নিশাজল

রুমা ব্যানার্জি
গল্প
Bengali
নিশাজল

আজ আর একটু পরেই শুরু হবে অনুষ্ঠান । আরে, কি অনুষ্ঠান সেটা বড় কথা নয় । উৎসব প্রিয় বাঙালির কি আর অনুষ্ঠানের শেষ আছে?হলেই হল।তবে আজ অনুষ্ঠান টা আমাকে ঘিরে । আই অ্যম্ সো সরি, ..আমার পরিচয়টা তো দেওয়া হয় নি। আমি হলাম বৃষ্টিলেখা মুখোপাধ্যায়, বয়স সতেরো। সামনের শ্রাবণ মাসে এডাল্ট হব।কি ভাবছেন , শ্রাবণ বললাম বলে অবাক হলেন? আরে বাবা , বাইশে শ্রাবণ জন্ম তাই আগস্ট’টা উল্লেখ করি না। বাঙালি হয়ে এই দিনটা ছাড়তে পারি? সেদিনও ” আজ আকাশে মনের কথা ঝর ঝর বাজে” তাই নাম হলো বৃষ্টিলেখা, অবশ্য ওই টুকুই যোগাযোগ ।বাকি কিছুই রাবীন্দ্রিক নয় ।এখনকার মেয়ে হয়ে ও একটু বেশি অন্তর্মুখী ও স্পর্শকাতর মাত্র। দেখতে মোটামুটি সুশ্রী ।আজকালকার ট্রেন্ড মেনে নাচ গান সাঁতার জানি।পড়াশোনায় মোটামুটি । বাড়ির কেউ’ই আমাকে নিয়ে খুব উচ্চাশা রাখে না।এত স্বত্বেও আমার জন্য আজকের অনুষ্ঠান, বেশ লাগছে এটা ভাবতে ।এতগুলো মানুষ শুধু আমার জন্য আসছে!! মোটামুটি অনেকেই এসে গেছে বিশেষ করে আমার বন্ধুরা। কিছু অবশ্য এখনো এসে পৌঁছাতে পারেনি। পাড়া প্রতিবেশি আর নিকট আত্মীয়দের ভীড়ও শুরু হয়েছে । কথা ছিল সবাই সকাল দশটায় আসবে ।এখন এগারোটা বাজতে চলেছে। আসলে বাঙালিরা কোন কাজটাই বা ঘড়ি ধরে কবে করে বলতে পারেন? আরে না না, এতে আমাদের লজ্জার কিছু নেই। আমাদের স্ট্যেন্ডার্ড টাইমেই আমরা চলি। আই এস টির সঙ্গে কম বেশি চল্লিশ বা পঁয়তাল্লিশ মিনিট ।এতে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে না ।সে যাক গে। অনেকে আসছে এটাই বড় কথা এবং সবটা না হলেও অনেকটাই মনের তাগিদে।কিছুটা ওই “লোকে কি বলবে” মিশে থাকতেই পারে , অত ধরলে চলে না।

যা বলছিলাম, এই অনুষ্ঠানের জন্য আজ সুন্দর করে ঘরটা সাজানো হয়েছে । ঠিক যেমনটি আমার পছন্দ । চারদিকে বেল যুঁই এর গন্ধে মম করছে ছোট্ট ফ্ল্যাট’টা। ফুলদানি গুলো উপচে পড়ছে গোলাপে। লাল, হলুদ,গোলাপি ।আঃ কি গন্ধ!!কি রং এর বাহার।আশেপাশের সাদার সঙ্গে এই রঙের ছটা যেন আরো সুন্দর করে তুলেছে এই ফুল গুলোকে। শুধু আমার সাধের পিটুনিয়া গুলো একটু ঝিমিয়ে পড়েছে ,সিজন শেষ হলেও ফুটছে গোটা কয়েক ।আসলে দুদিন নানা কারণে জল দেওয়া হয় নি। আমি নাহয় দিতে পারিনি, তাই বলে আর কারুর সে দিকে নজর পড়বে না?রাগ হয় কিনা বলুন।
