিন্দু ঘরের ব্রাহ্মণ বিধবা, তার উপর তার মনের সম্পর্ক হয়েছে ভিন্ন ধর্মের  মুসলমান ছেলে আলীর সঙ্গে। সেই অপরাধে মেঘীর বিরুদ্ধে সাজা শোনায় -চুল কেটে, মাথা ন্যাড়া করে, আগুনের ছেঁকা দিয়ে গ্রামে ঘোরাবার বিধান যাতে ‘জন্মের মত মনে থাকবে এ কলঙ্কের দাগ’১৬। সামাজিক বিধান ভঙ্গ কারীদের দৃষ্টান্তস্বরূপ শাস্তিদান সমাজের নিয়মের বজ্র আঁটুনিকে আরো শক্ত করতে, মেয়েদের উপর সমাজের কায়েমী শাসনকে পোক্ত করতে। এই শাস্তি কে প্রোপাগান্ডা করে সামাজিক শাস্তি বিধানের ভয়কে নারীসহ সমগ্র সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সমাজের সর্বসমক্ষে নারীত্ব ভূলুণ্ঠিত। মেঘের এই অপমান সহ্য করতে পারেনি পার্থ, সহ্য করতে পারেনি আলী।মেঘী ও  আলীকে সঙ্গে নিয়ে পার্থ মনসা ডাঙ্গা ছেড়ে কলকাতা শহরে যায়। রেজিস্ট্রি ম্যারেজ হয় সেখানে তাদের। মনসাডাঙ্গার গ্রামীণ পরিকাঠামোয় তারা থাকতে না পারলেও শহরের আধুনিক পরিবেশে তাদের নতুন জীবন শুরু করে। এইভাবে পাহাড়পুরে সারথি-সরস্বতী ও মনসাডাঙ্গায় মেঘী-আলী সামাজিক অনুশাসনের ঊর্ধ্বে মনুষ্যত্বকে রেখে মানবতার নতুন দিক উন্মোচন করেছে তাদের নতুন জীবন পথের দিশা দেখিয়ে।

আমাদের সামাজিক পরিকাঠামো বহুস্তরীয়। ভিন্ন ভিন্ন স্তরে সামাজিক সমস্যা ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় উপস্থিত থাকে।মেঘীর জীবনে আলীর সঙ্গে মিলিত হবার পথে বাধা হয়ে আসে তার বৈধব্য এবং আলীর ভিন্ন ধর্ম পরিচয়। এই দুটি বাধাই সামাজিক অনুশাসন প্রসূত। কিন্তু পার্থর কাছে কলকাতার বাড়িওয়ালার বিধবা পুত্রবধূ এক ভিন্ন বিষন্নতার মূর্তি হয়ে দেখা দেয়। স্কুলে চাকুরিরতা ভদ্রা শশুরের সেবা, কবিতা লেখা এবং স্কুলের কাজে ডুবে থেকে একাকী জীবনের নিঃসঙ্গতার সঙ্গে নিহত লড়াই করে চলে। স্বামীর মৃত্যু এর একমাত্র কারণ নয়। তার মৃত্যুর পূর্বে বিলাতে থাকাকালীনই ভদ্রার স্বামী প্রিয়দর্শন অন্যাসক্ত হন এবং ভদ্রার কাছে তাদের দাম্পত্য সম্পর্কের অবসান চান। স্বামী দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার যন্ত্রণা ভদ্রতার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সঙ্গে আপস করাতে পারেনি। বরং প্রিয়দর্শনকে সে জানিয়েছে তার ফরাসি বান্ধবীর সঙ্গে সম্পর্কের সম্মতি। বাঙালি ঘরের মেয়েদের কাছে জীবনের একমাত্র বাঁচার আশ্রয়স্থল হলো স্বামী। তাই সেই স্বামী অন্য সম্পর্কে জড়ালেও তাকে তাদের বিবাহিত দাম্পত্যে ফিরিয়ে আনতে আপ্রাণ চেষ্টা চালান অধিকাংশ গৃহবধূরা। যেখানে ভালবাসার দাবি ছেড়ে অন্যাসক্ত স্বামীর চলে যাবার পথে নিরঙ্কুশ করেছে, সেখানে সমাজের কাছে এবং নিজের কাছে স্বামী পরিত্যক্তা হবার নানি থাকা স্বাভাবিক। তবু তার চেয়েও বেশি অসম্মানকর স্বামীকে জোর করে নিজের কাছে আটকে রাখার প্রয়াস। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে প্রখর ভদ্রা এই অসম্মান কে প্রশ্রয় দেয়নি বলেই প্রিয়দর্শনকে তার দাম্পত্য বন্ধন থেকে মুক্ত করেছে। কিন্তু হিন্দু আইনে বিবাহবিচ্ছেদ অচল এদেশে, আর বহুবিবাহ অচল সে দেশে। তাই বুকভরা অতৃপ্ত প্রেম বুকে নিয়ে প্রিয়দর্শন আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। বিবাহিত দাম্পত্য ভদ্র প্রিয়দর্শনের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ দেয় সমাজকে। অথচ প্রিয়দর্শনের জীবনে ভদ্রার উপস্থিতি শুধুমাত্র আইনী পরিভাষাতেই সীমাবদ্ধ। বরঞ্চ প্রিয়দর্শনের জীবনে ভদ্রার এই আইনে উপস্থিতি তার ফরাসি বান্ধবীর সাথে থাকতে না পারার কারণ এবং সেই কারণেই তার আত্মহত্যা। যে স্বামীর কাছে এই সম্পর্ক বন্ধন স্বরূপ, সেই স্বামীর মৃত্যু ভদ্রার ভদ্রার জীবনে অপেক্ষা প্রত্যাখ্যানের গ্লানিকেই তীব্রতর করে। সমাজের অনুশাসন অনুযায়ী, বিধবাদের পালনীয় আচার ভদ্রা মেনে চললেও বৈধব্যের যন্ত্রণার তুলনায় এই গ্লানিই তাকে একাকিত্বের নিঃসঙ্গতায় নিক্ষেপ করেছে। সেই নিঃসঙ্গ জীবনের গ্রন্থি ছিন্ন করে পার্থ ভদ্রাকে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে। সেই সূত্রে ভদ্রার উপর পার্থর বিশ্বাস এবং নির্ভরতা ভদোদরা কে অন্য এক জীবনের স্বাদ দিয়ে যায়। ‘আপনাকেও আমাদের চাই’১৭। এই ‘আমাদের’গোষ্ঠী জীবনে ভদ্রার প্রয়োজন তার ব্যক্তি জীবনের মূল্যকে তার সামনে প্রসারিত করে – ‘তারও প্রয়োজন আছে পৃথিবীতে’১৮। এভাবে গৃহকোণে, পরিবারের সেবায় রত থাকাকে যে জীবনের একমাত্র সার্থকতা বলে সমাজ বিধবাদের জন্য নির্দিষ্ট করেছে, সেই বদ্ধ জীবন থেকে কর্মের জগতের মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছে যাবার মুক্তি ভদ্রা কে রাজনৈতিক সচেতনতার থেকেও বৃহত্তর মানবমুক্তির আস্বাদন এনে দেয়। এনে দেয় ব্যর্থ জীবনকে দূরে সরিয়ে রেখে জীবনের নতুন মূল্য খুঁজে পাবার পথ। মানুষ তখনই ভেঙে পড়ে যখন পৃথিবীর কাছে তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যায়। সংসারের মধ্যে থেকেও সংসার থেকে পৃথক করে, সমাজ থেকে একঘরে করে রাখা হয় বিধবাদের। মুক্তির জন্য তাদের কাশীবাসের ঘোষণা জীবদ্দশাতেই তাদের সমাজ-সংসার-পৃথিবীর সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাই প্রমাণ করে। ভদ্রার জীবনে এই অপ্রাসঙ্গিকতার যন্ত্রণার উপশম হয় সর্বসাধারণের স্বার্থে সাধারণ মানুষরূপে আন্দোলনের কাজে যুক্ত হতে পারার উপলব্ধিতে।

