নোবেলজয়ী আব্দুলরজাক গুরনা ও তার সাহিত্যকৃতি

সজল কুমার মাইতি
প্রবন্ধ
Bengali
নোবেলজয়ী আব্দুলরজাক গুরনা ও তার সাহিত্যকৃতি

আব্দুলরজাক গুরনা এই বছরের অর্থাৎ ২0২১ সালের সাহিত্যের নোবেল পদক জয়ী। গুরনার জন্ম ১৯৪৮ সালে। আফ্রিকা মহাদেশের তাঞ্জানিয়া রাষ্ট্রের জাঞ্জিবর নামক এক সুন্দর দ্বীপে তার জন্ম। এই দ্বীপে ছোটোবেলা কেটেছে গুরনার। ভারত মহাসাগরের একটি দ্বীপ এই জাঞ্জিবর একটি মহানগরী বা কসমোপলিটন সিটি। এই দ্বীপেই গুরনার বেড়ে ওঠা। কিন্তু ভাগ্যের কালচক্রে উনিশ শতকের ষাটের দশকের শেষভাগে জন্মভূমিচ্যুত হয়ে উদ্বাস্তু হিসেবে ইংল্যাণ্ডে আসতে বাধ্য হন গুনরা। ১৯৬৩ সালের ডিসেম্বর মাসে এই জাঞ্জিবর দ্বীপ ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে স্বাধীন হয়। ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপরাষ্ট্র একসময় সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রানকেন্দ্র ছিল। বিভিন্ন ঔপনিবেশিক শক্তি যেমন – পর্তুগীজ, আরব, জার্মান ও ব্রিটিশদের বিভিন্ন রকমের অত্যাচারের সাক্ষী থেকেছে এই দ্বীপ। এই দ্বীপরাষ্ট্র জাঞ্জিবর সমস্ত পৃথিবীর সঙ্গে ব্যবসা বানিজ্যে বহুকাল থেকে যুক্ত। দাস ব্যবসা ও ঐতিহাসিকভাবে এই রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত। এই জাঞ্জিবর গ্লোবাইলেজশনের আগে ও এক বিশ্বজনীন সমাজের অংশ ছিল। এই স্বাধীন দ্বীপের প্রথম রাষ্ট্রপতি হন আবেদ আমিনি কুমাশে। দুর্ভাগ্যক্রমে, এই রাষ্ট্রপতির রাজত্বে আরব দেশীয় নাগরিকদের ওপর অত্যাচার, হানাহানি ও বিতাড়ন শুরু হয়ে যায়। গুরনা এই ধর্মীয় গ্রুপের অনর্ভুক্ত হওয়ায় অত্যাচারের শিকার হন এবং স্কুল শিক্ষা শেষ করে আঠের বছর বয়সে নিজের পরিবার ও দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরমধ্যে এই দ্বীপ নব গঠিত স্বাধীন সার্বভৌম তাঞ্জানিয়া রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়।

নির্বাসিত জীবনে গুরনা বহুকষ্টে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যান। এই অবস্থায় গুরনা তার লেখালেখিতে হাত পাকাতে থাকেন। ইংল্যাণ্ডে উদ্বাস্তু অবস্থায় একুশ বছর বয়সে গুরনার লেখক জীবনের শুরু। যদিও গুরনার মাতৃ ভাষা স্বহিলি; ইংরেজি তার সাহিত্যের ভাষা হয়ে উঠেছিল। ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে গুরনা শেক্সপিয়র ও ভি এস নাইপলের লেখার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। ইতিমধ্যে তিনি ক্যান্টারবেরির কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ও উত্তর ঔপনিবেশিক সাহিত্যের অধ্যাপক পদে যোগ দেন। অবসরের সময় পয্যর্ন্ত গুরনা এই পদে কাজ করে গেছেন। এই সময়ে তিনি মূলত ওলে সোয়েঙ্কা, নুইগি ওয়া থিয়ঙ্গ ও সলমন রুশদির লেখা নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে আলোচনা করতেন।

