নিরংশু দুপুরে ফোটা আলোমুখী ফুল

নাহিদা আশরাফী
গল্প
নিরংশু দুপুরে ফোটা আলোমুখী ফুল

আলু – তিন সের

বুটের ডাল – এক সের

লবন – এক পোয়া

হোগলা- একটা

টেংরা মাছ- তিন ভাগা

লতি- এক আটি

বাজারের এই ফর্দ দিয়েই গল্পটা শুরু করা যেত কিন্তু সমস্যা বাঁধাল  জুলিয়ানা। সে সময় চাচ্ছে আরো দু’ঘন্টা। জাহির সিদ্ধান্ত নিয়েছে জুলিয়ানাকে সে আরও দুঘন্টা সময় দেবে।  দুঘণ্টা কম সময় নয়। ততক্ষণে আমরা একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যেতে পারি।

জুলিয়ানা ব্র্যান্ডন। একজন ওজি। মেলবোর্নের ডাউন টাউনে বাইশ নাম্বার বাড়িটি ওদের। জাহিরের সাথে তার পরিচয় গোল্ড কোস্টে। গোল্ড কোস্টের সাউদার্ন ক্রস  ইউনিভারসিটিতে মাস্টার্স অব ইনডেজিনাস হেলথ এ সহপাঠী হিসেবে দু’জনের যাত্রা শুরু। সহপাঠী থেকে সহযাত্রী হতে সময় লাগেনি। জুলিয়ানার বাবা বিষয়টি সহজ ভাবে মেনে নিলেও ওর মায়ের এ বিয়েতে ঘোর আপত্তি ছিলো। বাংলাদেশ সহ সাউথ এশিয়ান কান্ট্রির ছেলেরা এদেশীয় মেয়েদের নাকি বিয়ে করে শুধুমাত্র লাইফ সেটেল করার জন্যে – এটা জুলিয়ানার মা মেয়েকে যথেষ্টই বোঝাবার চেষ্টা করেছেন। লাভ হয়নি।জুলিয়ানা জাহিরের শুধু যে হাত ধরেছে তা নয়, একেবারে বাংলাদেশে চলে এসেছে। আসবার আগে ইউটিউব দেখে শাড়ি পরা শিখেছে, তিনমাস  বাংলাভাষার কোর্স করেছে। জাহিরের সাথে সারাক্ষণ ভুলভাল বাংলা বলে জাহিরের জীবন মূলা আর তেজপাতা বানিয়ে ছেড়েছে। গভীর আবেগে বাগদত্তাকে চুমু খাবার পর জাহিরকে অসংখ্যবার শুনতে হয়েছে, ‘জি, ডন্যবাদ। ডোয়া করবেন।’ জাহিরের মায়ের পছন্দের গান কোনটি , বাবার পছন্দের রুই-টমেটো কিভাবে রান্না করতে হয় এসবের উপর মোটামুটি একটা থিসিস জুলি করে ফেলেছে।

দিনসাতেক আগে বসন্তের এক বিকেলে জুলির মা-বাবা, গুটিকয় আত্মীয়-স্বজন আর খুব কাছের কিছু পারিবারিক বন্ধুদের উপস্থিতিতে দুজনের বিয়ে হয়ে গেল। জাহিরের মা-বাবা ভিসার জটিলতায় আটকে পরলেন। ভিসা যখন পেলেন তখন আর যাবার সময় থাকলো না। কারন বিয়ের তিনদিনের মাথায় ওরাই বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে উড়াল দিয়েছে।

দুই– 

– রুকু, এই রুকু কি হয়েছে তোমার? এমন করছো কেন?

মজিদ সাহেবের ধাক্কায় ধড়মড় করে উঠে বসতে চাইলেই রুকু মানে রোকেয়া মজিদকে কাঁধে মৃদু চাপ দিয়ে শুইয়ে দিলেন সারোয়ার মজিদ।

– আস্তে রুকু। সময় নাও। এমন তাড়াহুড়ো করে উঠতে যেয়ে আরও বিপদ বাঁধিয়ে বসো না। উফ! কী যে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে। কী হয়েছিলো তোমার বলতো ?

রোকেয়া মজিদ কিছুটা সময় নিলেন। মজিদ সাহেবের বাড়িয়ে দেয়া পানির গ্লাসটা এক ঢোকে শেষ করে খালি গ্লাসটা যখন ফেরৎ দিচ্ছিলেন ঠিক তখনই মনে পরলো সব।

সকাল থেকে ছেলের পছন্দের খাবারগুলো তৈরি করেছেন, ছেলের ঘরের পুরাতন পর্দা সরিয়ে নতুন পর্দা লাগিয়েছেন, রুমটা খুব ভালোভাবে ঝেড়েমুছে যখন বিছানাটা শেষবারের মতন ঝাড় দিতে যাবেন ঠিক তখনই মাথাটা কেমন ঘুরতে শুরু করলো। মনে হলো ঘরটা কেমন বাবুই পাখির বাসার মতন দুলছে। নিজেকে সামলে নিতে গিয়েও পারলেন না। বিছানাতেই শুয়ে পড়লেন। চোখের সামনে বৃত্তাকার সব আলো-আধারের খেলা চলতে লাগলো । কেমন যেন চারদিক ঝাপসা। প্রচন্ড পানির পিপাসা বুক জুড়ে। পানি এবং সাহায্যের জন্যে কাউকে ডাকতে গিয়েই বিষয়টা টের পেলেন। কারো নাম তিনি মনে করতে পারছেন না। এক অনন্ত ঘোরে তলিয়ে যেতে লাগলেন। এরপরে আর কিছু মনে নেই তার।

এভাবে অবশ্য কতক্ষণ ছিলেন , জানা নেই রোকেয়া মজিদের। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখেন একটি উৎকণ্ঠিত মুখ তার দিকে ঝুকে আছে। মুখটি তার চেনা চেনা লাগছে কিন্তু কিছুতেই নাম মনে করতে পারছেন না। অচেনা সেই উৎকণ্ঠিত মানুষটার হাতে গ্লাসটা ফেরৎ দেবার মুহূর্তেই সব মনে পড়ে গেল । নিজের জীবনসঙ্গীটিকে  চিনতে না পারার লজ্জায় জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ।

– এবার রেস্ট নাও খানিক। আমি আসছি।

– কোথায় যাচ্ছো?

– কোথাও না। আমি আছি রুকু। তুমি একটু ঘুমাতে চেষ্টা করো।

– আমরা কখন বেরুবো?

– ওহ। ঢের সময় আছে রুকু।

– ছেলেটা এসে যদি না পায় আমাদের।

– নো মোর টক। প্লিজ চোখ বন্ধ করো।

মজিদ সাহেব স্ত্রীর মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন। রোকেয়া মজিদ বাধ্য মেয়ের মত চোখ বন্ধ করলেন। ঘুমাতে নয়; চোখ ভরে যে সুখের জল আসছিলো তা আড়াল করবার জন্যেই। এত ভালো কেন এই মানুষটা!