গর্ভবতী দেবকীর কাছে ভাবি সন্তানের আগমন আনন্দের নয়; গ্লানির। এই সন্তান তার শরীরে লম্পট স্বামীর বুনে দেওয়া বীজের সাক্ষী। তবু জয়দেব যখন তার কোল ভোরে এলো, তখন সেই-ই হলো তার জীবনে বাঁচার আশ্রয়, নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে আলোর সন্ধান। মাতৃত্ব তাকে খাটো করেনি, সামির মুখাপেক্ষীও করেনি।বরং কলকাতায় গিয়ে স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জনের মাধ্যমে সন্তানকে নিয়ে বাঁচার সাহস যুগিয়েছে। এমনকি রাজেনের দ্বিতীয় বিয়ের হুমকিও তাকে টলাতে পারেনি। কিন্তু সেই জয়দেবকে রাজেন ছিনিয়ে নিয়ে গেলে মাতৃত্ব দেবকী কে বাধ্য করে শ্বশুরবাড়িতে ফিরে যেতে। কিন্তু সেখানে ছেলেকে ফিরে পায় না, কপালে জোটে চরিত্রহীনা, কুলটার অপবাদ। সামাজিক অনুশাসনের নিষ্ঠুরতা আইনের দন্ডাদেশকেও হার মানায়। ‘জেলখানাতেও যেসব মেয়েদের ধরে নিয়ে যায়, তাদের কচি সন্তানদের মায়ের সঙ্গেই থাকতে দেয় জেলখানাতে’১৯। সেই আসামীর চেয়েও বড় অপরাধী সাব্যস্ত সমাজের চোখে কুলটা দেবকী। রাজিন-এর  এতদিনের পাশবিক অত্যাচার, স্তনে সিগারেটের ছ্যাকা দেওয়ার মতো অমানুষিক যৌন নির্যাতনের চেয়ে বড় অপরাধ দেবকীর -গ্রামের ছেলে পার্থকে সে চিঠি লিখেছিল। এতেই তার চরিত্রদোষ প্রমাণিত এবং সেই দোষের শাস্তি স্বরূপ তার মাতৃত্বের দাবিকে খারিজ করা হয়। জয়দেবের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ধাক্কা দেবকীর রাজেনের সঙ্গে সম্পর্ককে ছিন্ন করে। এই জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে দেবকীর নতুন যাত্রাপথ শুরু হয় মনসাডাঙ্গা ত্যাগ করে কলকাতার অভিমুখে। এখানেই শেষ প্রথম পর্ব।

বিরুদ্ধ পরিস্থিতিতে মানুষকে খেলে সময় তার পরীক্ষা নেয়। সেইসঙ্গে যোগান দেয় প্রতিকূলতার সঙ্গে নড়ার শক্তি ও সামর্থ্যের। দেবকী, ভদ্রা সকলকেই এই পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে। দেবকী আজন্ম লালিত গ্রাম থেকে উদ্ভিন্ন হয়ে শহরে গেছে নতুন জীবনের লড়াই লড়তে। আর পার্থর সান্নিধ্য ভদ্রাকে যে পরিপূর্ণ জীবনের আস্বাদন দিয়েছিল, তা থেকে সে বিচ্যুত হয়েছে পার্থর পাহাড়পুরে ফিরে যাওয়ার দরুন। এই উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র লতারও জীবনে এর ব্যতিক্রম হয়নি। কাঞ্চনপুরে পিসিমার আশ্রয়ে মানুষ হয়েছে লতা। সেখানেই তার সঙ্গে পরিচয় পার্থর সহকর্মী সুলক্ষণের সঙ্গে। সুলক্ষণের প্রতি তার ভালোবাসা টলাতে পারেনি দীর্ঘ ছয় বছরের প্রতীক্ষা থেকে। মামার বাড়ির নির্বাচিত পাত্রকে প্রত্যাখ্যান করে লতা সুলক্ষণের সঙ্গে বেঁধেছে দাম্পত্যের গাঁটছড়া। কিন্তু এও যথেষ্ট নয়। শিববাড়িতে গিয়ে জমিদার শ্বশুরবাড়ির মুখোমুখি দাঁড়াবে পিসীমার গান্ধীবাদী আদর্শে মানুষ লতা। তার আজন্ম লালিত প্রগতিপন্থী সংস্কার এবার সম্মুখীন ক্ষয়িষ্ণু জমিদারতন্ত্রের। এই বাড়ি থেকেই একদিন কুলটা অপবাদ নিয়ে বিতাড়িত হতে হয়েছে আরেক পুত্রবধূ দেবকীকে।

ভদ্রার চিঠির উত্তর সড়ক পার্থ প্রত্যাখ্যানের সুরকেই এনেছে অনিচ্ছাসত্ত্বেও। ‘স্বরলিপি’র পৃথ্বীর মতই সেও মনে করেছে, ব্যক্তিগত আবেগ তার সামাজিক আদর্শের বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে উঠবে। কিন্তু তার এই ধারণার ত্রুটি তার কাছে তুলে ধরে লতা-সুলক্ষণের দাম্পত্য সম্পর্ক, যেখানে লতা সুলক্ষণের যোগ্য সঙ্গত দিয়েছে, হয়ে উঠেছে তার ঘরে বাইরের শক্তির যোগান স্বরূপ। আর যেখানে তাদের লড়াইয়ের মূল কেন্দ্র, সেই পাহাড়পুরের সংগ্রাম একা সারথির কাঁধে নেই, সে সংগ্রামে্য সঙ্গে পূর্ণরূপে জড়িত সরস্বতীও। এইভাবে পার্থর সঙ্গে লেখিকা পাঠকবর্গের সংশয়ও দূর করেন, রাজনৈতিক জগত একা পুরুষের নয়; নারী-পুরুষের যূথবদ্ধ অংশগ্রহণ তাকে দেয় তার প্রার্থিত পরিণতি।

লতা শহরের শিক্ষিত মেয়ে। তাকে অপদস্ত করার জন্য কোন ছুঁতো ছাড়েননি তার জমিদার কর্ত্রী শাশুড়ি। পাড়া প্রতিবেশীদের সামনে তাকে বয়স নিয়ে পরোক্ষ খোঁটা দিয়েছে। তাকে লুকিয়ে নিজের মেয়েদের ভালো মন্দ খেতে দিয়েছে। নিজেই লতাকে তার হবিষ্যি ঘরের রান্না করতে বারণ করেছেন, অথচ প্রতিবেশীদের  সামনে শিক্ষিত বৌমার কর্ম-অক্ষমতা এবং শাশুড়ির প্রতি কর্তব্যের অবহেলাকে তুলে ধরার কূটচাল চেলেছেন। ঘরের বউকে শাসন করার কামনায় প্রতিবেশী শাশুড়ির মুখে ঝরে পড়েছে নোংরা ক্রোধ ‘আমার ছেলে বলে, অমন মেম সাহেবী বউ হলে ন্যাংটা করে বেত মারত সে’২০। নারী জাতিকে শাসন করতে মনুর বিধান কেবল উত্তরসূরী পুরুষ সমাজই বহন করেনা, তিন আনি কাকির মত শাশুড়িরাও তার বাহক হয়ে ওঠে। শাশুড়ি বৌমার সম্পর্কে ক্ষমতার আস্ফালন দেখাতে গিয়ে এক নারীই হয়ে উঠেছে তার আত্মজা প্রতিম অন্য নারীর কায়েমী শাসক। ঈদের মধ্যে সুলক্ষণের মত পুরুষ চরিত্র এই উপন্যাসে এসেছে যারা বউকে কেবল কুক্ষিগত সম্পত্তি জ্ঞান করে না। একই বাড়ির ছেলে হয়েও রাজেনের মত স্ত্রীকে সংসার পেশাই যন্ত্রে মাড়াই করতে চায়নি, বরং জমিদার কর্ত্রীর পেষণ থেকে স্ত্রীকে যথাসম্ভব রক্ষা করার চেষ্টা করেছে। এইভাবে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারী-পুরুষের অসম সম্পর্ক নয়, পারস্পরিক আনুগত্যের দ্বারা তার পরিপূর্ণ দাম্পত্য সম্পর্ককে বাস্তব রূপ দিয়েছেন ঋতা-সুলক্ষণের মাধ্যমে সামন্ততান্ত্রিক কায়েমী পরিবেশেও। সুলক্ষণ ও লতাকে ঘিরে নারী-পুরুষের যে নতুন সম্পর্ক সুলক্ষণের বিমাতা দেখলেন, তার আস্বাদ তিনি নিজের দাম্পত্য জীবনে পাননি। তারেই না পাওয়া লতার প্রতি তার আক্রোশকে তীব্রতর করে। এইরূপ প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই শিক্ষিতা প্রগতিমনস্ক লতার কাছে চ্যালেঞ্জ। এর সাক্ষী হয় পার্থ। তার ‘বড়  সুন্দর লাগে দুজনের এই মিলিত জীবন’২১, ঘরে বাইরে প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে মিলিত প্রতিরোধ। তবু  ঘরের লড়াইটা মেয়েদেরই লড়তে হয় পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি। বহির্জগতের মানুষ পুরুষের সহমর্মী মন থাকলেও সাংসারিক কূটচাল বোঝার অভিজ্ঞতা তাদের নেই। তাই লতা সুলক্ষণের সহায়তা ও সমর্থন পেলেও এ লড়াই তার একলার ‘এত নিচ, এত কপট, এত ঈর্ষাতুর এ বাড়ির প্রতিটি ব্যবহার, সুলক্ষণ পুরুষ দৃষ্টি দিয়ে এদের মেয়েলী মনের গোলকধাঁধার কতটুকু পরিচয় পাচ্ছে’২২। কিন্তু সেই গোলকধাঁধার অবসান হবে এই আপাত নম্র, শিক্ষিতা লতার হাত ধরেই।সময়ের পরিবর্তন ভাঙতে শুরু করেছে সামন্ততান্ত্রিক এবং  পিতৃতান্ত্রিক শোষণকাঠামোর ইমারতকে -‘এ-বাড়ির দরদালানের পুরু দেওয়ালগুলিতে কান পেতে থাকলে আজও বুঝি শোনা যায় বেত্রহস্ত মাতাল স্বামীদের অত্যাচারে নিপীড়িতা ঠানদিদিদের চাপা আর্তনাদ। আর সেই বাড়ির অন্দরে বসে পরপুরুষের সঙ্গে হেসে কথা বলছে আজ ঘরের বউ’২৩। কেবল লতার শাশুড়িরই কর্তৃত্ব আহত হয়নি, তিনি যে শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করছেন সেই শ্রেণী কর্তৃত্বের অবসানের সুর ধ্বনিত হয়েছে লতাদের মাধ্যমে।