গুরনার লেখা দশটি উপন্যাস ও কিছু ছোট গল্প প্রকাশিত হয়েছে। তার লেখার মধ্যে উদ্বাস্তু জীবনের উথাল পাথালের ঘটনাই মূল প্রতিপাদ্য হয়ে উঠেছে। এই সকল লেখা তার মাতৃ ভাষা স্বহিলিতে নয়, এই লেখাগুলি তার সাহিত্যের ভাষা ইংরেজিতে লেখা। যদিও তার জীবনের শুরুর লেখাকে সাহিত্য বলা যাবে কিনা সে প্রশ্ন থাকতে পারে! আরবি ও পার্সি কবিতা, আরব্য রজনী ও কুরআনের সুরা – এইগুলি সাহিত্যের পর্যায় পড়ে কিনা তা পাঠকের বিচার্য। গুরনা তার লেখায় ইংরেজি সাহিত্যের প্রচলিত প্রথা থেকে সরে এসে আলাদা বৈশিষ্ট্য তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার লেখায় গুরনা বারে বারে চেষ্টা করেছেন প্রাক ঔপনিবেশিক আফ্রিকার নস্টালজিক স্মৃতি পরিহার করার। তার লেখায় গুরনার নির্বাসিত জীবনের কথা, উদ্বাস্তু জীবনের কথা এবং যে জায়গা তিনি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন সেই স্মৃতিকথা ও ঘুরেফিরে এসেছে।

গুরনার প্রথম উপন্যাস ‘ মেমরি অফ ডিপার্চার ‘ ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাস এক ব্যর্থ বিদ্রোহের কাহিনি। দক্ষিণ আফ্রিকা মহাদেশের ঘটনাবলীর মধ্যে এই উপন্যাস আমাদের আটকে রাখে। এই উপন্যাসের তরতাজা যুবা নায়ক উপকূলবর্তী এই অঞ্চলের রহস্যময় অশুভ পরিবেশ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। নাইরোবিতে ধনী কাকার কাছে চলে আসে ভাগ্যের খোঁজে। ভেবেছিল ধনী কাকা তাকে তার ক্যারিয়ার গড়তে সাহায্য করবে। পরিবর্তে তার কপালে জুটলো অপমান, লাঞ্ছনা। ভগ্ন হৃদয়ে সে ফিরে আসে তার সেই ছেড়ে যাওয়া বিচ্ছিন্ন পরিবারের কাছে। এই পরিবারে বাবা এখন সর্বক্ষনের নেশাগ্রস্ত, পরিবারের অন্য সদস্যরা তার অত্যাচারের শিকার। নিজের বোন আজ বাধ্য হয়েছে গনিকাবৃত্তি বেছে নিতে।

গুরনার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘ পিলগ্রিমস ওয়ে ‘ (১৯৮৮) নির্বাসিত জীবনের বহুমুখী বাস্তবতার এক পরীক্ষামূলক কাহিনি। এর নায়ক দাউদ ইংল্যান্ডে তার নতুন গৃহভূমিতে জাতিবিদ্বেষের শিকার হয়। প্রথমে নিজের অতীত ইতিহাস গোপন রেখেও পরে এক মহিলার প্রেমে পড়ে আসল সত্যি বলতে বাধ্য হয়। ফ্ল্যাশব্যাকে গিয়ে নায়ক নিজের দুঃখদায়ক বেড়ে ওঠার স্মৃতি মনে করে। তাঞ্জানিয়ার রাজনৈতিক উথাল পাতালের দুঃস্বপ্নের স্মৃতিও ভেসে ওঠে মনের মনিকোঠায়। এই পরিস্থিতি তো তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল! উপন্যাসের শেষে দাউদকে ক্যান্টারবেরির ক্যাথেড্রালে খ্রিস্টধর্মীদের সঙ্গে একসাথে উপাসনা করতে দেখা যায়, ঠিক আগের মতো। পূর্বতন ঔপনিবেশিক শাসকের বিরুদ্ধে বারবার এই নায়ককে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে। কিন্তু শেষে সুখ পরিসমাপ্তি ঘটেছে। এই উপন্যাস যেন এক আদর্শ ধর্মানুশাসনের মাধ্যমে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ রূপ পরিগ্রহন করেছে। ইতিহাস ও সাহিত্যের অতীত উদাহরণের সংমিশ্রনে নিজস্ব পরিচিতি, স্মৃতি ও আত্মীয়তার এক সুমেলবন্ধন ঘটেছে গুরনার এই উপন্যাসে।