তিন

সারোয়ার মজিদের বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। লম্বাটে গড়ন। চাহনির ব্যক্তিত্বে আর চোয়ালের ভাঁজে ঝুলে থাকা আভিজাত্যে তাকে এখনও আলাদা করে চেনা যায়। চোখে সোনালি ফ্রেমের রিমলেস চশমাটা তার  স্বাতন্ত্রে বাড়তি উজ্জ্বলতা দিয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের চীফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত এই মানুষটির কাছে তার পরিচয় জানতে চাইলে বেশ মজা করে বলেন,’ আমি ধবলপুর নিবাসী মোসাম্মৎ সাহানা বেগমের পুত্র, ওয়ারী নিবাসী বেগম রোকেয়া মজিদের স্বামী এবং অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী জাহির মজিদের বাবা।’ এই মুহূর্তে অবশ্য তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে যথেষ্ট উৎকন্ঠায় সময় পার করছেন। ওদিকে রাত দশটায় সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তার পুত্র ও পুত্রবধূ অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফিরছেন। স্ত্রী আর একমাত্র পুত্র জাহিরকে নিয়েই তার ছোট্ট ছিমছাম সংসার। অবশ্য এই সংসার ছিমছাম সবসময়েই ছিলো কিন্তু ছোট ছিলো এমন বলা যাবে না। একসময় এই সংসার ভরা লোক ছিলো। সারোয়ার মজিদের মা-বাবা, একমাত্র ছোটবোন সবাই একই বাড়িতে থাকতেন। শ্বশুর মারা যাবার পর শাশুড়ি আর ছোট শ্যালককেও নিয়ে এলেন নিজের বাড়িতে। শাশুড়ি যথেষ্টই আপত্তি তুলেছিলেন প্রথমে। মেয়ে, বেয়াই বেয়াইন সবাইকে ফিরিয়ে  দিলেও মেয়েজামাই এর কাছে হার মেনেছিলেন। অবশেষে  স্কুল পড়ুয়া ছোট ছেলেটিকে নিয়ে তিনিও এলেন এই একান্নবর্তী পরিবারভুক্ত হতে। এসে অবশ্য ভুল করেননি। জীবনের শেষ ক’টা দিন তিনি ভুবন ভোলানো ভালোবাসায় ডুবে ছিলেন। মায়েরা মেয়ের সাজানো সংসার আর ছেলের প্রতিষ্ঠা দেখে মরতে চান। তিনি শুধু দেখে যাননি রীতিমতো তা উপভোগ করে গেছেন। এই একান্নবর্তী পরিবারকে এক সুতোয় গেঁথে রাখার অভাবনীয় ও ঈর্ষনীয় সাফল্যের সিংহভাগ দাবীদার সারোয়ার মজিদ। একজন আদর্শ সন্তান, স্নেহময় পিতা, প্রেমময় স্বামী, যোগ্য ভাই, সৎ ও  যোগ্য সরকারি কর্মকর্তা। পাড়াপড়শি ও বন্ধুদের কাছে তিনি একজন সুপার হিরো। অবশ্য প্রাকৃতিক নিয়মেই তার এই একান্নবর্তী পরিবার দিনদিন ছোট হতে লাগলো। সময়, বড় নিষ্ঠুর নিয়ামক হয়ে একেএকে দূরে সরিয়ে দিতে লাগলো পরিবারের সদস্যদের। সেই দূরত্ব কোন কোন ক্ষেত্রে পরিমাপযোগ্য আর কোন কোন ক্ষেত্রে অপরিমেয়। মা- বাবা, শাশুড়ি চলে গেলেন অজানা ভুবনে, ছোট বোনটি বিয়ের পরে পাড়ি জমাল বিদেশে, শ্যালকটি একটি নামী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।  বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। বড় এই পরিবার অবশেষে তিনজনে এসে ঠেকলো। সময়ের ছোবল তবুও থামলো না। তিনজন এসে দাঁড়ালো দু’জনে। একমাত্র ছেলেটিও স্কলারশিপ নিয়ে পাড়ি জমাল অস্ট্রেলিয়ায়। অতএব একমাত্র সঙ্গী স্ত্রীর অসুস্থতা যে তাকে উদ্বিগ্ন করবে , ভয়ার্ত করবে এটাই স্বাভাবিক।  ইদানীং প্রায়ই রুকুর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। আর বিকেলের ঘটনাটা সারোয়ার মজিদকে আরও শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে। কয়েকদিন খুব দৌড়ঝাঁপের মধ্যে যাবে যদিও তবু এর মাঝেই সময় করে রুকুকে নিয়ে চেক-আপে যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন।

চার-

কাল রাতে বউ-ছেলেকে নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় ফিরতে  ফিরতে রাত প্রায় একটা বেজে গেছে। যাবার আগে বিকেলটায় হঠাৎই অসুস্থ হয়ে কী যে এক কান্ড বাঁধাল ; ভেবেই এখন লজ্জা লাগছে রোকেয়া মজিদের। বউ-বরণের আনুষ্ঠানিকতাকেও এ কারনে সংক্ষিপ্ত করতে হয়েছে। বাবা-ছেলে মিলে অনেকটা জোর করেই তাকে রুমে নিয়ে শুইয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু শুয়ে পরলেই কি ঘুম আসবে? নানাবিধ দুশ্চিন্তা আর উৎকন্ঠায় বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিলো। জুলি সবার সাথে কেমন আচরণ করে, জুলিকেও বা সবাই কিভাবে নেয় এসব নিয়ে ভাবনার অন্ত ছিলো না তার। এম্নিতেই কতজন কত কথা বলছে। মজিদ সাহেব এত ভালো মানুষ  অথচ ছেলেটা এ কী কাজ করলো।  গতকাল, একজন তো জিজ্ঞেস করেই বসলো, ‘ভাবী , ছেলেবউ কি মুসলমান হয়েছে নাকি এখনও তার ধর্মেই আছে? ‘

চারপাশের এত নেতিবাচক মানুষগুলোকে দুজন মিলে সামলাতে পারবেন তো? অবশ্য জাহিরের বাবা অসম্ভব ধীরস্থির আর ঠান্ডা মেজাজের মানুষ। চট করে রেগে যাওয়া, বাঁকা কথায় মেজাজ তিরিক্ষি করার মানুষ তিনি নন। তবুও ভাবনা হয়। বয়স হয়েছে তো। সারাজীবন একরকম প্রেম দিয়ে, সেবা দিয়ে, পরিচর্যা দিয়ে পরিবারটিকে আগলে রেখেছেন। ছেলে বিদেশী বউ ঘরে আনবে জেনে রোকেয়া মজিদ দু’দিন কিচ্ছু মুখে তোলেননি। কেঁদেকেটে বুক ভাসিয়েছেন। নিজের জন্যে তার যতটা না কষ্ট লেগেছে তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছে জাহিরের বাবার জন্যে। মানুষটার মুখের দিকে তাকাতে তার বুক ভেঙে যাচ্ছিলো। অথচ লোকটা কী আশ্চর্য নিরুদ্বেগ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তৃতীয় দিন অফিস থেকে ফিরে চায়ের কথা বলে রুকুকে নিয়ে বারান্দায় বসলেন।

– জাহিরের বিয়ে নিয়ে তুমি কি খুব আশাহত?