ঘরের বউকে যখন মাতাল স্বামীর বেতের ঘা খেতে হয়, শায়েস্তা করতে তাকে ‘নেংটা করে’মারতেও যখন দ্বিধা নেই পুরুষ গোষ্ঠীর, তখন ঘরের আড়ালের বাইরে মেয়েদের সুরক্ষা আরও বিপন্ন। তার প্রমান দেবকীর কলকাতা শহরে দুলাল মামার বাড়িতে আশ্রিত হয়ে থাকার জীবন পর্ব। এই দূর আত্মীয়টি আশ্রয় দেবার ছুতোয় দেবকীকে ভোগ করতে চায়। স্ত্রী-সন্তানের ভরা সংসার থাকলেও নারী তাদের কাছে ভোগ্য বস্তু। সেইসঙ্গে আশ্রিতার রুপোর আশ্রয়দাতার এইটুকু অধিকার আছে বলেই মনে করে দুলালেরা, তাই দেবকীর শরীরকে গ্রাস করার হীন চক্রান্ত চালাতেও পিছপা হয়নি সে। দেবকীর প্রতিরোধ তাকে হিংস্র করে  তোলে। মেয়েদের দুর্নাম রটানো সবচেয়ে সহজ উপায় ব্যবহার করে তার চরিত্রে কলঙ্কের দাগ রটিয়ে। ঝড়ে পড়ে হিংস্র আক্রোশ ‘এইসব মেয়েদের কাপড় তুলে চাবুক মারা দরকার’২৪। দুলাল তার লাম্পট্যকে অতি সহজেই ঢেকে দিতে পারে শ্রী এবং সমাজের কাছ থেকে অর্থের জোরে। সেই জোর খাটিয়ে এই দেবকীকে ভোগ করতে চেয়েছিল সে। পুরুষ কর্তৃক মেয়েদের শাস্তি বিধানে একটি বিষয় সকল ক্ষেত্রে সাধারণ। শুধু শারীরিক নির্যাতন নয়, সেই নির্যাতনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে যৌন নির্যাতনের ইঙ্গিত। এখানেই সেই পুরুষের কাছে নারীর অবস্থান তার তার শাস্তি বিধানের দণ্ডাদেশেই প্রতিফলিত। কিন্তু দেবকী এই ক্রুরতায় ভয় পাওয়ার বা ভেঙে যাবার মেয়ে নয়। তার মানসিক জোর এর পরিচয় সে দিয়েছে তালপুকুর ত্যাগের সময়েই। এমনকি চাকরির সন্ধানে ভদ্রার কাছে গেলে সেখানে তার ঠিকানা দেবার সময় মুছে ফেলেছে তার নামের সঙ্গে স্বামীর দেওয়া পদবি। মনে মনে সিঁদুরের ছোঁপও মুছে ফেলেছে। রাজধানীর সঙ্গে যে সম্পর্কে সমাজটাকে বেধেছে তার পদবী ও সিঁদুর সেই সম্পর্কের পরিচয়বাহী; এই সমস্ত চিহ্ন সে ক্রমশ মুছে ফেলেছে। সামাজিক আরোপগুলোকেও ছিন্ন করেছে। এবার দুলাল মামার আশ্রয়স্থল থেকে বেরিয়ে নিজের ক্ষমতায় নিজের পরিচয় গড়ার সিদ্ধান্ত এবং ঝুঁকি দুই-ই নেয় সে। এই কঠিন সময়ে তাকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে অন্নপিসি যিনি নিজেও একসময় শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনের শিকার ছিলেন। এইভাবে দেবকী, অন্নপিসিরা নির্যাতিত গৃহবধূদের প্রতিনিধি হয়ে উঠছে যারা নিজের মত করে, নতুন ভাবে বাঁচার, জীবন গড়ার দৃষ্টান্ত রাখছে সমাজের সামনে। অন্যের আশ্রিতা হয়ে আর দিনগুজরান নয়, দেবকী ক্রমে হয়ে ওঠে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর। যক্ষা হাসপাতাল নার্সের কাজ সে জোগাড় করে মেঘীর সহায়তায়। দেবকীর নিজের উপার্জিত অর্থ দীনবন্ধুর পরিবারের খোরাকি যুগিয়েছে, পুজোয় ভাই বোনেদের জন্যে নতুন বস্ত্রের ব্যবস্থাও করেছে। একদিন দেবকীর মা তাকে সম্পন্ন গৃহস্থ স্বামীর ঘরে শত অত্যাচার মুখ বুঝে সহ্য করে থাকতে বলেছিলেন এই আশায়, কখনো যদি জামাইয়ের দয়ায় তার বাকি সন্তানদের ভাগ্য খুলে যায়। লম্পট স্বামীর দাক্ষিণ্যে নয়, দেবকী এবার নিজের পরিবারের পাশে দাঁড়াবার ক্ষমতা অর্জন করেছে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হয়ে।

লতাও জমিদার বাড়ির পুত্রবধূর পরিচয়ের বাইরে নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব গড়ে তুলেছে। শিববাড়ির গ্রামের বউদের নিয়ে তৈরি করেছে মহিলা সমিতি। মহিলা সমিতি গঠন পুরুষ পরিচালিত সমাজে নারীর পরিচয় অতিরিক্ত নিজস্ব পরিচয় স্থাপনের সাহসী পদক্ষেপ চিহ্নিত করে। সমাজসেবিকা পিসিমার যোগ্য ভাইজি হয়ে ওঠে লতা, মহিলা সমিতির ভিতকে পোক্ত করতে গলার হার পর্যন্ত বিক্রি করে সে। স্ত্রীধন কেবল গয়নার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান আর্থিক স্বনির্ভরতার পথে হাঁটা। সেই সঙ্গে মেয়েদের গয়নার প্রতি মোহ নিয়ে তাচ্ছিল্যের যে মনোভাব সমাজে প্রচলিত, সেই ধারণার ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত রাখে লতা। পাড়ার গরীব শিশুদের পড়ানোর সূত্রে কুসুমপুরের পিসীমার আশ্রমের স্মৃতিকে নিজের কাজের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখে। এইভাবে গৃহকোণ যে সমাজ থেকে গৃহিণীদের বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত একাকী করে রাখে, সেই গৃহকোণে এসে মিশেছে সমাজসেবার উদার প্রাঙ্গণ। ঘরে থেকেও লতা ঘরে বাইরে জল অচল ভেদ ঘুচিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এই বিভাজন রেখা মুছে ফেলতে যে সব সময় প্রতিরোধের ভাষা হিসেবে প্রতিবাদই করে গেছে লতা, তা নয়; গৃহস্থ পরিমণ্ডলের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে অনেক সময় সাবেকী নিয়ম-কানুনকে মেনেও চলেছে। গ্রহণ লাগার আগে খাওয়ার পাট শেষ করার শাশুড়ির আদেশ সে মেনে নিয়েছে। শাশুড়ির তাকে অপদস্ত করার বিভিন্ন ফন্দি বুঝতে পেরেও সব ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করেনি লতা। লতার এই মৌনতা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। পরিস্থিতির সঙ্গে পূর্বজদের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা আসলে পরিবর্তনের পথে পূর্বজদের বাদ দিয়ে নয়, বরং তাদের সঙ্গে নিয়ে চলার প্রচেষ্টা। সুলক্ষণের সঙ্গে আসা কমরেড সঙ্গীদের কোনরূপ আতিথিয়তা বরদাস্ত করেননি হাসির মা। বাধ্য হয়ে লতা নিজের অংশের খাবার দিয়ে অতিথি সৎকার করেছে। গৃহবধু রূপে এবং একই সঙ্গে একজন কমরেড হিসেবে তার কর্তব্য পালন করেছে। ঘর থেকেই যে রাজনীতির পথ চলা শুরু হয় সেই পথে ঘরে থেকেই হেঁটেছে লতা।