গুরনা তার সহজ সরল বর্ননার মাধ্যমে কষ্টার্জিত অন্তর্দশনের চিত্র নির্মাণ করে থাকেন। তার তৃতীয় উপন্যাস ‘ দোত্তি ‘ (১৯৯০) এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই উপন্যাসে ১৯৫০শের দশকের জাতিবিদ্বেষে দগ্ধ ইংল্যাণ্ডের এক কঠিন পরিবেশে বেড়ে ওঠা এক অভিবাসী অতীতযুক্ত এক নিগ্রো ভদ্রমহিলার কাহিনি চিত্রিত হয়েছে। এর প্রানকেন্দ্রে জড়িয়ে আছে এই মহিলার মায়ের পরিবার বিচ্ছিন্নতার নীরব কাহিনি। এই ভদ্রমহিলা ইংল্যান্ডে নিজেকে ছিন্নমূল মনে করেন। এই দেশ – যেখানে তিনি জন্মগ্রহন করেছেন, বড় হয়েছেন। এই উপন্যাসের নায়িকা বই ও গল্পের মাধ্যমে নিজের আলাদা জগত ও পরিচিতি তৈরি করতে থাকেন। বই পড়ার মধ্য দিয়ে নিজের নবনির্মান করতে থাকেন। শুধু নাম নয়, এই উপন্যাসের মূল ভূমিকায় থাকে ক্রমাগত নামের পরিবর্তন। এর মাধ্যমে গুরনার সম্পূর্ণ ভাবপ্রবনতা বর্জিত অথচ গভীর আবেগ ও মানসিক কুশলতার পরিচয় পাওয়া যায় এই উপন্যাসের মধ্যে।

গুরনার চতুর্থ উপন্যাস ‘ প্যারাডাইস’ (১৯৯৪) তাকে লেখক হিসেবে সাফল্য এনে দিয়েছে। ১৯৯০ সালে পূর্ব আফ্রিকা ভ্রমনের গবেষণামূলক রসদ থেকেই এই কাহিনির জন্ম। কাহিনির নায়ক সহজ সরল যুবক ইউসুফের অন্ধকারময় জগতে ভ্রমনের ইতিবৃত্ত চিত্রিত হয়েছে এই উপন্যাসে। এই লেখায় ব্রিটিশ লেখক জোসেফ কনরাডের প্রভাব পরিস্ফুট হয়েছে। এই উপন্যাস বর্তমান সময়ের পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ন এক বিষাদময় প্রেম কাহিনি। এই কাহিনিতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন রীতিনীতির অসামঞ্জস্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়েছে। উনিশ শতকের শেষ ভাগে হিংসাবিধ্বস্ত পূর্ব আফ্রিকার ঔপনিবেশিক শাসনের এক বিস্তারিত বর্ননা এই কাহিনির উপজীব্য। এই পরিস্থিতিতে কুরআনের নবী জোসেফের গল্পের যেন পুনরাবৃত্তি হয়েছে। কুরআনের  জোসেফের গল্পের আশাবাদী পরিসমাপ্তির পরিবর্তে গুরনার নায়ক ইউসুফ তার প্রেমিকা আমিনাকে ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। যে জার্মান সেনাবাহিনীকে সে এককালে ঘৃণা করেছে, সেই বাহিনীতে যোগদান করে। গুরনার আর এক বৈশিষ্ট্য হল প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে পাঠকের সুখ প্রত্যাশার হতাশাগ্রস্ত পরিসমাপ্তি ঘটানো।

