নায়িকা

ফারজানা নীলা
গল্প
Bengali
নায়িকা

আমি একজন নায়িকা। আমার ছবি মানেই হিট। বছরের পর বছর আমি হিট ছবি দিয়েছি।আমার ছবিতে সব থাকে।নাচ গান ভালোবাসা কষ্ট। যা যা বাঙালি চায় আমি তার সবই দেই। গত বছর আমি দুইটি হিট ছবি দিয়েছি। এই বছর আমার একটি ছবির শুটিং চলছে। আরও দুইটি সাইন করা আছে। কয়টা যেন ইভেন্ট, বিজ্ঞাপন ফটোশুট আছে ঠিক মনে করা যাচ্ছে না এইই মুহূর্তে। এগুলো মনে রাখার জন্য আমার ম্যানেজার আছে, সুরেশ বাবু ডাকি তাঁকে।

প্রতিদিন সকালে খুব ভোরে উঠা আমার অভ্যাস। জিম টিম সেরে শুটিং এ যাওয়া প্রতিদিনকার কাজ।

আজকের আমার সিন খুব রোমান্টিক। নায়কের সাথে আমার কিছু ভালোবাসার ডায়লগ। নায়ক ছেড়ে চলে যাবে বা এটাই আমাদের বিদায়বেলা তাই খুব আবেগঘন মুহূর্ত কাজ করবে পরিবেশে। নায়কের সাথে চোখে চোখ রেখে সাথে চোখে পানি এনে তাঁকে বিদায় বলতে হবে। আমি এর আগে অসংখ্যবার এমন সিন করেছি। সুতরাং এ আমার জন্য খুব সাধারণ একটি দৃশ্য।

শট দেওয়ার জন্য দাঁড়ালাম। একশন বলা হলো। এবং আমি স্থির হয়ে গেলাম। নায়কের চোখে আমি আবেগ মেখে তাকাতে পারছি না। তার দিকে আমি তাকিয়েছি যেমন একটা দেয়ালের দিকে তাকাই। আমি কাট বলে আবার শট দিতে বললাম। এবং এবারো আমি চোখে মুখে কোনো ভালোবাসার চিহ্ন ফুটিয়ে তুলতে পারলাম না। চোখে পানিও আনতে পারলাম না। প্রিয়তমর বিচ্ছেদের কোনও কষ্ট চোখে মুখে ফুটিয়ে তোলা গেলো না। আশ্চর্য! এমন হওয়ার কথা না। আমি কোনও নতুন নায়িকা নই যে নার্ভাস হবো।

প্রথমদিন যেদিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াই আমার হাঁটু কাঁপছিল। পেটের ভেতর থেকে নানা রকম আওয়াজ হচ্ছিল। কিছুটা ভয়ে ছিলাম এই ভেবে যে আমার পাশেরজন পেটের আওয়াজ না শুনে ফেলে। একটা লাইনের ডায়লগ দিতে আমার তিনবার টেক নিতে হয়েছিল। সেইদিনের সেই বুক ধড়ফড় আজকে নেই। আজকে আমার পেট স্বাভাবিক। হাঁটু স্থির। শুধু অনুভূতির জায়গায় আমি শুন্যতা অনুভব করছি। এমন কিন্তু হওয়ার কথা নয়।

“কি হলো নাবিলা?” অল ওকে?

ডিরেক্টর রফিক ভাইয়ের কথায় আমি একটু নড়ে উঠলাম।

না কিছু না রফিক ভাই। একটু টায়ার্ড। আবার টেক নেই?

সিউর। রোল…

রোল ক্যামেরা একশন বলার সাথে সাথে আমি একটা লম্বা শ্বাস নিলাম। এবং এবার কোনও ভুল হবে না ভেবে আমি চোখ রাখলাম আমার নায়কের দিকে।

এবারও আমি কিছুই করতে পারলাম না। চোখে কোনো আকুতি ফুটলো না। ঠোঁটে কেঁপে গেলো না।

বিরক্ত হয়ে ভ্যানিটি ভ্যানে গিয়ে বসলাম। শট বিরতি চলছে। চলছে মানে আমার জন্য নিতে হয়েছে।

