নুসরাতদের গয়না লাগে না

যোষিতা
নন ফিকশন, পডকাস্ট, প্রবন্ধ
Bengali
নুসরাতদের গয়না লাগে না

যে মেয়েটি রিসেন্টলি খুন হয়েছে, যে মেয়েটিকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, সেই নুসরত আমার আত্মজা, আমার কন্যা হতে পারত। খবরটি দেখি ফেসবুকে, নানানরকমের দুঃখশোক, ক্রোধের প্রকাশ, হতাশা ইত্যাদি হয়ে চলেছে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে, আমিও তাতে মৃদু কমেন্ট করেছি, রাগের বা দুঃখের ইমো দিয়েছি, ভিডিও বা খবরের ক্লিপগুলো দেখেছি। সে আমার নিজের কন্যা হলে পারতাম এভাবে থাকতে?

মাথার ভেতর থেকে চিন্তাকে কিন্তু ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না। বিবেক আমাদের মধ্যে আজকাল কতদিন একটানা সজাগ থাকে সেটা নির্ভর করে আরও একটা সাড়া জাগানো নতুন ঘটনা কখন আসবে, তার ওপর। যেমন হয়েছিল ১৯৯০ সালে বানতলায়,  সিঙ্গুরে যেমন ২০০৬ এ তাপসী মালিককে ধর্ষণ করে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, বা মাত্র কয়েকবছর আগে দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ড, কামদুনির ঘটনা, তেমনি হবে নুসরতের বেলাতেও। ১৯৯০ তো একটা খুচরো ঘটনা মাত্র, আমাদের ট্র্যাডিশান আরও পুরোন। ধর্ষণের ট্র্যাডিশান, হত্যার ট্র্যাডিশান।

অডিও শুনুন এখানে: 

নুসরাতদের গয়না লাগে না

নুসরাতদের গয়না লাগে না…

Posted by অংশুমালী Ongshumali on Thursday, April 11, 2019

আরও বড়ো ট্র্যাডিশান আমাদের চেপে যাবার, রেখে ঢেকে লুকিয়ে ফেলার ট্র্যাডিশান। যতক্ষণ না চুড়ান্তভাবে ক্ষতবিক্ষত বা খুন হয়ে যাচ্ছে ভিক্টিম, ততক্ষণ ঘটনাগুলো হিসেবের মধ্যে আসে না। ভিক্টিম এবং তার নিকটজনেরাই সাধারণত যৌন অত্যাচারের অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নিতে চান না। কারণ এক্ষেত্রে এর মধ্যে জড়িয়ে থাকে ভিক্টিমের লজ্জা। অদ্ভূত না? অপরাধীর কোনও লজ্জা নেই, যে তার অপরাধের শিকার হচ্ছে তার যত লজ্জা।

দুনিয়ায় আর কোনও অপরাধের ক্ষেত্রে এমন উল্টো নিয়ম নেই।

চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, খুন, গুণ্ডামি, মারপিট, সমস্ত ক্ষেত্রে যে অপরাধী তাকেই লোকে ছি ছি করে। কিন্তু ধর্ষণ এমন এক ধরণের অপরাধ যেখানে অপরাধীর থেকেও বেশি ঘৃণিত হয় ভুক্তভোগী। এর কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে, যে সমাজ ঐ নিপীড়িত মেয়েটিকে আর আগের মত গ্রহণ করতে পারে না। অর্থাৎ সমাজে আগের মত গৃহীত হবার শর্ত হচ্ছে মেয়েটিকে তার নিপীড়নের ঘটনা লুকিয়ে যেতে হবে। এতে অপরাধীর সাহস কিন্তু বাড়তে থাকে। সে জানে, যে এটা এমনই একটা অপরাধ যার জন্য ভুক্তভোগী আইন আদালত পুলিশের দ্বারস্থ হবার আগে হাজারবার ভাববে। এসব সত্ত্বেও যদি নিপীড়িত মেয়েটি এর প্রতিবাদ করে, বাধা দেয়, তাহলে তার সেই স্পর্ধার জন্য তাকে শাস্তি দেবে অপরাধীরাই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরা খুনের হুমকি দেয়, বা খুন করেই ফেলে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এরকম ঘটনা বিরল নয়।

পৃথিবীতে প্রায় সমস্ত ধর্মেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা হয়েছে “লজ্জা নারীর ভূষণ”।