লতা যেখানে ঘরের পরিসরেই সর্বহারা আন্দোলনে প্রতিবেশীদের নিয়ে নারীর স্বতন্ত্র ভূমিকা গড়ে তুলতে চাইছে, সেখানে দেবকীর বোন কেতকী এই মাক্সীয় নারীবাদের পরিবর্তে বুর্জোয়া নারীবাদী ধারাকে আঁকড়ে ধরতে চেষ্টা করছে। আধুনিক নারীর মতো স্বাধীন জীবন সেও যাপন করছে। সেও চাকুরিরতা। কিন্তু নারী স্বাধীনতা ভিন্ন অর্থে তার কাছে ধরা দিয়েছে। সর্বহারা শ্রেণী ভুক্ত নারীদের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সঙ্গে অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের মত মৌলিক অধিকারের জন্য লড়তে হয়। তাই বুর্জোয়া নারীবাদীরা যে বিলাসী জীবনযাপনের অধিকারের দাবি তোলেন, সেই দাবি সর্বহারাদের থেকে তাদের পৃথক অবস্থানকেই নির্দিষ্ট করে। কেতকী দেবকীর মত দারিদ্র্য দেখেনি। তাই তার স্বীয়শ্রেণীর প্রতি রয়েছে বিতৃষ্ণা। এই অশ্রদ্ধা তাকে শ্রেণীচ্যুত করে উচ্চবিত্ত শ্রেণীতে ওঠার জন্য প্রলোভন যোগায়। পড়ে যায় দুলাল দত্তের অর্থের ফাঁদে। ব্যবসায়ী দুলাল তার মুনাফা বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে কেতকীকে ব্যবহার করে। অন্যদিকে কেতকীও উচ্চবিত্তের বিলাস পূর্ণ জীবনের লোভে নিজের দেহকে ব্যবহার করতেও কুণ্ঠিত হয় না। নারীরা পিতৃতন্ত্রের অবদমন থেকে মুক্ত হতে চাইছে, স্বাধীন জীবন যাপনের লালসা কেতকীরাসেই পিতৃতন্ত্রেরই তুরুপের তাস হয়ে পড়ছে। স্বেচ্ছায় নিজেকে যৌনবস্তু হিসেবে ব্যবহৃত হতে দিচ্ছে। পিতৃতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষক পুঁজিতন্ত্র, তারও ব্যবসা বৃদ্ধির মুনাফা লাভের কৌশল হিসেবে নিজেদেরকে ব্যবহার করতে দিচ্ছে কেতকীর মত মেয়েরা। বুর্জোয়া নারীবাদের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ ওঠে যে তারা পুঁজিতন্ত্রকে পরোক্ষে প্রশ্রয় দেয়। এইভাবে কেতকী মার্কসীয় নারী-স্বাধীনতার ধারায় নিজেকে দেখতে চায়নি। বরং সেই সর্বহারার স্তর থেকে নিজেকে শ্রেণীচ্যুত করে উচ্চবিত্তের গোত্রভুক্ত করতে চেয়েছে। বলছে বুর্জোয়া নারীবাদের কথা। কিন্তু এক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক দিক থেকে এবং একজন নারী হিসেবেও দুলালের দ্বারা শোষিত হচ্ছে সে। তবু শ্রেণীচ্যুত হয়ে বিত্তবানদের স্তরে ওঠার প্রচেষ্টা কেতকীকে শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় স্ত্রীর পরিচয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু কেতকী কখনোই দুলাল দত্তদের শ্রেণীতে নিজের জায়গা করে নিতে পারে না। বুর্জোয়ারা কখনোই প্রলেতারিয়েতের অনুপ্রবেশ বরদাস্ত করবে না। তাহলে শ্রেণীবিভাজন এবং শ্রেণীবৈষম্য জনিত শোষণ সম্ভবপর হবে না। তাই কেতকীকে শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতে হয় দেবকীর কাছে। দরিদ্র বলে যারা এতদিন তার কাছে ঘৃণার পাত্র ছিল, আজ তাদেরই একজন হিসেবে নিজেকে ভাবতে পারছে সে। সর্বহারার সংগ্রামে সেও একজন সংগ্রামী।

দেবকী, মেঘী নিজেদের জীবনকে ব্যক্তিগত স্বার্থের সংকীর্ণ সীমানায় সীমাবদ্ধ রাখেনি। একজন মেয়ে হিসেবে শুধু নয়, একজন কর্মী প্রাপ্য অধিকার বুঝে নিতে তারাও শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন করে। এইভাবে একদিন যেসব নারীরা নিজেদের অধিকারের কথা পরিবার পরিসরের সামনে রাখতে দ্বিধা করত, আজ তারাই তাদের রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন। সে অধিকার আদায় করার লড়াইতেও তারা পূর্ণমাত্রায় প্রস্তুত।

আর ভদ্রা নিজের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মার্জিত রুচি সম্পন্ন বুর্জোয়া পরিচিতি যা সংগ্রামী সর্বহারাদের চোখে সম্ভ্রমের সঙ্গে ভয়ের দূরত্বও এনে দেয়, সেই পরিচিতির বাইরে নিজেকে সরিয়ে এনে সর্বহারার একজন সংগ্রামী হয়ে ওঠার সাধনায় রত। জেলে যাবার পূর্বে পার্থ ভদ্রার প্রেমকে প্রত্যাখ্যানের ভুল পদক্ষেপ বুঝতে পেরেছে। সেই উপলব্ধির বার্তা ভদ্রার কাছে বহন করে এনেছে পার্থর ভদ্রাকে দেওয়া কলম; সেই সঙ্গে পার্থর হয়ে তার সর্বহারার সংগ্রামে যোগদানের বার্তাও এনেছে। তাই ভদ্রা ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের সংকীর্ণ গন্ডি পেরিয়ে সেই আন্দোলনের কাজে নিজেকে সঁপে দিয়েছে, তার পাথেয় হয়েছে পার্থর দেওয়া কলম যে কলম দিয়ে সংগ্রামের ঘোষণা করেছে সে ছত্রে-ছত্রে।

