নীরার লাল টিপ

ইভান অনিরুদ্ধ
গল্প, পডকাস্ট
Bengali
নীরার লাল টিপ

মটকা মেরে বিছানায় শুয়ে আছি। আজকে শুক্রবার, মেসের সবাই ঘুমাচ্ছে। বুয়া আসবে আরো দেরি করে। আমাদের মেসের এই বুয়া খুব সহিন্দার বা আরামপ্রিয়। রান্নাবান্না, দায়িত্ব পালন সব কিছুই তার ইচ্ছে খুশি মত করে। কারো কথায় সে খুব একটা গা করে না। নেত্রকোনাতে বাড়ি- এরকম বুয়ারা একরোখা স্বভাবের আর হয়রা কিসিমের হয়। এই বুয়াও তার ব্যতিক্রম নয়।

ভাবছিলাম একটা কিছু লিখবো। কিন্তু এমন সময় দরোজায় বেশ কড়া আওয়াজ হল। এতো জোরে আওয়াজ যে মেজাজটাই গরম হয়ে গেল। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। বেশ সাজুগুজু করা কঠিন চেহারার একজন মেয়ে মানুষ দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখেই বেশ ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো-সরি, এতো সকালে বিরক্ত করলাম। আপনি কি হাসান সাহেব? মা মনে হয় আপনার কথাই বলছিলো। আমার সঙ্গে এক্ষুণি আপনাকে যেতে হবে। চট করে রেডি হয়ে নিন, আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।

গল্পটির অডিও শুনতে পাবেন এখানে –

আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। কেউ এভাবে সাত সকালে আমাকে হুকুম করতে পারে আমার জানা ছিল না। তাও কি না অপরিচিত একজন মেয়ে। এই মেয়েটির সাথে আমার আগে কখন দেখা বা কথা  হয়েছে –এরকম কিছুই মনে পড়ছে না। তবে নিশ্চিত হলাম– বাড়িওয়ালারই মেয়ে।

একটা দৃশ্য আবছা চোখের সামনে ভেসে এলো। একবার  ভাড়ার টাকা দিতে আমি দোতলায় গিয়েছিলাম। খালাম্মাকে না পেয়ে তার এই মেয়ের হাতে টাকাটা রেখে এসেছিলাম। সামান্য ভদ্রতা করেও সে সেদিন কোন কথাই বলেনি। ভেবেছে– মেসে থাকে, চাল চুলা নেই। এলেবেলে মানুষ। টিউশনি বা এই সেই করে হয়তো ঢাকা শহরে চলে। তাই কথা বলেনি। তাছাড়া বড়লোকের সুন্দরী মেয়েরা বেশ অহংকারী হয়।  এই কারনে আমার মতো মানুষকে নিয়ে তার আগ্রহ না থাকাই স্বাভাবিক। আমি বিষয়টা সেদিন সহজ ভাবেই নিয়েছি। অত সাত-পাঁচ আর না ভেবে পনেরো মিনিটের মধ্যে  নিজেকে তৈরি করে ফেললাম। জিন্সের প্যান্টের উপর কফি কালারের ফুল হাতা শার্ট, চামড়ার স্যান্ডেল পরলাম। আর হাতে করে রে-ব্যান এর কালো ফ্রেমের সানগ্লাসটা নিলাম। বাইরে রোদের বেশ কড়া চোখ রাঙানি। অনেকটা এই মেয়েটির চোখের দৃষ্টির মতো।

রেডি হয়ে বাইরে এসে দেখি আগে থেকেই রিক্সা ঠিক করে  মেয়েটি উঠে বসে আছে। সানগ্লাসটি চোখে লাগিয়ে আমি তার বাম পাশে উঠে বসলাম। ভাবছি প্রথমে আমিই কথা বলে নীরবতা ভাঙি। নীরবতা আমার খুব অসহ্য লাগে।

–আপনার নামটা জানা দরকার।

–এটা জানা কি খুব জরুরি?

–এক রিকশায় পাশাপাশি বসে যাচ্ছি অথচ আপনার নাম জানবো না তা কেমন করে হয়!