তবে বাড়ি আজ ঝকঝক করছে।আর আমার ঘর…!!! নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না এটা আমার ঘর। আমি কখনোই এমন টিপটপ রাখতে পারতাম না।সারাক্ষণ মা এই নিয়ে কত চিৎকার চেঁচামেচি করত। অবশ্য মার’ই বা দোষ কি? সকাল থেকেই তো শুরু হয়ে যায় ব্যস্ততা । বাড়ির মোটামুটি কাজ সেরে নাকে মুখে গুঁজে স্কুলে ছুট । বেচারি বেরুবার আগে কোনোদিন হয়তো ওড়না পাচ্ছে না, কোনদিন আবার ম্যাচিং টিপ। তার মধ্যেই আমার বাবার কাগজ দাও,আর এক কাপ চা দাও, আমার নীল টাই কই? আমার সাদা শার্ট ইস্তিরি হয়েছে… টাইপের ফরমাশ।দিদি কে নিয়ে অবশ্য ঝামেলা নেই কারণ সে সারাক্ষণ ফোনেই ব্যস্ত ।সারাদিন হয় চ্যাট না হয় ফিস ফিস আর হি হি।আমাদের দুই বোনের ছোট হল আমাদের ভাই বিট্টু । সে আবার সারাক্ষণ গেম খেলতে ব্যস্ত। খাওয়া, ঘুম,পরীক্ষা, হোমওয়ার্ক একদিকে আর গেম একদিকে। ভাগ্গিস বিনি পিসি আছে তাই আমাদের সংসার টা চলছে। যে দিন বিনি পিসি আসবে না বলে দেয় সে দিন বাড়ি তে একশ চুয়াল্লিশ ধারা জারি হয় ।সবার মাথা সেদিন গরম।কথা বললেই গ্রেনেড ফাটবে।

এ বাড়িতে সবাই ব্যস্ত। মা তার সংসার সামলে স্কুল সামলাতে গিয়ে জেরবার।বাবা তাঁর বে-সরকারি অফিসের ডেড লাইন সামলাতে ব্যস্ত।দিদি আর ভাই যে যার দুনিয়ায় ব্যস্ত।সারাদিন কারুর সঙ্গে কারুর দেখা শোনা হয় না। তাই বাড়ির নিয়ম রাতের খাবারটা খেতে হবে একসঙ্গে ।তবে একসঙ্গে টা শুধুই কথায় । বাবা সাধারণত খেতে খেতে দরকারি কল গুলো সেরে ফেলে। আমি আর দিদি দুজনেই কানে হেড ফোন লাগিয়ে, আর ভাই যথারীতি গেম খেলতে খেলতে। আর মা এই সময়টাই পায় সিরিয়াল গুলোতে চোখ বোলাতে।জগাখিচুড়ি পাকিয়ে কি করে যে ঘটনা গুলো বোঝে সেটা একটা গবেষণার বিষয় হতে পারে।মোট কথা হল আমরা যে যার মত করে নিজের দুনিয়া গড়ে নিয়ে তাকে সামলাতে ব্যস্ত।আমি দিয়ে শুরু আর আমি তেই শেষ।
বেশ চলছিল জানেন। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজের নতুন স্বাধীনতা তাড়িয়ে তাড়িয়ে অনুভব করছিলাম। বাবা মা পাওনা হাত খরচা টাও বাড়িয়ে দিয়েছে তাই দলের মধ্যমণি হতেও সময় লাগেনি।এমন সময় ধূমকেতুর মত আবির্ভাব হল মেঘের , মেঘবাহন মজুমদার। না আমার কলেজের নয়, এমনকি এক’ই ব্যাচের ও নয়।জে ইউ তে পড়ে। হা হা করে হাসতে পারে, যে কোন জায়গায় ধপ্ করে বসে গলা ছেড়ে গান গাইতে পারে, আবার..’ এই রে কাজ আছে !!’ বলে ঝড়ের বেগে মোটরসাইকেল চালিয়ে মিলিয়ে যেতেও পারে।ওর ঝকঝকে চেহারা তার সঙ্গে বুদ্ধিদিপ্ত কথা বার্তা সঙ্গে উপরি পাওনা তার রস বোধ।দোষের মধ্যে একটু দুম দাম কথা বলে দেয়, কে কি ভাবল সেটা না ভেবে। কিন্তু মেঘ তো মেঘ’ই। ঠিক যেন এক ঝলক বসন্তের টাটকা বাতাস, ছুঁয়ে গেলেই ফুটে ওঠে থোকা থোকা পলাশ সিমুল । ভরিয়ে তোলে কনক চাঁপার মত সুগন্ধে।এমন যার বৈশিষ্ট্য তাকে ঘিরে মেয়ে মহলে একটু আনচান , একটু গুণ গুণ, একটু দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা থাকাটাই স্বাভাবিক ।এ হেন পুরুষটি যদি আমার সঙ্গে কথা বলে, এমনকি ফেস বুকে বন্ধুতের হাত বাড়ায় তাহলে আমার মনটা প্রজাপতির মত উড়বে সেটা বলাই বাহুল্য ।কারো কারো জীবনে বসন্ত আসে নিভৃতে সে রঙে নিজেই মেতে ওঠে ।অন্য জন সেটা টের পায় না যেমন আমার এল।