লতা যেমন শ্বশুরবাড়িতে নিয়মের মধ্যে থেকেও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে প্রখর করে তুলেছে, সেই রকমই একজন কমরেড হিসেবেও সুলক্ষণের সহকর্মী হয়েছে সে, তবে সবার অলক্ষ্যে। সংসার চালানো বা সন্তান পালন একা স্ত্রীর দায়িত্ব নয়। রাজনীতি সুলক্ষণের জীবনের মূল লক্ষ্য; তাই স্বামীকে সংসারের নিত্য প্রয়োজনের বেড়াজালে আটকে রাখেনি লতা। ন্যূনতম লজ্জা নিবারণের বস্ত্র বা সন্তানের চিকিৎসার জন্য অর্থের যোগান অপ্রতুল লতার সংসারে। এমনকি ছোট্ট ডাকুর ছোট্ট আবদারটুকু মেটাবার সামর্থ্য নেই তার মায়ের। কিন্তু সংসারের নিত্য দৈন্যর বা অভাব-অভিযোগের মধ্যে আটকে রাখেনি স্বামীকে, বরং নিপুন হস্তে অক্লান্ত পরিশ্রমে সেই ফাঁক ভরতে নিজেই সচেষ্ট হয়েছে। শুধুই গৃহকর্ত্রীর যোগ্য ভূমিকা পালন করেছে লতা, তা নয়। ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের পড়ানো বা মহিলা সমিতি গঠনের সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঘরে গিয়ে সুলক্ষণদের জন্য চাঁদাও তুলেছে অভুক্ত দশায়। সেই সঙ্গে মধ্যবিত্ত ঘরের গৃহবধূদেরও যুক্ত করেছে লতা রাজনীতির বৃহৎ পরিসরের সঙ্গে। তবু বটুর চোখে লতা সুলক্ষণের ‘অযোগ্য বউ’। প্রথমত লতার একমাত্র পরিচয় সুলক্ষণের স্ত্রী নয়, তার পৃথক অস্তিত্ব বর্তমান। একজন মানুষ হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা সে পালন করেছে তার গৃহস্থ পরিসর থেকেই। আর দ্বিতীয় পরিচয় যদি সুলক্ষণ সাপেক্ষ হয়, তবে সেই পরিচয়ও সে নিজ গুনে প্রমাণ করেছে। যেখানে সাংসারিক উপার্জনে সে অংশগ্রহণ করতে পারছে না, সেখানে সুলক্ষণের সীমিত আয় দিয়েই সংসারের অভাব পূরণ করেছে;প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত উপার্জনের ফাঁকটুকু সে ভরেছে অক্লান্ত পরিশ্রম দিয়ে, রাত জেগে ধান ভেঙে। সুলক্ষণ যদি রাজনীতির প্রয়োজনে রাত জেগে সমিতির কাজ চালিয়েছে, সেই রাত লতা ও জেগেছে তার পরিবারের নির্বিঘ্ন পরিচালনার জন্য। তাই একজন নারীর একাধিক পরিচয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় নিজের কর্মদক্ষতায় ও পরিশ্রমের জোরে  রেখে পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি মানুষরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে। লতার এই লড়াই বটু দেখতে না পেলেও পার্থ উপলব্ধি করেছে সহমর্মীর টানে। বটুর মত হালকা চালের কর্মীরা রাজনীতিকে কর্মদ্যমে না দেখে সীমাবদ্ধ গন্ডিতে দেখতে অভ্যস্ত।তাই লতা তাদের দলের সক্রিয় সদস্য না হওয়ায় কেবলমাত্র সেকেলে গৃহবধূ; কমরেড যোদ্ধা নয়। অথচ তাদের দলীয় চশমায় আঁটা দৃষ্টি একজন প্রকৃত কমরেডের সর্বহারা লড়াইয়ে অপ্রত্যক্ষ হলেও আন্তরিক অংশগ্রহণকে দেখতে পায়নি। কিন্তু পার্থর মাধ্যমে সেই স্বচ্ছ দৃষ্টি লেখিকা সঞ্চারিত করেছেন পাঠকের মধ্যে।

যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সৈন্যদের ভোগ লালসা মেটাতেই হোক, কিংবা জমিদারি চিরায়ত ব্যবস্থায় পুরুষের যৌনলিপ্সা চরিতার্থ করতেই হোক, বেদের পণ্যরূপে ব্যবহার চলে স্বাভাবিক এবং জরুরীকালীন সর্বপরিস্থিতিতেই। তাই এই উপন্যাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষের চূড়ান্ত দারিদ্র্যের সুযোগে টাকার বিনিময় নারী সম্ভ্রম কিনেছে বিদেশি সৈন্যরা ঘর ঘর থেকে। পেটের জ্বালা সম্মানের দাড়িপাল্লায় গুরুভার হয়ে মেয়েদের সম্ভ্রম ছিনিয়ে নিয়েছে। আর শ্রীবাড়ির চৌধুরী বংশের নায়েবের কাছে দরিদ্র প্রজারা খাজনা মেটাতে না পেরে বাধ্য হয়েছে ঘরের মেয়ে বোনদের সঁপে দিতে। অর্থগৃধ্নুদের মুনাফার লোভকে শান্ত করা হয়েছে নারীশরীরের বিনিময়ে। এই বাড়িতেই অতিথি হয়ে গিয়েছে ভদ্রা। কিন্তু পার্থ তো চেনে সেই ভদ্রাকে যে সর্বহারা আন্দোলনের স্লোগান লিখেছে অকপটে, প্রিয়দর্শনের বিধবা স্ত্রীর আচারনিষ্ঠ জীবনচর্যা পালন করলেও তারপর ব্যক্তিত্বময়ী অস্তিত্বকে অথচ স্পষ্ট রেখায় অটুট রেখেছে। যে ভদ্রা বৃদ্ধ শ্বশুড়ের পরিচর্যা ও স্কুলের শিক্ষক ও তার বাইরেও মানুষের মধ্যে থেকে মানুষের হয়ে লড়াইয়ে সামিল হয়েছিল, নিয়েছিল জীবনের স্বতন্ত্র আস্বাদন, স্বভাবতই সেই চেনা ভদোদরা অচেনা হয়ে যায় চৌধুরী বাড়ির আতিথ্য গ্রহণকারী পুত্রবধূর পরিচয়ে – ‘শাড়ির আকাশী রং এর পাড়ে জরির দাঁত, তার সঙ্গে ইন্দ্রনীলের পাথরের আংটি থেকে বিশেষ ধরনের কেশবিন্যাসের ওই শান্ত সৌন্দর্যটুকু পর্যন্ত যেন এ বাড়ির আত্মীয়তা মেনে নেওয়ারই ঘোষণা জানাচ্ছে সুন্দর নম্রভাবে’২৫। জমিদার বাড়ির আত্মীয় এই ভদ্রা যেন পার্থর সঙ্গে তার  সগোত্রতাকে অস্বীকার করছে -‘দুজনের মাঝে এই শ্রেণী কত ব্যবধান উড়িয়ে দিতে পারে না আজ’২৬ পার্থ। কিন্তু আতিথ্য গ্রহণ এর সঙ্গে আত্মীয়তা সমার্থক তো নয়। আত্মীয়তা তাদের সঙ্গে হয় যাদের সঙ্গে আত্মার মিলন সম্ভব। আত্মায় আত্মায় এই মিলনের জন্য জন্মসূত্র বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কসূত্র অপরিহার্য নয়। যদিও এবারের জমিদার কর্ত্রী মণিমা ভদ্রার মধ্যে ভাবি কর্ত্রীর ছায়া দেখেছিলেন। এক সময় ভদ্রারও একই কথা যে মনে আসেনি, তা নয়। কিন্তু ভদ্রা অচিরেই নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। ঘরের মেয়ে, বৌমাদের নিয়ে থিয়েটার করানোতেই এ বাড়ির প্রগতিমনষ্কতা সীমাবদ্ধ। এই বাড়ির শিরায় শিরায় আজও প্রবহমান  জমিদারি প্রজাপীড়ণবৃত্তি। তাই কৃষকদের নিজের পরিশ্রমের ধান নিজের গলায় তোলার দাবি সহ্য করেনি নায়েব সহ জমিদার পরিবার। এই অপরাধে পাহাড়পুরের প্রজা শঙ্খমানকে কাছারি বাড়িতে এনে বাঁশডলা দেওয়া হয় নির্মমভাবে; পিপাসার্তের জলের জন্য করুন আর্জি মেটানো হয় প্রস্রাবে ভরা খুরি দিয়ে। এই অত্যাচার জমিদার প্রভুদের আধুনিকতার মোড়কে লুকানো সামন্ত নায়কের নগ্ন, ঘৃণ্য চেহারা উন্মোচিত করে ভদ্রার সামনে। সেইরকমই তার কাছে ধরা পড়ে জমিদার কর্ত্রী দুর্বল নারীর অসহায়তা – ‘কাটা মাছের মত  সেখানে দাঁড়িয়ে ছটফট করে – তবু এর বেশি এক পাও যাবার উপায় নেই এ-বাড়ির গৃহিণীদের’২৭। যে মণিমার গাম্ভীর্যপূর্ণ অনুশাসনে চলে এবাড়ির প্রতিটি অনুপুঙ্খ কাজ, সেই মণিমার সাধ্যও নেই এই অন্যায়ের  প্রতিবিধান করার – ‘এ মুহূর্তে এ-বাড়ির ছোট্টকর্ত্রীর এ অনুরোধ একটা ভিখীরির অনুরোধের চাইতে এক বিন্দু বেশি মর্যাদা পাবে না’২৮। সেই মণিমার ছায়া কী করে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে প্রখর ভদ্রা হতে পারে? সেই বাড়ির সঙ্গে কী করে আত্মীয়তার যোগ থাকবে ভদ্রার সর্বহারার সংগ্রামে নিজেকে সঁপে দেওয়া আত্মার সঙ্গে? তাই পার্থর মনের আশঙ্কা অমূলক প্রমাণ করে ভদ্রা এই অন্যায়ের প্রতিবাদ স্বরূপ সেই মুহূর্তেই সেই বাড়ির আতিথ্য ত্যাগ করে ফিরে যায় কলকাতায়। ‘পিয়ার বাবাকে প্রণাম না করেই মোটরে উঠে বসে’২৯। ভদ্রা সেই প্রতিবাদের উৎস কেবলমাত্র সর্বহারা সংগ্রামী নেতা পার্থর প্রতি ভালোবাসার কারণে নয়। পার্থ তার নিঃসঙ্গ জীবনে বাঁচার অন্য অর্থ দিয়েছে তাকে সেই সংগ্রামের একজন করে ঠিকই। কিন্তু সেই ব্যক্তিপ্রেম ছাড়াও ভদ্রার অন্তরে এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর নিরন্তর জীবন-সংগ্রাম আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। শুধু পার্থর প্রেমিকা হিসেবে তার এই পথ চলা মাত্র নয়।একজন শিক্ষিত সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে মানবিকতার উপর আসা উৎকট লাঞ্ছনার প্রতিবাদ ভদ্রার পক্ষে অবশ্য পালনীয় কর্তব্য ছিল। মণিমা যেখানে আটকে যান, ভদ্রা সেখান থেকে পরবর্তী প্রজন্মকে তার কর্তব্যের সোপানে আর এক ধাপ এগিয়ে যায় জমিদার পুরুষ বিরুদ্ধে এই মৌন অথচ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে।

