নয়না রয়

মালবিকা লাবণী শীলা
গল্প, পডকাস্ট
নয়না রয়

ছুটির দিন একটু আদুরে বেড়াল হয়ে যেতে ইচ্ছে করে নয়নার। রাত জেগে বই পড়ার অভ্যাস ওর অনেক দিনের। কিন্তু আজকাল অফিসের জ্বালায় বারোটার মধ্যে শুয়ে পড়তে হয়। নইলে সকাল নয়টার অফিস ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

আজ শনিবার। গতরাতে একটি থ্রিলার নিয়ে পড়তে গিয়ে প্রায় ভোর করে ফেলেছে নয়না। রয় এসে কয়েকবার শুকনো মুখে উঁকি দিয়ে গেছে, টের পেয়েও নয়না ইজিচেয়ার ছেড়ে বিছানায় যায়নি। বই শেষ করে একবার ভেবেছে কড়া কফি খেয়ে সাপ্তাহিক বাজারটা করে ফেলবে। রয় ওকে একটু কড়া স্বরেই বলেছে,

– নো সুইটি! বাজারের লিস্ট লিখে রেখে সোজা বিছানায় যাও। এবং আপাতত নো কফি! আমি পরে গিয়ে বাজার করে আনবো।

– ধুত! তুমি মাছ ঠিক মতো চেনো না! শাক সব্জিতেও গোলমাল পাকাও! দেশি পুঁই আনতে বললে এখানকার টেস্টলেস স্পিনাচ নিয়ে আসো! এই সেদিনও তো পটলের জায়গায় বেগুন নিয়ে এলে! তুমি আসলে একটা ঢ্যাঁড়শ!

এতোক্ষণ ঠোঁট ফুলিয়ে অভিযোগ করলেও রয়কে ঢ্যাঁড়শ বলার সময় নয়নার চোখদুটো হেসে উঠল। রয় একটু সরু চোখে নয়নার দিকে তাকিয়ে বলল,

– অ‍্যাজ ফার অ‍্যাজ আই নো, ঢ্যাঁড়শ হচ্ছে ওকরা, অতি স্লাইমি একটা গ্রিন ভেজিটেবল। হাউ কুড আই বি সামথিং লাইক দ্যাট?

ওর চিন্তার বহর দেখে নয়না জোরে জোরে হেসে উঠে বলে,

– তুমি কচু বুঝেছো!

রয় আরেকটু কনফিউজড হয়ে বলে,

– এটাও তো একরকমের রুট ভেজিটেবল, তাই না? এগুলো সব আনতে হবে?

রয় ওর নিজের কাজের ক্ষেত্রে অত্যন্ত পটু হলেও, ওর সেন্স অফ হিউমারের অবস্থা খুবই খারাপ। আসলে ঠিক তা-ও না। অন্য কালচারের কাউকে কাঁচকলা দেখিয়ে লাভ নেই। পরে এর অর্থ বোঝাতে বোঝাতেই জান কয়লা হয়ে যায়! ওদের মতো করে ওর সেন্স অফ হিউমার আছে, সেটাও নিতান্ত খারাপ নয়। তবুও নিজের ভাষায় নিজের মতো করে মজা করতে নয়নার ভাল লাগে। সেক্ষেত্রে রয় ঠিক বুঝতে পারে না কিভাবে রিঅ‍্যাক্ট করবে। ওর অপ্রস্তুত চেহারা দেখতে নয়নার বেশ লাগে।

গল্পটির অডিও শুনুন এইখানে:

একটি বিশাল মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির অ‍্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর নয়না। নিজের ক্যারিয়ার গড়ায় ও এতোটাই ব্যস্ত ছিল যে, ওর প্রেম অথবা বিয়ে করার মতো সময়ই জোটেনি, ওরকম রিলেশনের পেছনে প্রচুর সময় আর ইমোশন ব্যয় করতে হয়, ইমোশনের অভাব না থাকলেও সময়টাই আর করে উঠতে পারেনি ও। এরপর এলো রয়। বাংলা কথা ও বোঝে, বলতেও পারে। কিন্তু কৌতুকগুলো ও কিছুতেই বুঝতে পারে না। না বুঝতে পেরে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে খানিকটা ব্লাশ করে। এটাই নয়নার মজা লাগে।

