নৈতিক অবক্ষয়

রুদ্র অয়ন
ছোটগল্প
Bengali
নৈতিক অবক্ষয়
 
চারটা বাজতে এখনো পনের মিনিট বাকি।চেম্বারের সামনে গাড়ি থামতেই ডাক্তার দেখেন বহু মানুষের ভিড়। হিতে বিপরীত দৃশ্য।এত রোগীর আশা ছিল না।যাক অন্তত ঢাকা থেকে আসা যাওয়ার টাকাটা অন্তত ওঠবে। অবশ্য এইখানে চেম্বার খুলেছেন নিজ থানা শহরে একটু জনপ্রিয়তা বাড়ানো এই আরকি।
গাড়ি থেকে নেমেই অ্যাসিসটেন্ট সবাইকে বলে দিল স্যার এখন ফ্রেশ হবেন।ঠিক চারটা থেকেই রোগী দেখা শুরু করবেন।
ডাক্তার ফ্রেশ হয়ে এসে চেম্বারের তুলতুলে চেয়ারটায় বসলেন। অ্যাসিসটেন্ট বলল
-স্যার, ডাকা শুরু করব?
-হ্যাঁ, এখন ডাকতে পারো।
অ্যাসিসটেন্ট ডাকল
-এ….ক।
প্রথম সিরিয়ালের রোগী আসল।চেকআপ করে ঔষুধ লিখে দিলেন ডাক্তার ।বেচারা প্রশ্ন করে বসল
-স্যার,ঔষুধ দিবেন না?
ডাক্তার বললেন –
-এই যে লিখে দিলাম তো।
-না,মানে স্যার তাহলে ওষুধ কে দিবে?
ডাক্তার বুঝতে পারলেন বেচারা লোকটি ডাক্তার মানে বুঝে ফার্মেসির লোক। ডাক্তার তাকে বললেন
-চাচা,কোন এক ফার্মাসি থেকে কিনে নিয়েন।
আবার বেচারা বলে বসল
-তাহলে পাঁচশ টাকা দিলাম যে।
ডাক্তার এইবার শিউর তিনি কোনদিন ডাক্তারের কাছেই যাননি, তাকে ডাক্তার বললেন
-চাচা,এটা ভিজিটের টাকা।
ডাক্তার অ্যাসিসটেন্টকে ডেকে তাকে ভালো করে বুঝিয়ে দিতে বললেন। অ্যাসিসটেন্ট দুই নম্বর সিরিয়ালের রোগি ডেকে লোকটিকে নিয়ে বাইরে যেতে উদ্যত হলো। তাকে বুঝিয়ে বাড়ি চলে যেতে বললো। তবু বেচারা বৃদ্ধ লোক অসন্তুষ্টির ঢেকুর তোলে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল।
দ্বিতীয় সিরিয়ালের রোগী দেখা শেষ না হতে দেখা গেল একটা পুলিশের গাড়ি এসে থামল চেম্বারের সামনে। ডাক্তার রোগী দেখছে আর খেয়াল করছে।দেখে গাড়ি হতে একটা ভূড়িওয়ালা লোক এই দিকে আসছে।লোক বললে ভুল হবে,পুলিশের ড্রেস গায়ে তার মানে হয়তে পুলিশই হবে। বয়স ৪০-৪২ হবে।
অ্যাসিসটেন্ট ডাকল,’তিন’
ততক্ষণে পুলিশ চেম্বারের টেবিলটার সামনে এসে দাঁড়াল, আর বলল ডাক্তার সাহেব আমিই তিন নাম্বার সিরিয়ালের রোগী। ডাক্তার সমাদারের সহিত বললেন
-ও আচ্ছা,বসেন বসেন।কেমন আছেন?
প্রশ্ন করে উনার শার্টের দিকে তাকাতেই দেখে লেখা।পুলিশ সুপার খাইরুল হক। ডাক্তারের চিনতে বাকি রইল না।
তিনি শুকনো মুখে উত্তর দিল
-ভাল কিভাবে থাকি?
-কেন কী হয়েছে স্যার?
ডাক্তার আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো।
-রাতে আপনার অ্যাসিসটেন্টকে বলেছিলাম সবার আগে সিরিয়াল দিতে, সে দিল কিনা তিন নাম্বারে।
ডাক্তার তোষামোদের মুডে উত্তর দিলেন।
-সেটা কোনো ব্যাপার না স্যার!আপনি যখনই আসতেন আমি তো তখনই ট্রিটমেন্ট করতাম।
পুলিশ সাহেব সন্তুষ্ট হয়ে বলল
-হু,সেটাই।
ডাক্তার এবার চেম্বার আসার কারণ জিজ্ঞাস করলেন।
-স্যার,আপনার সমস্যা কী বলুন? মানে কেন এসেছেন
-সমস্যা কিছুই না
-কিছু না মানে,স্যার?
-না,মানে আমি নাকি দিন দিন আনম্মার্ট হয়ে যাচ্ছি।
