নিকশিত হেম

তৌহিদ জামান
গল্প, নারী
Bengali
নিকশিত হেম

চোখের সামনে দেখছি, টুকটুকে লাল বেনারসিটা পুড়ছে!

শাড়ির পাড়ে এক টুকরো আগুন ধরিয়ে দিতেই ধিকিধিকি জ্বলতে শুরু করেছে। শাড়িটা পুড়ছে…

শাড়ির সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে যাচ্ছে অহনার প্রথম ভুল, দ্বিতীয় ভুল, তৃতীয়… চতুর্থ… একটা একটা করে পুড়ছে!

আমি দেখি, অহনার চোখে দৃঢ়প্রত্যয়, আগুনের শিখায় তার মুখায়বে উৎফুল্লতার বিচ্ছুরণ!

প্রথম ভুলটা ছিল তার চোখে শিশিরের ব্যক্তিত্ব! তখন ভাবতো- এই মানুষটার জন্যেই বুঝি তার মানবজনম!

দ্বিতীয় ভুলটা, তার চোখের নাচন- বাচনভঙ্গিটাও

তৃতীয় ভুলটা, এই মানুষকে সহজেই বুকের ঠিক ভেতরে, হ্যাঁ- একদম ভেতরে- যেখানে হৃদয় থাকে, সিংহাসন রয়েছে- সেখানে তাকে রাজাধিরাজ করে বসানো… এরপর ধীরে ধীরে ভুলগুলো উচ্ছ্বাসের মতো, বানের জলের মতো তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়!

অহনার দেওয়া আগুনে একটু একটু করে পুড়ে যাচ্ছে বিয়ের বেনারসিটা।

আগুনের লেলিহান শিখা তাকে পুড়িয়ে খাঁটি বানাতে চাইছে, একদম নিখাদ সোনা!

অহনা নিজের মনেই আউড়ে যাচ্ছে- দেখ, দেখে যা… তোর দেওয়া ভালবাসার অভিনয় কীভাবে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে!

তুই দেখে যা, তোর অহংকার কীভাবে ছাই হয়ে যাচ্ছে; দেখ- কীভাবে একা ঘুরে দাড়াতে হয়-

দেখ, আমি আজ দশভূজা হয়ে গেছি, বারবার ফিরে আসবো এই জগতে একজন দীপ্ত মানুষ হয়ে!

আমি শুধোই, কেন?

: ভুল করেছিলাম! প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে… আমি দুঃখিত নই একটুও

একজন প্রেমিকা কী আশা করে তার ভালবাসার মানুষের কাছে?

: কী আশা করবে! বন্ধুত্ব ছাড়া আর কীইবা দেওয়ার থাকে পুরুষের! জানো, আমি স্বপ্ন দেখেছি-েসে হন্তদন্ত হয়ে আসবে। তার সারামুখে বালুসম ঘাম চিকচিক করবে… আমি ওড়নার প্রান্ত দিয়ে মুছে দেবো নোনাজলটুকু…

আচ্ছা-

: আমি ওকে বারবার দোষারোপ করবো, আর ও আমাকে ভেজাবে সাদামেঘের জলে। ও দখিনা বাতাস হয়ে আমায় সতেজ করে দেবে, ও বারবার নত হবে, আমাকে ফুচকা খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে ক্ষমা চাইবে, তার বাইকের পেছনে গোটাশহর ঘুরাবে বলে প্রতিশ্রুতি দেবে- তারপর গভীর মমতায় হাত দুটো ধরে তার বাইকের পেছনে তুলে সবুজ ঘাস মাড়িয়ে একেবারে দিগন্তে নিয়ে যাবে, গোধূলিরঙা বিকেলটাকে জীবনের রঙে মাখিয়ে দেবে…

তো?

: আমাকে সে কেবল আশ্বাসই দিয়েছে, তার লাজুক মুখখানিকে সামনে এগিয়ে ভণিতার একগাদা উপহার দিয়েছে… আমি এতোটাই মগ্ন ছিলাম তার ভেতরে, একটুও বুঝিনি তার অভিনয়! জানো, বিয়ের পর আমাকে বাইরে বেরুতে হলেও তার পারমিশন নিতে হতো; আমার কাজগুলোকে পাত্তা দেয়নি- হৃদয়হরণ হাসি দিয়ে সবকিছু লুট করেছে! বোকার মতো তাকে কেবলই নিজের আত্মা ভেবেছি!