– তুমি নও?

– প্রশ্নের উত্তর প্রশ্ন দিয়ে হয় না রুকু।

– ভেবেছিলাম নিজে দেখে শুনে পছন্দ করে বিয়ে দেবো ছেলেটার। কত ভালো ভালো মেয়ে ছিলো।

– তারা যে ভালো হবে আর এই মেয়ে যে খারাপ হবে তা কি করে বুঝলে ?

– না তা নয়। যে ছেলে ক’দিন আগ পর্যন্ত নিজের হাতে খেতো না, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে যখন তখনও আমার হাত ধরে হেটেছে, সে আজ অন্যের হাত ধরার আগে একটিবার আমাদের মতামত পর্যন্ত নিলো না?

কথা শেষ হবার আগেই রোকেয়া মজিদের চোখ ভরে জল এলো।

মজিদ সাহেব বুঝতে পেরে স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখলেন। সেই হাত চুইয়ে রোকেয়ার কাঁধে প্রেম ও স্নেহের এক মিশ্রিত ফল্গুপ্রবাহ নেমে আসতে লাগলো।

– রুকু, মানুষকে সবসময়ে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দেয় কে, জানো ?

রোকেয়ার চোখের কোণের জলে এবার  এক প্রশ্ন সাতার কাটে।

-মানুষের মন। কোন এক বিচিত্র কারনে সে যে কোন ঘটনার উৎসমূল থেকে প্রথমেই কিছু নেতিবাচক উপাত্ত খুঁজে বের করবে। তারপর সেই পথ ধরেই নিজের মত বিশ্লেষণ দাড় করাবে। এবার নেতিবাচক চিন্তা থেকে দাড় করানো বিশ্লেষণের কাল্পনিক ভয়াবহতা ভেবে নিজেই আবার অহেতুক চিন্তিত হবে। এই মুহূর্তে তুমি তাই করছো রুকু। অন্যের মতামতের স্রোতে নিজের আত্মবিশ্বাস ডুবিয়ে দিও না। মেয়েটিকে নিজের মতন করে দেখো, ভালোবাসো। দেখো সে তোমার ভালোবাসার প্রতিদান দেয় কিনা।

– যদি না দেয়।

ফিক করে হেসে ফেলেন মজিদ। আর এই হাসিটা মুহূর্তেই মন ভালো করে দেয় রোকেয়া মজিদের।

পাঁচ-

আজ জাহিরের বৌভাত। বৌভাত দিন দশেক দেরী করেই করতে হলো। জাহিরের একমাত্র ফুপু এসেছেন কানাডা থেকে । মূলত তার জন্যেই এই অপেক্ষা । সকাল থেকেই জুলির উচ্ছ্বাস দেখার মত। হাতে মেহেদী দেবার পর থেকে ফর্সা মুখে খুশীর আলো জ্বলছে যেন। দুহাত উচু করে এঘর থেকে ওঘর করছে। ছেলের বউয়ের এই আনন্দকে দুচোখ ভরে উপভোগ করছেন রোকেয়া মজিদ। এই দশ দিনে জুলি তার শাশুড়ির মনের মেঘ অনেকটাই কাটিয়ে দিয়েছে।  নাহ,  যেমন ভেবেছিলো তেমন তো নয় মেয়েটি। প্রথম দিনই বিশুদ্ধ বাংলায় মা-বাবা ডেকে, অসুস্থ শাশুড়ির সেবা করে ওদের মন জয় করে নিয়েছে। তার উপর মুরুব্বী আত্মীয়-স্বজনকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে, সবার সাথে হাসিখুশী ব্যবহার করে নিজেকে  দারুণভাবে উৎরে নিয়েছে । কে বলবে সে বাঙালি নয়? রোকেয়া বেশি অবাক হয়েছে বাঙালি রান্নায় ওর আগ্রহ দেখে। পায়েস রান্না করে, শ্বশুরের পছন্দের রুই-টমেটো রান্না করে শাশুড়িকে বেশ অবাকই করে দিয়েছে জুলি । এরপর এক সন্ধ্যায় ভরা মজলিসে চা বানিয়ে এনে যখন গেয়ে উঠলো, ‘আমি তোমার প্রেমে হবো সবার কলঙ্কভাগী… ‘ তখন ঢলো ঢলো জোছনার চোখেও পরোপরো জলের নুড়ি। জুলির প্রতি রোকেয়া মজিদের অপত্য স্নেহের দরজাটা কেউ যেন এক ধাক্কায় পুরোটা খুলে দিয়েছে। মজিদ সাহেব সব কিছু নীরবে দেখেন আর হাসেন। সে হাসিতে তৃপ্তির সাথে আরো কিছু খেলা করে।

রোকেয়া মজিদ অবাক হয়ে ভাবে এত সুখ বিধাতা তার জন্যে বরাদ্দ রেখেছিলেন ! এতদিন যারা বিয়ে নিয়ে আশংকা আর উৎকন্ঠার বীজে জলসেচ দিয়েছে এখন তারাই আবার অন্য সুরে গান ধরেছে। জাহিরের বাবার কথাই আসলে সত্যি। মানুষের মন বড় অদ্ভুত। চিন্তার বিশালতায় নিজেকে হারাতে ভয় পায়।

ছয়-

মুহূর্ত কি জানে তার গতিপথ? জানে না বোধহয়। জানলে চোরাগোপ্তা হামলার আগেই সে উল্টে দিতো গতি,পাল্টে নিতো পথ। যে পথে হাওয়ার গায়ে আলোর চাদর ওড়ে, যে পথে সুখের শরীর বেয়ে স্বস্তির ফোটা চুইয়ে পড়ে স্নান থেকে সদ্য বেড়িয়ে আসা কোন কিশোরীর ভেজা চুলের মতন; সে পথেই থেমে যেত মুহূর্ত। কিন্তু থামে কই? আজকের এই যে সকাল যে সকালটা তিনটি গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেও আলো ছড়াতে পারছে না, যে সকালের বাতাসও সিগনালে আটকে পড়া গাড়ির মতন আচমকা ব্রেক কষে থামিয়ে দিয়েছে নিজেকে সেই সকালের আগমন খুব কি জরুরী ছিলো? এসব প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? বাবার গম্ভীর মুখ, মায়ের শীতল কঠিন চাহনি। জাহির আর নিতে পারছে না। রাত পার হয়েছে কি হয়নি জাহিরের ডাক পড়েছে মা-বাবার রুমে। কিছুই মাথায় ঢুকছে না তার। কী এমন হলো যার কারনে মা বৌভাতের আয়োজন শেষ হতে না হতেই কাউকে কিচ্ছু না বলে ফ্ল্যাটে ফিরে এসেছিলো? সব তো কেমন দখিনা হাওয়ার মত ছিলো। প্রবল ঝড় আর জলোচ্ছ্বাসকে সে আর বাবা মিলে বেশ শক্ত আর দক্ষ হাতেই সামলাতে পেরেছে এমনটিই ধারণা ছিলো জাহিরের। কিন্তু সমস্যাটা কোথায় বাধলো?

