নূরুল হকের সনেটগুচ্ছ

নূরুল হক
কবিতা
Bengali
নূরুল হকের সনেটগুচ্ছ

আমাকে খণ্ডিত করে

চোখের শরীর বেয়ে নামে ঘুম অন্ধকার শীতে।
ঢুলো ঢুলো ভেজা আঁখি পাতা মুখে তোল হাই।
অদৃশ্য ইঙ্গিতে বলো কথা হবে নীরবে নিভৃতে।
কাজেতে বিভোর দিন , সন্ধ্যা হলে ঘুমের দোহাই।

লতানো শরীরখানি হয়ে যায় অচেতন লাশ।
আমিও কেমন যেন রাত জেগে প্রতীক্ষায় থাকি।
চোখের পালক থেকে ঝরে জল সিক্ত হয় ঘাস।
তোমার মুখের স্বর রুদ্ধ করে ঘুম ঘুম আঁখি।

এভাবে বসন্ত আসে তার সেই ঘুমের পিপাসা।
মিটেনা কখনো আহা গ্রীষ্ম কিম্বা হেমন্তে শরতে।
বুকে ও পাঁজরে শুধু জমা হয় সমুদয় আশা।
ভ্রান্তির ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে স্নায়ুর পরতে ।

কামিনী ফুলের ঘ্রানে দীর্ঘ হয় কাঙ্খিত রাত।
আমাকে খন্ডিত করে তার সেই ঘুমের করাত ।

 

কখনো সে পাখি রাত জাগা

সমগ্র ললাটে তার সুর্যচিহ্ন লাল রঙা টিপ
চুলের সড়ক ধরে হেটে যায় সোনার চিরুনি
চোখ দুটি যেন এক ভাসমান লুপ্ত অন্তরীপ
গলায় মুক্তোর মালা চিরায়ত রিনিঝিনি শুনি।
লোকজ শাড়িতে তার সভ্যতার ঘোর লাগা ঢেউ
বসনে ভূষণে মাখা আংরাখা সোনায় সোহাগা
তাহাকে চিত্রিত করি অন্তপুরে নয় কিছু ফেউ
কখনো ঘুমায় সখি কখনো সে পাখি রাত জাগা

আমি কি দেখেছি তাকে, জাগরণে দুটি চর্মচক্ষে
তাহলে কি করে আঁকি তার ছবি অতৃপ্ত নয়নে
যার ছবি ভেসে ওঠে হৃদমাঝে আমার অলক্ষ্যে
আহারে অনূঢ়া দিন রক্তপাত নগ্ননিশিক্ষণে

কখনো ডাকিনি কাছে সাক্ষী আছে বৃক্ষ হরিতকী
রাতের থাকেনা রাত, নিশি যেন প্রেমহীন সখি

 

অনিন্দ্যসুন্দর তুমি চন্দ্রমুখী

অনিন্দ্যসুন্দর তুমি চন্দ্রমুখী সরু কটিদেশ
তোমার উপমা তুমি চিরায়ত আলোকের শিখা
সায়াহ্নে তোমাকে দেখি বহুবর্ণা আমি অনিমেষ
প্রভাত সূর্যের মতো কান্তিমান শুভ্র রজটিকা

তোমাকে আরাধ্য করি অশ্রুজলে অনমিত শিরে
তোমাকে ধারণ করি বক্ষমাঝে রুপালি আখরে
তোমাকে সাজিয়ে রাখি থরে থরে মনের মন্দিরে
তোমাকে আবৃত্তি করি স্বরবৃত্তে সাহিত্য বাসরে

আমার চুলের ঝাড়ে খেলা করে তোমার আবেগ
আমার হৃদয় জলে দোল খায় রুপের সাম্পান
তোমার ইঙ্গিতে কেটে যায় আহা অপ্রাপ্তির মেঘ
আমার চোখের পাতা নাচে আর গায় শুধু গান।