–নীরা, আমার নাম নীরা ফারহানা খান।

–আমার নাম তো আপনি জেনেই গেছেন। তাই কষ্ট করে আর বলছি না। আপনি কী করছেন?

–থার্ড ইয়ারে পড়ছি, ঢাকা মেডিকেলে। আর আপনি?

–আমি বাংলায় মাস্টার্স শেষ করলাম লাস্ট টু ইয়ার্স ঢাকা ভার্সিটি থেকে।

আমার কথা শুনে নীরা আড় চোখে আমার মুখের দিকে চাইল। মুখ ভর্তি দাড়ি দু’গালে লেপটে আছে–এটা দেখছে নাকি আমার বলা কথার সাথে আমাকে মিলিয়ে নিচ্ছে তা বুঝতে পারলাম না। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে রিকশা খুব দ্রুত চলছে। নিউ মার্কেটের এক নম্বর গেইটের সামনে এসে রিকশা থামলো। বললাম–ভাড়া আমি দিচ্ছি,আমার কাছে ভাংতি আছে।

–আপনি কেন দিবেন? আমার কাছে কি ভাড়া নেই?

এই বলে নীরা পঞ্চাশ টাকার নোটটা রিকশা ড্রাইভারের দিকে বাড়িয়ে দিল। আমি তার কথা শুনে হালকা মুখ টিপে হাসলাম। বুঝতে পারছি, এই মেয়ে খুব কঠিন স্বভাবের। রিকশা ভাড়া মিটিয়ে আমরা নিউ মার্কেটের ভিতরে ঢুকলাম। বেশির ভাগ দোকান এখনো খুলেনি। আমি নীরাকে জিজ্ঞেস করলাম-এখন আমরা কোথায় যাবো? আমার কথা শুনে সে খুব শীতল কণ্ঠে উত্তর দিল- হাসান সাহেব,আপনার কি খুব তাড়া আছে? যদি তাড়া থাকে তাহলে আপনি চলে যান। আমি একাই কাজ সারতে পারবো। আমি চোখ থেকে সানগ্লাসটা বুক পকেটে নামিয়ে নিলাম। উত্তরে বললাম- না, না, আমার কোন তাড়া নেই। আপনার সাথেই আছি সারা দিন। নো প্রবলেম এট অল।

নীরা তার ব্যাগের ভিতর থেকে একটা লম্বা লিস্টি বের করে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলো। আমি পাশ থেকে বললাম-চলুন, কোথাও গিয়ে বসে কফি খাই। দোকানপাট খুলতে থাকুক। সে হাঁ বা না কিছুই বললো না। আমি খানিকটা সামনে বাড়িয়ে একটা কফি শপে ঢুকলাম। দুইটা স্যান্ডউইচ আর দু’মগ কফির অর্ডার দিলাম। তারপর একটা খালি টেবিল দেখে আমরা মুখোমুখি বসলাম। কিছুক্ষণের ভিতর কফি চলে এলো। কফিতে একটা ছোট চুমুক দিয়ে নীরা আমাকে জিজ্ঞেস করল-এখন কী করছেন? কোন চাকরি? আমি হেসে বললাম-অ্যা কমপ্লিট বেকার। আপনাদের বিল্ডিংএ মেসে থাকি। খাইদাই আর লেখালেখি করি টুকটাক। আমার কথা শুনে নীরার হাতে ধরা কফির মগটা কেঁপে উঠলো। সে একটা বিষম খেয়ে বলল-আপনি লেখক? ভালোই হলো,আমি আগে কখনো লেখক দেখিনি এতো কাছাকাছি বসে।  আমি বললাম, মনে হচ্ছে লেখকদের আপনি খুব অপছন্দ করেন। কারণটা জানতে পারি কি? নীরা ঠোঁটের কোণে একটা অন্যরকম হাসি টেনে বলল- না, না অপছন্দ করবো কেন? লেখালেখি করা তো একটা বিশাল গুণ, তাই না? সবার সেই গুণ থাকে না। এরকম কথায় বুঝতে পারি, নীরা আমাকে কিছুটা তাচ্ছিল্য করছে। আমি মনে মনে হাসলাম আর স্যান্ডউইচে আলতো করে কামড় বসালাম। নীরা ঘড়ি দেখে বললো-চলেন, এইবার উঠবো। আমিও মাথা নেড়ে বললাম– উঠি তাহলে। নীরাকে সুযোগ না দিয়ে কাউন্টারে গিয়ে খাবারের বিল দিয়ে বেরিয়ে এলাম।