কিছু দিনের মধ্যেই অন্তরঙ্গতা এত বেড়ে গেল যে সারা রাত কথা হতে থাকল। আমিও একটা মনের মত সঙ্গী পেয়ে নিজেকে উজার করে দিলাম। মেঘও আমার সব মান অভিমান কেমন সুন্দর করে বুঝত, সামলাতো ।যদিও আমরা কেউ’ই মুখে কিছু বলিনি কখনো তবুও কোথায় যেন একটা সমর্পণের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল । ক্রমেই একসঙ্গে সময় কাটানোটাই অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল আমার । হঠাৎ পাওয়া এই সম্পর্কটাকে প্রাণ পণে আঁকড়ে ধরেছিলাম আমি।
সেদিন কি জানি কি একটা কারণে আমি কলেজ যাইনি। বাড়িতেই ছিলাম। দিনের এই সময়টা বাড়ি তালা বন্ধ থাকে তাই বিনি মাসিও থাকে না। মেঘের সঙ্গে দেখা হতে তখনো ঘন্টা তিনেক বাকি।অথচ ঘরে মন টিঁকছে না। সাধারণত পড়াশোনার সময়টা মেঘ ডিস্টার্ব করা পছন্দ করে না। সেটাই তো স্বাভাবিক, কৃতি ছাত্র, কেরিয়ারের আন্তরায় হয় এমন কাজ সে করে না। আমিও এই মনোভাব কে সম্পূর্ণ ভাবে সমর্থন করতাম।অনেক ভেবে ঠিক করলাম মিস কল দিয়ে রাখি, যাতে ফ্রি হলেই কল করে।একটা রিং পুরো হওয়ার আগেই মেঘ ফোনটা ধরল।
— কি রে , এই অসময় ফোন করলি?
—- আসলে আজ ক্লাসে যাইনি তাই ভাবলাম যদি….
—আমিও যাই নি
—- কেন?
— শরীর টা ….
—কই সকালে তো কিছু বললি না।
—–তখন বুঝিনি। তোর ফোনটা পেয়ে বাঁচলাম। বাই দা ওয়ে কোথায় এখন?
— কোথায় আবার ? বাড়িতেই ল্যাদ খাচ্ছি ।
—–দশ মিনিট পরে কথা বলছি।
এই বলে দুম করে ফোনটা কেটে দিল। ও তো চিরকাল এমন খাপছাড়া ।তাই ভাবলাম ততক্ষণ একটু আইস টি বানিয়ে নি। লিকার টা ঠান্ডা হতে পাখার তলায় দিয়ে সবে আইস ট্রে টা বের করেছি , এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল।কিছুটা বিরক্তি নিয়ে দরজার কাছে যাওয়ার আগেই আবার বেল।উফফফফ্ এই সেলসম্যান গুলো এত বিরক্ত করে না। ভীষণ বিরক্ত হয়ে, কিছুটা রেগেই বললাম চেঁচিয়ে বললাম
—- বাড়ি তে কেউ নেই । আমি কিছু কিনব না। দয়া করে বিরক্ত করবেন না।
বলতে বলতেই আবার বেল। আইস ট্রে হাতে নিয়েই দরজা খুললাম খুব একচোট যাচ্ছেতাই করব এই মনোভাব নিয়ে ।
দরজা খুলতেই অবাক হলাম।মেঘ দাঁড়িয়ে আছে। চুলগুলো এলোমেলো । পরণে একটা জগার আর হাত কাটা টি শার্ট । বোধহয় এটা পরেই শুয়ে ছিল।
—সরি, দেরি করে ফেললাম না?
—তুই?
— কেন? তখন বললাম যে দশ মিনিট পরে কথা বলছি। দুটো সিগনালে আটকেছিলাম তাই হয়তো একটু বেশি সময় লেগে গেছে।সরি বললাম তো।
— না রে আমি তা বলি নি। আসলে…
–‘আসল নকল জানি না। আমার একটা দরকারে এলাম। ঢুকতে দিবি কিনা বল।
—-ওঃ সরি রে । আয়।
দরজা বন্ধ করে বললাম
—কি খাবি? আইস টি বানাচ্ছিলাম । দি’ একটু?