হৃদয়ে হৃদয় ঘষে জ্বেলে দাও ঘুমের আগুন
তোমাকে আরাধ্য করি ,যেন তুমি স্বপ্নের প্রসুন

কালের ধুলির মতো

কেটে গেলো কতোকাল উন্মাতাল আলোর নগরে
উদ্ভাসিত ত্রিমোহনী ত্রিতরঙ্গে হাসে আর ভাসে
মোহন রাখাল এক পাল ছেড়ে একা খেলা করে
হিজল তমাল তলে এই গঞ্জে প্রেমের উচ্ছ্বাসে
সময়ের খাল হয়ে বয়ে গেলো কতোটুকু শ্রম
ধূসর আঙ্গিনা জুড়ে থোকাথোকা অপ্রাপ্তির ফুল
পর্যটক পাখিগুলো অবশেষে বুঝে সেই ভ্রম
কেবল বুঝিনা আমি। এ কেমন তার চক্ষুশূল

এইসব দিন আর নৃত্যকলা নানা অবক্ষয়ে
কালের ধুলির মতো উড়ে যায় শুধু বেখেয়ালে
তখন সে ক্লান্ত প্রাণ বলে উঠে আমি শিবালয়ে
একদা ছিলাম বটে। মাখামাখি জলজ শৈবালে

এখন নাচে না রাধা শশীলজ , অচেনা প্রান্তর
আহারে সোনার দেশ। প্রত্নতত্ত্ব রুদ্ধ তার স্বর্।।

আল মাহমুদ

( আল মাহমুদকে নিবেদিত )

দেখেছি অনেক বৃক্ষ কিছু তার হতাশার ঝড়ে
কালের ধুলির মতো মিশে গেছে আকাশের নীলে
দেখিনা তাদের আমি কবিতার উদগ্র মিছিলে
তুমিতো একাই শুধু লিখো নাম রূপালি আখরে
দেখেছি অনেক বৃক্ষ কিছু কিছু কালান্তর ঝড়ে
ডুবে গেছে পদচিহ্ন পোতাশ্রয়ে খালে আর বিলে
এখন কবিতা নেই, কেহ কেহ বিমর্ষ নিখিলে
বেখবরে পড়ে থাকে ছন্দহীন লাশ কাটা ঘরে

স্মৃতির ফলক নিয়ে করপুটে তুমি আর আমি
হেটে গিয়ে দ্বিধাহীন পৃথিবীর তল্লাটে তল্লাটে
খুজেঁ ফিরি খুদকনা। কারো কারো এর চেয়ে দামী
হয়তো কিছুই নেই শস্য শূন্য জীবিকার মাঠে

তোমার কলম হোক নিরন্নের তীক্ষ্ণ তলোয়ার
নিরক্ত স্বদেশে ফের জ্বলে উঠো মিনতি আমার

 

ক্ষমা করে দিও

হৃদয়ে হৃদয় ঘষে যে আগুন জ্বেলেছিলে তুমি
সময়ের ব্যবধানে ধীরে ধীরে নিভে গেল আজ
আমিও তোমার মতো নগরের পদধূলি চুমি
সাজিয়েছি একে একে তোমাকেই, সুষমা স্বরাজ

এইতো সেদিন আমি পৃথিবীর অক্ষরেখা আর
নগরের বুক থেকে তুলে এনে কতিপয় মিল
গেথেছি কবিতা গান ভেঙ্গে দিয়ে অভেদ প্রকার
অখণ্ড হৃদয় আজ খান খান খণ্ডিত নিখিল

এখনো তোমাকে ডাকি টেলিফোনে ভুলকরে আমি
না শোনার ভান করে পড়ে থাক দূর বৃন্দাবনে
জেনে গেছি পৃথিবীর এ গোলার্ধে সুর্য অস্তগামী
নিরাকার অন্ধকার নেমে আসে নির্বোধ নয়নে