পর পর দু’কাপ কফি শেষ করে ফেললাম। রাতে ঘুমাতে সমস্যা হবে জেনেও। কিন্তু কিছুতেই এর কারণ খুঁজে বের করতে পারলাম না। একটা সামান্য সিনে আমি আটকে যাচ্ছি কীভাবে? এত তুচ্ছ একটা অভিনয়ে? খারাপ লাগা, কষ্ট পাওয়া, বিচ্ছেদের যন্ত্রণা অনুভব করা এ তো আমার জন্য অতি নগণ্য। এই সিনে নিথর হয়ে যাওয়ার মানে কী? যখন নিজের ওপর নিজে খুব বিরক্ত তখন আমার মোবাইল বেজে উঠল, স্ক্রিনে দেখতে পেলাম অতি পরিচিত নাম। শিহাব।

আমার বর। থাকে কানাডায়। দিনে একবার আর রাতে একবার কল দেওয়া ওর রুটিন। আমাদের মধ্যে ভালোবাসার ইতি হয়েছে দুই কী তিনবছর হবে। তবু আমরা জোড়া লেগে আছি। কেন? হয়ত অভ্যস্ততা নয়ত স্বীকার করার সাহসের অভাব। এই বিরক্তিকর মুহূর্তে শিহাবের ফোন আরও বিরক্ত লাগবে। ফোনটা সাইলেন্ট করে স্ক্রিপটা আবার পড়তে শুরু করলাম।

বয় এসে তাগাদা দিলো। আমি আবার সেটে দাঁড়ালাম। আগেরবারের মতো এবারও আমি শুধু স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

সারাদিনের শুটিং আমার জন্য প্যাকআপ।

আমি মহাবিরক্ত হয়ে বাসায় ফিরে বাথটাবে শুয়ে ছিলাম। হাতে ছিল মোবাইল, মোবাইলে চলছে ভিডিও। কীসের ভিডিও সেদিকে খেয়াল নেই। শুধু চলছে। এবং তাকিয়েও আছি সেদিকে নিস্পলক। এটা একটা অভ্যাস। অবিরত মোবাইলে কোনো না কোনো কিছু চালিয়ে রাখা। ফেসবুক, ইন্সট্রাগ্রাম কিংবা ভিডিও।

এগুলো করা বা দেখা কোনটাই অত্যাবশ্যকীয় নয় জানি। কিন্তু আমি এসবে অভ্যস্ত, কবে থেকে? জানি না।

যদিও ভেতরে আমি বিরক্ত, কিছুটা উদ্বিগ্ন। একদিনের কাজ আরেকদিন চলে গেলে আমার পুরো মাসের শিডিউল উল্টা-পাল্টা হয়ে যাবে। যদিও সেটা সুরেশ বাবুর মাথা ব্যথা।

পরেরদিন শুটিং-এ একইদৃশ্যের অবতারণা। আমি নিথর স্থির আবেগহীন। আমার চেহারায় কোনও এক্সপ্রেশন নেই। মুখ দিয়ে যে ডায়লগ বলছি সেটাও রোবটের কণ্ঠস্বর মনে হচ্ছে। গ্লিসারিন দিয়েও চোখে পানি আনতে পারছি না।

এবার সবাই কিছুটা চিন্তিত। শুটিং আবার প্যাকআপ। আবার বাসায় এসে বাথটাবে ভিডিওর সামনে।

তৃতীয়দিনেও যখন একই ঘটনা ঘটল, ডিরেক্টর, নায়ক, প্রডিউসার, ম্যানেজার সবাই মিলে আমাকে ঘিরে ধরল।

আমি মানসিকভাবে কোনো কারণে বিধ্বস্ত কীনা। আমার কোনো ব্রেক লাগবে কিনা। আমি কোনো ওষুধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি কিনা।

ঘোষণা করা হলো শুটিং দুই দিন অফ থাকবে। আমি সবকিছু থেকে ছুটি নিবো। তাদের ঘোষণা মেনে নেওয়া ছাড়া করার মত আর কিছু পেলামও না।