— নাহ।
— বাট ইউ নিড টু হেভ সামথিং।
—- আই নিড ইউ।
— বুঝেছি আজ বাবুর মাথার পোকা নড়েছে।দাঁড়া।
এই বলে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়াতেই। একটা গরম হাত আমার পথ আটকালো।
—- একি রে তোর তো জ্বর ।ওষুধ খাসনি?
— খেতেই তো এলাম।
এক হেঁচকা টানে গিয়ে পড়লাম মেঘের বুকে। উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শে ভেঙে গেল আমার সব আবডাল। মেঘের উষ্ণ ভেলায় আমার সব ভেসে গেল । জেগে রইল দুই আদিম নর নারী আর তাদের উষ্ণ চাওয়া পাওয়া ।ঝড় থামার পর বিধ্বস্ত আমাকে আদরে মুড়ে চলে গেল মেঘ।
বলাই বাহুল্য যে পরের দিনই আমি আই পিল খেতে ভুলি নি।আমার এই পরিপূর্ণতার আমেজ সরে গেল সহজেই।একটু একটু করে অনুভব করেছিলাম যে মেঘ সরে যাচ্ছে ।পতঙ্গের মত পুড়ব জেনেই ভালবাসার আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিলাম কিন্তু সে পোড়ায় যে এত যন্ত্রণা বুঝতে পারিনি।ভালবাসার মানুষের অবজ্ঞা যে এতটা রক্তাক্ত করে জানা ছিল না। সারা রাত কথা, হোয়াটস্যাপ কমে এল ।যেদিন পর পর চারবার ফোন কেটে দিল ব্যস্ততার অজুহাতে সেদিন ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তার পরেই দেখলাম ” লাস্ট সিন” টাও নেই ।অবজ্ঞার হাসি হেসে অন্য দিকে তাকিয়ে চলে যাচ্ছিল মেঘ, রুখে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হলাম ।
— মেঘ দাঁড়া।এটা কেন করছিস?
—- কি করছি?
— এইভাবে সব শেষ করে দিতে পারিস না তুই।
— সব শেষ? শুরু কবে হল?আর সেদিনটা ,তোর অমতে তো কিছু হয় নি। তাই প্লিজ নেকুদের মত # মি টু বলিস না। হজম হবে না।উই বোথ হ্যড ফান।সো চিল্।
—তুই এ সব কি বলছিস?
—- ভুল কি বললাম?সেই মুহূর্তে আমার ছিল জৈব ক্ষুধা, তোর ছিল মানসিক ।দুজনে পরিপূর্ণ । গল্প শেষ।
—- গল্প? আমার অনুভূতি তোর কাছে গল্প?
—- ফালতু দিমাগের দই বানাস না।তার থেকে একটা ফাড়ু খবর দি শোন। নেক্সট উইকে আমি ফ্লাই করছি। তুই মাইরি হেভি লাকি।আয় একটা চাকাম করে চুমু খাই।
—কনগ্রাটুলেশনস্
— ব্যাস?