অবশ্য মেয়েটিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে ফেললে এ কথা চাউর করে দেওয়া যায় যে মেয়েটি লজ্জায় আত্মঘাতী হয়েছে। কী নিয়ম এই দুনিয়ার! ভুক্তভোগী লজ্জায় আত্মঘাতী হবে, এটা যেন স্বতঃসিদ্ধের মতো। কিন্তু সময় খুব ধীরে ধীরে হলেও পাল্টাচ্ছে, তাই নির্যাতিতা আত্মহত্যা না করে প্রতিবাদ করে। তখন অপরাধীরা হত্যার পথ বেছে নেয়।

প্রত্যেকবার যখন জঘন্যতম এইসব নির্যাতন বা হত্যার খবরগুলো দেখি আমার মনে প্রশ্ন তোলপাড় করে, কেন এমন হচ্ছে? শুধু যেটুকু সংবাদ মাধ্যমে আসছে সেই জঘন্যতম অপরাধের বাইরেও তো অসংখ্য অনুরূপ অপরাধ ঘটছে, সেগুলো সবই কি রেকর্ডেড মানে নথিভুক্ত হচ্ছে?

নথিভুক্ত হওয়া মানে সবসময় পুলিশের কাছে নথিভুক্ত করা নয়, কারণ পুলিশ নির্যাতিতার সঙ্গে খুব মনোরম ব্যবহার নাও করতে পারে, এমনকি ডাক্তারি পরীক্ষার সময়েও ডাক্তারেরা নির্যাতিতাকে সন্দেহের চোখে দেখেন বলে শোনা যায়। সেসব নিয়ে বলছি না।

বলছি ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করার কথা।

আমরা মেয়েরা তো যে কোনও অত্যাচারের কথা লুকিয়ে যাই, যতক্ষণ না সহ্যের বাঁধ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। লজ্জা নামক ভূষণ অর্থাৎ অলঙ্কারের ভারে নুয়ে পড়ছি, সেই অলঙ্কারের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে অত্যাচারের সমস্ত ক্ষতচিহ্ন। লজ্জা নামক গয়না নাহয় কয়েকগাছা কমই পরলাম। এখন সময় সমস্ত নিপীড়নের কথা প্রকাশ্যে আনার। পাপীরা অনায়াসে যাতে পার পেয়ে যেতে না পারে। তাদের মুখোশগুলো খুলে দেওয়া প্রয়োজন, সমাজকে সুস্থ রাখার তাগিদে।

বাংলাদেশে যে এমন ঘটনা ঘটতে পারে এ নিয়ে আমি আশ্চর্য হই নি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমার সম্পর্ক সেই আশির দশক থেকে। একটু আধটু ওপর ওপর নয়, বেশ গভীর প্রেমের সম্পর্কই ছিল, এখনও দস্তুরমতো আছে।

আমার জীবনের কিছু ঘটনা নিয়ে ধীরে ধীরে একটা দুটো বই লিখেছি, তাতে সেসব ঘটনাবলী এসেছে স্বভাবতই।

কিন্তু মুশকিল হচ্ছে যে আমার বইয়ের সম্পাদক বাধ সাধলেন কিছু কথা প্রকাশ করতে। আমার যেটা মনে হয়েছি দরকারি তথ্য, সেটা তিনি চেপে দিলেন। ঠিক সরাসরি যৌন হেনস্থার ঘটনা না হলেও, একটি বিশেষ ঘটনা আমার বই থেকে বাদ দেন সম্পাদক। সম্ভবত ভয়ে।

জীবনে আমার ওপর ঘটে যাওয়া যাবতীয় যৌন হেনস্থার ঘটনা, বা অত্যাচারের কথা আমি কখনই গোপন করি নি আমার আত্মজীবনীতে, কারণ আত্মজীবনীতে মিথ্যা লেখা যায় না। সেসব ছিল খুবই নৃশংস ঘটনাবলী, প্রকাশক সেসব ছেপেছেন, কারণ সেখানে ধর্মের উপযাজকেরা উপস্থিত ছিল না। নিম্নোক্ত ঘটনা তুলনায় অনেক হালকা হলেও তাতে ধর্মীয় উপযাজকদের উপস্থিতি সরাসরি, প্রত্যক্ষ। সম্পাদক ভয় পেলেন।