গুরনার পঞ্চম সৃষ্টি ‘ অ্যাডমায়ারিং সাইলেন্স’ (১৯৯৬) এ আমরা খুঁজে পাই উদ্বাস্তু জীবনের অভিজ্ঞতা, আত্মপরিচিতি তৈরির আপ্রান চেষ্টা ও নিজস্ব ইমেজ সৃষ্টির সংমিশ্রিত এক দলিল। এখানে নীরবতা যেন উদ্বাস্তুর আত্ম পরিচিতি আড়াল করার এক কৌশল হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। পরিচিতি গোপন করার দরকার পড়েছে জাতিবিদ্বেষ ও কুসংস্কারের জন্য। শুধু তাই নয়, এই নীরবতা রর্তমান ও অতীতের মধ্যে সংঘাত এড়ানোর উপায় ও বটে। এর ফলস্বরূপ হতাশা ও বিপদজনক আত্ম প্রবঞ্চনার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই কাহিনির কুসংস্কারগ্রস্ত ব্যাখ্যাকার তার অতীত বতর্মানের ইংরেজ পরিবারের কাছে গোপন রাখে। বতর্মান পৃথিবীতে যেমনটি দরকার সেইমতো নিজের এই নতুন পরিবারের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়। এ যেন নীরবতার দ্বৈত সৃষ্টি হয়েছে এই উপন্যাসে। কারণ এই ব্যক্তি জাঞ্জিবরে তার পরিবারের কাছেও তার নতুন সম্পর্কের কথা গোপন রাখে। ইংল্যান্ডের নতুন পরিবার ও সতের বছরের এক কন্যার কথা তার জাঞ্জিবরের পরিবারের কাছে অজানা থাকে। নীরবতাই দুই পরিবারে আপাত শান্তি বজায় রাখতে সক্ষম হয়।

‘ বাই দ্য সি’ গুরনার ষষ্ঠ উপন্যাস। এ ও হতাশা ও আত্ম প্রবঞ্চনার কাহিনি। এই কাহিনির নায়ক সালে একজন বৃদ্ধ মুসলমান। জাঞ্জিবর থেকে ইংল্যান্ডে আশ্রয় গ্রহনের জন্য শত্রুর নামে জাল ভিসা তৈরি করে। কাহিনির দ্বিতীয় অংশে ঘটনাচক্রে এই শত্রুর ছেলের সঙ্গে সালের দেখা হয়। শত্রুর ছেলে লতিফের ওপর দায়িত্ব বর্তায় সালেকে তার নতুন স্বদেশে মানিয়ে নেওয়ায় সাহায্য করার। তাদের মধ্যেকার আবেগপূর্ণ বিবাদে, সালের মধ্যে পুরানো বিবাদ জাগ্রত হতে থাকে। অনেক চেষ্টা সত্বেও সালে এই বিবাদের স্মৃতি ভুলতে পারে না, কিন্তু লতিফ বেমালুম ভুলে যায়। এই সকল ঘটনা উপন্যাসে এক বিশেষ টানাপোড়েনের সৃষ্টি করে। দুই চরিত্রের টানাপোড়েনে কাহিনি তার নির্দিষ্ট পথ ও দিকভ্রষ্ট হয়। চরিত্রের আত্মোপলব্ধি ও শক্তি খেই হারিয়ে ফেলে।