যখন গাড়িতে উঠি পেছন থেকে কেউ একজন বলে অনেকটা ফিসফিস করে, আরে তামাশা করে এসব নায়িকারা। রাতে মদ গাজা খায় দিনে হাবলা হই পড়ে থাকে”

কথা কানে নেই মনে নেই না।

শুটিংস্পট থেকে আমার বাড়ি অনেকদূর।

রাস্তায় হাজারো মানুষদের দেখতে দেখতে যাই। রাস্তায় হাজারো মানুষ। হাজারো জীবন।

কারো পায়ে হাটা জীবন, কারো রিকশায়, কারও বাসে, কারো বা আলিশান গাড়িতে। সবাই যাচ্ছে, কোথাও না কোথাও যাচ্ছে। আমিও যেমন যাচ্ছি। আমার পাশে একটা বাস এসে দাঁড়ায়। সিগনালে বাসটি প্রায় আমার গাড়ির গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। কালো আয়না ভেদ করে কিছু মানুষের চেহারা দেখতে পাই।

এক সিটে এক নারী বসে আছে। মাথা নিচু, আরেক সিটে মধ্যবয়স্ক এক পুরুষ বসে আছে, মাথা নিচু এবং টুপি পরা। আমার গ্লাস বরাবর দুই স্কুলগামী কিশোর কিশোরী বসে আছে পাশাপাশি। এদেরও মাথা নিচু।

জানলার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে বসতে না পেরে কয়েকজন দাঁড়িয়েও আছে। এদের সবার চোখ তাদের হাতে। হাত মানে হাতে রাখা একটা যন্ত্র।

আচ্ছা এই বাসে কোনো বন্ধু নেই? গল্প করা বন্ধু? বন্ধু কি এখন পাশে বসে না? হাতের মুঠোয় থাকে?

আমার বুক ধড়ফড় করে। গাড়ি চলতে থাকে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে। ধাক্কা আমার গায়ে লাগে না গায়ে লাগে বন্ধু খোঁজার আকুতি।

একজনও কি দেখতে পাবো না যারা কথা বলছে মুখোমুখি হয়ে। যারা হাসছে একে অপরকে দেখে? যাদের ঠোটের চেয়ে চোখ বেশি কথা বলে এমন কেউ নেই আশেপাশে?

যে অনুভূতির অভিনয়ই আমি করতে পারছি না গত তিন ধরে সেই অনুভূতি খুঁজে বেড়াচ্ছি এই ধুলা মাখা রাস্তায়। কী হাস্যকর। অভিনয় যার রক্তে মেশা সে নাকি খুঁজছে অনুভূতির সচিত্র?

আমি হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে নিশ্বাস নেই। আমার ক্লান্ত লাগে, ভীষণ অসহ্য লাগে, নিজের ওপর রাগ লাগে।

রাত এখন অনেক হবে হয়ত। আমি বারান্দায় নিস্তেজ হয়ে বসে আছি। ম্যানেজার এখনো যায় নি বাসায়। ব্যাপারটা আমার পছন্দ হচ্ছে না। তিন দিন ধরে অনেক অপছন্দের কাজ হচ্ছে আমার সাথে।

সুরেশ বাবু, আপনি এখনও যান নি কেন বাসায়?

দিদি আপনার এই অবস্থায় যাওয়াটা কি ঠিক হবে? কাঁচুমাচু হয়ে বলল সুরেশ বাবু। আধো অন্ধকারে সেটা ঠিক মত বুঝা গেল না।

আমার কী অবস্থা?

সুরেশ বাবু চুপ করে আছেন। কিছু বলার মত পাচ্ছেন না, মাথা নিচু।

আমি সুরেশ বাবুর দিকে ভাল করে তাকালাম। আজকের দিনে কাউকে দেখলাম যার মাথা নিচু কিন্তু হাতে কোনো যন্ত্র নেই।

একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসল নিজের অজান্তে।

সুরেশ বাবু, আসলেই আমার কি হয়েছে বলুন তো? আমার অভিনয় আসছে না কেন? এটা কি কোনো রোগ?