– মা, কি হয়েছে বলবে। বাবা, তুমিই বলো না কি হয়েছে? সব তো সুন্দরভাবেই চলছিলো। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমাকে আর টেনশনে রেখো না প্লিজ।

রোকেয়া মজিদ খুব সোজাসুজি আর স্পষ্টভাবে ছেলের দিকে চাইলেন।

– জুলির মা-বাবার পরিচয় কি?

জাহির মুহূর্তের জন্যে থেমে গেল। এই প্রশ্নটি মা’র মুখ থেকে ইথারে ইথারে ভেসে বেড়ালেই ভালো ছিলো। কেন এলো তার কান অবধি? এ প্রশ্ন তো সে শুনতে চায়নি মায়ের মুখ থেকে। তার জানা উত্তর এক তীব্র প্রশ্নের ভয়াবহতা এড়াতে পারছে না। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সব। খুব অসহায় ভঙ্গীতে বাবার দিকে তাকালো জাহির।

– বাবা, প্লিজ

– রুকু, তুমি শান্ত হয়ে বসো। সব জানবে তুমি। তোমায় না জানানোর অভিসন্ধিতে নয় বরং তোমার অসুস্থতা আর একটা আয়োজনকে মাথায় রেখে আমরা চেয়েছি সবকিছু মিটে গেলে তারপর তোমায় বিষয়টি জানাবো। আমি খুলে বলছি তোমায় সব। প্লিজ রুকু, বাড়ি ভর্তি গেস্ট। এদের সামনে কোন সিন ক্রিয়েট হলে তা আমাদেরই অসম্মান।

রোকেয়া মজিদের বিস্ফোরিত চোখ সারোয়ার মজিদকে দেখছে। এই মজিদকে সে চেনে না। এই মজিদকে সে জানে না। যে মানুষটি অফিসের খুঁটিনাটি গল্প থেকে শুরু করে এমন কোন কথা নেই যা তার সাথে শেয়ার করে না সেই মানুষ কিনা এত বড় সত্য কত অবলীলায় লুকিয়ে রেখেছে। বিস্ময়, অবিশ্বাস, রাগ, ক্ষোভ, অভিমান মিলেমিশে এক অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে সে তাকিয়ে আছে মানুষটির দিকে। মুখ থেকে অস্ফুটে একটি শব্দই বেড়িয়ে এলো।

– তুমি!!!

সারোয়ার মজিদ আস্তে করে স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখলেন

– হ্যা রুকু আমি। সব সত্যিকে সবসময় সামনে আনতে নেই। যে সত্যিকে আশ্রয় করলে জীবন ডুবে যায় সে সত্যি নাই বা সামনে এলো।

রোকেয়া মজিদ কি সব বিড়বিড় করতে করতে বিছানায় বসে পড়লেন। প্রশ্নের চেয়েও এক অপার বিস্ময় খেলা করে রোকেয়া মজিদের চোখে। এই বেদনাহত বিস্ময় নিয়ে তিনি কতক্ষণ বসে ছিলো তার জানা নেই। পাশের ঘরে জাহির আর জুলি, দুটি মানুষ যেন কথা ভুলে গেছে । এ ঘরে রোকেয়া মজিদ আর সারোয়ার মজিদ যেন হঠাৎ করেই চিনতে পারছেন না একে অপরকে। বাগানের সবচেয়ে সুন্দর গাছটার কোটর থেকে যখন সাপ বেড়িয়ে আসে তখন তার সৌন্দর্য ছাপিয়ে যেমন ভয় কাজ করে, রোকেয়ার  মনে হতে লাগলো তার ছোট্ট সাজানো সংসার থেকে তেমনি এক সাপ বেড়িয়ে এসে প্রত্যেকটি মানুষকে ছোবল দিয়ে নিষ্প্রাণ করে রেখেছে।

সাত-

টানা একুশ দিন বিছানায় রোকেয়া মজিদ। এর মধ্যে কারো সাথেই তেমন কোন কথা বলেননি। জাহির এবং সারোয়ার মজিদের সাথে তো মোটেই না। আত্মীয়স্বজনরাও যার যার গন্তব্যে ফিরে গেছে এরই মধ্যে। আজ অনেক দিন পর তিনি উঠে বসলেন। স্বামী আর একমাত্র সন্তানকে ডেকে পাঠালেন তার ঘরে । রোকেয়া মজিদ কঠিন আর অনড় এক সিদ্ধান্ত জানাতে চান ।  আবারো এ ঘরের আলো আর বাতাস থমকে আছে। ওরাও শুনতে চায় সেই অটল অনড় সিদ্ধান্ত।

– জাহির, আমি তোমার মা। সব মায়ের মত আমারো স্বপ্ন ছিলো তোমাকে নিয়ে। সেই স্বপ্নকে সত্যি করতে গিয়ে আমার নিজের অনেক স্বপ্নকে বিসর্জনের চিতায় তুলতে হয়েছে। ভেবোনা এ জন্যে আমি আলাদা করে কোন ক্রেডিট চাইছি। আমি এখনও বিশ্বাস করি দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বাঙালি প্রতিটি বাবা-মা তাদের সন্তানের জন্যে যতখানি স্যাক্রিফাইস করে তা বিশ্বের অনেক দেশের বাবা-মায়েরা ভাবতেও পারেন না। আমি তোমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছি, বিদেশে হায়ার এডুকেশনের জন্যে পাঠিয়েছি, শত অনিচ্ছার পরও তোমার ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে বিদেশী, বিধর্মী এক মেয়েকে বিয়ে করার অনুমতিও দিয়েছি। এসব করেছি আমি তোমার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে। কারন তার শ্রম,ত্যাগ, ভালোবাসা আর প্রগাঢ় যত্নে গড়া এই ছোট্ট পৃথিবীর কোথাও কোন কষ্টের আঁচড় পরুক তা আমি চাইনি। কিন্তু আমি বোধহয় পারিনি। আমি হেরে গেছি। কোন জন্ম পরিচয়হীন মেয়েকে ছেলের বৌ হিসেবে মেনে নেয়া আমার জন্যে অন্তত সম্ভব নয়। এতটা উদার আমি হতে পারবো না। তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে আজই এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে।

– মা !!!