ভদ্রার পরবর্তী জীবন তার পুরনো পরিচিতিকে ভেঙে  জীবন পথের নতুন দিশা গড়ার সাক্ষী। শ্বশুর মশায়ের সঙ্গে সে দেশের বাড়ীতে ফিরে আসে। খুর শাশুড়ি থেকে ঘরের কাজের লোক সকলেরই শ্যেণ দৃষ্টি তার বৈধব্য জীবনের আচারনিষ্ঠার প্রতি। তাকে যেন প্রিয়দর্শনের বিধবা স্ত্রীর পরিচয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রাখতে চায়। অথচ পার্থর প্রতি তার ভালোবাসা তার পূর্ব সম্পর্কের উপস্থিতির অনুভূতি তাকে সংকুচিত করে তোলে মনে মনে। বিধবাদের একবেলা চাল খাওয়ার অনুমতি। খুর শাশুড়ির পুলির পায়েস সেই নিয়মকেই মনে করিয়ে দিতে চায়। ভদ্রার দুবেলাই ভাত খাওয়ার ঘোষণা যেন সেই নিয়মের বিরুদ্ধাচারণের জন্যই। বউ মানুষের কাজ বলতে গৃহস্থালি। এমনটাই জানতে অভ্যস্ত গৃহকর্ত্রী থেকে পরিচারিকা সকলেই। তাদের এই নিয়মকেই যেন তাদের সামনে ভাঙতে ভদ্রার লেখালেখির কাজে বুঁদ হয়ে থাকা। টিপু এই দমবন্ধকর পরিস্থিতিতে একটু হালকা হাওয়ার যোগান দেয় ভদ্রাকে। টিপুর সাহায্যে ভদ্রা বাড়ির নিচে দুর্ভিক্ষের জন্য অভুক্ত শিশুদের দুধ বিলির ব্যবস্থা করে। ঘরের কাজে যে সে নিজেকে আর বেঁধে রাখবে না, সে কথাই সে জানিয়ে দিতে চায় নিজেকে এবং অন্য সকলকেও। দুধ বিলির কাজেই এই প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ থাকেনা, বি.এম.আর.সি.-র কাজে যোগ দিয়ে ভদ্রা গ্রামের দুঃস্থ মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছে। টিপুর কথাই ফলতে শুরু করেছে। ভদ্রক এসে বৌদি বলে সম্বোধন করে না, দিদি ডাকে – বউ হতেই চায় না, বৌদি হবে কি করে? সত্যিই ভদ্রা চৌধুরী বাড়ির পুত্রবধূর পরিচয় মুছে ফেলেছে ক্রমশ। মেয়েদের সঙ্গে ছেলেদের আলাপের উপরও রয়েছে বনেদি শাসনের রাশ। সেই রাশের বাঁধনকে ভদ্রা শিথিল করেছে টিপুর সূত্রে আলাপ হওয়া আইরিশ সৈনিক ওনীলের ক্ষেত্রে। অসুস্থ ওনীলকে দেখতে গিয়েছে হাসপাতলে। বাড়িতেও তাদের আলাপ বন্ধুত্বের বন্ধনকে দৃঢ় করেছে। অনাত্মীয় পুরুষের সঙ্গে তার এই বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন ভদ্রার প্রগতিশীল আধুনিকতাকেই প্রমাণ করে। ওনীল তাকে ভালোবেসেছে, সে কথা জানে ভদ্রা। কিন্তু এই ভালোবাসা সে গ্রহণ করেছে বন্ধুত্বের সম্পর্কে, প্রেমের সম্পর্কে নয়। কারণ তার মন জুড়ে রয়েছে পার্থ। তবু ওনীলের ভালোবাসা তার জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রিয়দর্শন তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে; পার্থর মনের কথা তখনও অজানা তার কাছে। ওনীলের এই ভালোবাসা তার নিজের কাছে নিজের অস্তিত্বের গুরুত্বকে জানান দেয়। শুধুই প্রত্যাখ্যান নয়, সেও কারোর জীবনে একান্ত কাছের মানুষ। এই উপলব্ধি ভদ্রার ব্যক্তিত্বকে বিশ্বাস এবং দৃঢ়তা একইসঙ্গে দিয়েছে।

চৌধুরী বাড়ির পুত্রবধু রূপে নয়, ভদ্র ক্রমশ নিজের জগতে স্থিত হচ্ছে যে জগতের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে পার্থ। ভদ্রার দেশের বাড়িতে পার্থ আসে ভদ্রাকে মনের কথা জানাতে। পার্থ চৌধুরীবাড়ির পুত্রবধূর কাছে পর পুরুষ হতে পারে, কিন্তু সে ভদ্রার একান্ত আপনজন।তাই সামাজিক অপবাদের ভয় তাকে পার্থর কাছে নিজেকে মেলে ধরতে কুন্ঠিত করে রাখতে পারেনি। গভীর রাত অব্দি তাদের আলোচনা টিপুর চোখে ভদ্রার সাহসের জন্য প্রশংসা ঝরায়। ভদ্রে নিজেকে তার পূর্ব পরিচয় থেকে মুক্ত করতে পেরেছে বলে পার্থর কাছে নিজেকে সঁপে দিতে পেরেছে। গভীর রাতে সমাজের সতর্ক প্রহরী সময় নির্দেশক ঘন্টা ভদ্রাকে পার্থর থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি। ভদ্রা পার্থর ঘর ছেড়ে নিজের ঘরে গেছে পার্থর অনুমতি নিয়ে; সমাজের অনুশাসন তাকে বাধ্য করতে পারেনি সমাজের চোখে নিষিদ্ধ বিধবার প্রেমকে বলি দিয়ে বৈধব্যের আচারকে জীবনের আশ্রয় হিসেবে মেনে নিতে। পার্থর ভদ্রার কাছে সমর্পণ ভদ্রাকে তার ভবিষ্যৎ জীবনের পথনির্দেশকে স্পষ্ট করে। প্রিয়দর্শনের সূত্রে আর পারিবারিক বন্ধনে নিজেকে জড়াবে না, এগিয়ে চলবে স্বীয় পথ ধরে। তাই সেই বাড়ি ত্যাগ করে কুণালের ফ্ল্যাটে চলে আসে প্রেসের অস্থায়ী চাকরি নিয়ে; ছিড়ে ফেলে তার বিবাহিত জীবনের সমস্ত সম্পর্কজাল। কুনালের সঙ্গে এক ফ্ল্যাটে থেকে প্রগতি মনস্কতার আরাক ধাপকে সমাজের সামনে রাখে। নারী-পুরুষের একত্রবাস যে সমাজ নির্দিষ্ট সম্পর্ক ছাড়াও সম্ভব এবং মনের সম্পর্ক সামাজিক বৈধতার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী তা প্রমাণ করে দেয়। কুনাল সমাজের চোখে ভদ্রার জীবনে বহিরাগত হলেও এই পুরুষ বন্ধুটি তার বিশেষ ভরসার আশ্রয়স্থল।সেই সহজেই অনাত্মীয় পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে এক বাড়িতে থাকার সাহস দেখায় ভদ্রা, সমাজের দেওয়া দুর্নামের ভয় না করেও। এইভাবে একজন মেয়ে তার জীবন পথ, তার সম্পর্কসূত্র স্থির করেছে নিজের ইচ্ছানুসারে, সামাজিক দায়রা ভেঙে। একই সঙ্গে পার্থর মৃত্যু তার স্বশ্রেণি বিচ্যুতিকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। মধ্যবিত্ত শিক্ষিতের উচ্চাসন থেকে সর্বহারার সংগ্রাম লড়া যায় না। এতে একীভূত হবার শক্তি থাকে না, উত্তমর্ণের অধমর্ণের প্রতি দয়াকে ঘনিয়ে তোলে একানুভূতিস্থলে। একদিন শিক্ষিত, মার্জিত ভদ্র কাছে দেবকী নিজের প্রয়োজনের কথা জানাতে কুন্ঠাবোধ করেছিল। সেই জীবনচর্যাকে ত্যাগ করে ভদ্রা পাহাড়পুরের সারথি, সরস্বতীদেরই একজন হয়ে ওঠে। তার বেশভূষায়, আচার ব্যবহারে স্পষ্ট হয়ে ওঠে আদিবাসী রমণী সত্তা। শ্রেণীবিচ্যুত (declassed) হতে পেরেছে বলেই ভদ্রা শ্রেণী-সংগ্রামের কর্ণধার হয়ে উঠেছে। পার্থের অসম্পূর্ণ লড়াইয়ের গুরু দায়িত্ব নিয়েছে আপন স্কন্ধে।