এর মধ্যে সব দোকানপাট খুলে ফেলেছে। প্রথমেই নীরা আমাকে নিয়ে মেডিকেলের বইয়ের দোকানে ঢুকল। বেশ মোটা সাইজের তিনটা আর মাঝারি সাইজের দুইটা বই কিনলো। জানি তার পক্ষে এই বইগুলো বহন করা কষ্টকর। আমি বললাম- দিন,আমার কাছে দিন। নীরা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো-আপনার কষ্ট হবে না তো? আমি হেসে বললাম-লেখক মানুষদের কষ্ট থাকতে নেই। আপনি দিন তো বইগুলো। আমার কোন কষ্ট হবে না। আমার কথায় নীরা কোন খোঁচা অনুভব করল কী না বুঝতে পারলাম না। সুন্দরী আর অহংকারী মেয়েদের মুখ দেখে চট করে আসলে কিছু বোঝা যায় না।  কিছুটা সময় লাগে তাদের বুঝতে। সে একটা করে জিনিস কিনছে আর লিস্টি দেখে টিক মার্ক দিচ্ছে। আমার পরিচিত এক দোকানে ঢুকে কেনা জিনিস গুলো রেখে আসলাম। বুঝতে পারছি তার আরো কিছু কেনাকাটা করা লাগবে। কেবল অর্ধেক হয়েছে। নীরা এদিক সেদিক কিছু একটা খুঁজছে। এমন সময় আমাকে জিজ্ঞেস করল-হাসান সাহেব, আপনার কি কোন বই-টই বেরিয়েছে?

আমি কিছুটা অন্যমনস্ক ছিলাম। বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম-আমাকে কিছু বলছেন নাকি? আমার কথায় নীরা কিছুটা রেগে গেছে। আপনি ছাড়া এই মুহূর্তে আমার পাশে আর কে আছে? হাঁ,আপনাকেই জিজ্ঞেস করছিলাম-কোন বই বেরিয়েছে আপনার? আমি কিছুটা লজ্জা পেয়ে বললাম-গত বইমেলায় আমার দুইটা বই বেরিয়েছে-একটা ছোট গল্প আর একটা উপন্যাস। আমার কথা নীরার বিশ্বাস হচ্ছে না। তার মুখ দেখে এখন একজন অন্ধ মানুষও তা বলে দিতে পারবে। আমি নীরার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম-চলুন,ঠাণ্ডা কিছু দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নেয়া যাক। খুব গরম পড়েছে আজকে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে,নীরা কিছু একটা ভাবছে হাঁটতে হাঁটতে। লিস্টির ভেতর থেকে কোন কিছু কেনাকাটায় বাদ পড়েছে নাকি আমার মতো অখ্যাত লেখকের বই বেরনোর কথাটা ভাবছে -কে জানে!