-কী বলেন স্যার।কে বলল আপনি আনস্মার্ট হয়ে যাচ্ছেন? আপনি তো এখনো যথেষ্ট স্মার্টই আছেন।
পুলিশ সুপার মনোকষ্ট নিয়ে বলল
-কে আর বলবে?শুধু কি তাই?সে আরো বলে আমি নাকি তার সঙ্গে এখন মানাই না।
ডাক্তারের আর বুঝার বাকি রইল না যে এইসব তার নিজ স্ত্রীর কথা। ডাক্তার ভাবে উনার স্ত্রীর কথা,এই বয়সেও তিনি স্মার্ট স্বামী চায়। ডাক্তার একটু ভেবে বললেন
-আচ্ছা,স্যার আপনাকে গিন্নি আনস্মার্ট ভাবে কেন?
-ভূঁড়ি।আমার ভূঁড়ি নাকি দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে, থামবে না নাকি কখনো।
-ভূঁড়ির জন্যই আপনাকে তিনি আনস্মার্ট ভাবেন।
-হ্যাঁ,আপনি দ্রুত ওষুধ লেখেন।টাকার চিন্তা করবেন না কী কী করতে হবে আপনি শুধু বলেন।
-স্যার বলি কি! ভূঁড়ি কমানোর ট্যাবলেট কিংবা সার্জারি কিংবা ওষুধ এখনো আবিষ্কার হয়নি যে।
পুলিশ সাহেব ডাক্তারের কথা শুনে হতাশার কণ্ঠে জবাব দিল,
-তাহলে কি আমার প্রতিদিন বউয়ের এসব কথা শুনতে হবে?
-স্যার,ভূড়ি কমানোর জন্য আমার নিজের আবিষ্কার করা একটা ট্রিটমেন্ট আছে।
-সেটাই তো আমি চাচ্ছি।আপনি শুধু বলেন।
-আপনি ওষুধটা ফলো করতে পারবেন তো?
-পারবো না মানে?আপনি ওষুধ লিখুন আর বলেন কোথায় পাওয়া যাবে।
-না,মানে স্যার সেটা কোন ওষুধ না!সেটা করলে আপনার কাজ হতে পারে..
-আচ্ছা আপনি সেটাই বলেন?
ডাক্তার বুকে হিমালয়ের মত সাহস জমিয়ে বলেই দিলো
-স্যার, ঘুষ খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। দেখবেন ঠিকই এই রোগ থেকে প্রতিকার পেয়ে যাবেন। সব সময় টাকার চিন্তা না করে, ঘুষটুস ছেড়ে একটু জঞ্জালমুক্ত থাকার চেষ্টা করুন। দেখবেন অনেকটা স্মার্ট হয়ে যাবেন।
ডাক্তার পুলিশ সুপারের দিকে তাকিয়ে রইলেন আর টের পেতে লাগলেন স্যারের মুখ থেকে এখনই একটা বোমা ফাটবে হয়তো! হঠাৎ হুরমুর করে হাঁপাতে হাঁপাতে একজন রোগী চেম্বারে প্রবেশ করে বললো, ডাক্তার সাহেব, এমনিতেই আগে সিরিয়ালের জন্যে দুইশত টাকা ভিজিটের চেয়ে বেশি দিয়েছি! বুকের ব্যথায় থাকতে না পেরে ঢুকে পড়লাম ডাক্তার সাহেব।
  পুলিশ সুপার এবার ডাক্তারের দিকে চেয়ে মুচকি হেসে বললেন, আমাকে ঘুষ না খাওয়ার পরামর্শ দিলেন ডাক্তার সাহেব অথচ আপনার এখানেও দেখি অনিয়ম অনৈতিক টাকার খেলা চলে!
 ডাক্তার সাহেব মুচকি একটা হাসি দিলেন! হাসির আডালে অনৈতিক ব্যাপারটা ঢাকতে চেয়েছেন হয়তো!
প্রায় সবখানেই আজকাল অনিয়ম অনৈতিক কর্মকাণ্ড যেন নিয়মে পরিনত হয়েগেছে!  এমনটাই অনৈতিক ব্যাপার স্যাপার আজকাল এদেশের সর্বত্র! যারা নীতির কথা বলে বেড়ান অধিকাংশ তারাই অনৈতিক কাজ কর্মে লিপ্ত থাকেন! এদের পাল্লায় পড়ে সাধারণ মানুষের নাজেহাল অবস্থা! এরাওতো মানুষ নামের মানুষ কিন্তু সত্যিকার মানুষ এরা কবে হবে?

রুদ্র অয়ন। কবি।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

পটচিত্র

পটচিত্র

  সৌম দাদুর কাছে থাকতে ভালোবাসত। গ্রামের নাম পাঁচুন্দি।আশেপাশে প্রচুর গ্রাম।সবাই সকলের খবর রাখে।সৌমদীপ এখানকার…..