গুরনার সপ্তম উপন্যাস ‘ ডেসারশন ‘ এ আমরা কিছু নতুন চরিত্রের সন্ধান পাই। সংস্কৃতি ও মহাদেশের আখ্যান থেকে বিরতি। পুরান ও নতুন জীবন থেকে ও বিরতি।  এ যেন এক অনিশ্চয়তার পরিবেশ যাকে কখনও সঠিক পথে আনা সম্ভব নয়। এই উপন্যাসে উপনিবেশিত পূর্ব আফ্রিকার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এর প্রথম অংশ সুদক্ষভাবে দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। বিংশ শতাব্দের শুরুতে এই উপন্যাসের কাহিনি বর্নিত হয় এইভাবে; এক ইংরেজ মার্টিন পিয়ার্স রাস্তায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায়। এক স্থানীয় ব্যবসায়ী তাকে সাহায্যে এগিয়ে আসে। তাকে শহরের এক গোলকধাঁধায় নিয়ে যায় যেখানে ধর্ম, কৃষ্টি এক অজানা জগতের। কিন্তু পিয়ার্স আরবি ভাষা জানে, এই ভাষায় কথা বলতে পারে। এর ফলে সে এই ব্যবসায়ী পরিবারের সঙ্গে নৈকট্যে আসতে পারে। তাদের বাড়ির মেয়ে রেহানার প্রেমে পড়ে পিয়ার্স। মোম্বাসায় এই দুজনের অবৈধ প্রেমের পরিসমাপ্তি হয় নিজেদের মধ্যে বিচ্ছেদের মাধ্যমে। এই মেলোড্রামার অবশ্যম্ভাবী পরিনতি এই বিচ্ছেদ। লেখক গুরনা যেন জেনে বুঝেই এই চিত্রাঙ্কন করেছেন। এক অবাস্তব ঘটনাক্রমে রেহানার নাতি এই কাহিনির ব্যাখ্যাকার। রেহানা চরিত্রের সমাপ্তি ঘটে নি। বরং নাতির মাধ্যমে সেই কাহিনি এখনো চলতে থাকে। এ যেন একের মধ্যে অনেক গল্প। এ যেন আমাদের মধ্যেকার ঘটনা নয়, আমাদের সময়ের সবার গল্প। এই গল্প আমাদের সবাইকে জড়িয়ে থাকে, সবাই আমরা সবসময় এর মধ্যে নিজেদের খুঁজে পাই। গুরনার এই উপন্যাসে নিজের জাঞ্জিবরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। শত শত বছর ধরে এই জাঞ্জিবরে বিভিন্ন ভাষাভাষি, সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষের বসবাস। আবার তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই ও লেগে থাকে। গুরনার লেখায় যদিও ইংরেজির প্রাধান্য, জাঞ্জিবরের কসমোপলিটন পটভূমিকায় বড় হয়ে ওঠা গুরনার লেখায় সেই বৈশিষ্ট্য ও লক্ষনীয়। তার চরিত্রের কথপোকথন ও শব্দ ব্যবহারে বহুত্ব লক্ষ্য করা যায়। তাদের মধ্যে স্বহিলি, আরবি, হিন্দি ও জার্মান ভাষার ব্যবহার প্রাধান্য পেয়েছে।

গুরনার অষ্টম উপন্যাস ‘ দ্য লাস্ট গিফট ‘ (২০১১) তার অন্য এক উপন্যাস ‘ পিলগ্রিমস ওয়ে ‘ র মতো এক বিষাদময় পরিনতি পায়। এই উপন্যাসের অসুস্থ উদ্বাস্তু নায়ক আব্বাসের মৃত্যু ঘটে। আব্বাসের মৃত্যুর আগে তার বই এর সত্ব ও তার সঙ্গে একটি রেকর্ড করা টেপ দান করে যান। এই টেপে তার নিষ্ঠুর ইতিহাস বর্নিত হয়েছে। এই কাহিনি তার পরিবারের কাছে অজানাই রইল।

‘ গ্রেভেল হার্ট ‘ (২০১৭) উপন্যাসে গুরনা তার যুবা নায়কের সঙ্গে তার ক্ষতিকর ও জটিল পরিবেশের ক্রমাগত সংঘাতের এক চিত্র তুলে ধরেছেন। ” আমার বাবা আমাকে চায় না” এই বাক্য দিয়ে উপন্যাসের শুরু। উপন্যাসের যুবা নায়ক সেলিমের কাছ এক ভয়ংকর সত্যি তার পরিবার তার কাছে গোপন রেখেছিল। এই ছিন্নমূল নির্বাসিত ব্যক্তির জীবন সংগ্রামের ইতিহাসে এই ঘটনার ভূমিকা অত্যন্ত নির্ণায়ক। হয়তো শেক্সপিয়রের নাটক ‘ মেজার ফর মেজার ‘ এর ডিউকের ভাষায় গুরনার নায়ক সেলিম ও বলতে চেয়েছিল ” আনফিট টু লিভ অর ডাই! ও গ্রেভেল হার্ট।” গুরনা তার এই নবম উপন্যাসের নায়ক সেলিমের ভাগ্য নির্ধারণে এই দ্বৈত অক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন এই কাহিনিতে।