নীরার সব কেনাকাটা শেষ করতে করতে দুপুর হয়ে গেল। দুপুরের আজান ভেসে আসছে মসজিদ থেকে। আমি তাকে বললাম–আজ শুক্রবার। জুম্মার নামাজ মিস করা যাবে না। চলুন, এইবার বাসায় ফেরা যাক। নীরা সাথে সাথে বলল-শিউর,চলেন তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরি। দু’জনের হাতে এক গাদা ব্যাগ ভর্তি জিনিসপত্র আর বই। এইসব নিয়ে রিকশায় চড়ে বসলাম। রাস্তায় তেমন জ্যাম নেই। আধাঘন্টার ভেতর আমাদের রিকশা নীরাদের বাসা পরীবাগের সামনে এসে থামলো।
তারপর সব জিনিসপত্র তার বাসায় পৌঁছে দিয়ে আমি ঝটপট গোসল সেরে মসজিদে গেলাম। নামাজ শেষ করে বাসায় যখন ফিরে এলাম তখন খুব খিদে পেয়েছে। মেসে আমার বাজার করার কথা ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি সঙ্গত কারনেই। বুয়া ডিম ভাজি আর আলু ভর্তা করে চলে গেছে। তা দেখে এখলাস ভাই খুব চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। সে মেসের সবচেয়ে সিনিয়র মেম্বার। আজিজ সুপার মার্কেটে একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে। রাগে চোখমুখ কঠিন করে আমাকে পুলিশের মত জেরা শুরু করেছে।

–হাসান, তুমি যে বাজার করতে পারবা না সেই কথা আগে বলনি কেন?

–ভাই,আমি ভাবছি ঘন্টা খানেকের ভেতর ফিরতে পারবো।

–কই গেছিলা তুমি? কার সাথে?

–নিউ মার্কেটে গেছিলাম। এই বাড়ির মালিকের মেয়ের সাথে।

–কী কইলা? কার সাথে?

–আরে ভাই,আপনি কি হাটকালা? কানে কম শোনেন?

–কানে আমি ঠিকই শুনি। কিন্তু এইরকম কথা আগে শুনি নাই যে,এতো মানুষ থাকতে বাড়িওয়ালার সুন্দরী মেয়ে তোমারে নিয়া নিউমার্কেট গেছে।

আমি কিছু একটা বলতে যাবো এখলাস ভাইয়ের কথার উত্তরে এমন সময় দরোজায় কড়া নড়ে উঠলো। এখলাস ভাই গিয়ে দরোজা খুলে দিলো। এক ঝটকায় দরোজা ঠেলে নীরা ভেতরে ঢুকলো। সে সবুজ কালারের উপর প্রিন্টের কাজ করা ড্রেস পরেছে। চুল খোলা। কিছুক্ষণ আগে গোসল করেছে বুঝাই যাচ্ছে। চুলে কন্ডিশনার ইউজ করেছে। একটা মাতাল করা ঘ্রাণ খোলা চুল থেকে ভেসে আসছে। এখলাস ভাই এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে। নীরা সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে বললো-জলদি চলে আসুন উপরে। মা টেবিলে ভাত দিয়েছে। আপনি আমাদের সাথে খাবেন। আমি লজ্জায় কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে গেলাম। আমতা আমতা করে বললাম-প্লিজ, আজকে না। আরেকদিন খাবো। তাছাড়া মেসে বুয়া আমার জন্য রান্না করেছে। সেই খাবার নষ্ট হবে। নষ্ট হোক সেই খাবার। আপনি তাড়াতাড়ি আসুন। আমি উপরে গেলাম-এই কথা বলে নীরা চলে গেল। এখলাস ভাই কিছুক্ষণ আমার দিকে অসহায়ের মত তাকিয়ে রইল। তারপর বিড়বিড় করে বলল–হাসান সাহেব,আজকে থেকে আপনি হলেন এই বাড়ির জামাই। বাড়িওয়ালার মেয়ের জামাই। যান, পোলাও মাংস খেয়ে আসুন। আর আমরা গরিব কাঙ্গাল আলু ভর্তা আর ডাইল দিয়েই সারা জীবন খেয়ে গেলাম। আমি আর কথা না বাড়িয়ে এখলাস ভাইয়ের দিকে একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে নীরাদের বাসার দিকে রওনা দিলাম।