তোমরা তো সংসার করলে ১৩টা বছর?

: সংসার? হাহ! তারচেয়ে বলো দাসত্ব! আমি দাসী ছিলাম তার, স্রেফ দাসী!

বুঝলাম না-

: বোঝাপড়াটা তো আগে থেকেই ছিল। বিয়ের পরদিন, হুমম সকালেই টের পেয়ে যাই- আমি আর আমার নেই… এখানে তার ষোলআনা মালিকানা।

আমাকে কেবল রান্নাবান্না আর ঘরকন্নাতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে! আমি তার লাল নীল গোলাপী স্বপ্নমাখা সখী নইগো, সখী নই। জানো, মেয়েরা সবচে’ বেশি ঘেণ্না করে কী?

না, জানি না-

: না জানারই কথা! তুমি তো আর মেয়ে নও! সবচে’ বেশি অপছন্দের হলো- অন্যের সঙ্গে তুলনা! এ বাড়ির বড়বউ কতো স্মার্ট; কী সুন্দর তার চুলের বিনুনি, কত সুন্দর রান্না করে- আর ঘরের দিকে তাকাও, আহা যেন পুষ্পবাগিচা!

তাই?

: ওর কাছে তো আমারখিুব বেশি চাওয়া ছিল না! আমি কখনোই চাইনি রাজরাণী হতে! এই যে বললে, ১৩টা বছর পার করেছি; হ্যাঁ করেছি।   আমার কাছে তো তের হাজার বছর! এই তেরটা বছরে আমার ১৩বার জন্মদিন গেছে; কোনোদিন একটা ফুল এনে বলেছে- হ্যাপি বার্থ ডে! ১৩টা বিয়েবার্ষিকী পার হয়েছে- দিয়েছে কি একটা শাড়ি কিংবা চুড়ি কিংবা একটা ফুল? তুমি হিসেব কষে দেখো- ঈদ, পহেলা বোশেখ, পহেলা ফাগুন- কোন দিবসে আমার জন্যে একটু সময় বের করে বেরিয়েছে তার গাড়িটা নিয়ে? আমি তো চেয়েছিলাম, একদিন ঘণ্টাখানেকের জন্যে হলেও আমাকে রিকশায় নিয়ে বের হবে।  আমি স্বপ্ন দেখেছি, আমার খোঁপায় একটা গোলাপ গুঁজে বলবে- শুভ জন্মদিন!

বিয়ের পর তোমাকে স্নাতক করিয়েছে সে-

: নিজের স্বার্থে…

বুঝলাম না

: আমি শিক্ষিত হই- এটা ভালবাসার জন্যে নয়, তার স্ট্যাটাসের জন্যে নয়। কলেজে ভর্তির সময় বলে দেয়, তোমাকে চাকরি করতে হবে- সংসারের খরচ একা সামলাতে পারবো না!

তার মানে এর একটা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছিল?

: এরসাথে ছিল আমার নিজের খাওয়া পরার নিশ্চয়তা! সংসারে আমিই সবচেয়ে বেশি সার্ভিস দিয়েছি। সার্ভিস মানে শুধু বাড়ির কাজ না, নিজের উপার্জিত অর্থের প্রায় সবটুকুই সংসারে ঢালতে হয়েছে…

তবুও সবকিছু মেনে নিয়েছিলাম। আমার ভবিতব্য ভেবে, সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে…

তো নতুন করে কী হলো?

: আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। নিজের চোখকে সেইসময় অন্য কারো মনে হচ্ছিল। আমার গোটা শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে, আমি ভাবছি- দুঃস্বপ্ন, হাতে চিমটি কেটে দেখি, না ব্যথা পাচ্ছি! সে আমার বাসার কাজের মেয়ের সঙ্গে…

তৌহিদ জামান। লেখক ও সাংবাদিক। জন্ম, বাংলাদেশের যশোর জেলায় ১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল। পড়াশুনো সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত রয়েছেন প্রায় ২০ বছর। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় প্রকল্পভিত্তিক কাজ করেছেন। ছাত্রাবস্থায় প্রগতিশীল বাম ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন।...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..