– আমার কথা শেষ হয়নি জাহির। আজকের পর থেকে তুমি আমার সাথে আর যোগাযোগ না রাখলেই আমি খুশি হবো। যে ক’টা দিন বাঁচবো আমি ধরে নেবো আমার কোন ছেলে নেই।

জাহির চিৎকার দিয়ে মায়ের পা জড়িয়ে ধরে। ‘প্লিজ মা যত খুশি শাস্তি দাও, আমায় মারো,বকো কিন্তু এই শাস্তি দিও না। আমি মরে যাবো মা। সারাজীবন আমি তোমার অবাধ্য হইনি। শুধু একটা ভুলের জন্যে আমাকে পর করে দিও না মা। মা, মাগো এরচেয়ে নিজ হাতে মেরে ফেলো তুমি আমাকে।…

অবুঝ বাচ্চার মত কাঁদছে জাহির। এ দৃশ্য দাঁড়িয়ে সহ্য করা সারোয়ার মজিদের পক্ষে সম্ভব  না। দুহাত বাড়িয়ে জাহিরকে টেনে তুললেন  তিনি।

-তুমি কোন ভুল করোনি বাবা।

বাক্যটি উচ্চারণের সাথে সাথে ভুতগ্রস্তের মত রোকেয়া মজিদ তার স্বামীর দিকে চাইলেন। সারোয়ার মজিদ সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করেই জুলিকে ডাকলেন। এত কিছু যাকে নিয়ে তার দিকে তাকালে সহজেই যে কেউ বুঝতে পারবে এক নিষ্প্রভ, নিষ্প্রাণ দেহ কোন এক অদৃশ্য সুতোর টানে চলাফেরা করছে।

– জুলি, জাহিরকে নিয়ে পাশের ঘরে যাও। আমি না বলা পর্যন্ত ওর কাছ থেকে তুমি নড়বে না। ক্লিয়ার?

জাহির তখন পাগলের মত বাবাকে জড়িয়ে আশ্রয় খুঁজছে। শক্ত হাতে জাহিরকে সামলে পাশের ঘরে পাঠালেন।  তীব্র চোখে তাকালেন স্ত্রীর দিকে।

– তুমি সিদ্ধান্ত বদলাও রুকু। এমন কথা তুমি ফিরিয়ে নাও।

– না। আমি আমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছি। কোনদিন তোমার কোন কথার অবাধ্য হইনি আমি। আজ বাধ্য হচ্ছি অবাধ্য হতে।

– স্রেফ জন্ম-পরিচয়হীনতার কারনে মেয়েটিকে তুমি অস্বীকার করছো রুকু? তার আচার, ব্যাবহার ,তার ভালোবাসা, সেবা, আন্তরিকতার কোন মূল্য নেই।

– এসব সাময়িক। মন-ভোলানো…

– কি করে বুঝলে?

– রক্তকে এড়ানো যায় না। শিকড়কে এত সহজে উপড়ে ফেলবে কি দিয়ে?

– তাই! একটা তাচ্ছিল্যের হাসি খেলে গেলো সারোয়ার মজিদের ঠোঁটের কোনায়। তবু মজিদ সাহেব শেষ বারের মত চেষ্টা করলেন।

– রুকু। প্লিজ আমাদের সাজানো এই ছোট্ট পৃথিবীকে তুমি তছনছ করে দিও না। এক তীব্র অসহনীয় সত্যিকে তুমি খুঁচিয়ে সামনে এনো না।

– তুমি ওদের যেতে বলবে কিনা বলো। এখুনি চলে যেতে বলো ওদের। এখুনি। ওরা না যাওয়া পর্যন্ত আমি পানিও স্পর্শ করবো না।

– রুকু।

থমকে গেলেন রোকেয়া মজিদ। এমন গর্জন সে আগে কোনদিন শোনেনি।

আট-

আর দেরী করাটা বোকামো হবে। এক মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিলেন সারোয়ার মজিদ । এ সংসার বাঁচাতে হবে,জাহির জুলিকে বাঁচাতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা রোকেয়াকে এক চরম ভুল সিদ্ধান্তের দায়ভার থেকে বাঁচাতে হবে। আলমারির তালাবন্ধ দেরাজ থেকেএকটি ব্রিফকেস টেনে বের করলেন । ব্রিফকেসটি গতকালই এনে রেখেছিলেন অফিসের নিজস্ব কেবিনেট থেকে। মজিদ সাহেবের দূরদৃষ্টি জানান দিচ্ছিলো এটির খুব প্রয়োজন এখন তার। ব্রিফকেস থেকে একটি সাদা খাম বের করে এগিয়ে দিলেন স্ত্রীর দিকে।

-রুকু, যদি জন্মপরিচয়ের কারনেই এ সংসার থেকে জুলিকে চলে যেতে হয়, জাহিরকে তার মা হারাতে হয় তাহলে আরো অনেককেই এ সংসার থেকে বিদায় নিতে হবে । চিঠিটা পড়ো। তারপর তুমি তোমার সিদ্ধান্ত নাও।

হতবিহ্বল রোকেয়া মজিদ একবার চিঠির দিকে একবার সারোয়ার মজিদের দিকে তাকান। নিজের কানকেও এখন আর বিশ্বস্ত মনে হচ্ছে না তার। কি শুনছেন তিনি? কাকে চলে যেতে হবে? কেনই বা চলে যেতে হবে ? চিঠিটা খুব সাবধানে খুলে পড়তে শুরু করলেন তিনি।

নয়-

মা,

চিঠি না লিখে চেয়েছিলাম তোকে সব খুলে বলবো।হয়তো সেটাই ভালো হতো। কিন্তু যতবারই বলতে চেয়েছি ততবারই জীবনানন্দের কবিতার মত এক বোধ জড়িয়ে ধরেছে। যেখানে রাগ নেই, ক্ষোভ নেই,দ্বিধা নেই, শঙ্কা নেই আছে শুধু বিস্মরণের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু কেন? কেন আমি ভুলে যেতে চাই দিন থেকে পালিয়ে আসা এক খন্ড দুপুরকে। সেই দুপুর,যে অন্ধকারের ছুড়ি দিয়ে তীব্রভাবে আমার আমিত্বকে টুকরো করছে প্রতিনিয়ত । যে আলোর আশ্বাসে অবুঝ উইপোকা বাতাসের সখ্যতা পিছু ফেলে শুধু উড়বার আনন্দে মৃত্যুকে বরণ করে, আমিও তেমন এক অন্ধ আলোর নেশায় সব প্রিয়জনদের মমতাকে উপেক্ষা করে ভালোবাসায় বিশ্বাস বুনেছিলাম।