দরজা হালকা ভেজানো ছিল। আমি দুইবার নক করলাম। ভিতর থেকে নীরা চেঁচিয়ে বললো-এতো ফর্মালিটি লাগবেনা, চলে আসুন। আমি লজ্জায় একেবারে মরে যাচ্ছি। এভাবে নীরার বাসায় খাওয়ার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। টেবিল ভর্তি নানারকম খাবারের আয়োজন। বড়লোক মানুষের ডাইনিং টেবিল যেমন হওয়ার কথা তা ঠিক তেমনি। মেস জীবনে আমাদের এতো খাবার খাওয়ার সুযোগ কই? ইচ্ছে করছিল,এখলাস ভাইকে ডেকে নিয়ে আসি। আহা,বেচারা শুক্রবার দিন আলু ভর্তা দিয়ে খাচ্ছে-এটা ভেবে আমার খুব খারাপ লাগছিল। আমি চেয়ার টেনে এক পাশে বসলাম। কিছুক্ষণ পর খালাম্মা আসলেন। আমি উনাকে সালাম দিলাম। উনি খুব আন্তরিক একটা হাসি দিয়ে বললেন-বসো বাবা। তোমরা এতোদিন ধরে আছ এখানে অথচ সময় সুযোগের অভাবে তোমার সাথে কথাই হয় না। ভালোই হলো,আজকে তোমার সাথে খেতে খেতে গল্প করবো। আমি লাজুক ভঙ্গিতে বললাম-জী খালাম্মা,অবশ্যই।

এক সাথে তিনজন খেতে বসলাম-আমি,খালাম্মা আর নীরা। নীরা আমার প্লেটে আস্ত দুইটা কৈ মাছ তুলে দিয়েছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম-আপনার দিতে হবে না,প্লিজ। আমি নিজের হাতে তুলে নিব। খালাম্মা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-হাসান,তোমার দেশের বাড়ি যেন কোথায়? আমি খাবার মুখে নিয়ে উত্তর দিলাম-নেত্রকোনা খালাম্মা। ফ্যামিলিতে কে কে আছেন তোমার? খালাম্মা জানতে চাইলেন। আমি খাবার হাতে নিয়ে বললাম-এখন কেউ নেই। আমি একাই আছি। আমার কথায় নীরা খুব অবাক হয়ে গেল। তার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার তাই মনে হল। সে বললো-মানে? আমি মা আর মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললাম-আমার মা বাবা কেউই বেঁচে নেই। যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন আমার বাবা মারা যান। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। স্কুল কমিটি নিয়ে বিরোধের জের ধরে এলাকার প্রভাবশালী এক রাজাকার আমার বাবাকে খুন করে। আর অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় আমার মা মারা যান। খাবার টেবিলের পরিবেশটা আমার কথা শুনে ভারী হয়ে গেছে। সবাই চুপচাপ। খালাম্মার চোখে পানি টলমল করছে। নীরা মাথা নীচু করে আছে। আমি বললাম-সরি,আমার কথায় আপনাদের খাওয়ার মুড নষ্ট হয়ে গেছে। খালাম্মা চোখ মুছে আমার পাতে আরো কিছু খাবার তুলে দিলেন। নীরা হঠাৎ তার মাকে উদ্দেশ্য করে বলল-মা,ইনি কিন্তু লেখক মানুষ। গত বইমেলায় তার দুইটা বই বেরিয়েছে। ঢাকা ভার্সিটি থেকে বাংলায় মাস্টার্স করেছে। খালাম্মা হাসি মুখে বললেন-তাই নাকি? তাহলে তো বিশাল ব্যাপার! সবাই লেখালেখি করতে পারে না। কিছু কিছু মানুষের এই গুণটা থাকে। সবার এই গুণ থাকে না। দোয়া করি তুমি একজন বড় লেখক হও। নীরা পাশ থেকে টিপ্পনী কেটে জিজ্ঞেস করলো-আচ্ছা,আপনি কী লেখেন? প্রেমের গল্প,উপন্যাস নাকি অন্যকিছু? আমি অবশ্য গল্পের বই-টই বেশী পড়ি না। তবে ইন্টার পরীক্ষা দিয়ে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ চার দিনে শেষ করেছিলাম। এখন তো মেডিকেলের বই পড়তে পড়তেই আধমরা হয়ে যাচ্ছি।