সেই মুহূর্তে নিজের প্রতি লজ্জায় ঘৃণায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিল। শুধু অস্ফুটে গো টু হেল বলে হাঁটা লাগালাম।সন্তর্পণে ক্ষত বিক্ষত হওয়া মনের ভাঙা টুকরো গুলো কে নিয়ে বাড়ি পৌঁছালাম। শরীর খারাপের অজুহাতে ঘর থেকে বেরুলাম না। কি অদ্ভুত ব্যাপার, একটা মেয়ে বলছে তার শরীর খারাপ অথচ তার বাড়ির লোকের মাথা ব্যাথা নেই। মা শুধু বলল– ওষুধ খেয়ে নিস।

একাকীত্বের রাত যে এত লম্বা হয় জানা ছিল না। সময় যেন কাটছেই না। এ দিকে চোখের জল ও থামছে না।অপমানের জ্বালা একটাই মলম চোখের জল। সেটাই অবিশ্রান্ত ঢেলে চলেছি ।মোবাইলে দেখলাম আমি ব্লক’ড। ভালোই হল। এই কাজটা আমি কিছুতেই করতে পারতাম না। অনেকেই বলবে নিজেকে শস্তা করে দিলে এমনই হয় ।হয়তো ঠিক, কিন্তু আমি যে ভালবেসে সব করেছিলাম তাই আফশোস নেই । দুঃখ শুধু একটাই । শৌচ পাত্রে পরমান্ন পরিবেশন করেছিলাম। কি করে এত বড় ভুল করলাম ? দুঃখ নাকি ভাগ করলে কমে অথচ আমি এমন অভাগা যে এমন কেউ নেই যাকে বলে একটু হাল্কা হতে পারি। অনেক বন্ধু আছে ঠিকই তবে এ কথা তাদের বলা যায় না। সব কথা তো সব বন্ধুদের জন্য নয়।
অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে তিনদিন কেটে গেল।তে রাত্রি তে মাও নাকি সন্তান শোক কাটিয়ে ওঠে ।আমিও কিছুটা শান্ত ।আমার হাব ভাব দেখে মা ভাবল ন্যাকামো, বাবা বলল নাটক। দিদির মনে হল ফুটেজ খাচ্ছি । সাত দিনে চোখে কালি পড়ে গেল। খাওয়া মোটামুটি ছেড়ে দিয়েছিলাম তাই ওজনটাও অনেক কমে গেল। সবাই সবটা দেখছে, কিন্তু কেন যে আমি এরকম শুকিয়ে যাচ্ছি কেউ জিজ্ঞেস করল না। কেউ জানতেই চাইলনা।কারুর হাতে বাজে কাজে নষ্ট করার মত সময় নেই। আসলে ওদের কাছে আমার অস্তিত্বই নেই তাই তার দাম ও নেই । অমি একা একাই তাই আমার ভুলের মাসুল দিচ্ছিলাম এই যন্ত্রণা বুকে চেপে রেখে। পরে মনে হল আমি কেন শুধু শুধু ওই অমানুষ টার জন্য কষ্ট পাব? অমন হৃদয় হীন মানুষ কি আমার মত মন কে কখনো সম্মান করতে পারত?বড় জোর দয়া করত। একজন স্বার্থপর মানুষকে ছাড়া কেন আমার পৃথিবীটা খালি লাগবে?আমার তো সব আছে। বাবা মা একটা পুরো পরিবার । তক্ষুনি ঠিক করলাম যে কাল থেকে আমি সবার সঙ্গে থাকব, ওদের সঙ্গেই শেয়ার করে নেব আমার যন্ত্রণা । নতুন করে ফিরে আসব সবার মাঝে ।পরের দিন মা কে গিয়ে বললাম
—- মা
— হু ,বল
—-‘ বলছি…যে
—থাক মা আর বলে কাজ নেই।
— মা, শোনো না।
—- মেলা কাজ পরে আছে মা । এখন এই ভ্যানতারা ভাল লাগছে না।
— শোনো না মা। বিনি পিসি তো আসেনি । আমি একটু হেল্প করে দি?
— রক্ষা করো মা । ক্ষেমা দাও ।তুমি রাজ নন্দিনী তুমি কেন কাজ করবে। তার জন্য তো এই বাঁদি আছে। আর বিরক্ত না করলে আমি কৃতার্থ হই। তোমাদের গেলার ব্যাবস্থা করে তবে আমাকে আবার বেরুতে হবে তাই দয়া করে এখন দূর হও।
সাত সকালে মায়ের চিৎকার শুনে বাবা বিরক্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
—- এখন চেঁচিয়ে কি হবে? মেয়েদের তো তুমি মানুষ করতেই পারো নি। ওরা শুধু চিনেছে টাকা। তা মার সঙ্গে এখন নাটক করার কারণ টা আমি বেশ বুঝেছি । তবে পরিষ্কার শুনে রাখো। এক পয়সাও আর আমি হাত খরচা বাড়াব না।এখনো পেটে চা পড়েনি শুরু হয়েছে মা মেয়ের যাত্রা পালা। যত্তসব!!!