নয়না বাজারের লিস্ট করে টেবিলে রেখে বেডরুমের দিকে এগোয়। বিছানায় গিয়ে ও ধপাস করে শুয়ে পড়ে। রয় কিচেন থেকে এসে বেডরুমে নরম আলো জ্বেলে দেয়। রিমোট টিপে পর্দাগুলো টেনে, সাউন্ড সিস্টেমে বিসমিল্লা খাঁ’র সানাই ছেড়ে, বিছানার কাছে এসে নয়নার ঠোঁটে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয়। কিন্তু নয়না, রয়ের হাত ধরে ওকে কাছে টানে। নয়নার এখন রয়কে ভীষণভাবে একান্তে পেতে ইচ্ছে করছে। রয় নয়নার পাশে এসে বসে ওকে আবার চুমু দেয়, তবে এবারের চুমুটা আরো গভীর, আরো গাঢ়, আরো অর্থবহ। নয়নার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসছে। আবেশে চোখের পাতা বন্ধ হয়ে এসেছে। নয়না শক্ত করে রয়কে জড়িয়ে ধরে…।

শরীর আর মনে এক আরামদায়ক আলস্য আর ঠোঁটের কোনে একটুকরো হাসি নিয়ে নয়না ঘুমিয়ে পড়ে।

কয়েকঘন্টা পর ফোনের শব্দে ও চোখ মেলে। জেএলআরপি থেকে কল এসেছে। ওদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রাখে নয়না। ফোনটা পেয়ে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেছে। কাল রবিবার, রয়কে নিয়ে লং ড্রাইভে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো নয়নার। তা আর হচ্ছে না।

ওদিকে রান্নাঘর থেকে টুকটাক শব্দ ভেসে আসছে। নিশ্চয়ই রয় রান্না করছে। মজাদার খাবারের গন্ধও ভেসে আসছে। নয়না কিচেনে যায়। যেতেই রয় বলে,
– তোমাকে ফোনে কথা বলতে শুনেই আমি কফি মেশিন অন করেছি। এই নাও তোমার কফি।

হাত বাড়িয়ে কফি নেয় নয়না। চুমুক দিয়েই মনটা ফুরফুরে হয়ে আসে। এতো চমৎকার কফি বানায়! ওদিকে তিনটা চুলায় একসাথে রান্না চাপিয়েছে ও। ছুটির দিনে নয়না একটু আয়েশ করে দেশি খাবার খেতে পছন্দ করে। রয় নয়নার পছন্দের সব কিছু রান্না করতে জানে। নয়না একটি কড়াইয়ে উঁকি দিয়ে দেখে ঢ্যাঁড়স ভাজি হচ্ছে, অন্যটিতে কচু আর ইলিশ, একটাতে বেগুনের বড়া। পাশে হটপটে গরম ভাত আর পটল ভাজা। সন্দেহ নেই এগুলো সবই নয়নার পছন্দের খাবার। ওর মনেমনে হাসি পায়, সকালে যে যে সব্জির প্রসঙ্গ এসেছে, রয় প্রায় সবগুলোই কিনে এনে রান্না করে বসে আছে।

রয় একটু এগিয়ে নয়নার কপালে চুমু দিয়ে বলে,

– তুমি শাওয়ার নিয়ে নাও, আমি টেবিলে খাবার দিয়ে দিচ্ছি।

– উঁউঁউঁ যেতে ইচ্ছে করছে না তো!

নয়নার আহ্লাদ দেখে হেসে রয় বলে,

– তাহলে দুইমিনিট ওয়েট করো আমিই তোমাকে শাওয়ার করিয়ে দেবো।

নয়নাও হেসে দেয়। রয় ওকে রীতিমতো বাচ্চাদের মতো আদর যত্ন করে। বন্ধুর মতো পরামর্শ দেয়। প্রেমিক হিসেবেও ও অদ্বিতীয়। সঙ্গী হিসেবে এরচেয়ে ভালো কাউকে নয়না কল্পনাই করতে পারেনা।

গত পাঁচ বছরে বাইরে ট্যুরে যাওয়া ছাড়া রয়কে ছেড়ে থাকেওনি নয়না।

নয়না খেতে বসে। রয় খাবার বেড়ে দিতে চাইলে নয়না ওকে বলে,

– তুমি একটু বসো কথা আছে।

নয়নার গম্ভীর মুখ দেখে রয় নিজেও চিন্তিত চেহারা নিয়ে ওর মুখোমুখি বসে জিজ্ঞেস করে,

– কী হয়েছে সোনা, ইউ লুক সো সিরিয়াস! ইজ এভরিথিং ওকে?

– জেএলআরপি থেকে কল করেছিল।

– ওহ!
রয়ের মুখের আলো দপ করে নিভে যায়। ও জিজ্ঞেস করে,

– তুমি কি আপগ্রেড করাতে চাইছো?

– আরে নাহ! পাঁচ বছরের রুটিন চেকআপ আর কি!

– বড়সড় কিছু করবে না তো?

– না না, তা কেন করতে যাবে?