খালাম্মার খাওয়া আগেই শেষ হয়ে গেছে। তিনি রান্নাঘরে কাজ করছেন। আমি আর নীরা এখনো টেবিলে বসে আছি। আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম-আপনি কি প্রেমের গল্প উপন্যাস পছন্দ করেন না? সে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললো-না, মানে সব লেখকরাই তো প্রথমে প্রেম-ট্রেম নিয়ে লেখে। তাই বললাম আর কী। আমি হাসতে হাসতে বললাম-আগে প্রেমের উপন্যাস লিখিনি। তবে এইবার লিখবো ভাবছি।

নীরাদের বাসা থেকে বিদায় নিয়ে নীচে নেমে এলাম। ঘরে ঢুকে দেখি এখলাস ভাই বিছানায় শুয়ে পেপার পড়ছে। আমাকে দেখে পেপারটা একপাশে রেখে শূণ্য দৃষ্টি দিয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার তাকানোর এই ভঙ্গিটা দেখে আমার হাসি পেয়ে গেল।

–কী ব্যাপার এখলাস ভাই, এমন করে তাকিয়ে আছেন কেন?
–কোন ব্যাপার-ট্যাপার না ছোট ভাই। তোমার দিকে কেবল তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছে করছে।

–ফাইজলামি রাখেন তো ভাই। খাবার টেবিলে আমি আপনাকে খুব মিস করেছি। কী এলাহি খানাপিনা!  এক্কেবারে বিয়ে বাড়ির আয়োজন।

–তাই নাকি? তা কী বুঝলা? কোন চান্স আছে?

–মানে? কীসের চান্সের কথা বলছেন?

–আরে মিয়া, মাইয়ার সাথে কোন ভাব ভালোবাসা অইবো নি?

–উফ,এখলাস ভাই! আপনি আসলেও একটা ফাউল।  মাথার ঘিলু আপনার শুকিয়ে গেছে। ঠিক কী কারনে নীরা আমার সাথে প্রেম করবে? আমি আপনার মত অত ফাউল চিন্তা করি না।

–ঠিক আছে, দেখা যাক। টাইম উইল সে এভরিথিং।

এখলাস ভাইয়ের সাথে আর কথা না বাড়িয়ে একটা ঘুম দেয়ার পরিকল্পনা করলাম। আয়েশ করে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণের ভেতর ঘুম নেমে এলো দুই চোখে। ঘুমের ঘোরে একটা স্বপ্ন দেখলাম- ছাদের এক কোণায় আমি আর নীরা বসে আছি। তার হাতে আমার লেখা গল্পের বই। সে জোরে জোরে বই থেকে পড়ে শোনাচ্ছে আমাকে। মাঝে মাঝে পড়া থামিয়ে আমাকে বলছে-হাসান,তোমার পছন্দের একটা গল্প আমাকে পড়ে শোনাও না। আমি তার হাত থেকে বই নিয়ে একটার পর একটা গল্প পড়ে যাচ্ছি। নীরা গল্প শুনছে খুব আগ্রহ নিয়ে। হঠাৎ সে আমার হাত থেকে বইটা কেড়ে নিয়ে আমাকে এক ধাক্কায় নীচে ফেলে দিল। আমি পাখির পালকের মত ভাসতে ভাসতে ছয় তলার ছাদ থেকে নীচে পড়ছি।

বুয়ার ডাকে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। মাথাটা কেমন জানি ভার ভার লাগছে। স্বপ্নের বিষয়টা আমার মাথায় গেঁথে আছে। এরকম স্বপ্ন কেন দেখলাম? পরক্ষণেই নিজেকে বললাম-স্বপ্ন আসলে দূর্বল কিংবা উত্তেজিত মস্তিস্কের কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না। আজকে দুপুরে যেহেতু রিচ ফুড খেয়েছি তাই এসব খাবার মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। তাই উল্টাপাল্টা স্বপ্ন দেখেছি। বাজারের ব্যাগ আমার সামনে এনে বুয়া বললো-ভাইজান,ছালাইয়া বাজার কইরা আনেন। রান্দনের কিছু নাই। এখলাস মামা দেশি মুরগি আনবার কইছে। পাশের বিছানা থেকে এখলাস ভাই বললো-হাসান,এক কেজি পোলাওর চাল আইনো। রাতে মুরগির মাংস আর খিচুড়ি খাবো। আমি এখলাস ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম-আহা,বেচারা এখলাস ভাই! তবুও এই লোকটাকে আমি বেশী পছন্দ করি মেসের অন্য সদস্যদের চেয়ে। তার ভেতরে কোন ঘোরপ্যাঁচ নেই। ঘোরপ্যাঁচের মানুষ আমার দুই চোখের বিষ, একদম সহ্য করতে পারি না।