গুরনার সাম্প্রতিক তথা দশম উপন্যাস ‘ আফটারলাইভস ‘ (২০২০) তার উপন্যাস ‘ প্যারাডাইস ‘ যেখানে শেষ হয়েছে, এর শুরু সেখান থেকে। উপন্যাসের শুরু বিংশ শতাব্দের শুরুতে; ১৯১৯ সালে পূর্ব আফ্রিকায় জার্মান ঔপনিবেশিকতার অবসানের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে। যুবা নায়ক হামজা জার্মান সেনাবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে যেতে বাধ্য হয়। সেখানে এক অফিসারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। পরিনামে ঐ ব্যক্তি তাকে যৌনসঙ্গী হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। জার্মান সেনাদের নিজেদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বে হামজা আহত হয়। তাকে যুদ্ধক্ষেত্রের এক অস্থায়ী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ফেলে রেখে যাওয়া হয়। সুস্থ হয়ে সে তার জন্মস্থানে ফিরে আসে। কিন্তু সেখানে সে তার পরিবার বা বন্ধু কাউকে খুঁজে পায় না। এই কাহিনি তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে। জার্মানরা আবার পূর্ব আফ্রিকা দখল করে, ঔপনিবেশিকতার অভিশাপ জড়িয়ে ধরে এই অঞ্চলকে। এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মকে আমরা দেখি গল্পের মধ্যে এগিয়ে যেতে। গুরনার নাম পরিবর্তন ও এই উপন্যাসে চলতে থাকে। হামজার ছেলে ইলিয়াস হয়ে যায় এলিয়াস জার্মান শাসনের এই পূর্ব আফ্রিকাতে। এই ভয়ংকর পরিবর্তনের ধারা বারে বারে চলতে থাকে এই উপন্যাসে। শাসকের আদর্শবিধির কাছে, জাতিবিদ্বেষের কাছে ব্যক্তি নিরুপায়; আত্মসমর্পণ ও আত্মত্যাগ ছাড়া তার কোন উপায় নেই।

গুরনার লেখার মূল বৈশিষ্ট্য হল সত্যের প্রতি তার দায়বদ্ধতা ও সরলীকরনের প্রতি অনীহা। এই বিষয়ে তিনি কোনরূপ সমঝতার পক্ষপাতী নন। একই সঙ্গে তিনি প্রতিটি ব্যক্তির ভাগ্য নিজের গভীর আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে নিতেন, কিন্তু নিজের কমিটমেন্টের বিষয়ে কখনও নতিশিকার করতেন না। তার উপন্যাসগুলি চিরাচরিত বর্ননামূলক যেমন ছিল, তেমন পূর্ব আফ্রিকার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যময় জীবনের মধ্যে বিচরন করতো। এই বৈচিত্র্যের কাহিনি বিশ্বের অন্য প্রান্তের লোকজনের কাছে এতদিন অজানা ছিল। গুরনার সাহিত্যকৃতির বিশ্ব সদা পরিবতনশীল – সে  স্মৃতি, নাম, কিংবা কাহিনীর চরিত্রের পরিচিতি হোক। গুরনার সৃষ্টি সম্ভবত সুনির্দিষ্ট কোন সম্পূর্নতা প্রাপ্তির পথ অবলম্বন করে না। তার প্রতিটি লেখা এক অন্তহীন অন্বেষণ, যার ছত্রে ছত্রে উপস্থিত বৌদ্ধিক আবেগের স্পর্শ। গুরনার লেখার এই বৈশিষ্ট্যই নোবেল কমিটির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে। নোবেল কমিটি সেই বৈশিষ্ট্যের পরিচিতি সারা বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন। সেই স্বীকৃতির প্রাপ্তি এই নোবেল সাহিত্য পুরষ্কার। নোবেল কমিটি আমাদের সামনে বিশ্বের উদ্বাস্তুদের নির্বাসিত জীবনের জ্বালা যন্ত্রণার কিছু জলছবির স্বাদগ্রহনের সুযোগ করে দিয়েছেন গুরনাকে এই পুরষ্কার প্রদানের মাধ্যমে। এতদিন আড়ালে থাকা এই সাহিত্য চর্চা আমাদের অনেক অজানা অন্ধকার ইতিহাসের সন্ধান দিতে পারে।

তথ্যসূত্র: বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ব্লগ।

সজল কুমার মাইতি, পিএইচডি। লেখক ও অধ্যাপক। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতায়। তিনি মূলত গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ লিখে থাকেন। লেখালিখি শখের হলেও পেশাগত জীবনে তিনি ভারতের সরকারি কলেজ 'হুগলী মহসীন কলেজ'--এর বাণিজ্য বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। এর...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