সুরেশ বাবু আকুতি করে উঠল যেন। না না দিদি, অভিনয় আসবে না কেন? হয়ত কয়দিনের ব্রেক ডাউন হয়েছে আর কি। অমন হয় সবার মাঝে মাঝে। ঠিক হইয়ে যাবে। আপনি একদম চিন্তা করবেন না। একটু ঘুমান, আরাম করেন কয়দিন। দেখবেন আবার সব আগের মত।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, কিছুই যদি না হয় আপনি যান নি কেন বাসায় আজকে?

সুরেশ বাবু এই প্রশ্নে যেন বোবা হয়ে যান।

সামান্য একটা শট, চোখে চোখ রেখে ভালোবাসা হারিয়ে যাওয়ার আকুতি, কষ্ট, না পাওয়ার বেদনা আমি ফুটিয়ে তুলতে পারলাম না? জানেন সুরেশ বাবু, আমি জোর করে চোখে প্রেশার দিয়েছি যেন কোনো অনুভূতি ধরা পড়ে। ইচ্ছে করে ঠোট কাঁপিয়েছি যেন কোনো অনুভূতি ধরা পড়ে। ভ্রু উঠা নামা করেছি, কপালে ভাজ ফেলেছি কিন্তু কোনোভাবেই  আবেগ জন্মাতে পারলাম না। এটা কী করে হলো বলুন তো?

বলতে বলতে আমার খুব ঝিমুনি এলো।

সুরেশ বাবু তখনও দাঁড়িয়ে।

দিদি ঘুমিয়ে পড়ুন। খুব আস্তে করে বললেন। কিন্তু আওয়াজে খুব মমতা ছিল।

আচ্ছা সুরেশ বাবু, এই যে আপনি এখানে পড়ে আছেন বৌদি চিন্তা করবে না? আপনার ছেলেরা? তারা বাবার অপেক্ষার করবে না?

সুরেশ বাবু হাসলেন। আপনার বৌদিকে জানিয়ে দিয়েছি। আর ছেলেদের অপেক্ষা কি আর। আমি গেলেও ওদের তেমন দেখি না।

কেন?  কেন দেখেন না?

তারা থাকে নিজেদের মত। সারাদিন বাইরে বাইরে। স্কুল কলেজ। এরপর বাসায় যতক্ষণ থাকে নয় মোবাইল নইয় ল্যাপটপ নয় পড়াশুনো। এসবেই ওদের সময় যায়।

আপনি বৌদির সাথে কবে বেড়াতে গিয়েছেন শেষবার?

সুরেশ বাবু অল্প অবাক হলেন। পুজোয় গিয়েছিলাম বাড়িতে।

না না সেই যাওয়া নয়। এই ধরুন আপনি আর বৌদি বাচ্চারা মিলে কোথাও বেরিয়ে আসেন নি?

সুরেশ বাবু আবারও হাসলেন। মৃদু। না দিদি তেমন করে যাওয়া হয় আর কই। আমরা  দুজনই ব্যস্ত। দুজনই ফিরি রাতে। বাচ্চারা স্কুল কলেজ নিয়ে ব্যস্ত। হয়ে উঠে না।

আমি ভীষণ অবাক হয়ে সুরেশ বাবুর দিকে তাকিয়ে রইলাম। যেন এমন কথা বোধের বাইরে। যেন এমন হওয়াটা অস্বাভাবিক। যেন এমনটা পৃথিবীতে ঘটে না।

অথচ এমনটাই স্বাভাবিক সরল সাবলীল এবং স্থির। অস্থির চঞ্চল উত্তেজনা এখানে অনুপস্থিত।

আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। সুরেশ বাবু চলে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, দিদি শিহাব বাবু ফোন করেছিলেন আপনাকে না পেয়ে।

আমি ঘুমিয়ে পড়লাম বারান্দায়।

এক সপ্তাহ পর আমি শুটিং এ গেলাম। এই এক সপ্তাহ দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম। আমার জন্য অনেক টাকার লোকসান হয়ে গেছে জানি। কিন্তু আমাকে মানা করার মত স্পর্ধা কেউ দেখাতে পারে নি বলে টাকার ক্ষতি মেনে নিয়েছে। এতদিন আমি ভেবেছি, শুধু ভেবেছি। অনুভূতি প্রকাশ করতে না পারার কারণ খুঁজে বের করতে চেয়েছি।