না ভুলার অক্ষমতা ক্ষমা করে দিও নিজ গুনে
জানিনা হৃদয় কেন বারবার প্রেম বীজ বুনে

 

সে আসে

সে আসে
কাজের ফাঁকে ফাঁকে
নানা সুষমায়
শব্দের কলসী কাঁকে
ছল করে জলের , জলজ মহিমায়

সে আসে অনিবার
অদৃশ্যে অফুরান প্রাণ শক্তি নিয়ে
নিজেকে উজাড় করে
অন্তহীন ভাবনার মোড়কে লুকিয়ে
সে আসে। বারবার আসে

সে আসে
প্রতিদিন, প্রতিটি বোশেখে
কাব্য নয়। কাজ নয়
পদদলে পরাজয়
ছন্দের লাবণ্য গায়ে মেখে
লুটোপুটি দূর্বাঘাসে
উত্তরের ধূলিঝড় মাড়িয়ে
সে আসে, কেবলই আসে

সে আসে
কাজের ফাঁকে ফাঁকে
মেঘনা তিতাস আর
ধলেশ্বরী কালীগঙ্গা, ঝাঁকে ঝাঁকে
উপছে পড়া উচ্ছ্বাসে
কখনো স্বপ্নের মধুমাসে
অনুভবে দুরন্ত দূর্বার

সে আসে
কবিতার জমিন জুড়ে
নিজেকে সাজাতে
আনমনে উজ্জীবিত দখিনা বাতাসে
ওড়ে মন ফুরফুরে
সে আসে অতি সঙ্গোপনে

 

তুমিহীন এই আমি একা

ঘনঘোর রাত্রি শেষ। তবু কেন কাটে না আঁধার
নিশির শিশির মাখা অরুণাভ অরণ্যে অধীর
বুকে চেপে বসে আছে বিন্দাঁচল পাহাড় বাধার
আমি হবো পৃথিবীর সর্বশেষ ক্লান্ত মুসাফির

বিরহে বিধ্বস্ত রাত। আশাহীন স্বপ্নশূন্য আমি
হেঁটে যাই আঁধারের হাত ধরে একা ও একাকী
স্মৃতির পকেট থেকে খসে পড়ে কিছু অনুগামী
অন্তরঙ্গ বিহগের সুর আর অলৌকিক রাখী।

রাতের প্রহরী পক্ষী সাক্ষী আছে রজনী জাগার
সুনসান নীরবতা টুপটাপ কুয়াশা পতন
এখন বুঝেছি আমি এ পৃথিবী বর্জের ভাগাড়
কেউ নেই বিড়ম্বিত হতভাগ্য আমার মতন।

তুমি ছিলে ছায়াসঙ্গী স্বনির্ভর আশার প্রতীক
তুমিহীন রাত্রি শেষে আমি আজ হারিয়েছি দিক।

নূরুল হক। কবি। জন্ম বাংলাদেশের কুমিল্লায়। বর্তমান নিবাস রুমানিয়া। তিনি রুমানিয়ায় অবস্থিত মুনির মেইজিদ ফাউন্ডেশন এর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণ কমিটির সদস্য। প্রকাশিত বই: ২০টি। 'পেইন অফ ইনোসেন্স' কাব্যগ্রন্থের জন্য 'ইয়াসির আরাফাত বিশ্ব শান্তি পুরষ্কার' ছাড়াও বিভিন্ন সনদ ডিপ্লোমা ও সম্মাননায় ভূষিত...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

বেশরম

বেশরম

বেশরম কি কঠিন ছিলো, ডুব সাঁতারের রুদ্ধ দম তোমাকে ভুলেছি ঠিক এক বেশরম- আবার পড়েছি…..

তোমার জন্য

তোমার জন্য

পাষাণের প্রেম বিকট স্তব্ধতায় সুনিপুণ সীমানা প্রাচীর তুলেছ, বেসামাল ভালোবাসার জাগতিক জায়নামাজে। প্রার্থনার গতিরোধ করো…..