সময়টা ১৯৭১ সাল। আমি তখন সবে পনেরোয়; বাহাদুরপুর গার্লস স্কুলের দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া। রংগশ্রী ইউনিয়নের দুধালমৌ গ্রামে আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা। বাবা প্রাইমারী স্কুল শিক্ষক। দাদা কৃষিকাজের পাশাপাশি বাকেরগঞ্জ বাজারে একটি হোটেলও দিয়েছিলেন। আমাদের গ্রাম থেকে সাঁকো পেরুলেই বাজার। বাবা স্কুল সেরে হোটেলে বসতেন।একে একে জড়ো হতেন বাবার সব বন্ধুরা। ইউসুফ কাকা, বাকেরগঞ্জ থানার কর্মকর্তা খালেক খান,বাবার আর আমার স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক। বিকেল হলেই জমিয়ে আড্ডা হতো আমাদের হোটেলে। আমি সবার চোখেই বাবার ছোট্ট মেয়েটি। স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে দু’টো মুখে দিয়েই দৌড়ে হোটেলে যেতাম। বাবা কাকুদের দেখতাম কী সব রাজনীতির আলাপে ব্যস্ত। আমি মাঝেমধ্যে তাদের চা বানিয়ে খাওয়াতাম।

হয়তো অবাক হচ্ছিস আমার এসব লেখায়। তাই না? তুই তো জানিস তোর নানাবাড়ি ঢাকায়। এখন এসব কোত্থেকে এলো। এসব ইতিহাস সব আমার ডায়রিতে লেখা আছে মা। সময় নিয়ে পড়ে নিস। আমি শুধু একটা দুপুরের গল্প তোকে শোনাতে চাই। যে দুপুর পালটে দিয়েছিলো আমাকে। আমার মতন এক অখ্যাত মেয়ের ভাবনার বিভূতিরেখা , সম্পর্কের ছাউনি, ভালোবাসার মেঘধনু  জীবনের চোরাবালিতে আটকে পড়ে কি করে এক অন্য রূপ পেলো আজ সেই গল্পটুকু তোকে শোনাতে চাই।

ইউসুফ চাচার বড় ছেলে বরিশাল কলেজে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করতো। তার প্রতি এক মন ভোলানো দখিন হাওয়ার টান আমার কিশোরী মনকে উতলা করতো বটে কিন্তু এটাকে ঠিক ভালোবাসা বলা যায় কিনা তা তলিয়ে দেখবার সাহস তখনও হয়ে ওঠেনি। দু’তিন সপ্তাহ পরপর স্কুল ফিরতি পথে হঠাৎ এক আধবার দেখা হতো। আমাকে দেখেও দেখতো না। সেটা কি না দেখার ইচ্ছেতে,  নাকি দেখেও তা না দেখানোর ইচ্ছেতে ঠিক বুঝে উঠতে পারতাম না।

আপন ধ্যানে নিমগ্ন এক নিবিড় পাহাড় যেন।

বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণের পর দুধালমৌ সমাজকল্যাণ ক্লাবের মাঠে বাঁশের লাঠি হাতে শপথ নেয় প্রায় জনা পঞ্চাশেক সদস্য। ২২ মার্চ পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হলো। কী উত্তেজনা চারদিকে ! দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে যুদ্ধের বিভীষিকা। ইউসুফ কাকা সহ আরো অনেকেই ট্রেনিং নিতে পাড়ি জমান ভারতে। বাবা নির্বিকার। স্কুলে যান, বিকেলে হোটেলে  যান। মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেবার কোন আগ্রহই যেন তার নেই। আমার হোটেলে যাওয়া বন্ধ। প্রতি রাতেই গোলাগুলির শব্দ কানে আসতো আর মা তখন আমায় নিয়ে গোয়ালঘরের মাটিতে করা গর্তে লুকিয়ে পড়তো। বাবার উপর তখন খুব রাগ হতো। বাবা কেন যুদ্ধে যায় না?

এক রাতে আমি আমার জবাব পেয়ে গেলাম। আমার শান্তশিষ্ট বাবাকে কে বা কারা ধরে নিয়ে গেছে। মা আর আমাকে তন্নতন্ন করেও খুঁজে পায়নি ওরা। বাবা বিপদ বুঝে আমাদের আগেই সরিয়ে দিয়েছিলেন। বাবা নাকি জানেন মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুকিয়ে রাখে। এমনকি মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় আত্মগোপন করে তাও নাকি বাবা জানতেন। মূলত মুক্তিযোদ্ধাদের সংবাদ আদানপ্রদানের সাংকেতিক ভাষার আবিস্কারকও নাকি বাবা। খবর পেয়ে মা ঘনঘন মূর্ছা যেতে লাগলেন।

পরদিন পাক হানাদার বাহিনী আমাদের হোটেলের মেঝে খুঁড়ে অনেকগুলো রাইফেল পেয়েছিল। রাজাকার আল-বদরের সহায়তায় আমাদের বাড়ি, হোটেল সব জ্বালিয়ে দেয়া হলো। বিশ্বাস কর মা, সেদিন কষ্টের সাথে সাথে এই ভেবে গর্ব হচ্ছিলো যে আমার বাবা একজন নীরব মুক্তিযোদ্ধা।

বাবাকে বরিশাল ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এই খবর কানে আসতেই মা পাগলের মত বরিশাল ছুটে যেতে চাইলেন। কিন্তু চাইলেই তো সম্ভব নয়। চারদিকে বিপদ ওৎ পেতে আছে। মায়ের পাগলামী দিনেদিনে বাড়তেই থাকে। আমার শুধু ভয় হতো মাকে হারালে আমি কার কাছে যাবো । এক দুপুরে মামা বাড়ির আম বাগানে দাঁড়িয়ে এসব কথাই ভাবছিলাম। একমাস বাবার কোন খবর নেই। আমাদের চোখের জলও কাঁদতে কাঁদতে শুকিয়ে গেছে ততদিনে। হঠাৎ বাঁশবনের ফাঁকে তাকিয়ে দেখি এক জোড়া চোখ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমায় দেখছে। আমি চমকে উঠলাম। কে? কে ওখানে? আমায় ইশারা দিয়ে চুপ থাকতে বলে খুব সন্তর্পণে আমার মুখোমুখি দাঁড়ালো। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ইউসুফ কাকার ছেলে হাবীব এখানে এলো কি করে? যে মানুষটা কোনদিন আমার মুখের দিকে সরাসরি তাকায়নি সে আজ আমার নিশ্বাসের দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে।

-কেমন আছো শেফালী?

আমি মাথা নীচু করে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকি।আমার চোখ ভেঙে শ্রাবণ নামে।

মনে হলো কতদিন পর আমি আপন কাউকে দেখিছি। পরম মমতায় আমার চোখের জল মুছে দিলো সে।

– শুনলাম, চাচা মিয়াকে নাকি ওরা ধরে নিয়ে গেছে? আহা এই নিরীহ মানুষটাকে কেন…

– বাবা কোথায় আছে। কিছু জানেন?