দুই বছর হল মাস্টার্স শেষ করেছি। বন্ধুদের অনেকেই চাকরিতে ঢুকে গেছে। কেউ দেশের বাইরে চলে যাওয়ার চেষ্টায় আছে। আমার ভিতর এই ব্যাপারে অত তাড়া নেই। একা মানুষ,কোন পিছুটান নেই। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে কেউ আমার জন্য কোথাও অপেক্ষা করে নেই। আর এটা যখন ভাবি তখন নিজেকে পাখির পালকের মতন হালকা লাগে। আমার একটাই স্বপ্ন-সারা জীবন লেখালেখি করবো। গল্প লিখবো,উপন্যাস লিখবো–এই করে আমি বিখ্যাত হব। আমি জানি আমার ভেতর সেই শক্তি আছে। তারপরও এই ঢাকা শহরে জীবনটাকে সহজ করে চালাতে হলে মোটামুটি একটা সম্মানজনক চাকরি দরকার। লেখালেখির ফাঁকে আমি সেই চেষ্টাই করছি। দুই জায়গায় কথা চলছে। একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভি জমা দিয়েছিলাম। তারা আমার রেজাল্ট দেখে শিক্ষক হিসাবে নেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। যদি সবকিছু ঠিক থাকে তবে লেকচারার হিসাবে সেখানে কাজ শুরু করবো। এতে আমার লেখালেখিতে সময় পাওয়া যাবে। অপেক্ষায় আছি,দেখি কী হয়।

নীরার সাথে  মাঝে মাঝে দেখা হয়,কথা হয়। বিকেলে ছাদে উঠে তার হাতে  বানানো চা-নাশতা খাওয়া হয়। সে খুব আগ্রহ নিয়ে আমার লেখালেখির খোঁজ খবর করে। অনুভব করি তার উৎসাহ পেয়ে ভেতরে একটা অন্যরকম অনুভূতি খেলা করে। তারপর একটা সময়ের পর তার দেখা পাবার জন্য আমার ভেতরের কেউ একজন ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।  আর যখন তার দেখা পাইনা তখন ভাবি-  মেডিকেলের পড়াশোনায় সময় পাওয়া খুব কঠিন। তার সাথে যে আমার প্রতিদিন দেখা হতেই হবে–এমন তো কথা নেই। তবে দেখা হলে একটা অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করবে–এটা বুঝি। তাছাড়া এমনও তো হতে পারে যে,আমি যখন তার কথা ভাবছি তখন সে তার ভালোবাসার মানুষের পিঠে হেলান দিয়ে রবীন্দ্র সঙ্গীত গুনগুন করে গাইছে। যদিও নীরাকে প্রথম দেখায় আমার কাছে খুব কঠিন হৃদয়ের মানুষ বলে মনে হয়েছে। এরকম কঠিন স্বভাবের মেডিকেল পড়ুয়া একটা মেয়ে তার প্রেমিকের পিঠে হেলান দিয়ে আছে- এইরকম একটা দৃশ্য আমার কেন জানি মানতে কষ্ট হচ্ছে। আসলে এসবই অর্থহীন ভাবনা। তারপর একদিন শেষ বিকেলের কনেদেখা আলোয় আমি নীরাকে বললাম–যেহেতু আমি আপনাকে মনেপ্রাণে চাই এবং ভালোবাসি তাই আজ থেকে আপনাকে তুমি করেই বলবো। আশা করি তুমি আমাকে ফেরাবে না। সে আমার কথায় কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বললো–আমিও তোমাকে ভালোবাসি হাসান। সারা জীবনের জন্য আমি তোমাকে আমার পাশে চাই। এরপর থেকেই আমরা দুজন প্রেমিক-প্রেমিকায় রুপান্তরিত হলাম। গভীর প্রেম আমাদের ভেতর-বাহির,সর্বস্ব ভাসিয়ে নিলো প্রবল বেগে।