সেই একই শট, সেই একই সুপুরুষ নায়ক, সেই একই ডায়লগ, সেই একই আবেগ।

পিনপতন নীরবতার মধ্য দিয়ে আমার টেক শুরু হয়। নিজেকে এবং সবাইকে নির্বাক করে দিয়ে আমি ফিরে আসি। ব্যর্থ সম্পূর্ণ নিষ্ফল ব্যর্থ হই কোনো রকম অনুভূতি ফুটিয়ে তুলতে।

ভ্যানিটি ভ্যানে আমি পাথর হয়ে বসে থাকি। সুবিশাল আয়নায় নিজেকে দেখি। মুখে কেন কোনো আবেগ প্রকাশ পাচ্ছে না। কেন চোখে কোনো ভালোবাসা নেই।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়।

আমি হুট করে অনেকটা উন্মাদের মত বের হয়ে পড়ি। বের হতে হতে সামনে পড়া সব মানুষদের চেহারা আমি আকুল দৃষ্টিতে দেখি। কারো চেহারায় ভালোবাসা আছে কীনা? কারো চেহারায় আবেগ আছে কীনা? কারো চেহারায় আকুলতা আছে কীনা? স্পট বয়, মেকআপ দাদা, গেইটম্যান কারো চোখে মুখে আবেগের চিহ্ন পাই না।

শুটিংস্পটের সবাই আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন আমি মানসিক বিকারগ্রস্ত।

আমি রিকশা নিই। মাথা মুখ ঢেকে।

রিকশা চলতে থাকে।

আমি উদ্দেশ্যহীন বসে থাকি।

না উদ্দেশ্যহীন না। আমি অনুভূতি খুঁজতে বের হয়েছি। ঝাঁক ঝাঁক অনুভূতি। গুচ্ছ গুচ্ছ অনুভূতি। ফুটন্ত সুন্দর সুরভিত অনুভূতি। রাস্তার ধারে মানুষের চেহারায় আমি তন্ন তন্ন করে অনুভূতি খুঁজি। রাস্তার ধারে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে উড়ে যাওয়া ছেলেটা। নিয়ন বাতির নিচে তার চেহারা দেখতে আমি রিকশার ভেতর থেকে মুখ বাড়াই। তার চেহারায় কোনো ভালোবাসার চিহ্ন নেই।

কোথায় যাওয়া যায়? কোথায় গেলে আমি মানুষের চোখে মুখে অনুভূতি দেখবো, আবেগ দেখবো, ভালোবাসা দেখবো অথবা আকুলতা দেখবো? সবার চেহারা আমার মত রোবট কেন? কেন নিরাকার হয়ে গেছে সবাই?

রিকশা থামে এক বিশাল গোল চত্বরের সামনে। চঞ্চল আর মুখরিত জায়গা। হৈচৈ বয়ে যাচ্ছে ঝাঁক ঝাঁক ছেলে মেয়েদের আওয়াজে। বিশাল এক অডিটোরিয়ামের সামনে একস্তূপ যুবক যুবতী মিশে আছে। বসে আছে। আড্ডায় মাতোয়ারা হয়ে আছে।

আমি নেমে পড়ি। হ্যাঁ এখানে অবশ্যই সবার চোখে মুখে আবেগের ছায়া দেখবো। আনন্দ উচ্ছলতা কষ্ট ভালোবাসা আকুলতা সব একসাথে দেখবো। দেখার আকুলতা আরও বেড়ে যায় আমার।

একজন শুধু একজনের মুখে আবেগের রূপ দেখলেই আবার অভিনয় করতে পারবো আমি।

এই যে সাতজন ছেলেমেয়ে মিলে এক জায়গায় বসে আড্ডা দিচ্ছে তারা হাসছে ঠিকই। কিন্তু হাসিটার মধ্যে কোনো প্রাণ নেই। তারা কিছুক্ষণ পর পর হাতে রাখা ওই যন্ত্রের দিকে তাকায়। যেন এটাই এদের প্রাণ। এটা না থাকলে তারা নিঃশ্বাস নিতে পারবে না।