– হ্যা জানি। জানি বলেই তো তোমাকে খুঁজে খুঁজে বের করলাম। চারদিকে রাজাকার, পাকিস্তানী সৈন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। খুব সাবধানে থেকো। আর তুমি যদি থানায় গিয়ে খালেক চাচার সাথে দেখা করে খালাম্মার অসুস্থতার কথা খুলে বলতে পারো তাহলে চাচা হয়তো তোমার বাবার জন্যে সুপারিশ করতে পারে। চাচা জানেন তোমার বাবার খবর।

– সত্যি ! খালেক চাচা জানেন বাবার খবর? আমি যেতে চাই চাচার কাছে ।আমায় নিয়ে চলুন। আমি একবার দেখতে চাই আমার বীর বাবাকে। তাছাড়া বাবার খবর না পেলে মাকেও বাঁচানো যাবে না। কিন্তু মামারা জানতে পারলে আমায় যে বের হতে দেবে না।

– সে তুমি ভেবোনা। তুমি যদি যেতে চাও আমি গোপনে এসে তোমায় নিয়ে যাবো। কিন্তু আমার কথা বাড়িতে কাউকে বলতে যেও না যেন। তোমার উপকার করতে গিয়ে আবার আমিই না বিপদে পড়ি।

– না না। সে আমি কখনই করবো না।

– ঠিক আছে তাহলে অই কথাই রইলো। কাল দুপুরে আমি এসে তোমায় নিয়ে যাবো খালেক চাচার কাছে। তারপর তোমার বাবার কাছে।

আহারে আমার বাবা। বুকের মধ্যে এক সমুদ্র হাহাকারের নাম। কতটা ভালবাসি তোমাকে তা কী করে বোঝাব? তোমার এতটুকু খবরের আশায় চাতকের মত তৃষ্ণা নিয়ে অপেক্ষায় থাকি। দূরদূর থেকে ভেসে আসা তোমার সামান্যতম খবরও বিশ্বাসের খড়কুটোতে আশার  উত্তাপ ছড়ায়। একবার তোমার বেঁচে থাকবার খবরটা এনে মা’কে দিতে পারলে মায়ের প্রানটাও অন্তত ঠান্ডা হতো। সারারাত দুচোখ এক করতে পারিনি। ভোর রাতে সিদ্ধান্ত নিলাম আমি যাবো। আমাকে যেতেই হবে। সাথে হাবীব ভাই আছেন। যার কাছে যাচ্ছি মানে খালেক চাচা; আমার বাবার মতনই আমায় স্নেহ করেন। তিনি নিশ্চই বাবার খবর দেবেন আমাকে।

দুপুরের আগেই বাড়ির পিছনের বাঁশবনে চলে এলাম। মা’কে বলেছি পাশের বাড়ির সালমার কাছে যাচ্ছি।

অপেক্ষার কাল বড় দীর্ঘ। অবশেষে সে এলো। তাকে দেখেই মন শান্ত হলো। খুব শক্ত করে হাত ধরতেই আমি বোধহয় কিছুটা কেঁপে উঠলাম। সেই কম্পন মূলত কেন হয়েছিলো সেসময় তা অনুভব বা অনুধাবনের অবস্থা বোধকরি ছিলো না। আমার সমগ্র চেতনায় তখন বাবা।

আমার অবশ্য পৌছুতে কোনই সমস্যা হয়নি। একেবারেই না। পথের আতঙ্ক ছিলো বটে কিন্তু সঙ্গীর উপর নির্ভরতা আর গন্তব্য স্থানের বিশ্বস্ততায় তা একেবারেই  মনোযোগে পোক্ত আসন গাড়তে পারেনি। কিন্তু বাবাকে খুঁজতে যাওয়া অই পনেরো বছরের কিশোরী কি তখনও জানতো তার বিশ্বাসের দেয়ালের নীচে কত বড় উইপোকার আবাস। এত কুৎসিত ফাঁদ যে সে কখনই দেখেনি।  চিৎকারের ভাষা আমি ভুলে গিয়েছিলাম, বিস্ময়ের ভাজে জমা ছারপোকা আমার আত্মার বিশ্বাসটুকু শুষে নেবার পরও আমি নির্বাক ছিলাম। এ কোন হাবীব আমার সামনে ? একে তো আমি চিনি না। জানি না। নরকের কীটের মত আমার শরীর খুবলে নিতে নিতে কী বীভৎস উল্লাসে চিৎকার করছে, ‘খানকী মাগি। তোর বাপের জন্যে আমার বাপটাও জাহান্নামের পথ বেছে নিছে। তোদের একটারেও ছাড়ুবো না। একটারেও না।’ তখন আমার শুধুই মনে হতে লাগলো আমি কোন ভুল স্বপ্নে বাগান গড়েছি। কোন মিথ্যের নদীতে ডুব দিতে পথে নেমেছি এই দুপুরকে সাক্ষী করে।

পিতৃজ্ঞান করা সেই খালেক চাচার বিকৃত হাসি, শরীরময় ঘুরে বেড়ানো তার কদর্য হাত, বাকেরগঞ্জ আর্মি ক্যাম্পে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পাকিস্তানী কুকুরগুলোর হিংস্র উন্মত্ত থাবা আমাকে ভুলিয়ে দিতো আমি কে, কেনই বা এখানে। মিথ্যের বৃত্তে আটকে পরা সময়ের নারকীয় অত্যাচার শব্দে  আর বাক্যে কতটুকুই বা ফুটিয়ে তোলা যায়, বল।

অবশেষে ভোর এলো আলো নিয়ে। ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানী হানাদারদের হাত থেকে বাকেরগঞ্জ মুক্ত হলো। ততদিনে খবর পেয়েছি , মাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে হায়েনার দল। মামাবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। পুনর্বাসন ক্যাম্পে থেকে বিস্ময়ে নিজেকে প্রশ্ন করেছি কেন বেঁচে আছি আমি? আর কি প্রয়োজনে? প্রকৃতির আর কী কী নিষ্ঠুরতা আমার জন্যে এখনও বরাদ্দ আছে?