বই থেকে অংশটি বাদ পড়ল।

সেটা ১৯৮৯ সালের ঘটনা। প্রায় তিরিশ বছর আগে থেকেই লক্ষ্য করেছি, কোথায় চলেছে সমাজ। তখন আমি থাকতাম তাশখন্দে (মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানে)। আমার বয়ফ্রেন্ড ছিল বাংলাদেশী ছাত্র।

সেই বাদ দেয়া অংশটুকু সম্পাদকের বক্তব্যসহ নীচে দিচ্ছি।

“ … সেই শনিবারে আমি চুল কাটিয়ে এসেছিলাম ছোট করে। শুধু তাইই নয়, চুল ব্লীচ করে তাতে হালকা রঙও লাগানো হয়েছিলো সেলুনে। সবটুকু নয়, সরু সরু গোছা ধরে ধরে নানারকম হালকা, গাঢ় রঙের শেড, সোনালি থেকে ব্রাউন অবধি। তখন ওটাই লেটেস্ট ফ্যাশন, বেশ খরচ করতে হয়েছিল আমায়। আন্দাজ করেইছিলাম যে শাহীন রেগে যাবে, অসন্তুষ্ট হবে, বিরক্ত হবে, কটা কটু কথা শুনিয়েও দিতে পারে। কিন্তু আমি তা আর গায়ে মাখব না, সবাই বলছে যখন দেখতে ভাল লাগছে, তখন ওই একজনের মন্তব্যকে গুরুত্ব না দিলেও চলবে, সে কোনওদিনই আমার রূপের প্রশংসা করেনি, করবার সম্ভাবনাও আর দেখি না। নীচে কী একটা কারণে গেছলাম, সম্ভবত মীণাক্ষিকে দেখাতে যাব নতুন হেয়ার কাট, শাহীন দেখতে পেয়ে প্রায় অজ্ঞান হয়ে যায় আর কি! আমার এত সাহস! বলে, এক্ষুণি গিয়ে মাথার সব চুলে কালো রং করিয়ে এসো। আরও বলে, ইশ অত লম্বা চুল এভাবে কেটে ফেললে? আ হাহা হাহা! আমি বলি, আবার গজাবে, আবার লম্বা হবে হুশহুশ করে। সে ভাবতেই পারে না এরকম অবলীলাক্রমে উত্তর দেব তাকে।

একটু থমকে থেকে বলে, কাল সকালে একবার এসো, আমার দেশ থেকে কয়জন আসছে, হোটেলে আছে, তাদের দাওয়াত দিছি।

মীণাক্ষি তো আমার চুল দেখে পুরো ফিদা! ওরও ওরকম চাই, কোন সেলুন, কত রুবল নিলো, কতক্ষণ সময় লাগে, এইসব আলোচনা করতে করতেই আড্ডা জমে ক্ষীর।“

এবার সম্পাদকের বক্তব্য দেখুন –

*** নীচের এই রেডমার্ক করা প্যারাগ্রাফগুলো ফেলে দিতে চাই। এর কোনও প্রয়োজন নেই এই লেখায়। লেখাটাকে টেনে বড় করা ছাড়া আর কিছু করছে না এই প্যারাগ্রাফগুলো।

পরদিন সকালে শাহীনের সঙ্গে হোটেল উজবেকিস্তানে যাই। চারজন আলখাল্লা টাইপের লম্বা ঝুলের পাঞ্জাবি-পাজামা পরা সাদা টুপি মাথায় লোক দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। তাদের দাড়ি আছে গোঁফ নেই। খুব রাগী রাগী মুখ। তাদের কাছে এগিয়ে অভিবাদন করতে গেলেই তারা সরে সরে যায়, প্রায় দৌড়ে পালায় আর কি! সমস্যাটা বুঝলাম না। শাহীন দুটো ট্যাক্সি ডাকে, দু’জন দু’জন করে দুটো ট্যাক্সিতে ওদের বসালে ড্রাইভারের পাশে একটা ট্যাক্সিতে আমি বসব আর অন্য ট্যাক্সিতে শাহীন যাবে, তাহলেই হস্টেলে পৌঁছে যেতে পারি। দু’জন লোক ট্যাক্সির পেছনে বসে, আমি যেই সামনের দরজা খুলে ড্রাইভারের পাশে বসেছি, ড্রাইভারও গাড়ি প্রায় স্টার্ট নিয়ে ফেলেছে, লোক দু’টো পেছনের দুটো দরজা খুলে তীরবেগে ট্যাক্সির দু’দিক দিয়ে নেমে পড়ে। আরে আসুন আসুন! যতই ডাকি লোকদুটো ক্রুদ্ধ মুখে ততই পালায়, না দেয় আমার কথার উত্তর, না আসে কাছে। ভয়ঙ্কর মুখ বিকৃত করে মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, মনের মধ্যে কী সেটা খুলে তো বলুক।