তিন মাস পর নীরা একদিন জানালো-তার মেডিকেল কলেজ থেকে একটা সেমিনারে এটেন্ড করতে নেপাল যাবে। চারদিনের প্রোগ্রাম। আমাকেও তার সাথে যেতে খুব জোর করলো। কিন্তু আমার অফিস থেকে ছুটি না পাওয়ায় যেতে পারিনি। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের টিকিট কনফার্ম করা থেকে শুরু করে অন্যসব কাজ আমিই তার সাথে থেকে করে দিয়েছি। সকাল দশটায় নীরার ফ্লাইট। দোতলা থেকে লাগেজ সহ নীচে নেমে সে আমার রুমে ঢুকলো। মেসে কেউ নেই। সকাল আটটার ভিতর সবাই যার যার অফিসে চলে গেছে। আমি অপেক্ষা করছি  তাকে নিয়ে এয়ারপোর্টে যাবো। রুমে ঢুকে সে আমাকে বললো–হাসান, আমার দিকে তাকিয়ে দেখো তো টিপটা কপালের মাঝখানে আছে নাকি সরে গেছে। আমি হেসে বললাম– তোমাকে দেবীর মত অপরূপ লাগছে। তবে লাল টিপটা চেঞ্জ করে অন্য কালারের একটা টিপ পরো। তাতে আরো পারফেক্ট লাগবে।

সে আমার ছোট ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে লাল টিপটা খুলে একটা খয়েরি কালারের টিপ পরে নিল। সেই লাল টিপটা আয়নার এক কোণায় গেঁথে দিল। হাসতে হাসতে বললো–আমি না ফেরা পর্যন্ত এই লাল টিপটাই হচ্ছি আমি! যখনই আমার কথা মনে পড়বে তখন এই টিপের দিকে তাকিয়ে থেকো। টের পাবে আমি তোমার হাত ধরে আছি। তারপর সে আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখলো অনেকক্ষণ।

দুপুর বারোটায় ইউএস-বাংলার ফ্লাইট-২১১ কাঠমান্ডু এয়ারপোর্টে নামার সময় ছিয়াশি জন যাত্রীসহ বিধ্বস্ত হয়। পাঁচজন আহত আর সবাই নিহত। আহত পাঁচ জনের ভিতর নীরা নেই। এই খবর নিশ্চিত হওয়ার পর নীরার বাড়িতে শোকের মাতম শুরু হয়েছে। তার মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। আমার কোন সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা নেই। কেবল বুঝতে পারছি মা বাবা চলে যাওয়ার পর যে নিঃসীম শূণ্যতা আমাকে গ্রাস করেছিল,আজ আবার সেই ভয়ানক শূণ্যতা আমাকে শেষ করে দিয়েছে।

ঘরে ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম নিশ্চুপ হয়ে। নীরার রেখে যাওয়া লাল টিপের উপর একটা গভীর চুম্বন এঁকে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম। আমাকে সান্ত্বনা দেয়ার কেউ নেই। আছে কেবল আমার একমাত্র আপন জন–নীরার লাল টিপ!

ইভান অনিরুদ্ধ। গল্পকার ও কবি। জন্মঃ ২৬ জানুয়ারি ১৯৭৮, আটপাড়া, নেত্রকোণা। উচ্চশিক্ষার পাঠ শেষ করে দীর্ঘদিন বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানিতে চাকরি করেছেন। কর্মসূত্রে দীর্ঘ ছয়বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় ছিলেন। ২০১৬ সালে দেশে ফিরে আসেন। বর্তমানে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