এক সকালে শেফালি ডাকে চমকে উঠলাম। এ নাম যেন কোথায় শুনেছি। ও হ্যা এ তো আমারই নাম। কে ডাকছে এ নামে এতদিন পরে? দেখলাম একটা সুঠাম হাত। আমার নোংরা, পচা-গলা জীবনকে আবার জোর করে দাঁড়াতে বাধ্য করলো। সে আর কেউ নয়। তোমাদের বাবা। আমাদের স্কুলের বাংলার শিক্ষক মজিবুর স্যারের ছেলে বিজয়। বি এ তে দুবার ফেল করে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে দিয়ে যে বাজারে বইয়ের দোকান দিয়েছিলো। যার দিকে ফিরে তাকাবার বা মনযোগী হবার কোন উপযুক্ত কারন কখনই ছিলো না। সেই মানুষটা আলো হাতে এলো অন্ধকার তাড়াতে। স্রেফ যাবার কোন জায়গা ছিলো না বলেই তার হাত ধরেছিলাম। সেই ধরায় কোন আবেগ উচ্ছ্বাস বা নির্ভরতা তো দুরের কথা কিছুমাত্র ইচ্ছেও আমি কোথাও খুঁজে পাইনি। কেবলি মনে হতো বেঁচে থাকার গ্লানি টানতে টানতে জীবন আমায় যেথায় খুশি নিয়ে যাক। স্রোতের শ্যাওলার ঘাট খুঁজতে নেই।

বিজয়ের সাথে ঢাকায় পাড়ি জমালাম। পুরানো ঢাকায় এক কামড়ার সংসার শুরু হলো আমাদের। এক সপ্তাহের মাথায় আমার শরীরে আরেকটা জীবনের অস্তিত্ব টের পেলাম। আজ বলতে দ্বিধা নেই সে রাতেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এবার আর বাঁচবার কোন মানে হয় না। আমার জীবনের দুর্বিপাক কেন আরেকটি জীবন বয়ে বেড়াবে? সারাটা জীবন আমার বাচ্চাটাকে একটা যুদ্ধশিশুর নামাবলি গায়ে দিয়ে বেড়াতে হবে। এ পঙ্কিল সমাজ তার কদর্যরূপ নিয়ে আমার সন্তানকে অক্টোপাসের মত পেঁচিয়ে রাখবে আর ও সবার উপহাস, অবহেলা আর অবজ্ঞার বাতাসে নিশ্বাস নেবে । মা হয়ে তা কি করে মেনে নেবো আমি? আর বিজয়? সেই বা এটা মানবে কেন? কিন্তু আমার ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে বিজয় তার পিতৃ পরিচয়ে বড় করে তুললো তোকে। তোর প্রতি কোন অবহেলা হতে পারে ভেবে অনেকদিন সে আমার কাছে দ্বিতীয় কোন সন্তানও দাবী করেনি। তোর জন্মের প্রায় তেরো বছর পর তোর ভাইয়ের জন্ম।

আমি আর তোর বাবা তোকে কোথাও , কখনও ছোট হতে  দেইনিরে মা । তাই মজিদের সাথে তোর বিয়ের সময়ও সত্যিটা ওকে জানিয়েছি। কোন মিথ্যের আশ্রয়ে তুই জীবন সাজাবি কেন? মানুষ তার জন্মের জন্যে কোনভাবেই দায়ী নয়। দায়ী তার কর্মে ও মর্মে।

এই চিঠি কোনদিন তোর কাছে পৌঁছুবে কিনা জানিনা। বিধাতার কাছে প্রার্থনা ঘরে ঘরে তোর বাবা আর মজিদের মত ছেলে জন্মাক। যাদের কাছে মনুষ্যত্বই শেষ কথা। জন্ম বা বংশপরিচয় নয়।

যে ভালোবাসার শীতলপাটি মজিদ বিছিয়েছে তোর সংসারে তা আগলে রাখিস মা। মনে রাখিস জীবন একটাই। হেরে যাওয়া সহজ। কিন্তু হেরে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে ক’জন?

সুখে থাক মা। বাঁচতে শেখ।

ইতি

তোর মা।

রোকেয়া মজিদের অচেতন দেহ মেঝেতে লুটিয়ে পড়ার আগেই মজিদ সাহেব তাকে ধরে ফেললেন।

 

দশ-

টানা পাঁচ দিন হাসপাতালবাসের পর গতরাতেই বাড়ি ফিরেছেন রোকেয়া মজিদ। সকালে চোখ খুলেই দেখেন জুলি বেচারি বাজারের এক ফর্দ হাতে নিয়ে কিছুতেই সংকেত মেলাতে পারছেন না। দু ঘন্টা সময় বাড়িয়েও না। ওর অবস্থা দেখে এগিয়ে এলেন রোকেয়া মজিদ। নাহ তিনিও এই ফর্দে কোন সংকেত খুঁজে পাচ্ছেন না। শেষ রক্ষা করতে এগিয়ে এলেন সারোয়ার মজিদ।

– কি হলো মা মেয়ের?

– বাবা, দেকুন তো। ব্রিফকেসের মধ্যে এমন ছোট ছোট অনেক লিস্ট, গানের লাইন, পোয়েট্রি পাওয়া গিয়েছে। জাহির বলেছে এগুলো নাকি এক একটি ক্লু। বাট আমরা কিছুতেই ক্লু মেলাতে পারিতেছি না। উড ইয়্যু প্লিজ হেল্প আস?

সারোয়ার মজিদ মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, ‘লিস্টটার প্রথম অক্ষর গুলো মেলাও। তাহলেই পেয়ে যাবে। মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় মিটিং করবে, কোথায় তাদের পরবর্তী মিশন , কোথায় অপারেশনে যেতে হবে এমন সব সংকেতের মাধ্যমে লিখে পাঠাতেন যাতে প্রতিপক্ষের হাতে এসব পরলেও তারা বুঝতে না পারে। জুলির চোখে  তখন এক পৃথিবী বিস্ময় আর শ্রদ্ধা।

বিকেলে রোকেয়া মজিদ আবারো ঘুমিয়ে গেলেন। হঠাৎ জেগে উঠে টের পেলেন জুলি তার পায়ে তেল মালিশ করছে। চট করে উঠে বসলেন তিনি।

– কী করছো জুলি।

– মা, আমি আপনার পায়ে টেল মালিশ করছি।

– কিন্তু এটা তেল কোথায়?

– জি, টেল খুঁজে না পেয়ে আমি ঘি মাখছি।

রোকেয়া মজিদ হো হো করে হেসে উঠলেন। হেসে নিজেই চমকে উঠলেন। কতদিন এমন হাসি তিনি হাসেননি। তার হাসির আওয়াজ বারান্দায় বসা জাহির আর সারোয়ার মজিদের চোখের কোন ভিজিয়ে দিলো।

নাহিদা আশরাফী। কবি, লেখক ও অধ্যাপক। জন্ম- ১ মার্চ, বরিশাল। প্রকাশিত বই: এপিটাফ (কাব্যগ্রন্থ , ২০১৫), শুক্লা দ্বাদশী (যৌথ কবিতাগ্রন্থ, ২০১৬), দীপাঞ্জলি (যৌথ কবিতাগ্রন্থ, ২০১৬),  মায়াবৃক্ষ (গল্পগ্রন্থ, ২০১৬),  প্রেম নিয়ে পাখিরা যা ভাবে (কাব্যগ্রন্থ, ২০১৮),  মুক্তির গল্পে ওরা এগারোজন (মুক্তিযুদ্ধের গল্প, সম্পাদিত)। লেখক 'জলধি'...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..