শাহীনের ট্যাক্সিতে যে দুজন ছিল তাদের নিয়ে শাহীন কিছুটা এগিয়ে গেছে। এতো মহা বিপদ হলো। লোক দু’টো নিজেদের মধ্যে কী বলছে শুনতেও পাচ্ছি না, কাছাকাছি গেলেই দৌড়ে পালাচ্ছে। পাগল নাকি? একটু পরে দেখি শাহীনদের ট্যাক্সিটা ফিরে আসছে, আমাদের পেছন পেছন আসতে না দেখে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়েছে। শাহীনের কাছে ফিসফিসিয়ে কীসব বলল তারা। আমি সন্দেহ করলাম হয়তো পায়খানা পেয়েছে লোক দু’টোর, বলতে লজ্জা পাচ্ছে, তা সেরে আসুক বরং হোটেলের ভেতর থেকে আমরা ওয়েট করব। কিংবা শাহীন ওয়েট করুক, আমি বরং যারা ট্যাক্সিতে বসে আছে তাদের নিয়ে হস্টেলে চলে যাই। কিন্তু সেই ট্যাক্সিটার দিকে যেই এগিয়েছি, দরজা খুলিওনি, সেই অন্য লোকদুটো ও ওই একই ধরণের অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে দিল। আমি শাহীনকে রাশিয়ানে বললাম, এই পাগলগুলোকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবার কোনও দরকার আছে কি? শাহীন বলছে, আপনারা তবে একটা ট্যাক্সিতে যান চারজনে, আমরা আগে আগে যাচ্ছি, আপনাদের ট্যাক্সি আমাদেরটাকে ফলো করুক। লোকগুলো কী বুঝল কে জানে, ওতেই রাজি হয়ে গেল। চারপাশে রাস্তায় অনেকেই একটু দাঁড়িয়ে এই সিন এনজয় করেছে।

আমি ট্যাক্সিতে উঠে জিগ্যস করলাম, ওই লোকগুলো ওরকম কেন? শাহীন বলল, তোমাকে দেখে। মানে? আমার হেয়ার স্টাইল দেখে? নাকি ড্রেস দেখে, আমি তো দিব্যি সালোয়ার কামিজ পরেছি, ওড়না দিয়ে বুক আলাদা করে ঢাকা, স্তনের আভাসমাত্র যাতে বোঝা না যায়। জানা গেল, সেসব নয়, মেয়ে দেখলেই নাকি ওই লোকগুলো ওরকম করে, মেয়েদের সঙ্গে কোথাও যায় না, মেয়েদের দিকে তাকায়ও না। মানে তাকায় কিন্তু লুকিয়ে আড়চোখে, নইলে বুঝল কী করে যে আমি একটা মেয়ে! বাহরে তাহলে বাংলাদেশ থেকে তাশকেন্ত অবধি এল কী প্রকারে? ফ্লাইটে আর কোনও মেয়ে ছিল না? এয়ার হোস্টেস ছিল না? ইয়ার্কি নাকি? শাহীন সেসবের উত্তর জানে না, তবে ওদের এই আচরণ শাহীনের কাছে তেমন অদ্ভূতও ঠেকছে না। লোকগুলো যে আমাকে রীতিমতো ইনসাল্ট করল তা নিয়েও ওর কোনও হেলদোল নেই। কী দরকার ওই আপদগুলোকে বয়ে নিয়ে এসে কষ্ট করে রান্নাবান্না করে খাওয়ানোর। সকালে মুর্গীগুলো নাহয় শাহীন বিসমিল্লা বলে বলে হালাল করেছে, কিন্তু বাকি রান্নাটা? সেটায় তো এই কাফেরের হাত ছিল, পেঁয়াজ কাটা থেকে চেটে টেস্ট করে দেখা অবধি। সেসব খাবে ওরা জানতে পারলে? মেয়েদের প্রতি এত ঘৃণা? ঘরে মা-বোন নেই, বিয়ে থা করেছে লোকগুলো? শাহীন ক্রমশ রেগে যায়, বলে তুমি একদম আসবে না আমার রুমে এখন।