— বাবা,আমি তো…
–চুপ । আবার মুখে মুখে কথা? যাও নিজের ঘরে যাও।সারাটা জীবন শুধু জ্বালিয়ে গেল।
চোখ ফেটে জল আসছিল। নিজের বাবা, মা… তোমরা কেন যে কেউ আমার কথা শুনছো না। আমি তো কিছু চাইনি। ভালবেসে একটু পাশে বসতে, ছুঁয়ে থাকতে চেয়েছিলাম ।তোমরা কেউ আমাকে ভালবাসো না। কেউ বোঝোনা। আমার থাকা না থাকায় কিছু এসে যায় না তোমাদের। বেশ আর জ্বালা সইতে হবে না ।
দিদি বেরিয়ে যেতে যেতে বলে গেল
— পাগলা খাবি কি ?ঝাঁঝেই মরে যাবি। কি নৌটংকি!!!!যা ঘুমা। সারাজীবন তো ঘুমিয়ে কাটালি। তাই তুই যেটা পারিস সেটাই কর। পতলি গলি সে কাট লে জানু।নোবডি কেয়ার্স।

ভেবে দেখলাম দিদি ঠিকই বলেছে।আমি চলে গেলে সত্যি কারুর কিছু যাবে আসবে না, শুধু আমার নিঃসঙ্গতা হয়তো রাতের অন্ধকারে আমাকে একটু মিস করবে। আমরা যে অনেকদিনের মিতা। শুধু চির ঘুমেই চির শান্তি। সেটাই করলাম। চির ঘুমে ঢলে পরলাম।আঃ কি শান্তি!!!

এই দেখ !! পোস্টমর্টেমের পর আমাকে নিয়ে এসেছে । আমি এখন কোনের সাজে , লাল গোলাপে মুড়ে,লাল বেনারসি পরে শুয়ে আছি। বাবা আর মা আলুথালু হয়ে বসে আছে । মা মাঝে মাঝে বৃষ্টি বৃষ্টি বলে কেঁদে জ্ঞান হারাচ্ছে । দিদি একদম পাথর হয়ে গেছে। এমনকি বিট্টু ও গেম খেলা বন্ধ রেখে আমার মাথার কাছে বসে আছে। সবার চোখে জল।শুধু বাবা বসে আছে পাথরের মত আমার একটা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া হাত শক্ত করে ধরে। এরা সবাই আমাকে এত ভালো বাসতো? তাহলে কেন করলে অমন অবহেলা?কেন একটু আমাকে বুঝলে না? শুনলে না?জানতে না আমি একটু অভিমানী? আমিও কি বোকা এত ভালবাসতে আর আমি বুঝতেই পারলাম না?ইচ্ছে করছে একবার ফিরে আসি। কিন্তু সেকেন্ড চান্স জীবন দেয়, মৃত্যু দেয় না যে।

এখন বুঝছি যে মানসিক যন্ত্রণা একটা ক্ষণস্থায়ী অনুভূতি মাত্র । কিন্তু আমরা সেই যন্ত্রণার কারণে যা যা করি, যা সিদ্ধান্ত নি তা চিরস্থায়ী । সেই একটা হঠকারী সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করতে হয় পরিবারের সবাইকে। পালানোর বা পেছিয়ে আসার সুযোগ থাকে না। ভুল শুধরে নেওয়ার দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়া যায় না।ইচ্ছে করলেও আর ফেরা যায় না। না , প্লিজ আমার জন্য আফসোস করবেন না। আমার জন্য আমার আপনরজনরা কিছু করতে পারে নি। ওদের সব চেষ্টা কে ব্যর্থ করে আমি চলে এসেছি এই চির ঘুমের দেশে। কিন্তু আপনার নিজের কেউ হয়তো এই মুহূর্তে আপনার দিকে হাত বাড়িয়ে আছে। তাকে ফেরাবেন না। একটু সহানুভূতি নিয়ে শুনুন তার কথা। একটু বলতে দিন তাকে। সে বুঝুক সে একা নয়। একটা শক্ত কাঁধ যে বড় দরকার। বড্ড প্রয়োজন একটু স্নেহের স্পর্শের। ফিরিয়ে দেবেন না। একটু শুনুন, প্লিজ । একবার বলুন তাকে “আমি আছি তো”। দেখবেন এই কথাতেই সে শিশিরের মত হারিয়ে না গিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে, তার জীবনে আবার নতুন সূর্য উঠবে। নতুন ভাবে মানুষ টা বেঁচে উঠবে… বলেই দেখুন না।

রুমা ব্যানার্জি। কবি ও গল্পকার। জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতায়, ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে। রুমা মূলত প্রকৃতি প্রেমিক ও সাহিত্য অনুরাগী। পড়াশুনা করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদ বিদ্যায় স্নাতক, এরপর আইন ও ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর। ছেলের উৎসাহেই লেখালিখির জগতে আসা।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..