রয়কে আশ্বস্ত করতে কথাটা বলে ঠিকই কিন্তু নিজে খুব একটা ভরসা পায় না। ওর এক পরিচিত মেয়ের কম্প্যানিয়নকে আপগ্রেড করার পর থেকে কম্প্যানিয়নের স্বভাব পুরোই পাল্টে গেছে, এখন ওকে দেখলেই মেয়েটি অস্বস্তি বোধ করে। রয় একটু চুপচাপ থেকে বলে,

– একটু চার্জ দিতে হবে। ব্যাটারি লো হয়ে এসেছে। তুমি কি খেয়ে এসে একটু আমার পাশে শোবে?

– তুমি যাও আমি আসছি।

– ওকে সোনা, লাভ ইউ।

– লাভ ইউ টু।

খাওয়া সেরে বেডরুমে যায় নয়না। রয় পাশ ফিরে শুয়ে আছে। চার্জার ওর ডানহাতের বাইসেপে ঢোকানো। চার্জ নেওয়ার সময় ও প্রায় ঘুমের স্টেজে চলে যায়।
ওর পাশে আস্তে করে শুয়ে নয়না ভাবতে থাকে, জেএলআরপি মানে “জাস্ট লাইক রিয়েল পার্সন” কোম্পানিটি বছর দশেক আগে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্ট সঙ্গী তৈরি করার পরপরই সবার মধ্যে বেশ সাড়া পড়ে যায়। যখন প্রচণ্ড ব্যস্ত মানুষগুলোর প্রেম, বিয়ে পটাপট ভেঙে যাচ্ছিল। নারী পুরুষ সবাই ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত। ঠিক তখনই জেএলআরপি বাজারে সঙ্গী হিসেবে এদের ছাড়ে। শুরুতে অনেকের দ্বিধা থাকলেও, মনের মতো করে প্রোগ্রাম করে নেওয়া যায় বলে অধিকাংশই আগ্রহী হয়ে ওঠে। চেহারা, হাইট, ভাষা, চুল, স্বভাব, গায়ের রঙ, চোখের রঙ থেকে শুরু করে প্রতিটি ডিটেইল ওরা রেকর্ড করে সেভাবেই তৈরি করে দেয় একজন সঙ্গীকে। গৃহকর্ম ছাড়া অন্যান্য কাজেরও প্রোগ্রামিং করে নেওয়া যায়।

অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর নয়না একজন সঙ্গীর জন্য আবেদন করে। আজ পাঁচ বছর ধরে নয়না রয়কে নিয়ে এসেছে। সেই থেকে শারীরিক, মানসিক, আত্মিক সবদিক থেকেই ভীষণ রকম সুখে আছে নয়না। রয় আসার আগে নয়না আসলে বুঝতেই পারেনি ও কতোটা একা হয়ে গিয়েছিলো! কয়েকটা ব্যর্থ প্রেমের পর থেকে নয়নার আর কোনো সম্পর্কে জড়াতে ইচ্ছে করেনি। কিন্তু কাজ সেরে খালি বাসার লকটা খুলতেই মনটা হাহাকার করে উঠত। একটা কুকুর বেড়ালও যদি অপেক্ষায় থাকতো! যে ঘরে কেউ অপেক্ষায় না থাকে, সেই ঘরে ফেরার টানটাও আসলে তেমন থাকে না।

শুরুতে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও রয় আর নয়না দুজনের মধ্যে এতো সুন্দর একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যা কল্পনাতীত। মেশিন হলেও নয়না রয়ের সাথে কখনোই খারাপ ব্যবহার করেনি। রয় নিজেও এতো ভালো! অবশ্য মেশিনকে যেভাবে প্রোগ্রাম করা হবে, সে তো সেরকমই রেজাল্ট দেবে! তবুও কেন জানি নয়নার মনে হয় ও রয়ের প্রেমে পড়েছে। রয়ের রুটিন চেকআপের পর ওরা গরীব কোনো দেশ থেকে একটি অরফ্যান বাচ্চা দত্তক নেবে। রয়কে তো নয়নার মানুষ ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি। রয় ভীষণ কেয়ারিং আর লাভিং। নয়না রয়কে “লাভ ইউ” কথাটা শুধু বলার জন্য বলে না। সত্যি সত্যি ভালোবাসে বলেই বলে। পাঁচ বছরে নয়না বুঝে গেছে ঘর বাঁধতে চাইলে একমাত্র রয়ের সাথেই বাঁধা যায়।

মালবিকা লাবণী শীলা। কবি, লেখক ও সংগীত শিল্পী। বাংলাদেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠা, বর্তমানে কানাডার নাগরিক। বাঙলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে। শাস্ত্রীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ভক্ত ও সাধক।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..