ভদ্রা যে সংগ্রামে শেষে এসে যোগ দিয়েছে, সেই সংগ্রামে মেয়েদের ভূমিকা অনেকখানি নির্দিষ্ট করেছে সরস্বতী। পাহাড়পুরের সংগ্রামে সারথীর অনুপস্থিতিতে গোপন দলীয় কর্মসূচি পূরণের দায়িত্ব নিয়েছে সরস্বতী। সেই সরস্বতী মিলিটারি সৈনিকদের হাতে লাঞ্ছিত হলে তাকে বাঁচাতে গিয়ে পার্থ নিহত হয়। স্বরস্বতীর এই লাঞ্ছনা দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ প্রসঙ্গকে বার্তাবহ করে তুলেছে। নারীত্ব উচ্চবিত্ত সম্প্রদায় থেকে নিম্নবিত্ত আদিবাসী স্তরে অর্থাৎ সমাজের সকল সোপানেই পুরুষ অধিপত্য দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছে। এই লাঞ্ছনার প্রতিবাদও এসেছে সমাজ থেকেই। দ্রৌপদীর অপমানের শোধ দিতে কৌরবপক্ষকে নির্বংশ হতে হয়েছে। আর স্বরস্বতীর লাঞ্ছনা এবং পার্থর মৃত্যু গোটা কৃষক সমাজকে সশস্ত্র তেভাগা আন্দোলনের সম্মুখ সমরে জড়ো করে। সফল হয় পার্থদের দেখা এতদিনের স্বপ্ন। আর সেই আন্দোলনকে পার্থর অনুপস্থিতিতে নেতৃত্ব দেয় তারই প্রাণের দোসর ভদ্রা। এইভাবে রাজনৈতিক আন্দোলনে নারীর ভূমিকা অন্যমাত্রা নিয়ে দেখা দেয় ‘পাকা ধানের গান’ উপন্যাসটি।

মাৎস্যন্যায় কেবল রাজনীতির ক্ষেত্রেই সত্যি নয়, দুর্বলের উপর সবলের আধিপত্য বিস্তার সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে, পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে। তাই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীর অবদমন কোন আকস্মিক বিষয় নয়। কিন্তু এই অবদমন যত অধিক হয়, প্রতিরোধের ভাষাও ততই তীক্ষ্ণ হয়। এই প্রতিরোধের ভাষা নিয়ে এসেছে নারীরা। পরাধীনতার শিকলে বাঁধা নারী নিজ অধিকারের লড়াই নিজের লড়েছে পুরুষতান্ত্রিক সর্বাঙ্গীণ আধিপত্যের বিরুদ্ধে। নারীর থেকে তার সহজ স্বাভাবিক শিক্ষা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তার জন্য নির্দিষ্ট আচরণবিধির নির্দেশিকা ঝুলিয়েছে জাতার লিঙ্গ পরিচয় বা Gender Identity তৈরি করে। এই লিঙ্গ পরিচয় সমাস দ্বারা নির্ধারিত; প্রকৃতি নির্দিষ্ট নয়। তাই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ তার পুরুষ আধিপত্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নারীর পালনীয় আচরণবিধি তৈরি করেছে। তাকে সম্পত্তি জ্ঞান করে তার উপর ব্যক্তিগত মালিকানা বিস্তার করতে চেয়েছে। এই মালিকানা পুরুষানুক্রমে বজায় রাখার উদ্দেশ্যে তার বাইরের গতিবিধি ছেঁটে ফেলা হয়েছে। তার কাছ থেকে শিক্ষার অধিকার সহ সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভৃতি প্রায় সমস্ত অধিকার কেড়ে নিয়ে গৃহলক্ষী আইকনে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, যে গৃহলক্ষীর বহির্জগতে প্রবেশ নিষেধ। হারেমে আটক দশায় দিনযাপন তথা জীবনযাপন নির্দিষ্ট হয়েছে। পুরুষের চোখে সে কেবল সম্পত্তি মাত্র নয়, ভোগ্যবস্তুও বটে। আরো নির্দিষ্ট করে বললে, যৌন ভোগ্যবস্তু। পুরুষ জাতির এই মানসিকতার প্রমাণ বর্তমান প্রযুক্তির যুগেও প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে। সিনেমা, সিরিয়াল সহ বিনোদনের বিভিন্ন মাধ্যম, বিজ্ঞাপন, এমনকি ভিডিও গেমসেও নারীরা যৌনবস্তু বা sex object রূপে উপস্থিত। সম্প্রতি অ্যালেক্সা নামক মেশিনের বিজ্ঞাপনে দেখা যায় অ্যালেক্সাকে নারী হিসেবে দেখানো হয়েছে, তার ভিতর থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর নারীর। আসলে এই মেশিনটি ঘরে থাকে বলেই এইরূপ উপস্থাপনা। এছাড়াও সেই যন্ত্র থেকে যে নারী কন্ঠস্বর ভেসে আসছে, তাতে মিশে রয়েছে যৌন আবেদনের চাটুকারি সুর। জি বাংলা চ্যানেলে নারী প্রগতির একাধিক সিরিয়াল চালু রয়েছে।কিন্তু সেসব সিরিয়ালে নারীরা বাইরের জগতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সংসারের সমস্ত ঝক্কি সে একাই সামলেছে। কারণ মেয়েদের অন্যান্য ভূমিকা মেনে নিলেও সমাজ নির্দিষ্ট প্রধান ভূমিকা গৃহলক্ষীর। তাই বোধহয় জি বাংলার লোগো যখন আসে, তখন সেই গৃহলক্ষীর আইকন স্বরূপ শাখা-পলাও সেই লোগোর সঙ্গে সঙ্গে আসে। এই সমাজ মানসের পরিকাঠামো পরিবর্তনের লক্ষ্যে নারীবাদী আন্দোলন তাদের বিভিন্ন প্রেক্ষিত, দাবি নিয়ে ক্রমশ অগ্রসর হচ্ছে।