রেলিং ধারে একসাথে অনেক ছেলেমেয়ে উচ্চস্বরে কী নিয়ে যেন আলাপ করছে। তাদের সকলের চেহারা আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি। তাদের উচ্চস্বর শুধু উচ্চস্বরই  লাগে। ঠিক যেমন রোবটের সাউন্ড সিস্টেম বাড়িয়ে দেওয়া।

ল্যামপোস্টের নিচে একা দাঁড়িয়ে এক যুবক মাথা নিচু করে যন্ত্রের দিকে তাকিয়ে আছে নিস্পলক। তার ঘাড়টি যেকোনো সময় ভেঙ্গে পড়বে বলে মনে হয়। তাঁকে একবার বলতে ইচ্ছে করে, ভাই ঘাড়টা একটু সোজা করুন। খসে পড়ে যাবে হয়ত।

একজোড়া প্রেমিক প্রেমিকা বসে আছে একটু আড়ালে। আমি একটু ধীরে পায়ে তাদের দিকে এগোই। এবং প্রায় নিশ্চিত থাকি প্রেমিকের চোখে প্রেমিকার জন্য, প্রেমিকার চোখে প্রেমিকের জন্য ভালোবাসা উপচে পড়বে। এই দৃশ্য আমি দেখবো। এবং আমার সকল অনুভূতি ফেরত আসবে। আমি প্রায় নিশ্চিতই থাকি।

কিন্তু আমি পেলাম একজনের হাতে আরেকজনের কোমরে। আর বাকি দুই হাত দুইটি যন্ত্রে। যন্ত্র থেকে মুখ তুলে তুলে মাঝে মাঝে চুমু খাচ্ছে। হয়ত রোবটও আরও চমৎকার চুমু খেতে পারে!

তন্ন তন্ন করে আবেগ খুঁজি মানুষের চেহারায়। হাঁপাতে হাঁপাতে মানুষের গায়ে ঢলে পড়ে, দূর থেকে দাঁড়িয়ে, আড়চোখে, সোজা তাকিয়ে সবভাবে আমি মানুষ দেখি। পুরো চত্বর ঘুরে মানুষ পাচ্ছি না যার চেহারায় শুধু শুদ্ধ আবেগ দেখবো।

মানুষের ভিড়ে ক্লান্ত হয়ে আমি ফুটপাতে বসে পড়ি। অসহ্য অস্থিরতায় যখন আমি বিধ্বস্ত তখন আমার সামনে এক কিশোরী হাতে কিছু বেলিফুলের মালা নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। “আপা মালা নিবেন? একটা মালা দশ টাকা”

শ্যামবর্ণ মলিন পোশাকে জরাজীর্ণ কিন্তু মুখে চোখে কী নির্মল হাসি। কী চমৎকার স্নিগ্ধতা সারা চেহারায়। আমি বসা থেকে উঠে দাঁড়াই। “আপা নিবেন?”

নিবো। আমি হাত বাড়িয়ে তার সব বেলি ফুলের মালা নিয়ে নিই। সে বিস্তৃত হাসি দিয়ে আমার কাছ থেকে একশ টাকা নিয়ে নিখুঁত আনন্দের অনুভূতি চেহারায় ফুটিয়ে পিছনে ফেরে। একটু দুরে আরও একটি ছোট মেয়ে অপেক্ষা করে তার জন্য। তার বোন। দু’জনে টাকা গোনে। দুজনের চেহারায় আনন্দের সর্বোচ্চ প্রকাশ। চোখ দিয়ে খুশি উপচে পড়ছে। ঠোঁট দিয়ে অনর্গল আনন্দবাণী বয়ে যাচ্ছে।

এদের হাতে কোনো যন্ত্র নেই। এদের চেহারায় শুদ্ধ অনুভূতি আর আবেগ ভেসে যাচ্ছে। আমি দু’চোখ ভরে দেখি। দু’চোখ বন্ধ করে দেখি।

 

সম্পাদনা: শাহানাজ ইয়াসমিন

ফারজানা নীলা। গল্পকার, নারী ও প্রাণি সংরক্ষণ অধিকারকর্মী।  

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..