আমি মুচকি মুচকি হাসি। সোজা মীণাক্ষির ঘরে চলে যাই। সে তো দোতলায় থাকে। শাহীন হয়তো ভয় পেয়েছিল আমি রাগের মাথায় অনর্থ করব, কিন্তু আমার মাথায় ঢুকছে না ওই চারজনকে এত তেল দেবার কী দরকার? ওদের খাই না পরি? যেমন বিচ্ছিরি ব্যবহার, তেমনি পাগলের মতো কাণ্ডকারখানা করছে লোকগুলো। হস্টেলেও তো মেয়ে আছে, গেটেই দুজন চৌকিদার মহিলা, তাদের দেখে আবার দৌড়ে পালাতে শুরু করে দেবে না তো? সে এক মজার সিন হবে কিন্তু। কিন্তু সিনটা দেখব কেমন করে, শাহীন আমাদের ঘরের বাইরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে গেছে যাতে আমরা বের হতে না পারি। আমরাও কম যাই না, তার উপর আমার তো এখন একগাদা জুনিয়র বন্ধু আছে, আর তো একা নই। মীণাক্ষির ব্যালকনি দিয়ে ডিঙিয়ে অন্য ব্যালকনিতে গিয়ে অনেক কায়দা কসরৎ করে বের হওয়া গেল। এখন দরকার উচিত শিক্ষা দেওয়া ওই লোকগুলোকে তো বটেই শাহীনকেও। তোমার প্রেমিকাকে যারা অপমান করছে, তুমি তাদের ডেকে ডেকে পোলাও রাজভোগ, থুড়ি পোলাও মাংস খাওয়াবে? ইল্লি আরকি! মীণাক্ষি তেরে পাস লাল মির্চি হ্যায়? হ্যায় লেকিন― রুক যা! আমি নিজের ঘরে গিয়ে নতুন প্যাকেট বের করি, সোজা শাহীনদের ব্লকে, ঘরের দরজাটা অল্প ফাঁক করা আছে, একেবারে দরজার পাশেই মিটসেলফ। সদ্য রান্নাঘর থেকে নিয়ে আসা ভারি একটা পাত্র। এটায় মাংস না পোলাও? সন্তর্পনে ঢাকনাটা খুলেই পুরো লঙ্কার গুঁড়ো তাতে খালি করে, ঢাকনা বন্ধ করে দিয়ে দৌড়। শোনা যায় প্রথম গ্রাসেই ঝালের মাত্রা সম্পর্কে ধারণা হওয়ায়, সেই অতিথিদের জন্য ওই মাংস ধুয়ে আবার রাঁধা হয়েছিল। আর ওই দিকে যাইনি।

 পাঠক, সেই ১৯৮৯ সালেই সেই ছাত্রী অবস্থাতেই বুঝে গেছলাম, দুনিয়ার বেশ কিছু লোক মেয়েদের “পণ্য (মাল)” হিসেবে দেখে। সমানাধিকার তো অনেক পরের প্রশ্ন।

এরও তিরিশ বছর পরে ২০১৯ এ বইটি প্রকাশ হবার সময় বুঝলাম সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে। আমি ঘটনা নথিভুক্ত করতে চাইলেও প্রকাশক চাইবেন না।

পরিশেষে এটুকুই বলবার যে অপরাধীদের শাস্তির জন্য তো সোচ্চার হবই, কিন্তু যতদিন ভিক্টিমেরা এ ধরণের অপরাধ লুকিয়ে যেতে থাকবে, ততদিন তারাই অপরাধীদের আড়াল করবে। লজ্জা নামক অলঙ্কার না পরলে ভয় নামক জড়তাও পালায়। সাহসী মানুষী খুব সুন্দর, তাকে গয়না পরতে হয় না।

যোষিতা। লেখক ও কম্পিউটার প্রকৌশলী। জন্ম ও বেড়ে ওঠা উত্তর কলকাতায়। ১৯৮৫ সালে উচ্চশিক্ষার্থে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নে যাত্রা। প্রাক-পেরেস্ত্রৈকা ও তৎপরবর্তীকাল, সবমিলিয়ে দশ বছর কাটিয়েছেন মধ্যএশিয়ার উজবেকিস্তানে। তিনি সামাজিক প্রথাবহির্ভূত জীবনের পাশবইয়ে জমার অঙ্ক ভরে তুলেছেন বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞান। ১৯৯৫ সালের...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