সাবিত্রী রায় স্বাধীনতা আন্দোলন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তার কথাসাহিত্যের মুখ্য ভাগটি লিখেছেন। এই পরিস্থিতিতে এদেশের অর্থনীতি যুদ্ধকালীন দুর্ভিক্ষ দ্বারা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মন্দার বাজারে একার রোজগারে সংসার চালাতে অসমর্থ পুরুষেরা বাধ্য হয়ে নারীদের কর্মজগতে প্রবেশ মেনে নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই নারী সমাজ নির্দিষ্ট আচরণবিধির বাইরে গিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের সংগ্রামে চালায়। এই নারী সংগ্রাম লেখিকার ‘পাকা ধানের গান’ উপন্যাসটির একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে।   গৃহের গণ্ডি কেটে বেরিয়ে এসেছে এই চরিত্রগুলি।দেবকি, ভদ্রা গৃহের অন্তরালে জীবন খোয়াইনি। তারা মেয়েদের জন্য নির্ধারিত আচরণবিধিকে মান্য করে চলে নি। জীবনে চলেছে নিজেদের শর্তে। নারীচরিত্রগুলি শিক্ষার জন্য লড়ছে, আর্থিক স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে, এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। একজন পুত্র সন্তানের দায়িত্ব ও একজন কন্যাসন্তানের দায়িত্বে কোন ফারাক রাখা হয়নি।   দেবকি তার দৃষ্টান্ত। রাজনৈতিক জগত পুরুষের একচ্ছত্র নয়, বাইরের জগতে নিজেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে নারীদের শাসন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরী। তাই নারীবাদী আন্দোলনের ভোটাধিকারের মত রাজনৈতিক অধিকার পাবার জন্য লড়াই চলছে। রাজনীতি সমাজজীবন বিচ্ছিন্ন নয়। সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রাজনৈতিক পরিচয়। সেই পরিচয় নিয়ে আমাদের সামনে এসেছে ভদ্রা, দেবকি, সরস্বতীরা।

সাবিত্রী রায়ের উপন্যাসগুলি বৃহদায়তন। বড় ক্যানভাসে সাহিত্য রচনা করেন বলেই উপন্যাসে সামাজিক প্রতিবেশ সূক্ষ্ম বিশ্লেষণসহ উপস্থিত। জটিল আবহের বহুবিধ শিকার হয় নারী। তারই অনুপুঙ্খ বিবরণ ও বিশ্লেষণ রয়েছে ‘পাকা ধানের গান’ উপন্যাসটি। নারীকে ঘরবন্দি করে রাখতে পিতৃতন্ত্র তার সার্বিক বল প্রয়োগ করে। এই ঘরের গণ্ডি ভেঙে বাইরের জগতে বেরিয়ে লড়াই চালায় মেয়েরা।সাবিত্রী রায়ের কথাসাহিত্যে বাইরের জগতে গিয়ে মেয়েদের লড়াই রয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার তুলনায় বড় অংশজুড়ে গৃহের ভিতরে হয়ে চলা রাজনীতির সঙ্গে মেয়েদের জুঝে চলার কাহিনী রয়েছে। দেবকির পূর্বজীবনে গৃহের ভিতরের সংগ্রাম সূক্ষ্ম অনুভূতির সঙ্গে পরিবেশিত। উপন্যাসের নারীচরিত্রের একটা বড় অংশ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ঠিকই, তবে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীর ভূমিকায় তারা অবতীর্ণ নয়। তবে তারা সক্রিয় রাজনৈতিক সদস্য না হলেও তাদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা উপেক্ষণীয় নয়। তা বহু যত্ন সহকারেই প্রদর্শিত।

সাবিত্রী রায়ের লেখা আরেকটি স্বাতন্ত্র্য উপস্থিত। অধিকাংশ নারীবাদী লেখায় এমন চরিত্র প্রতুল যারা এই আধুনিক প্রজন্মের অংশ, যারা পরবর্তী প্রজন্মকে এগিয়ে দিয়ে যায় সমাজের পটে। কিন্তু তাদের পূর্ব  প্রজন্ম অর্থাৎ ঠাকুমাদের খুব বেশি সক্রিয়তা দেখা যায় না, বিশেষ করে রাজনীতির আসরে। কিন্তু ‘পাকা ধানের গান’ এর ব্যতিক্রম – জেঠিমা, পিসিমা, মায়েরা জীবনের কোন না কোন অংশে পরোক্ষে হলেও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অথবা হচ্ছেন। নিজের জীবনে যা  পাননি, সেই অধিকারগুলিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সুরক্ষিত রাখতে তারা গৃহপরিসরের মধ্যে থেকেও আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। যেমনটা দেখা যায় Fourth wave of feminismএর অন্তর্ভুক্ত শাহীনবাগে চলা দাদিদের আন্দোলন আমাদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে এসেছে। এইভাবে বামপন্থী ভাবধারার সঙ্গে তো নারীবাদী ভাবধারা এসেছেই এই দুই লেখিকার কথাসাহিত্যে। সেই সঙ্গে ঘরে-বাইরে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রজন্ম ব্যাপী নারী আন্দোলনের সম্পূর্ণ বলাই হয়ে উঠে আসছে তাদের কথাসাহিত্য।

 

তথ্যসূত্র:

১., মল্লিকা সেনগুপ্ত, ‘স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ’, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১১, পৃষ্ঠা-১৩
২. মল্লিকা সেনগুপ্ত,’স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ’, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১১,  পৃষ্ঠা-১৬
৩. মল্লিকা সেনগুপ্ত,’স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ’, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১১,  পৃষ্ঠা- ৪১
৪. মল্লিকা সেনগুপ্ত,’স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ’, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১১,  পৃষ্ঠা- ৩৮
৫.মল্লিকা সেনগুপ্ত,’স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ’, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১১,  পৃষ্ঠা- ২৩
৬. মল্লিকা সেনগুপ্ত,’স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ’, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১১,   পৃষ্ঠা-৩৮
৭. ‘স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ’, মল্লিকা সেনগুপ্ত, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১১,  পৃষ্ঠা- ৪০

৮. https://en.wikipedia.org/wiki/Intersectionality
৯., মল্লিকা সেনগুপ্ত,’স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ’, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১১,  পৃষ্ঠা- ৪২-৪৩

১০.https://www.vox.com/2018/3/20/16955588/feminism

১১.সাবিত্রী রায়, ‘সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয় খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ৮০
১২. সাবিত্রী রায়,’সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ৮১
১৩.শেফালী মৈত্র,নৈতিকতা ও নারীবাদ,নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড,২০০৩, পৃষ্ঠা-৪৮
১৪.সাবিত্রী রায়,’সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০,পৃষ্ঠা- ৯১
১৫. সাবিত্রী রায়,’সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ৯০
১৬. সাবিত্রী রায়,’সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ১০০
১৭. সাবিত্রী রায়,’সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ১১৯
১৮.সাবিত্রী রায়,’সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ১১৯
১৯. সাবিত্রী রায়,’সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ১৩০
২০. সাবিত্রী রায়,’সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র-তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ১৯০
২১. সাবিত্রী রায়,’সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র-তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ১৯৫
২২.সাবিত্রী রায়, ‘সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ১৯৬
২৩.সাবিত্রী রায়, ‘সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ১৯৭
২৪.সাবিত্রী রায়, ‘সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ২১৮
২৫.সাবিত্রী রায়, ‘সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ৩৪৮
২৬.সাবিত্রী রায়, ‘সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ৩৪৮
২৭. সাবিত্রী রায়,’সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ৩৬০
২৮. সাবিত্রী রায়,’সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ৩৬১
২৯.সাবিত্রী রায়,’সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয়  খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০, পৃষ্ঠা- ৩৬২

 গ্রন্থপঞ্জীঃ

  • মৈত্র শেফালী,নৈতিকতা ও নারীবাদ,নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড,২০০৩
  • রায় সাবিত্রী,’সাবিত্রী রায় রচনা সমগ্র- তৃতীয় খন্ড’, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড,২০১০
  • সেনগুপ্ত মল্লিকা,’স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ’, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১১

  ওয়েবসাইটঃ

সুস্মিতা দাস। লেখক ও অধ্যাপক। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতায়। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে অধ্যাপনা করছেন ত্রিবেণী দেবী ভালোটিয়া কলেজে।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

একটি পরাধীন দেশ আর তার বাসিন্দাদের মনে স্বাধীনতার আকুতি আমরা দেখেছিলাম ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে। এর…..

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

  কেতুগ্রামে যেখানে চন্ডীদাস বাস করতেন সেইস্থানটি চন্ডীভিটে নামে লোকমুখে প্রচারিত। চোদ্দপুরুষের ভিটে বাঙালির মনে…..

নারীর আপন ভাগ্য জয় করিবার: নারীজাগৃতি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা।

নারীর আপন ভাগ্য জয় করিবার: নারীজাগৃতি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা।

নবজাগরণের সঙ্গে নারীর জাগরণ, নারীর মর্যাদা ও সুরক্ষা, এবং নারীমুক্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভারতে এই নবজাগরণের…..